#পর্ব২৩
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
“আয়াত… আয়াত! কোথায় তুমি?”
গগনবিদারী চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল আরভান। ঘুম ভেঙে পাশে আয়াতকে না দেখে ওর বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই খাঁ খাঁ করে উঠেছিল। এক অজানা আশঙ্কায় ওর হৃত্স্পন্দন যেন থেমে যাওয়ার উপক্রম। কাল রাতে শাহরিয়ারের সেই ধূর্ত চেহারা আর জঙ্গলের বিপদ—সব মিলিয়ে আরভান এক মুহূর্তের জন্য স্থির থাকতে পারছিল না।
”আমি এখানে আরভান!”
উল্টো দিকে জঙ্গলঘেঁষা ছোট্ট একটা বাগানে পাথরের বেঞ্চে বসে থাকা আয়াত চমকে উঠল। সে বৃদ্ধা মহিলার পাশে বসে কৌতূহল নিয়ে দেখছিল কীভাবে বুনো ফল থেকে এক বিশেষ ধরনের ভেষজ রস বের করা হয়। আরভানের চিৎকার শুনে সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে জবাব দিল।
“আমি এখানে আরভান!”
ভোরের নরম আলোয় ওর সেই মায়াবী স্নিগ্ধ মুখটা দেখে আরভানের মনে হলো সে যেন মরুভূমিতে হারানো শীতল জল খুঁজে পেয়েছে। ওর কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সে দীর্ঘ এক প্রশ্বাসের সাথে নিজেকে শান্ত করে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল।
“ঘুম থেকে উঠেছ কখন? আমায় না বলে কেন বের হলে?”
আয়াত চিবুক নামিয়ে চুলে হাত খোঁপা করতে করতে মুচকি হেসে বলল, “কিছুক্ষণ আগে। আপনি খুব শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলেন, তাই আর ডাকিনি।”
আরভান কিছুক্ষণ মুগ্ধ চোখে আয়াতের হাতের আঙুলের সঞ্চালন দেখল। ওর এলোমেলো হয়ে থাকা রূপ যেন সকালের সূর্যকেও হার মানাচ্ছে। আরভানের মনে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা তৈরি হলো। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “তুমি এখানে বসো, আমি একটু আসছি।”
বলেই আরভান সামনের দিকে হাঁটা দিল। আয়াত অবাক হয়ে পেছন থেকে ডাকল, “কোথায় যাচ্ছেন? আমি এখানে একা থাকব না, আমিও যাবো।”
আরভান থামল না, হাঁটতে হাঁটতেই গম্ভীর স্বরে বলল,
“তোমাকে এখন সাথে নিতে পারব না আয়াত। অনেকটা পথ হাঁটতে হবে ফোনের নেটওয়ার্ক খোঁজার জন্য। ফারহানকে কল দিয়ে লোকেশন পাঠাতে হবে, গাড়ি নিয়ে আসতে বলতে হবে ওকে।”
আয়াত এবার জেদ ধরে দাঁড়িয়ে গেল। “আপনাকে কে নিতে বলেছে? আমার কি পা নেই? আমি কি হাঁটতে পারি না? আমি একাই যেতে পারব, আপনার অযথা সাহায্যের দরকার নেই আমার।”
আরভান গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে এই মেয়েটার জেদ হিমালয়ের চেয়েও উঁচু। সে ফিরে তাকিয়ে দেখল আয়াত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তার দিকে আসার চেষ্টা করছে। কাল রাতে কাঁটা বিঁধে পায়ের পাতা যে ফুলে লাল হয়ে আছে, তা বোধহয় এই একগুঁয়ে মেয়েটার খেয়াল নেই। আরভান বৃদ্ধা মহিলার থেকে বিদায় নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করল। আয়াত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। এই লোকটা সত্যিই চলে যাচ্ছে? একবার সে নিজে অভিমানে বলেছে সে হাঁটতে পারবে, আর অমনি তাকে একা ফেলে চলে গেল? কাল রাতের সেই আগলে রাখা সব কি অভিনয় ছিল?
কিন্তু তার ভাবনার রেশ কাটবার আগেই সে অনুভব করল তার শরীরটা মাটি থেকে শূন্যে ভেসে উঠল। আরভান নিমিষেই ফিরে এসে তাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়েছে। আয়াত হকচকিয়ে গিয়ে বলল, “কী করছেন? নামান আমায়! বললাম না আমি হাঁটতে পারব!”
আরভানের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে আয়াতকে আরও নিবিড়ভাবে বুকের সাথে চেপে ধরে হাঁটতে শুরু করল। “বলুন… মনে মনে আমাকে কতগুলো গালি দিলেন?
