#পর্ব_৩
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
অন্ধকার করিডোরে দেয়ালের সাথে পিষ্ট হয়ে আয়াত অনুভব করছিল যমদূতের উপস্থিতি। শাহরিয়ারের হাতের বাঁধন ক্রমশ শক্ত হচ্ছে, তার তপ্ত নিঃশ্বাস আয়াতের কানের লতিতে এসে আছড়ে পড়ছে। শাহরিয়ার চোখ বন্ধ করে এক গভীর ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করছিল,
“লড়িস না আয়াত… প্লিজ জানপাখি, লড়িস না। আজ রাতে তোর গায়ের এই গন্ধে আমার মাতাল হওয়ার কথা ছিল। তোর ওই লাল ঠোঁটের হাসি খুব কাছ থেকে দেখার কথা ছিল। কিন্তু ওই শালা আরভান এসে সব নষ্ট করে দিল।”
আয়াতের মুখ শাহরিয়ারের শক্ত তালুর নিচে নির্মমভাবে চাপা পড়ে আছে। সে গোঙাচ্ছে, নিশ্বাস নেওয়ার জন্য জানপাণে ছটফট করছে।কিন্তু আজ শাহরিয়ারের উন্মাদনা যেন সকল সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সে যখন পৈশাচিক লালসায় আয়াতের ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে আনল, ঠিক সেই মুহূর্তে করিডোরের অন্য প্রান্ত থেকে একটি গম্ভীর এবং বরফশীতল কণ্ঠস্বর অন্ধকার চিরে ভেসে এল।
”তোমাদের এই সস্তা রোমান্স শেষ হলে আমার জন্য এক কাপ কফি নিয়ে এসো। রাইট নাউ!”
কণ্ঠস্বরটি শুনেই শাহরিয়ারের শরীর শক্ত হয়ে গেল। সে ঝট করে আয়াতের মুখ থেকে হাত সরিয়ে পেছনে তাকাল। আরভান সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালের সাথে দুহাত ভাঁজ করে অবহেলার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে দেখছে তাদের। যেন তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এই দৃশ্যটি গভীর অবজ্ঞার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। তার চোখেমুখে কোনো ক্রোধ নেই, বরং এক ধরণের বিদ্রূপাত্মক ঘৃণা ফুটে উঠেছে।
আরভান তার কবজিতে থাকা ব্ল্যাক ডেটোনা রোলেক্স ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“ডোন্ট ওরি, আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ডিস্টার্ব ইওর প্রাইভেট মোমেন্ট। তবে রোমান্স করার জন্য তোমরা যে জায়গাটা বেছে নিয়েছ, তা বড্ড বেমানান।”
আরভান তার ঠান্ডা চোখ দুটো একবার আয়াতের ওপর বুলিয়ে নিল। আয়াত তখন হাপাচ্ছে, ফুসফুস ভরে অক্সিজেন নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সে ভয়ে নীল হয়ে তাকিয়ে আছে আরভানের দিকে। আরভান এক পলক তাকে দেখে নিয়ে নিরুত্তাপ গলায় বলল,
“বাট ইউ ক্যান কন্টিনিউ ইফ ইউ ওয়ান্ট।আই’ম নট জাজিং। যাইহোক, কফিটা যেন জলদি আমার রুমে পৌঁছায়। আই অ্যাম ওয়েটিং।”
কথাটা বলেই আরভান এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ আর হাঁটার ভঙ্গিতে এমন এক আভিজাত্য আর কর্তৃত্ব মিশে আছে, যেন এই বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণা তার আজ্ঞাবহ।
****
আয়াত দেয়ালের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে হাপানি রোগীর মতো হাঁপাচ্ছিল। বড় বড় নিশ্বাস নিতে নিতে সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আরভানের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মাথায় বারবার একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল—একটা মানুষ কতটা পাষাণ আর নিস্পৃহ হতে পারে? চোখের সামনে একটা মেয়েকে লাঞ্ছিত হতে দেখেও মানুষটা একবার জানতে চাইল না সে কোনো বিপদে পড়েছে কি না। উল্টো এমন কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত করল যেন আয়াত আর শাহরিয়ারের মধ্যে কোনো অনৈতিক ঘনিষ্ঠতা চলছে!
