সম্পর্কের বন্ধন পর্ব-০৫

0
4863

গল্প–#সম্পর্কের_বন্ধন
লেখিকা– #সোনালী_আহমেদ

৫.
মাঝরাত, চারিপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার হবার কথা। অথচ বাহির এতই আলোকিত যে রাস্তার উপরের ছোট ছোট পাথরের রংও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কারণ বাহিরে ল্যামপোস্ট জ্বলছে, পাশাপাশি বাসা-বাড়ীর বাহিরের বাতিগুলোও জ্বলছে। শহরের মানুষের এ একটা নিয়ম রয়েছে তারা কারণবিহীন রাতদিন আলো জ্বালিয়ে রাখে। শহরে থাকতে হলে বোধহয় এমন নিয়ম মানতে হবে। তাদের অতি টাকা-পয়সা আছে তা এটার মাধ্যমেই বুঝানো হয়। নাহলে খামোখা কেনো এতগুলো লাইট জ্বালিয়ে বিদ্যুৎ বিল বাড়াবে। রিপার শশুরবাড়ীর বাহিরের উঁচু ওয়ালের বাহিরে বেশ কয়েকটা লাইট লাগানো। সেসবের আবার নানা বাহার, রিপার মনে হলো এসব অযথাই অপচয়। সে হলে কখনো এতগুলো লাইট লাগাতে আর জ্বালাতে দিতো না। সে মধবিত্ত পরিবারের মেয়ে, তার বাবা খুবই হিসেবি, সে ও হয়েছে তার বাবার মতো। তার বেড রুমে দুটো লাইট প্রয়োজন তবুও সে একটি লাইট ই রেখেছে। পড়ার সময় সে বিছানার পাশে এসে লাইটের নিচে পড়ালেখা করে যায়। তবুও বাবাকে বলে দুটো লাগায় না। অথচ এখানে একটার স্থানে তিন টা। রিপা জানালার পাশে দাড়িয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে এসব ভাবছে। অথচ তার এখন ভাবা উচিত শ্যামলের বলা কথা নিয়ে, কিন্তু সে ভাবছে না। যে বিষয় সে জানবে সেসব নিয়ে আগে ভেবে উল্টাপাল্টা কিছু মনে নিয়ে টেনশন করতে চায় না। বলতে গেলে সে পারে না। রিপার এটা অদ্ভুদ এক অভ্যাস। এই যেমন, ফিজিক্স পরীক্ষার দিন তার ফিজিক্স পড়তে ইচ্ছা করে না, সে তখন বায়োলজি পড়ে। যেটা হবে সেটা নিয়ে এত টেনশন করার কি দরকার? হলেই তো দেখবে।

– শ্যামল সিগারেট খাচ্ছে খুব দ্রুত, অথচ এত সময়ে অর্ধেক ও শেষ করতে পারে নি। রিপার সামনে সিগারেট খাওয়া যাবে না। রিপা সিগারেটের গন্ধ নিতে পারে না। এজন্য বারান্দায় দাড়িয়ে সিগারেট টানছে। রিপা অবশ্য এতে আপত্তি করে নি, সে আপত্তি করেছিলো যখন তাকে বলেছিলো ওখানে (রিপার সামনে) বসে সে খেতে পারবে কি না? শ্যামল আশ্চর্য ভঙ্গিমায় সিগারেটের দিকে তাকালো। সে এখনো শেষ করতে পারছে না কেনো? সচরাচর সিগারেট খায় না সে, মাঝে মাঝে খুব টেনশন হলে একটা-আধটা খায়। রুমের ভেতর থেকে চিকন কন্ঠে রিপার আওয়াজ আসলো,’ মিঃ শ্যামল, আপনার কি এখনো খাওয়া শেষ হয় নি?’ শ্যামল অর্ধ খাওয়া সিগারেট টা ছুড়ে ফেলে দিলো। ক্ষীণ স্বরে জবাব দিলো, ‘ আসছি।’ বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে স্থির হয়ে নিলো শ্যামল। স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় হেটে এসে উপস্থিত হলো রিপার সামনে। রিপা বেতের সোফায় বসে আছে। তার সামনে একটা টি-টেবিল আর বাম দিকে আরো একটা তিন জনের বসার মতো সোফা। সে যেখানে বসেছে সেখানে দুজন বসতে পারবে। রিপা ইশারায় শ্যামলকে তার বাম দিকের সোফায় বসতে বললো। সাথের সোফায় বসলে কথা বলতে অসুবিধা হবে, তার চেয়ে বরং পাশের সোফায় বসলে তার তাকাতে কষ্ট হবে না। দুজন আড়াআড়িভাবে বসলো। রিপা ঘরের আশেপাশের দিকে নজর বুলিয়ে ভাবলো, এরা বেশ শৌখিন। শ্যামলের মৌনতা দেখে সে সহজ গলায় বলে,

