#হোম_পলিটিক্স
#আফসানানীতু
#পর্ব_১১
নাফিসার কাজটা আপাতত অভির জন্য একটা উটকো ঝামেলা বটে। শফিকে নিয়ে হাসপাতালের ডিউটি দিতে গিয়ে কাজ অনেকটুকু পিছিয়ে গেছে তার। কিছু কাজ আজ রাতের মধ্যে শেষ করলেই না। খানিকক্ষণ ভেবে সে তমালকে কল করে। তমাল আর সে একই সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে। তমাল অবশ্য এখনো কোনো চাকরি-বাকরি পায়নি। তাই বাড়ি বসে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করে। রুটিন বাঁধা জীবনে নেই বলে তাকে দিয়ে প্রায়ই অভি নিজের খুটখাট ঝামেলাপূর্ণ কাজগুলো সারিয়ে নেয়।
– কিরে, তুই হঠাৎ?
এত রাতে অভির ফোন পেয়ে একটু অবাক হয় তমাল।
– একটা কাজের জন্য তোকে ফোন দিলাম।
– তা তো অবশ্যই! আমি তো আর তোর গার্লফ্রেন্ড না যে রাত বিরাতে আমার সঙ্গে প্রেম আলাপ করতে কল দিবি।
– তাও ঠিক! তবে তোর সঙ্গে কোন কাজ ছাড়া গাল-গল্প দিতে বোধহয় শুধু আমিই কল করি।
তমাল এবার লজ্জিত কন্ঠে বলে,
– হক কথা! এটা তুই সত্য বলছিস! যাই হোক, কি করতে পারি তোর জন্য?
– আমি তোকে তিনটা ভয়েস মেসেজ পাঠাচ্ছি। ভয়েস মেসেজগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ডের শব্দ এবং কথাগুলোকে হাইলাইট করে তুই আমাকে পাঠাবি। পারবি না?
– হুর, এইটাতো দুই মিনিটের কাজ। তুই নিজেই তো পারিস।
– পারি, কিন্তু আমার হাতে এখন অনেক কাজ জমে আছে। তুই একটু করে দে। আজ রাতেই আমাকে পাঠাবি কিন্তু!
– ঠিক আছে তুই পাঠা, আমি দেখছি।
মেসেজগুলো তমালকে পাঠিয়ে দিয়ে অভি নিজের কাজে মনোযোগ দেয়। কিন্তু দশ মিনিট যেতে না যেতেই তমাল আবারো কল দেয়।
– আব্বে হা*লা করছিস কি! তুই কি পাঠাইছিস এগুলা?
– কেন, কি হয়েছে?
– তুই নিজে শুনছিস মেসেজগুলো?
– হ্যাঁ শুনেছি তো।
– তারপরেও এমন স্টাইল মাইরা জবাব দিতেছিস? আরে এইগুলো তো কাউকে ব্ল্যাকমেইল করে পাঠানো মেসেজ।
– বললাম তো জানি।
– কার মেসেজ, তুই কোত্থেকে পেলি? এগুলা পুলিশরে জানাইছিস?
– এই মেসেজ আমার না। এই কাজটা আমাকে অন্য একজন করতে দিয়েছে। যে করতে দিয়েছে ব্যাপারটা তাদের ব্যাপার। আমাকে শুধু এই কাজটা করতে হবে।
– দোস্ত , পুলিশি ঝামেলা… আমাদের এগুলা করা উচিত?
– গাধার মত কথা বলবি না! আমরা এই মেসেজ দিয়ে এমন কি করছি? জাস্ট মেয়েটাকে একটু সাহায্য করছি এইতো! তুই তোর মাথায় এসব আলগা ফ্যাকড়া ঢুকাস না তো। তোকে যা করতে বলেছি করে দে।
– দোস্ত, আমি তোরে যতটুকু চিনি তাতে বুঝি এইসব ঝামেলার কাজ তুই কখনো নিস না। এইটা নিলি কেন, সত্যি করে বল।
তমাল সন্দিহান কন্ঠে জানতে চায়।
– কি আজব! কখনো নেই না, এইবার নিলাম। তাতে সমস্যা কি?
– বদলে তোরে কি দিব, টাকা পয়সা?
– না, তেমন কোন ডিল হয় নাই।
– তাইলে কিসের আশায় এমন ভেজাইলা কাজ কাঁধে নিয়েছিস? বদলে কি ওই মেয়ে তোরে চু*ম্মা দিব?
