সে আমার শরৎফুল পর্ব-১৬+১৭

0
280

#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব১৬

#আরশিয়া_জান্নাত

তুই সিওর তুই এই টেস্ট করাবি!

হ্যাঁ।

কিন্তু

কোনো কিন্তু না। আমি জানতে চাই আমি আসলেই এই বাড়ির সন্তান কি না। আমার প্রতি এতো অবহেলার কারণটা তখন স্পষ্ট হবে।

দেখি রুমি, আন্টি বাদে কেউই তোকে অবহেলা করেনা। ভাইয়া আপু কিংবা আঙ্কেল সবাই তোকে আদরে আহ্লাদে রাখে। আমার মনে হয় আন্টি এখন ইনসিকিউর ফিল করে। অবিবাহিত মেয়েরা মা-বাবার চিন্তার কারণ। আগেপরে সবাই বিয়ে নিয়েই ভাবে। তোর বেলা একটু আগে করছে এই পার্থক্য!

শান্তা, বিয়ে দিক সমস্যা নেই। কিন্তু তাই বলে এমন ছেলের সঙ্গে যে আমার চেয়ে অনেক বড়, বিয়ের পর পড়াবেও না। ওনার মায়ের কথাবার্তা শুনে মনে হয়নি উনি ভদ্রতা জানেন। আগের দিনের মহিলাদের মতো চিন্তাভাবনা রাখেন। আমি মানছি মা আমাকে নিয়ে ইনসিকিউরড। তবে তার মানে এই না আমি পঁচে গেছি। আমাকে যেখানে ইচ্ছে বিয়ে দিবে।

ভাইয়া আপু কি বলে?

মা কাউকে জানায়নি। আমাকেও বলতে বারণ করেছে।

উফফ। অসহ্যকর! আন্টি কেন যে এমন করছে?

রুমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি উনার নিজের পেটের সন্তান না হয়তো। তাই,,,

শান্তা ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, দোস্ত এসব টেস্ট করিস না। অযথাই টেনশন বাড়বে। তারচেয়ে বরং মাইশা আপুকে বল সবটা।

আপার কাছে ছিলাম তো অনেক, আপা এখনো আমাকে রাখবেজানি। কিন্তু মা একা থাকে আমারই চিন্তা হয় বলে চলে আসি।

তোর অবস্থা আমি বুঝতেছি।

রুমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, যাই রে দেরি হলে আবার বলবে কোন ছেলের সাথে ঘুরতেছি। কাল দেখা হবে।

শান্তা মন খারাপ করেই বিদায় দিলো রুমিকে।
রুমি মনে মনে ঠিক করলো ডিএনএ টেস্ট ও করাবেই। রিপোর্ট যাই আসুক ও মেনে নিতে প্রস্তুত।

রূপার বিয়ে দুপুরেই হয়। ওর বিয়ে শেষ করে তৃণারা হলে ফিরে আসে। গতকাল রাতে ঠিকঠাক ঘুম হয়নি। তার উপর যে রাস্তা ঝাঁকুনিতেই শরীর ব্যথা হয়ে গেছে! তাই হলে ফিরে সবাই ঘুম দিয়েছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ডাইনিং এ আসতেই একটা চাপা গুঞ্জন উঠে। হঠাৎ শারমিন তৃণাকে বলল, শুনেছিস কিছু?

কোন বিষয়ে?

গতকাল রাতে রূপার বিয়ে খেয়ে ফিরলি না তোরা?

