#পর্ব_১
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
আজ আয়াত মোর্শেদের দ্বিতীয় বিয়ে। অথচ প্রথম বিয়ের কোনো স্মৃতিই আয়াতের কাছে স্পষ্ট নয়। আট বছর বয়সের সেই অস্পষ্ট স্মৃতিগুলো যেন আজ এক বিশালাকার পাহাড় হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়েছে। আয়াতের মনে হচ্ছে, তার জীবনের চেয়ে বড় পরিহাস আর কিছুই হতে পারে না। একজন স্ত্রীর স্বামী জীবিত থাকতেও কি করে সেই স্বামীরই আপন চাচাতো ভাইয়ের সাথে তার বিয়ে হতে পারে? সমাজ বা আইন যা-ই বলুক, আয়াতের অবচেতন মন বারবার বিদ্রোহ করছে। কিন্তু সেই বিদ্রোহ প্রকাশ করার মতো শক্তি তার নেই।
আয়াত আয়নার সামনে স্থির হয়ে বসে আছে। পরনে গাঢ় লাল বেনারসি, হাতে মেহেদির আলপনা। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে শেহজাদী, যার ভাইয়ের সাথে আজ আয়াতের বিয়ে। শেহজাদী মেঝো চাচা আনোয়ার চৌধুরীর মেয়ে হলেও সে যেন আজ আয়াতের একমাত্র আশ্রয়।
শেহজাদী আয়াতের কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
“আপু, এখনো সময় আছে। তুই দাদাজানকে গিয়ে একবার বল যে তুই এই বিয়েতে রাজি নোস। আমার ভাইয়া মানুষ ভালো না, তা তুইও জানিস। ও তোকে মানুষ হিসেবে নয়, নিজের জেদ হিসেবে পেতে চায়।”
আয়াত ম্লান হাসল। সেই হাসিতে কোনো প্রাণ নেই। সে শান্ত গলায় বলল,
“দাদাজানের কথার ওপরে কথা বলার সাহস এই বাড়ির কারো নেই, শেহজাদী। আর তা ছাড়া, যাকে স্বামী বলে জানতাম, সেই আরভান তো কোনোদিন ফিরে আসেনি। ১২ বছর হয়ে গেল, একটা খবরও নেয়নি। যার কোনো অস্তিত্ব নেই, তাকে আঁকড়ে ধরে আর কতদিন থাকা যায়? তার চেয়ে দাদাজান যা ভালো মনে করেছেন, তাই হোক। হয়তো এটাই আমার নিয়তি।”
আয়াতের কথা শেষ হতেই ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন নাজমা বেগম। তার চোখেমুখে এক ধরণের কুটিল তৃপ্তি। তিনি বাঁকা হেসে বললেন,
“আর কত সাজগোজ করবি? সময় হয়ে গেছে। শাহরিয়ার তো নিচতলায় উশখুশ করছে। আমার ছেলেটার কপালই মন্দ, বড় ভাইয়ের ফেলে যাওয়া এঁটো বউকে এখন আমায় ঘরে তুলতে হচ্ছে বংশের মান-মর্যাদা রক্ষার খাতিরে।কী জানি, ছেলেকে আমার কোনো জাদুটোনা বা তাবিজ করেছিস কি না! নইলে তোর মতো অলক্ষুণ মেয়েকে বিয়ে করার জন্য ও এমন পাগল কেন হবে?”
