হৃদমাঝারে তুমি ছিলে পর্ব-৩৭

0
858

#হৃদমাঝারে_তুমি_ছিলে❤
#পর্ব_৩৭
#কায়ানাত_আফরিন❤

–তো তোমায় আর একটু অস্থির করি? কি বলো?

চোখ ছোট ছোট করে ফেললো মাইশা। ঠোঁট কামড়ে তাই বললো,

–তুমি অসভ্য হচ্ছো দিন দিন……..

–এভাবে বলো না ”মাইশুপাখি” ! তোমার এই ঠোঁট কামড়ে কথা বলার ধরন দেখে কবে যেনো আমি উন্মাদ হয়ে যাই !

আয়াতের শীতল কন্ঠে তুমুল লজ্জা গ্রাস করে নিলো মাইশাকে। ছেলেটার তীব্র পুরুষালি ঘ্রাণ ওকে এক মোহে যেন আবিষ্ট করে ফেলছে। চোখেমুখে কেমন যেন প্রেমময়অনুভূতি। সেই দৃষ্টিতে তাকানোর সাহস যেন মাইশার নেই।

________________________________________________

ঘুমুঘুমু চোখ নিয়ে নিজের রুম থেকে বের হলো মাইশা। গতকাল আধঘন্টার জন্য আয়াতের সাথে দেখা করে আর ভালোমতো ঘুম হয়নি। তাই তো বেলা সাড়ে দশটা বাজে সামাদ , অর্পি টেনেও ওকে উঠাতে পারলো না। বেশ কিছুক্ষণ পর মাইশা যখন অনুভব করলো ওই দুইটার কোনো সাড়াশব্দ নেই পিটপিট করে চোখ খুললো তাই। ওয়াশরুমে কেউ গুণগুণ করে গান গাচ্ছে শাওয়ার ছেড়ে। মেয়েটা নিশ্চিত পৃথা। তাই মাইশা সামনের রুমের বাথরুম থেকে মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলো বাহিরের দিকে।
সকালের মিষ্টি রোদ্দুরটা সবুজ ঘাসের ওপর পড়াতে চমৎকার লাগছে। কিচেন সাইট থেকে এক মহিলার হৈ হুল্লোড় শোনা যাচ্ছে। মহিলাটি যে অর্পির দাদি হবে এ নিয়ে মাইশা শতভাগ নিশ্চিত। তাই খালিপায়ে এই নরম ঘাসের ওপর লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোতে লাগলো সুপারি বাগানের দিকে। সেখানে স্তম্ভিত হয়ে যায় মাইশা। কেননা নুহাশ আনান আর সামাদের কান চেপে দাঁড়িয়ে আছে। এমন দামড়া দুটা ছেলের কান চেপে ধরার দৃশ্যতে মাইশা যেন অবাক না হয়ে পারলো না। নুহাশের ঠিক পেছন বরাবরই মুখে একটা শয়তানি হাসি চেপে দাঁড়িয়ে আছে অর্পি। মাইশা দ্রুতপদে সে প্রান্তে গেলো ঘটনাটি বোঝার জন্য।

আনান আর সামাদ হাহাকার সুরে বলছে.

— এইবারের মতো মাফ কইরা দেন ভাই। আমরা ছোড মানুষ।

নুহাশ ধমক মেরে বললো,

–তোমরা আর ছোট? ইয়া মাবুদ তোমাদের মতো দামড়া ছেলেগুলা ছোট হলে তো পোলাপানগুলা হারপিক খেয়ে সুসাইড করবো।

ভ্রু কুচকে ফেললো মাইশা। নুহাশ-আনান-সামাদ এদের সব বিষয়বস্তুই মাইশার ধারনার বাইরে। তাই বিচলিত হয়ে বলে ওঠলো,

–কি হয়েছে ভাই?

–এই গবেটগুলোকে জিজ্ঞেস করো! এমনিতেতো আমার সামনে স্বর বের হয় না আর গতরাতে গলা ফাটিয়ে দুইটায় পাবজি খেলছে শেষ রাতে বারান্দায় বসে বসে। কান ঝালাপালা হয়ে গিয়েছিলো আমার। তখনই ঠিক করি সকালটা একবার হোক। দুইটারে সাইজ করবো।

আনান আবার বললো.

