২৫.
ঢাকার আকাশ তখন মেঘাচ্ছন্ন। আবছা অন্ধকার কেড়ে নিচ্ছে সূর্যের জ্যোতি। বিংশ শতাব্দীর প্রতিটি শহুরে সকাল আবহাওয়ার পরোয়া করে না। ঝলমলে রোদমাখা দিন হোক কিংবা ঝমঝমে বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা। অফিস- স্কুল- কলেজের তাড়া এক ধরনের অস্থিরতা বয়ে আনে রাস্তাঘাটে। শোরগোল আর ব্যস্ততায় হারিয়ে যায় প্রকৃতির অপূর্ব সুন্দর লীলাখেলা।
সি আই ডি সদর দপ্তরের পুরনো ভবনটা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মিন্টু রোডের দিকে। পুরোনো ধূসর দেয়াল। কিছু অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। এই ভবনের জং ধরা জানালার গ্রিলগুলো শহরের কতশত অপরাধের সাক্ষী!
দপ্তরের করিডরের ফ্লোরে রাতে হাত ফসকে পড়ে যাওয়া চায়ের দাগ শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সিগারেটের ছাই।
প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে একগাদা ফাইলের স্তূপ। অতি সাধারণ ঘুনে ধরা টেবিল। ধুলো জমা সিলিং ফ্যান আর এক কোণায় অযত্নে ফেলে রাখা টাইপরাইটার।
দপ্তরের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে আলো একেবারে নেই বললেই চলে। টেবিলের ওপরে অগোছালো এলোমেলো সকল ফাইলের মধ্যে একটি ফাইল শুধুমাত্র যত্নের সহিত আলাদা করে রাখা। ফাইলের মলাটে লাল অক্ষরে লেখা “প্রজেক্ট রজনীগন্ধা”।
ডিআইজি রাশেদ, সন্তপর্ণে একটা সিগারেট ধরালেন। চশমার কাঁচের ভেতর দিয়ে তার চোখ দুটো নিস্তেজ বলে মনে হলেও লুকিয়ে আছে বিরক্তি। কালাচাঁদ এখনো আসে নি। ঘরদোর পরিষ্কার করা আর ঘন্টায় ঘন্টায় চা বানিয়ে আনা কালাচাঁদের মূল কাজ। সম্প্রতি তার মাঝে ফাঁকিবাজির উপসর্গ দেখা দিয়েছে। সময় মত অফিসে আসে না। আসলেও ঠিকমতো ঘর পরিষ্কার করে না। এদিকে কালাচাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। সে নাকি নাক ঘুটে সেই আঙুল দিয়ে চায়ের পানিতে জলকেলি করে! কি ভয়ংকর ব্যাপার। কালাচাঁদ রাশেদের পূর্বপরিচিত। তার মা দীর্ঘদিন যাবৎ রাশেদের মায়ের বাড়িতে কাজ করেছে। এখন তার গর্ভবতী বউয়ের দেখাশোনা করছ। কাজেই, অফিসাররাও সরাসরি কোনো কিছু বলার সাহস পায় নি। মিনমিন করে শুধুমাত্র অভিযোগ জানিয়ে গিয়েছে।
রাশেদ নিঃশব্দে ধোঁয়া ছাড়লেন। এমন সময় ঘরে প্রবেশ করল অফিসার মাহতাব। শুধালো,
– স্যার, আমাকে ডেকেছেন?
রাশেদ মাথা ঝাঁকালেন।
– বসো।
মাহতাব বসল। রাশেদ সময় নিয়ে সিগারেট শেষ করলেন। এরপর মাহতাবকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
– তেঘরিয়া সম্পর্কে যে খবরটা আমরা পেয়েছি তা একদমই মিথ্যে নয়। নারী পাচারের যে চক্রটা গড়ে উঠেছে, সেটা শুধু স্থানীয় নয়। এর পেছনে এখানকার বেশ বড় বড় মাথা আছে।
মাহতাব চুপ করে রইল ক্ষণিককাল। এরপর টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা উল্টে দেখল। সেখানে কয়েকটা ছবির সঙ্গে গোপন রিপোর্টের খণ্ডাংশ। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ছবি।
মাহতাব ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
– স্যার, আমাদের অতি দ্রুত একশনে যাওয়া উচিত।
– দ্রুত একশনে যাওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হলে ক্রিমিনালরা আরো বেশি সতর্ক হয়ে যাবে। প্রথমে এলাকার ওপর সর্বক্ষণ নজরদারি রাখার জন্য কাউকে পাঠানো উচিত।
– কিন্তু কাকে পাঠানো হবে? এরকম সুনসান হাওর এলাকায় কে যেতে চাইবে? বিষয়টি সুইসাইডাল স্যার।
রাশেদ প্যাকেট থেকে আরেকটি সিগারেট বের করে ধরালেন। ধোঁয়ার রিং শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে চুপচাপ তাকালেন জানালার দিকে। আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। মাতাল গাড়িগুলোর হর্নের শব্দ কানের পোকা নাড়িয়ে দিচ্ছে তার। রাশেদ কানে এক আঙুল ঢুকিয়ে বললেন,
– আমি এমন কাউকে পাঠাতে চাই যার মাঝে জানের মায়া নেই। নিয়মিত অফিসার দিয়ে একাজ হবে না। এক্সট্রাওর্ডিনারি কাউকে লাগবে।
মাহতাব ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
– স্যার, আন্ডারকভার?
