Home "ধারাবাহিক গল্প সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব-১+২

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব-১+২

0
1084

#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#সূচনা_পর্ব

দরজার অপরপ্রান্তে দন্ডায়মান প্রাক্তন স্বামীকে দেখে হতচকিত হয়ে গেলাম আমি। শুনেছি প্রাক্তনদের দেখলে নাকি বুকের ভেতরের হৃদপিন্ডটায় আলাদা একটা অনুভুতি হয়, রোমন্থনের। অথচ আমি নিজের মাঝে বিশেষ কিছু অনুভব করলাম না, শুধুমাত্র বিস্ময় ছাড়া। ডিভোর্সের এক বছর দুই মাস বাদে একেবারে অপ্রত্যাশিত এই সাক্ষাৎ আমায় ক্ষণিকের জন্য বাকরুদ্ধ করে দিলো।

“ আপনার ডেলিভারি, স্যার।”

বুঝেশুনে ওঠার আগেই তপ্ত মস্তিষ্কের প্ররোচনায় উচ্চারণ করে বসলাম। মানুষটা নিজের চশমার লেন্সের ভেতর থেকে একেবারে নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে আমায় দেখলো। আপাদমস্তক ঘুরপাক খেলো ওই গভীর বাদামী মণিজোড়া। নয়নদ্বয়ের মাঝে নির্বিকার শীতলতা বাদে কিছুই নেই। যেমন ছিলোনা আগেও। আজ আমি নতুন করে আবারও টের পেলাম, মানুষটা একটুও বদলায়নি।

দুহাত বাড়িয়ে আমার হাত থেকে পিৎজার বক্সগুলো নিলো সে। সামান্য আঙুলের ছোঁয়া লাগতেই অকারণে খানিক শিউরে উঠলাম আমি। অথচ সে একেবারেই শান্ত। তাকে দেখলে আমার সবসময় মনে হতো, যেন দুচোখ ভরে এক সুগভীর নীল প্রশান্ত সাগরকে দেখছি।

“ ২ হাজার ৮০০ টাকা, ক্যাশ অন ডেলিভারি স্যার। ”

আমার গলাটা এবার কেমন যেনো ভারী শোনালো। কিসের কারণে এই ভারত্ব, বুঝে উঠতে পারলাম না। মানুষটা চুপচাপ নিজের পকেটে হাত গুঁজলো। ওয়ালেট থেকে তিনটি এক হাজার টাকার নোট বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

“ কিপ দ্যা চেঞ্জ। ”

বহুদিন বাদে শোনা কণ্ঠটির মাধুর্য্য উদযাপন করতে পারলাম না। দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসা পুরুষালী হাসাহাসির আওয়াজে সেটি খানিক চাপা পড়ে গেলো। টাকাটা হাত বাড়িয়ে নেয়ামাত্রই উল্টো ঘুরল সে। চুপচাপ ভেতরে ঢুকে দরজাখানি আটকে দিলো। আর একটিবার ফিরেও দেখলোনা আমায়।

বোকার মতন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আহাম্মক আমি! কি আশা করছিলাম? হয়ত সে জিজ্ঞেস করবে, আমি কেমন আছি? সেই প্রশ্ন করার কোনো কথাই তো ওঠেনা। আজও স্পষ্ট মনে আছে আমার। এই আমিই সেদিন তার দিকে বিতৃষ্ণাভরে তাকিয়ে বলেছিলাম, “ আজকের পর থেকে আমরা একে অপরের কাছে অপরিচিত।”

সে তো আমার কথাই রেখেছে। একজন অপরিচিত মানুষের তো আমায় জিজ্ঞেস করার কথা নয় আমি কেমন আছি। তবুও এই বেহায়া অন্তরটার এত চাহিদা কিসের?

একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে টাকাগুলো পকেটে ভরলাম। অতঃপর চুপচাপ লিফটে ঢুকে গ্রাউন্ড ফ্লোরের বোতাম চাপলাম। সামান্য দুলে উঠে লিফট নিচে নামতে লাগলো। দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। একদমই স্বাভাবিকভাবে। তারপর একদম হঠাৎ করেই আমার কি যেনো হয়ে গেলো। চোখ দুটো জ্বলতে জ্বলতে ঝাপসা হয়ে উঠলো। অনুভব করলাম, আমার দুই গাল উপচে পানি গড়াচ্ছে টপটপ করে। শরীরটা থেকে থেকে কাঁপছে। হাঁটুর জোর কমে এলো। ধপাস করে লিফটের মেঝেতেই বসে পড়লাম। তারপর যা হলো তা আমার সঙ্গে বিগত এক বছরেও হয়নি।

কাঁদলাম খুব। একেবারে ডুকরে কান্না যাকে বলে। মুখ চেপে ধরলাম নিজের, শব্দ নিবারণে। অশ্রুর বাঁধ ভেঙে বিষাদটুকু ঝরতে লাগলো। গলা ভিজিয়ে পৌঁছে গেলো টি শার্টের ভেতরের বুক অবধি। এ কিসের কান্না আমার জানা নেই। কিন্তু এটুকু আমার অন্তর জানে, সত্যিই একটু প্রাণ উজাড় করে কাঁদা প্রয়োজন।

“ আফামণি আফনার কি হইসে? ”

প্রশ্নটি কানে যাওয়ার পরেই টের পেলাম, লিফট গ্রাউন্ড ফ্লোরে পৌঁছে গিয়েছে। দরজা খোলা। ওপাশে উদ্বিগ্ন দারোয়ান তাকিয়ে আছে। অতি ক্ষীপ্রতায় পরনের ইউনিফর্ম জ্যাকেটের হাতায় চোখমুখ মুছে নিলাম। উঠে দাঁড়ালাম। ভারসাম্যহীন পদক্ষেপে হেঁটে বাইরে পৌঁছেই শক্ত কন্ঠে জবাব দিলাম,

“ কিছু না।”

