Home "ধারাবাহিক গল্প বাউন্ডুলে ঘুড়ি বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০৬

বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০৬

0
158

#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️‍🩹 [পর্ব-০৬]
~ আফিয়া আফরিন

লং ড্রাইভের ক্লান্তি ভুলে রূপাঞ্জনা যখন হোটেলের বারান্দায় এসে দাঁড়াল, তখন সামনের বিশাল নীল জলরাশি রূপালী রূপ ধারণ করেছে। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত, ঢেউয়ের গর্জন আর নীল আকাশের মিতালী যেকোনো মানুষের মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু রূপুর চোখের সামনে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য যেন অদৃশ্য ধোঁয়াশা। এই নীল জলরাশি, ঠান্ডা হাওয়া; কোনোকিছুই মনের ভেতরের তপ্ত মরুভূমিকে শান্ত করতে পারছে না। দীর্ঘ পাঁচ বছরের চাতক পাখির মতো অপেক্ষার অবসান কি তবে সমুদ্রের পাড়েই হবে? সায়েম কি আসলেই এই শহরের কোথাও ওর মতোই ছন্নছাড়া হয়ে বেঁচে আছে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই রূপুর পুরো শরীরে কাঁপুনি দিয়ে উঠল। আর একমুহূর্তও রুমের ভেতর একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দ্রুত পায়ে হেঁটে পাশের রুমে বাবার কাছে চলে গেল। রুমে ঢুকতেই দেখল শওকত চৌধুরী সোফায় বসে ক্লান্ত ভঙ্গিতে কপালে হাত দিয়ে আছেন। রূপু ওনার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়িয়ে অস্থির গলায় বলল, “বাবা, আমরা তো কক্সবাজার চলে এলাম। তুমি হোটেলে উঠতে বললে, আমি উঠলাম। কিন্তু এখন তো বলো বাবা, সায়েম কোথায়? ও ঠিক কোথায় আছে?”

শওকত চৌধুরী মেয়ের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার মুখের অবয়ব দেখে মনে হচ্ছে তিনি নিজের ভেতরে কোনো বিরাট সত্যকে চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। শান্ত গলায় বললেন, “আছে মা, ও এখানেই আছে। একটু ধৈর্য ধর।”

বাবার সংক্ষিপ্ত উত্তর রূপুর ভেতরের ছটফটানি আরও বাড়িয়ে দিল। দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে প্রায় কেঁদে ফেলার মতো গলায় বলল, “কিন্তু কোথায় বাবা? তুমি ওর খোঁজ কীভাবে জানলে? ও যদি এখানেই থাকবে, তবে পাঁচটা বছর ও আমার সাথে কোনো যোগাযোগ কেন করেনি? তুমি এত রহস্য কেন করছ বাবা? দোহাই তোমার, আমার সাথে আর এভাবে লুকোচুরি খেলো না, সরাসরি বলো প্লিজ!”

শওকত চৌধুরী সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মলিন ও ব্যাকুল মুখের দিকে তাকালেন। তার চোখের কোণে বিষাদ খেলা করে গেল, যা রূপুর চোখ এড়িয়ে গেল। তিনি রূপুর মাথায় হাত রেখে অত্যন্ত ভারী গলায় বললেন, “তোর সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না রে মা। আগে তোকে সায়েমের সাথে দেখা করাই। ওর মুখোমুখি হলেই তুই তোর সব প্রশ্নের উত্তর নিজে থেকেই পেয়ে যাবি।”

রূপু বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। সায়েমের কাছে পৌঁছানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা ওকে গ্রাস করে ফেলেছে। শুধু মাথা নেড়ে বলল, “চলো তবে বাবা।”

শওকত চৌধুরী দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, “আয় মা…”