রাশেদের ঠোঁটের কোণে অল্পবিস্তর হাসি ফুটে উঠল।
– হ্যাঁ। এই মিশন সম্পর্কে শুধুমাত্র আমরা জানব। দপ্তরের বাহিরে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। ক্লিয়ার?
– জি স্যার। বুঝতে পেরেছি।
– ভেরি গুড।
রাশেদ ফাইলের উপর হাত রেখে শেষবারের মতো বললেন,
– এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় মিশন হল ‘এন্টি রজনীগন্ধা’।
সি আই ডি সদর দপ্তরের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে নেমে এলো নীরবতা। ঘরের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে উঠল। যেন পুরনো দেয়ালগুলোও গোপন কথোপকথনের সাক্ষী হয়ে গেছে আজ। আর এমনটা মোটেও উচিত হয় নি।
ফাইলের ছবিগুলোর দিকে আরেকবার চোখ বুলিয়ে অফিসার মাহতাব গলা খাঁকারি দিল।
– স্যার। একটা কথা জানতে চাই।
রাশেদ ভ্রু কুঁচকালেন।
– কী কথা?
মাহতাব আঙুল দিয়ে ছবিগুলোর দিকে ইশারা করল।
– এসব ছবি জোগাড় করতে আমাদের কে সাহায্য করলেন? এত ভেতরের কলুষিত তথ্য তো হুট করে কারো হাতে আসবার মত নয়।
ঠিক তখনই দরজাটা কঁকিয়ে খুলে গেল। হালকা ভেসে আসা বাতাসে ফাইলের কাগজ তিরতির করে কেঁপে উঠল। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে ভেতরে ঢুকল সারথি। সাংবাদিক মহলে তার নামটা সুপরিচিত। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভরা মজলিশে তালুকদার মশাইকে প্রকাশ্যে সাশিয়ে এসেছিল। এ ঘটনা এখনো তেঘরিয়ার জনমনে অদৃশ্যভাবে জেঁকে বসে আছে।
সারথি টেবিলের ওপর কাপ রেখে মিষ্টি করে হাসল।
– মাহতাব সাহেব, এই ছবিগুলো আমি জোগাড় করেছি। বহুদিনের খোঁজখবর। তেঘরিয়ার এই চক্রটা হঠাৎ জন্মায়নি। এর বীজ বহু আগেই বোনা হয়েছিল। আমি শুধু প্রমাণগুলো সংগ্রহ করেছি।
রাশেদ গম্ভীরভাবে তাকালেন তার দিকে।
– মানে, তুমি আগে থেকেই এ বিষয়ে জানো?
সারথি স্পষ্টভাবে উত্তর দিল,
– শুধু জানি না। সচক্ষে দেখেছি। ইউনিয়ন পরিষদ ভোটের সময় থেকেই তালুকদার আর তার লেলানো দোসরদের দিকে আমার নজর। সবকিছুই ছিল সাজানো খেলার মতো। নিজের বড় ছেলের প্রথম স্ত্রীকে গুম করে ফেলা, এরপর অল্পবয়স্ক একটি এতিম মেয়েকে ছেলের বউ করে ঘরে নিয়ে আসা সবকিছুই ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। গ্রামের সকলের সামনে মহান সাজার এক অপূর্ব ছলচাতুরী। একটি সুপরিকল্পিত নোংরা এবং ঘৃণিত অপরাধ করার জন্য কত বড় আয়োজন!
রাশেদ তার চশমাটা খুলে সাবধানে টেবিলের ওপর রাখলেন।
– এই মিশনে কোন অফিসারকে পাঠানো যায় বলে তুমি মনে করো সারথি?
