হৃদমাঝারে তুমি ছিলে পর্ব-৩৫+৩৬

0
848

#হৃদমাঝারে_তুমি_ছিলে❤
পর্ব ৩৫+৩৬
#কায়ানাত_আফরিন❤

নুহাশের বিয়ের দুদিন আগেই গাজীপুরের এই রিসোর্টটিতে ব্যাগপত্র নিয়ে এসে পড়লো পুরো পরিবার। আজকের আকাশটা বেশ পরিষ্কার। সূর্যের তেজি রশ্মিগুলো সবুজে মোড়ানো এই রিসোর্টটিকে অভূতপূর্ব সুন্দর বানিয়ে তুলেছে। প্রাচীরজুড়ে সুন্দরভাবে সারি সারি নারকেল আর সুপারিগাছ দাঁড়ানো। বিয়ে আর গায়ে হলুদের জন্য অলরেডি সব ব্যবস্থা শুরু হয়ে গিয়েছে। বরপক্ষের থেকে তা সামলাচ্ছে আরিয়া আর আনান। যদিও এই ডেস্টিনেশন ওয়েডিং এর পুরো পরিকল্পনা আরিয়ারই ছিলো তবে আনান এখানে সামলাচ্ছে নুহাশের আদেশি কন্ঠ শুনে যা অবাধ্য করার ক্ষমতা আনানের নেই। তাইতো ঢাকা থেকে গাজীপুরে আসা পর্যন্ত এই লম্বা সময় মুখ কালো করে রেখেছে ছেলেটা।
মাইশা গাড়ি থেকে নেমে একপলক আনানের দিকে দিকে তাকালো। আনান মুখটা কুমড়োপটাশের মতো করে ব্যাগগুলো গাড়ি থেকে উঠিয়ে রিসোর্টের সামনে রাখছে। এদিক দিয়ে অর্পিরাও এসে পড়েছে ওর পরিবার নিয়ে। তাই মানুষের সমারোহে গমগম করছে এই প্রাঙ্গনটি। মাইশা মিহি সুরে সামাদ-পৃথাকে বললো,

–আনানের জন্য মায়া লাগছে রে !

–থাক্ ! ওই ছাগলাটার জন্য এত মায়া বাড়ানোর দরকার নাই। ওর কাইল্লা মুখের কাইল্লা কথার জন্যই আজ নুহাশ ভাইয়ের খপ্পরে পড়েছে। আল্লাহয় যা করে ভালোর জন্যই করে।

বলেই তপ্ত শ্বাস ছাড়লো অর্পি। চোখের চশমাটা বারবার ঢিলে হয়ে নাকের কাছে পড়ে যাচ্ছে বিধায় বড্ড বিরক্ত হলো মেয়েটা। চশমাটা রাগের বশে খুলে ব্যাগে রাখতে গেলেই ওপাশ থেকে নুহাশ চেঁচিয়ে বলে ওঠলো,

–চশমা খুলছো কেনো? বিয়ের আগেই উষ্ঠা খেয়ে হাত পা ভাঙবে নাকি?

নুহাশের সাথে সায় দিলো অর্পির মা । অর্পির মাথায় গাটা মেরে বললো,

–এই মেয়ে ওর দাদীর আগে আমারে হার্টফেল করে মারবে। এদিকে আমার একাই সব কাজ সামলাতে হচ্ছে আর এই মেয়ে আসছে চশমা খুলে ঘুরবে। এক্ষুণি চশমা পড়।

–কিন্ত মা চশমাটা ঢিলে হয়ে গিয়েছে তো?

–সামাদকে বললেই তো স্ক্রু দিয়ে ঠিক করে দেয়। এর জন্য চশমা খুলতে লাগে? হায় আল্লাহ এই মেয়ে আমারে জ্বালিয়ে মারবে।

হাহাকার করতে করতে রিসোর্টের রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন আমেনা বেগম। এই বিয়ের মৌসুমে মাথায় অনেক কাজের চাপ পড়েছে উনার। অর্পি উদ্ভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো সেখানে। যদিও বকা, মার এগুলো ওর কাছে বড় কিছু না কিন্ত এভাবে নুহাশ আর আঙ্কেল আন্টির সামনে বকা খাওয়াতে লজ্জা লাগছে বেশ। সরু চোখে নুহাশের দিকে তাকালো তাই। নুহাশ ব্যস্ত ভঙ্গিতে চোখ রাঙানি দিতেই অর্পি চোখ সরিয়ে ফেলে। রাগ হচ্ছে ওর। তাই চিল্লিয়ে বলে ওঠলো,

–ওই আনাইন্না?

