হৃদমাঝারে তুমি ছিলে পর্ব-৪০

0
830

#হৃদমাঝারে_তুমি_ছিলে❤
#পর্ব__৪০
#কায়ানাত_আফরিন❤

আজ নুহাশের বিয়ে। কথাটি শুনলেই হুমায়ূন আহমেদের একটি উপন্যাসের কথা মনে পড়ে যায়, ”আজ হিমুর বিয়ে”। পার্থর্ক্য শুধু একটাই : বইয়ের পাতায় হিমু আর বাস্তবের পাতায় নুহাশ। উৎসবের আমেজের ভরপুর হয়ে ওঠেছে সর্বত্র , আর হবেই না বা কেন ? বিয়ে তো শুধু দুজনের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না……….বন্ধন নিবিড় হয় দুইটি পরিবারের মধ্যে। মাইশার ভাবতেই অবাক লাগে যেই মেয়েটাকে মাইশা সবসময় কানা বান্দর বলে ক্ষেপালেও মনের একটি গভীর অংশে গেঁথে আছে , সেই মেয়েটা ওর ভাবি হবে। এত উত্তেজনা রাখবে কোথায়? যেই মেয়েটা উনিশ থেকে বিশ হলেই কেদে বান ভাসিয়ে মাইশা-আনান-পৃথা আর সামাদকে আসতে বলতো, হুট করে সেই মেয়েটাকে কত বড় মনে হচ্ছে। এখন তো সবসময়ই মাইশা অর্পিকে কাছাকাছি পাবে , নিজের ভাবি হিসেবে। তাহলে ওর মনে খুশি নেই কেন?

উত্তরটা মনে হয় ওর জানা। কেননা বিয়ের কবুল পর্ব শেষ হলেই আগের মতো উল্লাস থাকবে না এই সম্পর্কে। সামাদ-পৃথা যখন তখন ওকে মাইর আর ভয়ংকর গালি দিতে পারবে না। পারবে না আনান সবসময় বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে।একবার এক ছেলে অর্পির ওড়না টান মেরেছিলো বলে কি উড়াধুরা মাইরটাই না দিলো আনান-সামাদ ! তখন ওরা কলেজে পড়তো। শাস্তিস্বরূপ প্রিন্সিপাল ওদের টেস্ট পরীক্ষা দিতেই না বলেছিলো। অন্যসময় সেগুলো মনে করে হাসি আসলেও আজ কান্না আসছে।

সবাই নিজেদের ঘরে বসে আছে গম্ভীর স্বভাবে। অর্পিকে কিছুক্ষণ পরেই রেডি করাতে হবে। আনান সোফায় মাথা এলিয়ে বসে আছে ক্লান্ত ভঙ্গিতে। এক কালো আকাশ যেন ওর মুখে ভর করেছে। অর্পি বলে ওঠলো,

–এমন ভুতুম পেঁচার মতো মুখ করেছিস কেন?

–আনান নিশ্চুপ।

মাইশা নিষ্পলক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। অর্পির সাথে ঘেষে বসে আছে পৃথা। আনান মৌনতা কাটিয়ে বললো,

–তোকে মিস করবো রে !

এতক্ষণের বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়া মুখটা ম্লান করে ফেললো অর্পি। সদর দরজা খোলা আছে বলে বাইরের থেকে মানুষের শোরগোল শোনা যাচ্ছে। অনুমান করে বোঝা গেলো শাওনের সম্ভবত বাহিরে লাইটিংয়ের লোকদের সাথে ঝামেলা চলছে। কিন্তু সেদিকে মাইশা বা কেউই কর্ণপাত করলো না। হতভম্ব দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে আনানের দিকে। আনান আবারও বললো,

–তোর বিয়ে হয়ে গেলে কি বিয়ের চক্করে ভুলে যাবি আমাদের?

–মোটেও না।

–যদি নুহাশ ভাই না করে?

চুপ হয়ে গেলো অর্পি। আনান আবারও বললো,

–নুহাশ ভাইতো এই জন্মে আমার কাজকাম পছন্দ করবো না। তাহলে গ্যারান্টি কি যে নুহাশ ভাই তোর সাথে আমার বা সামাদের কথা বলতে দিবে।

দম নিলো অর্পি। এই ছেলে নির্ঘাত নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছে। নাহলে এ ধরনের কথা বলার মতো মানুষ আনান না। অর্পি তাই মিহি কন্ঠে বললো,

–নুহাশ ভাই আর যা-ই করুক না কেন………..তোকে বিশ্বাস করে সে। হ্যাঁ ! উনি হয়তো অনেক রাগী , উনিশ থেকে বিশ হলে চড় থাপ্পড় মারতে মোটেই দ্বিধাবোধ করে না। তবুও তুই বল তো………..তোর এত আকামের পরও কেন তোরে দিয়ে কাজ করাত? কেন তোকে বা সামাদকে বলতো , রাস্তায় বিলম্ব হলে মাইশাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসতে? কারন তোদের দুইটাকেই সে খুব বিশ্বাস করে।