সারথির ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল। বলল,
– একজনই তো আছে, স্যার। আমি নিশ্চিত আপনার মাথাতেও তার নামই ঘুরঘুর করছে।
রাশেদ টেবিলে আঙুল ঠুকতে লাগলেন। মাহতাবের মুখে অস্বস্তির ছাপ। সারথি আয়েশ করে চা খাচ্ছে।
– হায়দার আলম রাহাত।
রাশেদ ঠাণ্ডা গলায় নামটা উচ্চারণ করলেন।
আচমকা বাতাসে ভেসে এলো ভারী পায়ের শব্দ। যেন কেউ ইচ্ছে করেই গোটা করিডর কাঁপিয়ে হনহন করে হাঁটছে। ক্যাচ করে ভিড়িয়ে রাখা দরজা খুলে গেল।
ভেতরে ঢুকল একজন ছাব্বিশ বছর বয়সী টগবগে যুবগ। পরনে ধবধবে সাদা লুঙ্গি। খয়েরি রঙের শার্ট। চোখে একখানা সস্তা সানগ্লাস। পায়ে স্যান্ডেল। মুখে বেপরোয়া হাসি। তবে সেই হাসিতে মিশে আছে আত্মবিশ্বাস।
রাহাত ঘরে ঢুকেই চেয়ার টেনে বসল। কোনো অনুমতি চাইল না। বলল,
– ইয়া মালিক, ইয়া আল্লাহ, ও খোদা! আবার নতুন মিশন? কই দাও দেখি, ফাইলটা দাও।
রাহাতের ব্যবহারে মাহতাব হতবাক। রাশেদও ঠোঁট কামড়ে বসে রইলেন। শুধুমাত্র সারথি মুখ টিপে খানিকটা হেসে নিল।
ফাইলটা নেড়েচেড়ে দেখল রাহাত। তার হাসিমাখা মুখে মুহুর্তেই নেমে এলো অন্ধকার। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চোখজোড়া বন্ধ করল সে। এরপর পুনরায় ফিরে এলো সেই হাস্যজ্বল চরিত্রে।
– স্যার, আমি হায়দার আলম রাহাত। থালা অজিত কুমার আমার গুরু। আমি তার শিষ্য। উনার সিনেমা থেকে আমি একটা জিনিস শিখেছি। নায়ক কখনো পিছে হটে না। আমি ও পিছে হটব না। হটার হইলে শত্রু হটবে। খোদার কসম।
রাশেদ বিরক্ত গলায় বললেন,
– রাহাত, তোমার এসব নাটকবাজি আমি সহ্য করতে পারি না।
রাহাত একহাতে সানগ্লাস খুলে ঘোরাতে ঘোরাতে হেসে ফেলল। বলল,
– স্যার, নাটকবাজি না সিনেমাবাজি। তবে খানিকটা নাটক বা সিনেমাবাজি না করলে মানুষ বোর হয়ে যায়। আর আমি বোরিং জিনিসপাতি এড়িয়ে চলি।
গলার স্বর নিচু করে পুনরায় রাহাত বলল,
যেমন আপনাকেও এড়িয়ে চলি।
অফসার মাহতাব প্রায় হেসে ফেলছিল। তাই দ্রুত মুখ চেপে ধরল নিজের। রাশেদ কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। রূঢ় গলায় বললেন,
– এই কারণে তোমাকে আমি পছন্দ করি না, রাহাত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই মিশন তুমি ছাড়া আর কেউ সামলাতে পারবে না। এটা আমার দুর্ভাগ্য বলতে পারো।
রাহাত ফিক করে হেসে ফেলল,
-এই কারণেই আমি আপনাকে এত পছন্দ করি, স্যার। আপনি বোরিং হইতে পারেন তবে মিথ্যাবাদী না।
এবার রাহাত স্বাভাবিক গলায় বলল,
– দুনিয়াতে দুইটা জিনিস আমার ভীষন রকমের অপছন্দ। মিথ্যা বলা আর মায়ের জাতিকে অশ্রদ্ধা করা। আর এই জানো / য়ার গুলা তো পণ্যের দরে ফুলের কলিগুলোকে বিক্রি করে দিচ্ছে। এই মিশনে অবশ্যই আমি স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করব।
রাহাতের কণ্ঠে এমন দাপট ছিল যে, সেকেন্ডখানেকের জন্য যেন ঘরের প্রতিটি জড়বস্তুও কেঁপে উঠল।
রাশেদ বললেন,
– মিশনটা মোটেও সহজ না। তেঘরিয়ার এই চক্রটা শুধু স্থানীয় কিছু গুণ্ডা নয়। ওরা ইতোমধ্যে রাজনীতির ছায়াতলে আছে। তাই সরাসরি অভিযান চালালে সব ভেস্তে যাবে। আমাদের ভিতর থেকে তথ্য চাই। ওদের হাতেনাতে ধরতে হবে।
রাহাত ভ্রু নাচিয়ে বলল,
– মানে কি? আমারে কি আবার গুপ্তচর বানাইতে চান নাকি?
