Home "ধারাবাহিক গল্প এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব-৫২ এবং শেষ পর্ব

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব-৫২ এবং শেষ পর্ব

0
644

#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৫২ (শেষ পর্বের প্রথম খন্ড)

সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর আজ বাপের বাড়িতে এসেছে আলো। আধার রেখে গিয়েছে এবং সাবধানে থাকতে বলেছে। ভার্সিটিতে ক্লাস থাকার জন্য সে থাকতে পারেনি, তবে ভার্সিটি শেষে রাতে আসবে। আলো আসার পর থেকে খেয়াল করেছে, ওর ছোট বোন কিছুটা পাল্টেছে। তার সাথেও ভালো করে কথা বলছে না, সারাক্ষণ নিজেকে রুম বন্দী করে রাখছে। হুট করে হাসিখুশি থাকা মেয়েটার কি হলো সেটা জানতে মায়াকে চেপে ধরে। কারণ এরা দুজন একে অপরের সাথে সবকিছু শেয়ার করে। নিশ্চয়ই ছায়ার এমন পরিবর্তনের কারণ মায়া জানে। কয়েক দিন আগে মৃন্ময়ের রাখা ইভেন্টের শেষে কি কি হয়েছিল এবং দেখেছে, সবকিছু মায়া বলে দেয় বড় আপুকে। সবটা শুনে আলো কিছুক্ষণের জন্য থম মে’রে ছিল। পরপরই ছোট বোনের কাছে ছুটে যায়।

-“ছায়া?”

ছায়া মনম’রা হয়ে ছাঁদের একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন বড় বোনের ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। আলো বোনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আমরা যেটা খুব করে চাই, সেটা সবসময় পাই না। এক জীবনে যদি সবকিছুই পেয়ে যাই, তাহলে আর আফসোস কিসের থাকবে?”

বোনের কথার মানে বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো না ছায়ার। মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎই আপুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল এবং বলল,

-“কেন, কেন আপু? কেন হলো এমন? আমি কি খুব বেশি কিছু চেয়েছি? শুধু আমার গায়ক সাহেব কে চেয়েছিলাম। কিন্তু…কিন্তু উনি আমারে না, অন্য কাউকে চায়। যে মেয়ে অতীতে উনাকে ধোঁকা দিয়েছে, উনি সেই মেয়েকেই চান। ভালোবাসা এত নিষ্ঠুর কেন আপু? জানো? আমার না অনেক কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতর অসহনীয় যন্ত্রণা করছে। তোমার বোন এই ব্যথা কীভাবে সইবে আপু? কীভাবে?”

আলো বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখদুটো বুজে নিল। সে কি বলে সান্ত্বনা দিবে মেয়েটাকে? তার যদি সাধ্য থাকত, তাহলে এক্ষুনি ছুটে গিয়ে মৃন্ময়কে এনে দিত। কিন্তু, তার যে এই ক্ষমতা নেই। তবে এই কষ্টের থেকে বোনকে বের করার একটা উপায় রয়েছে। আলো কিছু একটা ভেবে নিজেকে সামলিয়ে বোনের মাথায় হাত রেখে বলল,

-“কষ্ট পাস না বোন! জীবন কারোর জন্য থেমে থাকে না। আমাদের ভাগ্যে যা নেই, তা আমরা হাজার চাইলেও পাবো না।”

ছায়া কিছু বলল না, শুধু আপুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকল।

মৃন্ময় একটা কফিশপে এসেছে। মূলত একজনের সাথে দেখা করতে। ওর পরণে কালো হুডি, জিন্স, মাথায় ক্যাপ, মুখে মাক্স! সেলিব্রিটি হলে এই এক জ্বালা, যেখানে সেখানে যাওয়া যায় না। সে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসল। কিছুক্ষণ পর সেখানে তিশা হাজির হয়। আজ মেয়েকে নিয়ে আসেনি, বাড়িতে ন্যানির কাছে রেখে এসেছে। পরনে মৃন্ময়ের পছন্দের রঙের নীল জর্জেট শাড়ি৷ সে হেলেদুলে মৃন্ময়ের সামনে গিয়ে বসল।

-“এখানে না এসে আমার বাড়িতে আসতে পারতে।”

মৃন্ময় শান্ত গলায় জবাব দিল, -“আমি যেখানে সেখানে কম্ফোর্ট ফিল করি না। যাইহোক, কি খাবে বলো?”

-“কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। তোমাকে দেখে মন, পেট দুটোই ভরে গেছে।”

-“রায়া কেমন আছে?”

-“ভালো, তোমাকে পাপা হিসেবে পেলে আরো ভালো থাকবে। তা আমরা কবে বিয়ে করছি, রাজ?”

মৃন্ময় প্যান্টের পকেট থেকে একটা চেক বের করে টেবিলের ওপর রেখে বলল, -“মেয়েকে মানুষ করতে তোমার যত টাকা প্রয়োজন, সেটার এমাউন্ট এখানে লিখে ব্যাংক থেকে তুলে নিও৷ আমি সাইন করে দিয়েছি।”

তিশা অবাক কণ্ঠে শুধাল, -“মানে?”

-“মানে এই যে, আমি তোমার জীবনে ফিরছি না। তুমি আমার অতীত ছিলে, কিন্তু বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অন্য কেউ। আমি শুধু রায়ার জন্য সময় চেয়েছিলাম, মেয়েটাকে পৃথিবীর সব সুখ এনে দিতে পারলেও পিতার সুখ দিতে পারব না। তুমি চাইলে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারো, যে তোমাকে এবং তোমার সন্তানকে ভালোবাসবে।”

-“কিন্তু….আমি তোমাকে চাই রাজ!”

-“আমি কোনো বেইমানকে চাই না তিশা।”

মৃন্ময়ের সোজাসাপ্টা জবাব শুনে তিশা অসহায় কণ্ঠে বলল, -“অতীত ভুলে আবার নতুন করে জীবন শুরু করা যায় না?”

-“না যায় না, অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

-“তুমি যতই আমার সামনে নিজের আত্মসম্মান দেখাতে চাও না কেন, তবুও আমি জানি তুমি আজও আমাকে ভালোবাসো।”

-“যদি তাই হতো, তাহলে ওইদিনই তোমার কাছে ছুটে যেতাম, যেদিন তোমার সো কোল্ড স্বামী তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিল। আমি আমার অতীত ভুলে জীবনে এগিয়ে গেয়েছি, আর এখন এই মৃন্ময়ের জীবনে অতীতের কোনো চিহ্ন নেই। আমার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে তুমিও নেই। তুমি শুধুই ছিলে আমার খারাপ অতীত মাত্র৷ এ নতুন জীবনে তোমার কোনো ঠাঁই নেই, তিশা৷ অতীতে যেভাবে আমাকে ভুলে গিয়েছিলে, এখনো সেভাবে ভুলে যাও। কারণ এখন আমি তোমার রাজ নই, শুধু গায়ক মৃন্ময় আহমেদ ওরফে এমএ!”

-“এতটা না পরিবর্তন হলেও পারতে রাজ..!”

মৃন্ময় তাচ্ছিল্যের সুরে আওরাল, -“এই তুমিই আমাকে বদলাতে বাধ্য করেছিলে।”

তিশা চেক বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়ে থেকে বিরবির করে বলল, -“শেষ বারের মতো তোমার প্রথম ভালোবাসা কে একটা সুযোগ দেওয়া যায় না?”

মৃন্ময় চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল, -“মৃন্ময় কাউকে সেকেন্ড চান্স দেয় না!”

-“তাহলে বিয়ে করছো না কেন?”

মৃন্ময় চলে যেতে চেয়েও থেমে গেল। পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তিশার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলে উঠল,

-“আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে৷ তোমার দাওয়াত রইল। অবশ্যই আসবে কিন্তু! সঠিক সময়ে বিয়ের কার্ড পৌঁছে যাবে তোমার বাড়িতে।”

আলো দুপুরের দিকে গোসল করে ড্রয়িংরুমে এসে দেখল টেবিলের ওপর একটা বিয়ের কার্ড রাখা রয়েছে। এটা দেখে কপাল কুঁচকে গেল। গলা উঁচিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল,

-“এটা কার বিয়ের কার্ড, মা?”

আলেয়া রহমান ডাইনিং টেবিলের ওপর খাবার সাজিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, -“মাহিনের।”

নামটা শুনে আলোর হাত থেকে তোয়ালে পড়ে গেল নিচে। সে ছুটে এসে কার্ড টা খুলে ভালো করে দেখতে লাগল। বরের নামের জায়গায় ‘মাহিন’ লেখা এবং বউয়ের নামের জায়গায় ‘তানিয়া’ লেখা। তাদের আগামী মাসে বিয়ে! আলো পুরো কার্ড পড়তে পারল না, এক দৌড়ে নিজের রুমের ভেতর চলে গেল। তারপর ফোন খুঁজে বের করে সোজা মাহিন ভাইয়াকে কল দিল।

-“কেমন আছিস ছোট্ট কবুতর?”

মামাতো ভাইয়ের কথা শুনে আলো অস্থির গলায় শুধাল,

-“তুমি…তুমি বিয়ে করছো?”

-“হ্যাঁ!”

-“কিন্তু কেন? তুমি না অন্য কাউকে চাইতে? তাহলে?”

ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিশ্চুপ। আলো আবারো বলে ওঠে, -“তুমি চাইলে, আমি এ বিষয়ে মা-বাবার সাথে কথা বলব ভাইয়া। তবুও প্লিজ এই বিয়েটা করো না!”

মাহহিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, -“আমি মা কে ছায়ার কথা বলেছিলাম, কিন্তু মা চায় না ওকে।”

আলো অবাক কণ্ঠে শুধাল, -“কেন? কোনো সমস্যা?”

-“মেঘ মা’রা যাবার পর মা আর চাচ্ছে না রহমান পরিবারের কেউ এ বাড়ির বউ হয়ে আসুক।”

আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে বিরবির করল, -“তারমানে মামি মনে মনে এটা মানে? আমাদের জন্যই উনি উনার স্বামী, মেয়েকে হারিয়েছে? যেখানে আমরাও আমাদের পরিবারের একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছি। কই, আমরা তো তোমার বোনকে বা তোমার পরিবারকে দোষারোপ করিনি? তোমার হুট করে আমাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলে, তবুও আমরা কিছু মনে করিনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি এর পিছনের আসল কারণ।”

একটু থেমে পুনরায় আওরাল, -“এখন বলো, তুমি কি চাও?”

-“আমার জীবনে মা বলতে আর কেউ নেই। বাবাকে হারিয়েছি, কিন্তু মাকে হারাতে পারব না আলো৷ তাই আমি আমার মায়ের ইচ্ছেটাকেই মেনে নিয়েছি।”

আলোর কেন জানি খুব কান্না পেল। তার ভাই, বোনের
ভাগ্য এত খারাপ কেন? একজন নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়েও হারিয়ে ফেলল, সাথে নিজের প্রাণও। আরেকজন একতরফা ভালোবেসে প্রতিনিয়ত কষ্ট পাচ্ছে। তার কাছে একটা শেষ উপায় ছিল, বোনের কষ্ট কমানোর জন্য। কিন্তু এখন সেটাও আর নেই। সে কোনোমতে কান্না গিলে খেয়ে ধরা গলায় বলল,

-“নতুর জীবনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ভাইয়া। দোয়া করি, আগামী জীবন তোমাদের সুখের হোক! আচ্ছা, ভালো থেকো। আল্লাহ হাফেজ।”

একথা বলে লাইন কেটে দিয়ে ফোনটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে মা’রল। দু’হাতে মাথার ভেজা চুল খামচে ধরে নিরবে কেঁদে দিল। তার বোন কি কখনো সুখের মুখ দেখবে না? কেউ কি তাকে একটুও ভালোবাসবে না? মেয়েটার ভাগ্যে কি ভালোবাসা বলে কিছু নেই? তার মতো যদি ওর বোনটাও প্রিয় মানুষটিকে পেত, তাহলে কতোই না ভালো হতো। অন্তত জীবনে ভালোবাসা না পাওয়ার আফসোস থাকত না। তার ভাই-বোনদের ভাগ্য এত নিষ্ঠুর না হলেও পারত!

মৃন্ময় সন্ধ্যা বেলা বাড়িতে ফিরে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,

-“পাত্রী দেখা শুরু করো, এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে করব।”

ছেলের কথা শুনে মারুফা আহমেদ চমকে উঠলেন। তিনি কিছু বলতে যাবেন তার আগেই মিরা ভিডিও কলের ওই পাশ থেকে বলল, -“সতিই তুমি বিয়ে করবে ভাইয়া?”

মৃন্ময় ল্যাপটপের সামনে বসতে বসতে বলল, -“হুম, সত্যিই।”

-“আমার পছন্দের একজন রয়েছে ভাইয়া। তবে একটু বয়স কম এই!”

-“ক্লাস টেনের হলেও চলবে, বাট…ফিডার খাওয়া বাচ্চা না হলেই হবে।”

মিরা শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল, -“আরেহ না না, এত ছোট না। এই উনিশ, বিশ বছর। মজার ব্যাপার হলো ওই পুঁচকে তোমাকে হেব্বি ভালোবাসে।”

মৃন্ময় এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, -“তুই কীভাবে জানলি?”

-“কেউ একজন বলেছে আমায়। ধরে নাও, তোমার কাছের মানুষ।”

মৃন্ময়ের মাথা ব্যথা করছে, তাই সে অত ভাবল না। শটকার্টে শুধু মায়ের উদ্দেশ্যে এইটুকু বলল, -“তোমাদের যাকে পছন্দ হয় তার সাথেই আমার বিয়ে ঠিক করো৷ আর সেটা এই সপ্তাহের মধ্যেই! নয়তো সারাজীবন কুমার থেকে যাবো বলে দিলাম।”

—————————————–
রাত দশটার দিকে আধার শ্বশুর বাড়িতে এল। গাড়ি পার্ক করে ডোর খুলে ভেতরের দিকে যেতেই দেখতে পেল, মতিউর রহমান একজন ডক্টরের সাথে বাইরে আসছেন। এসময়ে ডাক্তারকে দেখে আধারের কপাল কুঁচকে গেল। কারোর কিছু হয়েছে নাকি? প্রশ্নটা মনের মাঝে উঁকি দিতেই সে বড় বড় পা ফেলে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

-“সব ঠিক আছে আব্বু?”

মতিউর রহমান ডাক্তারকে বিদায় দিয়ে জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, -“বড় মেয়েটা হঠাৎই জ্ঞান হারিয়েছিল, তাই ডাক্তারকে ডেকেছিলাম। তুমি ভেতরে এসো!”

বউ জ্ঞান হারিয়েছে জানতে পেরে আধার হাঁটতে হাঁটতে অস্থির গলায় জানতে চাইল, -“ডাক্তার কি বললেন? ও সুস্থ আছে তো?”

-“কিছুটা।”

আধার থেমে গিয়ে অবাক কণ্ঠে শুধাল, -“কিছুটা মানে? ওর কি হয়েছে?”

-“ভেতরে চলো, তারপর বলছি।”

শ্বশুরের থমথমে মুখ দেখে আধার বেশ চিন্তিত হয়। সে শ্বশুরকে রেখেই তড়িঘড়ি করে ছুটে চলে যায় ভেতরে। আলো বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় শুয়ে ছিল। কেঁদেকুটে চেহারার বারোটা বাজিয়েছে। অর্ধাঙ্গিনীর এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে আধারের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ছুটে এসে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

-“কি হয়েছে? তোমার এই অবস্থা কেন?”

রুমের ভেতর সবাই উপস্থিত ছিল। হুট করে এইভাবে জড়িয়ে ধরার ফলে আলো কিছুটা লজ্জা পেল। তড়িঘড়ি করে স্বামীর বুক থেকে মাথা তুলে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“কিছু হয়নি, ছাড়ুন আমাকে।”

-“কিছু না হলে ডাক্তার কেন এসেছিল? তুমি আমার থেকে কিছু লুকানোর চেষ্টা করছো?”

পাশ থেকে ছায়া বলে উঠল, -“এটা লুকিয়ে রাখা যায় না ভাইয়া। তিন-চার মাস পর এমনিই বেরিয়ে আসবে।”

আধার বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, -“মানে? কি বেরিয়ে আসবে?”

ছায়া কিছু বলতে যাবে তখনই আলো চোখ রাঙায়। ওইদিকে আধার অধৈর্য্য হয়ে আবারো জিজ্ঞেস করল,

-“কি হয়েছে আমাকে বলবে কেউ? শুধু শুধু হার্টবিট বাড়িয়ে দেওয়ার কোনো মানেই হয় না।”

আলেয়া রহমান ও নীলিমা রহমান ঠোঁট টিপে হেঁসে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। উনার পিছু পিছু ছায়া, মায়াও চলে যায়। সবাইকে চলে যেতে দেখে আধার চোখমুখ কুঁচকে বলল, -“কিছু না বলে সবাই চলে যাচ্ছে কেন? আশ্চর্য!”

আলো শুকনো ঢোক গিলে ফিসফিস করে বলল, -“সবটা বলব আপনাকে, তবে রাগারাগি করতে পারবেন না।”

-“দোষ করলে অবশ্যই রাগারাগি করব।”

-“আমার শুধু দোষ নেই, আপনারও আছে।”

-“আমি আবার কি করলাম?”

-“সবকিছু তো আপনিই করেছেন।”

-“ত্যাড়ামি না করে পরিষ্কার করে বলো, কি হয়েছে?”

-“আপনি যেটা চাননি, ওটাই হয়েছে। অবশ্য এর পিছনে আমারই হাতপা রয়েছে। কারণ আমি তাকে খুব করে চেয়েছি।”

আধারের মেজাজ খারাপ হলো। এই মেয়েটা সবসময় কথা ঘুরিয়ে পেচিয়ে বলে কেন?

-“কাকে চেয়েছো? নিজের প্রেমিক কে?”

আলো দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, -“না। আমাদের দুজনের ভালোবাসার ফল কে চেয়েছি।”

-“তা কি ফল পেলে? আর ফল-টা টক না মিষ্টি?”

স্বামীর এহেন কথা শুনে আলো দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

-“মজা করছেন আপনি?”