–দরকার পড়লে আপনার কথায় আর জীবনেও পাবজি খেলমু না ভাই ! আপনার ভবিষ্যত পোলাপাইনের কসম!

–এক থাপ্পড়ে তোমাদের দাঁত ফেলে দিবো আমি। বদমাশের দল! কসম করার জন্য আর মানুষ পাও না……..

নুহাশ আনানের এসব দৃশ্য আর নতুন না। এদের দেখলেই মানুষের একটা বিষয়ের কথা মনে পড়বে ”বাঘ আর বিড়ালের বাচ্চা”।অর্পি দুইটাকে নুহাশের অগোচরে ভেংচি মেরে মাইশার উদ্দেশ্যে বললো,

–এই মাইশু ! রান্নাঘরে চল তো। খিদায় পেট টা আমার রীতিমতো ডিস্কো ডান্স শুরু করেছে।
–চল তাহলে।
.
.
ডাইনিং টেবিলের এই বিশাল আসরে খাওয়া হচ্ছে কম আর কথা হচ্ছে বেশি। যেদিকেই তাকানো যায় সেদিকেই শুধু আলোচনা আর আলোচনা। এই এত মানুষের ভীড়ে যদি কেউ না বসে থাকে সেটা হলো অর্পির বোন অরি আর আমেনা বিবি। আনানের ভাষ্যমতে সপ্তম শ্রেণী পড়ুয়া এই দস্যু মেয়েটা পুরাই অর্পির মা র মতো ব্যস্ততম মহিলা হবে ভবিষ্যতে যেদিকে অর্পি পুরোটাই উল্টো।মেয়েটা নির্বিকারে পরটা ছিড়ে ছিড়ে বুটের ডালের সাথে খাচ্ছে। আজ বাদে কাল পরশু গায়ে হলুদ আর আয়োজন এখনও শেষ না হওয়াতে চিন্তায় বিভোর হয়ে গিয়েছেন শারমিন বেগম। নিজের বড় ছেলের বিয়ে এতটা জাকজমকপূর্ণ না করলেও সাদামাটাভাবে করার চিন্তাভাবনা নেই তার। কিন্ত এতকিছুর ভেতরেও রহমান সাহেব নিশ্চুপ…….বলতে গেলে অনেকটাই নিশ্চুপ। মাইশা-নুহাশ দুজনেই দু’তিনবার পরখ করেছে বাবার এই মৌনতা। কিন্ত বিয়ের আমেজে সবাই এতটাই বিভোর যে সেই মৌনতার দিকে ভ্রুক্ষেপ করার সময় যেন কারও মধ্যে নেই। নুহাশ বিনয়ী ভঙ্গিতে বললো,

–আব্বু তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?

নুহাশের কন্ঠে আলোচনা থামালো মিজান সাহেব আর রাহেলা বেগম। আরিয়া-অর্পি-আমেনা বিবিও সেখানে নজর দিয়েছে। রহমান সাহেব গম্ভীর ভাবে একগ্লাস পানি পান করেলেন। অর্পির মা বলে ওঠলো,

–ভাইজান প্রেশার বেড়েছে নাকি? ওষুধ আনবো।

–না……..তেমন কিছু না।

রহমান সাহেবের গম্ভীর কন্ঠ। চোখের মধ্যিখানে একরাশ চিন্তাগ্রস্থতা ফুটে ওঠেছে। নীরবতা কাটিয়ে তিনি বলে ওঠলেন,

–মাইশার জন্য যে ছেলে ঠিক করেছিলাম সে আগামীকাল আসছে এখানে।

বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে এলো সবার। মাইশা-আনান-সামাদ-অর্পি-পৃথার মনে রীতিমতো উত্তেজনার জোয়ার শুরু হয়ে গিয়েছে। মাইশার এই ছেলের কথা তো একপলক ভুলেই গিয়েছিলো। আর ভুলবেই না বা কেন , ইন্টারের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন এই ছেলের কথা বলেছিলো বাবা। ঘটকালি করেছিলো পাশের বাড়ির জামান আঙ্কেল। ছেলে সম্পর্কে উনার ভাতিজা হয়। কয়েক বছর যাবৎ দেশের বাহিরে গিয়েছিলো পড়াশোনার জন্য । ছেলের চাকরি-বাকরি হয়ে ইউরোপের একটা গ্রীণ কার্ড পেলেই মাইশার জন্য ছেলের হাত আনবে বলে বলেছিলেন জামান সাহেব। রহমান সাহেবের এই সম্বন্ধটা পছন্দ হলেও তখন সম্মতি জানানি। বলেছিলেন মেয়েটাকে আরও পড়াশোনা করাবেন। আয়াত ওর জীবনে আসার বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা এগুলো। সেই সুবাদে মাঈশা ভুলেই গিয়েছিলো এটার কথা। হুট করে রহমান সাহেবের এই কথা বলাতে গায়ে হিম ধরে যায় মাইশার।

