#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️🩹 [পর্ব-০৭]
~ আফিয়া আফরিন
রুপাঞ্জনা সময় নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করল। তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে, এখন আর সে চপলমতি কিশোরী নয় যে অল্প আঘাতেই ভেঙে পড়বে কিংবা অভিমানে নিজেকে শেষ করে দেবে। কক্সবাজারের তীব্র ঝড়টা ওর বিশ বছরের অন্ধ মোহকে এক ঝটকায় উপড়ে ফেলেছে সত্যি, কিন্তু ভেতরের জেদ আর আত্মসম্মানকে আরও এক ডিগ্রি চিলতে করে তুলেছে। সে আর কাঁদবে না, সে এখন হিসাব মেলাবে।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে রূপু আর শওকত চৌধুরী ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা না হয়ে কক্সবাজারের হোটেলেই আরও দুটো দিন থেকে গেল। এই দুটো দিন রূপু নিজেকে পুরোপুরি শান্ত করল। পরিকল্পনা মাফিক রূপু একজন বিশ্বস্ত লোক মারফত ঢাকা থেকে কিছু জিনিসপত্র আনাল। সেগুলো সায়েমের দেওয়া বিগত কয়েক বছরের স্মৃতি এবং কিছু দরকারি আইনি কাগজপত্রের কপি; যা রূপু নিজের দায়িত্বে রেখেছিল। ওর ভাবনার অলিন্দে এগুলো এতকাল ভালোবাসার পবিত্র স্মারক হলেও, আজ তা কেবলই একজন প্রতারকের ছুঁড়ে দেওয়া আবর্জনা। প্যাকেটটা হাতে পেয়ে রূপু ওটার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল তাচ্ছিল্যের হাসি।
.
বিকেলের চড়া রোদ তখনো কমেনি। ইয়াজিদ ব্যাংকের জরুরি একটা ফাইল দেখছিল, তখনই মায়ের নম্বর থেকে কল এলো। ফোনটা কানে নিতেই ওপার থেকে নাজমা বেগমের বুকফাটানো কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো, “ইয়াজিদ! তুই জলদি বাসায় আয় বাবা… হিয়াকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!”
“কী বলছ মা? হিয়া বাসায় নেই মানে?” ইয়াজিদের হাত থেকে কলমটা হাতড়ে পড়ে গেল।
“ফ্ল্যাটের দরজাটা মনে হয় কোনোভাবে খোলাই ছিল। আমি একটু রান্নাঘরে গিয়েছিলাম, এসে দেখি হিয়া কোথাও নেই! পুরো ফ্ল্যাট খুঁজে কোথাও পেলাম না ওকে।”
ইয়াজিদ আর একটা মুহূর্তও দাঁড়াল না। কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে ফাইলটা টেবিলে ফেলেই সে হন্তদন্ত হয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। ঝড়ের গতিতে বাড়ির দিকে ছুটল। বাসায় পৌঁছে ইয়াজিদ দেখল নাজমা বেগম বসে কাঁদছেন। ইয়াজিদ একছুটে নিচে নেমে গিয়ে গেটের দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করল, “আজমল কাকা! হিয়া কি বাইরে গেছে? আপনি দেখেননি ওকে?”