হোটেলের লবি পেরিয়ে ওরা রিকশায় চড়ে বসল। সমুদ্রের নোনা হাওয়া রূপুর মুখের ওপর এসে আছড়ে পড়ছিল। রিকশাটা মেইন রোড ছেড়ে একটু নির্জন, গলির ভেতরের রাস্তার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। রূপুর বুকের ধুকপুকানি ক্রমশ বাড়ছে। সায়েমকে দেখার পর ও প্রথম কী বলবে? জড়িয়ে ধরে কাঁদবে, নাকি এত বছরের অভিমানের প্রতিশোধ নেবে?
রিকশাটা কলাতলীর ভেতরের দিকে শান্ত, ছায়াঘেরা আবাসিক অঞ্চলের দিকে এগিয়ে চলল। এই দিকটায় সমুদ্রের গর্জন কম, পর্যটকদের হইচইও নেই। চারপাশটা বেশ ছিমছাম আর শান্ত। রূপুর বুকের ভেতর প্রতি সেকেন্ডে হাতুড়ির মতো শব্দ হচ্ছে। একটা মাঝারি সাইজের সুন্দর ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে এসে রিকশাটা থামল। বাড়ির সামনে ছোট্ট বাগান, যেখানে নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। শওকত চৌধুরী রিকশা থেকে নেমে রূপুকে ইশারা করলেন নামার জন্য। রূপু নেমে দাঁড়িয়ে বাড়িটার দিকে তাকাল। সায়েম কি এই বাড়িতে থাকে? ও এখানে কী করছে?

শওকত চৌধুরী রূপুর কাঁধে হাত রেখে ভারী গলায় বললেন, “নিজেকে শক্ত কর মা। শান্ত থাক। তাড়াহুড়ো করবি না, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাস না মা। তুই তো সত্যিটা দেখতে চেয়েছিলি, এবার নিজের চোখে ভালো করে দেখে যা…” তিনি ভেতরে ঢুকলেন না। বাড়ির সীমানা প্রাচীরের পাশে একটা বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালেন। কিন্তু রূপু যেখানে দাঁড়িয়ে আছে ওখান থেকে বাড়ির সামনের বারান্দাটা একদম স্পষ্ট দেখা যায়। রূপু ভ্রু কুঁচকে বাবার দেখানো দিকে তাকাল। আর তাকানো মাত্রই ওর পায়ের নিচের মাটি একনিমেষে সরে গেল। অবাধ্য চোখ দুটো নিজের দেখা দৃশ্যটাকে বিশ্বাস করতে পারছিল না!
সামনের সুন্দর খোলামেলা বারান্দায় সায়েম দাঁড়িয়ে আছে। পাঁচ বছর আগে যাকে রূপু হাসপাতালে রেখে এসেছিল, সেই সায়েম! কিন্তু রূপুকে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা দিল সায়েমের পাশে থাকা দৃশ্যটি। সায়েমের পায়ের কাছে দুটো ফুটফুটে ছোট মেয়ে খেলছে। তুলতুলে গোলগাল চেহারা, বয়স মেরেকেটে দুই বছর হবে। হুবহু একই রকম দেখতে, জমজ! ওরা খেলছে আর সায়েম নিচু হয়ে ওদের একজনকে কোলে তুলে নিয়ে গালে চুমু খাচ্ছে। ওর হাসিমুখের পিতৃসুলভ কোলাহল দূর থেকেও রূপুর কানে তীরের মতো বিঁধছিল। তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে বের হয়ে এলো এক সুন্দরী তরুণী। পরনে শাড়ি, খোঁপা। তরুণীটির হাতে এক কাপ চা। সে সায়েমের দিকে চা বাড়িয়ে দিয়ে মিষ্টি হাসল। নাহ, রূপু আর দেখতে পারল না। বাবার কাছে চলে এলো। বাবার হাত দুটো খামচে ধরে প্রায় রুদ্ধশ্বাসে বলল, “বাবা! এসব কী? এসব কী দেখছি আমি?”