-“হ্যাঁ।”

আলো রেগেমেগে স্বামীকে দূরে ঠেলে চিল্লিয়ে উঠল,

-“আপনি আপনার মজা নিয়েই থাকুন, আমার কাছে আসতে হবে না। চলে যান এখান থেকে।”

-“ঠিক আছে।”

একথা বলে আধার উঠে দরজার দিকে যেতে লাগল। আর আলো ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল। সে তো এমনি বলল কথাটা। তাই বলে লোকটা চলে যাবে? এমনিতেই সে দ্বিধায় পড়ে আছে৷ খবরটা পেলে মানুষটা কেমন রিয়াক্ট করে কে জানে। তার এসব ভাবনার মাঝেই দরজা লাগানোর শব্দ পেয়ে, চট করে সামনে তাকায়।

আধার ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে এগিয়ে আসতে আসতে হিসহিসিয়ে বলল, -“তুমি যতবার আমাকে দূরে যেতে বলবে, ঠিক ততবারই তোমার আরো কাছে আসব আমি।”

আলো ভয় পেয়ে খানিক পিছিয়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, -“এখন এসব করা কিন্তু ঠিক নয়, স্যার।”

আধার শার্ট খুলে এগিয়ে এসে, অর্ধাঙ্গিনীর পা চেপে ধরে এক ঝটকায় কাছে নিয়ে এল।

-“কেন? তোমার পিরিয়ড হয়েছে?”

আধার ঝুঁকে মেয়েটার ঠোঁটের কোণে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল। আলো চোখ বুজে ঘাড় কাত করে বিরবির করল, -“ওটার থেকেও অনেক বড় কিছু হয়েছে।”

আধার গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে জানতে চাইল, -“কি?”

আলো নিশ্বাস আঁটকে রেখে বলে উঠল,

-“আ…আমি প্রেগন্যান্ট!”

অর্ধাঙ্গিনীর বলা ছোট বাক্যটা কর্ণপাত হতেই আধারের হৃদয় থমকে গেল। সে তড়াক করে মাথা তুলে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধাল, -“কি বললে তুমি?”

আলো পিটপিট করে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে আওরাল,

-“আপনি বাবা হতে চলেছেন, মি. খান। আপনার অংশ, আপনার র’ক্ত, আমাদের দুজনের ভালোবাসার পূর্ণতার ফল, খুব শীঘ্রই পৃথিবীতে আসতে চলেছে।”

#চলবে

#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৫২ (শেষ পর্বের দ্বিতীয় খন্ড)

অর্ধাঙ্গিনীর মুখ থেকে অপ্রত্যাশিত কিছু বাক্য শোনা মাত্রই আধারের পুরো দুনিয়া থমকে যায়। সে ফ্যালফ্যাল করে মেয়েটার উদরের মাঝে তাকিয়ে রয়৷ তারপর আস্তেধীরে জামা সরিয়ে কোমল পেট ছুঁয়ে দিল এবং বলল,

-“আমার সন্তান! এখানে আমার অংশ রয়েছে। এখন থেকে আমাকেও কেউ পাপা বলে ডাকবে?”

আলো মুচকি হেঁসে দু’হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

-“হ্যাঁ, এখন থেকে আমার মতো আরেকজনও আপনাকে জ্বালাবে। এবং সারাক্ষণ পাপা পাপা বলে পিছু ছুটবে।”

একটু থেমে পুনরায় বলল, -“আপনি খুশি হয়েছেন?”

প্রতিত্তোরে আধার মাথা নুইয়ে অর্ধাঙ্গিনীর নগ্ন পেটের মাঝে মুখ ডুবিয়ে অজস্র ভেজা চুমুতে ভরিয়ে দিল।

-“পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর উপহারটা দিয়েছো আমাকে। আমি হয়তো কিছুটা সময় চেয়েছিলাম, কিন্তু…এখন মনে হচ্ছে সবচেয়ে বড় ভুল করেছি। এই সুখটা আরো আগে পাওয়ার দরকার ছিল।”

আলো নিঃশব্দে হাসল। আধার আবারো ফিসফিসিয়ে বলল, -“আমি আজ অনেক খুশি জান, অনেক। যেটা তোমাকে মুখে বলে বোঝাতে পারব না।”

আলো স্বামীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিরবির করে বলে ওঠে, -“আপনার সুখেই আমার সুখ!”

দীর্ঘ এক সুন্দর রাত পেরিয়ে নতুন সকালের আগমন ঘটে। রহমান পরিবারের সবাই ভীষণ খুশি। এত বছর পর পরিবারে ছোটো নতুন সদস্য আসতে চলেছে, এটা ভাবতেই মনের মাঝে প্রশান্তির সুখ বয়ে যাচ্ছে। সকল দুঃখের মাঝে এক টুকরো সুখের দেখা আবারো মিলেছে৷ সকাল থেকেই দুই জা মিলে আলোর পছন্দ মতো রান্না করতে শুরু করেছে। মতিউর রহমান ও মাহবুব রহমান গিয়েছেন বাজারে৷ ওখান থেকে মিষ্টি এনে মসজিদে ও পাড়াপ্রতিবেশিদের দিয়েছে। ছায়া, মায়া একটু পরপরই আপুর কাছে গিয়ে ঘুরঘুর করছে। কিন্তু…দুলাভাই থাকার কারণে বেশি যেতে পারছে না। মানুষটাও বউকে ছাড়া নড়ছে না। সবার আনন্দ দেখে আলো অনেক খুশি হয়েছে। এবং বোনদের কান্ড দেখে খিলখিল করে হেসেছে। আর মা, চাচির হাতের মজার রান্না খেয়ে বমি করে ভাসিয়েছে। তবে এতকিছুর মধ্যেও সে সুখ অনুভব করছে। মাতৃত্বের প্রথম অনুভূতি বুঝি এমনই হয়।

বাপের বাড়িতে কিছুদিন থেকে নিজের সংসারে ফিরে এসেছে আলো। তার মা হওয়ার কথা শুনে সোবহান খান খুশিতে কেঁদে দিয়েছেন। তিনি একসময় আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, এ জীবনে আর নাতির সন্তানের মুখ দেখতে পারবে না। কিন্তু উপরওয়ালার উনার ইচ্ছেটা পূরণ করেছেন। খবরটা পাওয়া মাত্রই নামাজ পড়ে সৃষ্টিকর্তার নিকট লাখো শুকরিয়া আদায় করেন। এবং বলেন, তার নাতির সংসার যেন সুখে-শান্তিতে ভরে ওঠে।

আলো ভয়ে ভয়ে তার শ্বাশুড়ি মাকেও খুশির খবরটা দেয়। এক মূহুর্তের জন্য ভেবেছিল, এই বুঝি জিজ্ঞেস করেন—এটা কার সন্তান! কিন্তু তাকে অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে তাহমিনা খান এই প্রথম মেয়েটাকে দোয়া দেন। কারণ তিনি একটু হলেও এ বাড়ির বংশধরকে পেয়ে খুশি হয়েছেন। হয়তো নিজের এক পা হারিয়ে, বিছানায় পড়ে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। মানুষের অহংকার সারাজীবন থাকে না। একদিন না একদিন অহংকারের পতন ঘটবেই। সেটা হোক আগে কিংবা পরে।

পড়ন্ত দুপুর বেলায় শাড়ি পরে, সেজেগুজে একটা ক্যাফেতে এসেছে ছায়া। মূলত ওর হবু বরের সাথে দেখা করতে এবং কথা বলতে। হুট করে কই থেকে মতিউর রহমান একটা সম্বোধন ধরে এনেছেন। সে শুরুতে এসবের আশেপাশেও ছিল না। এবং সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছে, সে এখন বিয়ে করবে না। কিন্তু তার মা জননী আজ ধরে বেঁধে নিজ হাতে সাজিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে ছেলের সাথে দেখা করতে। মায়াকেও নিয়ে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু মেয়েটা আবার নাচতে নাচতে বান্ধবীর বাড়িতে গেছে। সে বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে ক্যাফের সামনে এসে দাঁড়ায়। বাড়িতে দেখা করার বদলে লাট সাহেব বাইরে দেখা করার প্রস্তাব রেখেছেন। একদৃষ্টে ভালোই হয়েছে। সে সোজাসাপ্টা না করে দিবে। দরকার হলে নিজেকে পাগল প্রমাণ করে হলেও সে আজ বিয়েটা ভাঙবে। নয়তো সেও আলোর বোন ছায়া নয়!

-“আরে কে বাল! চোখে দেখেন না?”

ছায়া একহাতে নিজের কপাল চেপে ধরে খেঁকিয়ে উঠল। এমনিতেই সকাল থেকে মনমেজাজ ভালো নেই, তারপর একজন এসে তার সুন্দর কপালটা ফাটিয়ে দিল।

হুডি, মাক্স পরিহিত যুবকটি কাঁচের ভারী দরজাটা বন্ধ করে বলল, -“আলোর ছায়া যে! তা আপনি এখানে কি করছেন?”

অনাকাঙ্ক্ষিত জায়গায় অপ্রত্যাশিত কণ্ঠস্বর শুনে ছায়া চমকে উঠল। তড়িৎগতিতে মাথা তুলে সামনে দাঁড়ানো যুবকের দিকে তাকায়৷ ভালো করে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করল,

-“আপনি এখানে কি করছেন?”

মৃন্ময়ের গরম লেগেছে অনেক। তাই সে ভেতরের দিকে ইশারা করে বলল, -“কোথাও একটা বসে কথা বলি?”

অন্য সময় হলে মেয়েটা নাচতে নাচতে চলে যেত। কিন্তু আজ কেন জানি মানুষটার কাছাকাছি যেতে ইচ্ছে করল না। কারণ এই লোকটা এখন অন্য কারোর ব্যক্তিগত পুরুষ। আর সে এমন মেয়ে নয় যে, অন্যের ভালোবাসা জেনেও নজর দিবে। তাই সে নিজের আবেগ কে সামলিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আপনি গিয়ে বসুন। আমি একজনের জন্য ওয়েট করছি।”

মৃন্ময় কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, -“কার জন্য?”