মায়ের তিক্ত কথায় শেহজাদী প্রতিবাদ করতে চাইল,কিন্তু আয়াত তাকে চোখের ইশারায় থামিয়ে দিল। আয়াত জানে, আজ তার ভাগ্যে যা লেখা আছে, তা খণ্ডানোর ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া কারো নেই। না হলে তাকে মাত্র বারো বছর বয়সে কেন এতিম হতে হবে?কেনই বা সেই ছোটবেলা থেকে এই শ্বশুরবাড়িতে বড় হতে হলো, যেখানে নিজের স্বামীর কোনো অস্তিত্বই নেই? এই যে বাড়িতে সে বড় হয়েছে, সেই বাড়ির মানুষগুলোই আজ তাকে পণ্য বানিয়ে ফেলেছে।
*******
নিচতলায় বৈঠকখানায় থমথমে পরিবেশ। আফজাল চৌধুরী সোফায় বসে তসবিহ গুনছেন। তার পাশে বসে আছে শাহরিয়ার। শাহরিয়ারের চোখে এক ধরণের উন্মাদনা। সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। তার জন্য এই বিয়েটা কেবল একটি সামাজিক বন্ধন নয়, বরং আয়াতকে নিজের কব্জায় নেওয়ার এক দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা। ছোটবেলা থেকেই যে আয়াতকে পাওয়ার জন্য সে মরিয়া ছিল,আজ তার সেই স্বপ্ন সফল হতে চলেছে।
ছোট চাচা আমজাদ চৌধুরী পায়চারি করছিলেন। তিনি অস্থির হয়ে বললেন,
“আব্বা, কাজি সাহেব তো চলে এসেছেন। কিন্তু আমার মন বলছে আমরা তাড়াহুড়ো করছি।আয়াতের কোনো মতামত না নিয়ে, ওর ওপর এভাবে একটা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে?তাছাড়া আরভানের দিক থেকে তো কোনো ডিভোর্স লেটার আসেনি। আইনত কি এই বিয়েটা বৈধ হবে?”
আফজাল চৌধুরী তসবিহ থামিয়ে গর্জে উঠলেন,
“চুপ কর আমজাদ! আরভান মরল না বাঁচল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যে ছেলে তার বাবার মতো রক্ত ধোঁকা দিয়ে বিদেশের মাটিতে পড়ে থাকে,একটা বারও পরিবারের খোঁজ নেয় না।তাকে আমি নাতি বলে স্বীকার করি না। মনসুর আলীকে আমি কথা দিয়েছিলাম তার নাতনিকে আমি এই বাড়ির বউ করব। আরভান যখন সেই মর্যাদা রাখেনি, তখন শাহরিয়ারই এই দায়িত্ব নেবে। ”
আমজাদ চৌধুরী দমে না গিয়ে বললেন, “আব্বা, আপনি ভুলে যাচ্ছেন তাদের ছোটবেলায় বিয়ে হলেও রেজিস্টি করা হয়েছিলো। যা আয়াতের বয়স আঠারো হওয়া মাত্রই আইনি ভিত্তি পেয়েছে। আয়াত এখন বিশ বছরের যুবতী, তার মানে তাদের বিয়েটা শুধু কালেমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সেটা পূর্ণাঙ্গ আইনি বিয়ে। আরভানকে ছাড়া এই বিয়েটা জায়েজ হবে না।”
আফজাল চৌধুরী তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, “আইনের কথা আমাকে শিখিও না। যে স্বামী বারো বছর নিখোঁজ, তার কোনো অধিকার নেই। তাছাড়া আঠারো বছর পার হওয়ার পর আয়াতের সাথে আরভানের বিয়েটা যে অটোমেটিক রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে, সেটা ভাঙার জন্য আরভানকে তো আসতে হবে। সে যখন আসেনি, তখন আমি ধরে নিচ্ছি সে এই সম্পর্ক মানে না। কাজি সাহেব, আপনি কাজ শুরু করুন।”
আনোয়ার চৌধুরী টিপ্পনী কেটে বললেন, “ভাইজান, স্বামী সে হয় যে পাশে থাকে। যে বারো বছর উধাও, কখনো স্ত্রীর খোঁজ নেয়নি তার আবার কিসের অধিকার?”