শওকত চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত রেখে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে বললেন, “তুই যা দেখতে চেয়েছিলি, তা কি নিজের চোখে দেখেছিস?”

বাবার শান্ত ভাব দেখে রূপুর ভেতরের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে গেল। ক্ষিপ্ত গলায় বলল, “তুমি আমাকে পরিষ্কার করে বলবে এসব হচ্ছেটা কী?”

“শান্ত হ মা। নিজেকে শান্ত কর। চল হাঁটতে হাঁটতে তোকে সব বলি।”

রূপু কোনো কথা বলল না। ওর ভেতরের সব জেদ আর অহংকার ততক্ষণে পাথর হয়ে গেছে। চুপচাপ মাথা নিচু করে বাবার পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। শওকত চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরপায়ে হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগলেন, “তুই আমার ওপর অভিমান করে আমার থেকে দূরে চলে গেলেও, আমি কিন্তু চুপ করে বসেছিলাম না মা। আমি ঠিকই তোর সব খোঁজখবর পাচ্ছিলাম। তুই যার হাত ধরে ঘর ছেড়েছিলি, সেই ছেলেটা আসলে ভয়ঙ্কর আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে জড়িত ছিল। ওদের মূল কাজই ছিল সরল মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলা, তারপর সুযোগ বুঝে তাদের চড়া দামে বিদেশে পাচার করে দেওয়া! সায়েম সাধারণ বখাটে ছেলে ছিল না, ও ছিল ওই চক্রের একটা বড় ঘুঁটি।”

বাবার মুখ থেকে এমন ভয়ঙ্কর সত্য শুনে রূপু থমকে দাঁড়াল। কিন্তু শওকত চৌধুরী মেয়ের হাত ধরে আবার হাঁটা শুরু করলেন আর বলতে থাকলেন, “তোর বেলায় সায়েম সেই সুযোগটাই খুঁজছিল, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ও সুযোগটা শেষ পর্যন্ত কাজে লাগাতে পাচ্ছিল না। এই ব্যবসার লাইনে ও নতুন ছিল না। অল্প বয়সেই বহু মেয়েকে ফাঁসিয়েছে, ধ্বংস করেছে। আমি আগে এত বিস্তারিত জানতাম না। আমি শুধু ওর বাহ্যিক আচরণ আর চলাফেরা দেখে জানতাম অত্যন্ত খারাপ ছেলে। তাই তোকে দূরে সরাতে চেয়েছিলাম।” শওকত চৌধুরী থামলেন, তার চোখ দুটো ভিজে এলো। তিনি রূপুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “সায়েম যখন তোকে পুরোপুরি নিজের জালে আটকে তোকে ক্রের হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগটা পেল, তখন তুই অন্তঃসত্ত্বা। আর এটাই ওর পুরো প্ল্যানটা ওলটপালট করে দিল। এত বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় আর তোকে কাজে লাগাতে না পারার জন্য সায়েমের মাথা পুরোপুরি বিগড়ে গেল। ও তোকে একটা বোঝা ছাড়া আর কিছুই ভাবেনি মা। তাই যখন দেখল তোকে বিক্রি করা যাবে না, তখন তোকে হাসপাতালে যন্ত্রণায় ছটফট করা অবস্থায় ফেলে রেখে নিজের পুরো গ্যাং আর টাকা-পয়সা নিয়ে চম্পট দিল।”