আনানের নামটা বিকৃত করে ডাকাটা ওর কাছে বড় একটা কিছু না। তাই আনান দ্রুতপায়ে ব্যাগপত্র রেখে ওর কাছে আসলো। মাইশা, সামাদ, পৃথা নির্বিকারে গাড়িতে হেলান দিয়ে এ দৃশ্য দেখে চলছে। অর্পি দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

–আমার রুম কোনটা?

আনান কিছু একটা ভাবলো অল্প সময়ে। তারপর বলে ওঠলো,

–আপাতত তোর রুম কোনটা এটা আমি জানিনা। তবে বিয়ের পর আইমিন বাসররাতে তোর রুম কোনটা হবে এটা আমার ভালোমত জানা আছে। বলবো?

আনানের কথা শুনে নিজের রাগ দমাতে পারলো না অর্পি। রাগে যেন শরীরটা রি রি করছে। অর্পি সহজে রাগে না কিন্ত বিরক্তি আর ধমক যেন ওকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এমনিতেও নুহাশের জ্বালায় বাঁচে না এর ওপর আনানের মুখে ”বাসররাতের” কথা শুনে গর্জে বলে উঠলো,

–কেন রে?আমি কি একবারও বলেছি যে এখন আমি বাসর করবো?

–আস্তাগফিরউল্লাহ ! এখন বাসর করবি মানে? কার সাথে করবি? ওইটা তো করবি বিয়ের পর।

মাইশা সামাদ বিচলিত হয়ে আনান আর অর্পির মুখ চেপে ধরলো। কি শুরু করেছে এরা?অর্পির মুখ ক্রমান্বয়ে লাল হয়ে গিয়েছে আনানের কথায়। ইচ্ছে করছে নুহাশ আর আমেনা বিবির ওপর জমানো ক্ষোভটাও ওর ওপর ঝাড়তে। ওদের এমন কথা শুনে আয়াত আর শাওন দ্রুতপদে ওদের কাছে আসলো।ওরা দুজনেও যেন বিস্ময়ে যেন চোখজোড়া বড় বড় করে ফেলেছে। শাওন শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বললো,

–পাগল হয়েছো তোমরা? ওদিকে বড়রা আছে। এভাবে বাসর-বাসর করছো কেনো?

আনান বিভ্রান্ত হয়ে বললো,

–অর্পিরে জিগান ভাই। মাইয়্যা নুহাশ ভাইয়ের শোকে পাগল হইয়া এখনই বাসর করতে চাইতেসে।

–ওই কুত্তা ! আমি কখন বললাম যে আমি বাসর করতে চাইতাসি।

–ওমা। তাহলে কি তুই চাস না ! বইন নুহাশ ভাই যদি জানে যে তুই আমার সাথে রাগ কইরা বাসর লইয়া তিড়িং বিড়িং শুরু করছোস ওই হালায়……(জিভ কেটে) মানে দুলাভাই আমার কল্লা কাইট্টা দিবো।

অর্পি আর আনানের বাসরতত্ত্বের ঝগড়ায় মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠেছে মাইশার। সাথে বাকি সবারও। আয়াত এবার শীতল কন্ঠে বললো,

–তোমরা থামবে?

নীরব হয়ে গেলো অর্পি আর আনান। দুজনেই তর্ক বিতর্ক করে এবার হাপিয়ে উঠেছে। আয়াত দু’তিনবার নিঃশ্বাস ছাড়লো স্বাভাবিক ভঙ্গিমায়। রোদের দাপটে কপালের ঘামগুলো কেমন যেন চিকচিক করছে। আয়াত বলে ওঠলো,

–তোমাদের দুজনের মাথা যে আল্লাহ কি দিয়ে বানিয়েছে আমার তা ধারনার বাইরে। বিয়ের মহল আর এতগুলো মানুষ আর তোমরা বাসর নিয়ে কোমড় বেধে ঝগড়া করছো, লাইক সিরিয়াসলি !