আয়াত মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “দেইনি, তবে আপনি সত্যিই একজন নিষ্ঠুর পুরুষ।”
“আপনি নিজে তো তার চেয়েও বড় নিষ্ঠুর, মিসেস।” আরভানের তপ্ত নিঃশ্বাস আয়াতের কপালে আছড়ে পড়ল।
আয়াত অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “আমি কেন নিষ্ঠুর হবো?”
“কাল রাতে সাপের ভয়ে এই কাটা পা নিয়েই আমাকে একাই ফেলে ছুটতে চেয়েছিলেন, সেটা কি ভুলে গেছেন? আপনি যে বড্ড সুবিধাবাদী, তা কালই প্রমাণ হয়ে গেছে। প্রয়োজনে নিজের স্বামীকে সাপের মুখে ঠেলে দেওয়ার চিন্তা যে করতে পারে, সে তো বিশ্বসুন্দরী নিষ্ঠুর!”
কথাটা মনে পড়তেই আয়াত চুপসে গেল। লজ্জায় আরভানের শার্টের কলারটা খামচে ধরে তার বুকে মুখ নিচু করে রইল সে। আরভান ফোনে নেটওয়ার্ক চেক করতে করতে বনের সরু রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। কিছুদূর যেতেই একটা নীল জলের ছোট্ট নদী বয়ে যাচ্ছে নজরে এল। নদীর ধারের এক উঁচু জায়গায় সামান্য নেটওয়ার্ক আসতেই আরভান আয়াতকে নদীর ধারের একটা ছোট কাঠের বেঞ্চে বসিয়ে দিল।
”তুমি এখানে বসো, আমি দূরে গিয়ে কলটা সেরে আসি। এখানে নেটওয়ার্ক কিছুটা আসছে।”
আরভান কিছুটা দূরে গিয়ে ফারহানকে ডায়াল করল। ওপাশ থেকে ফারহানের উত্তেজিত কণ্ঠ ভেসে এল,
“এভি! কোথায় তুই? কাল রাতে একটা অস্পষ্ট মেসেজ পাঠিয়ে উধাও হয়ে গেলি! আমি তো পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।”
”শান্ত হ। সব ঠিক আছে। গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল আর নেটওয়ার্ক ছিল না।”
আরভান নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “ওগুলো কোথায়? পেয়েছিস একটাকেও?”
“সবগুলোকেই পেয়েছি। ওরা যখন আয়াতের পিছু নিয়েছিল, তখনই আন্টির পাঠানো লোক ওদের ধরে ফেলেছে। আমার মনে হয় আন্টি তোদের ওপর সবসময় নজর রাখছিলেন।”
আরভান আর কথা বাড়ালো না। শুধু বলল, “তুই এখনই ব্যাকওয়াটার্স রোডের শেষ মাথায় চলে আয়। আয়াত আমার সাথে আছে, তাই সাবধান।”
ফারহানের সাথে কথা শেষ করে আরভান পেছনে ফিরল। দেখল আয়াত চোখ বন্ধ করে নদীর শীতল বাতাস অনুভব করছে। ওর ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি। সূর্যের আলোয় ওর ঠোঁটের নিচে ছোট্ট কালো তিলটা যেন পাল্লা দিয়ে চমকাচ্ছে। আরভানের মনে হলো পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য বুঝি এই একটা বিন্দুতে এসে থমকে গেছে।
আরভান ধীরপদে এসে আয়াতের পাশে বসল। হঠাৎ বলে উঠল।
“তোমার ঘুম বড্ড বেপরোয়া আয়াত।”
আয়াত চোখ খুলে তাকালো।অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
”ঘুমের ঘোরে যেভাবে হাত-পা ছুড়ছিলে, আমার তো মনে হয় কয়েকটা পাঁজরের হাড় ভেঙে গেছে। শেষ রাতে যে লাথিটা দিয়েছিলে, ওটা কি প্রোপার প্ল্যানিং ছিল? একদম মেইন পয়েন্টে হিট করতে চেয়েছিলে বুঝি?”
আয়াত প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেল,কিন্তু আরভানের গম্ভীর মুখে এমন কথা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠল।
“আপনার প্রাপ্য ছিল ওটা। কাল রাতে সাপ আর অ্যানাকোন্ডার গল্প শুনিয়ে আমাকে ভয় দেখানোর শাস্তি। সারা দিনরাত আমায় যা জ্বালান, ঘুমে অন্তত তার শোধ তো নিতে হবে!”