হুম।

রূপার এক্স মুহতাসিম ভাই ওর জন্য সু*ইসা*ইড করেছে।

ঊর্মি বলল,মানে কি! উনাদের তো আরো ৬মাস আগেই ব্রেকাপ হয়েছে,,

মিথিলা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, রূপা ব্রেকাপ করেছে মুহতাসিম ভাই না। উনি সত্যিই রূপাকে ভালোবাসতো।

সবাই কিছুক্ষণ হা-হুতাশ করে রূপার সম্পর্কে গসিপ করে চলে গেল। সেখানে একমাত্র নিরবশ্রোতা ছিল তৃণা! ওর এমনিতেই রূপার উপর একটা চাপা রাগ ছিল। এখন মুহতাসিমের মৃত্যুর খবর শুনে মনটা আরো বিষিয়ে উঠলো যেন। আসলেই অপাত্রে গুরুদান করলে শেষটা এমনি হয়। অথচ শুরুতে রূপা কত ক্রেজি ছিল, মুহতাসিম বলতে পাগল টাইপ।যেই ছেলেটা দূর্বল হতে শুরু করলো অমনি রূপার রং বদল শুরু। মুহতাসিমের কেয়ার, পজেজিবনেস কে টক্সিক মনে হতে শুরু করলো। ভালোবাসা ব্যাপারটা এতো জটিল কেন! এজন্যই সে ইরহামকে মনের কথা বলেনা। ওর মনে হয় মনের কথা বলে দিলেই ভালোবাসারা উবে যায়। ভালোবাসাবোধহয় কর্পূরের মতো। ওটা খোলা রাখলেই ফুরিয়ে যায়। তাই একে যতোটা সম্ভব বুকের ভেতর প্যাকেট করে রেখে দিতে হয়।

তৃণা, আপনি কি আজ বিকেলে ফ্রি আছেন?

জ্বি, কেন?

অনেকদিন কোথাও বসা হচ্ছেনা। চলুন বসি?

আচ্ছা!

কোচিং এর শেষে এমনটাই আবদার করলো ইরহাম। তৃণাও সায় দিলো। কয়েকদিন যাবৎ ইরহাম খেয়াল করছে তৃণা কেমন মন খারাপ করে রেখেছে। তাই মূলত বাইরে যাওয়ার কথা বলা। ডিসিহিলের নজরুল চত্বরের সামনে বসে ইরহাম বলল, কি ব্যাপার বলুন তো? কিছু হয়েছে?

কই না তো! সব ঠিকঠাক।

বলতে চাইছেন না?

আসলে একটু ডিস্টার্ব আছি। যদিও ঐ ব্যাপারটার সঙ্গে আমার কোনো কানেকশন নেই। অহেতুক দুঃখ যাপন! তবে মানুষ হিসেবে ব্যাপারটায় মর্মাহত হওয়া অমূলক না,,

একটু ঝেড়ে কাশুন তো।

আপনাকে তো বলেছিলাম রূপার বিষয়ে, ওর বিয়ের দিন মুহতাসিম ভাইয়া সু*ইসা*ইড করলো। মানুষের জীবন কি এতো তুচ্ছ হয়ে যায় প্রিয় মানুষকে না পেলে? মা-বাবা এতো বছর কত আশা ভরসা নিয়ে সন্তানদের বড় করেন, প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। অথচ সন্তান রা কি করে! অন্য একজনকে ভালোবাসে, তার বিরহে জীবন দিতেও দ্বিধা করে না। মানছি ভালোবাসা গভীর হলে তার বিয়োগ সবাই সহ্য করতে পারেনা। তাই বলে এতোগুলো মানুষের মনে আঘাত দিয়ে চলে যাওয়া কি সমাধান?

তৃণা, লজিক দিয়ে আসলে মানুষের মনস্তাত্বিক ব্যাপারে হিসাব মেলানো যায়না। পৃথিবীতে সবকিছু লজিক মতো চললেও মন চলেনা।
এখানে অনেক বড় বড় বিজ্ঞ লোকেরাও অবুঝ হয়ে যায় ক্ষেত্রবিশেষে ভুলো করে ফেলে। হয়তো আমার আপনার কাছে মুহতাসিমের কাজটা বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে, কিন্তু ভুক্তভোগী ছাড়া মনের খবর কেউ বোঝেনা। আমি একটা কথা মানি, এই পৃথিবী দূর্বলদের জন্য না। এখানে টিকে থাকতে হলে লড়াই করতে হয়। লড়াইটা ঘরে বাইরে যেমন চলে, নিজের সাথেও চলে। যে যতো বেশি ফাইট করতে পারবে সেই দিনশেষে টিকে থাকবে।

রাইট! তবে আমার কাছে মনে সবার সাথে যুদ্ধ করার চেয়ে নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করা বেশি কঠিন।

হুম।

শুনলাম আপনি ঢাকায় চলে যাচ্ছেন!