শারমিন বেগম বিচলিত হয়ে বললেন,

–নুহাশের আব্বু বলছিলাম কি এখন নুহাশের বিয়েটা আগে হোক তারপর নাহয় মাইশারটা আগাই?

–আমি কি বলেছি যে ছেলে আসলেই বিয়ে দিয়ে দেবো মাইশার সাথে? জামান সাহেব অনেক আগেই এই সম্বন্ধটা নিয়ে এসেছেন আর আমাদের প্রতিবেশি হয়ার সুবাদে তো তাকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছে নুহাশের বিয়েতে। এখন জামান সাহেব যদি স্বেচ্ছায় ছেলেসহ ছেলের মা-বাবাকে নিয়ে এখানে আসতে চায় আমি কিভাবে না করতে পারি?

যুক্তি আছে উনার কথায় । পরিপ্রেক্ষিতে শারমিন বেগম তাই কিছুই বললেন না। মাইশা নির্বাক হয়ে কথাগুলো শুনছে। আনান-সামাদ ইশারা করছিলো মুখফুটে কিছু বলার জন্য কিন্ত ওর মুখ দিয়ে একটা স্বরও বের হয়নি। আয়াত-শাওন দুজনেই ডেকোরেটিংয়ের এর ব্যবস্থার জন্য ঢাকা গিয়েছে লোক আনার জন্য । অথচ এসময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আয়াতকে। মনে মনে নির্লিপ্ত শ্বাস ছাড়লো মাইশা। বাবাকে এবার সত্য কথা বলতেই হবে !
___________________________________________

মধ্যদুপুরের ভ্যাপসা গরমে চারপাশে বিতৃষ্ণা জেগে ওঠেছে। আশেপাশে কোনোপ্রকার কোনো বাতাসের অস্তিত্ব নেই। ইঙ্গিত দিচ্ছে নিম্নচাপের কারনে সন্ধ্যারপর ভয়াবহ এর বৃষ্টি হবে। সেই তান্ডবে পুনরায় শীতল হয়ে ওঠবে সর্বত্র। আজকাল আবহাওয়ার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। প্রকৃতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অতুলনীয়ভাবে যেন বদলে যাচ্ছে। বারকয়েক বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে বাবার কাছে যেতে ইচ্ছুক হলেও যেতে পারলো না। দরজার সামনে নীরব মূর্তির মতো ঠায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনেবিস্তার করছে অজানা কিছু ভয়। কোনো খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে না-তো? বাবা যদি আয়াতকে না মেনে নেয়। ভাবতেই কাঁপুনি ধরে গেলো মাইশার। রহমান সাহেব আরাম গদিতে বসে পেছনে মাইশার উপস্থিতি অনুভব করতে পেরেছিলো। তাই শীতল কন্ঠে বললো,

–কিছু বলবে মামণি?

–হ-হ্যাঁ।

মাইশার ইতস্তত কন্ঠ। রহমান সাহেব ইশারায় ভেতরে আসতে বললেই মাইশা নীরবে নিভৃতে বাবার মুখোমুখি হয়ে বসে পড়লো। মনে বিরাজ করছে টানটান এক উত্তেজনা। দৃষ্টি নত করে বলে ফেললো,

–আব্বু আমি একজনকে ভালোবাসি !

বলেই কন্ঠস্বর মিহি করে ফেললো সে। বাবার দিকে তাকানোর ক্ষমতাটি এখন যেন আর নেই। রহমান সাহেবও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। মুখে অদ্ভুত এক হাসি।

–ছেলেটা আয়াত। তাই না?