আয়াত দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে চাইল, কিন্তু শাহরিয়ার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পেছন থেকে তার হাত শক্ত করে মুচড়ে ধরল। তার চোখে তখন পৈশাচিক আক্রোশ। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কী রে? স্বামী সেবা করার জন্য জান ফেটে যাচ্ছে? ওই বিলেতি বড়লোকের স্টাইল দেখে খুব পছন্দ হয়ে গেল বুঝি? লাভ নেই আয়াত, কোনো লাভ নেই! তোর একমাত্র স্বামী হওয়ার যোগ্যতা শুধু আমারই আছে। তোর ওই তথাকথিত স্বামী তো তোকে ডিভোর্স দিতে এসেছে।তোকে ডিভোর্স দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নাচতে নাচতে তার ফিউন্সেকে নিয়ে চলে যাবে। সো, ডোন্ট বি সো এক্সাইটেড। নিজের ঘরে যা, কফি অন্য কেউ বানিয়ে দেবে। ওহ সরি, তোর স্টাইলিশ স্বামী কফি পাবে কোথায়?এ বাড়িতে তো কফি নিষিদ্ধ। ”
আয়াত ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। মুহূর্তের ব্যবধানে সে এক তীব্র আক্রোশে শাহরিয়ারের গালে একটা সপাটে চড় বসিয়ে দিল। সেই চড়ের শব্দে করিডোরের নীরবতা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
আয়াত ঘৃণাভরা চোখে তাকিয়ে বলল,
“আমাকে ছোঁয়ার সাহস হয় কীভাবে আপনার? বারবার নিজের সীমা লঙ্ঘন করবেন না শাহরিয়ার ভাইয়া। যদি আপনি মনে করে থাকেন আপনাদের বাড়িতে আশ্রিতা হয়ে আছি বলে আপনি যা খুশি তাই করবেন, তবে আপনি ভুল ভাবছেন। প্রথমবার বলে শুধু চড় দিয়ে ছেড়ে দিলাম, নেক্সট টাইম আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করলে ওই হাত আমি আস্ত রাখব না!”
শাহরিয়ার গালের ব্যথায় হাত বুলিয়ে বিকৃত হাসল। তার চোখে কামনার আগুন।
“তোর এই তেজটাই তো আমাকে পাগল করে দেয় জানপাখি। এটা আমাকে বারবার তোর নিষিদ্ধ চ্যুতির কাছে টেনে নিয়ে আসে।”
”খবরদার! ওইসব আজেবাজে নামে আমাকে একদম ডাকবেন না,”
আয়াত রাগে কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত পায়ে হাঁটা দিল।
শাহরিয়ার পেছন থেকে উচ্চস্বরে বলল,
“তোর এই চড় খেয়েও আমার মন্দ লাগলো না আয়াত, এ তো আমার কাছে মধুর মতো। তোর হাতের ছোঁয়া তো পাওয়া গেল। কিন্তু মনে রাখিস, তোর শেষ গতি আমিই। আমার এই হাতই তোকে একদিন পূর্ণ অধিকার দিয়ে ছুঁয়ে দেবে, সেদিন তুই আর পালাবার পথ পাবি না।”
শাহরিয়ারের নোংরা কথাগুলো আয়াতের কানে বিষ ঢেলে দিচ্ছিল। কিন্তু সে আর কোনো কথা না বলে সোজা নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পেছন থেকে আরভান আবারও করিডোরে ফিরে এল। তার গগনবিদারী চিৎকার পুরো বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হলো।
”ড্যাম ইট! কতক্ষণ ধরে বলছি কথাটা কি কারো কানে যায় না? আই সেড আই নিড কফি! ইজ এনিবডি লিসেনিং টু মি অর শুড আই মেক ইট ক্লিয়ার ইন অ্যানাদার ওয়ে?”
আরভানের বজ্রকণ্ঠে পুরো বাড়ি থরথর করে কেঁপে উঠল। ভয়ে আর আতঙ্কে আয়াত এক প্রকার ছুটে রান্নাঘরের দিকে দৌড় দিল। পেছনে শাহরিয়ার অন্ধকার করিডোরে দাঁড়িয়ে তার নখ কামড়াতে লাগল।
****
অন্যদিকে মেঝো চাচার ঘরে তখন অন্যরকম এক উত্তেজনা। আনোয়ার চৌধুরী ঘরের দরজা আটকে অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন। তার স্ত্রী নাজমা বেগম বিছানায় বসে আয়নার সামনে গয়না খুলছিলেন।
নাজমা বেগম বাঁকা হেসে বললেন,
“যাক বাবা, আপদ বিদায় হয়েছে। ওই মেয়ে আমার ছেলের বউ হয়নি, এতেই আমি খুশি। সারাক্ষণ কেমন মরা মানুষের মতো মুখ করে থাকে, দেখলেই পিত্তি জ্বলে যায়।”
আনোয়ার চৌধুরী ঝট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন,
“মুখ সামলে কথা বলো নাজমা! তুমি জানো না আয়াতকে হারানো মানে আমাদের কী পরিমাণ ক্ষতি? ওই মেয়ের বাবা-মা যে পরিমাণ সম্পত্তি আর ব্যাংক ব্যালেন্স ওর নামে রেখে গেছে, আজ যদি আমাদের শাহরিয়ারের সাথে ওর বিয়ে হতো, তবে আমরা আজ মোর্শেদের সম্পত্তির মালিক হতাম। আর এখন? সত্যিই আরভান ওকে ডিভোর্স দিবে কিনা কে জানে? আর দিয়ে দিলে ওই সম্পত্তি হয়তো ট্রাস্টে চলে যাবে বা আয়াত নিয়ে চলে যাবে। বুদ্ধিমতী হও নাজমা, ইমোশন দিয়ে চলে না।”
নাজমা বেগমের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সম্পত্তির কথা শুনে তার ভেতরটা জ্বলে উঠল। তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন,
“তাহলে এখন কী হবে? আরভান তো ডিভোর্স দিতে এসেছে। তাহলে শাহরিয়ার ওকে বিয়ে করলে সম্পত্তি তো আমাদেরই হবে, তাই না?”