আমজাদ চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে পড়লেন। তার হাতে কিছুই নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে কাজি সাহেব খাতা খুলে বসলেন।
শাহরিয়ারের বাবা আনোয়ার চৌধুরী তাড়া দিয়ে বললেন,
“কাজি সাহেব, শুরু করুন। শুভ সময় যাওয়ার আগেই কাজটা সেরে ফেলি।”
উপর থেকে আয়াতকে নিয়ে আসার তোড়জোড় চলছে। ছোট চাচি পারভীন সুলতানা আয়াতের হাত ধরে নিচে নামিয়ে আনছেন। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আয়াতের পা কাঁপছিল। তার মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই ছোট্টবেলার কথা। দাদাশশুর বলেছিলেন তার দাদিশাশুরি জাহানারা বেগম যখন অসুস্থ বিছানায় শুয়ে তার আর আরভানের হাত এক করে দিয়েছিলেন।আরভান তখন ১৭ বছরের কিশোর ছিল আর সে মাত্র ৮ বছরের এক চঞ্চলা বালিকা। বিয়ের কয়েকদিন পরেই আরভানের বাবা তাকে নিয়ে বিদেশে চলে যায়। সেটাই ছিল তাদের শেষ দেখা। এরপর তারা কোনোদিন ফোন করেনি, কোনো চিঠিও দেয়নি। অথচ সেই মানুষটার নামেই আয়াত নিজের সতীত্ব আর ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছিল এতকাল।
বৈঠকখানায় আয়াতকে বসানো হলো। কাজি সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,
“বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। আয়াত মোর্শেদ, পিতা মৃত ইমতিয়াজ মোর্শেদ… আপনাকে দুই লক্ষ টাকা দেনমোহরে শাহরিয়ার চৌধুরীর সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি। আপনি কি রাজি?”
পুরো ঘরে পিনপতন নীরবতা। আফজাল চৌধুরী আয়াতের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। বেনারসির ভারী কাজের আড়ালে আয়াতের ছোট্ট শরীরটা অনবরত কাঁপছে; সেই কম্পন আর তার নুয়ে পড়া ভঙ্গি দেখে আফজাল চৌধুরী স্পষ্ট বুঝতে পারছেন মেয়েটা শব্দহীনভাবে কাঁদছে। অথচ তার এই অসহায়ত্ব দেখে শাহরিয়ারের চোখে খেলে যাচ্ছে এক ধরণের পৈশাচিক আনন্দ। আয়াত মাথা নিচু করে পাথর হয়ে বসে আছে। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। যাকে দীর্ঘ বারো বছর ধরে মনে-প্রাণে স্বামী হিসেবে মেনে এসেছে, আজ তাকে মন থেকে এক নিমেষে মুছে ফেলে অন্য কারো নাম নেওয়া কি এতোই সহজ?ছোট চাচি পারভীন সুলতানা আয়াতের হাত ধরে সামান্য চাপ দিলেন, ইশারা করলেন ‘হ্যাঁ’ বলতে।
আয়াত যখনই কাঁপা ঠোঁটে ‘কবুল’ বলতে যাবে, ঠিক তখনই বাড়ির বাইরে থেকে একটি গাড়ির টায়ার ঘষার বিকট শব্দ শোনা গেল। গাড়ির শব্দটা এতটাই তীব্র ছিল যে ঘরের সবাই চমকে উঠল। আমজাদ চৌধুরী জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর চেষ্টা করলেন। গ্রামের এই নির্জন এলাকায় এত রাতে এমন দামী গাড়ির শব্দ হওয়া অকল্পনীয়।
কিন্তু বিস্ময়ের তখনো বাকি ছিল। যখন বাড়ির বৈঠকখানার বড় সদর দরজাটা হঠাৎ সশব্দে খুলে গেলো।বাইরের ঝোড়ো বাতাস আর হ্যালোজেন লাইটের তীব্র আলো একসাথে ঘরের ভেতর আছড়ে পড়ল। আফজাল চৌধুরী চশমা ঠিক করে দরজার দিকে তাকালেন। দরজার সামনে একটা দীর্ঘ ছায়া এসে পড়েছে। এক বলিষ্ঠ শরীরের দীর্ঘদেহী পুরুষ….
চলবে….