“না স্যার! কোনো বাচ্চা গেট দিয়ে বাইরে বের হয় নাই। আমি তো দুপুর থেইকা এইখানেই বইসা ডিউটি দিতাছি। আপনার মেয়ে বাইরে যায় নাই।”
দারোয়ানের কথা শুনে ইয়াজিদের পাগল পাগল দশা হলো। বাইরে না গেলে মেয়েটা গেল কোথায়? সে আবারও প্রতিটা সিঁড়িতে, ছাদে, প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে গিয়ে হন্যে হয়ে খুঁজল। কোথাও নেই মেয়েটা! খবর পেয়ে ইসরাতও হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। ইসরাত আর ইয়াজিদ মিলে আশেপাশের রাস্তা, দোকানপাট সব চষে বেড়াল কিন্তু হিয়ার হদিস মিলল না।
দেখতে দেখতে রাত নেমে এলো। ঘড়িতে তখন সাড়ে নটা। ঘরের ভেতর নাজমা বেগম কান্নায় প্রায় অচেতন অবস্থা। ইয়াজিদ ড্রয়িংরুমের সোফায় দুই হাতে মাথা চেপে পাথরের মতো বসে আছে। বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। পুলিশে ইনফর্ম করা হয়েছে। কিন্তু এতটুকু একটা মেয়ে নিখোঁজ হওয়া মানে অনেক বড় কিছু! তানিয়া চলে যাওয়ার পর হিয়াকে ঘিরেই ইয়াজিদের বেঁচে থাকা, আজ যদি হিয়া পাখির কিছু হয়ে যায়, সে কীভাবে বাঁচবে? ঠিক তখনই সিঁড়িঘর থেকে ইসরাতের তীব্র চিৎকারের আওয়াজ ভেসে এলো, “ভাইয়া! জলদি এদিকে আয়! হিয়া…”
ইসরাতের গলা পেয়ে ইয়াজিদ ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে দ্রুত সিঁড়িঘরের দিকে ছুটল। এই বহুতল ভবনের একদম নিচের তলার সিঁড়িঘরের এক কোণায়, যেখানে ভবনের পুরোনো রড, ভাঙা ইট আর সিমেন্টের বস্তা স্তূপ করে রাখা আছে; সেখানে আলো ফেলতেই ইয়াজিদের কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠল। পুতুলের মতো ছোট হিয়া একটা নোংরা চটের বস্তার আড়ালে গুটিসুটি মেরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ওর কপালে আর ডান হাতে কোনো ধারালো রড বা ইটের কোণার সাথে লেগে কেটে গেছে। সেখান থেকে রক্ত শুকিয়ে চামড়ার সাথে জমাট বেঁধে আছে। হয়তো খেলতে খেলতে ও এই অন্ধকার কোণায় এসে আটকে গিয়েছিল, তারপর কাঁদতে কাঁদতে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ইসরাত হিয়াকে কোলে তুলে নিতেই মেয়েটার ঘুম ভেঙে গেল। চড়া আলোর দিকে তাকিয়েই ও তীব্র ভয়ে আর যন্ত্রণায় চিৎকার করে কেঁদে উঠল। ছোট্ট দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে আধো-আধো গলায় কাঁদতে কাঁদতে বলল, “পাপা… পাপা…”
ইয়াজিদ ইসরাতের কোল থেকে হিয়াকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল। হিয়ার রক্ত জমাট বাঁধা কপালে চুমু খেয়ে ব্যাকুল গলায় বলল, “হ্যাঁ মা! আছি তো আমি। এই তো তোমার পাপা তোমার কাছেই আছে সোনা। আর ভয় নেই।”
হিয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল, “আমি… আমি তোমাতে খুঁজে পাচ্ছি না পাপা! অন্ধকার… পাপা পাচ্ছিলাম না…”
ইয়াজিদ ওর ভেজা গালে আবার চুমু খেল। আলতো করে ওর কপালে হাত দিয়ে খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুমি কেন একা একা বাইরে বের হয়েছ মা? পাপা বারণ করেছে না?”