দ্রুত পায়ে গ্রাউন্ড ফ্লোর পেরিয়ে গেটের ওপাশে পার্ক করে রাখা স্কুটিতে চেপে বসলাম। পিছনে এখনো বেশকিছু পিৎজা বক্স রাখা আছে। আরো দুইটি জায়গায় ডেলিভারি দেয়া বাকি। ইগনিশনে চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিয়ে একনজর অভিজাত সুউচ্চ বিল্ডিংটির দিকে তাকালাম। আমার নজর আটকালো ঠিক বারো তম তলায়। আমি জানি, সে ওখানে থাকেনা। আমার কাছে অর্ডার এসেছিলো ভিন্ন একটা নামে। হয়ত কোনো বন্ধু? বন্ধুমহল একসাথে হলে পিৎজাপার্টি বাঞ্ছনীয়।

অপেক্ষা করলাম না আর, স্কুটি ছুটিয়ে চললাম ঢাকা শহরের রাজপথ ধরে।

সকল ডেলিভারি শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত আটটা মতন বেজে গেলো। সাপ্তাহিক বাজার শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেটাও করে আসতে হয়েছে। ব্যাগে দুটো তেলাপিয়া মাছ এবং হাফ ডজন ডিম নিয়ে যখন দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম তখনি ভীষণ উত্তেজিত কন্ঠস্বরটি অত্যন্ত জোরে কানে বেজে উঠলো।

“ হ্যাপি বার্থডে মাই ডিয়ার সাবিন! ”

আধো আলো আধো অন্ধকারের মাঝে খানিক ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠলাম। খেয়াল করতেই চোখে ভাসলো আমার রুমমেটের শাড়ী পরনে অবয়ব। হাতে এক পাউন্ডের একটি ছোট কেক, তাতে জ্বলন্ত মোমবাতি। হলুদাভ আভায় মেয়েটিকে অনন্যসুন্দরী দেখাচ্ছে। ধড়ফড় করতে থাকা বুকে হাত চেপে আমি হতবাক কন্ঠে বলে উঠলাম, “ মীরা! ”

মীরা শুধুমাত্র আমার রুমমেট নয়। জীবনের একমাত্র বান্ধবী বটে। একমাত্র কেনো, তার ইতিহাস আরেকদিন স্মরণ করা যাবে নাহয়। আমার বিস্মিত মুখ দেখে ভীষণ মজা পেয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো মীরা। রুমের লাইট জ্বালিয়ে এক হাতে আমার কাছ থেকে বাজারের ব্যাগ কেড়ে মেঝেতে রেখে আবার কেক নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো। দ্বিতীয় দফায় শুভেচ্ছা জানালো।

“ শুভ জন্মদিন দোস্ত। ”

অজান্তেই ক্যালেন্ডারের দিকে চোখ গেলো আমার। আজ ২ নভেম্বর। নিজেরই নিজের জন্মদিনের কোনো হিসাব ছিলোনা। অথচ এই মেয়েটা, কিভাবে স্মরণ রেখেছে? আমি কি কোনোদিন ওকে নিজে থেকে বলেছি? না তো। তবে কি আমার বার্থ সার্টিফিকেট দেখেছিলো কখনো? মনে করতে পারলাম না। স্থবির হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম। মীরা ভ্রু দুলিয়ে এক হাতে আমার গাল চাপড়ে বললো,

“ কি? হাবাগোবার মতন চেয়ে আছিস কেন? হাতে কি টাইমড বম্ব ধরে রেখেছি মনে হচ্ছে? ”

প্রতিক্রিয়া জানাতে পারলাম না। এর আগেই মীরা আমাকে টেনে ভেতরে নিয়ে গেলো। রুমের একমাত্র ছোট্ট ডাইন ইন টেবিলটায় কেক রাখলো। প্রসারিত দৃষ্টিতে দেখলাম, শুধুমাত্র কেক নয়। আমার প্রিয় খিচুড়ি, কালাভুনা এবং পায়েশ তৈরি করা হয়েছে। মীরা ঢাকা ভার্সিটির ছাত্রী। তার উপর নিজের একটা অনলাইন কেক বিজনেসও আছে মেয়েটার। এতকিছু সামলে এসব সে কখন তৈরি করেছে ভেবে উত্তর পেলাম না।

“ এসব….কেনো মীরা? আমি…মানে…”

“ হুশ। একদম চুপ। ঘেমে নেয়ে মুখের যা ছিরি করেছিস! যাহ, মুখ হাত ধুয়ে একটা সুন্দর জামা গায়ে দিয়ে আয়। ”

“ কিন্তু….”

“ তুই যাবি নাকি রান্নাঘর থেকে ঝাঁটাটা আনবো? ”

ফিক করে হেসে ফেললাম। মীরা এমনিতে শান্ত শিষ্ট লেজবিশিষ্ট প্রজাতির মেয়ে। শুধু আমার সাথেই তার ভেতরের শয়তানি রূপটা বেরিয়ে আসে। এমন শয়তানকে উস্কানি না দেয়াই শ্রেয়। তাই দ্রুত ওয়্যারড্রব থেকে একটা ফ্রক টেনে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলাম।

একদম সংক্ষিপ্ত একটা গোসল সেরে গামছায় চুল মুছতে মুছতে যখন বেরোলাম, তখন মীরা সবকিছু তৈরি করে ফেলেছে। মেয়েটার মুখশ্রী ভীষণ সুন্দর। খানিকটা উপন্যাসে বর্ণনা করা নায়িকা চরিত্রদের মতন। উজ্জ্বল ফর্সা ত্বক এবং গোলাপী ঠোঁটের ডগায় কুচকুচে কালো তিল। হাজার খুঁজলেও চেহারায় খুঁত খুঁজে পাওয়া যাবেনা। আজ পরনের সবুজ শাড়ীতে তাকে মানিয়েছে বেশ। আমাকে দেখেই আরেক দফায় উৎফুল্ল এক হাসি উপহার দিলো মীরা। তারপর টেনে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসালো।

“ কেক গলতে শুরু করেছে। ধর ধর কাট, ফু দে একটা জোরসে। ”

ফু দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে কেক কাটতেই হাততালি দিয়ে জন্মদিনের সঙ্গীত গাইতে আরম্ভ করলো মীরা। গলা ধরে এলো আমার। বহু কষ্টে ভেতরের বিষাদঘূর্ণিকে আটকে রাখলাম। শেষ কবে আমার জন্য কেউ এমনটা করেছিল? মনে করতে পারলাম না। পেয়েছিলাম আমি অনেক কিছুই। তবে এমন স্বচ্ছ মনের একটা মানুষ আমার কোনোদিন ছিলোনা। আগে বুঝতে না পারলেও বর্তমানে আমি তা বুঝতে পারি।

