#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৫৫
তিন মাস আগে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যবসায়িক গ্রুপ রেমান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের তরফ থেকে তাদের নতুন কোম্পানি ভবন এবং বেশকিছু কোয়ার্টার নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। সেই প্রজেক্ট হাতে নিয়েই ইংল্যান্ড থেকে জেসন পাড়ি জমিয়েছে বাংলাদেশে। এক্ষেত্রে সবথেকে বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তার কোম্পানি, তাছাড়া বিদেশী। বাংলাদেশের মানুষ আবার নিজের দেশের থেকে অন্য দেশের কাজের উপর বেশি ভরসা করে এটা বৈদেশিক মহলে প্রচলিত ধারণা।
রেমান গ্রুপের বিশাল কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করতেই একদম নিচের সারির দিকে নিজের এদেশী ব্যবসায়ী বন্ধু রফিক জিলানীকে নজরে এলো জেসনের। সে সেদিকেই এগিয়ে গেলো। বিস্তৃত রুমটা প্রথম দেখায় মিটিং হল কম, সংসদ কক্ষ বেশি মনে হয়। সারি সারি লম্বা টেবিল এবং চেয়ার সংযুক্ত প্রতি সিঁড়ির ধাপে। সেসব দেখতে দেখতে জেসন পৌঁছে গেলো। রফিকের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে তার পাশেই বসল।
“কষ্ট করে না এলেও চলতো। টেন্ডারটা আমরাই পাচ্ছি যেহেতু!”
জেসন ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতে পারে। তার বক্তব্য শুনে মৃদু হাসলো রফিক।
“সেটা সত্যি কথা। তবে, ফর্মালিটিস তো করতেই হয়। তাছাড়া, ওরা বলেছে আজই ফাইনাল টেন্ডার ঘোষণা করে সাইন করিয়ে নেবে। সেক্ষেত্রে মালিক পক্ষের উপস্থিতি প্রয়োজন।”
ইতোমধ্যে টেন্ডার জমা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং মালিক পক্ষের প্রধানগণ উপস্থিত হতে শুরু করেছে। সকলেই কনফারেন্স রুমের চারপাশে বসলো। সামনের প্রশস্ত ডায়াসের উপর উঠে এলো পরিপাটি শাড়ী পরনে এক তরুণী। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে সে ঘোষণা করলো,
“আসসালামু আলাইকুম। আমি তাহমিনা সুলতানা, ম্যানেজার ফ্রম হ্যান্ডলিং ডিপার্টমেন্ট অব রেমান গ্রুপ। আপনাদের সকলকে স্বাগতম জানাচ্ছি আমাদের টেন্ডার ফাইনাল আলোচনায়। প্রথমেই আমি ধন্যবাদ জানাতে চাইবো আমাদের প্রজেক্টের জন্য টেন্ডার জমা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: জিলানী এল টি ডি, এস কে এম গ্রুপ, ব্লু আইস ফ্রম ইংল্যান্ড, আর বি জি ফ্রান্স, হাওলাদার কর্প, হুসেইন গ্রুপ….”
শেষ নামটায় রফিক চমকে উঠলো। জেসন খেয়াল করলো আশেপাশের ব্যবসায়ীদের মাঝেও খানিক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো রফিক। জেসনের কৌতূহলী চেহারার দিকে চেয়ে বললো,
“হয়ে গেলো! তোমার টেন্ডার গেলো বোধ হয় হাত থেকে!”
“কেনো কেনো?”
“হুসেইন গ্রুপ টেন্ডার দিয়েছে, তার মানে আমরা খতম।”
“হুসেইন গ্রুপের নাম তো আমি আগে শুনিনি। পাওয়ারফুল হলে জানার কথা।”
জেসন সন্দেহ প্রকাশ করলো। তাতে রফিক হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে খানিক হেলান দিয়ে বসে জানালো,
“নতুন মোড়কে পুরাতন আতঙ্ক। অনেক কন্ট্রোভার্শিয়াল। নিউ পাওয়ার।”
“তাহলে তাকে এত গোণায় ধরার কি আছে? আমি নিশ্চিত, আমার চাইতে কেউ এত কম বাজেটের টেন্ডার দেয়নি।”
খানিক ভাব দেখালো জেসন। নিজের গলায় বাঁধা টাইটা টেনে ঢিলে করে আয়েশী ভঙ্গিতে বসলো। রফিক সুস্থির দেখে বললো,
“তুমি হুসেইন গ্রুপের নতুন সি ই ও কে চেনোনা।”
“আমার যাকে তাকে চেনার সময় নেই।”
“সিংহের মুখ থেকে হয়ত খাবার ছিনিয়ে আনা সম্ভব, কিন্তু সাবিন হুসেইনের কাছ থেকে টেন্ডার ছিনিয়ে আনা অসম্ভব।”
এবার খানিকটা নড়েচড়ে বসে ভ্রু তুললো জেসন।
“কিঃ! একটা মেয়ে মানুষের এত ক্ষমতা?”
“মেয়ে মানুষ? ওই নামে কেউ তাকে ডাকে না এখানে।”
“তবে কি ডাকে?”
“স্যাভেজ সাবিন—দ্যা বর্বর ব্যবসায়ী।”
জেসন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলো তার পাশে বসে থাকা বাংলাদেশী ব্যবসায়ী বন্ধুটির দিকে। এই দেশে টেন্ডার দিতে এসে এমন মুসিবতে পড়া যায় তার ধারণায় ছিলোনা। সে তো ভেবেছিল তৃতীয় বিশ্বের দেশ, প্রতিযোগিতা কম! জেসনের অবিশ্বাস এবং বিস্ময় মাখা চেহারা দেখে বাঁকা হেসে রফিক জিলানী জানালো,
“শি ইয দ্যা ইয়াঙ্গেস্ট মিলিয়নিয়ার অব বাংলাদেশ ইন প্রেজেন্ট টাইম।”
ঝুঁকে এসে জেসনকে ফিসফিস করে সাবধান করলো সে,
“একটুখানি এদিক ওদিক করো, ছিঁড়ে খেয়ে উচ্ছিষ্টটুকু ছেড়ে দেবে বাকিদের জন্য উদাহরণ হিসাবে!”
মাইক্রোফোনে কথা বলতে থাকা তাহমিনার গলাটা এবার চড়া হলো,
“আমি খুবই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে জানাচ্ছি যে রেমান গ্রুপের বোর্ড অফ ডিরেক্টরস আমাদের আসন্ন প্রজেক্টের জন্য যে প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার গ্রহণ করেছে, সেটি হলো হুসেইন গ্রুপ। কংগ্র্যাচুলেশন্স!”
উৎসাহ এবং হতাশার এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো চারিদিকে। তবে কোথাও হুসেইন গ্রুপের কাউকে দেখা গেলোনা। ঠিক সেই মুহূর্তেই কনফারেন্স রুমের দরজাটা হাট করে খুলে গেলো। ভেতরে প্রবেশ করলো এক রমণী। কালো ফরমাল শার্ট এবং প্যান্ট পরনে, কোমরের দিকটায় শার্ট ইন করে রাখা। গলায় ঝুলছে একটা সাদা কালো চেক টাই। মাথার কালো চুলগুলো আলগা খোঁপা করে বাঁধা। চোখে ব্ল্যাক শেডের সানগ্লাস। ইঞ্চিকয়েক উঁচু সোলের হিল শুজ পায়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে সে। তার পিছনে হিজাব এবং ম্যাক্সি ড্রেস পরিহিত আরেক রমণী, অন্য পাশে রূপোলী চুলের বয়স্ক এক স্যুট পরিহিত ভদ্রলোক।
“এটা কে?”