হ্যাঁ, অনেকদিন ধরে মনমতো পজিশন পাচ্ছিলাম না। এবার মনে হয় আল্লাহ সহায় হলেন। তাছাড়া আমাদের ওখান থেকে ঢাকা কাছে। সবদিক বিবেচনা করে ওখানেই জয়েন করার কথা ভাবছি।

ওহ!

তৃণা

জ্বি?

আপনাকে একটা কথা অনেকদিন ধরে বলবো বলবো করে বলা হচ্ছে না। বুঝতে পারছি না এখন বলা উচিত হবে কি না।

বলুন কি বলতে চান?

আসলে আমি চেয়েছিলাম পরে জানাবো। যেহেতু এখানে আর থাকবো না, চাইলেও যখন তখন দেখা সাক্ষাৎ হবেনা। তাই যাওয়ার আগে জানিয়ে যেতে চাইছি।

তৃণা কৌতুহলী দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইলো। ইরহাম মনে মনে কি যেন ভাবলো। হয়তো গুছিয়ে নিচ্ছে কি বলবে। তারপর শ্বাস নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে বললো, তৃণা আমি জানিনা আপনি ব্যাপারটা কিভাবে নিবেন। আমি আমার জীবনের পরিকল্পনায় আপনাকেও রাখছি। এতে কি আপনার আপত্তি আছে?

তৃণা একটু বাজিয়ে বলল, এসিসট্যান্ট টিচার হিসেবে!

নাহ নাহ!

তাহলে?

আমি জানিনা সেটা ব্রাহ্মণ হয়ে চাঁদ চাওয়ার মতো দুঃসাহস হবে কি না! আমি আপনার সঙ্গে লাভ এফেয়ারে জড়াতে জড়াতে চাই না। না আমার সেই ইচ্ছে আছে। আমি আপনাকে সরাসরি বিয়ে করতে ইচ্ছুক। আপনি যদি রাজী থাকেন তবে আমি সময় হলে এই বিষয়ে আপনার পরিবারে কথা বলবো। আপনি ভয় পাবেন না প্লিজ।আপনার উত্তর যাই হোক আমি চুপচাপ মেনে নিবো। আপনি চাইলে সময় নিয়ে ভাবতে পারেন।

তৃণার মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে। হয়তো এখুনি এলার্মের শব্দে তার ঘুম ভাঙবে। তাকিয়ে দেখবে সে বিছানায় শুয়ে আছে, আশেপাশে ইরহাম তো দূর তার ছায়াও নেই। কিন্তু না এটা স্বপ্ন নয়। হাতে থাকা চায়ের কাপের উষ্ণতা সে টের পাচ্ছে, স্বপ্ন হলে সেটা হতো না। ইরহাম তাকে তার লাইফে এক্সপেক্ট করছে এর চেয়ে খুশির খবর আর কি হতে পারে তার জন্য?

তৃণা? শুনতে পাচ্ছেন?

ইরহামের ডাকে ধ্যান ভাঙ্গে তার। হকচকিয়ে বলে, হ্যাঁ?

আমি এতোক্ষণ কি বলেছি শুনেছিলেন?

জ্বি!

আপনি কি অস্বস্তিবোধ করছেন?

নাহ!

কিছু বলার নেই?

আসলে হঠাৎ এমনকিছু শুনবো প্রত্যাশা করিনি তো, তাই একটু নার্ভাস হয়ে গেছি।

ইরহাম নিচের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো।
তৃণা আনমনেই বলে ফেলল, আপনি কি জানেন আপনাকে আমি একটা বিশেষ নামে ডাকি?

কি নাম শুনি?

এখন বলবো না। ওটা তোলা থাক।

কবে বলবেন বলে ঠিক করেছেন?

উমমম বিয়ের রাতে!