আনোয়ার চৌধুরী চিন্তিত মুখে বললেন,
“সেই চেষ্টাই তো করছি। কিন্তু আরভান ছেলেটা সহজ নয়। ও যেভাবে এসেছে, তাতে পানি অনেক দূর গড়াবে বলে মনে হচ্ছে।”
****
আরভান তার গেস্ট রুমের সোফায় ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। জানালার বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার গ্রাম্য প্রকৃতি, মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে করিডোরের সেই দৃশ্যটা। বেনারসি পরা ওই মেয়েটা তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে ওভাবে ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
আরভান বিরক্তিভরে চোখ বন্ধ করে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে স্মৃতির অতল গহ্বর থেকে অস্পষ্ট এক শব্দ ভেসে এল। দীর্ঘ বারো বছর আগে; আট বছর বয়সী বাচ্চা মেয়ের কণ্ঠস্বর তার কানে প্রতিধ্বনিত হলো। বাচ্চা মেয়েটা কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করেছিল— ‘তুমি কি আমার নতুন বিদেশি বর?’
সেই পুরনো স্মৃতি মনে পড়তেই আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে ঝট করে চোখ খুলে ফেলল; দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠোর হয়ে উঠল। তার ঠোঁটে এক বাঁকা বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল।
“দিস টাইম আরশাদ চৌধুরী ওয়াজ রাইট। হি অলওয়েজ সেড দ্যাট দিস ম্যারেজ ওয়াজ জাস্ট আ ‘ডল ম্যারেজ’। বড়দের চাপিয়ে দেওয়া এক অর্থহীন শৃঙ্খল। দিস ভিলেজ গার্লস হ্যাভ নো ক্যারেক্টার। স্বামীর অবর্তমানে অন্য পুরুষের সাথে ফ্লার্ট করা এদের স্বভাব। ”
তার প্রচণ্ড ঘৃণা হচ্ছে। যদিও তার কিছুই আসে যায় না। সে এসেছে নিজের মুক্তি নিতে। তবুও কেন জানি দৃশ্যটা তাকে দংশন করছে। ফোন বের করে একটা মেসেজ টাইপ করতে যাবে, তখনই জেসিকা ঘরে ঢুকল।
জেসিকা হাসিমুখে আরভানের পাশে বসে তার বাহু জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখল।
“হেই আরভান, আর ইউ অলরাইট? ইউ লুক ডিস্টার্বড।”
জেসিকার গায়ের কড়া পারফিউমের গন্ধে আরভানের বিরক্তি যেন চরমে পৌঁছাল। সে ল্যাপটপটা সজোরে শব্দ করে বন্ধ করে দিল। তার শরীরের ভঙ্গি এতই কঠোর ছিল যে জেসিকা অপ্রস্তুত হয়ে তাকে ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে বসল।
জেসিকা কিছুক্ষণ আরভানের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“আমি করিডোরে দেখলাম ওই মেয়েটা আর সেই ছেলেটা… শাহরিয়ার মেবি? ওরা কি একে অপরকে ভালোবাসে? আই থিঙ্ক ইট’স নরমাল। যেহেতু তুমি ছিলে না, সো দে আর অবভিয়াসলি ক্লোজ টু ইচ আদার।”
আরভান শক্ত গলায় বলল, “আই ডোন্ট কেয়ার এবাউট দেয়ার রিলেশনশিপ। আই জাস্ট ওয়ান্ট মাই ফ্রিডম। বাট দ্যাট সিন ওয়াজ সো ডিসগাস্টিং।”
আরভানের কণ্ঠের এই তীব্রতা আর ক্রোধের আসল কারণ জেসিকা বুঝতে পারল না।যদিও আরভানের রাগের পেছনে কখনই কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে না, তবে এবারের অস্থিরতা যেন আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। জেসিকা তার রাগ কমাতে আরভানের গালের ওপর আলতো করে হাত রাখল এবং কোমল স্বরে বলল,
“রিলাক্স ডার্লিং! এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়ে নিজের মুড নষ্ট করো না।”
আরভান সাথে সাথে ঝটকা মেরে জেসিকার হাতটা ছুড়ে ফেলে দিল।। তার চোখের দৃষ্টি তখন আগুনের মতো জ্বলছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
“উইদাউট মাই পারমিশন হাউ ডেয়ার ইউ টাচ মি? গেট লস্ট ফ্রম মাই রুম—রাইট নাউ!”
