হৃদমাঝারে তুমি ছিলে পর্ব-২৩

0
898

#হৃদমাঝারে_তুমি_ছিলে❤
#পর্ব___২৩
#কায়ানাত_আফরিন❤
জোছনার মায়াবী আলো আর রাস্তার টিমটিমে লাইটের প্রতিফলনে ছাদটি লাগছে বেশ সুন্দর। ক্ষণে ক্ষণে ফুরফুরে হাওয়া বয়ে চলছে। ঘড়ির কাটা এখন সাড়ে আটটা কি পৌনে নয়টায় আছে। আর এ অসময়ে ছাদে মাদুর পেতে বসে আছে মাইশা আর ওর বন্ধুরা। মূলত হুট করে মাইশার ডাকাতেই সবক’টা হাজির হয়েছে নুহাশকে ভয় পাওয়া সত্ত্বেও। আনান, অর্পি, সামাদ, পৃথা ওদের সবার চোখে-মুখেই বিরক্তির ছাপ। কেননা ১০ মিনিটের ওপর হয়ে গিয়েছে ওরা এখানে অথচ মাইশা কোনো কথা না বলে আনমনে স্যান্ডউইচ এ একের পর এক বাইট দিয়ে চলছে।
নীরবতা ভেঙে সামাদ এবার বললো,

–”একটু বল তো হুট করে কেনো আমাদের সবাইকে আসতে বললি?”

মাইশা নির্বিকার। আসলে ও যখন প্রচন্ড টেনশনে কিছু বলতে পারে না তখন খেয়ে খেয়েই নিজেকে সামলায় যার সম্পর্কে ওর বন্ধুরা অবগত থাকলেও এখন যেন বিষয়টা ভুলে গিয়েছে। আনান এবার দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

–”এভাবে রাক্ষুসীর মতো খাওয়া বন্ধ কর। তোর খাবার আমরা নিয়ে যাচ্ছিনা।”

মাইশা কিছু না বলে স্যান্ডউইচ এর বড় বাটিটা ওদের এগিয়ে দিলো। কিন্ত কেউই তা নিলো না । যেন মাইশার কথা শোনার জন্যই সবাই কৌতুহল নিয়ে বসে আছে। অর্পি এবার তর সইতে না পেরে বললো,

–”যেই হারে খাচ্ছিস, মনে তো হচ্ছে বড় কিছু হয়েছে রে। কি হয়েছে বল না?”

মাইশা এবার প্লেটটি রেখে টিস্যু দিয়ে হাত মুছে নিলো নিজের। সবার অগোচরেই পরপর বেশ কয়েকটা শুকনো ঢোক গিললেও যেন কথা বলার মতো সাহস যোগাতে পারলো না।একটা নির্লিপ্ত শ্বাস নিয়ে আচমকা বলে ফেললো,

–”আমি প্রপোজ করে ফেলেছি।”

আনান, সামাদ, পৃথা, অর্পি কারওই যেন মাইশার এ কথাটি বোধগম্যে হলো না। পৃথা বিচলিত হয়ে বললো,

–”প্রপোজ করে ফেলেছিস মানে? কারেই তুই প্রপোজ করলি রে যার কথা আমরা জানি না।”

আনান অবিশ্বাস্যের সুরে বললো,
–”তুই, আর প্রপোজ? যেই মাইয়্যার কাছে ছেলেরা একটু আসলেই থাপড়াথাপড়ি শুরু কইরা দেয়, সেই মাইয়্যা আবার প্রপোজ করছে? তো কি নাম ওই অধমটার , একটু শুনি?”

–”আরহাম আয়াত !”

চিল্লিয়ে বলে দম ছাড়লো মাইশা। চোখটা বন্ধ করে রেখেছে যাতে কারও রিয়্যাকশন না দেখতে পারে। অর্পি, আনান, সামাদ, পৃথা সবাই হতভম্ব। অর্পি কানে হালকা বারি দিয়ে বললো,

–”গাইস ! আমি মনে হয় ভুল শুনেছি। মাইশা ! নামটা আবার বল তো। ভালোমতো শুনে নেই।”

–”আরহাম আয়াত !”
মাইশার মিহি কন্ঠ। আনান এবার সত্যিই অজ্ঞান হয়ে যাবে । তাই হাহাকার করে বললো,

–”তোরে ওইদিন ভাই কোলে নিসিলো বলে কি চড়টাই না মারলি। তোর বদমাইশ ভাইটাও আমারে এমনে মারে নাই যেমনে তুই তারে মারছস। আর এখন তুই বলিস কি-না, তুই আয়াত ভাইরে প্রপোজ করছস? তো ভাইয়ের রিয়্যাকশন কি ছিলো? চড়-থাপ্পড় দিসে নাকি চুল টানসে?”

মাইশা গোল গোল চোখ করে বললো,
–”আজব তো ! এমন করবে কেন?”

–”তুই যা করসিলি , আমি থাকলে তো তোরে লাথি মাইরা সাউথ আফ্রিকায় পাঠাইয়া দিতাম। ”

–”সবাই কি তোর মতো নাকি যে আমাদের প্রথম ঝগড়া আর ইগো নিয়েই বসে থাকবো? আসলে আয়াত ভাইয়ই আমাকে প্রথমে তার মনের কথা বলেছিলো।”

–”কবে?”