ইরহাম উজ্জ্বল দৃষ্টিতে তৃণার চোখে তাকালো। তৃণার গভীর কালো চোখ দুটোয় সে কখনোই সরাসরি তাকায় না। তার ভয় এই মায়াবী চোখে তাকালে দূরত্ব রাখা কঠিন তপস্যা হয়ে যাবে। এই যে এতোদিন নিরবে এক তরফা অনুভূতি পুষেছে, কাছাকাছি রাখতে কোচিং এর বাহানায় সপ্তাহে ২টা দিন বরাদ্দ করেছে। এতো নিকটে থেকেও প্রিয় নারীটির দিকে ১বারের বেশি ২বার তাকায় নি, রোজ ঠিকঠাক কথাও বলে নি। মনকে শক্তভাবে শাসন করেছে একটা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ এর আশায়। এটা কি তার জন্য কম কষ্টের ছিল?

তবে কি আমি ধরে নিবো আপনি…

এতোদিন লাগলো আপনার বুঝতে?

বুঝিনি তা নয় তবে নিশ্চিত ছিলাম না।

তৃণা অপর দিকে ফিরে হাসতে লাগলো। ইরহাম মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো তার প্রিয়দর্শিনীর দিকে।

চলবে,,,

#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব১৭

#আরশিয়া_জান্নাত

একগুচ্ছ লাল গোলাপ আর কিছু বই হাতে পেতেই মনটা বেশ ভালো হয়ে গেল তৃণার। কিন্তু পরক্ষণেই মনটা বিষন্নতায় ডুবে গেল। ইরহাম আজ ভোরেই চলে গেছে ঢাকা উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে এইসব তৃণার জন্য রেখে গেছে। তৃণা চিরকুট টা খুলে পড়লো,
“যদি দূরত্বের হিসাব কিলোমিটারে করেন, তবে আমি এখন দূর শহরের কেউ।
আর যদি মনের দিক থেকে হিসাব করেন তবে টের পাবেন আমি আছি ঠিক সেভাবে যেভাবে সাগরের বুকে থাকে ঢেউ!”

তৃণার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে।

হ্যালো ইরহাম?

হ্যাঁ বল।

কেমন আছিস?

ভালো তুই?

আছি ভালোই। তোর সঙ্গে একটা জরুরি কথা বলতে কল করেছি। ব্যস্ত আছিস?

তুই কল করেছিস যখন ব্যস্ততা বলে কিছু নাই। খালাম্মারা সবাই ভালো আছেন তো?

হ্যাঁ ভালোই। দোস্ত শোন আমি যা বলবো খুব মন দিয়ে শুনবি। আর হুট করে কোনো রিয়েকশন দিবিনা।

কি হয়েছে বল তো?

তুই হয়তো এখনো খবর পাস নাই, আন্টি তোর বোন রুমির বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা বলতেছে। খুব সম্ভবত ফাইনাল করে ফেলবে।

মানে কি! আমাকে তো কেউ কিছু বলে না, রুমির বিয়ে এখন কেন! ওর না সামনে এইচএসসি পরীক্ষা।

আমিও সেজন্যই অবাক হয়েছি। তুই বিবাড়িয়া এলিনা, আমাদেরো কিছু জানালি না। ও কি শুধু তোর ছোটবোন? আমরা খোঁজখবর নিবো, ১০টা দেখে ১টা ছেলে পছন্দ করবো। এরকম হুটহাট বিয়ের সিদ্ধান্ত কি ঠিক?

