সাহেব_বিবি_গোলাম পর্ব-০৮

0
1194

#সাহেব_বিবি_গোলাম
#নুশরাত_জেরিন
#পর্ব:৮
,
,

গাড়িতে উঠে চুপচাপ বসে রইলাম আমি।মাথাটা বারবার চক্কর দিচ্ছে। চোখ ঝাপসা হচ্ছে বারবার।আমার ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে যাকে আমি একদিনের পরিচয়ে এতোটা বিশ্বাস করলাম সে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো?এতোটা জঘন্যভাবে?আমাকে বাড়িতে নিয়ে এসে মামার হাতে তুলে দিলো?দিলো তো দিলো নিজে আবার বিয়েও করে নিলো?তারমানে শুভর সাথেই বিয়ে ঠিক করেছিলো মামা?শুভই সেই বড়লোক লোকটা?যে কিনা টাকা দিয়ে প্রায় কিনে নিচ্ছে আমায়?কিন্তু সে হঠাৎ বাসে কোথায় যাচ্ছিলো?এই যে এত্তো বড় গাড়ি আছে তার,তাহলে গাড়ি রেখে বাসে কেনো যাচ্ছিলো?আমায় ধরতে?আমায় ফিরিয়ে আনতে?প্রথম থেকেই এটা শুভর প্লান ছিলো?আর আমি কিনা বুঝতেও পারলাম না উল্টো তার উপর বিশ্বাস করলাম।
ঘর থেকে বেরিয়ে যখন প্রথম শুভকে দেখেছিলাম তখন আমার শরীর ঘেমে হাত পা কেঁপে উঠেছিলো।বিশ্বাস ভাঙার শব্দে কান ঝালাপালা হয়েছিলো আমার।
মাথা ঘুরে পরে যেতে গেলেই শুভ হুট করে এগিয়ে এসে আমায় পাঁজাকোলে তুলে নিয়েছিলো।
আর কোনদিকে না তাকিয়ে মামির হাতে একটা চেক গুজে আমাকে নিয়ে হনহন করে বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিয়েছিলো।
এখন পর্যন্ত আমার সাথে সে একটাও কথা বলেনি।হয়তো বলার মুখ নেই।
কিন্তু আমার কথাটা সে কেনো ভাবলো না?মানুষ চিনতে আমি এতোটা ভুল করলাম?নিজের উপরই ঘৃনা হচ্ছিল আমার।
হঠাৎ প্রিতমের কথা মনে পরলো।
তাকে ছাড়া অন্যকাউকে কিভাবে স্বামী হিসেবে মেনে নেবো আমি?কিভাবে সহ্য করবো?তাও আবার একটা বিশ্বাসঘাতককে?
এতোক্ষণের আটকে রাখা কান্না হুড়মুড় করে বাইরে বেরিয়ে এলো।ডুকরে কেঁদে উঠলাম আমি।
শুভ ড্রাইভিং সিটে বসে ড্রাইভ করার মাঝেমাঝে আঁড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছিলো।হঠাৎ আমাকে কাঁদতে দেখে সে গাড়ি থামিয়ে ফেললো।চোখ কুঁচকে তাকালো সে।
নিজের দু আঙুল দিয়ে কপাল ম্যাসাজ করলো।
চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বললো,

—হোয়াট হ্যাপেন্ড?কাঁদছো কেনো?

আমি কাঁদতে কাঁদতে তারদিকে তাকালাম।আবার জানালা দিয়ে বাইরে মুখ ফেরালাম।লোকটার সাথে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা।কথার বদলে কান্নার বেগ আরও বাড়লো আমার।

শুভ একটু চুপ থেকে আমার কোন উত্তর না পেয়ে ধমকে উঠলো।বললো,

—কান্না থামাও!থামাও বলছি!

ধমক শুনেও কোনপ্রকার ভয় ছুতে পারলোনা আমায়।তারদিকে চোখ রেখে কাঁদতে কাঁদতেই বললাম,

—কেনো করলেন এমনটা?কেনো করলেন?

শুভ না বোঝার মতো করে বললো,

—কি করেছি?

—আপনি জানেননা?

—নাতো।

আমি তীক্ষ্ণ চোখে তাকালাম।বললাম,

—ফাইজলামি করেন আমার সাথে?

—আরে ফাইজলামি কেনো করবো?তুমি আমার দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র বউ।তোমার সাথে ফাইজলামি করতে পারি?

আমি কপাল কুঁচকে তাকালাম।লোকটাকে এই মুহুর্তে আমার খুন করতে ইচ্ছে করছে।নয়তো কিছু দিয়ে বাড়ি মেরে মাথা ফাটাতে ইচ্ছে করছে।ততক্ষণে শুভ আবার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ফেলেছে।
দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,

—খবরদার আমাকে বউ বলবেন না।

—কেনো কেনো?

—কারন আমি আপনার বউ না।

—হুহ বললেই হলো?তিন কবুল বলা বিয়ে করা বউ আমার!

আমি রাগে কিড়মিড় করতে থাকলাম।কান্না থেমে গেছে আমার আরও আগে।এখন সারা শরীর জ্বলছে রাগে।বললাম,

—আপনি না বাসে বসে বলেছিলেন,আপনার টেস্ট ওতো খারাপ না?তাহলে কেনো করলেন আমায় বিয়ে?

শুভ নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিলো,

—ঝগড়া করতে।

—মানে?

—ভাবলাম তোমার মতো মেয়ে তো আর কখনো পাবোনা,তোমার মতো মানে,এতো ঝগরুটে মেয়ে।
তুমি দুনিয়ায় এক পিস ই আছো।তাই ভাবলাম সেই এক পিস নাহয় আমিই রেখে দেই।নিজের করে।বলা তো যায়না কখন জাদুঘরের লোকেরা তোমায় নিতে চলে আসে।

আমার পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব হলোনা।একপ্রকার ঝাপিয়ে পরলাম তার উপর।বুকের ওপর এলোপাতাড়ি কিল ঘুসি শুরু করে দিলাম।এতো পরিমান বদ লোককে মেরে ফেলাই উচিৎ।
চিৎকার করে বললাম,

—আমি ঝগরুটে? আমি?আমাকে জাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হবে?আমাকে?

আমার হামলায় শুভ গাড়ি থামালো।দুহাত দিয়ে জাপটে ধরলো বুকের উপর।
আমি ছুটতে চাইলেও পারলাম না।মোচড়ামুচড়ি করলাম খুব।
শুভর বুকের উপর আমার মাথা থাকায় তার শরীর থেকে একটা মিষ্টি ঘ্রান ভেসে এলো।অদ্ভুত অনুভূতি হলো শরীর জুরে।
শুভ আরও ঘনিষ্ঠভাবে আকড়ে ধরলো।
আমার পিঠে নাক ঘষতে লাগলো।
ফিসফিস করে বললো,

—আমার মারকুটে বউ।
,

,

,

চলবে……