অভি এবার মজা করে বলে,
– দিতেও পারে!
– মানে কি? যেই মেয়েরে ব্ল্যাকমেইল করা হইতেছে সেই মেয়ে কি তোর গার্লফ্রেন্ড নাকি?
– আরে কি অদ্ভুত! আমার গার্লফ্রেন্ড থাকলে তুই জানতি না?
– তাইলে কিসের আশায় এইসব ঝামেলার কাজ তুই নিছিস, সত্যি কইরা বল?
অভি এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে,
– সত্যি যদি শুনতে চাস তাহলে ক্লিয়ার করেই বলি, এই কাজটা আমাকে যেই মেয়েটা দিয়েছে মেসেজগুলো তারও না। সে তার পরিচিত কারো কাছ থেকে পেয়েছে এই মেসেজ। তবে আমি এই মেয়েটাকে সাহায্য করতে চাইছি। কারণটা কি সেটা আমি নিজেও জানিনা।
– মানে কি, তুই ওই মাইয়ার প্রেমে পড়ছিস?
– সত্যি বলতে, আমি এখনো বুঝতে পারছি না ঘটনা কি। তবে মনে হয় তেমন কিছুই হবে।
তমাল এবার উৎফুল্ল কন্ঠে বলে,
– হইছে না কাম!
অভি একহাতে নিজের হৃদয়ে আলতো চাপড় দিয়ে বলে,
– কাম হয় নাই দোস্ত, হইছে আকাম!
অভির কথায় তমাল গলা ছেড়ে হাসে।
***
রাত একটা…
ঘুমের মাঝে পানির জন্য বেড সাইড টেবিল হাতড়ান আনোয়ারা। কিন্তু মাথার কাছে রাখা জগে এক ফোঁটা পানি নাই দেখে মূহুর্তেই ঘুমটা চটে যায় তার। প্রতি রাতে বেড সাইড টেবিলে জগ ভর্তি পানি রাখতে হয় এটা রুচিতাকে হাজার বার বলার পরেও প্রায়ই সে এই কাজটা করতে ভুলে যায়। আনোয়ারার রাতে বেশ কয়েকবার উঠে পানি খেতে হয়, নয়তো গলা শুকিয়ে একেবারে কাশ শুরু হয় তার।
পাশে ঘুমন্ত স্বামীর দিকে তাকিয়ে আপন মনে গজগজ করেন আনোয়ারা,
– সব আমারই করতে হয়। সামান্য একটা পানির জগ তাও আমি খেয়াল না করলে কেউ একটু খেয়াল করে ভরেও আনতে পারে না। ব্যাস,বিছানায় শোয়া মাত্র ভোম্বলের মতো ভোসভোস করে নাক ডেকে ঘুম শুরু! আরে বাবা নিদেন পক্ষে পানিটুকু তো একটু খেয়াল করে নিজ গরজে জগে ভরতে পারো! হায়রে কপাল আমার!
ডাইনিং থেকে পানি খেয়ে জগ ভরে বিছানায় এসে শুয়ে বুঝতে পারেন ঘুম তার চোখ থেকে পালিয়েছে। এমনিতেই এই বয়সে সহজে ঘুম আসে না, তার উপর ঘুম থেকে উঠে হাঁটাহাঁটি করার কারণে ঘুমটা একেবারেই কেটে গেছে তার। আনোয়ারা বিছানায় খানিকক্ষণ এপাশ ওপাশ করে শেষে বিরক্ত হয়ে বিছানা ছাড়েন। মোবাইল হাতে বারান্দায় এসে ইজি চেয়ারে বসেন। মনের মতো দুই একটা নাটক দেখলে অনেক সময় ঘুম চলে আসে। ভাবতে ভাবতে খেয়াল করেন হোয়াটসঅ্যাপে একটা ভিডিও মেসেজ এসেছে। তার এক খালাতো ভাই কানাডা থাকেন, তিনি মাঝে মাঝে তার নাতির কিছু ভিডিও তাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। এ ছাড়া অন্য কেউ তো নাই ভিডিও মেসেজ পাঠাবার মত। তাছাড়া নাম্বারটাও অপরিচিত। ভিডিওটা দেখবেন কি দেখবেন না তাই নিয়ে একটু দোটানায় ভোগেন আনোয়ারা। আজকাল নাকি মোবাইলে কি সব লিংক আসে, তাতে চাপ দিলেই বলে মোবাইলের সব তথ্য পাচার হয়ে যায়। যদিও আনোয়ারার মোবাইলে নেবার মতো তেমন কিছুই নেই তবু তার বুক কাঁপে। কিন্তু শেষমেষ কৌতুহল জয়ী হয়।