#পর্ব_২
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
বৈঠকখানার সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘদেহী পুরুষটির রাজকীয় উপস্থিতি দেখে ঘরের প্রতিটি মানুষ পাথরের মূর্তির মতো জমে গেল। বাইরের হাওয়ার ঝাপটা ঘরের ভেতরের গুমোট নিস্তব্ধতাকে এক লহমায় তছনছ করে দিচ্ছে। ব্লাক স্যুটে মোড়ানো সুঠাম দেহের সেই আগন্তুকের আভিজাত্য যেন পুরো ঘরকে এক নিমেষে ম্লান করে দিল। কালো শার্টের উপরের দুটো খোলা বোতামের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া উন্নত গ্রীবা আর নিখুঁতভাবে পেছনের দিকে টেনে দেওয়া চুল তাকে যেন এক দুর্ধর্ষ পৌরুষে ভূষিত করেছে। তার চোখের চাউনি খুবই তীক্ষ্ণ তবে তাতে মিশে আছে একধরনের উদাশীনতা।
তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক বিদেশি তরুণী। সোনালী চুল, নীল চোখ আর পরনে পশ্চিমা পোশাক। সে কিছুটা কৌতূহল আর কিছুটা বিরক্তি নিয়ে অদ্ভুত এই পরিবেশটা দেখে যাচ্ছে।
পুরো ঘরে পিনপতন নীরবতা। কাজি সাহেবের হাতের কলম থমকে গেছে। শাহরিয়ারের কপালে বিরক্তির রেখা স্পষ্ট, সে দাঁতে দাঁত চেপে আগন্তুককে দেখছে।
আফজল চৌধুরী কম্পিত হাতে চশমাটা ঠিক করলেন। তার ঝাপসা চোখের মণি দুটো চিকচিক করে উঠল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন,
“আ… আরশাদ? তু..তুমি কি আরশাদের ছেলে আমার আরভান দাদুভাই?”
আরভান ধীর পায়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপের শব্দ যেন এই বিশাল বাড়ির নিস্তব্ধতাকে চিরে দিচ্ছিল। আরভান হাসল, তবে সেই হাসিতে কোনো আবেগ নেই।
“আসসালামু আলাইকুম দাদাজান।”
সে সামনে এগিয়ে গিয়ে আফজল চৌধুরী দিকে হাত বারিয়ে দিয়ে হ্যান্ডসেট করতে চাইলো , কিন্তু আফজল চৌধুরী তাকে আর সুযোগ দিলেন না। তিনি দুহাতে আরভানকে জড়িয়ে ধরলেন। বারো বছরের জমাট বাঁধা অভিমান যেন এক মুহূর্তেই নাতির শরীরের উষ্ণতায় গলে জল হয়ে গেল।
“দাদাজান, আপনি কেমন আছেন?”
আরভানের কণ্ঠস্বর গম্ভীর এবং ভরাট। বাংলাটা সে ভুলে যায়নি, তবে বলার ভঙ্গিতে বিদেশি টান কিছুটা স্পষ্ট।
আফজল চৌধুরী নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
“আমি ভালো আছি। এখন তো ভীষণভাবে ভালবাসি। আমি জানতাম তুই আসবি। রক্ত কখনো বেইমানি করে না। তুই না এলে আমি মনসুরকে দেওয়া কথা রাখতে পারতাম না।”
শাহরিয়ার সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কর্কশ গলায় বলল,
“এই নাটকের মানে কী? দাদাজান, বিয়ের দেরি হয়ে যাচ্ছে । আর আপনি আরভান হোন আর যেই হোন আপনি যখন এসেছেন, তখন মেহমান হয়ে পাশে বসুন। আমার আর আয়াতের বিয়েটা শেষ হতে দিন।”
আরভান একবার শাহরিয়ার দিকে তাকলো তার নজর পড়লো চেয়ারে বসা একটা মেয়ের দিকে। এতক্ষণ সে আয়াতের দিকে তাকায়নি। এবার সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। লাল বেনারসিতে মোড়ানো একটি মেয়ে, যার মুখমণ্ডল লম্বা ঘোমটায় পুরোপুরি ঢাকা। সে মাথা নিচু করে মূর্তির মতো বসে আছে। আরভানের ভ্রু কুঁচকে গেল।
সে দাদাজানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“এখানে কী হচ্ছে দাদাজান? ”
আফজল চৌধুরী একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“আমরা ভুল করতে যাচ্ছিলাম দাদুভাই। রাগের মাথায় আমি তোর আমানত অন্যকে দিয়ে দিতে যাচ্ছিলাম। ভালো হয়েছে তুই ফিরে এসেছিস।”
আরভান অবাক হয়ে পালটা প্রশ্ন করল,
“আমার আমানত? মানে?”