রাশেদ এবার স্পষ্ট গলায় ঘোষণা করলেন,
– তোমার কাজ হবে ডাবল এজেন্টের। বাইরে থেকে তুমি ওদের লোক সেজে ঢুকবে। তাদের বিশ্বাস অর্জন করবে। আর ভেতরের খবর আমাদের দিবে। ইটস এ লং প্রোসেস, রাহাত। এন্ড ইউ হ্যাভ টু বি কেয়ারফুল। ভেরি ভেরি কেয়ারফুল।
– বাহ! ডাবল এজেন্ট! নিজেকে তামিল সিনেমার নায়ক মনে হচ্ছে, স্যার!
রাশেদ ভ্রু কুঁচকালেন।
– এটা সিনেমা না, রাহাত। জীবন-মরণ খেলা। ভুল হলে তুমি আর ফিরে আসবে না।
রাহাত হেসে বলল,
– মরন দেখে হায়দার আলম রাহাত কবে ভয় পেত?
রাশেদ তৃপ্তির হাসি হাসলেন। ছেলে কিছুটা বেয়াদব হলেও তার মত সাহসী অফিসারের এই ডিপার্টমেন্টে বড় অভাব। কাজেই, রাহাতের এই কথার সাথে তিনি একমত।
রাশেদ নিচু স্বরে বললেন,
– নতুন পরিচয়ের জন্য প্রস্তুত হও, রাহাত।
রাহাত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে উক্ত স্থান ত্যাগ করল।
———–
আজ তেঘরিয়ার সকালটাও ছিল বেশ মলিন। তালুকদার বাড়ির উঠোনে শিশিরভেজা ঘাসগুলো রোদে ঝিকমিক করছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে হাড়ি পাতিলের টুংটাং শব্দ আর মাজেদার কণ্ঠস্বর।
চারুলতা বেশ মনযোগ দিয়ে চাল বাছছিল। মাঝে মাঝে চুলের গোছা কানের পেছনে সরিয়ে নিচ্ছিল অন্যমনস্কভাবে। তার চোখে মুখে নির্ঘুম রাতের
ক্লান্তিরা জেঁকে বসেছে। চেহারার মাঝে জ্যোতি নেই। সারাদিন কাজের মাঝে থাকলে মনটাকে অন্যদিকে ঘোরানো যায়। সেই চেষ্টাই করছে চারুলতা।
সহসা চারুলতা থমকে গেল মুখের রঙ বদলে গেল মুহুর্তের মাঝে। পেটের ভেতর কেমন যেন ঘুরপাক খেতে লাগল। মাথাও চক্কর দিচ্ছে। ঝাপসা দেখাচ্ছে চতুর্দিক। মাজেদা বিষয়টি লক্ষ্য করল।
-কি হইছে চারু?
মাজেদার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা।
চারুলতা কোনো উত্তর দিল না। হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে এক ছুটে বেরিয়ে গেল রান্নাঘর থেকে। উঠোনের মাঝামাঝি এসে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। গলগল করে বমি বেরিয়ে এলো।
চারুলতার শরীর কাঁপছে, বুক ধুকপুক করছে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে ধপাস করে বসে পড়ল মাটিতে।এক অচেনা উপলব্ধিতে শিউরে উঠল তার শরীর।
মাজেদা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন।
– কিরে চারু! পেটে খারাপ লাগতাছে?
উঠানে বমি দেখে আঁতকে উঠলেন। বললেন,
– ও আল্লাহ! সাপের বাতাস লাগল নাকি!
চারুলতা মাথা নাড়ল। কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বেরোলো না। বুকের ভিতরটা এখনো ধড়ফড় করছে। নিস্তেজ লাগছে।
মাজেদা তার কাঁধে হাত রাখলেন। হঠাৎ তার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল। ঘরে নতুন অতিথি আসছে না তো?
চারুলতা নিজেও একই ভাবনায় বিভোর। তার মনে পড়ছে স্বামীর সাথে কাটানো নিস্তব্ধ রাতগুলোর কথা। যে রাতগুলোতে তার শরীর তুর্জয়ের স্পর্শে কেঁপে উঠেছে বারবার। আন্দোলিত হয়েছে গভীর প্রেমে।
চারুলতা ঠোঁট কাঁপতে লাগল। বুকের ভেতরে ঝড় বইছে। যদি সত্যিই তার মাঝে নতুন জীবনের সূচনা হয়? যদি এই খবর জানাজানি হয়, তালুকদার মশাই কী বলবেন? তুর্জয় জানলে কি খুশি হবে, নাকি মুখ ফিরিয়ে নেবে?
বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল নাহিদা। সমস্ত ঘটনা তার দৃষ্টিগোচর হল। এক অদ্ভুত শঙ্কা তার বুকের ভিতর গর্জে উঠল। আগুন ধরল।
নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। মনে মনে ভাবল,
– না, এটা হইতে দেওয়া যাবে না। চারুলতা যদি সত্যিই গর্ভবতী হয়, তুর্জয় আমার হাতছাড়া হইয়া যাইব। আমি মরলে মরুম। কিন্তু ওরে জীবনে আর ফিরতে দিমু না।
শিউলি ফোটা দিনগুলো ফুরানোর পথে। তাই বোধহয় তালুকদার বাড়ির উঠোন আজ তীব্র গন্ধে ম ম করছে। আকাশে লালচে আভা। এত সৌন্দর্যের মাঝে লুকিয়ে আছে এক নারীর হৃদয়ে জন্ম নেওয়া নতুন জীবন, আর আরেক নারীর মনে জেগে ওঠা নতুন ষড়যন্ত্রের ছায়া।
(চলবে…)
#অবাঞ্ছিতা
#আতিয়া_আদিবা
২৬.
তালুকদার বাড়ির রান্নাঘরের দরজার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মাজেদা। তিনি অতি উদ্বেগের সাথে কারও পথ চেয়ে আছেন। ক্ষণিককাল পরেই মূল ফটকে পদধূলি পড়ল এক বয়স্ক মহিলার। সবাই তাকে হাফসা বুবু বলে ডাকে। বছরের পর বছর ধরে কত নারীকে তিনি সৌভাগ্যের খবর পৌঁছে দিয়েছেন! তার অভিজ্ঞ চোখ এবং হাতের স্পর্শ একেবারে নির্ভুল।
চারুলতা তখন তালুকদার বাড়ির অতিথিঘরের বিছানার এক কোণে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। নিজের ঘর থেকে সে বিতাড়িত। শেষ ঠাঁই জুটেছে সর্বদা ফাঁকা পড়ে থাকা এই ঘরটায়।
মাজেদা হাফসা বুবুকে নিয়ে চারুলতার কাছে এলেন। নরম স্বরে বললেন,
– বুবু, একটু দেহেন। আমার মন বলতাছে সুসংবাদ! বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।
হাফসা বুবু কোনো কথা না বলে চারুলতার পাশে বসলেন। তার কুঁচকে যাওয়া আঙুলগুলো আলতোভাবে চারুলতার পেটের ওপর চলাচল করতে লাগল। আরোও কিছু নিয়ম নীতি পালন করে হাফসার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
তিনি বললেন,
– আল্লাহর রহমত হইছে! চারুলতার পেটে সন্তান আসছে।
ঘরটা কিছুক্ষণের জন্য কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মাজেদার চোখজোড়ায় খেলা করছে অশ্রু। এ অশ্রু দুঃখের নয়। যেন বহুকাল পর প্রতীক্ষিত আনন্দ সংবাদ পেয়েছেন তিনি।
কিন্তু চারুলতার মুখে আনন্দের কোনো ছায়া নেই। তার নিঃশ্বাস আটকে গেল মুহুর্তেই। যেন মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া কোনো কান্না গলার কাছে এসে থমকে গেছে। একটি দীর্ঘশ্বাসের জন্য আঁকুপাঁকু করতে লাগল সে।
কদিন আগেও চারুলতার মনে জন্ম নিয়েছিল একটি সন্তানের তীব্র আকাঙ্খা। তুর্জয়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং সাজানো গোছানো সংসারের মোহে বিমোহিত ছিল সে। ভেবেছিল সাদা কালোর দিন কাটিয়ে এবার রঙিন হবে তার জীবন। অথচ, সব রঙ ম্লান হয়ে গেছে।
যে পুরুষের কাছে নারী শরীরের কাছে হেরে যায়, সে পুরুষ কোনোদিন কাউকে ভালোবাসতে পারে না তা চারুলতার নিকট এখন বোধগম্য।
তুর্জয়ের জীবনে এ কদিনে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি। সে সারাদিন শুয়ে বসে থাকে।
আরাম করে চা-বিড়ি খায়। নাহিদার অভিজ্ঞ স্পর্শে শরীরের ক্ষুধা মেটায়। অভিযোগ করার জায়গা নেই। নাহিদাও তার বশীকরণ প্রক্রিয়া বহাল রেখেছিল। তবে সে ভুলে গিয়েছিল, তুর্জয় তালুকদারের মতো পুরুষদের বেশিদিন এক শরীরের লোভ দেখিয়ে বেঁধে রাখা যায় না।
দুপুরে খাবার পর্ব মিটিয়ে ঘরে ফেরার সময় তুর্জয়ের অক্ষিজোড়া চুম্বকের মত আটকে যায় রান্নাঘরের দিকে। সেখানে অতি ব্যস্ততায় ছোটাছুটি করছিল চারুলতা। তার সরু কোমর, এলোমেলো শাড়ির আচল তুর্জয়ের বুকে দাউদাউ করে আগুন ধরিয়ে দিল তৎক্ষণাৎ।
শেষ কবে চারুলতার লজ্জাভরা মুখ দেখেছে তুর্জয়? চারুলতার সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো মনে পড়তেই তার ঠোঁটে এক টুকরো কুটিল হাসি ফুটে উঠল।
বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা। তুর্জয়ের সামনে বসে কথার ফুলঝুরি ছড়াচ্ছিল নাহিদা। আর যত্ন করে তেল মাখছিল চুলের প্রতিটি গোড়ায়। কথার এক ফাঁকে তুর্জয় বলে উঠল,
– আজকে চারুলতা যেন আমার ঘরে চা লইয়া আসে। তোর আসার দরকার নাই।
তার কণ্ঠস্বর ছিল শীতল।
– আমি থাকতে ওর কেন চা নিয়া আসা লাগব?
