Home "ধারাবাহিক গল্প এক ফালি রোদ্দুর এক ফালি রোদ্দুর পর্ব-০১

এক ফালি রোদ্দুর পর্ব-০১

0
828

#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্বঃ১

” বাচ্চাটা এবোরশন করিয়ে নাও, সোনা মা আমার!”

কথাটা বলতে গিয়ে গলাটা কেপে উঠলো ইকবাল শিকদারের। শব্দ গুলো যেন বুকের ভেতর থেকে রক্ত ঝরিয়ে বের হলো। সামনে থাকা মেয়েটির দিকে তাকাতে কষ্ট হচ্ছে তার। তবুও তাকিয়ে আছেন তিনি। এই মেয়েটা যে তার বড্ড আদরের। প্রভা বিছানার এক কোণে চুপচাপ বসে আছে। ফ্যাকাসে মুখ, চোখের নিচে কালি। সে এক পলক বাবাকে দেখে নিয়ে বলে,
” কখনোই না, বাবা!”

কথাটা খুব আস্তে বললেও কথাটার দৃঢ়তা ইকবাল শিকদারের বুক কাপিয়ে দেয়। ইকবার শিকদার বোঝানোর সুরে বলে ওঠে,
” একবার ভেবে দেখো, মা! আবেগ দিয়ে জীবন চলে না।”

” আমার সন্তানের অস্তিত্ব তোমার কাছে আবেগ মনে হচ্ছে, বাবা?”

ইকবাল শিকদার তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলেন,
” আমি সেটা বলিনি। আমি শুধু চাই, তোমার জীবনটা নষ্ট না হোক। এই সন্তান রেখে কি করবে তুমি? তোমার জীবন আরও শেষ হয়ে যাবে।”

প্রভা তার বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। সেই চোখে মায়া আছে, ভয় আছে, অসহায়ত্ব আছে। কিন্তু, প্রভা যে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও সরতে পারবে না। প্রভার চোখ ভিজে আসে, কিন্তু জল গড়াতে দেয় না সে। প্রভা কাঠ কন্ঠে বললো,
” তোমার সন্তানে জীবন শেষ হয়ে যাবে জন্য তুমি আমার সন্তানকে মেরে ফেলতে বলছো, বাবা? তোমার সন্তানের মূল্য আছে, আমার সন্তানের কি মূল্য নেই?”

ইমরান শিকদার থমকে গেলেন। গলা শুকিয়ে আসে তার।
” আমি আসলে বোঝাতে চাচ্ছি যে…”

তিনি কথাটা শেষ করার আগেই প্রভা বলে উঠলো,
” আমি কিছুই বুঝবো না, বাবা! বৃথা চেষ্টা করো না। অন্যায় আমার স্বামী করেছে, স্ত্রী হিসাবে ব্যর্থতা আমার। কিন্তু, আমার সন্তান তো কোনো অন্যায় করেনি। তাহলে সে কেন পৃথিবীর আলো দেখতে পারবে না, বাবা? মা হয়ে এতো বড় নিষ্ঠুর কাজ আমি কি করে করবো?”

” তুমি বুঝতে পারছো না, মা! একটা বাচ্চা নিয়ে একা জীবন পার করা খুব কঠিন।”

প্রভা তিক্ত হাসে।
” কঠিন? কঠিন তো তখনও ছিলো, বাবা! যখন আমি রাতের পর রাত রাজের জন্য অপেক্ষা করেছি। কঠিন তখনো ছিলো, যখন ও আমার সামনে বসে অন্য একটা মেয়ের সাথে ম্যাসেজ করতো। কঠিন তখনও ছিলো, যখন আমি জানতে পারলাম, আমি শুধু ওর জীবনে একটা অপশন মাত্র।”

ইকবাল শিকদার চোখ বন্ধ করে ফেলে। রাজের নাম শুনলেই এখন তার শরীর রাগে কেপে উঠে। প্রভা বলতেই থাকে,
” তুমি জানো বাবা, প্রথমে আমি বিশ্বাসই করিনি। ভাবতাম হয়তো ভুল বুঝছি। কিন্তু, যেদিন নিজের চোখে দেখলাম…।”

প্রভা থেমে যায়। গলা আটকে আসছে তার। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আবার বললো,
” সেদিন মনে হয়েছিলো, আমি মরে গেছি।”

ইকবাল শিকদার অসহায়ের মতো মেয়ের চোখের দিকে তাকালেন।
” মা!”