আফজল চৌধুরী আয়াতের দিকে ইশারা করে বললেন,
“এই যে তোর স্ত্রী আয়াত। যার সাথে তোর ছোটবেলায় বিয়ে হয়েছিল। তুই তো ওর জন্যই এসেছিস, তাই না দাদুভাই?”
এক মুহূর্তের জন্য আরভানের মুখে এক ধরণের অবজ্ঞার হাসি ফুটে উঠল। সে পাশের বিদেশি মেয়েটিকে ইশারায় কাছে ডাকল। মেয়েটি আরভানের বাহু জাপটে ধরে দাঁড়াল। আরভান শান্ত গলায় বলল,
“ভুল বুঝছেন দাদাজান। আমি কোনো আমানত বা স্ত্রীর জন্য আসিনি। আমি এসেছি সেই পুতুল খেলা নামক সম্পর্কটা চিরতরে শেষ করতে। আই নিড আ ডিভোর্স।”
আরভান তার পাশের মেয়েটিকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল,
“শি ইজ জেসিকা, মাই ফিউন্সে। আমরা শীঘ্রই বিয়ে করবো। তাই আইনগতভাবে এই ভিত্তিহীন সম্পর্কটা মিটিয়ে নিতে এসেছি।”
কথাটা যেন ঘরে বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল। শাহরিয়ারের মুখে জয়ের হাসি ফুটল, অন্যদিকে আমজাদ চৌধুরী এবং পারভীন সুলতানা আশাহত হলেন। আফজল চৌধুরীর মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল। আফজল চৌধুরীর চোখের সামনে মুহূর্তেই এিশ বছর আগের সেই অভিশপ্ত দিনটি ভেসে উঠল। সেদিন তার বড় ছেলে আরশাদ ঠিক এভাবেই একজন বিদেশিনীকে পাশে নিয়ে দাম্ভিকতার সাথে দাঁড়িয়েছিল, চুরমার করে দিয়েছিল বাবার সব স্বপ্ন। আজ ইতিহাসের নিষ্ঠুর পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে নাতি আরভানও একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। আফজল চৌধুরীর মনে হলো, সময় যেন থমকে গিয়ে তাকে আবারও সেই পরাজয় আর অপমানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।যেখানে রক্তের টান হেরে যায় বিদেশের মোহে।
আনোয়ার চৌধুরী সুযোগ বুঝে টিপ্পনী কেটে বললেন,
“আব্বা, দেখলেন তো? আপনার নাতি কী রত্ন হয়ে ফিরেছে! ডিভোর্স যখন হবেই, তখন দেরি করে লাভ কী? শাহরিয়ার আর আয়াতের বিয়েটা এই মুহূর্তেই পড়িয়ে ফেলা হোক। আয়াত অন্তত একটা গতি পাবে।”
আফজল চৌধুরী গর্জে উঠলেন,
“চুপ করো আনোয়ার! এখানে কার বিয়ে হবে আর কার হবে না, সেই সিদ্ধান্ত আমি নেব।”
তিনি আরভানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি ডিভোর্স দিতে এসেছো না কি করতে এসেছো, তা আমি পরে দেখব। আপাতত রাত অনেক হয়েছে। তোমরা অনেক দূর থেকে এসেছো বিশ্রাম করো।”
তিনি শেহজাদীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “শেহজাদী, আরভান আর এই বিদেশি মেয়েটিকে আলাদা ঘরে নিয়ে যাও। ওদের থাকার ব্যবস্থা কর।আমজাদ, মেহমানদের বিদায় করে দাও। আজকের মতো আয়োজন এখানেই সমাপ্ত।”
শাহরিয়ার প্রতিবাদ করতে চাইল, “কিন্তু দাদাজান..”
