হৃদমাঝারে তুমি ছিলে পর্ব-৩০

0
860

#হৃদমাঝারে_তুমি_ছিলে❤
#পর্ব____৩০
#কায়ানাত_আফরিন❤

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে থম মেরে বসে আছে মাইশা ও ওর বন্ধুরা। জানালা দিয়ে সূর্যের তেজক্রীয় রশ্নি ওদের টেবিল বরাবর পড়ছে। এখন ক্লাসটাইম থাকলেও সেদিকে কারও পরোয়া নেই। স্তব্ধ চাহিনী সবাই টেবিলের অবহেলিত কোকের বোতলগুলোর দিকে নিক্ষেপ করে রেখেছে। নীরবতা কাটিয়ে আনান এবার অর্পিকে বললো,

–”কি করলি এটা তুই?ওই ব্যাটারে আমি দুই চক্ষে দেখতে পারিনা। দেখলেই মাথায় আগুন ধইরা যায় তবুও ভয়ে হামাগুড়ি খাই আমি। দোস্তের বড় ভাই পর্যন্তই তো ঠিক ছিলো। কেমনে পারলি তারে আমার দুলাভাই বানাতে…………….মানে ! এমন দুলাভাই থেইকাও তো আজীবন সিঙ্গেল থাকাও ভালো।

আনানের কন্ঠে হাহাকার। নুহাশকে দুলাভাই হিসেবে ভাবলেই ওর অন্তরাত্না কেপে ওঠে। কত ভেবেছিলো , অর্পির বিয়ের সময় জামাইয়ের জুতো চুরি করে মোটা অঙ্কের টাকা নিবে আর এই জামাইতো ওরেই আঙুলের ওপর নাচাবে। আনানের কথায় ক্ষিপ্ত হলো মাইশা।দাঁতে দাঁতে চেপে বললো,

–”আমার ভাইয়ের নামে আর যদি একটা কথা কস্……………কসম আল্লাহর! তোর চোপা আমি ভেঙে ফেলবো।

অর্পি কাদোকাদো সুরে আনানকে বললো,

–একটা কথাও কইবি না তুই কুত্তা ! শালা****! ওইদিন তুই অভিসাপ দিসিলি না যে নুহাশ ভাইয়ের মতো আমি একটা জামাই পাবো , আজ দেখ , নুহাশ ভাইওই আমার হবু জামাই হইবো।

অর্পির অবস্থা কাহিল। অধিক শোকে পাথর হয়ে এই মেয়ে আজকাল অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করা শুরু করেছে। এমন না যে নুহাশকে ও মেনে নিতে পারবেনা। কিন্ত নুহাশ ছেলেটাকে যমের মতো ভয় পায় অর্পি। আনানের মতো ওরও নুহাশকে দেখলে ভয়ে কাপাঁকাপি শুরু হয়ে যায়। নুহাশের এক ধমকে আনান,সামাদ, পৃথা সিটিয়ে গেলেও অর্পি সর্বদাই ভ্যা ভ্যা করে কেদে ফেলতো। আর মানুষ যে একটা মানুষকে কান্নারত অবস্থায় দেখে মোহে পড়ে যায় নুহাশকে না দেখলে অর্পি তা জানতে পারতো না। গোল ফ্রেমের চশমা পড়ুয়া এই মায়াবতী মেয়েটি বড়ই বাচ্চাসুলভ। তাই সেদিন হঠাৎ নুহাশের স্পর্শ বিদ্যুতের ন্যায় নাড়িয়ে দিয়েছিলো ওকে। সেদিনের পর থেকেই নুহাশকে দেখলে ও মিহিয়ে যায় , মনে এমন সব আবেগের সূত্রপাত হয় যা এই ২১ বছরের জীবনে কখনোই হয়নি। সবদিকেই কেমন যেন এক দুর্দান্ত চাঞ্চল্যতার ভাব।

পৃথা অর্পিকে গাটা মেরে বললো,

–”কি হয়েছে তোর?”