” না, বাবা! আজ আমাকে বলতে দাও। জানো বাবা, আমি অনেক চুপ করে থেকেছি। অনেক সহ্য করেছি। শুধু সংসারটা বাঁচানোর জন্য। কারন, আমি ওকে ভালোবাসতাম। আমার স্বামীকে ভালোবাসতাম। কিন্তু ও? ও তো কোনোদিন আমাকে ভালোই বাসেনি।”

ইকবাল শিকদারের মাথাটা ঝিমঝিম করছে। তিনি নিচু গলায় বললেন,
” তবুও জীবন থেমে থাকে না, মা! বয়স কতোই বা তোমার? সামনে তোমার পুরো জীবন পড়ে আছে। চাইলেই আবার সব নতুন করে শুরু করতে পারবে তুমি।”

প্রভা শান্ত চোখে তাকালো বাবার দিকে।
” তুমি আসলে কি ভেবেছো, বাবা? যে, আমার সন্তানকে এবোরশন করিয়ে ডিভোর্সের ঝামেলা শেষ করে আমাকে আবার বিয়ে দেবে?”

ইকবাল শিকদার চোখ নামিয়ে ফেললেন। প্রভা আবার বললো,
” তোমার এই ভাবনা কখনোই পূর্ণ হবে না, বাবা! আমি আমার সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকবো।”

” বাস্তবতা এতো সহজ নয় রে মা!”

” বাস্তবতা আসলে কতোটা কঠিন, গত কয়েক মাসে আমি বুঝে গেছি, বাবা! আর হ্যা, আমি এই বাসাতেও থাকবো না। আমি এখান থেকেও চলে যাবো, শুধু একটু সময়ের প্রয়োজন আমার।”

ইকবাল শিকদার চমকে উঠে।
” কোথায় যাবে তুমি?”

” জানি না এখনো। তবে এখানে থাকবো না।”

” এই অবস্থায় তুমি একা কোথায় যাবে, মা? মানুষ কতো খারাপ, তুমি জানো? তুমি পারবে না।”
ইকবাল শিকদারের গলা ভেঙে আসে। প্রভা বাবার সামনে এসে বসে। বাবার হাত দুটো নিজের হাতের মাঝে নিলো।
” আমি পারবো, বাবা!”

” কিভাবে এতো বিশ্বাস নিয়ে বলছো?”

প্রভা চোখ বন্ধ করে ছোট্ট করে হাসলো।
” কারন, আমি একা না বাবা! আমার কাছে মাতৃত্বের জোর আছে, শক্তি আছে।”

কথাটা শুনে ইকবাল শিকদারের চোখ ভিজে উঠে। প্রভা বললো,
” আমার সন্তান তার নানা নানী, মামা মামী, এদের আশ্রয়ে বড় হবে না, বাবা! সে মায়ের আদরে, মায়ের আশ্রয়ে বড় হবে।”

” আমরা কি তোমার শত্রু, মা?”
কষ্টভরা গলায় বললেন ইকবাল শিকদার। প্রভা সাথে সাথে নেতিবাচক মাথা নাড়ায়।
” না, বাবা! তোমরাই তো আমার সবচেয়ে আপন। কিন্তু, আমি কারও বোঝা হয়ে বাঁচতে চাই না।”

” তুমি কোনদিনই বোঝা ছিলে না।”

” আজ নাহলেও একদিন হয়ে যাবো।”

” চুপ করো। আর একবারও এই কথা বলবে না।”
ইকবাল শিকদার গর্জে উঠে। প্রভা চুপ করে যায়। ইকবাল শিকদার কাঁপা হাতে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
” তুমি জন্মানোর পর প্রথম যখন তোমাকে কোলে নিয়েছিলাম, মনে হয়েছিলো আল্লাহ আমাকে পুরো পৃথিবী দিয়ে দিয়েছে। আর আজ, আজ আমি আমার মেয়েকে এতো বড় ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারছি না।”

প্রভা আর নিজেকে সামলাতে পারে না। বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠে। ইকবাল শিকদারও নীরবে চোখের পানি ফেলে মেয়েকে জড়িয়ে রাখে নিজের সাথে। ঘরের ভেতর বাবা মেয়ের কান্নার শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ পর প্রভা ধীরে ধীরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। চোখ মুছে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,
” আমি একটু একা থাকতে চাই, বাবা!”