‘ আপনার “একটু সময়” কি এখনো শেষ হয় নি? রাত বাড়ছে, যত দ্রুত সব বলবেন ততই লাভ হবে।’

‘ বলাবলির অনেক কিছুই। বলা শুরু করলে আজ সব বলে শেষ করতে পারবো না। এর চেয়ে বরং আপনি প্রশ্ন করুন, আমি জবাব দিচ্ছি।’

রিপা ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানালো। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,

‘ঠিক আছে। প্রথম প্রশ্ন, আমার স্বামী কে? যদি আপনি হয়ে থাকেন তাহলে মিস নুহা আর আপনার মা কেনো বললো ওসব সাজানো এবং আমার বিয়ে আমার ভাইয়ের সাথে হয়েছে?’

‘ আপনার স্বামী ‘মোঃ নীলয় আলমগীর শ্যামল’ অর্থাৎ আমি। দ্বিতীয়ত, নুহা এবং আম্মা আপনাকে যা বলেছেন সেসব মিথ্যা। আবার সত্য।’

রিপা ভ্রুযুগল কুচকালো। শ্যামলের কথা তার বোধগম্য হচ্ছে না। কপালে তিন ভাঁজ ফেলে বলে,

‘ মিথ্যা আবার সত্য? এর অর্থ কি?কথা না পেঁচিয়ে সোজাসুজি বলেন।’

‘ কথাগুলো বাস্তবিকভাবে মিথ্যা। তবে তাদের জন্য সত্য। আপনার সাথে যে ছলনার বিয়ে হয়েছিলো সেটা তাদের জন্য ছলনা ছিলো। বাস্তবে আমি আপনাকে সত্যিকার অর্থেই বিয়ে করেছি। তাদের প্ল্যানমতো সব করেছি,শুধু মাঝেই নকল বিয়ের স্থানে আসল বিয়ে করে ফেলেছি।’

রিপার কপালে ভাঁজ সরলো না বরং আরো দৃঢ় হলো। কথাবার্তার আগামাথা না বুঝলে তার এমন প্রতিক্রিয়া হয়। মাঝেমাঝে মাথা চুলকায়। শ্যামলের কথার আগামাথা কিছুই খু্ঁজে পাচ্ছে না দেখে চোখগুলো ছোট করে তাকালো। শ্যামলের হাসি পেলো, কিন্তু সে হাসলো না। হাসি আসলে সবসময়ে হাসা যায় না, কিছু স্থানে তা সংবরণ করতে হয়। এখন হাসার অর্থ হলো সে সব মিথ্যা বলছে বা রিপাকে নিয়ে মজা করছে। তাই সে হাসলো না বরং সহজ ভাষায় বললো,