ঠোঁটে স্মিত হাসি তুলে মাইশা। অর্পির কথায় মেয়েটাকে আজ খুব বড় বড় মনে হচ্ছে।আনানের ক্লান্তিমাখা মুখেও হাসির রেশ। আজ ওরা পাঁচজনই মনে-প্রাণে মানছে , সবকিছুর উধ্ধে বন্ধুত্ব না হলেও এর নিচে কিছুই নেই। এমন ধরনের বন্ধন তৈরি করা…………..আসলেই ভাগ্যের বিরাট একটা ব্যাপার। যৌবনকালের দুটো গহীন স্মৃতিই পুনরায় চলে……..প্রেম আর বন্ধুত্বের মাধ্যমে।

———————————————

মানুষের সমাগমে গমগম করছে প্রাঙ্গন। সবার মধ্যেই তুমুল ব্যস্ততা। তবুও এতকিছুর ভীড়ে নুহাশের এভাবে বসে থাকাতে আরাম লাগছে। যদিও শারমিন বেগম বারবার তাড়া দিচ্ছিলো , ছেলেটাকে রেডি হওয়ার জন্য । কিন্ত নুহাশ ততবারই মিহি গলায় বলে,

–আমার রেডি হতে সময় লাগবে না আম্মু। তুমি অন্য কাজ সামলাও।

বিরক্ত হলেন শারমিন বেগম। আজ ছেলের বিয়ে তবুও একরোখা ভাবটা যেন আর গেলো না। শ্বশুড়বাড়ির মানুষেরা কি বলবে এসব প্রলাপ করতে করতেই তিনি ব্যস্ত ভঙ্গিতে অন্যত্র চলে গেলেন। মাইশা একপাশে বসে মেহেদি পড়ছে হাতে। সবাই গতকাল মেহেদি পড়লেও সে পড়তে পারেনি আয়াতের জন্য। আয়াতের মহান বাণী , সে তার প্রেয়সীকে নিজে মেহেদি পড়াবে। সবার সামনে চুটিয়ে প্রেম করার নাকি মজাই আলাদা।

নুহাশের কাছ থেকে একটু দুরত্বে থাকা চেয়ারে বসে আসে মাইশা। বরাবরের বেতের মোড়ায় আয়াত সন্তর্পণে মেহেদি পরিয়ে বিচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই আরিয়াকে মেহেদি পরিয়ে দিত বলে এদিক দিয়ে দক্ষতা ভালো না বললেও খারাপ বলা যায় না।মাইশার প্রচন্ড অদ্ভুত লাগছে…………একইসাথে অস্বস্তিও। বিয়েতে কর্মরত কিছু মানুষ কাজের ভীড়ে এমনভাবে ওদের দেখছে যেন এর থেকে মজার বিষয় আর যেন হয় না। আয়াতের চুলগুলো কপালে পড়েছে এলোমেলোভাবে। পান্জাবির হাতা গুটানো। হাতের আংটিতে মোহনীয় লাগছে রূপে।আয়াত মিহি কন্ঠে বললো,

–এই নাও। এক হাতে আমার দেয়া শেষ। আর দেবো না। হাতের আঙুলগুলো ব্যাথা করছে আমার।

–যেমনে বলছো যেন আমি বলেছি………জানু মেহেদি দিয়ে দাও।

খোটা মেরে বললো মাইশা। আয়াত হাসে মৃদুভাবে। এতে গালের টোলটি দৃশ্যমান হয়ে ওঠেছে। আয়াত আবার বললো,
–দেখতো হাতে কিছু খুঁজে পাও নি?

কথাঅনুসারে মাইশা হাতে ফুটন্ত মেহেদির দিকে তাকালো। অনামিকা আঙুলের এককোণে সুন্দর করে ইংরেজী অক্ষরে লিখা আছে ,”MAISHAYAT”! বাহ…….ওদের দুজনের নামের মিলবিন্যাস যে এতটা সুন্দর হবে মাইশার ছিলো তা অকল্পনীয়। ঠোঁটে বিস্তৃত হাসি ফুটিয়ে তুললো তাই। মৃদু স্বরে বললো,

–ভালো হয়েছে।

–শুধুই ভালো?

–উহু ! অনেক চমৎকার হয়েছে মিঃ আরহাম আয়াত।

বিনিময়ে আয়াত ঠোঁট চেপে মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ালো । এতক্ষণ বসে থাকাতে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। হঠাৎ নুহাশের ক্ষিপ্ত কন্ঠে আয়াত আর মাইশা দুজনেই তাকালো নুহাশের দিকে। গর্জে বলে ওঠলো,

–আব্বু ! একটু এখানে আসো তো !