আফজল চৌধুরী তার লাঠি দিয়ে মেঝেতে সজোরে আঘাত করে বললেন,
“আমার কথা কি কানে যায়নি? এই মুহূর্তে সবাই যার যার ঘরে যাও। আমার শরীর ভালো লাগছে না।” তিনি আয়াতের দিকে তাকিয়ে ম্লান স্বরে বললেন, “আয়াত দাদুমণি, আমার হাতটা ধর। আমাকে আমার ঘরে নিয়ে চল।”
এতক্ষণ পাথরের মতো বসে থাকা আয়াত ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সে ঘোমটাটা আরও একটু টেনে দিল যাতে কেউ তার চোখের জল দেখতে না পায়। সে আরভানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আরভান লক্ষ্য করল আয়াতের পরনের বেনারসির খসখস শব্দ আর এক অদ্ভুত আতরের সুগন্ধ। আরভানের ভ্রু কুঁচকে গেল। তার মনে ভাবনা এলো, এই আধুনিক যুগেও এমন ঘোমটা টানা সেকেলে মেয়ে এখনো আছে? সে বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিল।
আয়াত অত্যন্ত সাবধানে আফজল চৌধুরীকে ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। আরভান নিচে তাকিয়ে দেখল ছোট এক সাত বছরের বালক, আরিয়ান, অবাক হয়ে তার স্যুটের দিকে তাকিয়ে আছে। আরভান তাকে দেখে হালকা হাসল, কিন্তু তার মন পড়ে রইল সেই ঘোমটা দেওয়া মেয়েটির ওপর। কেন জানি না, মেয়েটির নীরবতা তাকে ভীষন অস্বস্তিতে ফেলছে।
****
আফজল চৌধুরীর শোবার ঘরে পা রাখা মাত্রই তিনি দরজাটা বন্ধ করতে বললেন। আয়াত দাদাজানকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে যখন চলে যেতে চাইল, তখন তিনি আয়াতের হাত ধরলেন।
আফজল চৌধুরী বললেন,
“আয়াত, ঘোমটাটা তোল দাদুমণি। আমার সামনে আর আড়াল রাখিস না।”
আয়াত ধীরে ধীরে ঘোমটা সরাল। তার চোখ দুটো কান্নায় টকটকে লাল হয়ে আছে, নাকের ডগা গোলাপের মতো লাল। কান্নার ভারে তার কণ্ঠস্বর বুঁজে এসেছে। সে নিচু গলায় বলল,
“দাদাজান, কেন আমাকে বারবার এমন অপমানের মুখে ফেলছেন? দয়া করে আমাকে নিয়ে এই নিষ্ঠুর খেলাটা বন্ধ করুন। উনি নিজের জীবনের জন্য অন্য কাউকে সঙ্গে করে এনেছেন—তাহলে আমি এখানে কীসের দাবিদার? আমার আর এই বাড়িতে কোনো অধিকার নেই। এবার আমাকে ফুপিজানের কাছে যেতে দিন। দয়া করে আবার নতুন করে বিয়ের নামে কোনো নাটক শুরু করবেন না। আমি শুধু একটু শান্তি চাই, দাদাজান।”
আফজল চৌধুরী জেদী গলায় বললেন,
“অধিকার কেউ দেয় না আয়াত, অধিকার কেড়ে নিতে হয়। ও বিদেশ বিভুঁইয়ে বড় হয়েছে, মায়ার বাঁধন ভুলে গেছে। কিন্তু তুই তো এ বাড়ির বউ। মনসুর আলীর নাতনি কি এত সহজেই হার মানবে? ও যখন এখানে এসেছে, তখন তোকে ও বউ হিসেবে মানবেই এটা আমার বিশ্বাস।”
আয়াত ম্লান হেসে বলল,
“উনি আমাকে পছন্দ করে না। তা তার কথায় স্পষ্ট দাদাজান।উপরন্তু, ওনার সাথে আসা ওই ওই ভিনদেশি মেয়েটিকে তো আপনি দেখেছেন।
কোথায় সে আর কোথায় আপনার আয়াত!তাছাড়া উনি ডিভোর্স পেপার সাথে করে নিয়ে এসেছেন।”
দাদাজান তার মাথায় হাত রেখে বললেন।
”পেপার নিয়ে এলেই সব শেষ হয়ে যায় না।ওই বিদেশি মেয়ের চাকচিক্য হয়তো ক্ষণিকের জন্য ওকে মোহাবিষ্ট করেছে, কিন্তু আত্মার টান সেখানে নেই। ও যতদিন এখানে আছে, তুই ওর কাছাকাছি থাকবি। ওর সেবা করবি, ওকে মনে করিয়ে দিবি যে এই মাটির টান আর তোর অধিকার কতটা প্রবল। তুই শুধু হার মানিস না দাদুমণি।”
আয়াত ভেজা চোখে দাদাজানের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। নিচু স্বরে বলল,