জেসিকা স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে ভাঙা গলায় বলল, “আরভান, তুমি সবসময় আমার সাথে এমন রূঢ় ব্যবহার কেন করো? তাছাড়া কিছুদিন পরেই তো আমাদের …”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আরভানের সেই ভয়ংকর শীতল চাহনি জেসিকার বুক কাঁপিয়ে দিল। আরভান বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
“আমি নির্লজ্জ মেয়েদের একদম পছন্দ করি না, জাস্ট গেট লস্ট বিফোর আই লুজ মাই টেম্পার!”
জেসিকা অপমানে আর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
*****
কিছুক্ষণ পরেই দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। আরভান কবজির ঘড়িটার দিকে একবার তাকাল—রাত প্রায় একটা বাজে। সে গম্ভীর স্বরে বলল, “কাম ইন।”
আয়াত কাঁপাকাঁপা হাতে কফির মগ নিয়ে ভেতরে ঢুকল। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ। আরভানের তীক্ষ্ণ চাউনি আয়াতের হাতের দিকে স্থির হলো; ট্রে-র ওপর রাখা কাপটা থরথর করে কাঁপছে, যার মৃদু টুংটাং শব্দ এই নিস্তব্ধ ঘরে অস্বাভাবিকভাবে কানে বাজছে।
আরভান সোফা থেকে উঠে আয়াতের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার উপস্থিতির ভারে আয়াতের নিশ্বাস যেন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আরভান শীতল গলায় প্রশ্ন করল, “আই আস্কড ফর কফি, হোয়াই ডিড ইউ ব্রিং টি?”
আয়াত কোনোমতে অস্ফুট স্বরে বলল, “এ… বাড়িতে কফি রাখা নিষিদ্ধ।”
আরভান ভ্রু কুঁচকে ফেললো, “কেন?”
“দাদাজানের মতে কফি ভিনদেশি পানীয়, তাই এটি বাড়িতে আনা বারণ।”
আরভান এক পা এগিয়ে এল। আরভানের ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল।
“এত কাঁপছো কেন তুমি? একটু আগে করিডোরে তো তোমার মাঝে এই কম্পন দেখিনি! বাই দ্য ওয়ে, নাম কী তোমার?”
নিজে বিবাহিতা স্ত্রী হওয়ার পরেও নিজের স্বামীর মুখে এই প্রশ্ন শুনে আয়াতের আত্মসম্মানে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগল। দীর্ঘ এক যুগ ধরে যে মানুষটার নাম সে হৃদয়ে বহন করছে, অথচ সে তার নাম পর্যন্ত জানে না! অপমানে তার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গেলেও সে নিজেকে সামলে নিয়ে কম্পিত স্বরে বলল, “আ…য়া…ত। একটু আগে আপনি যা দেখেছেন, তা ভুল.. ..”
”শাট আপ!” আরভান গর্জে উঠল। “আরভান চৌধুরীর স্ত্রী পরিচয় দিয়ে মাঝরাতে পরপুরুষের সাথে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকাটা কি তোমার অভ্যেস?”
অপমানে আয়াতের ভেতরটা জ্বলে উঠল। সে অবদমিত ক্ষোভ নিয়ে পালটা জবাব দিল,
“আপনিও তো বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় আপনার অস্ট্রেলিয়ান ফিউন্সেকে নিয়ে ডিভোর্স দিতে এসেছেন; এটাও কি আপনার অভ্যেস?”
কথাটা বলে ফেললেও আয়াতের ভেতরে এক অদ্ভুত ভীতি কাজ করছিল। সে যদিও নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়েছে, কিন্তু অজানাল এক আশঙ্কায় সে মুখ তুলে লোকটার দিকে তাকানোর সাহস পেল না।আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো।
”কী বললে তুমি? আমার দিকে তাকিয়ে কথাটা আবার বলো! লুক অ্যাট মি। আমার দিকে তাকাও!”
আয়াত মাথা তুলল না। আরভান তার শক্তিশালী হাত বাড়িয়ে আয়াতের চিবুক ধরে জোর করে মুখটা ওপরে তুলল। আয়াতের জলভরা চোখ আর কান্নায় লাল হয়ে থাকা নাক দেখে আরভান ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ল করিডোরের সেই দৃশ্য।
সে তাচ্ছিল্যের সাথে বলল, ” কান্না কেন? তোমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে রোমান্সে বাধা দিয়েছি বলে? লিসেন টু মি ভেরি কেয়ারফুলি মিস আয়াত। আই ডোন্ট মাইন্ড ইউ হ্যাভিং অ্যান অ্যাফেয়ার। তুমি যার সাথে খুশি থাকো, আই জাস্ট ডোন্ট কেয়ার। কাল সকালে এই ডিভোর্স পেপারে তোমার সাইন চাই। এন্ড দেন ইউ আর ফ্রি টু ম্যারি ইয়োর লাভার শাহরিয়ার। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?”