আমি আসলেই জানি না, আপাও তো কিছু বললোনা। একটু আগেও কথা হয়েছে।

আমার মনে হয় না আপা কিছু জানে। আপাও আসেনি যখন ছেলেপক্ষ আসছে। আমরা পাশাপাশি থাকি, আমাদেরকেও কিছু বলেনাই। আম্মা জিজ্ঞাসা করলো আর বলে, এমনিই দেখতে আসছে। কিন্তু রুমি লুকিয়ে বলল তোকে জানাতে। তাই কল করা।

ইরহাম নির্বাক শ্রোতা হয়ে সবটা শুনলো। মাথা যেন কাজ করা বন্ধ হয়ে গেছে। তার মায়ের কি হয়েছে! উনি কেন এমন করছেন?
ইরহাম ফোনটা রেখে ভাবতে লাগলো কি করা উচিত। বাবা মারা যাবার পর থেকে মায়ের আচারণ অনেক বদলে গেছে। তিনি আগে যতোটা না গম্ভীর ছিলেন এখন সাথে রগচটাও হয়েছেন। কিছু বললেই খাওয়াদাওয়া অফ করে দরজা আটকে বসে থাকেন। নয়তো বলেন বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে। সারাদিনে যেটুকু সময় কথা বলেন ভালো কথা কিছুই বলেন না। ইরহাম ভাবতো প্রিয়জনের শোকে হয়তো কাতর। তাই বলে এতো মাসেও ঠিক হলোনা। মাঝে রুমিকে বড় আপার কাছে রেখেছিল। এইসবের ভুক্তভোগী সবচেয়ে বেশি হচ্ছে রুমি। তার চঞ্চল বোনটা হুট করেই যেন মনমরা হয়ে গেছে। আগের মতো হাসেনা, খেলেনা। সবসময় ভয়ভয় মুখ করে রাখে। এতো অল্প বয়সে মেয়েটা পাক্কা রাধুনী হয়ে গেছে। ইরহামের বুকটা কেমন যেন করে উঠে। মনে মনে ঠিক করে আজ অফিস শেষেই বাড়ি যাবে।

ইরহামকে অসময়ে বাড়িতে আসতে দেখে রুমানা বেগম একটু অবাকই হলেন। কিন্তু তার পেছনেই মাইশা আর তার বরকে দেখে বুঝতে বাকি রইলো না খবরটা তাদের নিকট পৌঁছে গেছে। রুমি ওদের দেখেই দৌড়ে এসে ঝাপটে ধরলো। বোনঝি মুনাকে কোলে তুলে ভেতরে চলে গেল সবার জন্য চা করতে।
রুমানা সবাইকে বসার ঘরে বসিয়ে কুশল বিনিময় করলেন। আর যাই হোক মেয়ের জামাইয়ের সামনে অনাচার করতে চান না তিনি।

মাইশা বেশ থমথমে গলায় বললো, আমাদের অস্তিত্ব কি ভুলে গেছেন আম্মা? একই শহরে থাকি তাও আমাদের বাদ দিয়ে রুমির বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন! আমাদের কে বলার প্রয়োজন ও বোধ করলেন না?

মেয়ে যখন হয়েছে আজ না হয় কাল বিয়ে তো দিতেই হবে। কত ঘর আসবে যাবে। ঐসব নিয়ে মনে কষ্ট পাবার কি আছে? বিয়ে ঠিক হলে দাওয়াত তো দিতাম ই।

আমরা কি মেহমান? দাওয়াত দিলেই হবে? আচ্ছা আমি নাহয় পরের ঘরের হয়ে গেছি, আমাকে দাম দাও নি।তোমার ছেলেকেও তো বললে না। সংসার এখন ওর উপর, ওর পরামর্শ নেওয়ার কি দরকার ছিল না?

রুমানা প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, বাবা বেয়াই বেয়াইন ভালো আছেন তো? তোমার ব্যবসা বাণিজ্য কেমন চলে?

তানজিম বেশ বিচক্ষণ পুরুষ। সে হেসে বলল, জ্বি মা উনারা ভালোই আছেন।

ভালো হলেই ভালো। ইরহাম কি এখন ভাত খাবি? ভাত বাড়তে বলি?