–”যেদিন বৃষ্টিতে ভিজে আসছিলাম বলে নুহাশ ভাই তোরে কল দিয়ে ঝাড়ি মেরেছিলো।”

কথাটি বলতে গিয়ে মাইশা কেমন যেন মিলিয়ে যায়। কেননা আনান এবার নির্ঘাত ফেটে পড়বে। আর তাই হলো। আনানের এবার ইচ্ছে করছে এই মেয়েটাকে বুড়িগঙ্গায় চুবিয়ে মারতে। তাই দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

–”কসম আল্লাহর ! তুই যদি আমার জানের দোস্ত না হতি, এখনই তোরে মাইরা জানাযার ব্যবস্থা করতাম। শালী হারামি কোথাকার ! বৃষ্টিতে প্রেম নিবেদন করবি তুই আর আমার হবু দুলাভাই আর মাঝখানে ফাসাবি আমাকে? তাও আবার ওই হালা নুহাশ ব্যাটার কাছে? মনটা তো চাইতাসে তোরে………………”

পৃথা আনানের কাধ চেপে বিদ্রুপ স্বরে বললো,
–”ভুইলা যাইস না। তোর জানের জান নুহাশ ভাই কিন্ত নিচেই আসে। যদি শুইন্না ফালায় যে তুই তারে ”হালা” কইয়া ডাকস……..তো !”

বলেই মুখ চেপে হাসে পৃথা। সামাদ মুখ টিপে হাসলেও অর্পি হেসে মাদুরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কোনোমতে হাসি সামলে বললো,
–”কি আর হইবো, আনানের পেয়ারে নুহাশ ভাই ওর সারা শরীরে আদর করবো। এমনই আদর করবো ; পরে হসপিটালে ভর্তি হইতে লাগবো।”

–”তুই কি আমারে ‘গে’ মনে করিস নাকি অর্পি? এই আনান তোরে অভিশাপ দিলাম তোর লাইফে ওই নুহাশটার মতো একটা জামাই থাকবো………হুহ !”

–”মোটেও না। আমার লাইফে থাকবো শাওন ভাইয়ের মতো ড্যাশিং একটা ছেলে। এমনকি শাওন ভাই হইলেও চলবো। সিগারেট খাক্ ! আই ডোন্ট কেয়ার। ”

অর্পি লাজুক সুরে বললো। মাইশা বোকার মতো ওদের কথা শুনে যাচ্ছে। কই ভাবছিলো নিজের কথাগুলো বলবে আর কি হচ্ছে। সামাদ এবার বললো,

–”তোদের কথা শেষ হলে আমরা এবার আমাদের মাইশা বেগমের লাভ স্টোরির দিকে ফিরে যাই?”

–”লাভস্টোরি? আর এই মাইয়্যার? যেই স্টোরিটা শুরু হইসিলো থাপড়া থাপড়ি দিয়ে ভাব তো একবার যে সামনে না জানি কত ক্লাইম্যাক্স থাকবো। আল্লাহ রে ! একে একে সবক’টার জুটি হয়ে যাচ্ছে।আমার রাণী যে কবে আসবো?”

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দেয়ার পর চলে গেলো সবাই। মাইশা এবার ছাদ থেকে নেমে নিজের ঘরে চলে এলো। মাথার ভেতরে শুধুমাত্র আয়াত ঘুরপাক খাচ্ছে। স্মৃতিচারণ হচ্ছে আয়াতের মাতাল করা কথাগুলো। ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়, একবার প্রকাশ পেয়ে গেলে তা যেন সবদিক থেকে অনুভূতিতে গ্রাস করে নেয়।

———————————————————

এক মিষ্টি রোদের প্রতিফলনে পিটপিট করে চোখ খুললো মাইশা। জানালার পর্দা ভেদ করে সূর্যের অবাধ্য রশ্মিগুলো আনমলে খেলা করছে মাইশার সদ্য খোলা চোখযুগলে। আজ সকালটি একটু অন্যরকম মনে হলো ওর কাছে। মনে কেমন যেন এক প্রফুল্লতার ভাব। উফফফ ! আজকে সবকিছু এত সুন্দর লাগছে কেনো?মাইশা হাজার খুঁজেও যেন এর উত্তর খুঁজে পেলো না। আড়মুড়িয়ে উঠে বারান্দায় চলে গেলো তাই। এসময়কার মিষ্টি শীতল হাওয়াটি যখন ওর দেহ স্পর্শ করে তখন মনে ছুঁয়ে যায়। বাড়ির সামনে দাঁড়ানো বড় কৃষ্ণচূড়া গাছটি সেসময় অপরূপ লাগে দেখতে।

মাইশা এসব কিছু উপভোগ করতে করতে যখন পাশের বারান্দায় তাকালো সাথে সাথেই স্তব্ধ হয়ে গেলো ও। ভুল কিছু দেখছে না তো? হতে পারে। কিন্ত দু’কয়েক চোখ মুছার পর ও আয়াতকেই দেখলো নুহাশ ভাইয়ের বারান্দায়। সেদিন কমলাপুর রেলস্টেশনে যেই লেমন টিশার্ট পড়েছিলো সেই টিশার্ট। বারান্দায় যেই প্লাস্টিকের চেয়ার ছিলো সেখানে বসে আরামসে মাইশার বারান্দার দিকে তাকিয়ে আছে। মাইশার সাথে চোখাচোখি হতেই একটা চোখ মেরে বললো,

–”গুড মর্নিং জান!”

মাইশা স্তব্ধ। এখানে আয়াতই আছে।সেই নেশাজড়ানো কন্ঠ, যা দেখে তোলপাড় শুরু হয়ে যায় হৃদয়ে। কিন্ত নুহাশ ভাইয়ের রুমে সে কি করছে? ভাইয়া কিছু বুঝে যাবে না-তো?
.
.
.
————-
#চলবে

ভুলক্রুটি ক্ষমাসুলভ চোখে দেখবেন।