বিষ্ময়ের চরম প্রান্তে এবার মাইশা। নত করা দৃষ্টি এখন অদ্ভুত আকারে বিকট রূপ নিয়েছে। বিনিময়ে যে কেমন প্রতিক্রিয়া করতে হবে মাইশা যেন তা ভুলে গেলো। তবুও আপ্লুত হয়ে বললো,

–তুমি………কিভাবে…….?

–আমার মেয়ে তুমি মাইশা।একজন বাবা কোনো ছেলের সাথে তার মেয়ের কথা বলার ধরন দেখেই বুঝতে পারে তাদের সম্পর্ক কেমন। আনান বা সামাদ বা শাওনের সাথে তোমার যেমন সম্পর্ক……….আয়াতের সাথে তোমার তেমন সম্পর্ক না। তা আমি আগেই আন্দাজ করতে পেরেছি। চোখ কখনও সেই অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে পারে না।

–তাহলে তোমার মতামত কি?
মাইশার মৃদু কন্ঠ। রহমান সাহেব নিষ্পলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ মাইশার দিকে তাকালেন। তারপর বলে ওঠলেন,

–আমি এ ব্যাপারে এখন কোনো কথা বলতে চাচ্ছি না। তুমি আসতে পারো।

রহমান সাহেবের কোনোপ্রকার কোনো প্রতিক্রিয়াই আন্দাজ করতে পারলো না মাইশা। অতি গরম আর চিন্তায় তরতর করে ঘামছে তাই। বাবার এই কথার কিসের ইঙ্গিত মেনে নিবে সে। আয়াতহীন মাইশা যে একেবারে নিশ্চুপ হয়ে যাবে , সেটা সে নিজে মানতে পারবে তো?
.
.
.
দুপুরে যেমন ভ্যাপসা গরম বিরাজমান ছিলো ,রাত্রির গহীনে এবার ঝমঝমিয়ে পড়েছে বৃষ্টি। নুপুরের ন্যায় সেই প্রতিধ্ধনিগুলো মধুময় ঝংকারের সুরে বেজে উঠছে। জানালার কপাটগুলো তাই বারি খাচ্ছে বারবার। এমনসময় কটেজের দরজায় ঠকঠক করে আওয়ার শুনতে পেলো আনান। সামাদ-পৃথা-অর্পি-আনান সবার মনেই এবার আশার আলো জেগে ওঠেছে। কেননা বাবার কাছে কোনো প্রতিউত্তর না পেয়ে ঘরে হূলস্থূল কান্ড ঘটিয়ে দিয়েছিলো মাইশা। অনেকটা ত্রাসে , তো অনেকটা আতঙ্কে। বারবার উল্টোপাল্টা কথা বিড়বিড়িয়ে ঘরের সব জিনিসগুলো ছিটিয়ে অবস্থা কাহিল করে ফেলেছে। আনান এগিয়ে যেতেই বেচারাকে দিলো দুইটা চড়। তাই কেউ আর এগোনোর সাহস পায়নি। শঙ্কায় কাউকে কিছু বলতেও পারছে না তাই। এমতাবস্থায় শুধু একজনই ছিলো যে মাইশার মনের ঝড়কে শান্ত করতে পারবে। আনান তাই কল দিলো আয়াতকে। ঢাকা থেকে সন্ধ্যায় গাজিপুর এসে কটেজে লম্বা ঘুম দিলেও আনানের কলে কথা শুনে বড় বড় পা ফেলে রিসোর্টের শেষপ্রান্তের কটেজে আসলো তাই।

দরজায় আবারও ঠকঠক শব্দ হতেই আনান দ্রুতপায়ে গিয়ে দরজা খুললো। আয়াত দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো…….হাতে একটি ছাতা, তাড়াহুড়োর চোটে উল্টো টিশার্ট পড়ে এসেছে। আয়াত সেটা খেয়াল করলেও ঠিক করার সময় ছিলোনা মাইশার দুশ্চিন্তার জন্য। মেয়েটা যে এতপরিমাণ পাগলামি করবে তা ধারনা করলে শাওনের সাথে মোটেও যেত না ঢাকায়। আয়াত গম্ভীর স্বরে বললো,

–কোথায় ওই জংলীবিড়ালটা !
.
.
.
.
#চলবে…….ইনশাল্লাহ