ইরহাম শান্ত দৃষ্টিতে মায়ের হাবভাব বোঝার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পর বলল, আপনার যদি মনে হয় আপনার ছেলে অকর্মা, আর এতোটাই অযোগ্য যে তার ছোটবোন আর মা-কে ভরণপোষণ দিয়ে রাখতে পারবে না। তবে আপনি ভুল ভাবছেন। আমার বাবা তার ছেলেমেয়েদের ধনসম্পদের ঐশ্বর্য দিয়ে যান নি না কখনো দিতে চেয়েছেন। তিনি সবসময় চেয়েছেন আমদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে। এখন তিনি নেই বলে তার ছোট মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হবে এতো দুর্দিন আল্লাহ আমাদের দেয়নি। রুমির বিয়ে নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। সময় হলে আমরা ওর বিয়ের ব্যবস্থা করবো। আপাতত এসব বাজে চিন্তা বাদ দিন।

রুমানা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন, তুমি এতো বড় এখনো হও নি ইরহাম। দুনিয়া সম্পর্কে তোমার ধারণা নেই। তাছাড়া ও তোমাদের বোন হবার আগে আমার মেয়ে। আমি ওর বিষয়ে যা ইচ্ছা তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখি। তবে তোমরা যদি ভাবো এই সংসারে আমার গুরুত্ব নেই, আমার মতামতের দাম দিতে তোমরা ইচ্ছুক নও তবে বেশ তোমাদের যা ইচ্ছা করতে পারো। আমি এই বিষয়ে আর কিছুই বলবোনা।

ইরহাম মায়ের হাত ধরে বলল, আম্মা প্লিজ! আপনি ইচ্ছে করে এমন করেন? আপনি আমাদের মা, আপনার গুরুত্ব কখনোই কমেনি আমাদের জীবনে। না কমবে। আপনি কেন বুঝতে চাইছেন না? রুমির জীবনটা এভাবে কঠিন করবেন না। ও এমনিতেই অভাগী। আমরা দুই ভাইবোন বাবার আদর যতটা পেয়েছি ও পায়নি। ওকে যদি এখন আপনার কথামতো বিয়ে দেই আমি আজীবন নিজের কাছে ছোট হয়ে থাকবো, আমি আব্বাকে কিভাবে মুখ দেখাবো বলেন তো? হাশরের দিন উনি যদি আমায় প্রশ্ন করেন একটাকেই তো রেখে এসেছিলাম তাকেও পড়াতে পারলি না? তখন আমি কি জবাব দিবো আম্মা? রুমির ও মনে হবে ওকে বোঝা ভেবেই ঘাড় থেকে নামিয়েছি। এসব আমি সহ্য করতে পারবো না।
আপনি ভরসা রাখেন না আমার উপর, আব্বার ধারদেনা শোধ করেছি যেভাবে সেভাবেই আমার বোনের দায়িত্বও পালন করবো। আপনি শুধু আল্লাহর কাছে দোআ করেন, আল্লাহ যেন আমায় সেই ক্ষমতা দেয়। আমি যেন আপনাদের অভিযোগ করার জায়গা না রাখি।

ইরহাম মায়ের হাতের উপরেই কেঁদে ফেলল। ওর চোখের পানিতে ওর দুই বোনেরো চোখ ভিজে উঠেছে। রুমানা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি আমার ছেলের মনে তার বোনদের জন্য ভালোবাসা আজীবন অটুট থাকুক। কি করবো বল চারদিকে দেখি বাপ-মা মরে গেলে ভাইয়েরা আর বোনকে দেখতে চায়না। আমি চেয়েছিলাম আমি বেঁচে থাকতে থাকতেই ফরজ কাজ আদায় করে ফেলি। অথচ আমি ভুলেই গেছি মাস্টার সাহেব তার ছেলেমেয়েদের সঠিকভাবেই মানুষ করেছেন। তার আদর্শ কখনোই ভুল হতে পারে না। তোরা সবসময় বলিস তোদের এই পৃথিবীতে কেউ নাই। আসল কথা হলো তোরা ৩জনই ৩জনের আশ্রয় হবি। তোদের আর কোনো লোকের দরকার হবেনা, আল্লাহ তোদের সম্পর্ক এমন মজবুত রাখলেই যথেষ্ট হবে। মাইশা মা তোকে আমি অনেক কথা শুনিয়েছি, রাগ দেখিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করিস। কি করবো বল মনটা দূর্বল হয়ে গেছে। তোর বাবা এমন হঠাৎ চলে গেছেন এটা মানতে পারিনি। এখন শুধু মনে হয় জীবনটা খুব তুচ্ছ। কখন কার ডাক আসে কোনো নিশ্চয়তা নেই। সেই ভয় থেকেই আমি উদভ্রান্তের মতো আচরণ করেছি। মৃত্যুকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই বলে জীবনকে নির্দিষ্ট গন্ডিতে আটকে ফেলাও বুদ্ধিমানের কাজ না। আমার আচরণে তোরা অনেক কষ্ট পেয়েছিস। আমার বোঝা উচিত ছিল তোদের উপর শক্তিশালী ছায়া হবার বদলে আমিই তোদের শত্রুর ন্যায় আচরণ করেছি। আমায় মাফ করিস তোরা।

