#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৪৭
রাতের শহরের দৃশ্য অদ্ভুত সুন্দর ও মোহনীয়। ব্যস্ত রাস্তার দু’ধারে ল্যাম্প পোস্টের আলোয় সবকিছু পরিষ্কার ও রঙিন। ফুটপাতে হরেকরকমের খাবারের দোকান বসেছে। ভাজাপোড়া দোকানে একটু বেশিই ভিড়! সেই ভিড়ের মাঝ থেকে রাত বেরিয়ে এল। হাতে প্লেট, আর প্লেট ভরতি মাশরুম চপ, শিক কাবাব, ফিস ফ্রাই সহ আরো অনেক কিছুই রয়েছে।
ঈশিতা বাইকের সাথে হেলান দিয়ে ছেলেটার কর্মকাণ্ড দেখছিল। তার মনে হয় না, এর আগে কখনো রাস্তার পাশে ভিড় ঠেলেঠুলে কিছু নিয়েছে রাত। ছেলেটা হয়তো এর আশেপাশেও আসেনি, কিন্তু এখন তার জন্য মাঝেমধ্যেই মাঝপথে বাইক থামিয়ে আড্ডা দেয় ও এসব খায়। আজও সেটার ব্যতিক্রম হলো না।
-“নিন, ম্যাম! আপনার ফাস্টফুড।”
ঈশিতা মুচকি হেঁসে প্লেট নিয়ে বলল, -“থ্যাংঙ্কিউউ।”
রাত হেঁসে মেয়েটার পাশে বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। ঈশিতা কাবাব খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল,
-“তুমি খাবে না?”
-“উঁহু!”
-“কেন?”
-“এইগুলো খেতে ভালো লাগে না।”
-“তাহলে কি খাবে?”
রাত ঘাড় কাত করে মেয়েটার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, -“আমি আজ পর্যন্ত কাউকে কিস করিনি।”
-“কেন?”
-“ইচ্ছে করেনি কখনো।”
-“বিয়ের পর বউকে চুমু খেও। এখন চপ খাও!”
বলেই ঈশিতা মাশরুমের চপ রাতের মুখের সামনে ধরল। রাত চুপচাপ মাথা নিচু করে মুখে তুলে নিল। হাতে নরম ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে ঈশিতা কিছুক্ষণ থম মে’রে থাকল। তার শরীরে অদ্ভুত শিহরন বয়ে গেল। সে আশেপাশে তাকিয়ে কয়েকবার চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে নিল। অজানা অনুভূতিকে দমিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
-“বাড়ি যাবো।”
রাতের কপাল কুঁচকে গেল।
-“এত তাড়াতাড়ি?”
-“হুম।”
-“শরীর খারাপ লাগছে? ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবো?”
ঈশিতা হঠাৎই রেগেমেগে চিল্লিয়ে উঠল,
-“না, আমার কিচ্ছু হয়নি! কিন্তু তোমার সাথে থাকতে ভালো লাগছে না আমার। আমি বিরক্ত তোমার প্যাচাল পারাতে। এখন কেন জানি মনে হচ্ছে, তোমার সাথে বন্ধুত্ব করাটাই সবথেকে বড় ভুল হয়েছে আমার। কারণ তুমি একটা বাজে ছেলে!”
আশেপাশের সবাই তাদের দিকে তাকায়। রাত মেয়েটার রাগান্বিত চেহারার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, চুপচাপ বিল মিটিয়ে একটা রিকশা ডাকল। তারপর ভাড়া দিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে যেতে বলে, সে বাইক নিয়ে চলে গেল। আর ঈশিতা হতভম্বের মতো শুধু চেয়ে চেয়ে দেখল। আচ্ছা, লোকটা কি রাগ করল?
★
রাত বাজে বারোটা! খান বাড়ির ড্রয়িংরুমের পিনপতন নীরবতা ভাঙল, এক জোরালো পদাঘাতের শব্দে। নেশায় বুদ হয়ে, এলোমেলো পায়ে টলতে টলতে ভেতরে প্রবেশ করল—আবরার খান রাত। ডান হাতে একখানা মদের বোতল ও বামহাতে অফিসব্যাগ! শরীর থেকে কোট খুলে ছুঁড়ে মা’রল একদিকে। আধখাওয়া বোতলে চুমুক দিতে দিতে তার রক্তিম চোখের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে সিঁড়ির ওপর। ওখানে মেয়েটা পানির জগ হাতে থম মে’রে দাঁড়িয়ে আছে।
আলো জানত, রাত আগে নেশা করত। কিন্তু কখনো সে এমন মাতাল অবস্থায় দেখেনি। সবসময় পরিপাটি, গুছিয়ে থাকা যুবককে আজ দেখতে ছন্নছাড়া লাগছে। মেরুন রাখা ইন করা শার্ট কুঁচকে, ভিজে, এলোমেলো হয়ে আছে। বুকের কাছে তিনটে বোতাম খোলা, মাথার বড় বড় চুলগুলো কপালের চারদিকে লেপ্টে আছে। দেখে কোনো পাগলের থেকে কম লাগছে না। ওই র’ক্তবর্ণ তীক্ষ্ণ চোখে চোখ পড়তেই আলো ভয়ে শুকনো ঢোক গিললো। ছেলেটা তার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি, আর না বাজে নজরে তাকিয়েছে। তবুও স্বামীর বলা কথাগুলো শুনে সে মনে মনে রাতকে ভয় পায়। তাই তো ছেলেটাকে এই অবস্থায় দেখে পিছনে ঘুরে দৌড় দিতেই শুনতে পেল,
-“আমি খুব খারাপ, তাই না বোম্বাই মরিচ?”
আলো থেমে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“ভালো মানুষরা কখনো নেশা করে না।”
রাত হেলতে দুলতে হাতের কাঁচের বোতলটা টেবিলের ওপর রেখে, সোফার সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসল।
-“ছেড়ে দিয়েছিলাম, সবকিছু ছেড়ে দিয়েছিলাম।”
-“তাহলে আবার কেন এমন করছেন?”
রাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের বুকের মাঝে হাত রেখে অস্ফুটস্বরে বলল, -“এখানে খুব ব্যথা হচ্ছিল তাই।”
বিষয়টা অন্যরকম লাগল আলোর কাছে। সে একবুক সাহস নিয়ে আস্তেধীরে নেমে এসে রাতের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়াল।
-“কেন ব্যথা করছে? আপনার ভাইয়াকে ডাকব?”
রাত দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, -“উঁহু, এই ব্যথার চিকিৎসা ভাইয়ের কাছে নেই।”
একটু থেমে রমণীর চোখে চোখ রেখে জানতে চাইল,
-“আমি কি খুবই খারাপ?”
-“আমি আপনার বিষয়ে যতটুকু জেনেছি তাতে বোঝা যায় আপনি প্লেবয় ছিলেন! কিন্তু…জোর করে তো কিছু করেননি, আর না কোনো মেয়েকে ধোঁকা দিয়েছেন। আপনি বিদেশে থাকাকালীন এসব করেছেন। আর ওখানে এইগুলো খুবই নরমাল ব্যাপার! তবে এখানে আপনারাও দোষ আছে। আপনি খোলা খাবারে মুখ না দিয়ে নিজের জীবনে ফোকাস করতেন! আপনার সাথে তো আপনার ভাইয়াও ছিল। কই, উনার তো এমন ব্যাড রিপোর্ট নেই! আপনাদের শরীরে একই বংশের র’ক্ত বইছে, কিন্তু দু’জনের মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ।
আপনি অতীত ভুলে নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, এমনকি ভালো পথেও চলে এসেছেন। আর এটাই বা ক’জন পুরুষ করে? আপনি জানেন? আপনার এই পরিবর্তনে আপনার ভাই কতটা খুশি হয়েছে? উনি প্রায়শই বলেন, ‘আমার ছোট ভাই ভালো হয়ে গেছে’! তাহলে এখন বুঝুন, আপনি খারাপ নাকি ভালো। অতীত কমবেশি সবারই থাকে। সবকিছু ভুলে, নিজেকে শুধরে নিয়ে ভালোর পথে এসেছেন। এটাই অনেক ভাইয়া!”
মেয়েটার কথাগুলো শুনল রাত। বিপরীতে শুধু বলল,
-“আমাদের শরীরে একই র’ক্ত হলেও শিক্ষা আলাদা। ছোট বেলা থেকে অন্যের টাকা-পয়সা কীভাবে উড়াতে হয়, সেটাই শিখে এসেছি। আমি আমার ভাইয়াকে একটুআধটু ঈর্ষা করতাম। আমাকে এমনভাবেই শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল, যেখানে নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বুঝতাম না। বাট…আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। আই রিয়েলি চেঞ্জড মাই ব্যাড হ্যাবিটস!”
আলো আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। জীবনে ভালো মানুষ হতে গেলে সর্বপ্রথম সুশিক্ষার প্রয়োজন। নয়তো এমন স্বার্থপরই তৈরি হবে ব্যক্তি!
-“আ…আপনি হাজার চেষ্টা করেও একজনের চোখে ভালো হতে পারলাম না, বোম্বাই মরিচ! পারলাম না…।”
বিরবির করতে করতে রাত ঘুমে ঢলে পড়ল। আলো পানির জগ রেখে রাতের কাছে আসতে চাইলে, টের পেল সিঁড়ি বেয়ে কেউ নামছে। মেয়েটা চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। স্বামীকে গম্ভীর মুখে আসতে দেখে আলো সরে যায়।
-“তুমি এখানে?”
-“পা…পানি নিতে এসেছিলাম।”
আধার আর কিছু না বলে রাতকে পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে কাছে এল। ছোট ভাইকে ধরে সাবধানে দোতলায় নিয়ে যেতে লাগল। আলো সেদিকে একপলক তাকিয়ে জগ নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
রাতকে রুমে নিয়ে এসে বিছানায় শুয়ে দিল। পরনের শার্ট, পায়ের বুট, মোজা খুলে দিয়ে গায়ে চাদর টেনে দিল। এসি অন করে, ড্রিম লাইট জ্বা’লিয়ে দেয়। আধার কপাল কুঁচকে ভাইয়ের লালচে চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনে আওরাল,
-“কিছু তো একটা হয়েছে…!”
পড়ন্ত দুপুর বেলায়, রোদ্দুর মাঝে বাস স্ট্যান্ডে বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে ছায়া। পরনে নীল টপস ও সাদা স্কার্ট! রোদের কারণে উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের মুখটা রক্তিম হয়ে উঠেছে। বারবার ওড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছছে। পাঁচ মিনিট দেরি করে আসার ফলে বাস মিস করেছে। পরবর্তী বাস কখন আসবে, সেটাও জানে না। মেয়েটা বিরক্তে হাত ঘড়ির দিকে তাকায়। দুটো বেজে যাচ্ছে, অথচ সে রোদে মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে কাইল্লা ভুত হচ্ছে। ছায়া আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সামনের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। কোনো রিকশা বা অটোতে করে যাবে।
ছায়া রাস্তা পার হওয়ার সময় খেয়াল করল, তার সামনে এসে একটা কার থেমেছে৷ ভরদুপুর বেলা এমন নির্জন পথে কালো রঙের গাড়ি দেখে, মেয়েটা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়। ছোটবেলায় শুনেছে, এমন কালো গাড়িতে করেই বাচ্চাদের ধরে নিয়ে যায় রাস্তা থেকে। কিন্তু, সে তো বাচ্চা নয় তাহলে? আরে ধুর, সে এসব কি ভাবছে? বাচ্চা না হলেও তো একটা মেয়ে! আর আজকাল মেয়েরা কোথাও নিরাপত্তা নয়।
মেয়েটার আকাশপাতাল ভাবনার মাঝেই ডোরের কাঁচ নেমে গেল। ছায়া কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ চেপে ধরে দৌড় দিতে চেয়েও কিছু একটা খেয়াল করে দিল না৷ বরংচ চোখদুটো বড়বড় করে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল যুবকের পানে।
-“কোথায় যাচ্ছেন, মিস?”
রাস্তার মধ্যে মানুষটার দেখা পাওয়া অপ্রত্যাশিত ছিল ছায়ার। সে চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“ব…বাড়িতে।”
-“পায়ে হেঁটে হেঁটে?”