বাবার প্রতিটি কথা রূপুর কানে তপ্ত সীসার মতো গলে গলে পড়ছিল। ওর পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেল। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না; যাকে হৃদয়ের সবচেয়ে পবিত্রতম আসনে বসিয়ে এসেছে, সে এতটা নিচে নামতে পারে? মানুষের অবয়বে এতটা ভয়ঙ্কর নরপশু লুকিয়ে থাকতে পারে? রূপুর চারপাশের সবকিছু কেমন ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। মাথার ভেতর তীব্র যন্ত্রণা আর শূন্যতা এসে ভর করল। নিজের শরীরের ভার ধরে রাখতে পারল না। রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটা ভাঙাচোরা কাঠের টুলের ওপর ধপ করে বসে পড়ল। তারপর দু হাতে মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরল। চোখ বন্ধ করতেই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল একটু আগে দেখা সায়েমের ঝলমলে হাসিমুখ। দুটো বাচ্চা। তার ঠিক পরপরই চোখের সামনে ভেসে উঠল রূপচারু ভিলার অন্ধকার, নির্জন কোণের ছোট্ট কবরের ভেজা মাটি। যে মাটিতে ওর মেয়েটা শায়িত! এমন বৈপরীত্য, চরম বিশ্বাসঘাতকতা আর নির্মম সত্যের আঘাত রূপুর অবাধ্য মস্তিষ্ক নিতে পারল না।
সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো। ব্যস! রূপু তৎক্ষণাৎ ওখানেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
.
ইদানীং হিয়া নতুন বায়না ধরেছে। অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ইয়াজিদ যখনই বাসায় ফেরে, কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাবার পিছু লেগেই থাকে; ওকে গল্প শোনাতে হবে। ইয়াজিদ যতই ক্লান্ত গলায় বলে, “মা, দাদুর কাছে যাও। দাদু কত সুন্দর সুন্দর গল্প জানে।”

হিয়া ততই জেদ ধরে বসে থাকে, “না, পাপার থেকে শুনব!” অগত্যা ইয়াজিদকেই প্রতিদিন কঠিন দায়িত্বটা পালন করতে হয়। মেয়ের মিষ্টি আবদারের কাছে তার কিছুই বলার থাকে না। প্রতিদিন হিয়াকে নতুন নতুন গল্প শোনাতে হয়। গতকাল রাতে শুনিয়েছে রূপকথার গল্প।
আজকে রাতে বিছানায় শোয়ার পর হিয়ার আবদার অন্য রকম। বলল, “আজকে রূপকথা না পাপা, আজকে ভূতের গপ্পো শোনাতে হবে!”

কিন্তু আজ ইয়াজিদের মনটা একটুও ভালো নেই। বুকের ভেতর ভারাক্রান্ত অনুভূতি দলা পাকিয়ে উঠছে। থেকে থেকে শুধু তানিয়ার কথা মনে পড়ছে। আজ যে ওদের প্রথম দেখা হওয়ার দিন ছিল! ক্যালেন্ডারের বিশেষ তারিখটা প্রতি বছর ঘুরে ঘুরে এলেই ইয়াজিদের বুকের ভেতরের পুরোনো ক্ষতটা নতুন করে রক্তক্ষরণ শুরু করে। তখনই হিয়ার ছোট ছোট হাত দুটো ইয়াজিদের গালে এসে পড়ল, “পাপা… গপ্পো!”

ইয়াজিদ হিয়ার কপালে আলতো করে চুমু খেল। তানিয়ার স্মৃতির তীব্র দহন সামলাতে না পেরে মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আজ ভূতের গল্প না শুনে… মায়ের গল্প শুনবে মা?”

হিয়া ছোট্ট দুটো ভ্রু কুঁচকে মাথা নাড়ল, “না, ভূত!”

“আজকে একটু মায়ের গল্প শোনো মা! তোমার মা কেমন ছিল, জানতে ইচ্ছে করে না?”