ছায়া আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে ওঠে, -“আমার হবু স্বামীর জন্য।”

-“ওয়াও! আপনি অপেক্ষা করছেন আপনার হবু বরের জন্য, আর আমি গরমে ম’রছি আমার হবু বউয়ের জন্য। বাই দ্য ওয়ে…কংগ্রাচুলেশনস।”

ছায়া মলিন হেঁসে বলল, -“আপনাকেও নতুন জীবনের অনেক শুভেচ্ছা।”

মৃন্ময় আর দাঁড়ায় না। দরজা ঠেলে ভেতরে চলে যায়। গরমে তার জান টা যাচ্ছে। ওইদিকে ওই মেয়েটারও আসার খবর নেই। এমন লেট লতিফাকে সে কিছুতেই বিয়ে করবে না। আজ আসুক শুধু! তারপর সময়ের মূল বুঝিয়ে দিবে। অন্যদিকে, ছায়া পায়চারি করছে আর অচেনা লোকটাকে ইচ্ছে মতো গালিগালাজ করছে। তার ভুল হয়ে গেছে নিজের ফোনটা ফেলে এসে। লোকটার একটা ছবিও দেখেনি। আলেয়া রহমান বারবার দেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে রাগে-দুঃখে মুখটাও দেখেনি। যাকে সে চায় না, তাকে দেখে কি করবে? এইদিকে গরমে ঘেমে যাচ্ছে। সে আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না৷ বাধ্য হয়ে ক্যাফের ভেতরে প্রবেশ করে মৃন্ময়ের সামনের টেবিলে বসল।

-“কই ওই কচ্ছপের ছাও? ওই কচ্ছপের জন্য আধঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি, তবুও দেখা নেই। দেখ…আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিস না। আমি কিন্তু চলে যাবো।”

মৃন্ময় দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে মিরা কি বলল বোঝা গেল না। তবে মৃন্ময় ভ্রু চুলকিয়ে বিরবির করল,

-“তাড়াতাড়ি ছবি পাঠা, নয়তো ওই মেয়ের মুখের নকশা পাল্টে দিবো। একটা কচ্ছপ কোথাকার!”

বলেই খট করে লাইন কেটে দিল। ছায়া কফি খেতে খেতে সবটাই শুনল। হঠাৎই সে জিজ্ঞেস করল,

-“আপনি তো আপনার প্রেমিকাকে চেনেন, তাহলে ছবি চাচ্ছেন কেন?”

মৃন্ময় মুখের মাক্স ঠিক করে বলল, -“আমার কোনো প্রেমিকা নেই। আই অ্যাম সিঙ্গেল। তবে একসপ্তাহ পর বিবাহিত হয়ে যাবো।”

-“মিথ্যে কেন বলছেন? ওইদিন আমি, মায়া সব দেখেছি এবং শুনেছিও।”

মৃন্ময় কিছু বলতে যাবে তখনই ওইদিনের কিছু দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল। এত ঝামেলার মধ্যে সে ওটা ভুলেই গেছিল। তাই সে কপাল কুঁচকে জানতে চাইল,

-“তুমি ওইদিন কেঁদেছিল কেন?”

ছায়া একপলক তাকিয়ে বলল, -“চোখে বিষাক্ত পোকা পড়েছিল তাই।”

প্রতিত্তোরে মৃন্ময় কিছু বলার আগেই ফোনে নোটিফিকেশন এল। সে লক খুলে সোজা হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো। মিরা ছবি পাঠিয়েছে। তাও বিশটার মতো। অথচ সে একটা চেয়েছিল। এতগুলো ছবি কেন দিয়েছে বুঝতে পারল না। তবে রাগে দাঁত কিড়মিড় করল। শুধু শুধু তার গ্যালারি ভরে গেল ওই কচ্ছপের ছবি দিয়ে। মৃন্ময় একরাশ বিরক্তিতে মিরার আইডিতে ঢুকে ছবিগুলো দেখতেই থমকে গেল। সে অবিশ্বাস চোখে প্রতিটা ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তারপর থমথমে মুখে সামনে বসা শাড়ি পরিহিত রমণীর দিকে তাকাল।

-“মেয়ে পছন্দ হয়নি? উপ্স সরি…মেয়ে নয়, আপনার হবু কচ্ছপকে পছন্দ হয়নি?”

ছায়ার কথা শুনে মৃন্ময় কোনো জবাব দিল না। সে মাক্সের আড়ালে ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছে৷ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

-“তুমি তোমার হবু বরকে দেখেছো?”

-“ওই পাগলকে দেখলে এখানে একা বসে থাকতাম?”

মৃন্ময় আনমনে বিরবির করল, -“পাগল আমি?”

-“আরে আপনাকে বলি নাই তো। আমি ওই সেকেন্ড কচ্ছপকে বললাম। যাইহোক, আমাকে একটা সাহায্য করবেন?”

-“কি সাহায্য?”

-“ওই লোকটা যখন আসবে, তখন আমি আপনাকে আমার বয়ফ্রেন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিবো৷ আপনি শুধু একটু নাটক করবেন। আসলে আমি এই বিয়েটা ভাঙতে চাই।”

-“কেন? বিয়ে করলে কি সমস্যা?”

-“এখন বিয়ে করতে চাই না।”

-“বাট….আমি চাই।”

মৃন্ময়ের কথা শুনে ছায়া কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বলল, -“তো করুন না, কে আপনাকে বাঁধা দিয়েছে।”

-“তুমি!”

ছায়ার কপাল কুঁচকে গেল। সে আবার কি করল? মৃন্ময় তপ্ত শ্বাস ফেলে উঠে এসে সোজা ছায়ার পাশের চেয়ারে বসল। হঠাৎ করে মানুষটাকে নিজের এত কাছে দেখে ছায়া ভরকে গেল। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মৃন্ময় নিজের ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

-“আমার ফিউচার ওয়াইফ!”

ছায়ার ভেতরে কষ্ট হলেও সে বাইরে নিজেকে শক্ত রাখল। যেন কিছু হয়নি তার। অথচ ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে জোরে শ্বাস নিয়ে ফোনের দিকে তাকায়৷ এবং সঙ্গে সঙ্গে চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। সে ভুল দেখছে ভেবে কয়েকবার চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে ফোনটা কেঁড়ে নিল। তারপর এক এক করে নিজের ছবি দেখতে লাগল। তারমানে সে আজ যার সাথে দেখা করতে এসেছিল, সেই ব্যক্তি সয়ং মৃন্ময় আহমেদ? অবিশ্বাস্য!

-“আমি কখনো ভাবতে পারিনি, ওই কচ্ছপটা তুমি হবে।”

-“আমিও!”

ছায়া আনমনে বলে৷ মৃন্ময় কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

-“আমাকে বিয়ে করতে তোমার কোনো অসুবিধা আছে?”

-“আপনার তো গার্লফ্রেন্ড আছে।”

-“ওটা আমার অতীত ছিল।”

অতঃপর মৃন্ময় সবকিছু খুলে বলে দেয় ছায়াকে। কারণ সে চায় না, কোনো সম্পর্ক মিথ্যে দিয়ে শুরু হোক। সবটা শুনে ছায়া বলল,

-“বুঝলাম। কিন্তু…আপনি তো মন থেকে বিয়ে করছেন না। নিশ্চয়ই জেদের বশে করতে চাচ্ছেন, রাইট?”

-“নিজের এলোমেলো জীবনটা আবারো নতুন করে শুরু করতে চাচ্ছি শুধু৷ এতগুলো বছর তো একাই পার করলাম, এখন না-হয় বাকী জীবনটা তোমার সাথে পার করব।”

-“আমিই কেন?”

-“আমার পরিবার চেয়েছে তোমাকে। আর….!”

-“আর?”

মৃন্ময় মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,

-“আমি নাহয় নিজের প্রথম ভালোবাসা পাইনি। তবে আমি চাই, তুমি তোমার প্রথম ভালোবাসা পাও!”

মানুষটার কথা শুনে ছায়া চমকে উঠল। মৃন্ময় আনমনে হেঁসে ধীর কণ্ঠে বলল, -“আই নো ছায়া! তুমি আমাকে ভালোবাসো।”

ছায়া চোখের পানি আড়াল করার জন্য মুখ ঘুরিয়ে নিল। কি থেকে কি হয়ে গেল, ঠিক বুঝতে পারছে না।

-“বিয়ে করবে আমায়, ছায়া? আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে কখনো নিরাশ করব না। পৃথিবীর পারফেক্ট স্বামী হতে না পারলেও তোমার মনের মতো হওয়ার চেষ্টা করব। তুমি হয়তো আমার প্রথম ভালোবাসা নও, কিন্তু….তুমিই হবে আমার শেষ ভালোবাসা। এবং আমার একমাত্র অর্ধাঙ্গিনী! তোমার গায়ক সাহেবের একটু সময় প্রয়োজন হলেও সে সারাজীবন শুধু তোমারই থেকে যাবে। আমাকে কি দ্বিতীয় বার ভালোবাসার সুযোগ দিবে? এবার অন্য মেয়েকে নয়, বরং নিজের বউকে ভালোবাসতে চাই। তুমি কি আমার নতুন জীবনের সাথী হবে? সারাজীবনের জন্য মৃন্ময়ের ছায়া হয়ে পাশে থাকবে?”

