Home "ধারাবাহিক গল্প বাউন্ডুলে ঘুড়ি বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০৯

বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০৯

0
153

#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️‍🩹 [পর্ব-০৯]
~ আফিয়া আফরিন

কেটে গেছে আরও বেশ কিছুদিন। এর মাঝে মা-বোনের জোরাজুরিতে ইয়াজিদকে আরও তিন-চারটে মেয়ের মুখোমুখি বসতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই নির্মম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে সে বাড়ি ফিরেছে। কোনো মেয়ের মাঝেই ন্যূনতম মাতৃত্বসুলভ ভাবটা খুঁজে পায়নি। কারো ভেতর মাতৃত্বের শাশ্বত আকাঙ্ক্ষাটুকুই নেই! ওরা হিয়াকে বাড়তি দায়িত্ব মনে করে আয়া বা বোর্ডিং স্কুলের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কড়া শর্ত জুড়ে দিয়েছে, আবার কেউ সরাসরিই বলেছে যে এই বয়সে বাচ্চার ঝামেলা পোহানো ওদের লাইফস্টাইলের সাথে যায় না। রাত গভীর হলে ইয়াজিদ ঘরের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। তার বিচক্ষণ মনটা চরম সত্যের সামনে এসে থমকে গেছে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে এভাবে জোর করে কাউকে ঘরে আনলে নিজের বা হিয়ার জীবনই নয়, ওই মেয়েটার জীবনটাও পুরোপুরি নষ্ট হবে। একটা মেয়ে যদি নিজের মন থেকে মাতৃত্বকে বরণ করতে না পারে, তবে সে নিজের অজ্ঞতা আর অনীহার কারণে হিয়াকে বোঝা ভাবতে শুরু করবে। দিনশেষে সে নিজেও কোনোদিন মাদারহুড ইনজয় করতে পারবে না, আর ওদিকে হিয়ার শৈশবটাও অবহেলায় পিষে মরবে।

ছেলের এই অনীহা আর একের পর এক মেয়ে রিজেক্ট করার ধরণ দেখে নাজমা বেগম পুরোপুরি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। ওনার এতদিনের লালিত আশা এবার ভাঙতে শুরু করেছে। তিনি ভালো করেই বুঝে গেছেন, এই ছেলেকে তারা আর কোনোদিনও সংসারে নিয়ে যেতে পারবেন না! আজ দুপুরে খাবার টেবিল থেকেই নাজমা বেগম ভেতরের ক্ষোভ উগরে দিলেন। ভাতের থালাটা একপাশে ঠেলে ছেলের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন, “আমি এই বুড়ো বয়সে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ওনাদের মেয়েদের ছবি এনে তোকে আর দেখাতে পারব না। তুই আসলে সবার মাঝে তানিয়াকে খুঁজিস, তাইনা? এই যে এতগুলো মেয়ে, কারো মাঝেই তোর মন সায় দিল না? তুই কি ভাবিস তানিয়াকে তুই ফিরে পাবি? যে চলে গেছে, সে তো মাটি হয়ে গেছে রে বাবা! ওর স্মৃতি আঁকড়ে ধরে তুই আর কতদিন ঘুরে বেড়াবি? নিজের জীবনটা তো শেষ করছিসই, সাথে আমার এতটুকু মেয়েটার ভবিষ্যৎও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছিস!”

ইয়াজিদ ধীর গলায় বলল, “মা, আমি কারও মাঝে তানিয়াকে খুঁজছি না। তানিয়া তানিয়ার জায়গায় অনন্য, ওর স্মৃতি কেউ মুছতে পারবে না। আমি শুধু হিয়ার জন্য একজন সত্যিকারের মা খুঁজছি। কিন্তু যে কটা মেয়ের সাথে আমি কথা বলেছি, ওদের কারও মধ্যে ওই মাতৃত্বসুলভ ভাবটা আমি পাইনি মা। আমি ওদের চোখে হিয়ার জন্য মায়া দেখতে পাচ্ছি না, একদমই পাচ্ছি না।”