তুর্জয় বিরক্ত হল। বলল,
– খামোখা কথা বাড়াইস না। যাইয়া ওরে বলবি ও যেন চা নিয়া এঘরে আসে। আর ও যখন আসব তুই এ ঘরের ধারে থাকবি না। বুঝছস?
নাহিদার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল মুহুর্তেই। সে সরু গলায় শুধালো,
– আপনে… আপনে আবার ওর লগে দেখা করবেন?
– ও আমার বউ। ছোট বউ। বউয়ের দেখভাল করা লাগব না? আল্লাহ কইছে সব স্ত্রীদের সমান নজরে দেখতে।
নাহিদার চোখে এবার রাগ জমল ঢের। কম্পিত কণ্ঠে বলল,
– এত কিছুর পরেও আবার ওই মাইয়ারে মনে পড়ছে আপনার? আমারে দিয়া ক্ষুধা মেটে না? কত শইল লাগে আপনের?
তুর্জয় বিছানা ছেড়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। তার গনগনে লাল চোখে উপচে পড়ছে হিংস্রতা। ঝড়ের গতিতে গিয়ে নাহিদার চুলের মুঠি ধরল সে। বলল,
– তোর এত বড় সাহস? তুই তুর্জয় তালুকদারের সামনে দাঁড়াইয়া এত কথা কস? কিছু কই না দেখে বুলি ফুটছে অনেক না? একেবারে ছিঁড়া ফালামু খাং/কি মা/গী। আব্বা ঠিকই কয়, মাইয়া মানুষ বে/শ্যা/র জাত। এগোরে মাথায় তুলতে নাই। আমি যা কইতেছি মন দিয়া শোন। চারুলতারে যাইয়া বলবি চা লইয়া আমার ঘরে আসতে। তোরে যেন আমার ঘরে আইজকা আর ঢুকতে না দেখি।
তুর্জয়ের কাছে বেধড়ক মার খেয়েও অভ্যস্ত নাহিদা। কাজেই, তার মুখ থামল না। সে চুলের মুঠি ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে বলতে লাগল,
– আমি আপনার ভাগ আর কাউরে দিতে চাই না। এতদিন সহ্য করছি। আমি এখন আর সহ্য করতে পারি না। আপনার সাথে অন্য কাউরে আমি দুঃস্বপ্নেও সহ্য করতে পারি না!
তুর্জয়ের এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। সমস্ত শক্তি দিয়ে নাহিদার গালে সে চড় বসাল। শব্দটা ঘরের চার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। তুর্জয় থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
– বলছি না, চারুলতারে ডাইকা দে? ঘর থেকে বাইর হ। এক্ষণি বাইর হবি।
নাহিদাকে ধাক্কা দিয়ে দরজার দিকে ঠেলে দিল তুর্জয়। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল নাহিদা। অবিশ্বাসের দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল তুর্জয়ের পানে। অথচ তার মাঝে কোনো অনুশোচনা নেই। নাহিদা কাঁদতে কাঁদতে নিজেকে গুটিয়ে নিল। বের হয়ে গেল ঘর থেকে।
তুর্জয় নিঃশব্দে বসে পড়ল বিছানায়। তার ঠোঁটে ফিরে এল পুরোনো সেই কুটিল হাসি।
———-
নাহিদার চোখ মুখ দেখেই পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেছিল চারুলতা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বামীর আদেশ তাকে পালন করতে হল। কোমল ঠোঁটজোড়া কামড়ে, চোখ নামিয়ে হাতে চা নাস্তা নিয়ে সে চলতে শুরু করল তুর্জয়ের ঘরের উদ্দেশ্যে। চারুলতার মনে হচ্ছিল তার প্রতিটি পা কেউ যেন শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে। হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার।
তুর্জয়ের ঘরের সামনে পৌঁছে ক্ষণিককাল থমকে দাঁড়াল চারুলতা। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে এলো মৃদু কাশির শব্দ।
দরজা সামান্য ঠেলে ভেতরে ঢুকল, চারুলতা।
পুরো ঘর জুড়ে বাসি বিড়ির গন্ধ। অতি পরিচিত ঘরটিও কেমন অপরিচিত লাগছে তার। তুর্জয় বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। তার চেহারায় ক্লান্তি অথচ চোখে সেই পুরোনো শিকারির অভিব্যক্তি স্পষ্ট।
চারুলতার ভ্রুক্ষেপহীন। সে তার পরিকল্পনা অনুযায়ী নিঃশব্দে টেবিলের উপর নাস্তার ট্রে রাখল। তারপর ঘুরে দাঁড়াতে গেল।
তুর্জয় ভ্রুঁ কুঁচকে শুধালো,
– এই যে বাইলা মাছ, এত তাড়া কিসের? একটু বসবি না আমার পাশে?