অজানা কারণে ছায়ার হাতপা কাঁপছে। সে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা করছে। মৃন্ময় চাতক পাখির ন্যায় মেয়েটার জবাবের আশায় বসে আছে। ছায়া আড়ালে চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

-“বাড়িতে যাবো, ড্রপ করে দিন।”

মৃন্ময় কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বাইরে এসে গাড়ির ডোর খুলে দিল। ছায়া চুপচাপ ভেতরে বসল। মৃন্ময় ড্রাইভিং সিটে বসে, পাশে ঝুঁকে এসে মেয়েটার সিট বেল্ট বেঁধে দিল। তারপর গাড়ি স্টার্ট করে রওনা দিল!

কাঙ্ক্ষিত জায়গায় এসে পৌঁছাতেই ছায়া নেমে পড়ল। এত সময়ের মধ্যে তারা কেউই কারোর সাথে কথা বলেনি। মৃন্ময় মেয়েটাকে চলে যেতে দেখে বলে উঠল,

-“আমি এখনো উত্তর পেলাম না।”

ছায়া পিছনে ফিরে ধীর কণ্ঠে বলল, -“আপনার জীবনে খুব শীঘ্রই কচ্ছপ আসতে চলেছে। তার জন্য নিজেকে রেডি রাখুন।”

মৃন্ময় ঠোঁট কামড়ে হেঁসে সিটে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে আওড়ায়,

-“পাগলকে সারাজীবন সামলে রাখার জন্য, তুমিও নিজেকে প্রস্তুত রেখো।”

ছায়া মনে মনে হাসলেও বাহিরে ভাব নিয়ে বলল, -“বেশি বাড়াবাড়ি করলে, পাবনায় রেখো আসব হুহ্।”

-“পাবনাতে নয়, আপনার হৃদয়ের মাঝে থাকতে চাই।”

-“আমার হৃদয়ে আপনি বহু বছর আগে থেকেই রয়েছেন, গায়ক সাহেব। এখন শুধু আপনার মনে একটু ঠাঁই পেলেই হবে।”

-“আজ, এই মূহুর্ত থেকে আমার পুরো জীবনে তোমাকে ঠাঁই দিলাম। মৃন্ময়ের অস্তিত্ব জুড়ে শুধু তুমিই থাকবে।”

ছায়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। অবশেষে সে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের করে পেতে চলেছে। এর থেকে সুখের কিইবা আছে? এক জীবনে প্রিয় মানুষটাকে পেলেই তার যথেষ্ট। আর ভালোবাসা না পাওয়ার আফসোস রইল না। বরং তার এতদিনের একতরফা ভালোবাসা পূর্ণতা পাওয়ার পথে….

#চলবে

#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৫৩ (শেষ পর্ব)

অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটা চলেই এল। আজ মৃন্ময় এবং ছায়ার বিবাহ। সেলিব্রিটি গায়ক হওয়ায় পুরো ধুমধামে, জাঁকজমকভাবে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। মৃন্ময় নিজে সবাই দাওয়াত দিয়েছে। সে নিজের বিয়ের জন্য কোনোরকম ক্রুটি রাখেনি। তাদের বিয়েটা পারিবারিক ভাবেই ঠিক হয়েছে। আলো যখন খবরটা পায় তখন শুধু বোনকে জিজ্ঞেস করেছিল, সে কি চায়! ছায়া নির্দ্বিধায় জবাব দিয়েছিল, সে তার গায়ক সাহেব কে চায়। এরপর আর কোনোরকম বাক্যব্যয় না করে আলোও মন থেকে বিয়েটা মেনে নিয়েছে। যেখানে তার বোন খুশি, সেখানে সে নিজেও খুশি।

মৃন্ময় সয়ং তিশার বাড়িতে গিয়ে বিয়ের প্রথম কার্ড দিয়ে দাওয়াত করেছে। তিশা ভদ্রতার খাতিরে তখন যেতে রাজি হলেও পরবর্তীতে যায়নি। টিভির পর্দায় শুধু দুজনের এনগেজমেন্টের ভিডিও দেখেছিল। এমনকি পুরো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। প্রিয় গায়কের বিয়ের কথা শুনে হাজারো রমণীর হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়েছে। আবার কেউ কেউ খুশি হয়েছে। শুরুতে তিশা ঠিক করেছিল, সে যাবে না বিয়েতে। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু একটা ভেবে মেয়েকে ন্যানির কাছে রেখে, ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে৷ ওখানেই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে।

নবরাত্রি হল জুড়ে তখন রাজকীয় আয়োজন। প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ভেতরের মণ্ডপ পর্যন্ত পুরো ভেন্যু সাজানো হয়েছে সাদা আর অফ-হোয়াইট থিমের হাজার হাজার বিদেশি টিউলিপ, অর্কিড আর সুগন্ধি রজনীগন্ধা দিয়ে। ওপরের বিশাল সিলিং থেকে ঝুলে আছে ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি, যার আলোয় চারপাশটা মায়াবী রূপ নিয়েছে।
​হলের একপাশে মিডিয়া আর পাপারাজ্জিদের জন্য আলাদা জোন করা হয়েছে, যেখানে ক্যামেরার ফ্ল্যাশের ঝলকানি আর সাংবাদিকদের ব্যস্ততা। দেশের টপ সব সেলিব্রিটি, মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির চেনা মুখ আর এলিট ক্লাসের অতিথিদের উপস্থিতিতে চারদিকে তখন উপচে পড়া ভিড়।

আলো নিজ হাতে বোনকে বিরিয়ানি, মাংস খাওয়াচ্ছে। মেয়েটা নার্ভাসে সকাল থেকে তেমন কিছুই মুখে তোলেনি। তাই এখন সুযোগ পেয়ে একটু খাইয়ে দিচ্ছে। আর একটু পরই বিয়ে শুরু হবে। ছায়া নতুন বউয়ের রূপে তৈরি হয়ে আছে। পরনে অফ হোয়াইট গার্জিয়াস লেহেঙ্গা। নামীদামী পার্লার থেকে লোকজন এসে একদম পুতুলের মতো সাজিয়ে দিয়েছে। মেয়েটা আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই টাস্কি খেয়েছে। নিজের এমন নতুন লুক দেখে বিস্মিত হয়েছে। সে কখনো কল্পনাও করেনি, বিয়ের সাজে তাকে এতটা সুন্দর লাগবে।

ছোট বোনকে প্রথম দেখায় আলো মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল। তারপর সে বোনের সাথে অনেকগুলো ছবি তোলে। তাদের দলে মায়াও ছিল। মিরা দেশের বাইরে থাকার ফলে আসতে পারেনি। তবে মেয়েটা ভীষণ খুশি। সে দূর থেকেই ভাই, ভাবীকে দোয়া দিয়েছে। এবং ওপরওয়ালার কাছে হাজারো শুকরিয়া আদায় করেছে। অবশেষে ওর ভাইটার সুবুদ্ধি হয়েছে। হয়তো একটু দেরিতে, তবে শেষমেশ সঠিক পথে এসেছে।

-“আর খাবো না আপু।”

ছায়া পানি খেয়ে ধীর কণ্ঠে বলে। আলো কপাল কুঁচকে বলল, -“গত চারদিন ধরে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করছিস না। নিজের শরীরের কি হাল করেছিস, একবার দেখছিস?”

ছায়া মিনমিনিয়ে বলল, -“ভয় হচ্ছে তো।”

-“কিসের ভয়? বিয়েই তো করছিস, পালিয়ে যাচ্ছিস না কোথাও। আমি কি নিজের বিয়ের সময় ভয় পেয়েছিলাম?”

-“ভয় পাওয়া তো দূরে থাক, তুমি বিদায়ের সময় সামান্য কান্না পর্যন্ত করোনি।”

বোনের কথা শুনে আলো হেঁসে উঠল, -“তখন শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার ভুত চেপেছিল, তাই।”

কথা বলতে বলতে বোনের মুখের সামনে খাবারের লোকমা ধরল। ছায়া ঠোঁট উল্টে তাকায়। আলো স্বাভাবিক গলায় আওড়াল,

-“নাটক না করে চুপচাপ খেয়ে নে। নয়তো পরে শরীরে এনার্জি পাবি না। তখন তোর গায়ক সাহেব আফসোস করবে।”

-“কেন?”

-“বিয়ের পর কি রাত ভুলে গেলি?”

-“কি রাত?”

-“বাসর রাত।”

অতিরিক্ত নার্ভাসের ঠেলায় ছায়া সব ভুলে গেছিল। কিন্তু এখন বড় বোনের মুখে এমন কথা শুনে লজ্জায় গাল লাল হয়ে গেল,

-“ধুর আপু। কি যে বলো না!”

আলো বোনের লাজুক চেহারা দেখে খিলখিল করে হেঁসে উঠল, -“হয়েছে, হয়েছে। আর লজ্জা পেতে হবে না। চুপচাপ খাবার শেষ কর। ওইদিকে তোর দুলাভাই কি করছে কে জানে।”

ছায়া আর কথা বাড়াল না। আস্তেধীরে সম্পূর্ণ খাবার খেয়ে নিল। আলো এঁটো প্লেট নিয়ে উঠতেই দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল, এক রমণী। অচেনা মেয়েটাকে দেখে আলোর ভ্রু কুঁচকে গেল। এই রুমে আপাতত অন্যের প্রবেশ করা নিষেধ ছিল। কারণ ছায়া অচেনা মানুষদের সামনে ভীষণ অস্বস্তি অনুভব করছিল। তাই মৃন্ময় কে বলে আলাদা রুমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু হুট করে মেয়েটাকে দেখে আলো জিজ্ঞেস করল,

-“কে আপনি? আর এখানে কি করছেন?”