ছেলের মুখে এমন অসহায় আকুতি শুনে নাজমা বেগমের কণ্ঠের কঠোরতা কমে এলো, তবে ওনার যুক্তির ধার কমল না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কীভাবে পাবি? তুই যাদের সাথে কথা বলছিস, ওরা কি কেউ আগে কোনোদিন মা হয়েছিল? একটা কুমারী মেয়ে হুট করে এসে মাতৃত্বের গভীর টান কোথা থেকে পাবে? তুই যদি ওদের সুযোগ না দিস, তবে কীভাবে হবে? ধীরে ধীরে সংসার করতে করতে, বাচ্চার সাথে মিশতে মিশতে সবটা শিখে যেত। তোকে তো একটু সময় দিতে হবে বাবা। হুট করে একটা নতুন মেয়ে নিজের এত বছরের চেনা জীবন, বাবা-মায়ের ঘর ছেড়ে এসে পরকে সহজে আপন করতে পারে? তুই তানিয়ার কথা বলিস, তানিয়া কি প্রথম দিনই এসে আমাদের আপন মনে করেছিল? ওরও তো সংসারটাকে নিজের করতে অনেকটা সময় লেগেছে। তুই যদি প্রথম দিনই সবার মধ্যে একজন পারফেক্ট মা-কে খুঁজতে যাস, তবে এই জন্মেও তুই আর ঘর বাঁধতে পারবি না।”

ইয়াজিদ তর্ক করল না। ভাতের থালাটা ওভাবেই পড়ে রইল। সে নিঃশব্দে টেবিল ছেড়ে উঠে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। তখনই দরজার ওপাশ থেকে একজোড়া ইয়া বড় জুতোর খটখট আওয়াজ তুলে হিয়া ঘরে ঢুকল। বাবার থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে হিয়া শার্টের কোণাটা টেনে ধরে ডাকল, “পাপা… পাপা! দেতো অতানে তে?”

ইয়াজিদ ভেতরের সবটুকু ক্লান্তি আড়াল করে মুখে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলল। বলল, “কে মা?”

“আতো আমাল সাথে।” হিয়া ইয়াজিদের হাতটা শক্ত করে ধরে টানতে টানতে ব্যালকনিতে নিয়ে গেল। পেছনের আমবাগানের দিকে ইশারা করে ফিসফিসিয়ে বলল, “দেতো… ভুউউউউউউত!”

ইয়াজিদ ভ্রু কুঁচকে ইশারা করা দিকে তাকিয়ে দেখল রূপাঞ্জনাকে। মেয়েটি ঘাসের ওপর গুটিসুটি মেরে ওনার মেয়ের কবরের পাশে চুপচাপ বসে আছে। দৃশ্যটা দেখে ইয়াজিদের মনের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল, তীব্র খারাপ লাগা তাকে গ্রাস করল। এই পৃথিবীতে কত মানুষের কত রকম দুঃখ! যার যন্ত্রণা, সে ছাড়া আর কেউ তা অনুভব করতে পারে না। ইদানীং প্রায়শই ইয়াজিদ ব্যালকনি থেকে মেয়েটাকে কবরের পাশে ওভাবে নিথর হয়ে বসে থাকতে দেখে।
এরই মধ্যে হিয়া চোখেমুখে ভয় ফুটিয়ে বলছিল, “পাপা, ভুত বসে আতে। তোমাকে তামড় দিবে কিন্তু!”

ইয়াজিদ হিয়াকে কোলে তুলে নিল। কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “মনে আছে মা, কয়েকদিন আগে শপিং করতে গিয়ে তুমি যে হারিয়ে গিয়েছিলে? তারপর তোমাকে একটা আন্টি বাড়িতে দিয়ে গেল, ওটা কিন্তু সেই আন্টি।”

হিয়া বড় বড় চোখ দুটো আরও গোল গোল করে চিবুকে হাত দিয়ে বলল, “ওওওওও… ভুত না ও?”

ইয়াজিদ হিয়ার গালে নাক ঘষে হেসে বলল, “না বাবা।”

হিয়া সাথে সাথে বাবার কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করতে করতে বলল, “আমি যাব অতানে।”

“গিয়ে কী করবে মা?”

হিয়া দুই হাত উঁচু করে আনন্দে হাততালি দিয়ে বলল, “তেলবো!”

“তাই? খেলবে?”

হিয়া মাথা নেড়ে সায় দিল। তারপর হুট করেই ওলটপালট ভাবনার জগতে ফিরে গিয়ে বলল, “জানো পাপা, অততে আমি তোথায় যাব?”

“কোথায় যাবে?”

হিয়া মুখে হাত চাপা দিয়ে দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল, “বলব না তোমাকে। আমি আর দাদু যাবো।”

“আমাকে নেবে না?”

“নাহ, তুমি পতা!”