ধ্যান ভাঙলো অর্পির। এতক্ষণ চিন্তাচেতনার রাজ্য ছেড়ে অন্য ভাবনায় মশগুলছিলো। মেকি হেসে বললো,

–”কি হবে আবার আমার? কিছুই না।”

মাইশার চোখে-মুখে নির্লিপ্ততার ছাপ। নুহাশ আর অর্পির বিয়ে নিয়ে রীতিমতো তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। মাইশা আদৌ বুঝতে পারলো না যে অর্পির মা আর শারমিন বেগম এত তাড়াহুড়ো কেনো শুরু করেছেন বিয়ের জন্য। বিয়ে ঠিক হয়েছে সবেমাত্র এক মাস হলো। এই একমাসে একটাবারের জন্যও অর্পি মাইশার বাসায় যায়নি নুহাশের সাথে দেখা হবে এই ভয়ে। আজকাল ওর আব্বু-আম্মুর পরিকল্পনা কিছুই যেন ওর মাথা দিয়ে ঢুকছেনা। এতসব কর্মব্যস্ততার ভীড়ে একটু প্রাণভরে শ্বাস নিতে চায় মাইশা। প্রিয়জনের হাত আকড়ে ধরে ঘুরতে চায়। কিন্ত আয়াতেরও সেদিকে খবর নেই। ওর মাস্টার্সের পরীক্ষা শেষ হলো কিছুদিন হয়েছে। এর মধ্যেই খালামণি ওকে জোর করে কাজে ঢোকাতে চাইলো কিন্ত আয়াত নির্বিকারে বলে দিয়েছে যে ও রেডিও সেন্টারেই আপাতত জব করবে। শাওন ভাইও ইতিমধ্যে ব্যস্ত নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে।আজকাল আয়াত কাজে এতটাই মশগুল থাকে যে মাইশার সাথে দেখা করার বিন্দুমাত্র সময় পায় না। কিন্ত নিয়মমাফিক প্রতিরাতেই ওর সাথে এক ঘন্টা কথা বলবে যার মধ্যে মাইশা কথা বললেও আয়াত হু হা ছাড়া তেমন কিছু বলতো না। ইদানীং কাজের চাপে প্রচন্ড গম্ভীর হয়ে গিয়েছে ও। মাইশার অবচেতনমন তখন অজান্তেই বলে ওঠে যে ওর জন্য হয়ত আয়াতের বিরক্তি লাগে। তার জন্য গত দুইদিন আয়াতের সাথে কোনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি মাইশা। আয়াত নাহয় কিছুদিন ওর কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকুক। ছেলেটারও তো নিজের ক্যারিয়ার গড়তে হবে।

হুট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো মাইশা।আনান, সামাদ, পৃথা , অর্পি সবাই নিজের কথা ছেড়ে ওর দিকে মনযোগ দেয়। পৃথা তাজ্জব সুরে বলে উঠলো,

–”কি রে? এভাবে উঠে গেলি ক্যান?

পৃথার কথার প্রতিউত্তর দিলো না মাইশা। শুধু মিহি কন্ঠে দুটো কথাই বললো,

–তোরা গল্পগুজব কর। আমি বাড়িতে গেলাম।ভাল্লাগছে না।

বলেই গটগটিয়ে ক্যান্টিন প্রস্থান করলো মাইশা।বাকিরা সবাই এখনও নির্বোধ চোখে মাইশার যাওয়ার পানেতাকিয়ে আছে। মেয়েটা আজকাল বেশ রহস্যময়ী হয়ে ওঠেছে !
.
.
.
.
————————————–
স্বচ্ছ নীল আকাশ ভেদ করে গড়িয়ে পড়ছে কাঠফাটা রোদ। এই দুপুর সময়টাতে যেদিকেই তাকানো হচ্ছে সেদিকেই হলুদ বর্ণের আবির্ভাব। বারকয়েক খালি ঢোক গিললো মাইশা। এই গরমে তেষ্টা পেয়েছে বটে। রাস্তার এককোণে দাঁড়িয়ে হাতঘড়ির দিকে পরখ করে নিলো। কাটায় কাটায় ১২ টা ৪৭ বাজে। আর কিছুসময় পর হয়তো যোহরের আজান দিয়ে দিবে। তাই তাড়াতাড়ি বাড়ি যাওয়ার জন্য রিক্সা খোঁজার জন্য এদিক সেদিক তাকালো। হুট করে একটা বাইক সামনে এসে পড়তেই ভড়কে গেলে মাইশা। তেজ নিয়ে এর প্রতিবাদ করতে যাবে কিন্ত বাইক আর বাইকের মালিকের চোখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই ওর গরম চাহিনী শীতল হয়ে গেলো। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আয়াত বসে আছে। পরনে নীল শার্ট আর গ্রে প্যান্ট। গরমের কারনে হাতের কাছে ফোল্ড করা হাতাটি আটঁসাঁটভাবে লেগে আছে।