আমাকে কেকের পিস খাইয়ে দিতে দিতে ঘ্যাচাং করে বেশ কতক সেলফি হাতিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো মীরা।

“ একটা বাঁধাই করে আমাদের বাসার মেইন দেয়ালে টাঙিয়ে রাখবো। কিছুদিন আগেই একটা ফটোফ্রেম পেইজ থেকে পি আর পাঠাতে চেয়েছে, কাস্টোমাইজ করে নেবো একদম, কি বলিস রে সাবিন? ”

কোনো জবাব না পেয়ে মেয়েটা অবশেষে ঘুরে তাকালো। তখনি দুচোখ মেলে দেখলো আমার নয়ন ভরা অশ্রু। টপটপ করে গড়াচ্ছে না। চরম অবাধ্যতায় সেসব আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু আমার প্রাণের মীরার বুঝতে আর কিছুই বাকি রইলোনা। সবকিছু ফেলে সে দুহাতে আমাকে আগলে নিলো বুকের মাঝে। জড়িয়ে ধরলাম তাকে আমি, যতটা জোরে সম্ভব। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। আজ একটামাত্র দিনে এই আমার দ্বিতীয় কান্না। জন্মদিনটা কি তবে অশুভ?

মীরার সকল প্রফুল্লতা হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে গিয়েছে। মুখজুড়ে এখন ভয়ানক চিন্তার বসবাস। আমার পিঠে হাত বুলিয়ে নরম গলায় সে শুধালো,

“ দোস্ত। কি হয়েছে রে? আমার সাবিনটা এমন কাঁদছে কেনো? ”

নিজের সাবিন নামটা আমার খুব বেশি পছন্দ নয়। ছোটবেলা থেকে একটা টিপ্পনী শুনেই বড় হতে হয়েছে। এটা নাকি ছেলেদের নাম। আমার নামটা সাবিনা হওয়া উচিত ছিলো। অথচ মীরা যখন আমায় আদর দিয়ে ডাকে, তখন এই নামটাই আমার প্রিয় হয়ে ওঠে। কি স্নেহ আমার নামটায়!

“ আমাকে মাফ করে দে দোস্ত। তুই আমার জন্য এতকিছু করলি, অথচ তোকে ধন্যবাদটাও দিতে পারছিনা। আমার সবকিছু কেমন যেন লাগছে মীরা।”

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠলাম আমি। মীরা তাতে আমায় দ্বিগুণ শক্তিতে চেপে ধরলো। বললো,

“ তুই তো অনেক শক্ত মেয়ে সাবিন। কান্নাকাটি করা তো আমার স্বভাব ছিল রে। তবে আজ কেন তুই ভেঙে পড়ছিস পাগলি? তোর এমন ভঙ্গুর সত্তা দেখলে তো আমার ভয় করে। ”

মীরার কথা আমায় বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনলো। অশ্রু বিসর্জন বন্ধ হলো সহসাই। মীরার বুক থেকে মুখ তুলতেই নিজের আঁচল দিয়ে আমার ফুলে ওঠা চোখজোড়া মুছিয়ে দিলো সে। নিজেকে রুখতে পারলাম না আর। কান্না জড়ানো ভারী গলায় প্রায় ফিসফিস করে জানালাম,

“ ওকে দেখেছি আজ। ”

আমার কথাটা শুনতেই জমে গেলো মীরা। একনাগাড়ে শূন্য চোখে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপরই মেয়েটির ভ্রু জুড়ে ক্রোধের কুঞ্চন সৃষ্টি হলো।

“ কিঃ? ওই বদমাইশটাকে? জুতা খুলে পিটিয়েছিস কয়বার? থোতা মুখটা ভোঁতা করে দিয়ে আসিসনি? ”

আমার ঠোঁটে এক মলিন হাসি ফুটলো। মীরা নিজের আঁচল কোমরে বাঁধতে বাঁধতে খেঁকিয়ে উঠলো,

“ একবার বল শুধু ওই বজ্জাত তোকে কি বলেছে? ওটাকে কোথায় পাওয়া যাবে? গতকালকেই একজোড়া হিল জুতো নিয়েছি। একেবারে ঠেঙিয়ে ওটাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে ছাড়বো। ”

আমার হাসিটা আরো বিস্তৃত হলো। আমি জানি, মীরা সত্যিকার জীবনে সেটা কোনোদিনও করতে পারবেনা। মানুষের সামনে এ ভীষণ ভদ্র ও দূর্বল গোছের। ওর সব অনুযোগ – অভিযোগ এবং দুঃসাহস আমায় ঘিরে। তবুও ওর কথাগুলো কেমন যেন আমার বুকে এসে লাগলো। ধারালো তীরের ফলার মতন। আমি জানি, মীরা কিছুই জানেনা। অথচ আমার ভীষন খারাপ লাগলো।

আমার দোষের ঘানি অন্য একটা লোক কেনো টানবে? এই বোধটুকু আগে না থাকলেও এখন যথেষ্ট রয়েছে আমার। একটি নিঃশ্বাস ফেলে সরে দাঁড়ালাম তাই। টেবিল থেকে পায়েশের বাটিটা তুলে চামচ দিয়ে মীরাকে খাইয়ে দিলাম। মেয়েটি বাধ্য শিশুর মতন খেয়ে নিয়ে মহা বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলো। আমি দূর্বল হেসে বললাম,

“ মীরা। ওর কোনো দোষ ছিলোনা। ও নিতান্তই একজন ভালো মানুষ। একটু অতিরিক্ত ভালো। ”

এই প্রথম আমার বান্ধবী মীরা আমার কথার ধাঁধা সমাধান করতে অপারগ রইলো। আমিও এই ধাঁধার উন্মোচন ঘটাতে বিশেষ আগ্রহী নই। থাকনা অতীত, শুধু অতীত হয়েই।

