Home "ধারাবাহিক গল্প অবাঞ্চিতা অবাঞ্চিতা পর্ব-৩৮ এবং শেষ পর্ব

অবাঞ্চিতা পর্ব-৩৮ এবং শেষ পর্ব

0
788

#শেষ_পর্ব
​তুর্জয়ের সেই গগনবিদারী স্বীকারোক্তি তেঘরিয়ার আকাশ-বাতাসকে যেন এক লহমায় স্তব্ধ করে দিল। গ্রামবাসীদের গুঞ্জন থেমে গিয়েও থামল না। এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতাও যেন শোরগোলের স্বরূপ।

ক্ষণিককাল পর তুর্জয় উন্মাদের মতো চিৎকার করে নিজের সমস্ত পাপের কথা কবুল করে যাচ্ছিল। কতশত মানুষকে খু/ন করেছে সে। কতজনকে বানিয়েছে ভো/গে/র বস্তু। আর মায়া? তাকে তো অনিচ্ছায় ক্ষুধার্ত হায়নার মত কুড়ে কুড়ে খেয়েছে সে!

রাহাত সন্তপর্ণে সারথি’র দিকে তাকাল। ইশারায় কিছু একটা বলল। সারথি সেই ইশারার মানে বুঝতে পারল। সে ব্যাক আপ টীমের নিকট পৌঁছে কিছু একটা বলল এবং তৎক্ষণাৎ প্রস্থান ঘটল তার।

ঘটনার আকস্মিকতায় তালুকদার মশাই ভেঙ্গে পড়লেন। কিভাবে পরিস্থিতি সামলাবেন তা বুঝতে পারলেন না। নেতাদের খবর পাঠানো প্রয়োজন। তাদের সঙ্গে আলাপচারিতা সেড়ে নেওয়া প্রয়োজন। ‘প্রজেক্ট রজনীগন্ধা’ আটকে আছে। এরমাঝে মিলল সোনালতার লাশের হদিস! তল্লাশি নিতে অবশ্যই পুলিশ এ স্থানে আসবে। এদিকে মেয়েগুলোকে বর্ডারের ওপারে পাঠানো অতি জরুরি এখন।

তালুকদার মশাই চেষ্টা করলেন মাথা ঠান্ডা রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করার। কিন্তু! খোদার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন।

বিকাল ৫ টা।
তেঘরিয়া গ্রামের দক্ষিণ হাওর ঘাটে ইঞ্জিনচালিত অনেকগুলো নৌকা এসে ভিড়ল। নৌকায় করে এসেছে পুলিশের একটি বিশাল বড় দল। ঘাটে নেমে বিশাল দলটি বিভক্ত হয়ে গেলো।
একটি দলের গন্তব্যস্থল ‘প্রজেক্ট রজনীগন্ধা’।
অপর দলটি হাঁটতে শুরু করল তালুকদার মশাইয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

​পুলিশের আগমনে বিচলিত হল না তালুকদার মশাই। তারা যখন সদর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল, তখন তালুকদার তার অনুগত লেঠেল বাহিনী লেলিয়ে দিল তাদের পথ রোধ করতে। শুরু হলো এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।
তেঘরিয়ার শক্ত মাটিতে বুট আর খড়মের শব্দে যেন রণক্ষেত্র তৈরি হলো। মারপিট আর আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

​ওদিকে টিনের ঘরগুলোতে পুলিশের দ্বিতীয় টীমটি হানা দিল। সি আই ডি হিসেবে সেখানেই প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটল হায়দার আলম রাহাতের।
তালুকদারের সাঙ্গপাঙ্গরা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও পুলিশের অতর্কিত হামলায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়ল। টীনের ঘর থেকে একে একে উদ্ধার হতে লাগল সেই অসহায় উঠতি বয়সী মেয়েরা।

​বাড়ির উঠোনে পুলিশ দেখে সাহায্য চাইতে চারুলতা তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।কারো বারন শুনলো না! ভুলটা বোধহয় এখানেই করে বসল ছোট্ট চারু।

লড়াইয়ের মাঝে এক লেঠেল আক্রমণাত্মক ভাবে চারুলতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লোকটা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তার হাতের ধারালো রামদা দিয়ে এক কোপ বসাল চারুলতার ঠিক পেট বরাবর।

​- উহ্! মা গো!

চারুলতার সেই আকাশফাঁটা আর্তনাদ তুর্জয়ের কানে গিয়ে বিঁধল। সে ছুটে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। দেখল, উঠানে চারুলতা হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে। তার পিঠের নিচে যেন রক্তে/র ফোয়ারা! তুর্জয়ের চতুর্দিক অন্ধকার হয়ে এলো। উঠানে সংঘর্ষ বিদ্যমান। এত চিৎকারের মাঝেও সে কিছু শুনতে পেল না। তার শ্রবণশক্তি যেন হারিয়ে গেছে।

চারুলতার শেষ কয়েকটি নিশ্বাসই তখন বেঁচে ছিল। তুর্জয় কাঁপা হাতে তাকে স্পর্শ করতে চাইল। চারুলতার ছোট্ট শরীরে যেটুকু শক্তি নিমজ্জিত ছিল, সবটুকু দিয়ে সেই স্পর্শকে অবজ্ঞা করতে চাইলো সে। ছলছল চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দিল,

– আপনার প্রতি ঘৃণা নিয়াই দুনিয়া ছাড়তেছি!