চারুলতা থামল না। ভাবখানা এমন, যেন সে কিচ্ছুটি শুনতে পায় নি।
তুর্জয় হালকা গম্ভীর হয়ে বলল,
– কীরে কথা কান দিয়া যায় না? পাশে আইসা বয়।
চারুলতা মুখ ঘুরিয়ে তুর্জয়ের দিকে তাকাল একবার। তার চোখে পানি। ঠোঁটজোড়া তিরতির করে কাঁপছে। অথচ তুর্জয় জানে না, এই অশ্রুসিক্ত চোখের আড়ালে ঠিক কতখানি অভিমান, অপমান আর দূরত্ব মিশে আছে।
তুর্জয় এবার কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। চারুলতাকে পাশ কাটিয়ে ঘরের দরজা ভিড়িয়ে দিল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে চারুলতা চমকে উঠল। অচেনা ভয়ে তার শাড়ির আঁচল মুষ্টিবদ্ধ করল। নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
– দরজা ভিড়াইলেন ক্যান?
– লোক দেখাইয়া আমার বাইলা মাছরে আদর করুম নাকি?
একথা বলে তুর্জয় থেমে রইল না। চারুলতাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। তার ঘর্মাক্ত ঘাড়ে নাক ঘষতে লাগল। নরম গলায় বলল,
– তোর শরীরের উত্তাপ না পাইলে আমি তুর্জয় তালুকদার যেন কেমন হইয়া যাই, চারু! দিন দুনিয়া ভাল্লাগে না। নেশা তুই আমার। মদের চেয়েও ভয়ংকর নেশা।
চারুলতা স্থির চোখে তাকিয়ে রইল দেয়ালের দিকে। বুকভরা সাহস নিয়ে আচমকা প্রশ্ন করে বসল,
– শুধু শইলের ক্ষুধা মিটাইতেই কি আপনার আমারে প্রয়োজন হয়?
– তোরে আমি ভালোবাইসা স্পর্শ করি, চারু। ক্ষুধা মেটাইতে না। তোরে দেইখা আমার মাথার তার সবগুলা ছিঁড়া গেছে আজকে। জোড়া লাগাইয়া দে না!
– ছাড়েন আমারে।
– এই মা/গী ঢং করিস না।
তুর্জয়ের গলা এবার বেশ কর্কশ শোনালো।
চারুলতা তুর্জয়ের প্রতিটি স্পর্শের বিরোধিতা করল। নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে শান্ত স্বরে বলল,
– আপনে অসুস্থ। বিশ্রাম নেন।
তুর্জয় তালুকদার কথা শোনার পাত্র নয়। সে তার কর্মকাণ্ড জারি রেখে বলল,
– তুই বদলাইয়া গেছস চারু!
চারুলতা ফিঁক করে হেসে ফেলল। বলল,
– আপনিও বদলাইছেন। আপনার শইলে আমি অন্য নারীর গন্ধ পাইতাছি। থাকেন, আমি যাই।
তুর্জয়ের মুখে এবার অন্ধকার নেমে এল। চারুলতাকে টেনে হিঁচড়ে সে বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলল। রাগে ফোঁস করে উঠল। বলল,
– এজন্য মা/গী মানুষের সাথে এত ভালো কথায় যাইতে হয় না। তোগো জাতই ভালো না। পায়ের নিচে পিষা রাখা লাগে খাং/কি গুলারে। কাপড় খুল! একদম নাটক করবি না। খুল।
দূরে কোথাও কুকুর কান্না করে উঠল। চারুলতা প্রাণপণে চেষ্টা করছে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে। পারছে না। তুর্জয়ের শক্তি তার চেয়ে ঢের বেশি বৈ কি!
