Home "ধারাবাহিক গল্প প্রেম প্রেম পাগলামী প্রেম প্রেম পাগলামী পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব

প্রেম প্রেম পাগলামী পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব

0
504

#প্রেম_প্রেম_পাগলামী
#১৭_ও_অন্তিম_পর্ব
#রেবেকা_খাতুন

সময় চলে ঝড়ের গতিতে। মাহা আর আহাদের ক্ষেত্রেও তাই হলো। আজ তাদের একত্রে থাকার একমাস পূরণ হলো। এই খুশিতে মাহা সেজে গুঁজে বসে আছে নিজেদের রুমে। আহাদের অপেক্ষায় অপেক্ষারত সে। ঘড়ির কাঁটা পৌঁছায় একটায়। বাড়ির সবাই গেছে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বিয়েতে। আহাদ যায়নি বলে মাহাও আর যায়নি। তবে এত রাতেও আহাদের ফিরে না আসায় সে একটু চিন্তিত হয়। সঙ্গে ভয়ও পায়। পুরো বাড়িতে সে একা। বাইরে একটু একটু ঝড়ও উঠছে বোধহয়। তবে রুমের মধ্যে গুমোট গরম। মাহা ভাবে একটু ছাদ থেকে ঘুরে আসবে। এত গরমে নাজেহাল সে। যেই ভাবা সেই কাজ। মাহা ছাদে চলে যায়। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে তখন। মাহা ছাদ থেকেই দেখতে পায় আহাদ ফিরেছে। হালকা করে ডাক দেয়। আহাদ সেই ডাক শুনে তাকায় ছাদের দিকে। ভ্রু কুঁচকে আসে তার। দৃষ্টিতে বোঝায় এই বৃষ্টির মাঝে মাহার ছাদে যাওয়াটা মোটেও পছন্দ হয়নি তার।

সে বাড়িতে ঢুকে নিজের রুমে যায়না। সোজা পৌঁছে যায় ছাদে। ছাদে পৌঁছাতেই তার হৃদস্পন্দন বুঝি কিছু সময়ের জন্য থমকে যায়। লাল শাড়িতে তার শুভ্র পরী কেমন নেচে নেচে সারা ছাদে বিচরণ করছে। আহাদের লোভ হয়, মেয়েটিকে এই মুহূর্তে নিজের মাঝে পিষে ফেলতে ইচ্ছা করে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় মাহার দিকে। মাহা আহাদের উপস্থিতি খুব সহজেই বুঝে ফেলে। ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে পিছু ফিরতেই আহাদ এক টানে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। আবদ্ধ করে বক্ষমাঝারে।

“এভাবে সেজে আমাকে মেরে ফেলতে চাইছিস? দিন রাত তোর প্রেমে হাজারবার করে খুন হচ্ছি, তাও মায়া হয়না তোর?”

“উহু, মেরে ফেলবোনা। বরং নিজেকে আপনার ভালোবাসার চাদরে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে নেবো।”

“আমি তো জড়িয়েই আছি, নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্বে মিশিয়ে নিয়েছি তোকে। আর কি চাই?”

“আপনাকে… আপনাকে… আপনাকে…. আমার এই পাগলামীতে শুধু আপনাকেই চাই। সারাজীবন, প্রতিটা ক্ষণে।”
আহাদ হাসে মেয়েটির এহেন স্বীকারোক্তিতে। এই কয়েকদিনেই মেয়েটি তার মাঝে নিজেকে এমনভাবে জড়িয়ে নিয়েছে, আহাদ একটু ব্যস্ত হলেও সে কষ্ট পায়। সঙ্গ চায় আহাদের। আহাদও তখন প্রেয়সীর ভালোবাসার চাদরে নিজেকে আরো বদ্ধভাবে আবদ্ধ করে।

“তোর পাগলামী সয়ে নেবো, কিন্তু আমার এই পাগল করা প্রেম কি তুই সহ্য করতে পারবি?”.

“এতদিনে নিজেকে আপনার মতো গড়ে নিয়েছি, আপনার প্রতিটা আদরের অভ্যাস করে নিয়েছি। তাও বিশ্বাস হয়না?”

