Home "ধারাবাহিক গল্প বাউন্ডুলে ঘুড়ি বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০৮

বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০৮

0
254

#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️‍🩹 [পর্ব-০৮]
~ আফিয়া আফরিন

ক্যাফে থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই রূপাঞ্জনার মাথার ভেতর সায়েমের শেষ কথাগুলো দমকা হাওয়ার মতো অবিরাম পাক খেতে লাগল। “আমি বাচ্চার ব্যাপারে কিচ্ছু জানি না!” নৃশংস এক অপরাধী চরম বিপদে পড়লে মিথ্যে বলতেই পারে, কিন্তু সায়েমের কণ্ঠস্বরের সেই মুহূর্তের ভয় আর বিস্ময়টা কি আসলেই সাজানো ছিল?
হোটেল ফিরে রূপু শান্ত থাকতে পারল না। শওকত চৌধুরী মেয়ের পাথরের মতো শান্ত অথচ ভেতরের ছটফটানি দেখে কপালে হাত রাখলেন। রূপু বাবার হাতটা ধরে শুধু বলল, “বাবা, সায়েম বলল ও নাকি বাচ্চার ব্যাপারে কিচ্ছু জানে না!”

মেয়ের কথা শুনে শওকত চৌধুরীর মুখে তেতো হাসি ফুটে উঠল। তিনি রূপুর মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “ও কীভাবে জানবে রে মা? তোকে ওই অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যুর মুখে ফেলে রেখে যে লোক নিজের আখের গোছাতে লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল, সে বাচ্চার খবর রাখার সময় পেল কখন? তোর খবরই তো আমি আমার ডাক্তার বন্ধুর মাধ্যমে জেনেছিলাম। সায়েম সেদিন ওখান থেকে পালানোর পর আর পেছনে ফিরে তাকানোরও প্রয়োজন মনে করেনি। ও নিজের চামড়া বাঁচাতে তোকে মিথ্যে নাটক দেখাচ্ছে, তুই ওই নরপিশাচের কথায় একদম কান দিস না।”

কঠোর সত্যটা শোনার পর রূপুর মনের ভেতরের ক্ষোভটা এক বুক হতাশায় রূপ নিল। সে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শূন্য চোখে চেয়ে রইল। কণ্ঠস্বর বুজে এলো। অস্ফুট গলায় বলল, “একটা মানুষ এতটা নিষ্ঠুর কীভাবে হয় বাবা? কেউ এত নিচে নামতে পারে? অন্তত একবার… একবার নিজের সন্তানটার কথাও মনে হলো না?”

“ওদের কাছে সবাই সমান মা। নিজের মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান আলাদা কিছুই না। এদের একমাত্র উপাস্য হলো টাকা আর ক্ষমতা। স্বার্থের সামনে এরা নিজের কলিজাটাও কেটে বিক্রি করে দিতে পারে।”

বাবার কথাগুলো রূপুর মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করল। অবাধ্য মনটা হুট করেই পাঁচ বছর পেছনের দিনগুলোতে ডানা মেলল। এমতাবস্থায় রূপুর স্পষ্ট মনে পড়ে গেল প্রেগনেন্সির সময় সায়েমের দেওয়া অজস্র সোনালী কথাগুলো। তখন প্রতিটাক্ষণ কত মায়াবী ছিল! সায়েম রূপুর পেটে কান পেতে বাচ্চার হার্টবিট শোনার চেষ্টা করত। কত শত খুনসুটি, কতশত পরিকল্পনা! সায়েম আহ্লাদী গলায় বলত, “রুপা, আমাদের যদি মেয়ে হয়, ওকে আমি পরীর মতো সাজিয়ে রাখব। বড় বড় চুল থাকবে, চুলে রোজ নতুন রিবন বেঁধে দেব।” আবার পরক্ষণেই নিজেই নিজের কথা কেড়ে নিয়ে বলত, “না না, ছেলে হলে আরও জমবে! বাপ-বেটা মিলে ছুটির দিনে ক্রিকেট খেলব, বিকেলে তোমাকে পেছনে বসিয়ে বাইক নিয়ে ঘুরতে বের হব।” কত রাত যে ওরা দুজনে জেগে জেগে অনাগত সন্তানের নাম ঠিক করত! বাচ্চার জন্য ছোট্ট ছোট্ট মোজা, ফ্রক, শার্ট আর খেলনা কেনার কত রঙিন আয়োজন! সেই দিনগুলোয় সায়েমের চোখের চাউনি, আকুলতা সব কি তবে মিথ্যে ছিল? একটা মানুষ দিনের পর দিন এতটা নিখুঁত অভিনয় কীভাবে করতে পারে? রূপু এতটাই বোকা, এতটাই অন্ধ ছিল যে সায়েমের ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কুৎসিত অমানুষটাকে বিন্দুমাত্র চিনতে পারল না? ভাবতে ভাবতে রূপুর চোখের কোণটা আবারও ভিজে উঠল। তবে এই অশ্রু কষ্টের নয়, এ নিজের অতীতের বোকামির প্রতি তীব্র ধিক্কার!