-“তাহলে কি উড়ে উড়ে যাবো?”
মৃন্ময় হেঁসে বলল, -“গাড়িতে উঠুন, আমি আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি।”
-“আপনার সময়ের মূল অনেক। অহেতুক আমার জন্য সেটা নষ্ট করেন না।”
-“বন্ধুর শালী সাহেবার জন্য এইটুকু করায় যায়। আর আমরা এখন বেয়াই, বেয়াইন! সো…কাম।”
একথা বলে মৃন্ময় নিজেই পাশের ডোর খুলে দিল। ছায়া আর আপত্তি করল না। চুপচাপ উঠে বসল। মেয়েটা সিট বেল্ট লাগিয়ে নিতেই মৃন্ময় গাড়ি স্টার্ট দিল এবং ঠিকানা জিজ্ঞেস করল।
ছায়া গুটিশুটি হয়ে বসে থেকে, ক্ষণে ক্ষণে আড়চোখে পাশে বসে থাকা সুদর্শন যুবকের দিকে তাকাচ্ছে৷ লোকটা ঠোঁট কামড়ে একহাতে মনোযোগ সহকারে ড্রাইভ করছে।
ধীরে ধীরে সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। কাঙ্ক্ষিত স্থানে এসে মৃন্ময়ের গাড়ি থামে এবং ছায়া ধন্যবাদ দিয়ে নেমে পড়ল। মেয়েটা চলে যেতে চাইলে মৃন্ময় পিছন থেকে ডেকে ওঠে।
ছায়া ফিরে এলে, মৃন্ময় একটা কার্ড বাড়িয়ে দিল। সেটা দেখে জিজ্ঞেস করল,
-“এটা কিসের কার্ড?”
-“আমার বিয়ের।”
ছায়া চমকে উঠল।
-“কীহহহহ…..!”
মৃন্ময় মেয়েটার রিয়াকশন দেখে নিঃশব্দে হেঁসে বলল,
-“রিলাক্স, মিস! আই’ম জাস্ট কিডিং।”
তবুও ছায়া স্বস্তি পেল না। ও চট করে কার্ড নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। মৃন্ময় একহাতে মাথার চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করতে করতে বলল,
-“সামনে আমার একটা অনুষ্ঠান রয়েছে। উমম…বলতে পারেন সকল ভক্তদের সাথে দেখা করব, অটোগ্রাফ দিবো। ওইদিন আপনার আপুর বলা কথাগুলো শুনে সিদ্ধান্ত নিই, সবার সাথে মিট করব। আপনাকে আমি পার্সোনালি ইনভাইট করলাম। আই হোপ, আপনি আসবেন। আপনার দুলাভাই, আপুও আসবে। আর হ্যাঁ, আপনার ছোট বোন মায়াকেও নিয়ে আসবেন!”
ছায়া একগাল হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বলল, -“ঠিক আছে।”
মৃন্ময় চোখে সানগ্লাস পরে, গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল,
-“খুব শীঘ্রই আমাদের আবারো দেখা হচ্ছে…! টেক কেয়ার অব ইউ।”
ছায়া হাত নাড়িয়ে বলল, -“বাই…গায়ক সাহেব। সাবধানে যাবেন, আর আপনিও নিজের খেয়াল রাখবেন।”
———————————
আজ রাত অফিসে যায়নি, সারাদিন ঘুমিয়ে পার করেছে। সন্ধ্যা বেলা উঠে গোসল করে বেরিয়ে এল। আলো রান্নাঘরে টুকটাক কাজ করছিল। আর শেফালি চাচি মটরশুঁটি বাছছেন। দেবরকে দেখে আলো ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে ওভেনে গরম করতে দিল। সবকিছু গরম করে ডাইনিং রেখে বলল,
-“আসুন, ভাইয়া।”
রাত চুপচাপ এসে চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। আলো প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। সোবহান খান বাহিরে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে নাতবউয়ের জন্য এটাসেটা নিয়ে আসেন। মেয়েটা আবার বাহিরের খাবার খেতে খুব পছন্দ করে। তাই আজকেও নিয়ে এলেন। দাদাজানকে দেখে আলো হাসিমুখে এগিয়ে আসে ড্রয়িংরুমে।
-“আজকে কি নিয়ে এসেছো দাদাজান?”
সোবহান খান জিনিসের টোপলা দিয়ে বললেন,
-“ফুচকা, চটপটি, মাংসের পেঁয়াজু আর সমুচা।”
জিনিসের নাম শুনে আলোর চোখদুটো চিকচিক করে উঠল। সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই শুনতে পেল—
-“এসব হাবিজাবি রাস্তার খাবার নিয়ে এসে, তুমি আমার বউয়ের পেট খারাপ করাচ্ছো দাদাজান।”
আধার দোতলা থেকে নেমে এসে গম্ভীর কণ্ঠে কথাগুলো বলে। সেগুলো শুনে আলো প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল,
-“মোটেও আমার পেট খারাপ হয় না।”
-“এবার যদি বমি করো, তাহলে ঘাড় ধরে রুম থেকে বের করে দিবো।”
আলো ঠোঁট উল্টে দাদাজানের দিকে তাকায়। সোবহান খান বড় নাতির উদ্দেশ্যে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
-“আমার নাতবউকে বের করে দিলে, তোমাকেও এ বাড়ি থেকে বের করে দিবো।”
আধার থমথমে মুখে বলল, -“তুমি আস্ত একটা গিরগিটি!”
আলো ফিক করে হেঁসে দিয়ে ওখান থেকে চলে গেল। গরম গরম কফি বানিয়ে নিয়ে এসে স্বামীকে দিল, তারপর সে ফুচকা রেডি করতে শুরু করল।
-“কোনো সমস্যা হয়েছে?”