‘আপনি হয়তো কিছু বুঝতে পারছেন না। বুঝার কথাও নয়, যেহেতু আপনি কিছুই জানেন না। আমি বলছি শুনুন, আপনার সামনে এতসময় যেসব উপস্থাপন করা হয়েছিলো সবকিছুই একটা চক্রান্ত ছিলো। চক্রান্ত হলো আমাকে দেখিয়ে ভাইয়ের সাথে বিয়ে দেওয়া হবে, তারপর আমার চরিত্র খারাপ প্রমাণ করে আপনাকে ভাইয়ের প্রতি দূর্বল করা হবে। ভাইয়ের প্রতি দূর্বল হলে তখন বলা হবে আপনাকে বাস্তবে ভাই ই বিয়ে করেছেন। তখন আর সমস্যা হবে না, কারণ ভাইয়ের প্রতি তো আপনার টান চলে আসবে। এসব কিছু একটা চক্রান্ত ছিলো। এ চক্রান্ত করার কারণ হলো, আপনাকে কখনো ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিবে না আপনার পরিবার। এর শুধুমাত্র কারণ ভাই মানসিক অসুস্থ সেটা নয়, তার কারণ ভাইয়ের “প্রথম বিয়ে”,যার জন্য আমার ভাইয়ের এ অবস্থা। আপনার স্থানে অন্য কোনো মেয়ে হতে পারতো, আপনিই কেনো? এমন একটা প্রশ্ন হয়তো আপনার মাথায় এসেছে? তার উত্তর হলো, ‘ ভাইয়ের বিড়ালকে যে বাঁচিয়েছে তার সাথেই যেনো ভাইয়ের বিয়ে হয়।’ -এই উক্তিটি।’

রিপার কপালে আবার চিন্তার ভাঁজ দেখা দিলো। শ্যামলের ঠোঁট নাড়া বন্ধ দেখে সে দ্রুত বলে,

‘ সব ঠিকঠাক বলে শেষে আবার প্যাচ লাগালেন কেনো? আপনার ভাইয়ের প্রথম স্ত্রী মানে? উনি কি বিবাহিত ছিলেন? তাহলে উনার স্ত্রী কে? মিস নুহা নিশ্চই নয়। অন্য কেউ হলে সে কই? তার কি হয়েছে? আর উক্তিটি মানে? এই উক্টি কার? কে বলেছে এসব? খোলাসা করে বলেন।’

‘ জ্বি, আমার ভাই বিবাহিত। তবে বিপত্নীক। ভাবী মারা গিয়েছেন গত বছরের শেষের দিকে ভাবীর আকস্মিক মৃত্যু সহজ হলো না ভাইয়ের জন্য। মানসিক চাপ নিতে না পেরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। বার্বিডল নামে আমার ভাবীকে ভাই ডাকতো। কারণ ভাবী দেখতে হুবহু বার্বিডলের মতো ছিলো। বিড়াল টাও ভাবীর। আর উক্তিটি হলো আমাদের পরিবারের বিখ্যাত, সরি কুখ্যাত পীর সাহেবের। যার জন্য মারা গিয়েছেন আমার পরীর মতো ভাবী। এই পীর সাহেব হলেন আমাদের পরিবার ধ্বংস করার নষ্টের মূল। যাকে সাধ্যে থাকলে গলা টিপে মেরে ফেলতে দু-দন্ড ভাবতাম না।’

কথা বলতে বলতে শ্যামলের চোখমুখ শক্ত হয়ে গেলো। কপালের রগ ফুলে ভাসমান হলো। শ্যামল যখন এই পীর সাহেবের কথা মুখে আনে, তখন তার চোখমুখ এমন হয়ে যায়। যেনো তার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তিনি। রিপা এখনো হতভম্ব হয়ে আছে। সে এখনো পুরোপুরি কিছুই বুঝে উঠে নি। মাথাটা ঘোলাটে লাগছে। এ শ্যামল লোকটা এমন ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলে কেনো? সহজ করে বললেই তো সে সব বুঝে যায়। বিরক্ত লাগছে শ্যামলের কর্মকান্ড। মানুষ অদ্ভুত, সোজা ভাত খাবে না, হাত ঘুরিয়ে উল্টিয়ে খেতে চাইবে। এমনিতেই গত কয়েকদিন যাবৎ কি হচ্ছে সে কিছুই ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারছে না। বিরক্ত ভাব টা ঝেড়ে ফেলে কৌতুহল নিয়ে সে শ্যামলকে প্রশ্ন করলো, ‘ এই পীর সাহেব কে? আর উনি ই বা কি করেছেন? সবকিছু বিস্তারিত বলুন।’

#চলবে..
®সোনালী আহমেদ