“বল খেলতে…”
“কেন সোনা? পাপা তো তোমাকে কত সুন্দর সুন্দর বল কিনে দিয়েছি।”
হিয়া ওর ছোট হাত দিয়ে চোখ মুছে বলল, “বাবুদের সাথে বল খেলব। বাইরে…”
ইয়াজিদ কথা বাড়াল না। মেয়েকে বুকের সাথে শক্ত করে লেপ্টে ধরে বাড়ির দিকে রওনা দিল। হিয়াকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেয়ে এতক্ষণ পর যেন সবার প্রাণ ফিরে এলো। ফ্ল্যাটে ঢোকার পর পুরো বাড়ি জুড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নামল। ইসরাত একটুও সময় নষ্ট না করে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে এলো। হিয়াকে কোলে বসিয়ে ওর হাত আর কপালের কেটে যাওয়া অংশটুকু ডেটল দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করে ড্রেসিং করে দিল। ব্যথার চোটে হিয়া আইঢাই করে আবার পাপার গলা জড়িয়ে ধরল।
ওদিকে ড্রয়িংরুমে বসে নাজমা বেগম এতক্ষণের জমে থাকা ভয় আর টেনশন ক্ষোভে উগরে দিতে লাগলেন। অনবরত গজগজ করে বলতে লাগলেন, “আজকে আল্লাহর অসীম দয়া যে মেয়েটা অক্ষত ফিরে এসেছে! যদি মেইন গেট গলে রাস্তায় চলে যেত, কী হতো বলতে পারিস? এই বুড়ো বয়সে আমার কি বাচ্চা সামলানোর ক্ষমতা আছে? তুই তো সারাদিন অফিস নিয়ে থাকিস, কিন্তু এই অবুঝ বাচ্চাটার যে প্রতিটা মুহূর্তে চোখে চোখে রাখার মতো একজন মানুষ প্রয়োজন; সেটা তুই কবে বুঝবি? তানিয়া চলে গেছে চার বছর হলো। ওর শোক আঁকড়ে ধরে তুই কতদিন বাচ্চাটার জীবন এভাবে ঝুঁকিতে ফেলবি? আমি আর দায়িত্ব নিতে পারছি না বাবা, আমার শরীর আর কুলায় না!”
ইয়াজিদ প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেল না। চুপচাপ মাথা নিচু করে শুনতে লাগল। তার ভেতরের অপরাধবোধটা ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে। মায়ের প্রতিটা কথাই তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল; সে একজন ভালো বাবা হওয়ার চেষ্টা করলেও, দিনশেষে হিয়ার একটা বড় শূন্যতা রয়েই গেছে। ইয়াজিদের অবাধ্য মনটা আজ নির্মম বাস্তবতার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল।
নাজমা বেগমের গলার আওয়াজ ক্ষোভের সীমা ছাড়িয়ে এক বুক অভিমানে গিয়ে ঠেকল। তিনি চোখের কোণ মুছে নিয়ে বলতে লাগলেন, “এই বয়সী বাচ্চাদের আলাদা চাহিদা থাকে। ওদের সার্বক্ষণিক একটা ছায়া লাগে, মায়ের মায়া লাগে। আজ আমি বেঁচে আছি বলে তাও একটু-আধটু চোখে চোখে রাখছি, কিন্তু কাল যদি আমি মরে যাই তখন কে দেখবে? কে আগলাবে মেয়েটাকে? তুই তো কাজ ফেলে ঘরে বসে থাকতে পারবি না!”
মায়ের প্রশ্নগুলো ইয়াজিদের ভেতরের অপরাধবোধকে আরও উসকে দিল। সে অত্যন্ত নিরুপায় আর অসহায় গলায় বলল, “তাহলে আমি এখন কী করব মা? তুমিই বলো না…”
নাজমা বেগম তিক্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখটা ঘুরিয়ে নিলেন, “যা মন চায় তাই কর! আমি বলার কে? আমার কথা এ বাড়িতে কে শোনে? আমিই তো তোদের সংসারের বাড়তি বোঝা। কোনোমতে দুটো খেয়ে পড়ে বেঁচে আছি, এই তো!”