আয়াতের ঠোঁট কাঁপছে। সে চিৎকার করে বলতে চাইল শাহরিয়ার তাকে জোর করছিল, সে পরিস্থিতির শিকার। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না; অপমানের পাহাড় তার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করে দিয়েছে। আরভান তার চিবুক ছেড়ে দিয়ে চরম ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল।
”চা-টা রাখো। এন্ড গেট আউট অফ মাই সাইট!”
আয়াত কাপটা টেবিলে রেখে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আরভানের প্রতিটি শব্দ তীরের মতো তার বুক চিরে দিচ্ছিল। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে সে কোনো জোরালো প্রতিবাদ করতে পারলো না। নিজের এই অদ্ভুত ব্যর্থতা তাকে আরও বেশি কুঁকড়ে দিচ্ছে।সে অন্ধকার বারান্দার এক কোণে স্তম্ভের আড়ালে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো। নিজের ভাগ্য আর এই মানুষটার নিষ্ঠুরতা – কোনটা বেশি ভয়াবহ তা সে জানে না।
#তাসনিম_রিয়া_খান
#পর্ব_৪
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
সকালবেলার রোদটা আজ বড্ড বেশি কড়া। ড্রয়িংরুমে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুরো বাড়িতে একটা চাপা আতঙ্ক আর উত্তেজনার রেশ এখনো কাটেনি। কারণটা বেশ রহস্যময়। কাল রাতে শাহরিয়ারকে কেউ একজন প্রায় মেরেই ফেলেছিল। তার ঘরে ঢুকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গলায় টেলিফোনের ল্যান্ডলাইনের তার পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করেছিল অজ্ঞাত কেউ।
শাহরিয়ারের মতো সুঠাম দেহের অধিকারী একজন পুরুষও সেই আক্রমণকারীর শক্তির সামনে খড়কুটোর মতো নুয়ে পড়েছিল।
শাহরিয়ারের দাবি অনুযায়ী,অন্ধকারের মাঝে সেই ঘাতকটি কোনো এক অশরীরী আত্মার মতো তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এবং ফিসফিস করে কিছু প্রলাপ বকেছিল। সেই কণ্ঠস্বর এতই অস্পষ্ট ছিল যে শাহরিয়ার কিছুই বুঝতে পারেনি। এই এলাকায় তার শত্রুর অভাব নেই, কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢুকে এভাবে আক্রমণ করার সাহস কার হতে পারে, তা নিয়ে মাঝরাত থেকে সকাল পর্যন্ত বাড়িতে হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটে গেছে। কিন্তু সেই আগন্তুক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ভেদ করে বাড়িতে কীভাবে ঢুকল আর কীভাবে উধাও হলো, তার কোনো হদিস মিলল না।
নাজমা বেগম পরম আদরে ছেলেকে গরম চা খাইয়ে দিচ্ছেন, যাতে গলার ব্যথার ক্ষতটা কিছুটা লাঘব হয়।শাহরিয়ার তার গলার সেই কালচে দাগ লুকাতে একটা চওড়া মাফলার পেঁচিয়ে রেখেছে। আর এসব দৃশ্য অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে দেখছে আরভান। সে সোফায় হেলান দিয়ে পা দুলাচ্ছে, তার বসার ভঙ্গিতে এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্য। তার মুখে কোনো ক্রোধের ছাপ নেই, বরং এক ধরণের শীতল শান্তি বিরাজ করছে। আরভানের ঠিক সামনে গম্ভীর মুখে বসে আছেন আফজাল চৌধুরী। তার তীক্ষ্ণ নজর আরভানের দিকে স্থির। তিনি যেন আরভানের শান্ত চোখের মণির ভেতরে লুকানো কোনো এক আগ্নেয়গিরিকে খুঁজে চলেছেন। দীর্ঘ ৩০ বছর পার হয়ে গেলেও নাতির অবয়বে তিনি যেন আরশাদকেই খুঁজে পাচ্ছেন। ঠিক এই উদ্ধত চাহনি আর অবজ্ঞাভরা ভঙ্গিই আরশাদকে একদিন এ বাড়ি থেকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানের টি-টেবিলে সাদা ধবধবে কয়েকটি কাগজ রাখা—ডিভোর্স পেপার। কাগজের কোণগুলো বাতাসের দোলায় সামান্য কাঁপছে, যেন ওগুলোও এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছেদের সাক্ষী হতে চাইছে না। আমজাদ চৌধুরী এবং আনোয়ার চৌধুরী দুপাশে বিমর্ষ মুখে বসে আছেন।নাজমা বেগম ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে আরভানের দিকে বিষাক্ত চোখে তাকাচ্ছেন, কিন্তু পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠছে।
শাহরিয়ার সিঁড়ির পাশের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বারবার ওপরের দিকে তাকাচ্ছে। তার অস্থিরতা স্পষ্ট। আয়াতকে ডাকা হয়েছে অনেকক্ষণ আগে, কিন্তু সে এখনো নামছে না।মেয়েটা নিশ্চয়ই ডং দেখিয়ে ওপরে বসে স্বামী বিয়োগের ভয়ে মরা কান্না কাঁদছে। শাহরিয়ারের ইচ্ছে করছে, এখনই গিয়ে মেয়েটাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে নিচে নিয়ে আসতে।
পারভীন সুলতানা এবং শেহজাদী ট্রে হাতে নাস্তা নিয়ে এলেন, কিন্তু পরিবেশের গাম্ভীর্যে কেউ হাত বাড়াল না। আফজাল চৌধুরী নাস্তার দিকে না তাকিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরভানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“কাল রাতে তুমি ঠিক কোথায় ছিলে আরভান?”