মাইশার দিকেনা তাকিয়েই শান্ত ভঙ্গিমায় বলে ওঠলো,

–বাইকে উঠে পড়ো।

বিরক্তির ভাঁজ পড়ে মাইশার কপালে। এতদিন নিজ থেকে একপলকের জন্য কথা বলে নাই আর এতদিন পর দেখা করে কই না কুশল বিনিময় করবে , কিন্ত হলো উল্টো। কওয়া নেই , কথা নেই , হুট করে বললো ,”বাইকে উঠে পড়ো।”

মাইশা চোখ ছোটছোট করে বললো,

–আমি যার তার বাইকে এভাবে উঠে পড়ি না।

আয়াত চোখ পাকিয়ে বললো,
–আবার বাচ্চামো শুরু করেছো কেনো তুমি? ফটাফট পিছে বসে পড়ো।

আয়াতের কন্ঠে স্পষ্ট ক্রোধের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই গরমে এই ক্রোধের শিকার হয়েছে নিজেকে আরও ভস্মীভূত মনে হলো মাইশার। আয়াতের দিকে না তাকিয়েই বললো,

–আমি এখন বাসায় যাবো। আর তুমিও নাহয় তোমার কাজে যাও। ইদানীং যা ব্যস্ত মনে হচ্ছে। ক’দিন পর তো কথা বলাই বন্ধ করে দিবে।

আয়াত নীরব ভঙ্গিতে এবার মাইশার এক হাত টান মেরে বসিয়ে দিলো পিছনের সিটে। হতভম্ব হয়ে গেলো মাইশা। আয়াতের এহেন কান্ডে ওর মাথা শূণ্য হয়ে গিয়েছে। আয়াত বাইক স্টার্ট করতেই মাইশা কিছু বলতে যাবে তার আগেই আয়াত শীতল কন্ঠে বললো,

–মুখ থেকে একটা ওয়ার্ড বের হলে ডিরেক্ট আমি খালু-খালামণির কাছে আমাদের ব্যাপারে গিয়ে সব বলবো।

মিহিয়ে গেলো মাইশা। ভারক্রান্ত অবস্থায় আয়াতের কাধে নিজের হাত চেপে ধরলো তাই। আয়াত কিছু না বলেই এবার বাইকটা হাতিরঝিলের দিকে নিয়ে গেলো।
.
.
.
—————————————————
হাতিরঝিলের এপাশটিতে বহমান ঠান্ডা বাতাস। রৌদ্দুরের তেজটি সঠিকভাবে বোঝা যাচ্ছে না এত বাতাসের কারনে। নীল আকাশের সাদা মেঘের আস্তরণে আশপাশ চমৎকার লাগছে। সবদিকেই কেমন যেন এক মৌনতার ভাব। অদূরের শিউলি গাছটিকে এত সুন্দরভাবে দাঁড়ানো দেখে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করলেও তা পারলো না মাইশা। কেননা আয়াত বিধ্ধস্ত ভঙ্গিমায় বেঞ্চের সিটে মাথা এলিয়ে দিয়েছে। চোখে-মুখ কেমন যেন লাল দেখাচ্ছে। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে আয়াত। কিছুক্ষণ পর শীতল কন্ঠে বললো,

–”দুদিন ধরে কল রিসিভ করছো না কেন?”

মাইশা নীরব।

–কিছু জিজ্ঞেস করছি তোমাকে? কল রিসিভ করছো না কেন?

তবুও মাইশা কিছু বললো না। কঠোর দৃষ্টি সামনের ঝিলের পানিতে দিয়ে রেখেছে। ক্ষেপে গেলো আয়াত। উচ্চস্বরে বলে ওঠলো,

–এসব লেইম কাজের মানে কি মাইশা?একটাবার ভেবে দেখেছো যে আমার কি অবস্থা হয়েছিলো। সারাটাদিন খাটাখাটুনি করে রাতের নিস্তব্ধ প্রহরে তোমার কন্ঠই নিমিষে আমার ক্লান্তি দূর করে ফেলতো। আমার জন্য একটুও কষ্ট হয় না তোমার?তোমার আবদারের জন্য তো আমি ছুটে চলে এসেছি তোমার সাথে দেখা করার জন্য । আর তুমি?…………………….এক কাজ করো। মেরে ফেলো আমায়। তবেই তো তোমার শান্তি হবে, তাইনা?