■ ■ ⁠■ ⁠■

গুলশানের অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোতে একটা আলাদা ধরণের শান্তি বিরাজ করে। অন্যান্য এলাকার রেস্তোরাঁর মতন উচ্চ শব্দে হাসাহাসি – কোলাহল চলেনা। এখানে আগত মানুষগুলো অভিজাত গোছের। তারা কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী অধিক। বিনোদনের থেকে ব্যবসায় সময় ব্যয় করা শ্রেয় তাদের জন্য। তবে এই শান্ত পরিবেশ কেন যেন খুব একটা পছন্দ নয় আরওয়ার। সবকিছুই কেমন যান্ত্রিক লাগে। মানুষগুলো রোবটের মতন। আগাগোড়া আভিজাত্যে মোড়ানো। প্রাকৃতিক ছোঁয়া নেই। আছে অর্থের গৌরব এবং বংশপরম্পরায় অর্জিত সম্মান। এর চাইতে মিরপুরের রাস্তার ধারের টং দোকানগুলোর চিত্র বেশ উপভোগ্য লাগে। কি সুন্দর করে হাসে সবাই! রাজনৈতিক আলোচনা করে। তাই সতর্কবার্তা টাঙানো থাকে টংগুলোতে।

এখানে রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ।

আরওয়া আশপাশ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে বসে থাকা পুরুষ মানুষটাকে দেখলো। এই অভিজাত শ্রেণীর সদস্যদের থেকে ভিন্ন কিছুই মনে হচ্ছেনা তাকে। ধূসর রঙের ক্রপ স্যুট এবং ফরমাল পরনে। কোটের জ্যাকেটটা খুলে চেয়ারে ঝুলিয়ে রেখেছে। চোখে হালকা ফ্রেমের চারকোনা আকৃতির চশমা। ত্বক উজ্জ্বল না হলেও হালকা বাদামী বর্ণটা বেশ চোখে পড়ার মতো। ভিড়ের মাঝে দেখলে সবার আগে চোখে পড়ার মতন স্বাস্থ্যকর গড়ন। তবে আরওয়া রূপে বিশেষ আকর্ষিত নয়। এমন সুদর্শন চেহারা সে অহরহ দেখে অভ্যস্থ।

পুরুষটির উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আরওয়া নিজের হাতের ফাইলের দিকে মনোযোগ দিলো।

॥ নাম: জায়দান আরেফিন

বয়স: ৩২

পেশা: প্রফেসর অব কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট।

ম্যারিটাল স্ট্যাটাস: ডিভোর্সড, নো কিডস ॥

বায়োডাটার এই পর্যায়ে এসে থমকে গেলো আরওয়ার দৃষ্টি। প্রসারিত দৃষ্টি মেলে দেখলো সামনে বসে থাকা আগাগোড়া স্যুট টাইয়ে মোড়া পুরুষটাকে। পোশাক তার পানীয়ের মতোই রসকষহীন।

ব্ল্যাক কফি, নো সুগার।

“ ডিভোর্সড? ”

আরওয়া খানিক আগ্রহবোধ করে এই প্রথম প্রশ্ন ছুঁড়লো। জায়দান নামক পুরুষটি অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে হাত থেকে কফির মগ নামিয়ে টেবিলে রাখলো। চোখের চশমার লেন্সের আড়াল থেকে একজোড়া ঘোলাটে বাদামী দৃষ্টি চাইলো রমণীর পানে। ওই দৃষ্টিজুড়ে নির্লিপ্ততা।

“ যদি আপনার এতে সমস্যা থেকে থাকে তবে এই অ্যারেঞ্জমেন্ট আপনি এখনি ক্যান্সেল করতে পারেন।”

“ না না। আপনি ভুল বুঝছেন। ”

আরওয়া ভদ্রতাস্বরুপ একগাল হেসে আবারো বললো,

“ আমি শুধু জানতে চাচ্ছিলাম, আপনার প্রাক্তন স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্সের কারণটা কি? ”

জায়দান টানটান শিরদাঁড়ায় খানিকটা ঝুঁকে এলো টেবিলে। ওই ধারালো বাদামীর মাঝে হিমশীতল তীরের ফলা যেন, যা বিদ্ধ হলো রমণীর মনমাঝে।

“ কোনো কারণ নেই। আমি গীবত অপছন্দ করি। ”

“ মানে? ”

“ সকল প্রশ্নের উত্তর হয়না। ”

আরওয়া ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো। আজকের আগেও সে পারিবারিকভাবে ঠিক হওয়া এই সম্পর্কটাকে ভাঙার ১০১ টা উপায় ভেবে বের করে রেখেছিলো। অথচ আজ মানুষটার সামনে বসে তার মনে হলো,

অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ বোধ হয় সবসময় খারাপ হয়না।

#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২

🛑টক্সিক বিহেভিয়ার অ্যান্ড স্ল্যাং ল্যাংগুয়েজ অ্যালার্ট!

“ ছেলেটাকে কেমন লাগলো? ”

বাসার দরজা দিয়ে প্রবেশমাত্রই নিজের মায়ের মুখের প্রশ্নটা শুনে আরওয়া বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালোনা। একপাশের মোড়ায় বসে পরনের হিলজোড়া খুলে নিয়ে শু ক্যাবিনেটে রাখতে রাখতে সংক্ষিপ্ত জবাব দিলো।

“ ভালো। ”

আরওয়ার মা, রুশমি, মেয়ের জবাব শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

“ শুধুই ভালো? অন্য কিছু নয়? ”

আরওয়া বিরক্তভরে ক্যাবিনেটের দরজা আটকে উঠে থপথপ পা ফেলে বাড়ির ভেতরে এলো। লিভিং রুমের কাউচে হ্যান্ডব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে খানিক ক্লান্ত গলায় জানালো,

“ আমরা মাত্র একবার দেখা করেছি, মম। ভালোমত চেনাজানা এখনো বাকি। বিয়ে শাদী তো আর ছেলেখেলা নয় যে মুখ দেখে পছন্দ করে সেরে ফেললাম! ”

রুশমি সন্তানের কথা শুনতে শুনতে ডাইন ইন টেবিলের পাশে চেয়ারে বসলেন। আরওয়া নিজের গলা থেকে ওড়না সরিয়ে রেখে টেবিলের জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে পান করলো। তারপর সেটি ঠক করে আবার টেবিলে রেখে দিয়ে বললো,

“ তাছাড়া, উনি ডিভোর্সড। কেমন যেনো হয়ে গেলোনা? যখন জিজ্ঞেস করলাম, প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে কি সমস্যা হয়েছিল, কিছুই বললো না। এমন অসৎ হলে তো তার সঙ্গে সংসার করা যায়না। ”