আরভান কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“কেন দাদাজান? অবভিয়াসলি আমি আমার রুমেই ছিলাম।”
আফজাল চৌধুরী রহস্যময় এক টুকরো হাসি হাসলেন, যা আরভান বিশেষ পাত্তা দিল না। এরপর আফজাল চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে আবারও প্রশ্ন করলেন,
“তোমার বাবা নিশ্চয়ই ভালো আছে আরভান? সে তো বাড়ির ঠিকানা ভুলে গেছে, মাটির টানও কি সে ভুলে গিয়েছে?”
আরভান জানালার বাইরে নিস্তেজ রোদের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“আপনি কিন্তু একবারও এলিনা চৌধুরীর কথা জিজ্ঞেস করলেন না দাদাজান। তবে আপনার ছেলে উচ্চস্তরের প্রাণী, মাটির টান তার স্বভাবের সাথে শোভা পায় না। সে অন্যকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে হলেও নিজেকে ভালো রাখতে জানে সবসময়। সেদিক থেকে দেখলে, ইয়া… হি ইজ কমপ্লিটলি ফাইন।”
আফজল চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
” আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস, তুমিও তোমার বাবার মতোই হলে আরভান। চরম এক বিশ্বাসঘাতক।”
আরভান সোজা হয়ে বসল। তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং কিছুটা বিস্ময়।
“আমাকে দয়া করে আপনার ছেলের সাথে মেলাবেন না দাদাজান। আমি উদ্ধত হতে পারি, বদমেজাজি হতে পারি, কিন্তু তার মতো স্বার্থপর নই। আর বিশ্বাসঘাতক? দ্যাট’স আ হার্ড ওয়ার্ড, দাদাজান। আমি কীভাবে বিশ্বাসঘাতক হলাম? না আমি কাউকে কোনো কথা দিয়েছি, আর না কোনো ওয়াদা ভঙ্গ করেছি। ইফ ইউ আর টকিং অ্যাবাউট দিস ম্যারেজ… আই ডোন্ট কনসিডার দিস আ রিয়েল ম্যারেজ। এটা একটা জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া নাটক ছাড়া আর কিছুই না।”
আফজাল চৌধুরী টেবিলের ডিভোর্স পেপারটার দিকে ইশারা করে বললেন,
“তুমি সত্যিই কি ডিভোর্স দিতে চাও? ভেবেচিন্তে দেখেছো তো? নাকি তোমার বাবা আর বিদেশি মায়ের কানপড়াতে এসে এই হঠকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছ?”
আরভান কিছুক্ষণ থমকে দাদাজানকে দেখল। লোকটা বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও তার বুদ্ধিবৃত্তি এখনো প্রখর। আরভান সামান্য হেসে বলল,
“দাদাজান, আপনি ভীষণ বুদ্ধিমান। আপনাকে নতুন করে ব্যাখ্যা করার কিছু নেই। বাট দিস টাইম, আই অ্যাম নট আন্ডার এনিওয়ানস ইনফ্লুয়েন্স। কারো কথায় নয়, বরং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে জানি। আমি এমন একটা মেয়ের সাথে জীবন কাটাতে পারব না যাকে আমি চিনিই না, যার সাথে আমার কোনো আত্মিক টান নেই। আই হ্যাভ আ ফিউন্সে, আই হ্যাভ আ সাকসেসফুল ক্যারিয়ার ইন অস্ট্রেলিয়া। সো প্লিজ, লেট’স জাস্ট ফিনিশ দিস অফিসিয়ালি।”
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়িতে পায়ের মৃদু শব্দ পাওয়া গেল। আয়াত ছোট আরিয়ানের হাত ধরে অত্যন্ত ধীরপায়ে নিচে নামছে। দরজার কাছে শাহরিয়ারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আয়াত অবচেতন মনেই নিজের ওড়নাটা আরও একটু টেনে নিল; ওই লোকটার দৃষ্টিতে সে সবসময় এক ধরণের পৈশাচিক লালসা খুঁজে পায়। দাদাজান আফজাল চৌধুরী ইশারা করে স্নেহমাখা গলায় বললেন,
“আয়াত দাদুমণি, এখানে এসে বোস।”
আয়াত আরভানের বিপরীত পাশের একটি একক সোফায় গিয়ে বসল। আরিয়ান আয়াতকে ছেড়ে পারভীন সুলতানার কাছে ছুটে গিয়ে ছোট হাত দুটো দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। গত রাতে আবছা আলোয় আরভান আয়াতকে দেখেছিল ঠিকই, কিন্তু আজ দিনের আলোয় সে প্রথমবার অত্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আয়াতকে দেখতে শুরু করল।