“দাদাজান, এসব করা মানে তো স্রেফ জোর করা। আর জোর করে আর যাই হোক, ভালোবাসা বা সংসার—কোনোটাই হয় না। আপনি কি বুঝতে পারছেন না, আপনি আমার কাছে এমন এক আবদার রাখছেন যা আমার জন্য চরম লজ্জার? যে পুরুষটি অন্য এক নারীকে পাশে নিয়ে দাঁড়িয়ে সগর্বে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেয়, তার সামনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া কি আমার পক্ষে সম্ভব? যার চোখে আমার জন্য কোনো সম্মান নেই, তার মনে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করা কি এক ধরণের নির্লজ্জতা নয় দাদাজান? দয়া করে আমার আত্মসম্মানটুকুকে এভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দেবেন না।”
আফজল চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়াতের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। তিনি বললেন,
“একটা সম্পর্ক ভেঙে ফেলা খুব সহজ রে দাদুমণি, কিন্তু সেই সম্পর্কের দায়ভার সারাজীবন বয়ে নিয়ে চলা ভীষণ কঠিন। তুই যাকে নির্লজ্জতা বলছিস, আমি তাকে বলছি নিজের অধিকারের লড়াই। এই শেষবার না হয় এই বুড়োটার অনুরোধটা রেখে দেখ। হয়তো জীবন তোর জন্য এমন কোনো সুন্দর মোড় অপেক্ষা করে রেখেছে, যা তুই কল্পনাও করতে পারছিস না। অন্ধকার না এলে যেমন ভোরের আলোর মূল্য বোঝা যায় না, তেমনি এই কষ্টের পরেই হয়তো তোর জন্য সুখের কোনো ফল্গুধারা অপেক্ষা করছে। বিশ্বাস রাখ দাদুমণি, আল্লাহর ইচ্ছার ওপর কোনো ইচ্ছা বড় নয়। হার মানার আগে শেষ চেষ্টাটুকু করতে দোষ কী?”
আয়াত আর কিছু বলল না। সে ভালো করেই জানে, এই অসম লড়াইয়ে জেতা প্রায় অসম্ভব। তবুও দাদাজানের করুণ আর্তি আর শেষ অনুরোধ সে ফেলতে পারল না। মাথা নিচু করে নিরবে সম্মতি জানিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
*****
আয়াত দাদুর ঘর থেকে বেরিয়ে অন্ধকার বারান্দা দিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। করিডোরের লাইটগুলো আধো-অন্ধকার। হঠাৎ পেছন থেকে একটি শক্তিশালী হাত তাকে হ্যাঁচকা টানে পাশের একটি অন্ধকার দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।
আয়াত চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু আগন্তুক তার একটি হাত দিয়ে আয়াতের মুখ সজোরে চেপে ধরল। ভয়ে আয়াতের হৃদপিণ্ড যেন গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তার সযত্নে করা খোঁপাটা আলগা হয়ে খুলে গেল, একরাশ অবাধ্য চুল মুহূর্তেই পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। আগন্তুক তার মুখের খুব কাছে নিজের মুখ নিয়ে এল। আয়াত অনুভব করল তার ঘাড়ের ওপর লোকটির তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে। আগন্তুক এক হাতে তার মুখ চেপে ধরে অন্য হাতে আয়াতের এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলের সুগন্ধ টেনে নিল এক লম্বা নিঃশ্বাসে।
আয়াতের শরীর থরথর করে কাঁপছে। অন্ধকারে মানুষটির চেহারা স্পষ্ট নয়, শুধু তার গায়ের কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ আর তার শক্তিশালী হাতের স্পর্শে আয়াতের দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে; যন্ত্রণায় সে নীল হয়ে যাচ্ছে।
#তাসনিম_রিয়া_খান
চলবে….