রহমান সাহেব কাছেই দাঁড়ানো ছিলো। ছেলেটা এতটা ক্ষিপ্ত হতে দেখে আন্দাজ করে নিলো যে কেন উনাকে এভাবে ডাকছে। দ্রুতপায়ে রহমানের সাহেব গিয়ে বললো,

–কি হয়েছে?

–ওই বাস্টার্ডটা এখানে কি করছে?

নুহাশের চোখ অনুসরণ করে রহমান সাহেব তাকালেন সেপানে। সেই সাথে পাশে দাঁড়ানো মাইশা-আয়াত আর সামাদও।একটা ছেলেকে দেখা যাচ্ছে অর্পির মা আর দাদীর সাথে। পরনে কালো শার্ট……..চুলগুলো হালকা কোকড়ানো…….!আয়াত ছেলেটাকে দেখে কিছুই বুঝলোনা।রহমান সাহেব বিচলিত কন্ঠে বললেন,

–কি বলছো এসব? ছেলেটা অর্পির চাচাতো ভাই,,,,,, তাহলে সে কি অনুষ্ঠানে আসবে না?

–তুমি আন্টিকে স্ট্রেইটলি বলে দাও এই ছেলেকে চলে যেতে। একটা মানুষ কতটা রিডিকিউলাস হতে পারে?সেদিন মাইশার সাথে অসভ্যতা করার পর আমার মার খেয়ে হাসপাতালে ছিলো ৭ দিন। এতকিছুর পরেও কিভাবে হাসিমুখে আসতে পারে ওই বাস্টার্ডটা?

মুখ কালো করে ফেললেন রহমান সাহেব। নুহাশের মুখে স্পষ্ট রাগের আভাস দেখা যাচ্ছে। রহমান সাহেব বললেন,

–আমার মনে হয় না যে এইবার ও মাইশার সাথে কোনোরূপ কোনো খারাপ ব্যবহার করবে। তাছাড়া ওরা এখন আমাদের আত্নীয়। এভাবে ভরা বিয়ে বাড়ির সামনে কিভাবে না বলতে পারি বলো? আর না তুমি এ ব্যাপারে কিছু বলবে। একদিনই তো। তারপর আর মনে হয় না ওর সাথে কোনো যোগাযোগ থাকবে অর্পিদের। আশা করি তুমি বুঝেছো !

দমে গেলো নুহাশ। কেননা কারও সাথে বেয়াদবি করার মতো শিক্ষা রহমান সাহেব ওকে দেননি। মাইশাও দাঁড়িয়ে আছে মৌনভাবে। আয়াত সামাদকে জিজ্ঞেস করলো,

–কি করেছিলো ছেলেটা মাইশার সাথে?

–আমরা কলেজে পড়াকালীন সময় অর্পির জন্মদিনে ওর সাথে পরিচিত হই। আর সেরাতেই মাসুদ মাইশার সাথে অসভ্যতামি করার চেষ্টা করেছিলো। ভাগ্যক্রমে নুহাশ ভাই সেদিন দেখে ফেলাতে ওই ছেলেকে ইচ্ছেমতো পেটায় ভাই। যার জন্য ৭ দিন টানা হসপিটালে ছিলো। অর্পির মা এ নিয়ে বেশ লজ্জিত হলেও অর্পির চাচি অনেক কটু কথা শুনাতে চেয়েছিলো মাইশাকে। পরে নুহাশ ভাইয়ের জন্য সেটা পারেনি।আত্নীয় বলেই অগত্যা তাকে দাওয়াত দিয়েছে আন্টি। নাহলে আমার মনে হয় না এদের মতো মানুষদের আন্টি কখনও দাওয়াত দিবে।

মৌনতার সহিত ঠায় ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো আয়াত। কি ভাবছে সেটা বোঝা বেশ মুশকিল। নুহাশ মাইশাকে বলে ওঠলো,

–ওই রাসকেলটার থেকে ১০ হাত দূরে থাকবি আজ।

বলেই গটগটিয়ে এখান থেকে প্রস্থান করলো সে। মাইশাও রেডি হওয়ার জন্য চলে যেতে নিবে হাত চেপে ধরলো আয়াত। আগের ন্যায় সেই গহীন সম্মোহনী দৃষ্টি। কপালে সুক্ষ্ম এক চিন্তার ভাঁজ পড়েছে ইতিমধ্যে। হালকা ঠোঁট কাপিয়ে শুধু একটা কথাই বললো,

–আমার দৃষ্টির নেশা থেকে হারিয়ে যেয়ো না।

কথাটা যতটা কঠিন মনে হচ্ছে আসলে অতটাও কঠিন না। আয়াতের কন্ঠে ফুটে ওঠেছে সাবধানতার আভাস। হয়তো এই বিয়েমহলে আয়াত মাইশার কাছাকাছি না থাকলেও চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করবে। উফফফফ ! এত মোহনীয়তা কেন আয়াতের প্রতিটা বাক্যে?
.
.
.
.
#চলবে………..ইনশাআল্লআহ!