“ বলেনি কারণ নিতান্তই ভদ্র ছেলেটা। আর আগের বউটা? একেবারে ডাইনি ছিলো। ”

রুশমির কথায় আরওয়া চমকালো। মায়ের চেহারায় তীব্র বিতৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলনা। জায়দানের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা ওঠার কারণটা হলো ছেলের মায়ের এবং রুশমির বন্ধুত্ব। দুইজনই নাকি বাল্যকালের বান্ধবী ছিলেন। একসাথেই স্কুল কলেজ পার করেছিলেন তারা। পরবর্তীতে রুশমি নেদারল্যান্ডস চলে যাওয়ায় আর অহরহ যোগাযোগ ছিলোনা। ছেলের দ্বিতীয়বার বিয়ের জন্য প্রথম পছন্দ হিসাবে আরওয়াকেই মনে ধরেছে ভদ্রমহিলার।

চেয়ার টেনে মায়ের মুখোমুখি বসলো আরওয়া। না চাইতেও অস্পষ্ট এক আগ্রহ ঘিরে ধরলো তাকে। রুশমিকে তাই জিজ্ঞেস করলো সে,

“ মানে? পরকীয়া টাইপ কিছু? ”

“ ধুর। সেসব হলে তো তাও মেরেধরে টাইট দিয়ে ঠিক করা যায়। ওই মেয়ে সাক্ষাৎ ইবলিশ ছিলো বুঝেছিস? রগে রগে শুধু আগুন ঝরতো। তুই তো দেখিসনি। আমি আর তোর বাবা গিয়েছিলাম না, আফটার ওয়েডিং সারমোনিতে? তখন এক দেখায়ই বুঝে গিয়েছিলাম এই সংসার টেকার নয়। ”

ডিভোর্সের কারণটা কি তাহলে? প্রশ্নটা হৃদয়ে উত্থাপিত হলেও ঠিক উচ্চারণ করতে পারলোনা। অন্য কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে তার বিবেকে বাঁধছে। তবে বিবেকের দোহাই দিয়ে লাভ কি? যদি এই ছেলের বাঁধনেই বাঁধা পড়তে হয়, তবে তার সবটা জেনে নেয়া উচিত নয় কি?

মেয়ের দ্বিধাদ্বন্দ্ব স্পষ্ট পড়তে পারলেন রুশমি। ঝুঁকে এসে নিজের বয়সের ভারে হালকা চামড়া কুঁচকে আসা হাতটাকে আরওয়ার কোলে গুছিয়ে রাখা হাতের উপর রেখে নরম কন্ঠে বললেন,

“ যে মেয়ে নিজের শ্বাশুড়ির গায়ে হাত তুলতেও কার্পণ্যবোধ করেনা,তার সঙ্গে সংসার করা যায়না মা। ”

আরওয়া থমকে গেলো। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো রুশমির নয়নমাঝে। যেন তার মা এক্ষুণি বলে উঠবেন, এতক্ষণ মজা করছিলেন তিনি। অথচ রুশমি তেমন কিছুই করলেন না। উল্টো তার দৃষ্টি ভারী হয়ে উঠলো।

“ তোর মম ড্যাড তোর জন্য খারাপ কোনো সম্বন্ধ দেখেনি। এটুকু বিশ্বাস করিস তো? একটা সুযোগ দিয়ে দেখ। হয়ত তোরা একে অপরের মনকে সুস্থ করে তুলতে পারবি। ”

রুশমি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। তবে আরওয়া ঠাঁয় বসে রইলো। সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে গিয়েছে সে। তবে জায়দানের ডিভোর্সের কারণ কি এটাই? তার প্রাক্তন স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা হয়নি? কিন্তু তাই বলে একটা মেয়ে এভাবে গুরুজনের গায়ে হাত তুলবে? এই দেশের ভদ্র সমাজের হিসাবে খানিক অবিশ্বাস্য তা। এজন্যই কি জায়দান তাকে নিজের প্রাক্তনের সম্পর্কে কিছুই বলেনি? হাজারো প্রশ্ন মাছের মতন ছলাৎ করে উঠলো আরওয়ার হৃদসাগরে।

মেয়ে আর কিছু বলবেনা ভেবে রুশমি চুপচাপ রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন। কাজের মেয়ে দুটোকে বলতে হবে, আজকে যেন বেশি ঘি দিয়ে পোলাও রান্না করে। তবে তিনি লিভিং রুমের বাইরে যাওয়ার আগেই হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এলো আরওয়ার কন্ঠস্বর।

“ মম? এসব তোমাকে জেসমিন আন্টি বলেছেন? ”

রুশমি থামলেন। পিছন ঘুরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে মাথা দোলালেন। আরওয়া তার দিকে দীর্ঘ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শেষমেষ বলে বসলো,

“ কিন্তু তার কথা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? ”

চরম বিস্মিত হলেন রুশমি। রীতিমত চোয়াল ফাঁক হয়ে গেলো তার। হাহাকার মেশানো কন্ঠে আর্তনাদ করে উঠলেন,

“ জেসমিনকে অবিশ্বাস করছিস? ”

“ উঁহু। কাউকে অবিশ্বাস করছি না, মম। তবে একটা কথা কি জানো তো? এক হাতে কখনোই তালি বাজেনা। ”

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো আরওয়া। একদম স্তব্ধ হয়ে মেয়ের পানে চেয়ে রইলেন রুশমি। চোখ পিটপিট করলেন অস্বস্তিতে।

“ শুধুমাত্র এক পক্ষের কাহিনী শুনে কখনো আরেক পক্ষকে বিচার করা উচিৎ নয়। উস্কানি না পেলে গুরুজনের উপর হাত তোলার মতন জঘন্য অপরাধ কোনো মেয়ের দ্বারা সম্ভব বলে আমার মনে হয়না। মুদ্রার অপর পিঠের ভিন্ন একটা কাহিনী থাকা মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। ”

এটুকুই। নিজেকে আর ব্যাখ্যা করলোনা আরওয়া। পায়ে পায়ে হেঁটে লিভিং রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। পেছনে ফেলে গেলো নিজের ওড়না এবং হ্যান্ডব্যাগ। জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে বাকরুদ্ধ রুশমি মনে মনে ভাবলেন, আধুনিকতার নামে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে আরম্ভ করেছে বর্তমান প্রজন্ম। তাদের কাছে আজ বেঠিকটাই সঠিক।