ইয়াজিদ হাসল। হিয়া কোল থেকে ধপাস করে নেমে সারা ঘর জুড়ে ছোট ছোট পায়ে দৌড়াতে লাগল। দুই হাত ডানা মেলার মতো করে মেলে দিয়ে মহা আনন্দে চিৎকার করে বলতে লাগল, “ঘুলতে যাব… ঘুরতে যাব! পাপাকে নিব না। পাপা পতা!”

নাতনির চ্যাঁচামেচি শুনে ওপাশ থেকে নাজমা বেগম ড্রয়িংরুমের পর্দাটা সরিয়ে বললেন, “তোর পাপাকে একদম বলবিও না হিয়া যে আমরা কোথায় যাচ্ছি। ওই থাকুক মনের দুঃখ নিয়ে একলা একলা! ওকে আমাদের সাথে নেওয়ার কোনো দরকার নেই। আমি আর আমার নাতনি মিলে আজ জমিয়ে ঘুরতে যাব।”
হিয়া দাদুর আঁচলটা খপ করে ধরে বাবার দিকে তাকিয়ে জিভটা বের করে ভেঙচি কাটল। ইয়াজিদ ফের হাসল।
.
বিকেলের দিকে হিয়া আর নাজমা বেগম বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বের হচ্ছিলেন। বাড়ির সদর গেটটা পেরিয়ে রাস্তার দিকে পা বাড়াবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে দোতলার বারান্দা থেকে কেউ একজন মিষ্টি ডেকে উঠল, “হিয়া! এই হিয়া!”

হিয়া দাদুর হাত ধরে চট করে ওপরের দিকে তাকাল। রূপাঞ্জনা বারান্দার গ্রিল ধরে হিয়াকে উদ্দেশ্য করে হাত নেড়ে বলল, “এক মিনিট দাঁড়াও, আমি আসছি।”

রূপাঞ্জনা চটপট সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। হিয়ার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে ওর দুই গালে আলতো করে হাত রেখে বলল, “কেমন আছো সোনা? আমাকে চিনতে পেরেছ?”

হিয়া চোখ দুটো পিটপিট করে কয়েক সেকেন্ড রূপাঞ্জনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চট করে মাথা নেড়ে বলল, “নাহ!”

বাচ্চাটার এমন চটজলদি না শুনে রূপাঞ্জনা কৃত্রিম অভিমান করে মুখটা কালো করে ফেলল। ওদের কথোপকথনে নাজমা বেগম বেশ কৌতূহল বোধ করলেন। তিনি রূপাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে মা?”

রূপাঞ্জনা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিল। পাশাপাশি কয়েকদিন আগে শপিংমলে হিয়া কীভাবে হারিয়ে গিয়েছিল এবং সে খুঁজে পেয়ে কীভাবে এখানে পৌঁছে দিয়েছিল সবটা বিস্তারিত বলল।
সব শুনে নাজমা বেগমের চোখ দুটো বিস্ময়ে করে উঠল। তিনি নিজের কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন, “ওহ আচ্ছা! আমি ইয়াজিদের মুখে শুনেছিলাম তোমার কথা। কিন্তু তুমি যে শওকত ভাইয়ের মেয়ে আর এই বাড়িতেই থাকো, তা আমি একদমই জানতাম না! আসলে বয়স হয়েছে মা, ওইভাবে বাসা থেকে বের হওয়া হয় না। তাই আশেপাশের খোঁজখবরও রাখা হয় না।”

রূপাঞ্জনা মৃদু হেসে আবার হিয়ার দিকে তাকাল। হিয়াকে কোলে তুলে নিল। হিয়াও কেমন যেন জাদুমায়ার টানে ওর কোলে গুটিসুটি মেরে বসল। রূপাঞ্জনা জিজ্ঞেস করল, “তা এত সেজেগুজে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?”

হিয়া আধো-আধো গলায় দাদুর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “ফুপিল ভাতায়।”

রূপাঞ্জনা হেসে হিয়ার গালে চুমু খেল। হিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে নাজমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা। ঘুরে এসো। তবে আন্টি, আপনি কিন্তু সময় করে ওকে নিয়ে আমাদের বাসায় অবশ্যই আইসেন। হিয়া খুব কিউট, ওর সাথে গল্প করতে আমার ভালো লাগে। যদিও আমাদের পরিচয়টা মাত্র একদিনের।”