চারুলতার রক্তাক্ত দেহ তুর্জয়ের মস্তিষ্কের শেষ সুস্থ তন্তুটাকেও মুহুর্তেই ছিঁড়ে ফেলল। সে দৌঁড়ে রান্নাঘরে ঢুকল। বিশাল বড় একখানা কোদাল নিয়ে সোজা চলে আসল নিজের জন্মদাতা পিতার ঘরে।

তালুকদার মশাই নিস্পৃহ মুখে বিছানায় বসে আছেন। কোদাল হাতে বড় ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,

– এখন আর মারামারি কইরা কি করবি? আমার ইজ্জত যা খাওয়ার তা তো খাইছসই! যা, দেখ গুটি কয়েক পুলিশের লাশ ফেইলা পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে পারস কি না। বাকিটা আমি নেতাদের সাথে কথা বইলা ঠিক কইরা ফেলুম।

​তুর্জয়ের ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। কোনো নড়াচড়া করল না। তার চোখে ভেসে উঠল চারুলতার মুখ। সোনালতার লাশ, মায়ার ঝুলে থাকা দেহ।

তুর্জয় অতি ঠান্ডা গলায় বলল,

– আপনি আমার কে হোন?

– মানে?

– আপনার সাথে আমার সম্পর্ক কি?

– কিসব উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করতাছস?

– আপনি তো আমার আব্বা না। আপনি আমার জীবনের এক জীবন্ত অভিশাপ।

ছেলের মুখে এমন কথা শুনে তালুকদার মশাই ভড়কে গেলেন। ​তুর্জয় দুচোখে এক বীভৎস স্থিরতা নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল তালুকদার মশাইয়ের দিকে।
তালুকদার মশাই অভিজ্ঞ মানুষ। তুর্জয়ের এই দৃষ্টির অর্থ বুঝতে সময় লাগল না তার। তিনি তুর্জয়কে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে লাগলেন।

– তুর্জয়, বাপ আমার! আমার কথা শোন। কোদালটা ফালায়া দে। তোর কোথাও যাওয়া লাগব না। তুই আমার পাশে আইসা বস। আয়, বাপ আমার!

তুর্জয় তার বাবার কাছে গেল। কিন্তু পাশে বসল না। নিজের সমস্ত শক্তি এবং জীবনের সবটুকু ঘৃণা দিয়ে সেই ধারা/লো কোদা/লটি তালুকদার মশাইয়ের বুকের মাঝখানে আমূল বসিয়ে দিল।

​তালুকদারের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন,

-তু… তুর্জয়? তুই নিজের বাপেরে? এইভাবে…

তালুকদা কথা শেষ করতে পারল না। তুর্জয় কোদালটা আরও গভীরে চেপে ধরে হিসহিস করে বলল,

– সোনালতারে ভোগ কইরা এরপর মারছ। আমারেও তৈরি করছ তোমার নিজের মত একটা জানোয়ার। তোমার জন্য আমি আমার বাইলা মাছরে হারাইয়া ফালাইছি! চিরকালের জন্য হারাইয়া ফালাইছি। আমার অনাগত বাচ্চাটারে হারাইছি। তুমি বাইচা থাকলে এই গ্রামে মানুষ থাকতে পারব না। তোমার লগে তো আমার জান্নাতেও যাওয়া হইব না, জাহান্নামেই সই!

একথা ​বলেই সে কোদালটা সজোরে মোচড় দিয়ে বের করে আনল। তালুকদার মশাই রক্তবমি করলেন। ছটফট করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তার সেই বিশাল দেহটা কয়েকবার এদিক ওদিক আছাড় খেয়ে নিথর হয়ে গেল। নিজের ছেলের হাতেই শেষ হলো তেঘরিয়ার সেই প্রতাপশালী শয়তানের রাজত্ব।

তালুকদারের সেই রক্ত হাতে নিয়ে তুর্জয় দৌঁড়ে বাহিরে বেরিয়ে এলো। চারুলতার দেহের পাশে বসে চিৎকার করে বলতে লাগল,

– আমারে ঘৃণা করিস না, বাইলা মাছ। একটা বার তোর রূহটারে দেহে ফিরায়া আন। আমারে একটাবার ছুইতে দে তোরে। এই দেখ! কার রক্ত আমার হাতে। তোর বোনের খুনির রক্ত আমার হাতে। আমি প্রতিশোধ নিছি। ফিরা আয়, বাইলা মাছ! ফিরা আয়!

​তুর্জয়ের চিৎকারে ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে এলো সব। থেমে গেলো লড়াই। ঘর থেকেও একে একে সকলে বেরিয়ে এলো। তালুকদারের ঘরে গিয়ে মূর্ছা গেলেন তার স্ত্রী।

​পুলিশ ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। উদ্ধার হওয়া মেয়েগুলোকে লঞ্চে উঠিয়ে দিয়ে, রাহাত তখন ছুটে এলো তালুকদার বাড়িতে। উঠানে সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা আছে একটি লাশ। সারথি এক কোণায় দাঁড়িয়ে কান্না করছে। রাহাত সারথির দিকে অবিশ্বাসের চোখে তাকাল। সারথি মাথা নিচু করে ফেলল।

রাহাত অস্ফুটে বলে উঠল, চারুলতা!

তুর্জয়কে হাতকড়া পরিয়ে টেনে নিয়ে যেতে লাগল পুলিশের এক কর্মকর্তা। অথচ তুর্জয় ভ্রুক্ষেপহীন। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে পাগলের মত হাসছিল সে। তার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত আজ রক্তের অক্ষরে পূর্ণ হলো।

চারুলতার লাশ নিয়ে ঢাকা ফিরল রাহাত। কবরস্থানের একপাশে অতি যত্নের সাথে দাফন করা হল তাকে। কবরের নাম রাখল ‘অবাঞ্চিতা’।
যে মেয়েটা এত অল্প বয়সে পৃথিবীর সমস্ত সুখ থেকে বঞ্চিত হল, তার নাম চারুলতা কিকরে হয়?

​সমাপ্ত।

আতিয়া আদিবা