“হয় তো। ওই জন্যই তো নিজেকে বারবার তোর মাঝে হারিয়ে ফেলি। এই যে এখন। এখন তো আবারও তোর মাঝে হারাতে ইচ্ছা হচ্ছে। সাথ দিবি আমার?”
মাহা মাথা নাড়ে। আহাদ জড়িয়ে ধরে তাকে। কপালে ছোট্ট একটা ভালোবাসার পরশ এঁকে বলে,
“আমার জীবন তোর নামে লিখে দিলাম। আমার ভাগের সমস্ত সুখ তোকে দিলাম। তুই শুধু আমার হয়ে থাক, আমি এই পৃথিবী সমান ভালোবাসা তোকে এনে দেবো।”

———-

দেখতে দেখতে কেটে যায় আরো দুমাস। এই দুমাসে বদলেছে অনেক কিছু। বদলেছে মাহার শারীরিক গঠন। সেই চিকন মেয়েটা কেমন হেলদি হয়েছে। আজ কাল বিনা কারণেই তার মেজাজ খিটখিটে থাকে। এমনকি সেই মেজাজ কখনও কখনও আহাদের উপরেও বর্তায়। তবে আহাদ কিছু মনে করেনা। সে আরো ভালোবেসে মেয়েটা শান্ত করে।

সকাল সকাল সবাই নাস্তা করছিল। বাড়ির কর্তারা বসে খাচ্ছেন। আহাদও আছে সেখানে, তবে মাহা এখনও নামেনি। আহাদ আরো একবার ডাক দেয়। সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে মাহা। হঠাৎ করেই তার মাথাটা ঘুরে যায়। সে রেলিং ধরে নিজেকে বাঁচাতে চাইলেও শেষ রক্ষা আর হয়না। তার আগেই সিঁড়ি বেয়ে পড়ে যায় নীচে। অজ্ঞান হয় মুহূর্তেই। বাড়ির সবাই কেঁপে ওঠে এহেন দৃশ্যে। খাওয়া ছুটে যায় সবার। আহাদ দৌঁড়ে গিয়ে মাহার মাথাটা নিজ কোলের উপর নিয়ে নেয়। রীতিমত কাঁপছে সে। ভয় ও কাঁপের চোটে মুখ দিয়ে কোনো কথায় বার হচ্ছেনা তার। হেনা বেগম দ্রুত গিয়ে পানি নিয়ে আসেন। মেয়ের মুখে পানির ছিটা দেন। মাহা পিটপিট করে চোখ খুলে আহাদ সহ বাকিদের দেখতে পায়। মাহা আহাদের কোমর জড়িয়ে আবারও অজ্ঞান হয়ে যায়। সকলে পড়ে বিপাকে। আহাদ তাড়াতাড়ি বাড়িতে ডক্টর নিয়ে আসেন।

মাহাকে ড্রয়িংরুমের সোফায় শুইয়ে রাখা হয়েছে। ডক্টর বেশ অনেকক্ষণ ধরেই চেক করছেন, তবে মুখে কিছু বলছেন না। এতে সবাই আরো ভয় পাচ্ছে। আকসা বেগম ভয় না পেলেও খুশি হননি মাহার এই অবস্থায়, বরং আজকাল ছেলের প্রতি মাহার এই ভালোবাসা দেখে তিনি আস্তে আস্তে মাহার প্রতি নরম হচ্ছেন।

“কি হয়েছে মাহার? আপনি কিছু বলছেন না কেন?”
আহাদের ভয়ার্ত, বিরক্তিকর কণ্ঠস্বর। ডক্টর ফেরেন আহাদের দিকে,
“আপনি পেশেন্টের কি হন?”

“আমি ওর হাজব্যান্ড।”
ডক্টরের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সেই হাসিতে মেজাজ বিগড়ায় আহাদের।

“আমার ওয়াইফ অসুস্থ, আর আপনি হাসছেন? এই ডক্টর আপনি? শুধু রোগী দেখা কাজ? কোনো সহানুভূতি নেই আপনার?”
আহাদের কথায় ডক্টর মোটেও রাগ করেননা, বরং ওনার মুখের হাসি আরো চওড়া হয়।

“আমি এখন যেটা বলতে যাচ্ছি, সেটা শুনে আপনিও হাসবেন।”

“মাহা অসুস্থ, আর আমি হাসবো? হাউ রিডিকিউলাস!”
ডক্টর এবারেও হাসেন,
“মিষ্টি আনেন মিস্টার চৌধুরী, আপনি বাবা হতে যাচ্ছেন।”
কথাটা বোধহয় আহাদ ঠিকঠাক শুনতে পাইনি। সে অবাক দৃষ্টিতে চায় ডক্টরের দিকে। বাকিরা আলহামদুলিল্লাহ বলে ওঠেন। আকসা বেগমের চোখও চিকচিক করে ওঠে। এতদিনের জমে থাকা রাগ বুঝি পুরো গলে জল। তার আহাদের সন্তান আসবে, তার ছোট্ট নাতি, নাতনি হবে। এটা ভেবেই তিনি আনন্দে লাফিয়ে উঠতে যান, তবে বাইরে তা প্রকাশ করেন না। সোজা চলে যান রান্নাঘরে।

আহাদ তখনও হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে। আরবাজ চৌধুরী ও আসাদ চৌধুরী একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেন। আজ যে খুশির দিন। ওনারা দাদা, নানা হতে যাচ্ছেন। এই বাড়িতে প্রথম সন্তান আসবে। এর থেকে বড় খুশির আর কি হতে পারে!

