#সিনিয়র_লাভ_বার্ড(২১)
#লেখিকা_এমএ_তাহিনা
বিষাদের সময় এতো দীর্ঘ হয় কেনো? কষ্টের দিনগুলো এতো দীর্ঘ হয় কেনো? জানা নেই কল্পের। প্রেয়সীকে না দেখার যন্ত্রণায় সে প্রতিনিয়ত দগ্ধ হচ্ছে। আজ একমাস হলো পূরবি নিখোঁজ হওয়ার। কেউ খুঁজে বের করার আর চেষ্টা করেনি। কারণ পূরবি পারু শেখ এর ফোনে একটা মেসেজ করেছিলো মেসেজটা এমন ‘আসসালামু আলাইকুম আম্মু। আমি পূরবি। জরুরি প্রয়োজনে একটি কাজে এসেছি। কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব নয়। আমার জন্য কেউ চিন্তা করোনা। সঠিক সময়ে আমার কাজ শেষ করে ঠিকই চলে আসবো। কল্পসহ সবাইকে বলে দিও এগুলো। ভালো থেকো। সবাইকে আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে মানা করো।’
এইটুকুই ছিলো পূরবির দেওয়া সেই মেসেজে। সেইদিনের পর থেকে সবাই নিশ্চিন্তে জীবন যাপন করলেও মনে মনে সবারই পূরবির জন্য চিন্তা হয়। কল্প পড়াশোনায় মন দিয়েছে। দেড় বছর পরে তার পড়াশোনা শেষ হবে। তারপর বাবার বিজনেস নিজে দেখাশোনা করবে বাবাকে অবসর দিবে।৷ এমনি প্লেন তার। তারপর পূরবিকে বিয়ে করবে। যেখানে একমাস পূরবিকে না দেখে অস্থির হয়ে গেছে কল্প, সেখানে দেড় বছর পূরবিকে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এটাই ঢেড় ভালো৷ পূরবিকে সে দেখতে পারবে, কথা বলতে পারবে। নিজের করে পাওয়ার জন্য নাহয় আরো দেড় বছর কষ্ট করলো সমস্যা কি তাতে?
ভালোবাসা এমন এক জিনিস যেটা পেয়ে গেলে অনেকের গুরুত্ব কমে যায়। আবার অনেকেই মাথায় তুলে রাখে। কল্পও তেমনই, সে তার সিনিয়রকে কখনো অসম্মান বা অবহেলা করতে পারবেনা। সে যতোই পূরবি তার থেকে দূরে গিয়ে কষ্ট দিক না কেনো। সে জানে পূরবি ইচ্ছে করে তার থেকে দূরে না, তার সিনিয়র কখনো কারণ ছাড়া কোনো কাজ করেনা এটাই কল্পের বিশ্বাস। মধ্যরাতের অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে কল্প বিড়বিড় করলো- তোমাকে আমার মতো করে কেউ ভালোবাসতে পারবেনা সিনিয়র। কেউ বাসতে আসলেও আমি তাকে সুযোগ দিবোনা। তুমি শুধু আমার, একান্তই আমার। তোমার ভাগ কেউ নিতে আসলে এই সহজ সরল কল্প আর সহজ সরল থাকবে না। ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমি হিংস্র হতে দুবার ভাববো না। একবার তোমাকে নিজের করে পাই, তখন তোমাকে বুঝাবো ভালোবাসা কাকে বলে। প্রতিদিন তোমাকে আমার ভালোবাসায় পুড়াবো। উহু সেটা কষ্টদায়ক নয়। সুখে পুড়াবো। সেই সুখে পুড়ে তুমি আমাকে উজার করে ভালোবাসবে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে তোমার মনের ভিতর লুকানো আমাকে নিয়ে সর্বোচ্চ অনুভূতির শীর্ষে।
কিছু মূহুর্ত পরেই কল্পের লজ্জা লাগতে শুরু করলো, এতোক্ষণ পূরবির ভাবনায় পড়ে কি থেকে কি বলেছে মনে হতেই মুখ ঢাকলো দুই হাতে। এই কথা গুলো সে কখনো পূরবিকে এমন করে বলতে পারবেনা। যেখানে সে নিজেই নিজেকে বলে লজ্জা পাচ্ছে সেখানে পূরবিকে বললে তো অজ্ঞানই হয়ে যাবে মনে হয়। পরমুহূর্তেই ভাবলো কল্প, তখন তো পূরবি তার বউ হয়ে যাবে। আর বউদের কাছে স্বামীরা সবকিছু বলতে পারে, তাতে লজ্জার কিছু নেই। একজন পুরুষ শুধুমাত্র তার একান্ত প্রিয়জনের কাছেই তো নির্লজ্জ হবে। সেও নাহয় পূরবির কাছে নির্লজ্জ হবে তবুও যে করেই হোক এই কথাগুলো পূরবিকে বলবে, না না বলবে না। মুখে না বলে অনুভব করাবে। অনুভব করতে পেরে যখন পূরবি লজ্জা পাবে তখন সেই লজ্জামাখা মুখশ্রী সে দুহাতে নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখবে। কেমন হবে তখন? সে তার সিনিয়রকে লজ্জা দিতে পারবে তাহলে ভাবতেই কল্পের মুখে হাসি ফুটলো। গম্ভীর ভাব বজায় রাখা পূরবিও তাহলে কখনো লজ্জায় লাল হবে, আর সেটা কল্প নিজেই করবে।
নিজের ভাবনা গুলোকে একপাশে রাখলো কল্প, ফোন নিয়ে রূপকের নাম্বারে ডায়াল করলো। এটার উদ্দেশ্য হলো যদি রূপক পূরবির বিষয়ে কোনো খুঁজ খবর জানে তো তার কাছ থেকে জেনে নিবে। এটা সে এই কয়েকদিন ধরেই করে আসছে। তার সবসময়ই মনে হয় পূরবি যদি কারো সাথে কোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ করে তাহলে সেটা রূপক। কেনো এমন মনে হয় জানেনা সে। তার ভাবনার মধ্যেই রূপক ফোন রিসিভ করে সালাম দিলো। উত্তর দিয়ে কল্প বললো- পূরবির কোনো খবর জানতে পারলে রূপক?