ভিডিওটা অন করে প্রথমে বুঝতেই পারেন না তিনি কি দেখছেন। কিন্তু একটু পরেই আনোয়ারার জ্ঞান হারাবার দশা হয়। ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে সে কি সত্যিই তার ছেলের বউ রুচিতা? কোন সাহসে বিবাহিত হবার পরেও এভাবে অর্ধন*গ্ন হয়ে সে ভিডিও তৈরি করেছে পর পুরুষের সাথে? আর তাকেই বা এগুলো কে দিল? আনোয়ারার শরীর ঘামতে শুরু করে, ঘৃণায় লজ্জায় আনোয়ারার ইচ্ছা হয় গলা ছেড়ে কাঁদতে। তার স্বামীকে সে কতবার বলেছিল শফির জন্য এত শিক্ষিত মেয়ের দরকার নেই। তার সহজ সরল ছেলের জন্য একটা সহজ সরল কম পড়াশোনা জানা মেয়ে হলেই হবে। কিন্তু তার স্বামী শুনলো কই? এই মেয়ে পড়াশোনার জন্য মেয়েদের হোস্টেলেও থেকেছে। সুতরাং এর এমন ইতিহাস থাকা অসম্ভব কিছু নয়। আনোয়ারা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। নাহ্, রাত যতই হোক আজ এর একটা ফয়সালা না করে তিনি ছাড়বেন না।
আনোয়ারা শফির ঘরের সামনে এসে দেখেন শফির ঘরের আলো জ্বলছে। তার মানে এরা এখনো জেগেই আছে? আনোয়ারা দরজায় নক করে শফির নাম ধরে ডাকেন, কিন্তু বেশ কয়েকবার ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কোন সাড়া শব্দ মেলে না। আনোয়ারার তাতে রাগ আরো বাড়ে। সকাল থেকে ছেলেটা এমন ভাব করেছে যেন মেয়েটাকে সে সহ্যই করতে পারে না। অথচ কি সুন্দর এখন বউকে নিয়ে ঘরের দরজা আটকে বসে আছে। রাগে দরজায় টোকার বদলে জোরে জোরে চাপড় দেন তিনি। এবার তাকে অবাক করে দিয়ে পাশের গেস্টরুমের দরজা খুলে রুচিতা বেরিয়ে আসে।
– একি, তুমি এঘরে কী করছো?
রুচিতা তার জবাব না দিয়ে উল্টো জানতে চায়,
– কিছু লাগবে মা?
এদিকে দরজা খুলে শফিও বেরিয়ে এসেছে। এত রাতে আনোয়ারাকে দেখে সেও অবাক হয়।
– মা, তুমি এত রাতে?
রুচিতা আর শফিকে অবাক করে দিয়ে বলা নেই কওয়া নেই আনোয়ারা রুচিতার গালে সজোরে একটা চ*ড় বসিয়ে দেন। রাগে হিসহিসিয়ে বলেন,
– আমার ছেলে অসুস্থ, আর তাকে একা রেখে তুমি গেস্ট রুমে শুয়ে আছো? কি,স্বামীর সঙ্গে শুলে পর পুরুষের সঙ্গে রং ঢং করতে পারবে না মোবাইলে সেই জন্য ,তাই না?
রুচিতা চ*ড় খেয়ে এতটাই হতভম্ব হয়ে গেছে যে আনোয়ারার কথার কোন অর্থই সে ধরতে পারেনা, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এদিকে তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আনোয়ারার রাগ সপ্তমে চড়ে। তিনি আবারও রুচিতাকে মা*রতে উদ্ধত হন হাত উঠিয়ে,
– কথা বলো না কেন? ভাব ধরেছো ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানো না?
কিন্তু দ্বিতীয়বার মা*রার আগেই শফি তার হাত ধরে ফেলে।
– আহ্, মা! কি হচ্ছে এসব?