এরই মধ্যে রূপুর জমা দেওয়া ডকুমেন্টস আর ফাইলের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় থানা থেকে রূপাঞ্জনাকে জরুরি তলব করা হলো। সায়েম যে বড় একটা চক্রের সাথে জড়িত এবং ফ্রড করছে সেই বিষয়ে প্রাথমিক বয়ান ও প্রমাণের সত্যতা যাচাইয়ের জন্যই পুলিশ ডেকে পাঠিয়েছে। রূপু নিজে থানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলো। ও জীবনের বিষাক্ত অধ্যায়ের মানুষদের মুখোমুখি আর নতুন করে হতে চায় না। বাবাকে বলল, “বাবা, আমি থানায় যাব না। আইনি যা কিছু করার, পুলিশের সাথে যা যা কথা বলার সব তুমি গিয়ে হ্যান্ডেল করো।”

শওকত চৌধুরী মেয়ের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানালেন। রূপুর কাছ থেকে ওর আর সায়েমের বিয়ের কাগজ, রূপুর প্রেগনেন্সির সময়কার হাসপাতালের যাবতীয় রিপোর্ট এবং প্রেসক্রিপশনের ফাইলগুলো নিজের জিম্মায় নিলেন। এগুলোই সায়েমের আসল পরিচয় এবং প্রতারণার আইনি প্রমাণ। বিকেলের দিকে শওকত চৌধুরী থানার ওসির রুমে বসলেন। টেবিলের ওপর একে একে সাজিয়ে দিলেন রূপুর দেওয়া কাগজপত্রগুলো। ওসি সাহেব ফাইলগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “চৌধুরী সাহেব, আপনার মেয়ের দেওয়া আগের ফাইলটাতেই সায়েমের ভুয়া পাসপোর্ট আর স্মাগলিং গ্যাংয়ের সাথে কানেকশনের যথেষ্ট প্রমাণ আমরা পেয়েছি। আর বিয়ের পেপারস, প্রেগনেন্সির রিপোর্টগুলো সায়েমের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও নারীনির্যাতন-এর মামলাটাকে আরও একশ ভাগ নিরেট করে দিল। প্রভাবশালী এমপির ছেলে হলেও, এত অল-রাউন্ড প্রমাণ থাকার দরুন ওপরের মহলেরও ওনাকে বাঁচানোর কোনো সুযোগ নেই।”

শওকত চৌধুরী চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালেন। ওসির দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “আমি শুধু আমার মেয়ের জীবনের জাস্টিস চাই, অফিসার। ও যেন আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি পায়। বাকি সমস্ত ফর্মালিটি আমার আইনজীবী এসে পূরণ করবেন।”
থানা থেকে বেরিয়ে শওকত চৌধুরী আকাশের দিকে তাকালেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওনার মনে হলো, কক্সবাজারের নোনা বাতাস আজ রূপুর জীবনের একটা বড় কলঙ্ক ধুয়েমুছে সাফ করে দিল। এবার মেয়েটাকে নিয়ে শান্ত নীড়ে ফিরে যাওয়ার পালা। মেয়েকে নতুন করে বাঁচতে শেখাতে হবে!
.
বাপের বিয়ে নিয়ে মেয়ের উচ্ছ্বাসের যেন শেষ নেই! দাদুর সাথে কোমর বেঁধে আদা জল খেয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। সাধারণত একটা মেয়ের বিয়ে নিয়ে বাড়ির সবার লাফালাফি করা সাজে, কিন্তু এই পরিবারে পুরো উল্টো কাহিনী শুরু হয়েছে। হিয়া সারাক্ষণ আধো-আধো গলায় ‘নতুন আম্মু’ আর ‘নতুন বল খেলার সাথী’র গল্প করে বাড়ি মাথায় তুলছে।
আজ সন্ধ্যায় ইয়াজিদ অফিস থেকে ফিরতেই নাজমা বেগম ড্রয়িংরুমে ছেলের পথ আগলে দাঁড়ালেন। ওনার হাতে একটা চমৎকার মেয়ের ছবি। ছবিটা ইয়াজিদের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত উৎফুল্ল গলায় বললেন, “তোর মেয়ে এই মেয়েটাকে পছন্দ করেছে রে! আজকে ছবি দেখানোর পর থেকেই ‘আম্মু আম্মু’ করে নাচছে। আগামীকালই তুই গিয়ে মেয়ের সাথে কথাবার্তা বলে আয়। তারপরের সপ্তাহেই আমরা বিয়ের দিন-তারিখ একদম পাকা করে ফেলব।”