✩ ✩ ⁠✩ ✩

আজকে ডেলিভারি বেশি নেই। অথচ এটুকুতেই কেনো এতটা ক্লান্ত লাগছে আমি বুঝতে পারছিনা। গত কয়েকদিন যাবৎ রাতে ঠিকমতো ঘুম হচ্ছেনা। অদ্ভুতুড়ে দুঃস্বপ্ন আমায় তাড়া করে বেড়ায়। সেই স্বপ্নে আমি ড্যাডকে দেখি। তার মুখজুড়ে থাকে তীব্র ব্যথার কুঞ্চন। কেমন যেন ছটফট করে আমার সামনে। হাজার চাইলেও একটু জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিতে পারিনা তাকে। এই দুরূহ মানসিক অবস্থাই হয়ত বর্তমানে আমার শারীরিক দূর্বলতার কারণ।

নভেম্বরের প্রকৃতি হালকা শীতল হতে আরম্ভ করেছে। তবে এখন ভরদুপুর হওয়ার মাথার উপরে সূর্যমামা গনগনে আগুন ঢালছে। স্কুটির উপর হেলমেট পরে থাকা সত্ত্বেও হেলমেটের আবরণ ভেদ করে মাথার তালুকে ছুঁয়ে যাচ্ছে উত্তাপ। একেবারে চান্দি গরম হয়ে যাওয়া যাকে বলে। তার উপর পেটে ভীষণ ক্ষুধার জ্বালা। আজকে সকালে কিছু মুখে না দিয়েই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। মীরাও একদম ভোরে ভার্সিটি চলে গিয়েছে। সে থাকলে একটু ধমকে হলেও আমাকে খাওয়ায়।

সড়কের ধারে স্কুটি পার্ক করলাম। পাশেই একটা ভাসমান টং দোকান। দুইজন লুঙ্গি পরিহিত মধ্যবয়স্ক পুরুষ এবং এক যুবক বেঞ্চে বসে চা পান করছে। মধ্যবয়স্করা রাজনৈতিক কোনো আলাপ করছে। আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তাদের বিস্তর চিন্তা। স্কুটি ছেড়ে নিজের গায়ের জ্যাকেট খুলে হ্যান্ডেলে জড়িয়ে এগিয়ে গেলাম আমি। কোনো অস্বস্তি ছাড়াই দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলাম,

“ মামা এক পিস বনরুটি আর দুটো কলা দেবেন। ”

অর্ডার জাহির করেই ধপাস করে বেঞ্চে যুবক ছেলেটার পাশে বসে পড়লাম। সকলে আমার দিকে কেমন যেন অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকালো। এমন দৃষ্টি আমার জন্য মোটেও নতুন নয়। এদেশে রাস্তার ধারের টং দোকানে মেয়েদের আনাগোনা শূন্যের কোঠায়। মাঝে মধ্যে ভার্সিটির ছেলেপেলেরা অনেক শখ করে যায় অবশ্য। তবে আমার মতন কেউ নির্দ্বিধায় একলা এসে বিনা চিন্তায় বেঞ্চ দখল করতে পারে, এমনটা হয়ত তারা আগে দেখেনি কিংবা ভাবেনি। আমি অবশ্য তাতে খুব একটা মনোযোগ দিলাম না। দোকানদার বনরুটি এবং কলা এগিয়ে দিতেই প্যাকেট দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে খাবারে মনোনিবেশ করলাম।

“ আপনি কি ডেলিভারি গার্ল? ”

বনরুটি চিবুতে চিবুতে পাশের যুবকের প্রশ্ন শুনে আমি মাথা দোলালাম। ভ্রু তুলে নিজের স্কুটির দিকে নির্দেশ করলাম যেখানে এখনো এক বক্স পিৎজা রাখা আছে। যুবক নিজের হাতের লাল চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দ্বিতীয় দফায় বললো,

“ কিছু মনে করবেন না। আসলে এইরকম প্রফেশনে মেয়েদের খুব কম দেখা যায় তো, তাই জিজ্ঞেস করেছি। ”

“ ইটস ওকে। ”

এক কামড়ে একটি কলার অর্ধেক নাই করে দিয়ে কিছুক্ষণ আপনমনে চিবুলাম। তারপর খাবারটুকু গিলে নিয়ে বললাম,

“ আমার একটা অনলাইন বিজনেস আছে। হোমমেড পিৎজা সেল করি। সেটার ডেলিভারি আমিই দেই। ”

“ ওহ। ইন্টারেস্টিং। ভার্সিটিতে পড়েন? ”

“ উঁহু। পড়ালেখা শেষ। ”

যুবককে খানিক বিস্মিত মনে হলো। সরু দৃষ্টিতে আমায় আপাদমস্তক দেখলো। পাতলা ফিনফিনে শরীরে জড়ানো ওভারসাইজড টি শার্ট আর ট্রাউজার দেখে বোধ হয় সে আমার বয়স আন্দাজ করতে পারেনি। শুধু মাথায় শক্ত তেলতেলে খোঁপা বাঁধা চুল না থাকলে আমায় অনায়াসে ছেলে বলে চালিয়ে দেয়া যেতো হয়ত। আমার অবশ্য তাতে বিশেষ বাতিক নেই। বনরুটি খতম করে ফেলেছি। হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। ট্রাউজারের পকেট থেকে একশো টাকার নোট বের করে দোকানদারকে দিয়ে যখন আশি টাকা ফেরত নিলাম, তখনি বিকট এক শব্দে রীতিমত আকাশ বাতাসে কেঁপে উঠলো।

সটান করে উল্টো ঘুরলাম। টং দোকানের অন্য মানুষগুলোও লাফিয়ে দাঁড়ালো আমার পিছনে। মনে হলো যেন চোখের সামনে নিজের পৃথিবীটাকে থমকে যেতে দেখলাম। আমার স্কুটিটা রাস্তার উপর উল্টে পরে আছে। সামনের অংশটা একেবারে দুমড়ে গিয়েছে। পিছনের চাকা উপরে উঠে আছে, বনবন করে ঘুরছে যেন আহত আর্তনাদ প্রকাশে। পিৎজার বক্স চাপা পড়ে থেঁতলে গিয়েছে সড়কের পিচে। নিঃশ্বাস প্রশ্বাস বলে একটা প্রক্রিয়া আছে, তাই ভুলে গেলাম ক্ষণিকের জন্য। আমার চোখে ভাসলো শুধু দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া একটা স্বপ্ন।