না পারতে জিজ্ঞেস করলো জেসন। নারী ব্যবসায়ী দেখেছে সে প্রচুর, বহু কাজও করেছে। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী দৃঢ় পদক্ষেপে নীরব প্রভাব নিয়ে এগিয়ে আসা রমণী তাকে একইসঙ্গে মুগ্ধ করছে আবার অস্বস্তিতে ফেলছে। রফিক ফিসফিস করে জবাব দিলো,
“দ্যাটস হার, সাবিন হুসেইন।”
নিষ্পলক চেয়ে রইলো জেসন। রমণী যখন সিঁড়ি বেয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে গেলো, একটি মন মাতানো সুবাস তার নাকে এসে ঠেকলো। ক্ষমতা এবং গৌরবের সুবাস। এক মুহূর্তের জন্যও সে রমণীর উপর থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারলোনা।
***
ডায়াসের কাছাকাছি এসে থামলো সাবিন। সে কিছু বললোনা। নিজের হিজাবের পিনটা একটু সমস্যা করছে দেখে সেটা চাপ দিয়ে ঠিকঠাক করে নিয়ে এগোলো মীরা। গলা খাঁকারি দিয়ে তাহমিনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দুঃখিত। আমাদের আসতে খানিকটা দেরী হয়ে গেলো। বুঝতেই পারছেন, বিজনেস সিজন আর ব্যস্ত দিনকাল।”
“না। ঠিক আছে। তেমন একটা দেরী হয়নি। আমরা মাত্রই ঘোষণা…”
“সাইনিং করে নেই? কুশলাদি নাহয় মিস্টার রেমানের সঙ্গেই বিনিময় করা যাবে?”
তাহমিনা কথা শেষ করার আগেই সাবিন নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাড়া দিলো। মুহূর্তেই মাথা নাড়লো সকলে। তাহমিনা নিজেই ডায়াস থেকে নেমে বাকি কর্মকর্তাদের সাথে সাবিনকে সিঁড়ি বেয়ে নিয়ে যেতে লাগলো বাইরের দিকে। তারা যখন কনফারেন্স রুম থেকে বেরোচ্ছে তখন ভেতরে অবস্থিত প্রত্যেকটি দৃষ্টি আটকে রইলো সাবিনের অবয়বের উপর।
সাবিনকে সি ই ওর কেবিনের বদলে টুয়েলভ ফ্লোরের বিশেষ টেরেসে নিয়ে যাওয়া হলো প্রাইভেট এলিভেটরে। কাঁচের দেয়ালে ঘেরা চারপাশ। সেখান থেকে বাইরের ঢাকা শহরটা একদম স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। আভিজাত্যের ছোঁয়া প্রতি পরতে পরতে। সাবিন সুস্থির এগিয়ে গেলো, দৃষ্টি সামনে রেখে। মসৃণ মেঝের মাঝ বরাবর নরম গদির আরামদায়ক সোফা। মাঝখানে কফি টেবিল। ওপাশের একটি সিংহাসন সদৃশ সোফায় বসে আছে এক রমণী। ধবধবে সাদা স্যুট এবং ওভারকোট পরনে। তার দীঘল রেশমি চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে সোফার গদির উপর ছড়িয়ে পড়েছে। সেই চুলের রং মূলত কালো হলেও মাঝে মাঝে হালকা রূপালী রেখা। কালার করিয়েছে স্পষ্ট। সাবিনকে দেখে সুদর্শনা নিজের হাতের ফাইল থেকে দৃষ্টি সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো। বিস্তৃত হেসে নিজের একটি হাত বাড়িয়ে ধরলো করমর্দনের উদ্দেশ্যে।
“হ্যালো, সাবিন হুসেইন।”
সাবিন তার হাতটা ধরলো। সামান্য দুলিয়ে বললো,
“হ্যালো, চারুলতা রেমান।”
“প্লীজ। বসুন।”
সাবিন এবং মীরা বসলো। সাবিনের সঙ্গে আসা কোম্পানির ম্যানেজার আবু কাশিম ভিন্ন একটি সোফায় বসলেন অন্যদের সাথে। একজন স্টাফ এসে কফি এবং নাস্তা পরিবেশন করে গেলো টেবিলে। সাবিন কিছুই ছুঁয়ে দেখলো না। মীরা অবশ্য কফি নিলো। অন্যপাশে বসা রেমান কন্যা চারুলতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সাবিনকে দেখে বললো,
“আপনার সম্পর্কে যেমন শুনেছি, তার চাইতে আপনি অনেকটাই আলাদা।”
বাঁকা হাসলো সাবিন। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে নিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে শুধালো,
“কেমন আমি?”
“ডেয়ারিং অ্যান্ড ডেঞ্জারাস। লাইক গ্যাসোলিন।”
পাল্টা তীর্যক হেসে হাতের ফাইলটা এগিয়ে দিলো চারুলতা। সাবিন সেটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে চুক্তিপত্র দেখতে লাগলো অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে। চারুলতা নিজের সোফায় হেলান দিয়ে বললো,
“একদম শেষ সময়ে প্ল্যান পরিবর্তনের জন্য দুঃখিত। ভাইয়াকে আজ সকালেই অতি জরুরীভাবে দেশের বাইরে যেতে হয়েছে। তাই ডিরেক্টর বোর্ডের হেড হিসাবে আমিই কিছুদিন কোম্পানি সামলাচ্ছি।”
সাবিন কোনো উত্তর করলনা। ফাইলটা ভালোমত দেখা হয়ে গেলে সে কলম তুলে নিলো সাইন করার জন্য। চারুলতা নিজের কফির মগে চুমুক দিয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে তাকে।
“কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করি?”
“করুন।”
দৃষ্টি কাগজের দিকে রেখেই অনুমতি দিলো সাবিন। কফিতে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে চারুলতা বললো,
“টেন্ডার আপনিই পাবেন সেটা আপনি জানতেন। তবে একটা জিনিস আমাকে খটকায় ফেলে দিচ্ছে। আপনার টেন্ডারের বাজেট কিন্তু বাকি সকল টেন্ডারের থেকে সবথেকে বেশি ছিলো! এরপরেও ভাইয়া আপনাকেই কেন ফাইনাল করলো করলো বলুন তো?”
সাবিনের কলম থামলো ক্ষণিকের জন্য। পরমুহুর্তেই সে সম্পূর্ণ সাইন করে ফাইলটা চারুলতার দিকে ঠেলে দিয়ে খানিকটা হেসে বললো,
“এই কারণেই আপনি হেড অব ডিরেক্টরস, আর উনি সি ই ও।”
চারুলতা অতি ক্ষীণ একটা হাসি নিয়ে চেয়ে রইলো সাবিনের দিকে। পরক্ষণেই দুই আঙ্গুল কপালে ঠেকিয়ে ছোট্ট একটা স্যালুটের ভঙ্গি করে ফিরিয়ে নিলো ফাইলটা।
***
রেমান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের কোম্পানি ভবন থেকে যখন সাবিন এবং বাকিরা বেরোলো তখন দুপুর। মীরা চোখে হাত দিয়ে রোদ আড়াল করে পার্কিং লট ধরে হাঁটতে হাঁটতে সাবিনকে জিজ্ঞেস করলো,
“ওই চারুলতা ম্যামের মতন আমারও একই প্রশ্ন। টেন্ডার বেশি দেয়া সত্ত্বেও আমাদের নির্বাচন করার লজিকটা বুঝলাম না। আগেরগুলো আমরা টেন্ডার কম রেখে বহু যুদ্ধ করেই পেয়েছিলাম।”
পাশাপাশি প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সাবিন একগাল হাসলো। উত্তর করলোনা। উত্তর এলো আবু কাশিমের তরফ থেকে।
“সাবিন ম্যামের ব্র্যান্ড ভ্যালু কত জানো না?”