রমণী এগিয়ে এসে একপলক নববধূবেশে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, -“আমি ছায়ার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।”

আলোর কপাল আরো কুঁচকে গেল। অন্যদিকে, মেয়েটাকে চিনতে একটুও অসুবিধা হয়নি ছায়া আর মায়ার। কারণ তারা দুজনই মেয়েটাকে দেখেছিল মৃন্ময়ের ইভেন্টে।

-“যা বলার আমাদের সামনেই বলুন।”

আলোর কণ্ঠস্বর গম্ভীর শোনালো। মেয়েটা এতে বেশ বিরক্ত হলো, -“সামান্য কথা বলতে চেয়েছি, মে’রে ফেলতে নয়।”

-“মুখ সামলে কথা বলুন। নয়তো জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।”

মেয়েটার কথা শেষ হতে না হতেই আলো গর্জে উঠল। রাগে চোখমুখ লাল হয়ে যায়। শুরুতেই মেয়েটাকে পছন্দ হয়নি তার, কেমন করে অদ্ভুত চোখে তার বোনটার দিকে তাকিয়ে আছে। ওই ঈর্ষান্বিত নজর তার কাছে মোটেও ভালো লাগছে না। পরিস্থিতি উল্টো দিকে যাচ্ছে দেখে ছায়া দু’হাতে ভারী লেহেঙ্গা সামলিয়ে উঠে দাঁড়াল,

-“আপু শান্ত হও। আর আমি উনাকে চিনি।”

আলো চট করে বোনের দিকে তাকাল, -“কে এই মেয়ে?”

ছায়া মাথা চুলকিয়ে আমতাআমতা করল। এখন যদি তার আপু জানে এই মেয়েটা মৃন্ময়ের এক্স প্রেমিকা! তাহলে ছোট্টখাট্টো একটা ঝামেলা সৃষ্টি হবে। আর সে সেটা চায় না।

-“তোমাকে একটু পর বলি? উনি কি বলতে এসেছেন সেটা আগে শুনি।”

আলো কিছুক্ষণ বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হনহনিয়ে চলে গেল। ওর পিছু পিছু মায়াও ছুটল। বড় বোন রাগ করেছে ভেবে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ছায়া। তারপর মেয়েটার উদ্দেশ্যে বলল,

-“বলুন, কি বলবেন?”

তিশা সোজা ছায়ার মুখোমুখি দাঁড়াল, -“তুমি জানো, আমি কে?”

-“ওমা, জানব না কেন? আপনি আমার স্বামীর এক্স। যে কিনা টাকাপয়সার জন্য নিজের বয়ফ্রেন্ডকে ধোঁকা দিয়েছিল।”

তিশা দাঁত কিড়মিড় করে উঠল, -“ও এখনো তোমার স্বামী হয়নি। সো…স্বামী বলার অধিকার রাখো না তুমি।”

ছায়া হেঁসে বলল, -“আর কয়েক ঘন্টা পর উনি আমার স্বামীই হবেন। উমম…শুধু আমার ব্যক্তিগত পুরুষ।”

তিশা মনে মনে রাগ-ক্ষোভে ফুসলেও নিজেকে আপাতত শান্ত রাখার চেষ্টা করল,

-“এই বিয়েটা কেন করছো? মৃন্ময় তোমাকে নয়, আমাকে ভালোবাসে। সে আজও শুধু আমাকে চায়।”

-“তাহলে আপনাকে রিজেক্ট করে উনি আমাকে বিয়ে করছেন কেন? এতোই যদি ভালোবাসে, আপনাকে চায়, তাহলে তো বিয়েটা আপনাকেই করা উচিত ছিল। আপনি কি জানেন? উনিই সর্বপ্রথম আমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব রেখেছেন। আমি যাইনি।”

-“তুমি কেন রাজি হলে? দুনিয়ায় কি ছেলের অভাব পড়েছিল? নাকি বড়লোক ছেলে দেখলে আর অমনি গলায় ঝুলে পড়লে?”

-“আপনি আপনার মতো লোভী নই। আর না তো উনার টাকাপয়সা দেখে বিয়ে করতে রাজি হয়েছি।”

-“তাহলে কেন রাজি হলে? কি কারণ?”

ছায়া চোখ বুজে জোরে শ্বাস নিয়ে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,

-“আমি আমার গায়ক সাহেব কে ভালোবাসি, ভীষণ রকমের ভালোবাসি।”

তিশা এমনটা আগেই সন্দেহ করেছিল। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, -“মৃন্ময় কি তোমাকে বলেছে, সে তোমায় ভালোবাসে?”

মূহুর্তেই ছায়া দমে গেল। মুখটাও কেমন ফ্যাকাসে হয়ে যায়। সেটা তিশা লক্ষ্য করে দুই হাতে মেয়েটার বাহু ধরে বোঝানোর চেষ্টা করল,

-“লিসেন ছায়া! মৃন্ময় তোমাকে নয় আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু ও সেটা স্বীকার করছে না। অতীতের একটা ভুলের জন্য আমরা দুজন এখন দুই দিকে। তবুও আমাদের মনটা একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে। মৃন্ময় আমার ওপর রাগ করে শুধু এই বিয়েটা করছে। ও দেখাতে চাচ্ছে, আমাকে ভুলে গেছে। কিন্তু….সত্যি এটা নয়। ও আজও আমাকে ততটাই চায়, যতটা অতীতে চেয়েছিল। আমি নিজের ভুল স্বীকার করছি। আবেগের বশে ভুল করে ফেলেছিলাম। মৃন্ময়ের এক আকাশসম ভালোবাসাকে পা ঠেলে দিয়েছিলাম। আর এর শাস্তি পেয়েও গেছি। যার জন্য আমি আমার ভালোবাসার মানুষটিকে ছেড়ে ছিলাম, ওই মানুষটাই অন্যের জন্য আমাকে ও আমার সন্তানকে ছেড়েছে।

আমার কথা না ভাবো, তবে আমার মেয়েটার কথা একবার ভাবো৷ ও মৃন্ময়কে বাবা হিসেবে পেতে চায়, আর আমিও চাই আমার ভালোবাসার মানুষটিকে স্বামী হিসেবে। আমার, আমার সন্তানের মৃন্ময় ছাড়া কেউ নেই। দোহাই লাগে তোমার, আমার মেয়েটাকে আরেকবার এতিম করে দিও না। আমি একজন মা হয়ে তোমার কাছে নিজের সন্তানের সুখ ভিক্ষা চাচ্ছি। প্লিজ তুমি এই বিয়েটা করো না। আমার মৃন্ময় কে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। ও শুধু আমাকে ভালোবাসে, আর আমাকেই চায়। ওর জীবনে তুমি নামক কোনো অস্তিত্ব নেই।”

ছায়া শুধু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিটা কথা শুনে গেল। তিশা আবারো বলল,

-“আমাকে দেখানোর জন্য তোমাকে বিয়ে করলেও কখনো মৃন্ময় তোমাকে স্ত্রীর অধিকার দিবে না। সবার সামনে তোমার স্বামী হওয়ার অভিনয় করলেও কখনো একান্তে তোমাকে চাইবে না। তুমি শুধু ওর দায়িত্ব হবে, ভালোবাসা নও।”

ছায়ার শরীরটা মৃদু কাঁপলো। কাজল রাঙা আঁখি জোড়া
ভরে উঠল। না চাইতেও মেয়েটার বলা কথাগুলো খুব বাজেভাবে আঘাত করল তার হৃদয়কে। হয়তো মেয়েটা সত্যিই বলছে। মৃন্ময় তাকে কখনোই কাছে টানবে না। ছায়ার বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসে একটা দীর্ঘশ্বাস। সে মুখ তুলে কিছু বলবে, তখনই এক জোড়া রক্তিম চোখের সাথে দৃষ্টি বিনিময় ঘটল। তবে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকল না, চট করে নজর সরিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

-“বিয়ের আয়োজন নিচে, তুমি আমার বউয়ের কক্ষে কি করছো?”

আচানক মৃন্ময়ের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে তিশা পিছনে ফিরে তাকায়। ছেলেটা এখনো রেডি হয়নি, পরনে শুধু এলোমেলো টিশার্ট ও ট্রাউজার। সকাল থেকে এদিকওদিক
ছুটতে ছুটতে শরীরটা ক্লান্ত হয়েছে। যার রেশ লালচে চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। মৃন্ময় দুই হাত পকেটে গুঁজে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,

-“আমার বউকে দেখা হলে, এখন তুমি আসতে পারো।”

-“কেন? আমি কি এখানে থাকতে পারি না?”

