Home "ধারাবাহিক গল্প ফিরে আসার গান ফিরে আসার গান পর্ব-০২

ফিরে আসার গান পর্ব-০২

0
1241

#ফিরে_আসার_গান
#পর্ব_২
#লেখিকা_দিশা_মনি

​সূচনা বিছানায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের ঘূর্ণায়মান পাখাগুলোর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার কানের কাছে ক্রমাগত গুনগুন করে বাজছে মায়ের সেই তিরস্কারভরা কণ্ঠস্বর, যা সূচনার হৃদয়ে এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণার সৃষ্টি করছে। পেটের ভেতরে যে ছোট্ট প্রাণের অস্তিত্ব সে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জেনেছে, সেই প্রাণের জন্য কোনো আনন্দ নয়, বরং তার মনে দানা বাঁধছে এক পাহাড়সমান ভয়ের শঙ্কা। সে কি সত্যিই একা পারবে এই লড়াই চালিয়ে যেতে?

​জানালার বাইরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ঢাকার আকাশটা আজ কেমন যেন বিষণ্ণ। সূচনা বালিশটা বুকের কাছে জাপটে ধরে নিজেকে গুটিয়ে নিল। তার মস্তিষ্ক এখন কোনো গাণিতিক সমাধানের মতো জট পাকিয়ে আছে। এইচএসসি পরীক্ষা আর কদিন পরেই। বাবার চোখে নিজেকে পুনরায় যোগ্য করে তোলার শেষ সুযোগ ছিল এই পরীক্ষাটা। এখন যদি এই অনাকাঙ্ক্ষিত
খবরটা সবাই জেনে যায়, তবে তার বাবার স্বপ্ন শুধু ভেঙে চুরমারই হবে না, তার পরিবার সমাজের কাছে মুখ দেখানোর কোনো জায়গাই পাবে না।

​”না, সূচনা। ভেঙে পড়া চলবে না,”

সে নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল। সে জানে, এই মুহূর্তে তার সব থেকে বড় শত্রু হলো আবেগ। রাব্বির সাথে কাটানো সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো, তার শারীরিক নির্যাতন আর মানসিক লাঞ্ছনা সবকিছুর স্মৃতি তার মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেয়। রাব্বির ড্রাগ আর নোংরা জগতের কথা মনে পড়লে সূচনার বমি ভাব হয়। ডিভোর্সের কাগজটায় স্বাক্ষর করার সময় সে ভেবেছিল, সব শেষ। কিন্তু নিয়তি তাকে এমন এক মোড়কে দাঁড় করাল, যেখানে
মুক্তির চেয়ে দায়বদ্ধতা অনেক বেশি ভারী।

​রাত গভীর হলো। সোহেল খান ড্রয়িংরুমের টেবিলে বসে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে ফাইল দেখছিলেন। মাঝেমধ্যে তিনি সূচনার ঘরের দরজার দিকে তাকাচ্ছেন। তার একমাত্র মেয়ের চোখের পানি তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয়। তিনি মনে মনে দোয়া করছেন, সূচনা যেন এই কষ্ট কাটিয়ে আবার তার পুরনো প্রাণবন্ত রূপ ফিরে পায়। সায়রা খাতুন বারান্দায় পায়চারি করছিলেন, তার দীর্ঘশ্বাস শোনা যাচ্ছে ঘরের ভেতরেও। সূচনার কানে এল মায়ের বিড়বিড়ানি, “মেয়েটা কেন যে এমন ভুল করল! এখন আমাদের মান-সম্মান সব শেষ।”

​সূচনা নিজের ঘরে বসে একটা ডায়েরি খুলল। পাতায় পাতায় রাব্বির সাথে কাটানো প্রথম দিকের কিছু অগোছালো লেখা। সে সব ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ফেলল। তারপর ডায়েরির শেষ পাতায় বড় করে লিখল, “জীবন শেষ নয়, এটি একটি নতুন যুদ্ধের সূচনা।”

★★
​এদিকে, শহরের অভিজাত ক্লাবে আদানের মেজাজ তখন তুঙ্গে। দিব্যা পাটোয়ারীর উপস্থিতি তার কাছে কোনো স্বস্তি বয়ে আনেনি, বরং তার স্নায়ুগুলোকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