মীরা থমকে গিয়ে তাকালো আবু কাশিমের দিকে। তিনি অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়ে বললেন,
“প্রথমত আমাদের টেন্ডার বেশি এমনি এমনি হয়নি। আমরা সবকিছু বেস্ট কোয়ালিটির হিসাব করেছি। উপরন্তু, ইকবাল আর্কিটেকচারাল ফার্ম আমাদের কোম্পানির সঙ্গে কোলাবে আছে। একটা জিনিসের মার্কেটিংয়ের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন খরচ হয়। কিন্তু সাবিন হুসেইন নিজেই একটা ব্র্যান্ড এবং দেশজুড়ে কন্ট্রোভার্শিয়াল কারণে ভাইরাল। হুসেইন গ্রুপ রেমান গ্রুপের প্রজেক্ট হাতে নিলে এমনিতেই সেটার প্রচার হবে। রেমান গ্রুপের মিলিয়নের এডভার্টাইজিং ফ্রি অব কস্ট। এক্ষেত্রে আমাদের কোম্পানি হচ্ছে ক্লাসের সেই ওয়ান পিস অবাধ্য ছেলের মতন যে উশৃঙ্খল, বেয়াদব হলেও রেজাল্ট কার্ডে সবসময় প্রথম! রেমান গ্রুপের সি ই ও ইয ভেরি ইন্টেলিজেন্ট।”
মাথা দোলালো মীরা। এবার বুঝেছে সে। সাবিনের ব্যক্তিগত সহকারী হওয়ার খুব বেশিদিন হয়নি তার, ব্যবসায়িক ব্যাপারগুলো এখনো শিখছে সে। নিজের সহকারী এবং ম্যানেজার কথা বলতে বলতে সাবিন খানিকটা এগিয়ে গিয়েছে। তবে পার্কিং লটের ভেতরে প্রাইভেট গ্যারেজে থাকা একটা বস্তু হঠাৎ করেই নজর কাড়লো তার। থমকে গেলো পদক্ষেপ। সানগ্লাস খুলে সে তাকালো নিগূঢ় দৃষ্টিতে। মীরা তাকে হঠাৎ থেমে যেতে দেখে পাশে এসে দাঁড়ালো। সাবিনের দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকাতেই দেখতে পেলো গ্যারেজের ভেতরে একটি কালো রোলস্ রয়েস গাড়ি রাখা। হালকা আলোর প্রতিফলনে চকচক করছে ধাতব জান্তব। বনেটের উপরে মূর্তির মতন লোগো এক অনন্য আভিজাত্যের প্রতীক। সাবিনকে একনাগাড়ে চেয়ে থাকতে দেখে মীরা জিজ্ঞেস করলো,
“কি দেখছিস?”
“আভিজাত্যের সিংহাসনকে।”
“রোলস্ রয়েস চাস? সেটা আমাদের বাজেটের বাইরে।”
মীরার কথা শুনে মুচকি হেসে সানগ্লাসটা পুনরায় চোখে পরে সাবিন বলে উঠলো,
“ব্যাপার না। একদিন আমারও হবে। অর্জন করে নেবো।”
***
টুকটুকিকে নিয়ে পায়চারি করতে করতে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে জারিন। যদিও সে এখনো ঘড়ির সময় পড়তে শিখেনি, তবে দিনের বেলা কাটাগুলো ঠিক কোন অবস্থানে কত কোণে বেঁকে থাকলে তার মায়ের আসার সময় হয় সেটি সে ভালোভাবেই বুঝতে পারে। কিভাবে পারে, জানেনা। বয়সের হিসাবটা মাত্র তিন হলেও তার মস্তিষ্ক অতীব ক্ষুরধার। এর মধ্যেই বাংলা এবং ইংরেজী বর্ণমালার অনেকগুলো অক্ষর চিনে ফেলেছে সে। কোথাও লিখা থাকলে বুঝে ফেলে। তবে কথার উচ্চারণ সুস্পষ্ট হয়নি। অনেকটাই জড়িয়ে যায়।
পায়চারি থামিয়ে জারিন গোলাপের মতন লালচে নরম ছোট্ট ঠোঁটজোড়া ফুলিয়ে টুকটুকিকে বললো,
“মাম্মাম কি আতবে না? জা-ইন হাঙগি! কুদা লেগেশে তো!”
টুকটুকি জারিনের খরগোশের আদলে তৈরি পুতুলের নাম। পুতুলটা সে সবসময় নিজের সাথে রেখে অভ্যস্থ। ছোট ছোট পা ফেলে এবার থপথপ করে হাঁটতে লাগলো জারিন। ঠোঁটজোড়া ফুলতে ফুলতে বলের মতন হয়ে গেছে তার, চকচকে বাদামী চোখজুড়ে অসীম অভিমান জমতে শুরু করেছে।
ঠিক তখনি বাংলোবাড়ির মূল দরজা খোলার শব্দ হলো। টুকটুকিকে বুকে চেপে উত্তেজিত হয়ে গুটিগুটি পায়ে ছুটে গেলো জারিন।
“মাম্মাম!”
ভেতরে প্রবেশ করলো সাবিন এবং মীরা। ছোট্ট জারিনকে ছুটে আসতে দেখে মীরা দুহাত মেলে ধরে বসে পড়লো নিচে,
“হেই সুইটহার্ট!”
কিন্তু সাবিন মুহূর্তেই তাকে আটকে ফেললো।
“তোকে কতবার না বলেছি, বাইরে থেকে এসে সরাসরি আমার মেয়েকে ধরবি না? যা, আগে ফ্রেশ হ।”
“ধুরু শালী। সবকিছুতে সমস্যা করিস তুই!”
গজগজ করতে করতে কাচুমাচু মুখে সিঁড়ি বেয়ে বাড়ির দুই তলায় উঠে গেলো। সাবিন দ্রুত হেঁটে চললো কিচেনে। জারিন তার পিছু নিলো।
“মাম্মাম, মাম্মাম! তুমি মীলা কালামুনিকে জাইনকে দততে দাওনা কেনো?”
মেয়ের কথায় মুচকি হাসলো সাবিন। নিজের শার্টের হাতা গুটিয়ে কিচেনের সিংকে ভালোমত সাবান দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিতে নিতে বললো,
“মীলা না, মীরা। আর জা-ইন না, তোমার নাম জারিন সোনা। মাম্মাম আর খালামণি তো বাইরে থেকে আসি, অনেক জীবাণু থাকে আমাদের হাতে। ইউ নো, জার্মস?”
“জার্মি জার্মি!”
“হ্যাঁ। জার্মি জার্মি তোমার মধ্যে ঢুকে গেলে? তোমার অসুখ করবে। আমার বেবিটাকে আমি কিভাবে অসুখে দেখবো,হুম?”
“অতুক অবেনা! জা-ইন জার্মি জার্মিকে দিসুম দিসুম কলে দেবে!”
ছোট্ট দুখানা হাত মুঠো করে ঘুষির ভঙ্গি করলো জারিন। তাতে হেসে ফেলল সাবিন। মেয়ের মায়াবী মুখ খানির চিত্রে তার চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে উঠল। হাত ধোয়া শেষে তোয়ালেতে মুছে নিয়ে দ্রুত হাঁটু মুড়ে মেয়ের সামনে বসে সাবিন তার ছোট্ট শরীরটাকে নিজের বুকে তুলে আগলে নিলো। অসংখ্য ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে দিলো জারিনের গোলগাল মুখটা। তারপর ফোলা গালে আলতো কামড় দিয়ে বললো,
“মাই বেবি, মাই হার্ট, মাই প্রিন্সেস!”