মায়ের মুখ থেকে কথাটা শোনামাত্রই ইয়াজিদ অবশ হয়ে গেল। ‘বিয়ে’ কী বিভীষিকাময় শব্দ! অথচ একটা সময়, বছর পাঁচেক আগে এই শব্দটা তার জীবনে কতটা আনন্দের, কতটা রঙিন ছিল। তানিয়াকে ঘরে তোলার দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও বুকটা কেঁপে ওঠে।
নাজমা বেগম ছবি এবং বায়োডাটা টেবিলের ওপর রেখে ভেতরের ঘরে চলে গেলেন, কিন্তু ইয়াজিদের মনের ভেতর তীব্র অপরাধবোধের ঝড় উঠেছে। সে যদি আবার বিয়ে করে, তবে তানিয়ার কী হবে? তানিয়াকে দেওয়া সারাজীবন পাশে থাকার ওয়াদাগুলোর কী হবে? তানিয়া কি ইয়াজিদকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে? তানিয়ার স্মৃতিগুলোকে এভাবে অন্য কারো হাতে সঁপে দিতে তার বিবেক যে বারবার ধিক্কার দিচ্ছে! কিন্তু ওপাশে হিয়ার ব্যান্ডেজ করা মিষ্টি মুখের সেই চওড়া হাসিটার দিকে তাকালে ইয়াজিদের আর ওজর-আপত্তি টেকো না। চরম মানসিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ইয়াজিদ শূন্য দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে চেয়ে রইল।

পরদিন বিকেলে নাজমা বেগম আর ইসরাতের জোরাজুরিতে ইয়াজিদকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেয়েপক্ষের সাথে অভিজাত রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসতে হলো। মেয়েটির নাম ফারহানা। বেশ আধুনিক, সচ্ছল পরিবারের মেয়ে। কিন্তু ফারহানাকে প্রথম দেখাতেই ইয়াজিদের মনের ভেতর কোথাও একটা খটকা লাগল। নাজমা বেগম আর ফারহানার মা একটু দূরে অন্য একটা টেবিলে গিয়ে বসলেন, যাতে ওরা দুজন নিজেদের মধ্যে খোলামেলা কথা বলতে পারে। ফারহানা প্রথমে শুরু করল, “হাই আই অ্যাম ফারহানা। আপনার ব্যাপারে আন্টি আর ইসরাতের কাছে টুকটাক শুনেছি। ডিরেক্টলি একটা কথা বলি? আপনার অতীত নিয়ে আমার কোনো অবজেকশন নেই। দিস ইজ ২০২৬, সো একটা মানুষের পাস্ট থাকতেই পারে। বাট আমার কিছু নিজস্ব কন্ডিশনস আছে।”

“জি বলুন, কী কন্ডিশন?”

ফারহানা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, “দেখুন, আমি একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বেশ ভালো পোস্টে আছি। আমার ক্যারিয়ারের গ্রাফটা এখন ওপরের দিকে। বিয়ের পরও আমি ফুল-টাইম জব কন্টিনিউ করব। সো, ঘরের খুঁটিনাটি কাজ বা রান্নাবান্নার দায়িত্ব আমি নিতে পারব না। ওটার জন্য ফুল-টাইম মেইড রাখতে হবে।”

“সেটা কোনো সমস্যা নয় ফারহানা। আমার বাসায় অলরেডি কাজের মানুষ আছে, আর আমার মা-ও আছেন। কিন্তু আমার আসল চিন্তা হিয়াকে নিয়ে। আপনি তো জানেন ওর বয়স মাত্র চার বছর।”

হিয়ার নামটা আসতেই ফারহানার মুখের চওড়া হাসিটা কেমন ফিকে হয়ে গেল। গলার সুরটা বদলে বলল, “হুম, আন্টি বলেছেন। দেখুন, আমি বাচ্চাদের পছন্দ করি না তা নয়। বাট টু বি অনেস্ট, একটা চার বছরের বাচ্চার রেসপন্সিবিলিটি নেওয়া বেশ টাফ। ওর পেছনে সারাক্ষণ টাইম দেওয়া, ওর মুড সুইং হ্যান্ডেল করা; ঝামেলার। আমার মনে হয়, একটা বাচ্চার পেছনে সারাদিন মায়াকান্না আর সময় নষ্ট করার চেয়ে নিজের ক্যারিয়ারে আর লাইফস্টাইলে ফোকাস করাটা অনেক বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। এই যুগে এসে ঘরের কোণায় বাচ্চা সামলানোকে জীবনের সব ভাবাটাই এক ধরণের বোকামি। আই হোপ আপনি আমার প্র্যাক্টিক্যাল দিকটা বুঝবেন।”