দরজার কাছে গিয়ে থেমে যায় প্রভা। পেছন দিকে না ফিরেই বললো,
” আর একটা কথা, আমার সন্তান পৃথিবীতে আসবে। এটাই আমার শেষ কথা। আজকের করা এই প্রস্তাব, তুমি দ্বিতীয় বার আর ভাববে না বাবা!”

কথাগুলো বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো প্রভা। ইকবাল শিকদারের মনে হচ্ছে বুকের ভেতর কেউ পাথর চেপে ধরেছে। দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেললেন তিনি। এক অসহ্য চাপা যন্ত্রণা তাকে গ্রাস করে ফেলছে। জীবনে অনেক কঠিন সময় পার করেছেন তিনি। কিন্তু, মেয়ের এই কষ্ট, এই ভাঙাচোরা জীবন তিনি কিছুতেই সহ্য করতে পারছেন না।

এক সময় যে মেয়েটা হাসলে পুরো বাড়ি আলােকিত হয়ে যেতো, আজ সেই মেয়ের জীবন অন্ধকারে ডুবে গেছে। আর সেই অন্ধকারের জন্য দায়ী, প্রভার স্বামী রাজ রহমান। ছেলেটাকে নিজে পছন্দ করে মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন ইকবাল শিকদার। নিজের ছেলের মতোই ভালোবেসেছিলেন তিনি। বিশ্বাস করেছিলেন। অথচ, সেই বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হতে সময় লাগলো না।

ইকবাল শিকদার মাথা নিচু করে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো ছোট্ট প্রভার মুখ। দুই বেনী করা হাসিখুশি মেয়েটা দৌড়ে এসে তার গলা জড়িয়ে ধরছে। ইকবাল শিকদারেট চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। জীবনে অনেক কিছুই হারিয়েছেন তিনি। কিন্তু, মেয়ের হাসি হারানোর কষ্টটা সবচেয়ে ভয়ংকর।

পাক্কা বর্ষাকাল চলছে৷ আকাশ যেন দিনের পর দিন জমিয়ে রাখা সমস্ত কান্না ঝরিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর বুকে। কখনো মুষলধারে বৃষ্টি নেমে চারপাশ ঝাপসা করে দিচ্ছে, আবার কখনো টিপটিপ শব্দে অবিরাম ঝরতে আছে। মাঝে মধ্যে বিদ্যুতের ঝলকানিতে চারিদিক আলোকিত হয়ে উঠছে, আবার সব ডুবে যাচ্ছে ধূসর অন্ধকারে। কখনো তীব্র মেঘের ডাক ভেসে আসে, আবার কখনো ক্ষীন ডাক।

বেলকনির এক কোণে চুপচাপ বসে আছে প্রভা। তার সামনে খোলা আকাশ, আলোর ঝলকানি, বৃষ্টি টুপটাপ শব্দ। ভেজা বাতাস এসে তার খোলা চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই তার মা এসে ফল কেটে দিয়ে গেছে। কিন্তু, সেগুলো ছোয়ার ইচ্ছেও হয়নি প্রভার। ফলের প্লেটটা অনাদরে পড়ে আছে কাচের টেবিলের উপর।

আজকাল কিছুই ভালো লাগে না প্রভার। খেতে ইচ্ছে করে না। শরীরটা সারাক্ষণ গুলায়। মাঝে মাঝে বোমি বোমি পায়, মাথা ঝিমঝিম করে। কিন্তু, এই শারিরীক অসুস্থতার চেয়েও বেশি তাকে কাবু করে রেখেছে ভেতরের যন্ত্রণা। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে প্রভা টেবিলের উপর রাখা ফোনটা হাতে নেয়। কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর কন্টাক্ট লিস্ট থেকে একটা নাম খুজে বের করতেই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠে তার। একসময় নামটার পাশে ছোট্ট লাল হৃদয় দেখলে লজ্জায় হেসে ফেলতো সে। আজ সেই একই হৃদয় তার কাছে উপহাসের মতো লাগছে। প্রভা ঠোঁট কামড়িয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। একটু সময় নিয়ে কল দেয় সে। রিং হতে থাকে। দুইটা রিং পড়তেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হয়। গভীর পুরুষালী কন্ঠ ভেসে আসে,
” হ্যালো!”