আধার রাতের পাশের চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল। রাত খেতে খেতে জবাব দিল,
-“উঁহু, সব ঠিক আছে।”
আধার আর কিছু বলল না। শুধু নিজের বউয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
★
ডিনার করার পর আলো স্বামীর কাছে বায়না করে, আজ রিকশায় করে ঘুরবে এবং রাতের শহর দেখবে। আধার সোজাসাপ্টা না করে দেয়, কারণ তার ভার্সিটির জরুরী কাজ আছে। এবং এটাও বলে, অন্য কোনো সময় নিয়ে যাবে। কিন্তু…আলো তো আলোই! সে জেদ ধরে বসে আছে। আজ যাবে মানে যাবেই। এমনকি শাড়ি পরে, সেজেগুজে তৈরি হয়ে বসে আছে। মেয়েটা যখন দেখল, এতেও কাজ হচ্ছে না তখন কান্নাকাটি শুরু করে দিল। তার কুমিরের কান্নার কাছে আধার আত্মসমর্পণ করে, বউকে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েছে। নয়তো তাকে শান্তিতে থাকতে দিবে না মেয়েটা৷ আজকাল একটু বেশিই জেদ, ত্যাড়ামি করছে।
রাতের আঁধারের নিস্তব্ধতার মাঝে নির্জন পথ দিয়ে, স্বামীর হাতে হাত রেখে হাঁটছে আলো। অন্য হাতে একগুচ্ছ গোলাপ! একটু আগেই রিকশায় করে দুজন মিলে শহর ঘুরেছে। আপাতত এখন হেঁটে হেঁটেই বাড়িতে ফিরছে।
-“খুশি হয়েছো?”
আলো একগাল হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“খুউউউউব!”
আধার মুচকি হেঁসে হাত ছেড়ে দিয়ে, শাড়ি ভেদ করে কোমর চেপে ধরে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে বলল,
-“এতদূর পথ, হেঁটে যেতে পারবে?”
-“এখনই তো পা ব্যথা করছে।”
-“তাহলে রিকশায় উঠলে না কেন?”
-“আপনার সাথে হাঁটব তাই।”
-“ঠিক আছে, চলো!”
মাঝপথে এসে আলো কোমর চেপে ধরে থেমে যায়। তার পা জোড়া আর চলছে না। মনে মনে নিজেকেই ইচ্ছে মতো বকাবকি করল। শুধু শুধু জেদ করে!
-“জুতা খুলো।”
স্বামীর কথা শুনে আলো চোখদুটো বড়বড় করে তাকায়। সেটা দেখে আধার বিরক্তিতে বলল,
-“এমন ভাবে তাকিয়ে আছো যেন তোমাকে আমি শাড়ি খুলতে বলেছি!”
আলো কিছু না বলে হিল জোড়া খুলে দিল। সে বুঝতে পারছে না, এই লোকটা তার জুতা নিয়ে কি করবে? ভাবনার মাঝেই সে নিজেকে শূন্যে অনুভব করল। আলো চমকে উঠে দু’হাতে স্বামীর গলা আঁকড়ে ধরে বিস্ময়ে তাকায়।
-“এটা কি করেছেন আপনি?”
আধার একহাতে মেয়েটার জুতা নিয়ে, অন্য হাতে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে সামনে হাঁটতে থাকে। এবং বলে,
-“মুখ বন্ধ করে থাকো, নয়তো আছাড় মা’রব।”
-“লোকে দেখলে কি ভাববে?”
-“কে কে ভাবল, না ভাবল—আই ডোন্ট কেয়ার। আমি অন্যের বউকে নয়, নিজের বউকে নিয়ে যাচ্ছি।”
আলো কিছু না বলে কাঁধে মাথা রেখে, মানুষটার মুখের দিকে তাকায়। তখনই তার মনে সূক্ষ্ম ইচ্ছে জাগল। সে আশেপাশে নজর বুলিয়ে নিয়ে, মাথা উঁচু করে টপাটপ দুটো চুমু বসিয়ে দিল স্বামীর বাম গালে।
হঠাৎই আধারের পা জোড়া শ্লথ হয়ে গেল৷ সে চোখ রাঙিয়ে মেয়েটার দিকে তাকাতেই, খিলখিল করে হেঁসে উঠল।
-“জান….!”
আলো তর্জনী আঙুল দিয়ে স্বামীর গালে আঁকিবুঁকি করতে করতে আদুরে কণ্ঠে ডাকে। এই প্রথম বউয়ের মুখ থেকে এই বাক্য শুনে আধারের হৃদয় কাপলো। সে শুকনো ঢোক গিলে গম্ভীর কণ্ঠে বলার চেষ্টা করল,
-“মাঝরাস্তায় আমাকে সিডিউস করার একদম চেষ্টা করবে না! চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো….।”
আধার সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে পারল না। কারণ পাঁজি মেয়েটা তার ঠোঁটে চুমু দিয়েছে। আধার চোখ বুজে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। সে জানে, এই মেয়েটা ইচ্ছে করে তাকে জ্বা’লাচ্ছে! কারণ তারা এখন বাহিরে, আর সে চাইলেও কিছু করতে পারবে না। তাই তো অসভ্য মেয়েটা সুযোগের ফয়দা তুলছে।
-“ভালোবাসি।”
ছোট্ট একটা বাক্য, অথচ সেই বাক্য শোনা মাত্রই আধারের হৃদয় থমকে গেল। সে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে বিরবির করল,
-“কি বললে? আবার বলো!”
আলো প্রাণখোলা হাসি দিল। তারপর প্রিয় মানুষটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে, ফিসফিসিয়ে বলল,
-“লাভ ইউ! আই রিয়েলি লাভ ইউ সো মাচ….মি. খান।”
#চলবে
#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৪৮
বাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাত একটা বেজে যায়। আলো ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে কোনোমতে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ল। আধার রুমের বাতি নিভিয়ে অর্ধাঙ্গিনীর কাছে এল।
-“মাঝরাস্তায় একজন পুরুষের ইজ্জত লুটে নিয়ে, এখন আরামে ঘুমানো হচ্ছে হুম?”
আলো হেঁসে চোখ পিটপিট করে জবাব দিল,
-“আমি আমার ব্যক্তিগত পুরুষের ইজ্জত লুটেছি, তাতে আপনার কি?”
-“আজকাল পুরুষরাও মেয়েদের কাছে সেইফ না। কি দিনকাল এলো রে বাবা!”