​”এই ফিয়ন্সে হওয়ার নাটকটা বন্ধ করো, দিব্যা।”

আদান হুইস্কির গ্লাসটা টেবিলের ওপর সজোরে রাখল। শব্দের ঝংকারে ক্লাবের বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।

“মির্জা আজমাইন কবীরের ব্যবসার উত্তরাধিকারী হিসেবে আমাকে দেখার দরকার নেই। আমি সেই লোক নই, যে বাবার তিলতিল করে গড়ে তোলা ঐশ্বর্যের ওপর রাজত্ব করবে।”

​দিব্যা তার পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশি ভঙ্গিতে বসল। তার চোখে এক চিলতে রহস্যময় হাসি।

“আদান, তুমি তোমার বাবার ব্যক্তিত্বকে যতটা ঘৃণা করো, তোমার রাগের ধরনটা ঠিক ততটাই তার মতো। তুমি চাইলে এই জৌলুসময় জীবন থেকে দূরে সরে যেতে পারো, কিন্তু তুমি তো জানো, তোমার বাবা তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করেন না।”

​আদান উঠে দাঁড়িয়ে ক্লাবের জানালার কাছে গেল। বাইরের বৃষ্টিভেজা ঢাকা শহরটাকে দেখা যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, দিব্যা শুধু একজন সাধারণ মেয়ে নয়, সে তার বাবার পাঠানো এক গোয়েন্দা। আদান চৌধুরী নামটি তার কাছে আজ এক বিষাক্ত শিকলের নাম। সে নিজের স্বাধীনতা চায়, কিন্তু তার পরিচয় তাকে প্রতি মুহূর্তে শিকল পরাতে চায়।

​”তোমার এই কথার উত্তর দেওয়ার সময় আমার নেই, দিব্যা,”

আদান পিস্তলটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে দ্রুত বেড়িয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল।

​”কোথায় যাচ্ছো? এই মধ্যরাতে?”

দিব্যা পেছন থেকে প্রশ্ন করল।

​আদান কোনো উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে এল ক্লাবের বাইরে। তার দামি গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জনে রাতের স্তব্ধতা চিরে গেল। গাড়িটা যখন রাস্তার মোড় দিয়ে যাচ্ছিল, আদানের চোখ পড়ল একটা ওষুধের দোকানের দিকে। সেখানে এক তরুণীকে দেখা গেল, যে বেশ ঘাবড়ে আছে। আদান খেয়াল করল, মেয়েটি বাসের জন্য অপেক্ষা করছে, তার চেহারাটা কেমন যেন ফ্যাকাসে।

​আদান গাড়ির গতি কিছুটা কমিয়ে দিল। তার ভেতরটা কেন জানি একটা অদ্ভুত টানে মেয়েটির দিকে ঝুঁকতে চাইল।

​সূচনা তখন ওষুধের দোকান থেকে ফিরে আসার পথে। তার হাত কাঁপছে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সে কিছু প্রাথমিক ওষুধ কিনেছে, কিন্তু তার মনে অনিশ্চয়তা প্রবল। সে জানে, কাল সকালটা হবে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। রাব্বির ছায়া এখনো তাকে তাড়া করে ফিরছে। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“তুমি যদি আমাকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়ে থাকো, তবে এই নতুন জীবনটার দায়িত্বও তোমাকে নিতে হবে। আমি হার মানছি না।”

​রাস্তার উল্টো দিক থেকে আসা হেডলাইটের তীব্র আলোয় সূচনা নিজের চোখ ঢেকে ফেলল। আদানের গাড়িটা ঠিক তার সামনে এসে ব্রেক কষল। টায়ারের ঘষায় একটা যান্ত্রিক শব্দ হলো। আদান জানালার কাঁচ নামিয়ে সূচনার দিকে তাকাল। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই এক অদ্ভুত স্থিরতা নেমে এল রাতের অন্ধকারে।

​সূচনা তার গলার স্বর কিছুটা সামলে নিয়ে বলল,
“আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?”

​আদান এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “হয়তো। কিংবা কাউকে হারিয়ে ফেলেছি।”

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