মায়ের ভীষণ আদরের বিপরীতে খিলখিল করে হেসে উঠলো জারিন। তার হাসির সুমধুর ধ্বনি প্রতিফলিত হলো বাড়িটার প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে।
“মাম্মাম এখন খাবে আর তোমাকে খাইয়ে দিবে, হুম? তারপর তুমি কিন্তু একদম লক্ষ্মী মেয়েটি হয়ে চুপটি করে ঘুমিয়ে যাবে। ঠিক আছে?”
“ইয়ে ন্যাপি ন্যাপি!”
সাবিন প্লেটে খাবার বেড়ে নিলো। ইতোমধ্যে সে জারিনকে নিজে নিজে খাবার খাওয়া শিখাচ্ছে। তবে আজ আলাদাভাবে দিতে ইচ্ছা হলোনা। সে নিজের ভাতের সঙ্গে মেয়ের জন্যও কিছুটা খাবার বেড়ে নিলো। তাকে খাবার নিতে দেখে কিচেন কাউন্টারের দেয়ালে চাপড় দিতে দিতে জারিন আবদার করলো,
“জা-ইন একানে কাবে না।”
সাবিন মেয়েকে শুধরে দিতে চাইলো,
“জারিন।”
“জা-ইন!”
“না মামণি। বলো, জা…”
“জা…”
“রিন!”
“রিন!”
“ভেরি গুড! জারিন!”
“বেলি গুদ! জা- ইন!”
হেসে ফেললো সাবিন এবার। মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,
“ওকে ওকে। আমরা পরে আবার প্র্যাকটিস করবো। চলো, কোথায় বসে খাবে তুমি?”
“জা-ইন আপ্পার কাতে কাবে!”
সাবিনের চেহারায় টলটলে এক অভিব্যক্তি খেলে গেলো। মেয়ের ছোট্ট একটি হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বললো,
“ঠিক আছে। চলো তার কাছে।”
এক হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে অপর বাহুর মাঝে মেয়েকে কোলে তুলে দুই তলায় উঠে গেলো সাবিন। মীরার ঘর এবং লম্বা একটা করিডোর পেরিয়ে এসে অবশেষে সে সফেদরঙা একটা দরজার সামনে থামলো। জারিন নিজের ছোট্ট হাত দিয়ে ঠেলে দিলো দরজাটা। উন্মুক্ত হলো পথ। সাবিন ধীরপায়ে প্রবেশ করলো ভেতরে।
কক্ষজুড়ে ওষুধের কড়া ঘ্রাণ। একদম ছিমছাম আবহ। সাদা এবং ধূসরের মিশেল চারিপাশে। হালদা পর্দাগুলো দুলছে বাতাসে। স্নিগ্ধ সূর্যরশ্মি ভেতরে ঢুকে স্বর্ণালী মোহে রাঙিয়ে তুলেছে চারপাশ। একপাশে নার্সিং কর্নারে দাঁড়িয়ে থাকা একজন নার্স সিরিঞ্জ মুছে পরিষ্কার করে রাখছে। সাবিনকে লক্ষ্য করে সে হালকা মাথা নাড়ল,
“হ্যালো ম্যাম।”
এটুকু বলেই সে নিজের কাজে মনোযোগ দিলো। রুমের একদম মাঝ বরাবর একটি বিশেষ বিছানা। রিমোটের সাহায্যে কন্ট্রোল করে মাথা, পা যেকোনো কিছু উঁচুনিচু করা যায়। সেই বিছানায় নরম ম্যাট্রেসের উপর শুয়ে আছে সাবিনের গোটা পৃথিবী।
জায়দান আরেফিন।
এক সময়কার তুখোড় বুদ্ধিমান প্রফেসরের খুব কম অংশই অবশিষ্ট আছে। ফিনফিনে পাতলা শরীর, তাতে নরম কাপড়ের পোশাক জড়ানো। লম্বাটে শরীরখানি পাথরের মূর্তির মতন শুয়ে আছে। ফ্যাকাশে শরীরে ত্বক, পাতলা মাথার চুল। ওই বাদামী মনকাড়া চোখজোড়া আজ কতদিন যাবৎ বুঁজে আছে! কতদিন সাবিন দেখেনা ওই চোখের মাতোয়ারা দৃষ্টি, শোনেনা ওই কণ্ঠের মধুর ধ্বনি! আজ সে শুধুই এক ভাস্কর্যমাত্র, সাবিনের নতুন বাড়ির একটি ঘর দখল করে নিঃশব্দে থাকে সে।
সাবিন ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো বিছানার কাছে। অতীব সাবধানে। জায়দানের নাকের সঙ্গে যুক্ত ন্যাসাল ক্যানোলা। বিছানার পাশেই একটি স্ট্যান্ডে স্বচ্ছ ফিডিং ব্যাগ ঝুলছে, সেটার পুষ্টিবর্ধক তরল সরু পাইপ বেয়ে প্রবাহিত হয়ে চলে গিয়েছে জায়দানের পেটের দিকে, যেখানে সংযুক্ত পি ই জি টিউব। বিছানার অন্যপাশে ছোট একটা পোর্টেবল ভাইটাল মনিটর, সেখানে পালস রেট প্রদর্শিত হচ্ছে। সমস্ত কক্ষই স্নিগ্ধতায় ঘেরা। অথচ ভেতরে উপস্থিত সহস্র রকমের মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি যেন এক আলাদাই মাতম সৃষ্টি করছে।
সাবিনের কোল থেকে রেলিং টপকে আস্তে করে বিছানায় নামলো জারিন। সাবিন রেলিংটা নিচে নামিয়ে নিজে এক কোণায় বসে মেয়েকে বললো,
“সাবধানে সোনা।”
জারিন একদম ধীরে গিয়ে জায়দানের শরীরে সামান্য হেলান দিয়ে ছোট্ট দুই পা ছড়িয়ে বসলো। সাবিন অপলক চোখে দেখলো দৃশ্যটা। জারিনের ছোট্ট অবয়ব নিজের পিতার সঙ্গে ঘেঁষে রয়েছে, কতটা মায়া তাতে! কব্জিতে সরু দুটো স্বর্ণের চুড়ি জড়ানো জারিনের। মসৃণ কালো লম্বা চুলে ঢাকা দুই কানেও পিচ্চি দুটো স্বর্ণের রিং। সেগুলো জ্বলজ্বল করে উঠল যখন সে নিজের একটা ছোট্ট বেবি ফ্যাটে ফোলা নরম হাত তুলে জায়দানের সরু ফিনফিনে হাতের তর্জনী শক্তভাবে মুঠো পাকিয়ে ধরলো।
“আপ্পা আমি কাই। তুমিও কাও!”
কোনো প্রতিক্রিয়া হলোনা। ওই একই হার্টবিট, একই মেডিক্যাল যন্ত্রপাতির ফস ফস শব্দ। ফিডিং টিউবের টিক টিক আওয়াজ।
“আপ্পা খাচ্ছে মামণি, আপ্পা খাচ্ছে।”
একপাশের ফিডিং টিউবের দিকে ইঙ্গিত করে দেখালো সাবিন। পরমুহুর্তে ভাতের গ্রাস মাখিয়ে মেয়ের মুখে তুলে। জায়দানের গা ঘেঁষে বসে টুকটুকিকে নিয়ে খেলতে খেলতে খেতে লাগলো জারিন। সাবিন ছলছলে দৃষ্টিতে দৃশ্যটা দেখলো। নিজের মুখে গ্রাস তোলার আগে সে ঝুঁকে নিথর, নিশ্চল জায়দানের ঠান্ডা কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করে বললো,
“আই মিস ইউ, মাই লাভ। আই মিস ইউ সো মাচ!”