আয়াতের পরনে একটি সাধারণ সাদা সুতি থ্রি-পিস, কিন্তু তার স্নিগ্ধ ত্বকের বিপরীতে ওই শুভ্র পোশাকটি তাকে যেন এক অপার্থিব শ্রী দান করেছে। মাথার সাদা ওড়নাটি মাথার ওপর আলতো করে দেওয়া, যা তার চেহারায় এক ধরণের পবিত্রতা যোগ করেছে। আয়াতের চোখের নিচে হালকা কালশিটে দাগ—বোঝাই যাচ্ছে সারা রাত সে এক ফোঁটাও ঘুমায়নি। তার পাতলা গোলাপি ঠোঁট দুটো অবুঝের মতো সামান্য কাঁপছে। জানালা ভেদ করে আসা বাতাসের ঝাপটায় অবাধ্য কয়েক গোছা চুল বারবার তার মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। আরভান যেন এক মুহূর্তের জন্য স্থাণু হয়ে গেল। কাজল ধোয়া ওই ডাগর চোখ দুটোর গভীর মায়া আর অসহায়ত্ব তাকে অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। কেন জানি মনে হচ্ছে, এই মেয়েটি তার পরিচিত কোনো এক সত্তার অংশ।আরভান বুঝতে পারল না, কেন তার ভেতরে একটা অজানা তোলপাড় শুরু হয়েছে যদিও এ তোলপাড় তার মোটেও অজানা নয়।
আশপাশ থেকে কে যেন আরভানকে ডাকছে, কিন্তু সেই ডাক তার কান অবধি পৌঁছাচ্ছে না। ছোট আরিয়ান মাকে ছেড়ে আরভানের হাত ধরে সজোরে ঝাঁকিয়ে বলল,
“আরভান ভাইয়া! দাদাজান তোমাকে ডাকছে তো!”
আরভান দ্রুত সংবিত ফিরে পেল। সে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল সবাই তার দিকে এক অদ্ভুত কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে। এমনকি আয়াতও তার দিকে করুণ চোখে চেয়ে। আরভান নিজের ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত হলো; যা সে প্রকাশ করতে চায় না তার চোখ যেন তা প্রকাশের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে । সে দ্রুত টি-টেবিল থেকে ডিভোর্স পেপারটা আয়াতের দিকে এগিয়ে দিয়ে কর্কশ গলায় বলল,
“সাইন দিস। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ওয়েস্ট এনি মোর টাইম।”
আয়াত ছলছল চোখে দাদাজানের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টির ভাষা দাদাজান সহজেই বুঝে ফেললেন। ভারী কণ্ঠে বললেন,
” ওর কাছে পেপারটা দিয়ে দাও। কালকের মধ্যে ও সই করে দিয়ে দেবে।”
আরভান জেদী গলায় বলল,
“সরি দাদাজান, বাট আই কান্ট ওয়েট। আমি কাল সকালেই অস্ট্রেলিয়া ফিরে যাচ্ছি। সো, যা করার আজই ফিনিশ করতে হবে।”
আয়াতের ভেতরটা আজ হুট করেই জ্বলে উঠল। আরভানের এই চরম তাচ্ছিল্য এবং অবহেলা যেন তার দীর্ঘ বারো বছরের অপেক্ষার ওপর এক বড়সড় চড় মারল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটার কাছে তার পবিত্র অনুভূতির কোনো মূল্য নেই। এই জঘন্য মানুষটা কখনোই বোঝার ক্ষমতা রাখে না যে, একটা মেয়ে যার জন্য বারো বছর তিল তিল করে নিজেকে গড়েছে, তার মনে সে ঠিক কতটুকু জায়গা জুড়ে আছে। আয়াত নিজের চোখের জল মুছে অত্যন্ত শক্ত হাতে কাগজটা টেনে নিল। তার হাত কাঁপছিল না, কিন্তু হৃদপিণ্ডটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল। সে দ্রুত কলম চালিয়ে সই করে দিল। সই শেষ হতে না হতেই দু-ফোঁটা তপ্ত অশ্রু টুপ করে পেপারের ওপর আছড়ে পড়ল। ডিভোর্স পেপারটি আয়াতের কান্নায় ভিজে একাকার হয়ে গেল।
আরভান সেই ভেজা কাগজের দিকে তাকিয়ে রইল। কেন জানি না, আয়াতের ওই চোখের জল তার কঠিন বুকের ভেতর এক অজানা কাঁটার মতো বিঁধল। এখানে আসার পর থেকেই ওই চোখের পানিতে সে নিজের এক অবিশ্বাস্য দুর্বলতা বারবার খুঁজে পাচ্ছে, যা তার যুক্তিনির্ভর মস্তিস্ক মেনে নিতে পারছে না।
ঠিক সেই সময় জেসিকা ড্রয়িংরুমে ছুটে এল। সে আরভানের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“বেবি! যেহেতু আমরা কাল চলে যাচ্ছি, আমি এই গ্রামটা ঘুরে দেখতে চাই। আরশাদ আংকেল টোল্ড মি দিস ভিলেজ ইজ বিউটিফুল। প্লিজ আমাকে কোথাও নিয়ে চলো
আরভান চোখ খিঁচিয়ে বন্ধ করে নিল, যেন নিজের ভেতর উথলে ওঠা রাগটা লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“আই অ্যাম নট ইন দ্য মুড জেসিকা। বাড়ির অন্য কাউকে বলো তোমাকে একটু ঘুরিয়ে আনতে…”
জেসিকা মুখ কালো করে বলল,
“বাট আই ডোন্ট নো এনিওয়ান হেয়ার। ইউ মাস্ট কাম উইথ মি!”