তুর্জয় গর্জন করছে রীতিমতো। চারুলতার মনে পড়ে গেল বিয়ের প্রথম দিনগুলোর কথা। ঠিক এভাবেই শারীরিক ভাবে লাঞ্চিত হতে হয়েছে তাকে। একবার নয়, বহুবার। শরীরের মোহ তুর্জয়কে সাময়িক বদলে দিয়েছিল। তবে অভিব্যক্তি এখনো একই আছে।
চারুলতা কোনোভাবেই চাচ্ছিল না, তার অনাগত সন্তানের খবর তুর্জয় জানুক। তুর্জয়ের ধস্তাধস্তির ফলে যদি সন্তানের কোনো ক্ষতি হয়? চারুলতা আর চুপ থাকতে পারল না। তার মাতৃত্ববোধের জাগরণ ঘটেছে। চারুলতা চিৎকার করে বলে উঠল,
– আমার সাথে এমন কইরেন না। আমার পেটে আপনার সন্তান। তার ক্ষতি হইব। ছাইড়া দেন আমারে!
চারুলতার কথা শুনে তুর্জয় থমকে গেল। অবাক দৃষ্টিতে ক্ষণিককাল তাকিয়ে রইল চারুলতার পানে। এরপর হাতের বাধন আলগা করল। শরীরের ভার উঠিয়ে নিল। চারুলতা আর এক মুহুর্তও অপেক্ষা করল না। ছুটে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।
—————
তালুকদার মশাই আয়েশ করে চা খেয়ে বসে আছেন তার আলিসান চেয়ারে। ঠিক তার পাশে চেয়ারের হাতলের ওপর আপত্তিকর অবস্থায় বসে মাথা টিপে দিচ্ছে জোহরা। ইচ্ছে করে স্ফীত বক্ষযুগল নিয়ে তালুকদারের মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে।
নাহিদা তালুকদারের ঘরে ঢুকতেই এমন দৃশ্য দেখে দাঁতের ফাঁক দিয়ে গালি দিল জোহরাকে,
‘ ইস! ন/টির নইটামি যেন থামতেছেই না!’
তালুকদারও চোখ বুজে আছেন আরামে। নাহিদা গলা খাঁকারি দিল। জোহরা ছিটকে উঠল। নাহিদার চোখে চোখ পড়তেই বুকের আচল ঠিক করল সে।
নাহিদা লক্ষ করল, জোহরার ব্লাউজের বেশ কটি বোতাম আলগা। অতি সন্তপর্ণে আরোও একবার জোহরাকে গালি দিল নাহিদা।
তালুকদার একবার নাহিদার দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বললেন,
– বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? ভিতরে আস।
ঘরে প্রবেশ করা মাত্র নাহিদা বলল,
-জোহরা, অন্য ঘরে যা। আব্বার লগে আমার কথা আছে।
এমন আচরণে জোহরা বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলল না। হনহন করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
নাহিদা তালুকদারের চেয়ারের সামনে এসে দাঁড়াল। তালুকদার মৃদু স্বরে বললেন,
– বলো বড় বউ। কি বলতে চাও।
– চারুলতার বাচ্চা হইব।
– শুনলাম তোমার শাশুড়ী আম্মার কাছে।
নাহিদা বলল,
– আব্বা, সেদিন রাতে আপনি আমারে প্রাণ ভিক্ষা দিছিলেন। আপনার ইচ্ছাতেই সংসার ছাড়ছিলাম। আবার আপনার ইচ্ছাতেই ফিরা আসছি। নিজের সংসার হারায়া, সতিনের সংসার করতেছি। আপনি বলছিলেন চারুলতার একটা বিহিত করবেন। জলদি করেন না, আব্বা? আমি আমার সংসারে অন্য কোনো নারীর ভাগ চাই না।
তালুকদার মুখে চুরুট পুরে শান্ত ভঙ্গিতে বললেন,
– সময় হইলে করব। কারো বলা লাগবে না।
নাহিদার চক্ষু ছানাবড়া হল।
– সময় হইলে করবেন মানে? আপনি এহন কোনো সিদ্ধান্ত না নিলে, পরে যদি আপনার বড় পোলা আমারে ত্যাজ্য করে? চারুলতা এমনেই পোয়াতি।
– মেয়ে মানুষের এত ভাবা উচিত না। বললাম তো, সময় হলে সব হবে। কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান কইরো না। ঘর থিকা বিদায় হও।
খানিকটা উত্তেজিত হয়ে বললেন তালুকদার মশাই।
নাহিদার কান্না চেপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
তালুকদার মুচকি হাসলেন। চারুলতার বিরুদ্ধে তিনি এখন কোনো সিদ্ধান্ত নিবেন না। আগে অনাগত সন্তান ভূমিষ্ঠ হোক। পৃথিবীর আলো দেখুক। সন্তান ছেলে নাকি মেয়ে এর ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে!
বাইরে হালকা হাওয়া বইছে। দূরে শেষ বারের মত শিউলি ঝরে পড়ছে টুপটুপ করে। প্রকৃতিও যেন চারুলতার মত এক নতুন শুরুর অপেক্ষায়।
চলবে..
উপন্যাসঃ #অবাঞ্ছিতা
লেখিকাঃ #আতিয়া_আদিবা