-“শুধু কয়েকটা চুমুই তো খেয়েছি, আপনি এমনভাব করছেন যেন আমি আপনাকে…..!”
বলতে বলতে থেমে যায় আলো। সে একটু আগে কি বলতে চেয়েছিল, ভাবতেই তাজ্জব বনে গেল।
-“তুমি আমাকে….কি বলো?”
বেহায়া ইঙ্গিত বুঝতে পেরে আলো লজ্জায় হাসফাস করতে করতে দু’হাতে স্বামীকে ঠেলে বলল, -“সরুন তো, আমাকে বিরক্ত না করে ঘুমাতে দিন।”
আধার সরে না! বরং সাপের মতো আরো আষ্টেপৃষ্টে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আমার ঘুম হারাম করে, এখন ঘুমাতে চাচ্ছো?”
-“তো কি এখন আপনার সাথে ধেইধেই করে নাচব?”
-“নাচতে হবে না, শুধু আমাকে অনুভব করো।”
-“আপনি কিন্তু দিনদিন অসভ্য হয়ে যাচ্ছেন।”
-“সবকিছু তোমার জন্যই হয়েছে। কথায় আছে, সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে!”
আলো প্রতিত্তোরে কিছু না বলে চোখ বুজে নিল৷ সময়ের সাথে সাথে আধার তার অর্ধাঙ্গিনীর মাঝে হারিয়ে গেল। মেয়েটা যখন স্বামীর ভালোবাসার মধ্যে অন্য এক জগতে বিচরণ করছিল, তখন আধার এগিয়ে এসে কপালের মাঝে গভীরভাবে ঠোঁট ছুঁয়ে অবশেষে বলে উঠল,
-“ভালোবাসি…..জান!”
★
রাত কয়েকদিন ধরে অফিসে যায়নি, আর না কারোর সাথে যোগাযোগ করেছে। বসের ফোনকল পেয়ে আজ অফিসে এসেছে এবং ভেতরে প্রবেশ করতেই ঈশিতার সাথে দেখা হয়ে যায়। মেয়েটা এতদিন পর রাতকে দেখে এগিয়ে এল। কিছু বলতে যাবে, তার আগেই রাত না চেনার ভান করে পাশ কাটিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল। ছেলেটার এমন ব্যবহারে খুবই খারাপ লাগে ঈশিতার। সে তো ওইদিন রাতে ইচ্ছে করে ওইগুলো বলতে চায়নি, হঠাৎ তার কি হয়েছিল তার কে জানে। না চাইতেও রুড বিহেভিয়ার করে ফেলেছে। তারজন্য এই পর্যন্ত কম সরি বলেনি, অথচ ছেলেটা ওই একটা কথা নিয়েই পড়ে আছে।
-“রাত….?”
রাত বসের সাথে কথা বলে কেবিন থেকে বের হতেই ঈশিতা কই থেকে ছুটে এসে ডাকল। রাত পিছনে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না, সে ওইভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে স্বাভাবিক গলায় বলল,
-“জ্বি বলুন?”
রাত খুব সহজে আপনি থেকে তুমিতে আসেনি, বরং তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হওয়ার দেড় মাস পর ‘তুমি’ বলে ডেকেছিল। কিন্তু আজ ওই একই কণ্ঠে ‘আপনি’ ডাক শুনে মেয়েটার আবারো খারাপ লাগল। তবে সে মুখে প্রকাশ করল না। ধীর পায়ে রাতের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে,
-“ওইদিনের জন্য আবারো সরি! আমি ইচ্ছে করে তোমাকে হার্ট করতে চাইনি।”
রাত মেয়েটার দিকে একপলক তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“ইটস ওকে, মিস! আমি কিছু মনে করিনি। আর আপনি তো ভুল কিছু বলেন নি! আমি আসলেই বাজে একটা ছেলে।”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল, -“আজ থেকে এই খারাপ আমিটার আর চেহারা দেখতে হবে না আপনাকে, আর না আমার প্যাচাল সহ্য করতে হবে। কারণ….আমি জব ছেড়ে দিয়েছি এবং খুব শীঘ্রই দেশটাও ছেড়ে দিবো। আজ থেকে আপনি আপনার পথে আর আমি আমার পথে। আই উইশ….আমাদের আর কখনো দেখা না হোক। ভালো থাকবেন, আল্লাহ হাফেজ!”
একথা বলে রাত গলার টাইয়ের নট ঢিলে করতে করতে চলে যায়। আর পিছনে ফেলে গেল, স্তব্ধ হওয়া এক রমণীকে।
দেখতে দেখতে মৃন্ময়ের রাখা ইভেন্টের সেই বিশেষ দিন চলে এসেছে। আজ সবথেকে বেশি খুশি ছায়া। সাথে মৃন্ময়ের সকল ভক্তরাও। এতগুলো বছর পর প্রিয় গায়কের সাথে সশরীরে দেখা করবে, অটোগ্রাফ নিবে, সেলফি তুলবে, গিফট দিবে আরো কতকিছু। তাই তো দেশে একটা ছোট্ট হুলুস্থুল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মৃন্ময় স্যাড গানের জন্য বিখ্যাত ছিল, বিশেষ করে মেয়েদের কাছে। যারা ভালোবাসায় ছ্যাকা খেত, তারা রাতে মৃন্ময়ের গান শুনতো আর প্রিয় মানুষটিকে অনুভব করে চোখের জলে বালিশ ভেজাতো। অথচ তারা কেউই এই স্যাড গান গাওয়ার পিছনের রহস্য জানে না৷ তারা জানেই না, তাদের অতি প্রিয় গায়ক মৃন্ময় আহমেদ রাজও ছ্যাকা খেয়ে বাঁকা হয়ে আছে। আর নিজের ভালোবাসাকে না পাওয়ার কষ্ট থেকেই তার এই যাত্রা শুরু। এই নতুন জগতে সে খুব কম সময়ে সবার মন জিতে নিলেও অনেকেই হয়ে উঠেছে তার শত্রু! ভালোর মাঝেও খারাপ রয়েছে। ঠিক তেমনই মৃন্ময় ভক্তদের সাথে কিছুসংখ্যক শত্রুও পেয়েছে।
❝না রাখা কিছু কথা
সময়েরই ঝরা পাতা
দিয়ে যায় শুধু ব্যথা
এই বুকে….