ইয়াজিদ এগিয়ে গিয়ে মায়ের হাঁটুর কাছে মেঝেতে বসল। ওনার মায়ের একটা হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “এভাবে বলো না মা! তুমি আমাদের বোঝা হতে যাবে কেন? তুমিই তো আমাদের একমাত্র ভরসা। আসলে… আসলে আমার বড্ড ভয় হয় মা! আজ যদি আমি নতুন কাউকে এই ঘরে নিয়ে আসি, সে কি হিয়াকে ভালোবাসবে? নিজের মেয়ের মতো বুকে টেনে নেবে? যদি ওকে অবহেলা করে, সেই কষ্ট আমার কলিজা ছিঁড়ে গেলেও আমি সহ্য করতে পারব না মা! এই একটা ভয়েই তো আমি থমকে আছি।”
নাজমা বেগম ছেলের উস্কোখুস্কো চুলগুলো আলতো করে বিলি কেটে দিতে দিতে বললেন, “তোর ভয়টা তো অমূলক না রে বাবা। সৎ মা নামটার সাথে একটা ভয় সবার মনেই থাকে। কিন্তু দুনিয়ার সব মানুষ তো এক রকম না। এমন অনেক মেয়ে আছে যাদের বুকে এক সমুদ্র মায়া লুকিয়ে থাকে। হিয়া পাখিটা এত মিষ্টি, ওর মায়াবী চেহারার দিকে তাকালে যেকোনো পাষাণ নারীর বুকেও মাতৃত্ব জেগে উঠবে বাবা। তোকে তো চোখ বন্ধ করে কাউকে ঘরে তুলতে বলছি না, আমরা দেখেশুনে একটা ভালো মেয়েই আনব যে আমাদের হিয়াকে নিজের কলিজার টুকরো করে নেবে।”
তবুও ইয়াজিদের মনের দ্বিধা পুরোপুরি কাটল না। মায়ের হাতের ওপর নিজের কপালটা ঠেকিয়ে এক বুক সংশয় নিয়ে আবার বলল, “কিন্তু মা, আমি যদি তাকে মন থেকে মেনে নিতে না পারি? আমার অবাধ্য মন যদি সারাক্ষণ তানিয়ার স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায়, আর আমি যদি অবহেলায় তাকে কষ্ট দিয়ে ফেলি? একটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট করার অধিকার কি আমার আছে মা?”
নাজমা বেগম মৃদু হাসলেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “সময় সবকিছু মানিয়ে নিতে শেখায় ইয়াজিদ। আজ তোর যে ক্ষতটা কাঁচা লাগছে, সময়ের নিয়মে সেই ক্ষততে একদিন প্রলেপ পড়বে। কেউ কারো জায়গা কেড়ে নেয় না বাবা, তানিয়া ওর জায়গায় থাকবে। কিন্তু জীবন তো নদীর মতো, নিজের প্রয়োজনে সামনে এগোতেই হয়। তুই শুধু মনের দরজাটা একটু খোলা রাখিস, দেখবি সময় তোদের দুজনকে ঠিক মানিয়ে দেবে…”
ইয়াজিদ ভারী গলায় বলল, “আচ্ছা…”
নাজমা বেগম ছেলের দিকে উৎসুক চোখে তাকালেন, “তাহলে কি মেয়ে দেখব আবার?”
“দেখো।” কথাটা শেষ করেই ইয়াজিদ আর ওখানে দাঁড়াল না। তার মনের ভেতর ঝড় আর শূন্যতা একসাথে কাজ করছে। ছেলের মুখ থেকে একটিমাত্র সবুজ সংকেত পাওয়ার জন্য নাজমা বেগম গত চারটা বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। ইয়াজিদের মুখে কথাটা শোনামাত্রই ওনার চোখের কোণ গড়িয়ে আনন্দের দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না!
.
কালো রঙটা শোকের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু আজ রূপাঞ্জনার জন্য এটা প্রতিশোধ আর নিজেকে সামলে নেওয়ার শক্ত বর্ম। সে পছন্দের কালো রঙের শাড়িটা পরল। অনেকদিন পর চোখে কাজল দিল! কাজল দিলে ওকে অন্যরকম দেখায়। হিমশীতল চোখের চাউনিটাই যেকোনো অস্ত্রের চেয়ে ধারালো লাগে! আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে নিল।
এরই মাঝে লোক মারফত সায়েমের বর্তমান বিজনেস নম্বরটা জোগাড় করে ফেলেছিল রূপু। ব্যবসার কথা বলে সায়েমকে আজ বিকেল ঠিক চারটায় কলাতলী বিচের কাছে একটা ক্যাফে দেখা করতে বলল। সায়েমও বড় প্রজেক্ট ভেবে এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল। রূপু নিজে কথা বলেছে। হায় রে নিয়তি! যে কণ্ঠস্বর সায়েমের এত চেনা ছিল, নেশা ছিল; যে কণ্ঠের মান-অভিমান সে এক নিমেষে ধরে ফেলত আজ সেই বিশ্বাসঘাতক লোকটা গলার আওয়াজটুকু বিন্দুমাত্র চিনতে পারল না!