“আচ্ছা, বলো।”

ইয়াজিদ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা অন্ধকার আকাশের দিকে চাইল। তানিয়ার হাসিমুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই সে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে কষ্টের গল্পটা বলতে শুরু করল, “জানো মা, তোমার মা না খুব সুন্দর গান গাইত। ও যখন চোখ বন্ধ করে তানপুরাটা নিয়ে বসত আর ওর মিষ্টি গলায় সুর তুলত, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে গান শুনতাম। মনে হতো পুরো পৃথিবীটা শান্ত হয়ে গেছে।” হিয়া পাপার বুকের ওপর থুতনি রেখে বড় বড় চোখ করে শুনতে লাগল। ইয়াজিদ ওর চুলে বিলি কেটে বলল, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমকালো গানের অনুষ্ঠানে ওর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। স্টেজে ও গান গাইছিল, মিলনায়তনের হাজারো মানুষের মাঝে আমি ওর মায়াবী কণ্ঠের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। তারপর ওখান থেকেই টুকটাক কথা, একটু একটু করে বন্ধুত্ব… আর সেই বন্ধুত্ব কখন যে নিটোল প্রেমে রূপ নিল, আমরা নিজেরাও টের পাইনি। কিন্তু জানো হিয়া, তোমার মা না খুব অভিমানী ছিল। আমাকে বড্ড ভালোবাসত, তাই আমাকে অন্য কারো সাথে একদম সহ্য করতে পারত না। আমি কোনো মেয়ের সাথে সামান্য কথা বললেই ওর সুন্দর মুখটা অভিমানে কালো হয়ে যেত, দিনভর আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিত। ওর মিষ্টি অভিমান আর ভালোবাসাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অহংকার…”

এটুকু বলা শেষে ইয়াজিদ যখন হিয়ার দিকে তাকাল, দেখল মায়ের গল্প শুনতে শুনতেই ছোট্ট হিয়া কখন যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।
ইয়াজিদ হিয়াকে বুকের ওপর থেকে নামিয়ে বিছানায় ভালো করে শুইয়ে দিল। ওর গায়ের ওপর পাতলা কাঁথাটা টেনে কপালে আলতো করে একটা চুমু খেল। তারপর ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি একদম তোমার মায়ের মতো হয়েছ সোনা। ওর মতোই মায়াবী।”

হিয়া ঘুমের ঘোরেই নড়েচড়ে উঠল। অবুঝ মনে অবিন্যস্ত গলায় বিড়বিড় করে আধো-আধো স্বরে বলে উঠল, “পাপা… মা এনে দাও।”

তানিয়াকে এনে দেওয়ার সাধ্য যে এই জন্মে ইয়াজিদের নেই! সে ম্লান হেসে ফিসফিসিয়ে বলল, “এখন যদি তোমার জন্য নতুন কোনো মাকে নিয়ে আসি, তবে তোমার মা বড্ড রাগ করবে সোনা! ও যে আমাকে আর কারো সাথে একদম সহ্য করতে পারে না, তা তো তোমাকে একটু আগেই বললাম…”
.
রূপাঞ্জনার যখন জ্ঞান ফিরল, তখন চারপাশে তীব্র ডেটলের গন্ধ আর সিলিং ফ্যানের একঘেয়ে আওয়াজ কানে এলো। চোখের পাতা মেলতেই বুঝতে পারল ও হাসপাতালের একটা কেবিনে শুয়ে আছে। রূপু চোখ ঘুরিয়ে দেখল, বেডের পাশের চেয়ারে মাথা নিচু করে ক্লান্ত শওকত চৌধুরী ঘুমে ঢলে পড়েছেন। রূপু অত্যন্ত ক্ষীণ আর দুর্বল গলায় ডাক দিল, “বাবা…”

মেয়ের ডাক কানে পৌঁছাতেই ওনার তন্দ্রা ছুটে গেল। হুরমুর করে চোখ খুলে তাকালেন। রূপুর জ্ঞান ফিরেছে দেখে তার শুকিয়ে যাওয়া মুখে প্রাণ ফিরে এলো। মেয়ের হাত দুটো চেপে ধরে আকুল হয়ে বললেন, “মা! তুই ঠিক আছিস রে মা?”

রূপু ম্লান হেসে মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ বাবা, আমি একদম ঠিক আছি। কিন্তু বাবা… সায়েমের সম্পর্কে তুমি এতকিছু কীভাবে জানলে?”