– তুই জানিস না শফি, এই মেয়েটা কত বড় শয়তান! এই বদমাইশ আমাদের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে পর পুরুষের সঙ্গে রঙ্গ লীলা চালাচ্ছে। বিশ্বাস না হলে আমার কাছে ভিডিও আছে, দেখাতে পারবো। তুই সহ্য করতে পারবি না শফি, তুই ভাবতেও পারবি না এই মেয়ে কত খারাপ!আরে আমার তো এখন ভাবতেই লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে যে এর হাতের খাবার আমি তিন বেলা খাই।
রুচিতা এবার বিস্মিত কন্ঠে বলে,
– এসব কি বলছেন মা? আমি কী করেছি? কিসের ভিডিও?
– ওহ্,ন্যাকা! জানতে চাস কিসের ভিডিও?
আনোয়ারা নিজের মোবাইলে ভিডিওটা চালু করে সেটা এগিয়ে ধরে ওদের দুজনের মুখের সামনে। মার মোবাইলে ভিডিওটা দেখে আঁতকে উঠে শফি। গতকাল গভীর রাতে তার কাছে মেসেজ এসেছিল আরো একটা। তাতে বলা হয়েছিল, সে বাড়ি ফিরে যদি সঙ্গে সঙ্গে রুচিতাকে ত্যাগ না করে তাহলে ফলাফল ভয়ংকর হবে। বাড়ি ফিরে শফি এ ব্যাপারে আজ সারাদিনে রুচিতার সঙ্গে চেয়েও আলাপ করতে পারেনি। ভেবেছিল ধীরেসুস্থে আগামীকাল সকালে তার সঙ্গে আলাপ করে একটা ফয়সালা করবে। কিন্তু তার আগেই যে তার মায়ের কাছে এমন মেসেজ চলে আসবে স্বপ্নেও ভাবেনি সে।
এদিকে রুচিতা অবিশ্বাস ভরা চোখে মোবাইলে চালু ভিডিওটার দিকে তাকিয়ে আছে। সে আনোয়ারার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে নেয়। ভিডিওতে চোখ রেখেই হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
– বিশ্বাস করেন মা, এটা পুরোপুরি সত্য না।
– মানে তুমি বলতে চাও এই ভিডিও তোমার না?
– এই ভিডিও আমার… কিন্তু এমন না!
রুচিতা থেমে থেমে জবাব দেয়।
– এমন না মানে কী? আমার সাথে বাটপারি করো? এখনই তুমি আমার বাড়ি থেকে বিদায় হও, ন*ষ্টা মেয়ে মানুষ কোথাকার!
– আহ্ মা, কি বলছো এসব? এত রাতে ও কোথায় যাবে?
মায়ের হইচই এ ভীষন বিরক্ত বোধ করে শফি।
– সেটা আমি জানি না। দরকার হলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে তবু আমার বাড়িতে এমন ন*ষ্ট মেয়েছেলের কোন স্থান হবে না।
এদিকে হইচই চেঁচামেচি শুনে ততক্ষণে মনির সাহেব এবং অভি দুজনেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। মনির সাহেব স্ত্রীকে প্রায় ধমকে বলেন,
– হচ্ছে কি এসব? রাত বাজে একটা, এখন বাসার ভেতর এমন মাছের বাজার বসিয়েছো কেন?
– বাজার বসিয়েছি কারণ বাসায় এখন বাজারের মেয়ে মানুষ তুলে এনেছো তুমি। জিজ্ঞাসা কর… তোমার প্রিয় বৌমাকেই জিজ্ঞাসা করো না ব্যাপার কি? আল্লাহ গো!এই মেয়ের জন্য আমার মান সম্মান কিছুই রইল না! আমার তো এখন মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
– মা, কি হয়েছে একটু পরিষ্কার করে বলবে?
অভি তার মায়ের এমন খামখেয়ালিপূর্ণ চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে উঠেছে।
আনোয়ারা এবার রুচিতার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলে,
– এই মেয়ের বা*জে ভিডিও আমার মোবাইলে কে যেন পাঠিয়েছে। এত নোং*রা ভিডিও অন্য পুরুষের সঙ্গে… আমি তোদের বলে বোঝাতে পারবো না অভি!আমার বলতেও লজ্জা হচ্ছে! তোদের আমি দেখাতে পারবো না, তোরা শুধু জেনে রাখ এই মেয়ে আমাদের মান সম্মান সব নষ্ট করেছে। এমন একটা নোং*রা ভিডিও হাতে পেয়েছি যেটা তোদের দেখাতেও পারছি না। এই মেয়ে আমার বাড়িতে থাকলে আমি আর এই বাড়িতে থাকব না বলে দিলাম। এক্ষুনি বের কর একে।
আনোয়ারা বিশ্রীভাবে সুর করে কাঁদতে শুরু করেন।
স্ত্রীর এমন ছেলে মানুষীতে মনির সাহেব কতটুকু কি বুঝতে পারলেন বোঝা গেল না। তবে তিনি এবার গর্জে ওঠেন,
– কি হয়েছে না হয়েছে ঠিকমতো না জেনেই চেঁচামেচি করার বাজে অভ্যাস হয়ে গেছে তোমার আনোয়ারা। সামান্য বিষয় পেলেই হয়েছে চেঁচামেচি জুড়ে দাও, রাত দিনের খেয়ালও থাকে না তোমার!