_________চলবে_________
#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৫৬
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার।
কেরানীগঞ্জ কমপ্লেক্সের ভেতরের ওয়ার্ডটি বিশেষ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয়। নতুন হলেও দেয়ালে শ্যাওলার পরত। বিশাল রুম ধরে সারি সারি চৌকি পাতা। প্রথম দেখায় মনে হয়, বুঝি কোনো মেসে এসে পড়েছে কেউ। অথচ এটি অপরাধীদের জন্য নির্মিত জেলখানা।
সময়টা বিকালবেলা। সারাদিন কাজের শেষে দুপুরের খাবারের পর খানিকটা সময় পাওয়া যায়। বেশিরভাগ কয়েদী এই সময়ে নিজ নিজ টুকটাক কাজ নয়ত বিশ্রামে থাকে। চৌকির উপর নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে অনেকে। কেউ আবার এদিক ওদিক বসে গল্প গুজব সারছে। আপাতদৃষ্টিতে খুবই ফুরফুরে সময় মনে হলেও এখানে প্রতিটি মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটি গল্প।
সবার থেকে আড়ালে একদম কোণায় নিজের চৌকির ধার ঘেঁষে মেঝেতে বসে আছে কয়েদী নং ৪৫২১/২৭। পরনে ধূসর বর্ণের ফতুয়া এবং ঢোলা পায়জামা। ফতুয়ার পিঠে জেল কর্তৃপক্ষের লোগো। কিছুক্ষণ আগেই আসরের নামাজ শেষ করে জায়নামাজ কোলে রেখেই বসে আছে। হাতে একটি পুরাতন বই। জেলের লাইব্রেরীতে কাজ করার সুবাদে সে প্রায়ই গাদা গাদা বই নিয়ে আসে। অদ্ভূত হলেও সত্য জেলের কর্মচারী কর্মকর্তারা এই কয়েদীকে বেশ সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। শিক্ষিত বলে? অর্থবান বলে? জানা নেই কারো।
দুজন কয়েদী নিজেদের চৌকিতে বসে আড়চোখে তাকে দেখছে। তাতে তার বিশেষ কোনো খেয়াল নেই। সে মগ্ন নিজের দুনিয়ায়।
“এমন একটা থোবরা নিয়ে জেলে কে আসে ভাই?”
শুরু করলো প্রথমে একজন। অপরজন তার কথা শুনে খানিকটা বিস্মিত হলেও পরক্ষণে কয়েদী নং ৪৫২১/২৭ কে লক্ষ্য করে মৃদু হাসলো।
“চেহারায় যাস না ভাই। খু*নের আসামী!”
“খু*নের আসামী?”
“হ্যাঁ।”
হাসলো সে। বিদ্রূপ নিয়ে বললো,
“খু*নী কি ভাবছে জেলের ভেতর বসে নামাজ কোরআন পড়লে পাপ মোচন হয়ে যাবে? হাহাহা…!”
দুজনের কথোপকথন এবং টিটকারীমূলক মন্তব্যে লোকটির একটুও পরোয়া হলোনা। যেন সে নিজস্ব ধ্যানে মগ্ন, বাস করছে ভিন্ন জগতে, একমনে বসে হাতের বইটি পড়ছে। পাতা উল্টে সে সূর্যের আলোর দিকে মুখ বসে বসলো এবার।
“হুশ, এত জোরে কথা বলিস না। শুনতে পাবে।”
“শুনতে পেলে কি হবে? আমার কি চুলটা ছিঁড়বে?”
এমন সময়ে ওয়ার্ডের দরজা বেয়ে ভেতরে ঢুকলো এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার ইউনিফর্ম বুটের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো শক্ত মেঝে জুড়ে। জেলের জেলার। তীক্ষ্ণ চোখে দেখলেন তিনি চারপাশ। ওপাশ থেকে হেঁটে আসা জেলারকে দেখে দুজনেই চুপ করে গেলো। তাদের কথোপকথন জেলার শুনেছেন। তিনি মাথা কাত করে গম্ভীর আওয়াজে বললেন,
“যে নিজের ভাইয়ের জন্য দুই দুইটা খু*ন করে জেলের ঘানি টানতে পারে, সে আরো অনেক কিছুই করতে পারে! কথাবার্তায় সাবধানতা কাম্য নয় কি?”
চুপ করে গেলো সমস্ত ওয়ার্ড। জেলার গভীর নজরে দেখলেন একে একে সবাইকে। যেন নিঃশব্দে সতর্ক করলেন। তারপর কয়েদী নং ৪৫২১/২৭ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আয়দান। আমার সাথে এসো। তোমার জন্য বিশেষ একটা কাজ আছে।”
অবশেষে নিজের মনোযোগ ভেঙে বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো কয়েদী নং ৪৫২১/২৭—আয়দান। জায়নামাজ এবং বই সুন্দর মতন নিজের চৌকিতে রেখে ঝাঁকড়া চুলে আঙুল বুলিয়ে এগিয়ে গেলো জেলারের দিকে। তবে পথিমধ্যে থামলো সে। কিছুক্ষণ আগে তাকে নিয়ে গল্প করতে থাকা দুজনের দিকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকালো। উভয়েই বিনা কারণে খানিক সংকুচিত হয়ে গেলো। আয়দান মোলায়েম গলায় বললো,
“কার কোন পাপ কোন উছিলায় আল্লাহ্ পাক মোচন করবেন, সেটা বোঝার সাধ্য যদি মানবহৃদয়ের হতো, তাহলে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তির কোনো অভাব থাকতোনা।”
পিনপতন নীরবতা বিরাজমান চারিদিকে। সেটি ছাপিয়ে আয়দানের গভীর কন্ঠ ধ্বনিত হলো,
“তুমি সেদিনই হেরে গিয়েছ, যেদিন বিশ্বাস করে নিয়েছ তোমার ফেরাকে তোমার রব স্বাগতম জানাবেন না।”
আর দাঁড়ালোনা আয়দান। জেলারকে অনুসরণ করে ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে গেলো। উপস্থিত কয়েকজন কয়েদীদের মধ্যে গুঞ্জণ পরে গেলো। এর মধ্যে বয়স্ক গোছের একজন বাকিদের উদ্দেশ্যে হঠাৎ করে বলে উঠলেন,
“ওর সাথে লাগতে যাইস না। ওর মধ্যে নূরানী কিছু একটা আছে, আমি অনুভব করবার পারি। খোদার লগে ওর আত্মার সম্পর্ক।”
জেলখানার চারদেয়ালের মাঝে বাণীটি ভীষণ অলৌকিক এবং অবাস্তব শোনালো। অথচ কয়েদীদের বেশিরভাগই জানে, কথাটা চরম সত্য।
***
জারিনের আজ প্লে- গ্রাউন্ডে যাওয়ার নির্ধারিত দিন। প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে চারদিন তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়। বেশিরভাগ দিন সাবিন সাথে থাকলেও আজ কোম্পানিতে অতি জরুরী মিটিং থাকার কারণে সে মেয়ের সাথে যেতে পারেনি। তাই বলে মেয়ের এত সাধের সময়টা রুখে দেয়নি সে। আজ ন্যানি এসেছে তার সাথে। সাবিন যখন বাড়িতে থাকে না, সেই সময়টায় জারিনের দেখাশোনা করার জন্য একজন বিশ্বস্ত মহিলা রেখেছে সে।
গাড়ি প্লে গ্রাউন্ডের সামনে এসে থামতেই উত্তেজিত জারিন লাফিয়ে নেমে পড়লো ভেতর থেকে। খুব সুন্দর একটা টকটকে লাল ফ্রক পরনে তার। মসৃণ চুলগুলো মাথার দুপাশে দুটো খাড়া ঝুঁটি করে রাখা। হাতের চুড়ি এবং কানের স্বর্ণের রিং হালকা রোদের আভায় জ্বলজ্বল করে উঠল তার। হাতের টুকটুকিকে ধরে গুটিগুটি পায়ে দৌঁড়ে সে চলে গেলো ভেতরে। বন্ধুরা অপেক্ষা করছে তার। অনেকগুলো বন্ধু হয়েছে তার প্লে গ্রাউন্ডে। খেলতে এলে দেখা হয়।
আজও সকলে এসে পড়েছে। একজনের মা ম্যাট বিছিয়ে দিয়েছে। বাকিরা সেটার উপর বসে খেলনা দিয়ে খেলছে, হাসাহাসি করছে। তাদের বাবা মায়েরা আশেপাশে হাঁটাহাঁটি করছে, নিজেদের মধ্যে কথোপকথনে ব্যাস্ত তারা। জারিন ন্যানির সাবধানবাণী কানে না তুলেই দৌঁড়ে গিয়ে ম্যাটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
“আততালামু আলাইকুম!”