থেমে যাওয়া সেই গানে
জমে থাকা অভিমানে
বৃষ্টি থামে না, দু চোখে…
ও মন কাঁদে রে,
কাঁদে রে, কাঁদে রে
স্মৃতি মোছে না… ওওও…(২)
আয়না মন ভাঙা আয়না
যায়না ব্যথা ভোলা যায়না
সয়না এই ব্যথা যে সয়না…(২)❞
~~~~~~~~~~~~
বিশাল অডিটোরিয়ামে হাজারো ভক্তদের সামনে মূল স্টেজে, নিজের সিগনেচার গিটার নিয়ে গান গাইছে মি. মৃন্ময় আহমেদ রাজ। তার সামনে সকল ভক্তরা গানটা অনুভব করছে। এত এত মানুষের ভিড়ে আলো, ছায়া, মায়া হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। তাদের জন্য বিশেষভাবে বসার আলাদা করে জায়গা করা হলেও তারা সবার মাঝেই এসে মিলেমিশে গেছে। আজ ছায়া মেরুন রঙা শাড়ি পরে এসেছে। তার দুইপাশে আলো ও মায়া রয়েছে। চারিদিকে ভক্তদের ভিড়ে মিডিয়ার লোকজন, পুলিশ, গার্ডও আছে।
আলো আশেপাশে উঁকিঝুঁকি মে’রে তার স্বামীকে খুঁজছে। একসময় পেয়েও গেল, ওই তো স্টেজের পাশে এক জায়গায় বসে থেকে ফোন টিপছে। চারিপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে, সেদিকে উনার কোনো ধ্যান নেই! বেরসিক পুরুষ কোথাকার।
গান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে, মৃন্ময় বসে পড়ল সবাইকে অটোগ্রাফ দিতে। সে হাসিমুখে সবার সাথে টুকটাক কথা বলছে, অটোগ্রাফ দিচ্ছে, সেলফি তুলছে এবং ভক্তদের নিয়ে আসা উপহারও গ্রহণ করল। এমনকি তার তরফ থেকেও উপহার দেওয়া হলো। পুরো হল জুড়ে তার নাম ধরে চিৎকার, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর অন্যরকম একটা উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছে।
-“এ্যাই আপু? চলো…চলো? অটোগ্রাফ নিবো।”
ছোট বোনের ঠেলাঠেলি দেখে আলো চোখমুখ কুঁচকে বলল,
-“ভাইয়া তো তোকে অটোগ্রাফ দিয়েছে, তাহলে আবার কেন নিবি?”
-“ইচ্ছে করছে তাই নিবো।”
-“তাহলে যা মায়াকে নিয়ে, আমি ওই ভিড়ের মধ্যে গিয়ে চ্যাপ্টা হতে পারব না।”
ছায়া বড় বোনকে আর জোর করল না। মায়াকে বগলদাবা করে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল।
-“অটোগ্রাফ প্লিজ…!”
চেনা কণ্ঠস্বর শুনে মৃন্ময় মুখ তুলে সামনে দাঁড়ানো রমণীর দিকে তাকায়।
-“ডবল চান্স নেই, মিস! আপনাকে আমি অনেক আগেই অটোগ্রাফ দিয়েছি।”
-“আপু ঠিকই বলে, আপনি ভীষণ কিপ্টে।”
মৃন্ময় হেঁসে মেয়েটার হাত থেকে ডায়েরি নিয়ে অটোগ্রাফ দিল। ছায়া নিয়ে আসা একগুচ্ছ লাল গোলাপ এবং একটা ছোট্ট গিফট বক্স বাড়িয়ে দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আপনার ভক্তর তরফ থেকে সামান্য গিফট। আশা করছি গ্রহণ করবেন।”
মৃন্ময় বাধ্য ছেলের মতো সেগুলো নিয়ে নিজের পাশে রাখল। তারপর ছায়া বায়না করল সেলফি তোলার! মৃন্ময় চুপচাপ মেয়েটার সাথে হাসিমুখে অনেকগুলো ছবি তুললো। এবং স্পেশাল একটা গিফটও দিল। খুব চমৎকার একটা ব্রেসলেটের মাঝে খোদাই করে লেখা আছে—M.A!
যেটা পেয়ে এক মূহুর্তেই ছায়া খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল। মেয়েটার খুশি দেখে মৃন্ময় ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বাকীদের কে অটোগ্রাফ দিতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে আলো মুচকি হাসল। তখন পাশে কারোর অস্তিত্ব অনুভব করে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আজ আমার বোনটা খুব খুশি।”
আধার ছায়ার দিকে তাকায়। মেয়েটা মায়াকে কিছু একটা বলছে আর হাসতে হাসতে বাম হাতে ব্রেসলেট পরছে। যেটা একটু আগে মৃন্ময় দিয়েছে।
-“আপনি অটোগ্রাফ নিবেন না?”
আলোর কথা শুনে আধার নজর সরিয়ে নিয়ে বিরবির করে বলল, -“যেখানে প্রতিরাতে বউয়ের থেকে অটোগ্রাফ পাই, সেখানে বন্ধুর থেকে অটোগ্রাফ নিয়ে কি করব?”
-“অসভ্য লোক কোথাকার।”
আলো চোখমুখ কুঁচকে সেখান থেকে সরে গেল। আর আধার মাথা নিচু করে নিঃশব্দে হাসল।
এত এত ভক্তদের অসীম আনন্দের মাঝেও একজনের ঠোঁটের কোনো ক্রুর হাসি লেগে আছে, সাথে রক্তিম চোখদুটোও জ্বলজ্বল করছে। যেন কিছু একটা করার জন্য সঠিক মূহুর্তের অপেক্ষা আছে। গার্ডের পোশাক পরিহিত ব্যক্তিটা সকলের ওপর নজর রাখছে এবং মৃন্ময়ের থেকে বেশ দূরত্ব বজায় রেখে এক জায়গায় দাঁড়ায়। এখন শুধু ছেলেটার উঠে দাঁড়ানোর পালা। নয়তো টার্গেট মিস হয়ে যাবে। আর তিনি এই সুযোগ কোনোমতেই হারাতে চান না।
অচেনা লোকটাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। মৃন্ময় পানি খেতে খেতে উঠে দাঁড়ায়। ভক্তদের সাথে হাত নাড়িয়ে হাসিমুখে কথা বলছে ছেলেটা। ঠিক তখনই, ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে গু লির বিকট শব্দে পুরো হল রুম মূহুর্তেই
কেঁপে উঠল, -“ঠাস…..!”