প্রভা চুপ করে থাকে। রাজ আবার বলে,
” প্রভা! কথা বলছো না কেন?”

কন্ঠটা শুনে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠে প্রভার। এই কন্ঠের জন্যই তো একসময় পাগল ছিলো সে। অথচ, আজ সেই মানুষটাই তার সবচেয়ে বড় কষ্টের কারন। নিজেকে শক্ত করে প্রভা বলে,
” তোমার সাথে জরুরি কথা ছিলো।”

” হুম! বলো।”

প্রভা ঠোঁট ভিজিয়ে নেয় জিভ দিয়ে। গলা শুকিয়ে আসছে তার। তবুও কন্ঠটা শক্ত রাখার চেষ্টা করলো,
” আমি তোমাকে এই মুহুর্তে ডিভোর্স দিতে পারবো না।”

রাজের কপালে ভাজ পড়ে যায় মুহুর্তেই।
” কেন? তুমিই তো বলেছিলে, মিউচুয়ালি সেপারেশন হয়ে যাবো আমরা। তাহলে?”

” কারন আছে।”

” কী কারন?”

” আমি প্রেগন্যান্ট।”

মুহুর্তেই ওপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তারপর আচমকা রাজ প্রায় চিৎকার করে বলে ওঠে,
” কিহ? কি বললে তুমি?”

প্রভা একদম ঠান্ডা নির্লিপ্ত গলায় বললো,
” ইয়েস! আই অ্যাম ক্যারিং ইওর চাইল্ড।”

” না, না এইটা হতে পারে না।”

প্রভা তিক্ত হাসে।
” কেন হতে পারে না? আমরা তো স্বামী স্ত্রী ছিলাম, রাজ! গত দুই বছরে তুমি কতোবার আমার কাছে এসেছো, আমাকে স্পর্শ করেছো, তাহলে কেন হতে পারে না?”

রাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তারপর নিচু গলায় বলে,
” তুমি, তুমি আগে বলোনি কেন?”

” আজ সকালে নিশ্চিত হয়েছি।”

রাজ বিরক্ত স্বরে বলে উঠলো,
” দারুণ! জাস্ট গ্রেট।”

প্রভার ভ্রু কুচকে যায়।
” তুমি এমন ভাবে বলছো, যেন এটা কোনো দূর্ঘটনা ঘটে গেছে।”

” তুমি মেডিসিন নাওনি কেন? আমি তো কিনে দিতাম সব সময়। এই বাচ্চার নেওয়ার কি দরকার ছিলো প্রভা?”
রাজের গলায় চাপা রাগ। প্রভা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। ভেতরের কষ্ট গুলো পাথরে রুপ নিচ্ছে তার।
” এই কথা বলার আগে একবারও তোমার মনে হলো না যে ও তোমারও সন্তান?”

রাজ বিরক্ত হয়ে বললো,
” প্লিজ ড্রামা করো না।”

কথাটা শুনে প্রভার বুক কেঁপে উঠে। চোখ দুটো ভিজে আসে। তবুও কন্ঠে দূর্বলতা আনলো না সে,
” ড্রামা? একটা মেয়ের মা হওয়ার খবর তোমার কাছে ড্রামা মনে হচ্ছে?”

রাজ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
” দেখো, যা হওয়ার হয়ে গেছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ করা প্রয়োজন আমাদের। আমরা তো আলাদা হয়ে যাচ্ছি। এই বাচ্চাটা পৃথিবীতে না আসায় ভালো হবে।”

” তুমি আমার বাচ্চাকে মেরে ফেলতে বলছো?”

রাজ চুপ হয়ে যায়। প্রভা আবার বললো,
” ভয় পেয়ো না। তোমার নতুন জীবন নিয়ে আমি কোনো ঝামেলা করবো না। তুমি যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছো, করতে পারো। আমি তোমাকে আটকাতে আমার সন্তানকে উকিল বানাবো না।”

রাজ এবার একটু অস্বস্তি নিয়ে বলে,
” প্রভা! তুমি ব্যাপারটা ভুল ভাবে নিচ্ছো।”

প্রভা হেসে ফেললো। সেই হাসিতে তীব্র কষ্ট মিশে আছে।
” ভুল ভাবে? ভুল তো তখন ছিলাম, যখন আমি সব কিছু বুঝেও না বোঝার ভান করে গেছি। আবার তোমার চাহিদাও মিটিয়ে গেছি।”

রাজ চুপ করে যায়। বৃষ্টির গতি বেড়েছে, বেশ শব্দ হচ্ছে আকাশ ভেঙে পড়া তুমুল পানি ফোটার। প্রভা একটু দম নিয়ে বললো,
” শোনো, আমি দেড় মাসের প্রেগন্যান্ট। বাচ্চা না হওয়া পর্যন্ত ইসলাম বা আইনে কোথাও ডিভোর্স কার্যকর হবে না। তাই সময় লাগবে।”

” মানে?”