শওকত চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে রূপুর কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “তুই যখন হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ হয়ে গেলি, তখন আমি চারদিক হন্যে হয়ে তোকে খুঁজছিলাম। পরে ভাবলাম, সায়েমকে যদি খুঁজে বের করতে পারি, তবে ওর সূত্র ধরেই তোর খোঁজ পেয়ে যাব। সেই সূত্র ধরে লোক লাগিয়ে খোঁজ করতে গিয়েই ওর সমস্ত সত্য জানতে পারি। কিন্তু… কিন্তু জেনেও আমি ওর বিরুদ্ধে কিচ্ছু করতে পারিনি মা। তোর বাবা পুরোপুরি ব্যর্থ!”

রূপু জিজ্ঞেস করল, “কেন বাবা? আইনের আশ্রয় নাওনি কেন?”

“ও যে গ্যাংটার সাথে জড়িত ছিল, তা্য পেছনে বিরাট ক্ষমতাশালী হাত ছিল। সায়েমের বাবা ছিলেন তখনকার প্রভাবশালী এমপি! ওনার হাত অনেক লম্বা, অনেক ওপরে। আমি তো সাধারণ একজন ব্যবসায়ী মাত্র। আমার সমস্ত ক্ষমতা, চেষ্টা ওনার রাজনৈতিক প্রতিপত্তির কাছে হেরে গিয়েছিল রে মা। তোকে বাঁচাতে গিয়ে আমি ওদের ক্ষমতার কাছে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছিলাম।”

বাবার অসহায়ত্ব আর অপরাধবোধ দেখে রূপু তার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লেও নিজেকে একদম বদলে ফেলল। জেদ আর অনমনীয়তায় শক্ত হয়ে উঠল। বাবার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, “না বাবা! তুমি ব্যর্থ নও। একদম নিজেকে ব্যর্থ বলবে না। আজ তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এসে নিজের চোখে ওর আসল রূপটা দেখিয়েছ, এটাই তোমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা বাবা! তুমি যদি আজ আমাকে এই সত্যের মুখোমুখি না করতে, তবে আমি আজীবন এক নরপশুকে মনে মনে ফেরেশতা ভেবে অপেক্ষা করে যেতাম। নিজের জন্মদাতা বাবাকে সারাজীবন অপরাধী ভাবতাম। তুমি আমাকে বিরাট মানসিক অন্ধত্ব থেকে বাঁচিয়েছ বাবা, তুমি সার্থক!” বিছানায় উঠে বসল। শওকত চৌধুরীর বোকা মেয়েটা এক নিমেষে মরে গিয়ে নতুন, শক্ত রূপাঞ্জনার জন্ম হলো। ও বাবাকে উদ্দেশ্য করে প্রতিজ্ঞার সুরে বলল, “বাবা, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি আমি নিজেকে শক্ত করব। এই রূপু আর কোনোদিন সায়েমের দেওয়া অপবাদের কথা ভেবে, ওর নিখোঁজ হওয়ার কথা ভেবে এক ফোঁটা চোখের জলও ফেলবে না। আমি ভেঙে পড়ব না বাবা, কিচ্ছুতেই না! তবে আমি সায়েমের সাথে আরেকবার দেখা করব বাবা। শেষ দেখা। ভালোবাসার নামে ও আমার সাথে যে নোংরা খেলাটা খেলেছে! ওর সাজানো সুখে আমি বিষাদ ঢালতে যাব না কিন্তু মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওর ভেতরের কুৎসিত রূপটা যে আমি জেনে ফেলেছি, সেটা ওর পাপী চোখে চোখ রেখে বুঝিয়ে দিয়ে আসতে চাই। ওর অহংকার আমি চূর্ণ করে দিয়ে আসব বাবা!”
.
.
.
চলবে…
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ২১৫৪