গু লির বিকট শব্দে অডিটোরিয়ামের হাজার হাজার মানুষের মধ্যে মুহূর্তেই হুলস্থুল আর চিৎকার শুরু হয়ে যায়। মানুষ পাগলের মতো এক্সিট গেটের দিকে দৌড়াচ্ছে। তারা অনেক খেয়ালই করল না, তাদের প্রিয় গায়ক কে বাঁচাতে গিয়ে এক রমণী নিজের বুকে বুলেট নিয়েছে!
-“ছা….ছায়াআআআ।”
চোখের সামনে নিজের কলিজার টুকরো বোনের র’ক্তা’ক্ত দেহ দেখে আলো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। অন্যদিকে, ছায়ার শরীরটা দূর্বল হয়ে ভেঙে পড়ল। ফ্লোরের শক্ত মেঝেতে ওর নাজুক শরীর স্পর্শ করার আগেই মৃন্ময় বাহুডোরে আগলে নিল।
ওইদিকে লোকটা হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে কাকে গু লি করতে চেয়েছিল, আর এখন কে গু লি খেয়ে শুয়ে পড়েছে। পরক্ষণেই আবারো পি স্তল তাক করল, মৃন্ময়ের দিকে। কিন্তু এবার গু লি করার আগেই অন্য গার্ড, পুলিশ ছুটে এসে লোকটাকে ঘিরে ধরল।
-“ছ…ছায়া?”
মেয়েটার বুক থেকে গলগল করে তাজা র’ক্ত বের হচ্ছে। বুলেট ঠিক হৃদয়ের কাছে লেগেছে! মেয়েটার র’ক্তে মৃন্ময়ের গায়ে থাকা সাদা শার্ট র’ক্তবর্ণ হয়ে উঠল। ছেলেটার পুরো শরীর কাঁপছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। এই পিচ্চি মেয়েটা কেন এমন করল? কেন তাকে বাঁচাতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিল? কে বলেছিল মেয়েটাকে, ওর সামনে এসে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে? এই মেয়েটার কি নিজের জীবনের প্রতি একটুও মায়াদয়া নেই? অপরিচিত একজনের জন্য কেউ এইভাবে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতে পারে? এখন এই মেয়েটার যদি কিছু হয়, তখন? না, না! সে কিছু হতে দিবে না। কিছু না।
ছায়া অস্বাভাবিকভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছে। লালচে, অশ্রুসিক্ত নয়নে মৃন্ময়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না! মৃন্ময় সময় নষ্ট না করে, মেয়েটাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে গেটের দিকে ছুটল। এবং অস্থির গলায় বিরবির করতে থাকল,
-“কিচ্ছু হবে না তোমার, কিচ্ছু হবে না…!”
তীব্র কষ্টের মাঝেও ছায়া হাসল। সে নিজের র’ক্তা’ক্ত বাম হাতটা মৃন্ময়ের গালে রেখে, জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বহু কষ্টে বলার চেষ্টা করল, -“গ….গ-গায়ক স…সাহেব! আ…আ-আমি, আমি…আ…আপনাকে ভ…ভা….”
হঠাৎই ছায়ার শরীরটা জোরে খিচুনি দিয়ে উঠল। চোখের পলকে মেয়েটার ঠোঁটের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তাজা গাঢ় র’ক্ত গড়িয়ে পড়ল। সে আর কোনো কথা বলতে পারল না, তার শরীরটা একদম নিথর হয়ে যায়। এবং প্রিয় মানুষটির দেওয়া ব্রেসলেট পরা বাম হাতটা অবহেলায় পড়ে গেল। সঙ্গে থেমে গেল শ্বাসপ্রশ্বাস! কিন্তু তার চোখের পাতা দুটো তখনও বন্ধ হলো না, অর্ধেক খোলা পাথরের ন্যায় স্থির চোখ দুটো দিয়ে সে যেন শূন্যের দিকে তাকিয়ে রইল।
মৃন্ময়ের পায়ের সাথে ওর হৃদয়ও থমকে যায়। সে চট করে মেয়েটার খোলা, কাজল রাঙা, রক্তিম চোখের দিকে তাকায়। শেষ বারের মতো ছায়ার মায়াবী চোখের কার্নিশ বেয়ে দুফোঁটা নোনা অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ল।
মেয়েটার নিথর শরীরটা দেখে মৃন্ময়ের চোখদুটো জ্বলে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে মেয়েটাকে নিচে নামিয়ে, বুকের মাঝে নিয়ে চিল্লিয়ে ডাকতে শুরু করল,
-“এ্যাইইই মেয়ে? ওঠো বলছি। দেখো, আমার সাথে একদম নাটক করবে না। আমি জানি, তুমি আমাকে ভয় দেওয়ার জন্য ইচ্ছে করে এমন করছো। এই ওঠো বলছি!”
প্রতিত্তোরে কোনো জবাব এল না। শুধু মেয়েটার আঁখিজোড়ায় খোলা রয়ে যায়।
-“ওহ গড, নো! প্লিজ, সে ইট… প্লিজ, কিছু একটা বলো! এই, ছায়া? ওঠো বলছি, ড্যাম ইট…!”