ওপাশ থেকে রূপক দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো, কল্প ফোন দিয়ে এই কথাটাই জিজ্ঞেস করবে তা সে জানতো। ছেলেটা সত্যিই পূরবিকে ভালোবাসে, আর সত্যি কারের ভালোবাসলে এমন পাগলামি করা আবশ্যক সেটা রূপকের মনে হয়। সেও রুশার জন্য পাগলামি করে। বার বার রুশার ফোন বন্ধ বলার পরেও ডায়াল করে, যদি কখনো রিসিভ করে। কিন্তু তা হয়না, সেই যে রুশা ফোন দিয়ে কল্পকে সামলানোর কথা বলেছিলো তারপর থেকে আর তার নাম্বারে ফোন যায় নি। সবসময়ের মতোই বন্ধ। রূপকের হঠাৎ করেই মনে হলো পূরবি ও রুশার মতো নিষ্ঠুর নারী সে আগে কখনো দেখেনি। এতো নিষ্ঠুর কিকরে হয় এরা? একবারও কি ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেনা কেমন আছো বা কি অবস্থা? করবেই বা কেনো এরা তো নিষ্ঠুর। নিজের ভাবনাগুলোকে সাইডে রেখে কল্পের উত্তর দিলো সে, – না কল্প কোনো কিছু জানিনা আমি। জানলে অবশ্যই তোমাকে জানাতাম। তোমার যেমন চিন্তা হয় আমারো তেমন হয়। এসব ছাড়ও, পড়াশোনায় ফোকাস করো। আমার তো আরো ছয়মাসের মতো আছে তারপর পড়াশোনা শেষ। ছয়মাস পরেই বিয়ে করে নিবো। আর তুমি? তুমি করবে দেড় বছর পরে। হা হা। তুমি আমার আগে এনগেজডমেন্ট করেও আমার পরে বিয়ে করবে। তো জীবন যুদ্ধে কে এগিয়ে গেলো?
ওপাশ থেকে কল্প হালকা হেসে বললো- তুমি।
রূপক আবারো বললো- আর কে পিছিয়ে গেলো?
কল্প কিছু একটা ভেবে বললে- সূর্য।
রূপক ভ্রু কুঁচকে বললো- সূর্য হবে কেনো? তুমি কেনো নয়?
কল্প ভাব নিয়ে বললো- আমার তো হবু বউ আছে, সূর্যের তো তাও নেই। তাই সূর্যই পিছিয়ে গেছে।
রূপক বললো- কিন্তু আমি তো তোমার আর আমার দুইজনের মধ্যে বলেছি। এর মধ্যে সূর্য কেনো?
কল্প বুঝানোর ভঙ্গিতে বললো- কারণ আমরা তিনজনই সিনিয়র বিয়ে করবো। তাই দুইজন নয় তিনজনকে নিয়ে ভাবতে হবে। সবার আগে তুমি এগিয়ে মানলাম। তারপর আমি। তারপর সূর্য বুঝলে?
ওপাশ থেকে মাথা নাড়িয়ে রূপক বলে- বুঝলাম। তো দিনকাল কেমন যাচ্ছে? এতো রাতে না ঘুমিয়ে জেগে আছো কেনো? নিজে তো জেগে আছোই সাথে আমাকেও ফোন দিয়ে কাঁচা ঘুম ভাঙালে। এখন আমি কি করবো? আমার তো একবার ঘুম ভাঙলে আর ঘুমে ধরে না। আমার ঘুম ভাঙার জন্য তোমাকে কি শাস্তি দেওয়া উচিৎ?
কল্প বললো- এটার জন্য শাস্তি ও পেতে হবে নাকি? তাহলে তো সবার আগে সূর্যকে শাস্তি দেওয়া উচিত। ওই তো আমার কাঁচা ঘুম ভাঙিয়েছে বলে নোটের পিক তুলে দিতে। তারপর আমারো ঘুম আসেনি তাই বেলকনিতে দাড়িয়ে তোমাকে ফোন দিয়েছি।
রূপক দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললো- এটাতেও সূর্য? এই বেটাকে তো আচ্ছা করে একটা ধুলাই দেওয়া উচিৎ। সবসময় এমন করে। অবশ্য করাটাই স্বাভাবিক ওর তো আমাদের দুজনের প্রতি হিংসে হয়। আমরা সিনিয়র বউ পেয়ে যাচ্ছি কিন্তু ও এখনো পটাতে পারলো না। আহারে বেচারার জন্য আমার মায়া হচ্ছে।
কল্প শব্দ করে হাসলো, তারপর বললো- সমস্যা নেই, তোমার বা আমার যেকোনো সিনিয়র শালিকা থাকলে সূর্যের সাথে সেটিং করিয়ে দিবো। এটা ওর বন্ধুগত অধিকার যতোই হোক আমরা তো বন্ধু হয়ে আর ওর কষ্ট দেখতে পারিনা
রূপক হুম বলে, আরো কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দিলো। দুজনেই বিছানায় শুয়ে প্রিয় মানুষের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেলো।
চলবে ইনশাআল্লাহ✨