ছলছল করে ওঠলো চোখজোড়া মাইশার। না চাইতেও চোখের অবাধ্য জলগুলো অবধারায় গড়িয়ে পড়ছে। মিহি গলায় বললো,

–দুদিন ধরে তোমার কল রিসিভ করলাম না বলে তুমি এমন করছো আর তুমি? একটাবার বলতে পারবে যে লাস্ট কবে আমার সাথে কথা বলেছিলে হু হ্যা ছাড়া।………………….আমার মনে হচ্ছিলো যে আমি তোমায় বিরক্ত করছি । তাই কথা বলি নাই দুদিন।

শান্ত হয়ে গেলো আয়াত। মেয়েটার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। এভাবে বকাটা আসলে ঠিক হয়নি।আয়াত নিজের চুলগুলো এক হাতে পেছনে ঠেলে দিয়ে নির্লিপ্ত শ্বাস ছাড়লো। তারপর মাইশার সামনে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বললো,

–সরি………….আমার এভাবে বলা উচিত হয়নি।

–সরি বলছো কেনো? দোষ তো আমার। আমি তো তোমাকে একটুও শান্তিতে থাকতে দেই না।

মাইশার কাঠ কাঠ উত্তর । আয়াত কিছু না বলে আলতো হেসে এগিয়ে গেলো কানের কাছে। মাইশা পিছাতে গেলেই আয়াত নিজের হাত দিয়ে ওর হাত চেপে ধরে। যার দরুন থেমে যায় মাইশা। আয়াতের হুটহাট এভাবে কাছে আসাতে অস্বাভাবিকভাবে ওর হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। এই কাছে আসাতে কোনো অপ্রীতিকর দৃশ্য বা অশ্লীলতা নেই ; আছে শুধু না জানা কয়েক খন্ড অনুভূতি। আয়াতে মাইশার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো,

–ঠিকই তো বললাম , আমায় তুমি শান্তিতে থাকতে দাও না। এই অবাধ্য মনটা সময় অসময়ই শুধু মাইশা নামটি উচ্চারন করতে থাকে। আর আমার সাথে কথা না বলে কি মজা পেয়েছিলে তুমি? জানো আমার কি অবস্থা হয়েছিলো? দু রাত শান্তিমতো ঘুমাতে পারিনাই। শ্বাস নেওয়া তো কষ্টকর হয়ে গিয়েছিলো। আর একটু হলে যদি মরে যেতাম তার দায়ভার কি তুমি নিতে?

আয়াতের ঠোঁটজোড়া বারবার স্পর্শ করে চলছে মাইশার কানের লতি। নিজেকে কেমন যেন দমবদ্ধ পরিস্থিতির শিকার মনে হলো ওর। দুপুরের এই জনশূণ্য পরিবেশের তিক্ততা নিমিষেই মেঘের ন্যায় উড়ে গিয়েছে। আর মাইশা তখনও নীরব । আয়াত মাইশার কাছ থেকে সরে আসলো আস্তে করে। এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। নতুন নতুন অফিসে কাজ শেখা শুরু করেছে। এ সময়ে কাজে ফাঁকি দিলে বাবা রাগ করতে পারে। আয়াত শীতল গলায় বললো,

–আর অল্প কিছুসময় মাইশা। একবার নুহাশ ভাইয়ের বিয়েটা হয়ে যাক। ততদিন আমিও নিজের ক্যারিয়ার সামলে নেই যাতে তোমার বাবা-খালু আমায় তোমার অযোগ্য না মনে করতে পারে। তারপর এই আরহাম আয়াতও বিয়ের জন্য অনশন শুরু করবে।

ফিক করে হেসে দিলো মাইশা। যতবারই মনে একটা ভয় জেগে ওঠে ততবারই আয়াত নতুনভাবে আশ্বাস দেয় ওকে।আয়াতের প্রতিটি কথা, প্রতিটি ভঙ্গিমাই যেন মাইশার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। রাগ, হাসি, তেজ সবকিছুতেই কোনো না কোনো ভাবে যেন মাইশার অস্তিত্ব রয়েছে।মাইশার মনের কথাও চট করে বুঝে ফেলার মতো ক্ষমতা ধারন করে নিয়েছে। ব্যাপারটা এমন হলো কেনো? ছেলেটা কি আজকাল মন পড়া শুরু করেছে নাকি?
.
.
.
.
#চলবে…………ইনশাল্লাহ