বিকেল চারটা বাজতে ঠিক দশ মিনিট বাকি। ‘ক্যাফে ব্লু মেরিন’-এর কাঁচের জানালার পাশে, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের দিকে মুখ করে বসে আছে রূপাঞ্জনা। টেবিলের ওপর রাখা ঢাকা থেকে আনিয়ে নেওয়া স্মৃতির কালো প্যাকেটটা। ঠিক চারটা বেজে দুই মিনিটে ক্যাফের দরজার বেলটা টুং করে বেজে উঠল। সানগ্লাস কপালে তুলে, মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি নিয়ে ক্যাফেতে প্রবেশ করল সায়েম। চারপাশে চোখ বুলিয়ে কর্নার টেবিলের দিকে নজর যেতেই সে দেখল একজন নারী কালো শাড়ি পরে একাকী বসে আছেন। সায়েম ভাবল ইনিই হয়তো ঢাকা থেকে আসা সেই ক্লায়েন্ট। সে এগিয়ে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। অত্যন্ত মার্জিত গলায় বলল, “এক্সকিউজ মি, ওয়ান গ্রুপের রিপ্রেজেন্টেটিভ? আই অ্যাম সায়েম।”
রূপু এতক্ষণ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। সায়েমের কণ্ঠস্বর পেতেই অত্যন্ত ধীর ভঙ্গিতে তার মুখের দিকে তাকাল। নিজের চোখের ওপর থেকে সানগ্লাসটা সরিয়ে সায়েমের চোখের দিকে সটান চাইল। সায়েম যখন রূপুর জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকাল তার মুখের চওড়া হাসিটা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল! ঠোঁট দুটো চট করে শুকিয়ে গেল, চোখের মণি দুটো ভয়ে আর বিস্ময়ে চড়কগাছ। সে এক কদম পিছিয়ে গিয়ে তোতলামো গলায় বলল, “রূ… রূপা? তুমি? এখানে?”
সায়েমের ফ্যাকাশে ভাবটা দেখে রূপাঞ্জনার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। রূপু নিজের বসার ভঙ্গিটা বদলাল না, অত্যন্ত আয়েশ করে টেবিলের ওপর দুই হাত রাখল। বলল, “বসুন সায়েম সাহেব। ওয়ান গ্রুপের পিএ হিসেবে না হলেও, আপনার পুরোনো চেনা মানুষের সামনে অন্তত পাঁচ মিনিট বসাই যায়, কী বলেন?”
সায়েম শুকনো ঢোক গিলে কাঁপতে কাঁপতে সামনের চেয়ারটায় বসল। তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলাটা যতটা সম্ভব নিচু করে বলল, “রুপা… তুমি এখানে কীভাবে? আমি কত খুঁজেছি তোমাকে!”
রূপাঞ্জনা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। সায়েমের ছটফটানি আর ভয়টা সে প্রতিটা সেকেন্ড তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে। এতগুলো বছর যে মানুষটা ওকে হাতের পুতুল বানিয়ে নাচিয়েছে, আজ সেই মানুষটাই ওর চাউনি দেখে খাঁচার পাখির মতো কাঁপছে; এই দৃশ্য দেখার আনন্দই আলাদা! রূপু জিজ্ঞেস করল, “সত্যি সায়েম? তুমি আমাকে খুঁজেছ? কতটা খুঁজেছ বলো তো?”
সায়েম ঘাবড়ে গেল। রুমালে কপাল মুছতে মুছতে বলল, “অনেক খুঁজেছি রুপা। ঢাকা শহরের এমন কোনো হাসপাতাল, কোনো চেনা জায়গা বাকি রাখিনি। তুমি হুট করে ওভাবে গায়েব হয়ে গেলে, আমার যে কী অবস্থা হয়েছিল…”
“তাই?” রূপু ঝুঁকে এসে টেবিলের ওপর হাত রাখল। ঠোঁটের হাসিটা আরও চওড়া হলো, “তা খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ এত দূরে কক্সবাজারর চলে এলে? তাও আবার বিয়েশাদী করে? পাচারকারী চক্রের নোংরা টাকা বুঝি বেশি হয়ে গিয়েছিল?”