“কি বললেন আপনি?”
আহাদের অবিশ্বাস্য কন্ঠস্বর।

“যেটা আপনি শুনলেন, আপনি বাবা হতে যাচ্ছেন।”
আহাদ এবার যেন হুস ফিরে পায়। মাহার দিকে ফিরে তৃপ্তির হাসি দেয়।

“থ্যাংক ইউ ডক্টর। থ্যাংক ইউ সো মাচ।”

ডক্টর অমায়িক হেসে বলেন,
“ডক্টর হচ্ছেন আপনি, আর ধন্যবাদ দিচ্ছেন আমাকে?”

“ধন্যবাদ তো দেবেই, আপনি এত ভালো একটা খবর দিলেন যে! নিন মিষ্টি খান।”
আকসা বেগমের কথায় সবাই অবাক দৃষ্টিতে ওনার দিকে চান। আকসা বেগমের ঠোঁটের কোণে চওড়া হাসি। তিনি ডক্টরের দিকে মিষ্টি এগিয়ে দেন। ডক্টর সানন্দে সেটা গ্রহণ করেন।

মুহূর্তে পরিবেশ আনন্দময় হয়ে ওঠে। মাহার শরীর দূর্বল, তাই এখনও জ্ঞান ফেরেনি তবে ফিরে আসবে। আহাদ ওকে কোলে তুলে নিজ রুমে নিয়ে যায়। বাড়ির সবাই তাদেরকে একলা ছেড়ে দেন।

মিনিট দশেক পরে মাহা ধীরে ধীরে চোখ খোলে। আহাদকে নিজ শিয়রে বসতে দেখে আলতো হাসে।

“শুনছেন…”
মৃদু, ধীম কন্ঠে আহাদ তাকায়। মাহার কপালে এঁকে দেয় গাঢ় চুমু। বেশ সময় নিয়েই ছাড়ে সে। মাহা চোখ বন্ধ করে সবটা অনুভব করে। অতঃপর ধীর কন্ঠে বলে,
“কি হয়েছে আমার?”

“জানিস না বুঝি? আমাকে বুঝি বলতে নেই?”
মাহা ভাবে কিছুক্ষণ অতঃপর তার দুচোখ চিকচিক করে ওঠে। অবিশ্বাস্য স্বরে বলে,
“আমি প্রেগন্যান্ট?”
আহাদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। খুশিতে মাহার চোখ বেয়ে অশ্রু নামে।

“আমি সত্যিই প্রেগন্যান্ট? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছেনা?”

“তুই কিছু বুঝিসনি?”

“ভাবছিলাম এমন কিছু, তবে সিওর ছিলাম না। আপনাকেও জানাবো ভেবেছিলাম।”
আহাদ মাহার ঠোঁটে আলতো চুমু খেয়ে বলে,
“থ্যাংক ইউ মাহা, আমার জীবনকে এতটা রঙিন বানানোর জন্য।”

“আমার জীবন আসার জন্য ধন্যবাদ আহাদ ভাই!”

“এখনও ভাই? আমার বাচ্চাগুলোকে কি মামা ডাক শোনানোর ইচ্ছা আছে তোর?”
মাহা হাসে। দুটো হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
“আমাকে একটু বুকের মাঝে নিন না। কেমন একটা সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে। আমার জীবনের এই সুখ আমি আপনার সাথে ভাগ করে নিতে চাই।”

আহাদ মাহার পাশে শুয়ে পড়ে। তাকে আগলে নেয় বুকের মাঝে।

“আমরা এভাবেই সারাটাজীবন কাটিয়ে দেবো মাহা। দেখবি, আমাদের একটা সুখী পরিবার হবে। যেখানে থাকবো আমি, তুই আর আমার সন্তানেরা। দারুণ হবে বল?”

“এক্কেবারে ফার্স্ট ক্লাস!”
আহাদ হাসে। বুকের মাঝে আরো লেপ্টে নেয় নিজস্ব রমণীকে।

সমাপ্ত…….