” মানে, তুমি ধরে নিতে পারো আমরা আলাদা। শুধু কাগজে কলমে ডিভোর্সটা পরে হবে।”

” আর বাচ্চা?”

প্রভা নিজের পেটের উপর হাত রাখলো আলতো করে।
” ও আমার কাছে থাকবে।”

” তুমি সিরিয়াসলি এই বাচ্চা রাখতে চাচ্ছো?”

” হ্যা!”

” তুমি বুঝতে পারছো, তুমি কি করতে যাচ্ছো?”

” খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারছি।”

রাজ রাগী গলায় বলে ওঠে,
” একটা বাচ্চা নিয়ে তুমি একা কিভাবে থাকবে? সমাজ কি বলবে, ভেবেছো?”

প্রভা ধীরে হেসে বললো,
” যে সমাজ আমার স্বামীর প’রকী’য়া দেখে চুপ ছিলো, সেই সমাজের কথা আমি কেন ভাববো?”

রাজ থমকে যায়। প্রভা আবার বলে,
” তার বাবা তার মাকে ছেড়ে অন্য নারীতে আসক্ত হয়েছে, এটা তো তার দোষ না। তার মা আছে তাকে মানুষ করার জন্য।”

কথাটা শুনে রাজের মুখ থমথমে হয়ে যায়। কন্ঠে অপমানের তীব্রতা৷ নিয়ে বললো,
” তুমি কিন্তু আমাকে অপমান করছো।”

প্রভা তাচ্ছিল্য করে হাসে।
” আমার কি সেই সাহস আছে, মিস্টার রাজ রহমান?”

রাজ একটু সময় চুপ থেকে বলে ওঠে,
” শেষবারের মতো বলছি, আরেকবার ভেবে দেখো। দরকার হলে, হসপিটালের সব খরচা আমি দেবো।”

” তোমার ঐটাকার আমার কোনো প্রয়োজন নেই। যদি করানোর হতো, সেই অর্থটুকু আমার আছে। কিন্তু, আমার ভাবা হয়ে গেছে।”

” প্রভা!”

” আমার সন্তান পৃথিবীতে আসবে এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত। ডিভোর্স আপাততো খাতা কলমে করা সম্ভব না। বাবু হয়ে গেলে সবটা কম্পিলিট করে দিবো। এইটুকু বলার জন্যই কল দিয়েছিলাম। রাখছি।”

কথাটা বলে এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করে না প্রভা। কল কেটে দেয়। ফোনটা টেবিলের উপর রেখে কিছু সময় স্থির হয়ে বসে থাকে প্রভা। বুকের ভেতরটা ভারি লাগছে। তবুও আজ নিজেকে দূর্বল লাগছে না তার। বরং, মনে হচ্ছে ভেতরে কোথাও নতুন একটা শক্তি জন্ম নিচ্ছে। মায়ের শক্তি। বারান্দার গিরিলের দিকে তাকায় প্রভা। বৃষ্টির ফোটা গুলো গিরিলে স্পষ্ট হয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

এক সময় সামনে রাখা ফলের প্লেটটা তুলে নেয় প্রভা। তাকে খেতে হবে। তার সন্তানের জন্য খেতে হবে। এই পৃথিবীতে তার সন্তানের যত্ন নেওয়ার মতো খুব একটা মানুষ নেই। কিন্তু, সে থাকবে। সব সময় থাকবে। নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখবে তাকে। কোনো অভাব বুঝতে দেবে না কখনো।

এক টুকরো আপেল মুখে দেয় প্রভা। অদ্ভুত ভাবে এবার আর শরীর গুলিয়ে উঠে না। বুকের ভেতর এক নরম উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। মাতৃত্বের উষ্ণতা!!

#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