ফারহানার কথাগুলো শোনামাত্রই ইয়াজিদের ভেতরটা রি রি করে উঠল। সে ফারহানার চোখের দিকে তাকাল। ফারহানার সুন্দর, পরিপাটি করে সাজানো মুখে আত্মবিশ্বাস আছে, আভিজাত্য আছে; কিন্তু সেখানে মায়া নেই। একটা মাতৃহীন বাচ্চার জন্য যে কোমল, উষ্ণ মাতৃত্বের ছায়া প্রয়োজন; তার একটা কণাও এই নারীর মধ্যে নেই। হিয়াকে নিজের সন্তান ভাবা তো দূর, ফারহানা হিয়াকে সাজানো ক্যারিয়ার আর জীবনের পথে ‘বাড়তি দায়িত্ব’ হিসেবে দেখছে।
ইয়াজিদের চোখের সামনে ভেসে উঠল হিয়ার রক্তাক্ত কপাল আর আধো-আধো গলায় বলা, “পাপা অন্ধকার… তোমাতে পাচ্ছিলাম না।”

সে কলিজার টুকরোকে অবহেলার মধ্যে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তানিয়ার স্মৃতিকে বিসর্জন দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়নি। ইয়াজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফির কাপটা টেবিলের ওপর রাখল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভদ্র হিমশীতল গলায় বলল, “আমি আপনার প্র্যাক্টিক্যাল দিকটা খুব ভালোভাবেই বুঝেছি ফারহানা। ধন্যবাদ আপনার স্পষ্টবাদিতার জন্য।”
দমবন্ধ করা মিটিংটা শেষ করে রেস্তোরাঁ থেকে বের হতেই ইয়াজিদের চারপাশের বাতাসটা আচমকা বড্ড ভারী হয়ে গেল। সে মাকে, হিয়াকে আর ইসরাতকে গাড়ি তুলে দিয়ে বলল, একটা জরুরি কাজ আছে। সে পরে ফিরবে।
চার বছর পর আজ আবারও ইয়াজিদ সেই পুরোনো, বাউন্ডুলে জীবনে ফিরে গেল; চার বছর আগে তানিয়াকে হারানোর পর সে যেভাবে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। মনের ভেতরের জমাট বাঁধা তীব্র হাহাকার আর শূন্যতা ঢাকতে সে আজ কোনো গন্তব্য ছাড়াই হাঁটতে লাগল। তার ভেতরের বিচক্ষণতা এই দিকবিদিকশূন্য বাউন্ডুলেপনার কাছে বড্ড বেমানান লাগছিল।
বিকেলের আলো ফুরিয়ে যখন শহরের বুকে নিয়ন বাতিগুলো জ্বলে উঠল, ইয়াজিদ তখনো হেঁটে চলেছে। কানে ফারহানার তাচ্ছিল্যভরা সুর বাজছে, “বাচ্চার পেছনে সারাদিন মায়াকান্না আর সময় নষ্ট…”

হিয়া পাখির জন্য এই নিষ্ঠুর শহরে বুঝি খাঁটি মায়ার অবশিষ্ট নেই। তানিয়া ছাড়া এই পৃথিবীতে মেয়ের কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতো দ্বিতীয় কোনো হাত কি তবে আর কখনোই পাওয়া যাবে না? হাঁটতে হাঁটতে ইয়াজিদ কখন যে প্রগতি সরণির ব্যস্ত মেইন রাস্তার একদম মাঝবরাবর চলে এসেছে, নিজেরও খেয়াল ছিল না। অবাধ্য মনটা তানিয়ার স্মৃতি আর হিয়ার রক্তাক্ত কপালের মাঝে দুলছিল, চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণ শূন্য।
“এই যে ভাই! সরুন! সরুন বলছি…” হঠাৎ তীব্র বাসের হাইড্রোলিক হর্নের কানফাটানো আওয়াজ আর চাকার কর্কশ ব্রেকের শব্দে ইয়াজিদের ঘোর ভাঙল। তার একদম গায়ের ওপর এসে পড়েছে একটা চলন্ত মিনিবাস! বাসের হেডলাইটের চড়া আলোটা চোখের ওপর এসে পড়তেই সে জমে পাথর হয়ে গেল। পা দুটো নাড়ানোর শক্তিটুকুও ছিল না। শেষ মুহূর্তে, পেছন থেকে এক পথচারী তাকে ঝটকা মেরে ফুটপাতের দিকে টেনে নিল। এক ইঞ্চির দূরত্বের মোড় নিয়ে মিনিবাসটা তীব্র গতিতে ধোঁয়া উড়িয়ে চলে গেল। লোকটা বলল, “এই মিয়া! মরতে আইছেন নাকি রাস্তায়?”