মাইশা-সামাদ-পৃথা-শাওন ওরা নিঃশব্দে হেসে চলছে। আয়াত আবার বললো,
–এই রিসোর্ট অন্য ৪-৫ টা রিসোর্টের মতো না যে একসাথে অনেকগুলো রুম আছে। এখানে মূলত ছোট ছোট ৭-৮ টা কটেজের ওপর বেজ করে সব করা। আর তোমরা ৫ জন দক্ষিণ মাথার কটেজে থাকবে। দুটা রুম আছে ওখানে। সামনের টায় সামাদ আর আনান থাকবে। ভেতরের টায় থাকবে তুমি, মাইশা আর পৃথা। ঠিক আছে?

–হুমম।

অর্পির মৃদু উত্তর। আয়াত পরিপ্রক্ষিতে কিছু বললো না। গায়ে হলুদ আর বিয়ের জন্য এখনও অনেক সময় আছে। তাছাড়া এই রিসোর্ট ভাড়া নেওয়া হয়েছে পুরো ১ সপ্তাহের জন্য যাতে ধীরে সুস্থে সুষ্ঠুভাবে বিয়ের কার্য সম্পাদন করা যায়। আয়াত মনে মনে ভেবে নিলো , একবার নুহাশ ভাইয়ের বিয়েটা হয়ে যাক্………..তারপর আয়াত ওর আর মাইশার সম্পর্কের কথা ওঠাবে। প্রয়োজনে অনশন করতেও পিছপা হবে না।

__________________________________________________

রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথেই স্তব্ধ হতে লাগলো এই বিয়েমহলটি। সারাদিনের কাজকর্মের ক্লান্তিতে সবাই নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে এই মোহময় পরিবেশের আবিষ্টে। অতিথিরা আগামীকাল থেকে আসা শুরু করবে। তাই আজকেই সব ব্যবস্থা করতে হলো। প্রাঙ্গনে স্টেজ বসানো থেকে শুরু হয়ে লাইটিং ডেকোরেশন সব কাজ সবাই করেছে মিলমিশে। সারাবিকেল আর সন্ধ্যা যেখানে আড্ডা আর হৈ হুল্লোড়ের কারনে গমগম করছিলো সেই পরিবেশটি এখন কেমন যেন নীরব , নিস্তব্ধ। দূর দূর শুধু শোনা যাচ্ছে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। কেমন যেন মায়াবিচ্ছিন্ন প্রহর। বিছানায় এসময়ে সটান হয়ে শুয়ে আছে মাইশা। শরীর অবসন্ন থাকলেও চোখে যেন ঘুম নেই। ওদিকে আনান সামাদের ঘর থেকে কিছু কন্ঠ ভেসে আসছে। সম্ভবত পাবজি খেলতে মগ্ন দুজনে।

হঠাৎ ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দে ভাবনাত্যাগ করে বাস্তবে ফিরলো মাইশা। ভাইব্রেশনের কারনে খাটটি অস্বাভাবিকভাবে কেঁপে ওঠছে। এমতাবস্থা অর্পি আর পৃথা আরও জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে পড়লো।পৃথা ঘুমের ঘোরে অর্পিকে বললো,

–আমারে নুহাশ ভাইব্বা খাটের থেইকা ফালাইস না কিন্তু !

প্রতিউত্তরে অর্পি কি বললো মাইশা তা বুঝতে পারলো না। এর মধ্যে কল কেটে আবার কল আসাতে ভাবনার জাল ছিঁড়লো পুনরায়। মাইশা ভ্রু কুচকে বালিশের নিচে থেকে মোবাইল বের করে দেখলো স্ক্রিনে লিখা……..”আয়াত”। নামটাতে চোখ বুলাতেই মাইশা অনুভব করলো ওর বুকে ভালোলাগার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো তাই। হুট করে এত রাতে আয়াতের কল আসাতে যতটাই না অবাক হয়েছে তার থেকে বেশি কাজ করছে তুমুল উত্তেজনা। কল রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে আয়াত শীতল কন্ঠে বললো,

–আমার সাথে আজ জোছনাবিলাস করবে মাইশুপাখি?