-“আমার বউয়ের সাথে কিছু পার্সোনাল কাজ আছে।”

মৃন্ময়ের মুখে বারবার “আমার বউ” শুনে তিশা আহত চোখে প্রিয় পুরুষের দিকে তাকায়,

-“ও এখনো তোমার বউ হয়নি, রাজ।”

-“আর একটু পর হয়ে যাবে।”

তিশাকে পাশ কাটিয়ে মৃন্ময় ছায়ার সামনে দাঁড়ায়। নিজের কাছে অতি পরিচিতি মানব দেহের অস্তিত্ব অনুভব করে ছায়া ধীরে ধীরে মুখ তুলে উপরে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে ওর ললাটের মাঝে শক্ত চুমু এসে পড়ে।

-“মাশাআল্লাহ।”

মৃন্ময় মাথা ঝুঁকিয়ে মুগ্ধ চোখে হবু বউয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বিরবির করল। এই প্রথম ভালোবাসার মানুষের থেকে স্পর্শ পেয়ে ছায়ার শরীর অদ্ভুত ভাবে শিউরে উঠল৷ সে অবাক চোখে মানুষটার সুন্দর মুখশ্রীর দিকে তাকায়।

-“ভেবেছিলাম, বিয়ের আসরে তোমাকে দেখব। কিন্তু ছোট শালীকার মুখে তোমার প্রসংশা শুনে আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। তাই লুকিয়ে চলে এলাম আমার বউকে দেখতে। তোমার স্বামী আবার বড়োই অধৈর্য মানুষ।”

চোখেমুখে গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়তেই ছায়া দুই কদম পিছিয়ে গেল। মৃন্ময় আনমনে হেঁসে চট করে কোমর চেপে ধরে নিজের কাছে টেনে আনল। একহাতে রমণীর কোমর ও অন্য হাতে রমণীর বাম হাত ধরে, অনামিকা আঙুলের মাঝে তাকায়। সেথায় তার পরিয়ে দেওয়া ডায়মন্ডের রিং চিকচিক করছে। মৃন্ময় মাথা নুইয়ে আংটির ওপর ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

-“তুমি তো আমার বাগদত্তা। আর আজ আমার হালাল বউ হয়ে যাবে। সো….এখন তো একটু অবাধ্য হতে পারি!”

মৃন্ময়ের কথা বুঝল না ছায়া। সে তো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। মৃন্ময় সহসাই মেয়েটার দুই গালে, চোখের পাতায়, কপালে, নাকে, থুতনিতে চুমু খায়। তাদের এই ঘনিষ্ঠ দৃশ্য দেখে তিশা জ্বলেপু’ড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। সে পারলে চোখ দিয়েই ছায়াকে ভস্ম করে দেয়।

তিশা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে একটু আগে বলেছিল মৃন্ময় মেয়েটার কাছে আসবে না, কিন্তু এখন তারই সামনে ছেলেটা একান্তই মেয়েটার কাছে এসেছে। যেটা ওর মোটেও সহ্য হচ্ছে না। তাই রাগে, দুঃখে, কষ্টে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

-“আপনার এক্স চলে গিয়েছে, এখন অভিনয় করা বন্ধ করুন।”

তিশাকে চলে যেতে দেখে ছায়া মুখ সরিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল। মৃন্ময় গলার ভাঁজ থেকে মুখ তুলে চোখের দিকে তাকিয়ে আওড়াল,

-“হুঁশ, আমি যা করি তা মন থেকে। নিজের বউকে আদর করব না তো আর কাকে করব, হুহ্?”

ছায়া কিছু বলল না। মৃন্ময় মুখটা ধীরে ধীরে ছায়ার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ঠোঁটের মিলন হতেই মৃন্ময় কিছু একটা টের পেয়ে চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়। এবং দেখে আলো বড়বড় চোখে হা করে তাকিয়ে আছে। আপুকে দেখে লজ্জায় ছায়া দূরে সরে গেল। মৃন্ময় সোজা হয়ে বলল,

-“ভুল টাইমে এসে পড়েছেন শালী সাহেবা।”

আলো থমথমে মুখে জবাব দিল, -“আপনাকে সবাই খুঁজছে।”

-“সবাইকে বলুন ওয়েট করতে, আমি আমার বউকে চুমু খেয়ে আসছি।”

আলো লজ্জায় চলে যেতে যেতে বিরবির করে বলে উঠল,

-“ওর সাজ যেন নষ্ট না হয়, নয়তো আপনাকে নর্দমার পানিতে ডোবাবো।”

মৃন্ময় হেঁসে ছায়ার দিকে তেড়ে গেল। আঁধার মৃন্ময়কে খুঁজতে খুঁজতে উপরে চলে এসেছে। একটা রুম থেকে বউকে বের হতে দেখে জিজ্ঞেস করল,

-“মৃন্ময়কে দেখেছো?”

-“হ্যাঁ, ভাইয়া এই রুমে আছে।”

আঁধার প্রতিত্তোরে রুমের দিকে এগিয়ে গেলে আলো চিল্লিয়ে উঠল, -“আরে, আরে….ভেতরে যাবেন না।”

আঁধার থেমে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে জানতে চাইল, -“কেন?”

আলো মাথা চুলকিয়ে আমতা আমতা করল, -“না মানে, ওখানে ছায়াও রয়েছে। আর ওরা দুজন একটু কথা বলছে এই।”

আঁধার বুঝতে পারল আসল ঘটনা। তাই সে ভেতরে না গিয়ে অর্ধাঙ্গিনীর কাছে এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে, কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

-“আপনার বোনের মতো আপনিও তো একটু স্বামীকে সময় দিতে পারেন।”

আলো দৃষ্টি নুইয়ে নিঃশব্দে হাসল, -“আপনাকে সময় দিতে দিতে বাচ্চার মা হয়ে গেলাম, তবুও মন ভরেনি আপনার?”

-“একটা নয়, আমার আরো ন’টা বাচ্চা চাই।”

-“তাহলে আমি আবারো কোমায় চলে যাবো। তখন আপনি নিজেই বাচ্চা পয়দা করেন। এখন ছাড়ুন!”

আঁধার মেয়েটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে, শক্ত বাহুডোরে আবদ্ধ করল, -“আজকেও নিশ্চয়ই ঠোঁটে সস্তার লিপস্টিক দিয়েছো?”

আলো কপাল কুঁচকে জবাব দিল, -“মোটেও নয়। আমি যথেষ্ট ভালো ব্র্যান্ডের লিপস্টিক দিয়েছি।”

-“ওয়েল, আই অ্যাম টেস্টিং ইট!”

বলেই অর্ধাঙ্গিনীর লিপস্টিক দেওয়া ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল আঁধার। আর বেচারি শুধু হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে রইল।

সময় গড়িয়েছে, বিয়েও শুরুর পথে। ঠিক রাত নয়টায় হলের ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে উঠল লাইভ ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক, ভায়োলিন আর সেতারের এক যুগলবন্দী সুর। আসরের ঠিক মাঝখানে তৈরি করা হয়েছে এক রাজকীয় স্টেজ, যা দেখতে অনেকটা থিয়েটারের গ্র্যান্ড সেটের মতো। চারদিকের হইচই এক নিমেষে থেমে গেল যখন ঘোষণা করা হলো বরের আগমন। ​চারপাশে সিকিউরিটির কড়া কর্ডন ভেদ করে হলের মেইন গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখল দেশের হার্টথ্রব গায়ক এমএ। পরনে নিখুঁত কাজের শুভ্র শেরওয়ানি। স্টেজে ওঠার পর সবার নজর চলে গেল প্রবেশদ্বারের দিকে, যেখান থেকে লাল গালিচার ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে কনে। লেহেঙ্গার দীর্ঘ ট্রেইলটা মেঝে ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর তার ধীর পায়ের ছন্দে পুরো হল জুড়ে তখন এক পিনপতন নীরবতা বইছে।

​আসরে মৃন্ময়, ছায়া বসার পর শুরু হলো মূল বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। ক্যামেরার ক্লিক আর হাজারো ফিসফাসের মাঝে যখন কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শেষ করলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো হল জুড়ে এক আনন্দধ্বনি বয়ে গেল। বরের বন্ধু, কাজিনরা আর ব্যান্ডের সদস্যরা একসাথে চিৎকার করে অভিনন্দন জানাল। তখনই উপর থেকে ঝরে পড়তে লাগল সোনালী কনফেটি আর গোলাপের পাপড়ি, আর ভেন্যুর বাইরের খোলা আকাশে শুরু হলো বর্ণিল আতশবাজির রোশনাই!

মাঝরাতে বউকে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরেছে মৃন্ময়। গাড়ি থেকে নেমে সকলের সামনে অর্ধাঙ্গিনীকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। এবং সোজা দোতলায় উঠে যায়।

ছায়া ভারী লেহেঙ্গা চেঞ্জ করে, মুখের মেকআপ তুলে, লম্বা শাওয়ার নিয়ে একটা পাতলা সুতির শাড়ি পরেছে। মৃন্ময় পাশের ঘর থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে বউকে দেখতে না পেয়ে বারান্দায় গেল।

-“কি ভাবছো?”

ছায়া একমনে দাঁড়িয়ে থেকে খোলা, জোৎস্না ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেসময় মৃন্ময় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে। ছায়া স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল,

-“ভাবছি, এই বিয়েটা বাস্তব নাকি আমার কল্পনা।”

-“হঠাৎ এমন মনে হওয়ার কারণ?”

-“কখনো ভাবিনি আমি আপনাকে পাবো। কিন্তু…সবসময় চেয়ে এসেছি আপনাকে। আর আজ আমি আপনাকে পেয়ে গেছি।”

মৃন্ময় আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, -“আমি আর অতীতে ফিরে যেতে চাই না ছায়া। নিজের এই নতুন জীবনটার মাঝে রয়ে যেতে চাই। শেষ নিঃশ্বাস অবধি শুধু তোমারই হয়ে থাকতে চাই। তুমি কি আমার হয়ে থাকবে?”