অন্যান্য বাচ্চারা অবাক হয়ে ঘুরে তাকালো। অদূরে দাঁড়ানো একজন মহিলা মৃদু হেসে বললো,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম! কি মিষ্টি! তোমাকে সালাম দেয়া কে শিখিয়েছে বাবু?”
“মাম্মাম! মাম্মাম বলে তবাইকে তালাম দিতে অয়, তাহলে আল্লাহ আদল দেয়।”
“মাশাআল্লাহ।”
মুখে মুখে প্রশংসা খেলে যেতেই জারিন ভীষণ গর্বিত হাসলো। পরমুহুর্তেই বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় যোগ দিলো। তার ন্যানি পাশেই নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে রইলো, যেন বাচ্চাদের অসুবিধা না হয়।
ব্লক, টয়ট্রেন, বল দিয়ে খেলতে খেলতে একঘেঁয়ে হয়ে যাওয়া বাচ্চারা আজ নতুন একটা খেলা আবিষ্কার করলো। তারা একে অপরকে নিজেদের বাবা মায়ের নাম বলে বলে শোনাচ্ছে। কার বাবা মায়ের নাম সবথেকে সুন্দর সেটা নির্ণয় করাই আজকের মহতী লক্ষ্য তাদের।
“আমার আব্বুর নাম শফিক চৌধুরী, আর আম্মু হাসনাহেনা চৌধুরী।”
“হাসনাহেনা! ফ্লাওয়ার! অনেক সুন্দর!”
তালি দিয়ে একে অপরকে উৎসাহ জানাচ্ছে সবাই। সবশেষে এলো জারিনের পালা। সে লালচে কোমল ঠোঁটজোড়া ফুলিয়ে সুন্দর করে উচ্চারণ করতে চাইলেও অস্পষ্ট ভাষায় বেরোলো শব্দগুলো।
“আমাল মাম্মাম তাবিন হুতেইন।”
“ওটা সাবিন হুসেইন।”
খিলখিল করে হেসে সবচেয়ে স্পষ্টবাদী বাচ্চাটা শুধরে দিলো জারিনকে। এ এই গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে বড়, বছর পাঁচ। তাই উচ্চারণ পরিষ্কার। সাবিন আগেও জারিনকে নিয়ে প্লে গ্রাউন্ডে এসেছে, তখন তার নামটা জানা হয়েছিল তার। বাচ্চাটার কথা শুনে মুখ ফোলালো জারিন। তার মায়ের নাম অন্য কেউ বলে দেবে, এটা তার জন্য অপমান এবং ঈর্ষার বিষয়। মাথা ঝাঁকিয়ে জারিন এবার বললো,
“যাই অক, আমাল আপ্পা আল মাম্মামের নাম অন্নেক তুন্দল!”
দুহাত যত দূরে সম্ভব ছড়িয়ে কত বড় সুন্দর ভঙ্গি করে দেখিয়েও দিলো জারিন। তারপর বেশ গর্ব নিয়ে দাঁত কেলিয়ে জানালো,
“আমাল আপ্পা জায়লান আলেপিন!”
“আলপিন?”
“আলেপিন!”
অপমানিত বোধ করলো জারিন রীতিমত। কত বড় সাহস! তার বাবার নামকে এরা বিকৃত করে উচ্চারণ করে! একটা হাসির রোল পড়ে গেলো বাচ্চাদের মাঝে।
“আচ্ছা আচ্ছা, তুমি যেমন বলো। কিন্তু তোমার আপ্পাকে তো তোমার সাথে দেখাই যায়না। খেলে না তোমার সাথে?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ। আমাদের সবার ড্যাডি মাম্মি আসে। কিন্তু তোমার তো শুধু মাম্মি আসে। তোমার বাবা কোথায়? উনি কেন আসেনা? উনি তোমাকে পছন্দ করেনা?”
“উনি মনে হয় আমাদের আব্বুদের মতন ওনার বাচ্চাকে ভালোবাসে না।”
শিশুদের মাঝে অদ্ভূত এক তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়লো। জীবনে পিতা মাতার অনুপস্থিতি তাদের ছোট্ট মস্তিষ্কে না ভালোবাসারই সামিল। অজস্র প্রশ্নবাণে জর্জরিত ছোট্ট জারিন না বিষয়টা হজম করতে পারলো, আর না তো সইতে পারলো। তার পিতাকে ঘিরে এমন প্রশ্নবাণ নতুন নয়। সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো,
“জা-ইনের আপ্পা অলেক বালো, অলেক তুন্দল!”
“তাই হলে তোমার আপ্পা তোমার সাথে খেলতে আসেনা কেনো?”
এই প্রশ্নের জবাব নেই জারিনের কাছে। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো তার সঙ্গীদের দিকে। ঠিকই তো! প্লে গ্রাউন্ডে সবার বাবাই এসেছে। অদূরে দেখা যাচ্ছে, একজন ছেলের বাবা মা দুজনই হাসিমুখে দোলনা ঠেলে দিচ্ছে, ছেলেটি ভীষণ মজায় খিলখিল করে হেসে উঠছে। অপরদিকে একটি এক বছরের শিশুকন্যাকে বুকে অতি যত্নে আগলে রেখে পার্কের ধারে হাঁটাহাঁটি করছে এক সুদর্শন ভদ্রলোক।
“জারিনের আপ্পা বালো না! জারিনের সাথে কেলেনা!”
অপর এক খেলার সঙ্গী বলে উঠতেই জারিন হাতের পুতুল টুকটুকিকে শক্তভাবে চেপে ধরলো। তার ডাগর ডাগর বাদামী আঁখিজুড়ে অশ্রুর বন্যা বয়ে গেলো। সে তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করে উঠলো,
“জা- ইনের আপ্পা স্পেতাল! আপ্পা কুব স্পেতাল! তোমলা খালাপ! তোমলা কুব খালাপ! আমাল আপ্পা বালো, অনেক বালো! আমি দানি, আপ্পা কেলবে, আপ্পা একদিন জা-ইনের সাতে কেলবেই কেলবে!”