“নিশ্চয়ই আসব মা।” রূপাঞ্জনা হাত নেড়ে হিয়াকে বিদায় জানাল, আর হিয়াও দাদুর হাত ধরে যেতে যেতে পেছন ফিরে মিষ্টি হেসে টা-টা দিল।
.
হিয়া ইদানীং বড্ড বায়না করা শিখেছে। যখন যেটা চাইবে, তখন সেটা ওকে দিতেই হবে; কোনো ওজর-আপত্তি শুনতেই চায় না। এই ভরদুপুর বেলায় মেয়ে বায়না ধরেছে সে নাকি আইসক্রিম খাবে। দুপুরবেলা, তার ওপর আজ শুক্রবার; আশেপাশের সব দোকানপাট বন্ধ। তবুও ইয়াজিদ হিয়ার কান্নাকাটি আর জেদের কাছে হার মেনে পাশের চেনা দোকানদারকে ওনার বাসা থেকে ডেকে এনে রিকোয়েস্ট করে আইসক্রিম কিনে বাড়ির দিকে ফিরছিল। রোদের তীব্রতা মাড়িয়ে আইসক্রিমের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে ইয়াজিদ একটু তড়িঘড়ি করেই সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই অসতর্কতার কারণে শক্ত কিছুর সাথে বেশ জোরমতন একটা ধাক্কা খেল। ধাক্কাটা এত আচমকা ছিল যে হাত থেকে আইসক্রিমের প্যাকেটটা ছিটকে নিচে পড়ে গেল। সামনে তাকিয়ে দেখল, সেখানে রূপাঞ্জনা দাঁড়িয়ে আছে। ইদানীং রূপাঞ্জনা বাড়ির সামনের আর পেছনের গাছগুলোর খুব দেখভাল করছে, একাকীত্ব কাটানোর এটাই এখন বড় মাধ্যম। ও গাছগুলোর গোড়ায় মাটি আলগা করছিল। ইয়াজিদকে ওভাবে বড়সড় একটা গাছের সাথে ধাক্কা খেতে দেখে রূপাঞ্জনা বলে উঠল, “আরে আস্তে, আস্তে! এত তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছেন? গাছগুলো সব আছড়ে পড়ত তো এখন!”

ইয়াজিদ অত্যন্ত লজ্জিত বোধ করল। বলল, “আই অ্যাম রিয়ালি সরি।”

“ইটস ওকে।” বলে রূপাঞ্জনা নিচ থেকে আইসক্রিমের প্যাকেটটা তুলে নিয়ে ইয়াজিদের হাতের দিকে বাড়িয়ে দিল। সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল, “হিয়া কেমন আছে?”

ইয়াজিদ বলল, “হ্যাঁ, ভালো আছে।”

রূপাঞ্জনা মুখের উপর এসে পড়া চুলগুলো একপাশে সরিয়ে বলল, “আন্টি সেদিন আমাদের বাসায় আসছিল। ওনাকে বইলেন তো হিয়াকে নিয়ে আবার আসতে।”

ইয়াজিদ কিছু বলতে যাবে, তখনই ওপরের ব্যালকনি থেকে হিয়া বাবাকে দেখে চিল-চিৎকার জুড়ে দিল, “পাপা… পাপা! আইততিম তাবো!”

ইয়াজিদ ওপরে তাকিয়ে হাত নেড়ে আশ্বস্ত করে বলল, “এইতো মা, আসছি।”

ইয়াজিদ চলে যেতে নিচ্ছিল, সেই মুহূর্তে রূপাঞ্জনা পেছন থেকে কড়া গলায় ডেকে উঠল, “শুনুন! এই স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় মেয়েকে আইসক্রিম খাওয়াচ্ছেন কেন? ঠান্ডা লাগবে না?”

ইয়াজিদ থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে বলল, “খেতে চেয়েছে, তাই…”

রূপাঞ্জনার কড়া শাসনের সুর টেনে বলল, “বাচ্চারা তো কতকিছুই চাইবে, তাই বলে আপনি সেটাই এনে দেবেন? আবহাওয়া দেখেছেন বাইরের?”

ইয়াজিদ কিছুটা হতবুদ্ধির মতো হয়ে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ তো একদম পরিষ্কার, ঠিকঠাকই আছে! গতকাল অবশ্য একটু ঝুম বৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু আজকে তো বেশ কড়া রোদ উঠেছে। রূপাঞ্জনার অতি-সতর্কতা তার মাথায় ঢুকল না। সে আইসক্রিমের দিকে তাকিয়ে বলল, “আজকে তো রোদ আছে। আইসক্রিম খেলে কী এমন সমস্যা?”

“আচ্ছা পাগল তো আপনি! আক্কেল-বুদ্ধি একটুও নেই?”