ঠিক সামনেই থমকে দাঁড়িয়ে আছে কটকটে লাল বর্ণের দানবটি। ল্যাম্বরগিনি অ্যাভেন্টাডর এস ভি জে। গাড়ির মডেল চিনতে আমার একটুও অসুবিধা হলোনা। কারণ, একটা সময়ে এই দানবকে আমিও চালাতাম। সড়ক ধরে ছুটে যেতাম পাগলা ঘোড়ার মতন, যেন বাংলাদেশের যানজট বাঁধা ভাঙাচোরা সড়ক নয়, এফ এসের রেসিং ট্র্যাক বেয়ে ছুটছি। ল্যাম্বরগিনির বনেটে চির ধরেছে, বর্ণহীন ধোঁয়া বের হচ্ছে ফাঁক গলে। কি হয়েছে বুঝতে আমার একটুও অসুবিধা হলোনা।

আশেপাশে মানুষের ভীড় জমে গিয়েছে ততক্ষণে। উৎসাহী জনগণ আশেপাশের ফুটপাথ মার্কেট থেকে উঁকি দিয়ে দেখছে কাহিনী। ল্যাম্বরগিনির দরজা অত্যন্ত বেখেয়ালী ভাবে খুলে গেলো। ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো এক ছ ফুট দুই ইঞ্চির দানব। আসলেই উচ্চতা এমন, নাকি পরনে হেভি বুট থাকায় বেড়ে গিয়েছে তা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। তুলতুলে চেহারাটা এতটাই ভদ্রগোছের যে অ্যাঞ্জেলরাও বুঝি এর চেহারা দেখে দ্বিধায় পরে যাবে, সেখানে এথায় তো সবাই মানুষ! আমি নিশ্চিত, এ এমন গড়নের পুরুষ যে সামান্য সময় রোদের নিচে থাকলেই টুকটুকে লাল হয়ে যায়। কিন্তু তার চেহারার নিষ্পাপ ভাব, সঙ্গে মনের মধ্যে জেগে ওঠা একটা বাক্য, ‘ একে আগে যেন কোথায় দেখেছি?’ কিছুই আমাকে আটকাতে পারলোনা। আমার মাঝে তখন অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছে। বহুদিন বাদে আমি নিজের মধ্যে সেই চিরায়ত ভয়ানক রাগের অস্তিত্ব টের পেলাম। এই রাগ জলোচ্ছ্বাসের মতন। সামনের সবকিছুকে অত্যন্ত অবহেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় অবলীলায়।

লোকটি কালো লেদার প্যান্টের ভেতর হাত ভরে এগিয়ে এসে বাজখাঁই কন্ঠে খেঁকিয়ে উঠলো,

“ হুয ফাকিং স্কুটি ইয দিস? হু ইয দ্যাট শিট? ”

নিয়ন্ত্রণের যেটুকু সুতো অবশিষ্ট ছিল, তাও এক টানে ছিঁড়ে গেলো। লম্বা পদক্ষেপে এগোলাম আমি। ফুটপাথ থেকে সড়কে নামার আগে পা থেকে নেভী ব্লু বর্ণের স্নিকার্স খুলে হাতে নিলাম। ভীড় ঠেলেঠুলে ভেতরে ঢুকলাম। লোকটা তখন সবেমাত্র আমার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্কুটিতে লাথি হাঁকিয়ে ফিরে দাঁড়িয়েছে। চোখের মাঝে আগুন জ্বললো আমার। বিদ্যুৎ গতিতে বাড়ালাম নিজের হাত। ছ ফুটি দানবের কলার খুঁজে পেতে একটুও বেগ পেতে হলোনা। কলার টেনে তাকে ঝুঁকিয়ে হাতের স্নিকার্স জুতোটা সটান বসিয়ে দিলাম তার তুলতুলে গাল বরাবর। সপাসপ দুইটি জোর জুতোর বাড়ির সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলাম,

“ আই অ্যাম দ্যাট ফাকিং শিট, ইউ মাদারফাকার! ”

প্রথমবার এই অঞ্চলের উৎসাহী ভীড়কে অবধি স্তব্ধ করে দিলো আমার আচরণ। চোখের কোণে স্পষ্ট দেখলাম, কয়েকজনের হাতে উঠে এসেছে মোবাইল ফোন। কিন্তু তখন আমার বিচার বিবেচনাবোধ বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমার আঘাতে এতটাই জোর ছিলো যে লোকটির মাথা ঝুলে পড়লো একপাশে। সে তখন ফিরে তাকালো, তখন তার বাদামী বর্ণের চোখের মাঝে অদ্ভুতুড়ে এক ঝিলিক দেখতে পেলাম। ওই নয়নের বাদামীর খেলা দেখে ক্ষীণ মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম। আবারো মনে হলো, এহেন আলোড়ন আমি আগেও দেখেছি!

লোকটির ঠোঁটের কোণে গুটিকতক র*ক্তবিন্দু জমেছে। সেটি অবলীলায় নিজের জিভের ডগায় চেটে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে তীর্যক হাসলো সে।

“ আ প্রিটি লি’ল ক্রিয়েচার, আরে’ন্ট ইউ? ”

তার তীক্ষ্ণ চোখ আমার সমস্ত শরীরে ঘুরপাক খেলো বিনা দ্বিধায়। এত লোকের সামনেও নিজের দৃষ্টির মাঝে জ্বলজ্বল করা লোভী হায়নাকে লোকানোর কোনো আগ্রহ দেখা গেলোনা তার মাঝে। উন্মত্ত হয়ে উঠলো আমার অন্তরাত্মা। তার কলার ধরে জোরে জোরে ঝাঁকিয়ে বললাম,

“ কথায় কথায় ইংলিশ মারিয়ে বোঝাতে চাস তোর বাপের অনেক টাকা? কুত্তার অওলাদকে সোজা ভাষায় কি বলে জানিস? কুত্তার বাচ্চা! ”