রমণীর র’ক্তে ভেজা শরীরটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করে উঠল মৃন্ময়। ওর রক্তিম এক চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল মেয়েটার মলিন মুখের ওপর। তবুও কোনোরকম সাড়া দিল না ছায়া! কারণ সে বহু আগেই আকাশের বাসিন্দা হয়ে গেছে। তাদের সামনে ধপ করে হাঁটু ভেঙে বসল আলো। যুবকের কাছ থেকে নিজের বোনকে ছিনিয়ে নিয়ে, শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“বোন আমার…! এইভাবে চুপ করে থাকিস না, তোর আপুর যে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। তুই তো আমার সোনা বোন, কখনো আপুকে কষ্ট দিসনি, তাহলে এখন কেন দিচ্ছিস? এই কথা বল না রে…একটু বল বোনু! আমার যে তোর এই নিশ্চুপ থাকাটা সহ্য হচ্ছে না, একটুও সহ্য হচ্ছে না। আমি তোকে কথা দিচ্ছি, আজ থেকে তোর সব কথা শুনব, রাখব, তোর সব ইচ্ছে পূরণ করব। তুই না আমাকে খুব ভালোবাসিস? তাহলে কেন এখন আমার কথা শুনছিস না? এই বোনু? ওঠ, একটু আমার ডাকে সাড়া দে প্লিজ! আমার যে খুব কষ্ট হচ্ছে, খুউউউব।”
কথাগুলো বলে বোনকে দু’হাতে চেপে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল আলো। তার সাথে তাল মিলিয়ে মায়াও হাউমাউ করে কাঁদছে। ওইদিকে আধার ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে, চোখের সামনে এমন অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখে এক মূহুর্তের মধ্যে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। ওই মেয়েটার শরীরে এত র’ক্ত কেন? একটু আগেই তো সুস্থ অবস্থায় দেখে গেল, তাহলে?
আধার শুকনো ঢোক গিলে রোবটের মতো ভিড় ঠেলে কাছে এগিয়ে গেল। তাকে দেখে আলো কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-“দেখুন না, আমার বোনটা কথা বলছে না আমার সাথে। আপনি ওকে বলুন না, আমার সাথে একটু কথা বলতে?”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“আ…আমার বোনের শরীর থেকে অনেক র’ক্ত পড়ছে, ওকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চলুন। তারপর দেখবেন সুস্থ হয়ে গেছে, আর আমার সাথে কথা বলছে। আপনি ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কি বলছি শুনতে পাচ্ছেন না? আমার বোনকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে চলুন, আমার কলিজার টুকরো বোনটার যে কষ্ট হচ্ছে। তাড়াতাড়ি ওকে নিয়ে চলুন, নয়তো ও আরো কষ্ট পাবে!”
আধারের চোখ ভীষণ বাজেভাবে জ্বলছে। সে যতই অতীত ভোলার চেষ্টা করুক না কেন, তবুও কোনো না কোনো উপায়ে ঠিকই তার ক্ষতকে জাগিয়ে তোলে। সে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে অর্ধাঙ্গিনীর পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। কাঁপা কাঁপা বাম হাতটা মেয়েটার মাথার ওপর রাখল। আলো তখনো ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করে যাচ্ছে!
-“ওর শরীর থেকে যত র’ক্ত পড়েছে, সবটা আমি দিবো। তবুও ওকে হাসপাতালে নিয়ে চলুন। আপনার দুটো পায়ে পড়ি স্যার, আমার বোনটাকে বাঁচিয়ে দিন। ছায়া বিহীন আলো থাকবে কীভাবে? আমার ছায়াকে চাইইই! ওকে ফিরিয়ে আনুন, প্লিজ ফিরিয়ে আনুন…। আমি আমার বোনকে চাই।”
শেষের বাক্যগুলো নিভু নিভু গলায় বলে আলো। বুকের মাঝে লেপ্টে থাকা ছোট্ট শরীরটাকে একটু আলগা করে ঝুঁকে এসে বোনের পুরো চেহারায় পাগলের মতো ঠোঁট ছুঁয়ে বিরবির করল,
-“একটু সাড়া দে বোন আমার। তোর আপুর দমটা যে বন্ধ হয়ে আসছে! তুই কবে থেকে এত পাষাণ হলি? বড় বোনের কষ্ট দেখেও চুপ করে আছিস। আমার ছায়া তো এতটা স্বার্থপর ছিল না। কিন্তু…কিন্তু তুই? তুই তো একটা স্বার্থপর মেয়ে বের হলি। একবারের জন্যও আমাদের কথা ভাবলি না। এই ছায়া, ওঠ! নয়তো আমি তোর সাথে কখনো কথা বলব না। এতটা পাষাণ হস না। ভালোবাসি তো, তোকে তোর আপু অনেক অনেক ভালোবাসে। এখন তুই বল, তুইও আমাকে ভালোবাসিস! এইইইই….বল না রেএএএ।”
এত এত কথা বলার পরেও ছায়া নিশ্চুপ। আলো উন্মাদের মতো কাঁদতে কাঁদতে একসময় জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল, স্বামীর বুকের মাঝে। আধার অর্ধাঙ্গিনীকে আগলে নিয়ে চোখ বুজে নিল। ওরও কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কি থেকে কি হয়ে গেল, ভাবতেও দম আঁটকে আসছে। আজকের এই সুন্দর রাতটা এমন ভয়ংকর, নিষ্ঠুরতম না হলেও পারত।
ছায়ার জীবনের সাথে সাথে তার না বলা কথা, অনুভূতিগুলোও থেমে গেল৷ মেয়েটার বলা আর হলো না, সে তার গায়ক সাহেব কে কতটা ভালোবেসেছিল এবং চেয়েছিল। হয়তো ছেলেটা কখনো জানবেও না, তাকেও কেউ একজন নিঃস্বার্থের মতো ভালোবেসেছিল। যার শেষ পরিণাম বড্ডই নিষ্ঠুর! সর্বশেষে ঝড়ে পড়ল একটি ফুল এবং পৃথিবী থেকে এক নিমিষেই মুছে গেল একটি মেয়ের নিষ্পাপ প্রাণ….
অদূরে লোকালয়ের কোথাও একটা থেকে ভেসে এল কিছু গানের লাইন—
❝Phir agar mujhe, tu kabhi na mile
Humsafar mera tu bane na bane…
Faaslon se mera pyar hoga na kamm
Tu na hoga kabhi ab juda aaaa…
Maine tera naam dil rakh diya
Maine tera naam dil rakh diya..
Dhadkega tu mujhme sada
Maine tera naam dil rakh diya
Tere vaaste kabhi mera yeh pyar
na hoga kamm…❞
#চলবে