মাইশা মাকে জড়িয়ে বলল, সন্তানের কাছে মাফ চাইতে হয়না মা। তুমি বুঝতে পেরেছ এতে আমরা খুশি। আমাদের আর কিচ্ছু চাই না।

রুমানা মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দরজার দিকে চেয়ে রুমিকে ও কাছে ডাকলেন। রুমি দৌড়ে এসে মায়ের বুকে আশ্রয় নিলো। সকলের চোখেই পানি। তবে আজ কান্নাটা আনন্দের কান্না। রুমানা বেগম মনে মনে বললেন, এতোদিন অযথাই এই বাচ্চাগুলোকে তিনি কষ্ট দিয়েছেন। এরা যে একেকটা রত্ন তা দেখার ফুরসতই পাননি।

তৃণা ফোন হাতে নিয়ে চাতকের ন্যায় অপেক্ষা করে। সময় যেন কাটতেই চায় না। ওদিকে আর্কিটেক্ট সাহেবের ব্যস্ততাই ফুরোয় না। তৃণার ইচ্ছে করে আর পাঁচটা প্রেমিকার মতো কল করে রাতের পর রাত কাটাতে। কিন্তু জনাবের কঠোর নিষেধাজ্ঞা, প্রেমিকা হওয়া যাবে না। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের শরীরের প্রতিও যত্নশীল হতে হবে।
ইরহাম যখন ধীর গলায় বললো, আপনি এখন কেবল আপনার না তৃণা। মনে রাখবেন আপনি ফুয়াদ আজমির ইরহামের ফিউচার প্রোপার্টি। তাই আপনার কোনো অযত্ন আমি সহ্য করবো না…. কথাটা শুনে তৃণার বুকের ভেতর মৃদু কম্পন সৃষ্টি হয়েছে বৈকি। মানুষটা একবারো বলেনা ভালোবাসে। কিন্তু এমন সব বাক্য ব্যবহার করে যা মনে ঝড় তুলতে যথেষ্ট। তৃণার নিজেকে মাঝেমধ্যে অধৈর্যশীল রমণী মনে হয়, পাগল পাগল লাগে। ওর ইচ্ছে করে এইসব নিয়মনীতির বেড়াজাল টপকে ছুটে যেতে ইরহামের বুকে, শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে তার প্রিয় পুরুষটিকে।
এতে লোকে তাকে যাই বলুক ও তোয়াক্কাই করবেনা। ইরহামের সাথে তার এই দূরত্ব সহ্য করা দিনকে দিন কঠিন পরীক্ষা হয়ে যাচ্ছে। এতোদিন একতরফা প্রেম ভেবে নিজেকে সামলানো গেলেও এখন আর সেটা সহজ বোধ হয় না। আচ্ছা ইরহাম যদি এসব শুনে নিশ্চয়ই ওকে খারাপ ভাববে। বলবে, আমি ছেলে হয়ে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলে আপনি কেন পারবেন না? আপনি কি এতো অবুঝ তৃণা?
তখন তৃণা কি বলবে?

“হাহ! কবে যে আমাদের বিয়ে হবে,,,, আমার আর ভালো লাগছে না!!!””

চলবে,,,