– সামান্য বিষয়? দেখবে? দেখবে তুমি ভিডিওটা?
– কোন ভিডিও আমি এত রাতে দেখতে চাইছি না। যা বলার বা দেখার সেটা সকালে হবে। তাছাড়া এত রাতে এই মেয়েটাকে আমি কিভাবে বাড়ি থেকে বের করে দেই? তোমার মাথা আসলেই খারাপ হয়ে গেছে!
– বাবা ঠিকই বলেছে মা। সকালে ঠান্ডা মাথায় সব শুনে তারপর ফয়সালা করা যাবে। এখন দয়া করে শুতে যাও, চেঁচামেচি করো না।
অভির রাগত চেহারার দিকে তাকিয়ে আনোয়ারার আর চেঁচামেচি করার সাহস হয় না। অভি এমনিতে শান্ত প্রকৃতির তবে রেগে গেলে অন্য মানুষ। তাই আনোয়ারা তার নাটকের সেখানেই সমাপ্তি ঘটান। মনির সাহেব স্ত্রীকে রীতিমতো পাকড়াও করে ঘরে নিয়ে দরজা আটকে দেন শোবার ঘরের।
এদিকে এতক্ষণের হইচই এ শফি একবারের জন্যও রুচিতার ওপর থেকে চোখ সরায়নি। আনোয়ারা চলে যেতে সেও একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে রুচিতার মুখের ওপর দরজা আটকে দেয়।
এখন শুধু অভি আর রুচিতা দাঁড়িয়ে। রুচিতার চোখে মুখের হতভম্ব ভাবটুকু বেশ পড়তে পারে অভি। আনোয়ারা রুচিতার কাছ থেকে তার মোবাইলটা নিতে ভুলে গেছেন। রুচিতা এখনো সেটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বোকার মত। অভি পুরো ঘটনাটা বোঝার জন্য জানতে চায়,
– ভাবী, ভিডিওটা আমি দেখতে চাই না। শুধু জানতে চাই এর সত্যতা কতটুকু?
রুচিতা এলোমেলো চোখে চেয়ে বলে,
– বিশ্বাস করো… ভিডিওটা সত্যি, কিন্তু পুরোটা নয়! মানে আমি আসলে তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারবো না। আমি নিজেও ঠিক বুঝতে পারছি না এমনটা কিভাবে হল!
রুচিতার কথায় অভি নিজেও কিছুটা বিভ্রান্ত বোধ করে। তবে রুচিতার জন্য তার খারাপ লাগছে। পুরো বাড়ির মানুষ একটা মানুষের বিপরীতে চলে গেলে সেই মানুষটা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তাই সে রুচিতাকে আশ্বস্ত করতে বলে,
– আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি এক কাজ কর মা’র মোবাইল থেকে ভিডিওটা তোমার মোবাইলে শেয়ার করে নাও। আর নাম্বারটাও টুকে রাখো। তারপর মা’র মোবাইল থেকে ভিডিওটা ডিলিট করে ফেলো। তার মাথার ঠিক নেই, কোথায় কখন কাকে আবার শেয়ার করে বসে বলা যায় না। তুমি আপাতত গিয়ে শুয়ে পড়ো। যা বলার সকালে শোনা যাবে।
রুচিতাকে শুতে পাঠিয়ে দিয়ে অভি নিজের ঘরে চলে আসে। পুরো ব্যাপারটায় তার অসম্ভব বিরক্ত লাগছে। সবচেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে শফির উপর। শফির উল্টোপাল্টা ব্যবহারের কারণ এখন তার কাছে স্পষ্ট।তার মানে গত কয়েক দিন ধরে তার ভাই নিজের স্ত্রীর সঙ্গে যে এমন দুর্ব্যবহার করছে তার কারণ হচ্ছে ওই ভিডিও। কেননা শফির মুখ দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছিল যে এই ভিডিওটা সম্পর্কে সে আগে থেকেই জানে।আর জানে বলেই তার মা যখন চেঁচামেচি করছিল সে সময় সে একেবারে শান্ত ছিল।
রুচিতার ভাষ্যমতে ভিডিওটা পুরোপুরি সত্যি নয়। আর তাই যদি হয় তবে ঘটনার সত্যতা জানতে অভিকে সেই ভিডিওটা দেখতে হবে। কিন্তু নিজের ভাইয়ের বউয়ের আপ*ত্তিকর ভিডিও কিভাবে দেখবে সে? যাচাই বাছাই তো দূরের কথা। অভির ভীষণ অস্থির লাগে। কি হচ্ছে এসব? কে বা কারা এসব করছে? ওদের পরিবারে ঝামেলা বাড়িয়ে তাদেরই বা লাভ কোথায়? শফির কাছে এ ব্যাপারে ঠিক কি ধরনের মেসেজ এসেছে সেটাও জানতে হবে তার। কেউ কি শফিকে ব্ল্যাকমেইল করছে এসব ভিডিও পাঠিয়ে? কিন্তু তাতে লাভ?