অশ্রু ভাসিয়ে চলে গেলো জারিনের বুক অবধি। সকলে ফিরে ফিরে তাকালো হঠাৎ একটা বাচ্চার এমন আর্তনাদে। জারিন টকটকে লাল মুখে চিৎকার করে বললো,
“আপ্পা জা-ইনকে বালোবাতে! আপ্পা জা-ইনকে আদল কলে! আপ্পা লাব ইউ! আপ্পা অলেক অলেক লাব ইউ!”
ন্যানি আর দাঁড়িয়ে থাকলো না। ছুটে এসে ক্রন্দনরত জারিনকে কোলে তুলে নিজের বুকে জাপটে ধরে শান্তনা দিলো। বাকি সকল বাচ্চা এবং অভিভাবক বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলো দৃশ্যটি।
***
হুসেইন গ্রুপ কোম্পানিভবন।
মিটিংরুমে বসে আছে সাবিন। গত রাতে কাজের চাপে একফোঁটা ঘুম হয়নি তার। সকাল থেকেই কর্মব্যস্ততা। ক্লান্ত লাগছে ভীষন। অথচ সে শিরদাঁড়া টানটান করে টেবিলের প্রধান চেয়ারে বসে আছে। তার ঠিক বিপরীত দিকে একজন পুরুষ বসে আছে।
মিসির। এই মুহূর্তে তার স্বামীর বন্ধুটি দ্রুত হাতে একটা রাফ স্কেচ করছে। রেমান গ্রুপের টেন্ডার লাভের পর সাবিন মিসির ইকবালের আর্কিটেকচারাল ফার্মকেই দায়িত্ব দিয়েছে ডিজাইনের জন্য। সেই মিটিংটা প্রায় শেষ, মিসির শুধু অন্তিম কিছু অ্যাডজাস্টমেন্ট করছে।
সাবিন একনাগাড়ে মিসিরকে দেখে গেলো। এই কয়েক বছরে মুখটা খানিকটা ভারী এবং গুরুগম্ভীর হওয়া বাদে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি ছেলেটার মাঝে। এই পুরুষটির কাছে সাবিনের কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। যখন একটা খুঁটির প্রয়োজন ছিলো জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা সামাল দেয়ার, তখন সেই খুঁটি না হতে পারলেও অন্তত ভরসা – সহযোগীতা নিয়ে সে পাশে ছিল। বাকিটা সাবিন কাটিয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ নিজস্ব চেষ্টায়। তবুও, কেউ তো অন্তত সাথে ছিল যখন সে কোর্টে কোর্টে আর হাসপাতালে চক্কর কেটেছে।
“তুমি ফাইনালি বড় সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললে জেনে সত্যি খুব ভালো লাগছে, মিসির।”
সাবিনের হঠাৎ মন্তব্যে মুখ তুলে তাকালো মিসির। এতক্ষণ নুয়ে থাকায় তার কপালে এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চুল। সেগুলো হাতের আঙুলে গুছিয়ে নিতে নিতে মৃদু হেসে সে জানালো,
“বাবা মায়ের ইচ্ছা। তাছাড়া, বিয়ে তো সুন্নত। একদিন না একদিন করতেই হতো।”
“শুধু আংকেল আন্টির জন্য? তোমার ইচ্ছা নেই? হবু স্ত্রীকে পছন্দ হয়নি?”
মিসির বুকে দুবাহু বেঁধে খানিকটা ভেবে বললো,
“আপাতত ওনার মাঝে পছন্দ না হওয়ার কিছু দেখছি না। বাকিটা নাহয়, সময় শিখিয়ে দেবে?”
তীর্যক হাসলো সাবিন।
“উনি! অনেক সম্মান দেয়া হচ্ছে তাহলে!”
এবার খানিকটা শব্দ করে হাসলো মিসির। সেই হাসিটা যেমন হঠাৎ করে উদয় হয়েছিল, তেমন হঠাৎ করেই আবার মিইয়ে গেলো। আনমনে মিসির বলে উঠলো,
“আমি এত বড় একটা কাজ ওকে ছাড়া করতাম না সাবিন, কোনোদিন করতাম না! যদি ডাক্তার একবার বলতো, শুধু একবার আশ্বাস দিতে পারতো একদিন ও ফিরে আসবে, একদিন ও উঠে বসবে, আমাদের সঙ্গে কথা বলবে, বছর বছর পেরিয়ে গেলেও আমি ওই দিনটার আশায় বসে থাকতাম!”
সাবিনের চেহারায় অমাবস্যার আঁধার নেমে এলো। মিসিরের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ভিন্নদিকে তাকালো সে। ডাক্তার জায়দানের অবস্থা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। কতদিন এভাবে ধুঁকে ধুঁকে শরীরটার বাঁচা হবে তা অনিশ্চিত। আর কোনোদিন কি ফিরে আসবে সে? তাও অনিশ্চিত। উত্তর মেলেনা এই প্রশ্নের।
জায়দান কোনো ডিপ কোমায় নেই। সে যে অবস্থায় আছে তাকে মেডিকেলের ভাষায় বলে প্রোলংড মিনিমালি কনশাস স্টেট, সংক্ষেপে এম সি এস। দূর্লভ এই অবস্থাটি সাবিনের নিজের স্বামীকেই একদিন গ্রাস করে নেবে সে কি ভেবেছিল কোনোদিন?
সাবিন বেশি ভাবার কিংবা মিসিরের কথার প্রতিক্রিয়া করার সময় পেলনা। এর আগেই মিটিং রুমের দরজা খুলে গেলো। ভেতরে প্রবেশ করলো নীলাভ স্যুট পরিহিত একজন।
আরিয়ান হান্নান। পঁয়ত্রিশ বছর বয়স্ক এক ভদ্রলোক। প্রভাবশালী হান্নান পরিবারের ছোট সন্তান। বাবার পর বড় ভাইয়ের বদলে নিজের যোগ্যতায় ব্যবসায় বসেছে। আজ তার কোম্পানির সঙ্গে একটা ডিল সাইন হচ্ছে সাবিনের। এই ব্যবসায়িক বন্ধুত্ব যদি সফল হয়ে যায়, তবে হুসেইন গ্রুপকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবেনা। তাকদীর হুসেইন চলে যাওয়ার পর যে গ্রুপ কাদায় নেমে গিয়েছিল, আজ সেই গ্রুপকে আবারো টেনে ধীরে ধীরে একটু একটু করে উপরে তুলছে সাবিন। সেক্ষেত্রে হান্নানদের সঙ্গে এই চুক্তিটা সাফল্য দ্রুত অর্জনে বিরাট ভূমিকা রাখবে।
“মিস্টার হান্নান। প্লীজ বসুন।”
সাবিন স্বাগতম জানাতেই বিরাট হেসে চেয়ার টেনে টেবিলের পাশে বসে পড়ল আরিয়ান। মীরা বাহির থেকে কফি নিয়ে এলো এমন সময়ে। একটি মিসিরকে দিয়ে অপরটি সে আরিয়ানের সামনে রেখে দিয়ে বললো,
“ফাইল তৈরিই আছে স্যার, আপনি দেখে নিন।”
দক্ষ সহকারীর মতন মীরা ফাইল বের করে কাজে লেগে গেলো। তবে আরিয়ানের মনোযোগ অ্যাসিস্টেন্টের তুলনায় অধিক তার বসের উপর। একনাগাড়ে সাবিনকে দেখে আরিয়ান বলে বসলো,
“ইউ আর লুকিং টায়ার্ড টুডে, মিস হুসেইন।”
নিজের কপাল ঘষতে ঘষতে মিসিরের হাতের পেন্সিলের চলন দেখছিল সাবিন। কণ্ঠটি কানে যেতেই ভ্রু তুলে ঘুরে তাকিয়ে আরিয়ানকে দেখলো সে। বান্দা বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে বসে আছে। কফির কাপের উপর দিয়ে সাবিনকে দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।
“রাতে ঘুম হয়নি, না?”