এই প্রথম তার বাদামী নয়নজুড়ে লোভের বদলে ক্রোধ দেখতে পেলাম। ক্ষিপ্ত হয়ে আমার গলা নিজের প্রশস্ত দুই হাতে সজোরে চেপে ধরলো সে। বায়ু আদান প্রদানের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দিলো, চাপ প্রয়োগ করলো একেবারে শ্বাসনালী বরাবর। দাঁতে দাঁত পিষে চিবিয়ে চিবিয়ে জোর দিয়ে উচ্চারণ করলো,

“ বারোব্যাটারি কোথাকার! তোর অসহায়ত্ব দেখে অলমোস্ট দয়া করে ফেলছিলাম। কিন্তু ভুলেই গিয়েছিলাম, ওয়ান্স আ বিচ, অলওয়েজ আ বিচ! ”

“ তোর দয়ার খাতায় আগুন! রাস্তাকে পারিবারিক সম্পত্তি ভাবিস? রেসিং ট্র্যাক বানিয়ে রেখেছিস ইমপোর্টেড কারের জন্য? খ…ক্ষ্ক! ”

অক্সিজেনের অভাবে আমার মুখ লাল হয়ে উঠতে লাগলো। কাশতে শুরু করলাম। তাতে মজা পেয়ে এক হাতে গলা চেপে অন্য হাতে গাল ছুঁয়ে দিলো লোকটি। ঘিনঘিন করে উঠলো আমার সমস্ত শরীর।

“ হ্যাঁ। এই রাস্তা আমার বাপ দাদার সম্পত্তি। তুই ফকিন্নি বেজায়গায় পার্ক করেছিস কেনো? মনে হয় তুই জানতি আগে থেকেই, যে আমি আসবো? তোর প্ল্যান নয়তো? বড়লোক মাছ জালে ফাঁসানোর? ভেবেছিস মেয়ে বলে গায়ে হাত দিতে পারিনা? ”

আমার মন মস্তিষ্ক কোনোটাই আর ক্রোধের চাপ সইতে পারলোনা। মাথা দিয়ে সজোরে ঠুকে দিলাম তার কপাল। ককিয়ে উটে লোকটা আমার গলায় ঢিল দিয়ে পিছনে সরে যেতেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম শিকারী পশুর মতন। গাড়ির বনেটে ওটাকে আছড়ে ফেলে লাথি হাঁকিয়ে দিলাম সপাসপ। কোথায় গিয়ে লাগলো খেয়ালই করলামনা। দরকার নেই! পাশে পড়ে থাকা স্নিকার্স টা আবারো তুলে নিয়ে পিঠ বরাবর বাড়ি দিতে দিতে পাগলের মতন চিৎকার ছুঁড়লাম,

“ তুই ফকিন্নি! তোর চোদ্দ গুষ্টি ফকিন্নি, ফকিন্নির বাচ্চা! গিয়ে কাঁদিস তোর আব্বার কাছে! বলিস, এই বিচের জুতার বাড়ি খেয়ে বাসায় ফিরেছিস। শালা কাপুরুষ একটা! ”

“ আপা, আপা থামেন! ”

আশেপাশের লোকজনের যেন হঠাৎ করেই শুভবুদ্ধির উদয় হলো। তাই আমায় এসে ধরলো কয়েকজন। দুজন পুরুষ এবং এক বয়স্ক মহিলা আমাকে টেনে সরিয়ে নিলো তার কাছ থেকে। বেচারা তখনো গাড়ির বনেটে উৎপটাং হয়ে পড়ে আছে। আমি স্নিকার্স উঁচিয়েই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে হুমকি দিলাম,

“ আরেকবার পাবলিকের রাস্তাকে বাপের রেসিং ট্র্যাক মনে করার আগে একশো চুয়ান্নবার ভাববি, জাউরা! ”

লোকটি বনেট থেকে মাথা তুলে সামান্য পিছন ঘুরে তাকালো। বাদামী নয়নজুড়ে ঘূর্ণিঝড় উঠেছে। মুখে কিছুই উচ্চারণ করলোনা সে। কিন্তু এমন দৃষ্টির অর্থ বুঝতে আমার একটুও বাকি রইলোনা। ‘ তোর শেষ আমি দেখে নেবো! ’

পুলিশের টহলগাড়ির উপস্থিতির কারণে ঝামেলা এরপর তেমন এগোলনা বললেই চলে। তবে হ্যাঁ, আমার ক্ষতিপূরণ বলতে আমি কিছুই পেলাম না। পুলিশ সদস্য আমাকে বলল, চুপচাপ এই স্থান ত্যাগ করতে। তাদের যে টাকায় কেনা হয়েছে বুঝতে বাকি রইলনা আমার। ওই মুহূর্তে কারো সঙ্গেই বিন্দুমাত্র তর্ক করার শক্তি কিংবা মনোভাব আমার মাঝে আর ছিলোনা। আমি টং দোকানের সেই যুবকের সাহায্যে আমার দুমড়ে যাওয়া স্কুটিটা টেনেই কাছের এক গ্যারাজের দিকে যাত্রা করলাম।

***

সাবিন চলে যেতেই পুলিশে ঘিরে থাকা লোকটি রুমালে নিজের র*ক্তবিন্দু লেপ্টে থাকা মুখ মুছতে মুছতে আশেপাশে তাকালো। ভীড়ের মাঝে দাঁড়ানো পুরাতন মডেলের আইফোন হাতে এক তাগড়া ছেলেকে চোখে পড়লো তার। খানিক মাস্তান টাইপের দেখতে। সিগারেট ফুঁকছে ঠোঁটে। লোকটি এগিয়ে গেলো তার দিকে, অমায়িক এক হাসি মেখে। ছেলেটি তাকে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, চোখে ফুটলো খানিকটা ভয় এবং কৌতূহলবোধ।

“ আইফোনে অনেক সুন্দর স্ট্যাবল ভিডিও হয়, জানিস? ”

ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো। লোকটি হাসলো বেশখানিক। তারপর পকেট থেকে নিজের কমলাভ আইফোন সেভেন্টিন প্রো ম্যাক্স বের করে বললো,

“ যেটা রেকর্ড করেছিস, সেটা সুন্দর করে আমার ফোনে ট্রান্সফার কর তো বাচ্চা। বেনসনের দশটা প্যাকেট আজ তোর হবে। ”

──⁠───⁠─চলবে──⁠───⁠─