সকালে অফিস আছে, তার উপর বেশ কিছু কাজ জমে আছে হাতে। তাই না চাইতেও ল্যাপটপটা নিয়ে বসে অভি। কিন্তু কাজ আগায় না, শুধুই বোকার মত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আকাশ কুসুম ভাবতে থাকে সে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আনোয়ারার চোখ কপালে ওঠে। সকাল আটটা বাজে! এত দেরি করে কখনোই ঘুম ভাঙ্গে না তার। কাল ঘরে আসার পরেও বেশ অনেকক্ষণ জেগে ছিলেন তিনি।রাতে ঘুমাতে দেরি হওয়াতেই বোধ হয় উঠতে দেরি হল। এদিকে সকাল নয়টায় অফিসের জন্য বেরিয়ে যায় অভি। কে জানে, রুচিতা নাস্তা বানাতে উঠেছে কিনা কাল রাতের এত নাটকের পর!
তাড়াতাড়ি উঠে বাথরুম থেকে হাত মুখ ধুয়ে বেরিয়ে আসেন আনোয়ারা। কিন্তু রান্নাঘরে এসে দেখেন সবকিছু একদম গোছানো। তার মানে সকালে রান্না ঘরে কেউ ঢোকেনি। গতকালের দমিয়ে রাখা রাগটুকু আবারো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তার ভেতর। মেয়েটা তাহলে এভাবে প্রতিশোধ নিচ্ছে? কাল রাতে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলেছেন বলে আজ সকালে দিব্যি তার বাড়িতেই দরজা আটকে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে বেলা অবধি? উহু, এত আরাম তাকে দেয়া যাবে না। এত কিছুর পরেও এই বাড়িতে যে তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে সেটাই তার সাত কপালের ভাগ্য!
আনোয়ারা ত্রস্ত পায়ে গেস্ট-রুমের দিকে যান। রুমের দরজা হা করে খোলা দেখে একটু অবাক হন তিনি। ঘরে ঢুকে দেখেন রুম ফাঁকা, কোথাও রুচিতা নেই। বিছানায় তার মোবাইলটা পড়ে আছে, সঙ্গে একটা কাগজ। তাতে লেখা…
” আপনার কথাই রইলো, মা। চলে গেলাম। তবে হারবো না অবশ্যই। এই ভিডিওটার সত্যতাটুকু আপনাদের জানাতে ফিরব। আমার জন্য আপনারা যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলায় পড়েছেন তার জন্য সত্যি দুঃখিত!”
চিঠি হাতে আনোয়ারা পুরোই বেকুব বনে যান। কোথায় তিনি ভেবেছিলেন সকালে সবার সামনে রুচিতাকে দোষী সাব্যস্ত করে বাড়ি থেকে বিদায় করবেন। অথচ দেখা যাচ্ছে রুচিতা নিজেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে কাউকে কিছু না জানিয়েই। আনোয়ারা তবু পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খোঁজেন ছেলের বউকে। কিন্তু কোথাও নেই রুচিতা! সত্যি সত্যি সে বাড়ি থেকে চলে গেছে কাউকে কিছু না জানিয়ে। চুপি চুপি… একাকী।
চলবে।