ঝাঁকুনিটা এত জোরে ছিল যে ইয়াজিদ ফুটপাতের ওপর ধপ করে বসে পড়ল। কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। তার হন্তদন্ত হয়ে যাওয়া দশা দেখে আশেপাশে কয়েকজন অচেনা মানুষ এসে ভিড় জমাল। কেউ পানি এগিয়ে দিল, কেউ আবার অসতর্কতার জন্য কড়া করে দুটো ধমক দিল। ইয়াজিদ পানির বোতলটা নিল, কিন্তু মুখে তুলল না। শূন্য দৃষ্টিতে চলে যাওয়া বাসটার কালো ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তানিয়া চলে যাওয়ার পর নিজের জীবনের কোনো মূল্য হয়তো তার কাছে নেই, কিন্তু হিয়া পাখির জন্য তাকে যেকোনো মূল্যে বেঁচে থাকতেই হবে…
.
কক্সবাজারের রুদ্ধশ্বাস ঝড় শেষ করে রূপাঞ্জনা ঢাকায় ফিরেছে আজ দুদিন হলো। এখনো সে বাবার কাছেই, ওর পুরোনো ঘরটাতেই আছে। কিন্তু এই দুদিনে রূপুর ভেতরের চেনা মানুষটা কোথাও হারিয়ে গেছে। সে এখন কাঁদে না, কারো সাথে তর্কও করে না; শুধু এক বুক নিস্তব্ধতা নিয়ে বসে থাকে। সারাদিনের বেশিরভাগ সময় কাটে বাড়ির পেছনে মেয়ের কবরের পাশে। ঘাসের ওপর চুপচাপ একাকী বসে থাকে। কবরের নরম মাটির ওপর হাত বুলিয়ে কী যেন খোঁজার চেষ্টা করে! আর বাকিটা সময় নিজের ঘরে জানালার গ্রিল ধরে বাইরের শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। রূপুর প্রাণবন্ত ভাবটা, ঠোঁটের কোণের চপল হাসিটা আর অবশিষ্ট নেই। এতদিন সায়েমকে খুঁজে পাওয়ার সুপ্ত আশা বা জেদ ওকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এখন? হিসাব তো চুকে গেছে। সায়েম পাপের শাস্তি পেতে চলেছে। কিন্তু রূপুর জীবনের বিশাল শূন্যতা, এই যে চারপাশ জুড়ে থমকে থাকা একাকীত্ব; এখান থেকে ওনার সামনে এগোনোর কোনো রাস্তা জানা নেই। সে আকাশ খুঁজে না পেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়েছে।

মেয়ের জীবন্ত লাশের মতো অবস্থা দেখে শওকত চৌধুরীর বুকের ভেতরটা প্রতিনিয়ত চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তিনি দূর থেকে মেয়ের শূন্য চাউনি লক্ষ্য করেন। তিনি ভালো করেই জানেন, অতীতকে উপড়ে ফেললেও সেই শূন্যস্থানে যদি নতুন কিছু না আসে, তবে রূপু কোনোদিন এই বিষণ্ণতা থেকে বের হতে পারবে না। ওনার নিজের বয়স হয়েছে, আজীবন তো মেয়ের ছায়া হয়ে থাকতে পারবেন না।
শওকত চৌধুরী ইদানীং খুব গুরুত্ব দিয়ে একটা কথা ভাবছেন, মেয়েটার যদি আবার নতুন করে বিয়ে দেওয়া যায়? ওর জীবনের একাকীত্ব দূর করতে যদি কোনো ভালো, রুচিশীল মানুষের হাতে ওকে সঁপে দেওয়া যায়, তবে হয়তো রূপুটা আবার নতুন করে বাঁচতে শিখবে। মেয়েটা আদেও রাজি হবে? যে মেয়ে অন্ধ মোহ আর বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষত বুকে বয়ে বেড়িয়েছে, সে কি আবার কোনো নতুন মানুষকে নিজের জীবনে জায়গা দিতে পারবে?
.
.
.
চলবে…
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ১৯৬৩