সায়েমের ফর্সা মুখটা আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেল। পায়ের তলার মাটি ততক্ষণে পুরোপুরি সরে গেছে। সে তোতলামো গলায় বলল, “তুমি… তুমি এসব কী বলছ রুপা? আমি তো… আমি তো এখানে সাধারণ ব্যবসা করি। তুমি কোনো ভুল তথ্য পেয়েছ। কে দিয়েছে তোমাকে এসব খবর?”
রূপা টেবিলের ওপর রাখা স্মৃতির কালো প্যাকেটটা সায়েমের দিকে ঠেলে দিল। সায়েম ভয়ে ভয়ে তাকাল, “কী এটা?”
“এটা তোমার ফেলে যাওয়া পাপ আর আমার অন্ধ মোহের মরা লাশ!” রূপু সোজা হয়ে বসল, “খুলে দেখো এর ভেতরে তোমার দেওয়া সব সস্তা প্রেমপত্রগুলো আছে, যা পড়ে আমি নিজের জন্মদাতা বাবাকে ত্যাগ করতে দুবার ভাবিনি। তোমার দেওয়া ঘড়িটা আছে, যার দিকে তাকিয়ে আমি প্রতিটা সেকেন্ড তোমার ফেরার প্রহর গুনেছি। আর আছে তোমার পুরোনো আইডি কার্ড আর আইনি কাগজপত্রের কপি, যা দিয়ে চাইলে এই মুহূর্তেই তোমাকে শহরের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া যায়।”
“রুপা, প্লিজ! আমার একটা সাজানো সংসার আছে, দুটো ছোট ছোট বাচ্চা আছে। তুমি প্লিজ অতীত টেনে এনে আমার জীবনটা ছারখার করে দিও না।”
“আমি প্রতিশোধ নিতে আসিনি। তুমি রূপাঞ্জনার জীবনে সেই যোগ্যতাই রাখো না।” রূপু চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বাঁকা হেসে বলল, “তবে… প্রতিশোধ না নিলেও, একজন মানুষ হিসেবে তোমার মতো একটা নরপিশাচকে বিবেচনা করলে অবশ্যই তুমি চরম শাস্তির যোগ্য। অনেক তো মানুষের জীবন নিয়ে খেললে সায়েম সাহেব! আমার কতকগুলো বছর নষ্ট করলে, আমার জীবনটা ছারখার করলে… আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটা…” বাচ্চাটার কথা আসতেই রূপুর গলাটা কেঁপে উঠলেও ওর চিবুক আবার শক্ত হয়ে উঠল। বলল, “থাক, সেসবে না-ই বা গেলাম। তোমার মতো অমানুষ তো আর আমি নই, তাই অতটা নিচ আমি হতে পারব না। তবে হ্যাঁ, তোমার যোগ্যতা অনুযায়ী যতটুকু শাস্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব, তা আমি ঠিকই করে এসেছি। তোমার সব কুকীর্তির ফাইল আর আইডেন্টিটির প্রমাণ উপযুক্ত জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এইবার তুমি নিজেকে বাঁচাতে বঙ্গোপসাগরের তলায় গিয়ে লুকালেও আইনের হাত থেকে তোমাকে বাঁচানোর ক্ষমতা তোমার ক্ষমতাশালী বাবারও নেই।”
কথাগুলো শেষ করেই রূপু সানগ্লাসটা চোখে পরে নিল। সায়েমকে আর একটা শব্দও বলার সুযোগ না দিয়ে সে দর্পিত পায়ে ক্যাফের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সায়েমের পায়ের তলার মাটি তখন পুরোপুরি ধসে গেছে। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে, মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সে চেয়ার ছেড়ে প্রায় হুমড়ি খেয়ে টেবিলের ওপর পড়ে পাগলের মতো পেছন থেকে ডাকতে লাগল, “রুপা…”
কিন্তু রূপাঞ্জনা পেছনে ফিরে তাকাল না। ক্যাফের দরজার বেলটা আরও একবার টুং করে বেজে উঠল। সায়েম বলতে থাকল, “রুপা! বাচ্চার কথা কী বললে? আমি তো কিছুই জানি না! বিশ্বাস করো, আমি বাচ্চার ব্যাপারে কিচ্ছু জানি না!”
.
.
.
চলবে…
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ২২৬৬