-“থাকার জন্যই তিন কবুল বলে বিয়ে করেছি।”

মৃন্ময় চোখ বুজে ঠোঁট কামড়ে হাসল। অতঃপর প্রিয়তমাকে আলিঙ্গন করে, কাঁধে মুখ গুঁজে দিল বলে উঠল,

-“আপনাকে আপনার গায়ক সাহেবের জীবনে স্বাগতম। আজ থেকে শুরু হলো মৃন্ময়, ছায়ার নতুন জীবন, নতুন সংসারের পথচলা। আই হোপ, আমাদের শেষটাও সুন্দর হবে!”

বহু মাস পর একটা বিদেশি আননোন নাম্বার থেকে কল আসে ঈশিতার। রাতের শেষ প্রহরে এসে ঘুম ভেঙে গেল। একরাশ বিরক্তিতে ফোনটার দিকে একপলক তাকিয়ে রিসিভ করল না। পর মূহুর্তে আবারো একই নাম্বার থেকে কল আসে। উপায় না পেয়ে কল ধরে, কানে গুঁজে ঘুমু ঘুমু কণ্ঠে আওড়াল,

-“আসসালামু আলাইকুম, কে বলছেন?”

অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিশ্চুপ। শুধু ভারী নিঃশ্বাসের মৃদু আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আস্তেধীরে উঠে বসল,

-“রাত….?”

অপর প্রান্তের যুবকের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল,

-“বুঝলে কীভাবে, এটা আমি?”

এতদিন পর প্রিয় মানুষটির কণ্ঠস্বর শুনে ঈশিতা একটু নড়েচড়ে উঠল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,

-“তুমি আমাকে ভুলে গেলেও আমি তোমায় ভুলিনি।”

-“যদি ভুলতাম, তাহলে এত রাতে কল দিতাম?”

-“তা কি মনে করে এতদিন পর কল দিলে?”

-“শুধু তোমার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য।”

-“কেন? ওখানে কি মেয়ের অভাব পড়েছে?”

-“মেয়ের অভাব না থাকলেও তোমার মতো চাশমিসের অভাব রয়েছে।”

ঈশিতা আর কিছু বলল না। দুজনেই নিশ্চুপ থেকে একে অপরকে অনুভব করল। একসময় সকল পিনপতন নীরবতা ভাঙল রাত,

-“তোমার সুন্দর ঘুম নষ্ট করার জন্য সরি। তুমি ঘুমাও, আমি রাখছি।”

একথা বলেও রাত কল কাটল না। ভেবেছিল ঈশিতা নিজ থেকে লাইন কা’টবে, কিন্তু মেয়েটাও কিছু করল না। শুধু বলল,

-“দেশে কবে ফিরবে, রাত?”

-“দুই বছর পর।”

-“ঠিক আছে, আমি অপেক্ষায় থাকব।”

-“কেন? আমার জন্য কেন অপেক্ষা করবে তুমি?”

-“তুমি আমার অতি মূল্যবান কিছু চুরি করে নিয়ে গেছো। আর সেটা ফিরে এসে আমাকে দিবে।”

মেয়েটার কথা শুনে রাতের কপালে চারটে ভাজ পড়ল। সে আবার কি চুরি করেছে, আশ্চর্য!

-“আমি আবার কি চুরি করলাম তোমার?”

-“করেছো তো, আমার হৃদয় চুরি করেছো।”

রাত কিছু বলতে চেয়েও থমকালো। সে বিস্মিত কণ্ঠে শুধাল, -“তারমানে তুমি আমাকে…..!”

-“ভালোবাসি।”

ব্যস! একথা শোনা মাত্রই রাত চেয়ার নিয়ে উল্টে পড়ে গেল। সে অফিসে বসে থেকে কাজ করছিল। সেসময় মেয়েটাকে খুব মনে পড়ছিল, তাই তো সব ইগো একদিকে রেখে কল দিয়েছিল। কিন্তু…এমন কথা যে শুনতে পাবে সেটা কখনোই কল্পনা করেনি। সে মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই চোখদুটো বড়বড় করে জানতে চাইল,

-“ওহ, রিয়েলি?”

ধপাস করে পড়ে যাওয়ার শব্দ ঈশিতা শুনতে পেয়েছে। সে মিটমিট করে হেঁসে বলল, -“ইয়েস, ইট’স ট্রু!”

রাত চোখ বুজে জোরে শ্বাস নিয়ে মেঝেতে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর ধীর কণ্ঠে আওড়ায়, -“তুমি তো আমার অতীত জানো। তাহলে আমিই কেন?”

ঈশিতা বিছানায় শুয়ে জবাব দিল, -“জানি না, আমি জানি না কবে কখন, কোন সময় আমার মনটা তোমাকে চেয়ে বসল।”

একটু থেমে পুনরায় আওড়াল, -“তোমার অতীত নিয়ে কোনো সমস্যা নেই রাত। আমি শুধু তোমার বর্তমান দেখব, এবং আমাদের ভবিষ্যৎ।”

-“অপেক্ষা করবে আমার জন্য, ঈশিতা? আমি কথা দিচ্ছি, খুব ভালো স্বামী হয়ে দেখাব।”

ঈশিতা কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,

-“তোমার জন্য শুধু দুই বছর কেন? আমি সারাজীবন অপেক্ষা করতে পারি, রাত। শুধু তুমি একবার ফিরে এসো। তারপর তোমাকে বোঝাবো, আমাকে অহেতুক কষ্ট দেওয়ার ফল।”

রাত হেঁসে ছাঁদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে,

-“প্রেয়সীর সকল শাস্তি মনজুর।”

——————————————-
আলোর সাত মাস চলছে। সে আপাতত বাপের বাড়িতে রয়েছে। পড়ন্ত বিকেল বেলায় টুনা-টুনিকে নিয়ে বাগানে বসে আছে। শূন্য দৃষ্টি তার অদূরে থাকা দুটো প্রিয় মানুষের কবরের দিকে। এত এত সুখের মাঝেও কোথাও না কোথাও দুঃখ রয়েই গেল। জীবন হয়তো এমনই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আফসোসটা থেকেই যায়। আর এটাই নিয়তি।

আধার আজ ভার্সিটি থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে শ্বশুর বাড়িতে। হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ ও দোলনচাঁপা। পরনে নীল স্যুটবুট! আজকাল মেয়েটার রঙে নিজেকে রাঙাতে পছন্দ করে। সেই সাথে অর্ধাঙ্গিনীর ছোটো ছোটো সকল আবদার পূরণ করার চেষ্টা করে। তার যদি ক্ষমতা থাকত, তাহলে হয়তো আকাশের চাঁদ টাও এনে দিত। আধার এগিয়ে এসে অর্ধাঙ্গিনীর সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসল,

-“আমার জানের জন্য তার প্রিয় ফুল!”

আলো একগাল হেঁসে স্বামীর হাত থেকে ফুলগুলো নিয়ে বলল, -“প্রিয় ফুল আর প্রিয় পুরুষ আপনি।”

আধার প্রতিত্তোরে অর্ধাঙ্গিনীর বেড়ে ওঠা পল্লবের মাঝে মুখ ডুবিয়ে, চুমু একে দিল,

-“আমার আরেকটা জানপাখি! তুমি কবে তোমার পাপার বুকে আসবে? তোমার পাপার যে তোমার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।”

আলো কিছু বলতে যাবে তখনই একহাতে পেট খামচে ধরে ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে ফেলল,

-“উফফফ….আপনার পঁচা বাচ্চার লাথি খেতে খেতে আমার জীবনটা গেল।”

বেবি কিক মে’রেছে জেনে আধার অর্ধাঙ্গিনীর পেটে হাত রাখল। তখনই বাচ্চার নড়াচড়া ও লাথি মা’রা অনুভব করল। ওই মূহুর্তে নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান মনে হলো আধারের। এরাই তো ওর জীবনের এক মুঠো সুখ।

-“সোনা আমার! মাম্মাকে হার্ট করে না, জান। তোমার মাম্মা এমনিতেই অনেক কষ্ট পাচ্ছে। পাপা তোমার মাম্মার কষ্ট সইতে পারছে না। তুমি আর মাম্মাকে হার্ট করো না, চুপচাপ ভাদ্র বাবুর মতো থাকো। নয়তো তুমি আসার পর তোমার সব চকলেট তোমার পেটুক মাম্মাকে দিয়ে দিবো।”

প্রথমের কথাগুলো ভালো লাগলেও শেষের কথাটা আলোর পছন্দ হলো না। মানছে সে, চকলেট একটু বেশিই পছন্দ করে। তাই বলে সন্তানের কাছে তাকে পেটুক বলে পরিচয় করে দিবে? এটা কেমন কথা? হুম? হুম?

-“আমি পেটুক হলে, আপনিও ভুড়িওয়ালা গোপাল ভাঁড়!”

-“আর তুমি আমার গিন্নি।”

না চাইতেও আলো ফিক করে হেঁসে দিল। আধার ওই হাসির দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থেকে বলে উঠল,

-“হাজারো অপূর্ণতার মাঝে এই তোমরাই আমার পূর্ণতা এবং আমার ভালোবাসা। আধারের জীবনে সুখ বয়ে নিয়ে আসা এক মুঠো চাঁদের আলো তুমি। সেই আলো করেছে আমার অন্ধকার জীবন আলোকিত। তোমাকে পেয়ে আধার খানের জীবন সার্থক ও পরিপূর্ণ! সর্বশেষে বলব, ভালোবাসি প্রিয়তমা। অসম্ভব রকমের ভালোবাসি!”

~সমাপ্ত~