মাইশা কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে রইলো। ওপর পাশ থেকে শোনা যাচ্ছে কেবল উত্যপ্ত শ্বাস। কেমন যেন নিজেকে মাদকময় লাগছে মাইশার। নাহলে কোনো ছেলের কন্ঠ এতটা নেশা মিশ্রিত মনে হয় কেনো। অতঃপর মাইশা প্রশ্ন করলো,

–কোথায় তুমি?

–রিসোর্টের পেছন দিকে।

আয়াতের গহীন কন্ঠ। মাইশা সরু চোখে একপলক তাকালো অর্পি আর পৃথার দিকে। দুজনেই যেন ঘুমে কাবু হয়ে গিয়েছে।মাইশা ঠোঁটচেপে ভাবলো অল্পক্ষণ। তারপর মৃদুস্বরে বললো,

–আসছি আমি।

বলেই কল কাটলো মাইশা। চুলগুলো কাটাব্যান্ড দিয়ে ভালোমতো আগলে ওড়না পেচিয়ে নিলো শরীরে। ধীরপায়ে দরজা খুলে এবার বেরিয়ে গেলো রিসোর্টের দক্ষিণ দিকে।
.
.
.
রিসোর্টটের দক্ষিণ পাশটিতে শীতল মনজুড়ানো বাতাস। হাওয়ার শীতল সংস্পর্শে যেন লোমগুলো মাইশার শিরশির করে দাঁড়িয়ে পড়লো। আকাশে মস্তবড় একটা চাঁদ উঠেছে। কিন্ত এখানে এতই গাছপালা যে সেই পাতাসমাহার ভেদ করে চাঁদের ম্লান আলো কচি কাটা ঘাস স্পর্শ করতে পারলো না। এদিক ওদিক তাকিয়ে প্রাঙ্গনের একেবারে শেষপ্রান্তে দেখতে পেলো আয়াতকে।শুভ্র ওড়নাটি দিয়ে নিজেকে আরও ভালোভাবে আবৃত করে মাইশা গিয়ে দাঁড়ালো আয়াতের পাশে।মাইশার উপস্থিতি টের পেলেও প্রতিক্রিয়া করলো না আয়াত। ধূসর ট্রাউজারের পকেটে হাত দিয়ে প্রগাঢ় চোখে তাকিয়ে রইলো দীঘির টলোমলো জলের দিকে। মাইশা প্রশ্নবিদ্ধ মুখে তাকিয়ে আছে আয়াতের দিকে। শেষমেষ বলে ফেললো,

–এভাবে চুপচাপ কেনো?

–কেন ভাল্লাগছে না?

–মোটেও না। তোমায় চুপচাপ দেখলে আমায় অস্থির অস্থির লাগে!

বিনিময়ে দুষ্টু হাসলো আয়াত। তাই একটু ঝুঁকে এলো মাইশার দিকে। তারপর মৌনতা কাটিয়ে বললো,

–তো তোমায় আর একটু অস্থির করি? কি বলো?

চোখ ছোট ছোট করে ফেললো মাইশা। ঠোঁট কামড়ে তাই বললো,

–তুমি অসভ্য হচ্ছো দিন দিন……..

–এভাবে বলো না ”মাইশুপাখি” ! তোমার এই ঠোঁট কামড়ে কথা বলার ধরন দেখে কবে যেনো আমি উন্মাদ হয়ে যাই !❤

আয়াতের শীতল কন্ঠে তুমুল লজ্জা গ্রাস করে নিলো মাইশাকে। ছেলেটার তীব্র পুরুষালি ঘ্রাণ ওকে এক মোহে যেন আবিষ্ট করে ফেলছে। চোখেমুখে কেমন যেন প্রেমময়অনুভূতি। সেই দৃষ্টিতে তাকানোর সাহস যেন মাইশার নেই।
.
.
.
.
#চলবে……..ইনশাআল্লাহ