আরভান দাদাজানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দাদাজান, শেহজাদীকে বলুন ওকে একটু আশপাশ থেকে ঘুরিয়ে আনতে।”
শেহজাদীর মুখে অন্ধকার নেমে এল। এমনিতেই সে জেসিকা নামের এই আপদটাকে সহ্য করতে পারছে না, তার ওপর তাকে নিয়ে সে রাস্তায় বের হবে! সে আমতা আমতা করে বলল,
“ভাইয়া, আজ আমার কলেজে একটা ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে। আমি তো যেতে পারব না।”
নাজমা বেগম এবার সুযোগ বুঝে ফোঁড়ন কাটলেন,
“আয়াত আছে তো! আয়াতের তো কোনো কাজ নেই, আজ ওর কলেজও নেই। ও আমাদের বিদেশি মেহমানকে গ্রামটা দেখিয়ে আনুক।”
নাজমা বেগম জেসিকার কাছে গিয়ে একটু গদগদ হয়ে বললেন, “ইয়েস জেসিকা, আয়াত তোমাকে নিয়ে যাবে।এই মাইয়া দিস ভিলেজের সব কর্নার নো করে।” ( শি নোস এভরি কর্নার অফ দিস ভিলেজ।)
আফজাল চৌধুরী একবার আয়াতের বিষণ্ণ মুখটার দিকে তাকালেন। তিনি বুঝতে পারছেন আয়াতের ওপর দিয়ে কী ঝড় যাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি কিছু একটা ভেবে নিলেন। তিনি আয়াতকে ইশারা করে বললেন,
“যাও দাদুমণি, ওকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে এসো। নিজেকে শক্ত করতে শেখো আয়াত, জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না।”
আরভান ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই মেয়ের সাথে জেসিকা একা কোথাও যাবে না। আই কান্ট ট্রাস্ট হার।”
আফজাল চৌধুরী নাতির এমন উদ্ধত কথা শুনে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বললেন,
“বিশ্বাসের ঠিক অভাবটা কার ওপর, আয়াতের ওপর নাকি অন্যকারো ওপর সেটাই তো পরিষ্কার করলে না,আরভান। যা-ই হোক, না বিশ্বাস করলে যেতে দিও না। এই বাড়ির মানুষদের এত অফুরন্ত সময় নেই যে তারা তোমার প্রেমিকাকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে।”
’প্রেমিকা’ শব্দটা বোধহয় আরভানের কানে খুব একটা সুখকর শোনাল না।তা তার মুখেই ফুটে উঠলো। তার মুখের পেশি শক্ত হয়ে উঠলো।
জেসিকা আহ্লাদ করে ডেকে উঠল, “আরভান!”
আরভান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ফাইন! আমিও সাথে যাব। ওয়েট আ মিনিট, আমি আসছি।”
আরভান ডিভোর্স পেপারটা নিয়ে গটগট করে ভেতরে চলে গেল। আয়াত তখন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরভানের সাথে আয়াত ঘুরতে যাবে শুনে শাহরিয়ার রাগে ফুঁসতে লাগল। কিন্তু মনে মনে সে দারুণ খুশি যে আয়াত এখন মুক্ত। সে আয়াতের খুব কাছাকাছি গিয়ে নিচু স্বরে হিসহিস করে বলল,
“সাইন করে দিলে? থ্যাঙ্ক ইউ জানপাখি! তোমার এই ত্যাগের জন্য আমার একটা চুমু দিতে ইচ্ছা করছে। তবে এখন না, বিয়ের পরে বাসর রাতে দিব—একটা না, হাজারটা।”
আয়াত প্রচণ্ড ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল। সে মনে মনে স্থির করল, দাদাজানের মাথার দিব্যির কারণে একবার সে পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলো। কিন্তু শাহরিয়ারের মতো লম্পটের ছায়া সে কোনোদিন নিজের শরীরে পড়তে দেবে না। কাল ভোর হওয়ার আগেই সে এই অভিশপ্ত খাঁচা থেকে চিরতরে মুক্তি নেবে।
#তাসনিম_রিয়া_খান
চলবে….