একটা অচেনা মেয়ের মুখে নিজের আক্কেল-বুদ্ধি নিয়ে এমন খোঁচা শুনে ইয়াজিদ রাগে কটমট করে উঠল। সে অত্যন্ত ধারালো গলায় বলল, “আইসক্রিম খেতে আক্কেল-বুদ্ধি লাগে না, মুখ লাগে! আর সেটা আমার মেয়ের আছে।” কথাটা এক নিঃশ্বাসে বলেই ইয়াজিদ গটগট করে হেঁটে সিঁড়ির দিকে চলে গেল। রূপাঞ্জনা তার যাওয়ার দিকে চোখ বড় বড় করে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আশ্চর্য! ক্ষেপে গেল কেন?

হিয়া আর রূপাঞ্জনার মধ্যকার সম্পর্কটা ইদানীং সহজ সমীকরণে রূপ নিয়েছে। রক্তের টান নেই, পুরোনো চেনাজানা নেই; অথচ দুটো ভিন্ন বয়সী মানুষ একে অপরের মাঝে শান্তির আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। হিয়া দিনের বেশিরভাগ সময়ই দৌড়ে বাগানে চলে আসে। আর রূপুও জীবনের সব বিষণ্ণতা, সায়েমের দেওয়া গভীর ক্ষত ভুলে এই নিষ্পাপ শিশুটার সঙ্গ বড্ড উপভোগ করে। চারুর চলে যাওয়ার পর বুকের ভেতর যে মস্ত বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, হিয়া যেন ওর ছোট্ট ছোঁয়া দিয়ে সেখানে একটু একটু করে প্রলেপ লাগিয়ে দিচ্ছে।
আজও নাজমা বেগম ইসরাতের সাথে আধঘণ্টার জন্য একটু বাইরে বের হয়েছিলেন, টুকটাক কেনাকাটা করার জন্য। হিয়াকে নিয়ে যাওয়া যাবে না বলে বেশ নিশ্চিন্ত মনেই রূপুর কাছে রেখে গিয়েছিলেন। কেনাকাটা শেষ করে ওরা যখন বাড়ির সদর গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন, তখন দুপুরের রোদের তীব্রতা কমে বিকেল নামার আয়োজন চলছে। বাগানের কাছাকাছি আসতেই নাজমা বেগম আর ইসরাতের কান জুড়িয়ে গেল হিয়ার খিলখিল হাসির শব্দে। ওরা পা টিপে টিপে একটু এগিয়ে গিয়ে ঝোপের আড়াল থেকে যা দেখল, তাতে দুজনেরই চোখ জুড়িয়ে গেল।
বাগানের সবুজ ঘাসের ওপর রূপাঞ্জনা শাড়ির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে গুঁজে হিয়ার পেছনে পেছনে ছুটছে। হিয়ার গোলাপি ফ্রক, হিয়া দুই হাত ডানা মেলার মতো করে ছড়িয়ে সারা বাগান জুড়ে টলমল পায়ে দৌড়াচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে, “তুমি আমাকে দলতে পালবে না…”

রূপু মুখের ওপর এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলো ফু দিয়ে উড়িয়ে কৃত্রিম রাগের ভান করে বলল, “আচ্ছা দাঁড়াও!”

কথাটা বলেই রূপু দৌড়ে গিয়ে হিয়াকে পেছন থেকে খপ করে ধরে ফেলল। হিয়া আনন্দের ঝিলিক তুলে আরও জোরে হেসে উঠল। রূপু ওকে কোলের মধ্যে তুলে নিয়ে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। হিয়া ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে রূপুর গলা জড়িয়ে ধরল। রূপু হিয়ার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল, “পরীটা আজ এত দৌড়াচ্ছে কেন, হ্যাঁ? ডানা গজিয়েছে বুঝি?”

“হু, আমি পলী!” দুই অসম বয়সীর নিঃশর্ত ভালোবাসার মেলবন্ধন, ওদের বাঁধভাঙা ছোটাছুটির অসামান্য দৃশ্যটা দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন নাজমা বেগম আর ইসরাত। ওদের বুকের ভেতরটা পরম তৃপ্তিতে ভরে উঠল।

ইসরাত মায়ের খুশিতে ভরা চাউনি লক্ষ্য করল। তারপর মায়ের হাতের শপিং ব্যাগটা নিজের হাতে নিয়ে চোখের কোণ দিয়ে ইশারা করে ফিসফিসিয়ে বলল, “মা… এই মুহূর্তে আমি যা ভাবছি, তুমিও কি ঠিক তা-ই ভাবছো?”
.
.
.
চলবে…
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ১৯৬৮