দৃষ্টি সরু হলো সাবিনের। আরিয়ানের এমন ব্যক্তিগত আলাপ এই প্রথম নয়। বিশেষ করে পরিচয় হওয়ার পর থেকে প্রায়ই এই লোক তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে জুড়ে যেতে চায়। বিষয়টা বহুদিন যাবৎ কঠোর পেশাদারিত্ব অবধিই সীমাবদ্ধ রেখেছে সাবিন। তবে আজ এমন প্রশ্ন কেন যেন গায়ে লাগলো তার। বিশেষ করে মিসির এবং মীরার সামনে বলায়। এতে দুজনকেই কি ভুল ইঙ্গিত দেয়া হলোনা?
“মিসেস হুসেইন আরেফিন!”
সাবিন ঝাঁঝালো কন্ঠে শুধরে দিলো আরিয়ানকে। তাতে একগাল হাসলো আরিয়ান। কফির মগ রেখে সোজা হয়ে বসে বললো,
“উপস। মাই মিস্টেক। আসলে আপনাকে দেখলে আমি সত্যিই ভুলে যাই আপনি বিবাহিত। কি করবো বলুন, ওই বিয়ে থাকা না থাকা একই কথা।”
এই কথাটা এবার সত্যিই অনেক গায়ে লাগলো সাবিনের। দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললো সে। তবে প্রতিক্রিয়ার আগেই পাশ থেকে গম্ভীর গলায় মিসির বললো,
“এক্সকিউজ মি? আপনার মনে হয়না আপনি প্রফেশনালিজমের সীমা লঙ্ঘন করে যাচ্ছেন?”
মাথা ঝাঁকিয়ে হাসলো আরিয়ান।
“প্রফেশনালিজম? ওয়েল, অবশ্যই। তবে যেহেতু লং টার্ম বিজনেস করতে হবে, সেহেতু একটু ব্যক্তিগত পরিচয় থাকাই দরকার তাইনা?”
মিসির কিছু বলতে যাচ্ছিল তবে সাবিন নীরবে হাত উঁচু করে থামিয়ে দিলো তাকে। সেটি লক্ষ্য করে আরিয়ান আরও বিস্তৃত হাসলো।
“দেখুন মিস…আই মিন মিসেস হুসেইন আরেফিন, আমি আর পাঁচজনের মতন লুকিয়ে চুরিয়ে কিছু করতে পারিনা। যা করব বা বলবো সামনা সামনি। আপনাকে আমি আগেও একবার বলেছি, আজ আবারও বলছি। আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।”
পিনপতন নীরবতা নেমে এলো মিটিং রুমজুড়ে। মীরা ফাইল আঁকড়ে ধরে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। মিসির চেয়ারের হাতল ধরে ক্রুদ্ধ চোখে তাকালো, শুধুমাত্র সাবিন নিষেধ করায় সে এখনো বসে আছে। সাবিন তুলনামুলক শান্ত, একটু বেশীই শান্ত। আরিয়ান তাতে সাহস পেয়ে বললো,
“আমি জানি আপনার একটা মেয়ে আছে অ্যান্ড অল। আমার কোনো প্রবলেম নেই। আই উইল বি আ ফাদার টু হার। আপনিই বা আর কত বছর যাবৎ একটা অনিশ্চিত সম্পর্কের বোঝা টানতে থাকবেন? আপনার মেয়ের একটা বাবার দরকার, আমার একটা বউয়ের দরকার। আর আমাদের দুজনের বিজনেসেরই পার্টনার দরকার। থিঙ্ক অ্যাবাউট রিয়ালিটি। আমার কাছে আছে নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা, সহযোগিতা। এভরিথিং ইউ নিড রাইট নাউ! দিনশেষে একজন নারী যত সফলই হোক না কেন, পুরুষ নেই তো ভ্যালু নেই।”
মীরা শুনতে পারলোনা। কঠোর গলায় বললো,
“লজ্জা লাগেনা আপনার? একজন বিবাহিত মেয়েকে এমন কথা বলতে? আপনার প্রয়োজন আছে কার? সাবিনের কি স্বামী নেই?”
“স্বামী? ওহ…ইউ মিন ওই প্রফেসর? ইজ নট হি জাস্ট আ ভেজিটেবল নাউ? মিসেস হুসেইন আরেফিনের সকল চাহিদা, হোক তা আর্থিক, সামাজিক কি শারীরিক, পূরণ করতে সে একেবারেই অপারগ।”
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সাবিন। হতবাক মিসির এবং মীরাকে পিছনে ফেলে সে আরিয়ানের সামনে এসে দাঁড়ালো। বান্দা বেশ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে ঠোঁটে হাসি নিয়ে চেয়ে রইলো সাবিনের দিকে।
“ঠিকই বলেছেন আপনি।”
সাবিনের কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো মিটিং রুমজুড়ে। আরিয়ানের হাসি বিস্তৃত হলো আরও।
“রাইট?”
“হুম। আমার স্বামী অপারগ।”
বিদ্যুৎ গতিতে ঘটলো পরবর্তী ঘটনাটি। কেউ কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ অবধি পেলনা। নিজের পরনের হাই সোলের শু জুতা পা থেকে খুলে নিয়ে অপর হাতে আরিয়ানের চুলের মুঠি পাকিয়ে ধরে সাবিন হুংকার দিলো,
“আর তুই একটা প্রতিবন্ধী!”
জুতাটা দিয়ে সপাত করে আরিয়ানের গাল বরাবর চাপড় মারলো সাবিন। একবার না, অসংখ্যবার। চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে গেলো মিসির, তবে সাবিনকে থামানোর চেষ্টা করলোনা কেউই। হট্টগোলের শব্দে বাইরে থেকে সিকিউরিটি গার্ড এবং অন্যান্য কিছু কর্মকর্তা ছুটে এলো, দেখলো এক উন্মত্ত ঘূর্ণিঝড়কে। আরিয়ানের মুখটা টেবিলের উপর সশব্দে চেপে ধরে জুতার বাড়ি হাঁকাতে হাঁকাতে সাবিন বললো,
“আমি বাঁচলে ওর জন্য বাঁচি, মরলে ওর জন্য মরবো। তোর মতন সুযোগ সন্ধানী হারামীর জন্য না! ভেজিটেবল? অপারগ? শুনে রাখ লোভী, আমার স্বামী শুধু আমার স্বামী না, আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিচরণ তার। অসুস্থ শরীর কেন, তার পোশাকের একটা ছিঁড়া টুকরোকে নিয়েও আমি জনম জনম কাটিয়ে দিতে পারি। নারী আমি, তোর মতন লালায়িত পুরুষ না! আমার স্বামী যে রাস্তায় হাঁটত, সেই রাস্তায়ও আমি তোর অপবিত্র ছায়া পড়তে দেবোনা, শালা মাদারের বাচ্চা! আমার মেয়ের ঠেকা পড়েনি তোর মতন কুত্তাকে বাপ ডাকবে! তোর চুক্তি আর কপাল দুটোর উপরই আমার জুতার বাড়ি!”
ধাক্কা দিয়ে আরিয়ানকে দূরে সরিয়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে সাবিন চিৎকার করে উঠল,
“দূর হ! আমার কোম্পানির সামনে থেকে দূর হ তুই! তোকে যদি এই সাবিন দ্বিতীয়বার নিজের চোখের সামনে দেখে, কসম তোর কলিজাটা টেনে ছিঁ*ড়ে ফেলবে!”
_________চলবে_________