হাসি থামিয়ে আয়াত হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। নদীর শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে হুট করেই প্রশ্ন করে বসল, “আরভান, আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?”
চারপাশটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আরভান নদীর ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে সে মাত্র একটি শব্দ উচ্চারণ করল,
“না।”
আয়াতের হাসিমাখা মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে আরভানের দিকে তাকালো, কিন্তু আরভান তখনো অন্যমনস্ক হয়ে পানির দিকে তাকিয়ে আছে। ওর এই এক শব্দের উত্তরটা আয়াতের বুকের বাম পাশে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল।
আয়াত প্রথমে ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ আরভানের নিস্পৃহ মুখটা পড়ার চেষ্টা করল। লোকটা অদ্ভুত! কাল রাতে অতিনাটকীয়ভাবে অধিকার নিয়ে কথা বলল, আগলে রাখল, আর এখন স্রেফ এক শব্দে সব অস্বীকার করে দিল! সে আরভানের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে প্রশ্ন করল, “তাহলে কাল রাতে কেন বলেছিলেন আমি শুধু আপনার? কেন আমাকে অধিকার নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছিলেন?”
”এমনি।” আরভানের সংক্ষিপ্ত এবং নিস্পৃহ জবাব।
আয়াত এবার হুট করেই শব্দ করে হেসে ফেলল। ওর খিলখিল হাসির শব্দে নদীর তীরের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। আরভান ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“হাসছো কেন?”
”এমনি। আজ খুব হাসতে ভালো লাগছে। কেন যেন মনে হচ্ছে—আমি বোধ হয় এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ! জানেন আরভান? আপনি যখন ‘না’ বলেন, তখন আপনার চোখগুলো অন্য কথা বলে। আপনি বড্ড খারাপ অভিনেতা।”
আরভান কোনো কথা বলল না। সে পাশ থেকে একটা নীল বুনো ঘাসফুল ছিঁড়ে আনমানে আয়াতের কানে গুঁজে দিল। ফুলটা গোঁজার সময় ওর হাতের স্পর্শ আয়াতের গলার কাছে লাগতেই আয়াত শিউরে উঠল। ঠিক সেই সময় বাতাসের ঝাপটায় আয়াতের শাড়িটা একটু সরে গিয়ে কোমরের অনাবৃত অংশ দৃশ্যমান হতেই আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে খুব সাবধানে, প্রায় মালিকানাসুলভ ভঙ্গিতে আঁচলটা টেনে দিয়ে জায়গাটা ঢেকে দিল।
আয়াত বড্ড অবাক হচ্ছিল আজ আরভানের আচরণে। এক অদ্ভুত শান্ত রূপ তার! আজ সে আয়াতের সাথে কোনো ফ্লার্টিং করছে না, এমনকি অহেতুক ঝগড়াও করছে না। শান্ত, শীতল এবং মোহনীয়। আয়াত নদীর টলটলে জলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
”আরভান… আমি যদি হুট করে এই নদীতে ঝাঁপ দেই, আপনি কি আমায় বাঁচাবেন?”
“না।” আরভান যথারীতি জবাব দিল।
“সত্যিই ঝাঁপ দেব তাহলে?”
“রাস্তায় চলো আয়াত, ফারহান চলে আসবে এখনই। দেরি করার সময় নেই।”
আরভান নিরাসক্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল।যেতে নিলে আয়াত ঝট করে ওর হাতটা ধরে ফেলল। “কী হয়েছে আরভান? আপনি কি আমার ওপর রেগে আছেন?”
আরভান এক মুহূর্ত স্থির থেকে হেয়ালি করে বলল, “রাগ করার মতো গুরুত্ব কি আমি তোমাকে দিই মিসেস? আমি শুধু সময়ের হিসাব মেলাচ্ছি। আর আবেগ? ওগুলো ব্যবসায়ীদের জন্য বিলাসিতা। আমি স্রেফ হিসাবনিকাশে বিশ্বাসী।”
আয়াত দমে না গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আরভানের চোখের গভীরে চোখ রেখে বলল,
“আরভান, আমি যদি আপনাকে সত্যি ভালোবেসে ফেলি, তবে কি আমি খুব বড় কোনো ভুল করে ফেলব?”
আরভান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব গম্ভীর স্বরে বলল,
“অনেক বড় ভুল হবে আয়াত। সবচেয়ে ভয়ঙ্করতম সুন্দর ভুল হবে এটা।”
”সুন্দর হলেও ভুল তো ভুলই হবে, তাই না? আমি সেই ভুলের মাশুল দিতে রাজি।”
আরভান আয়াতের হাতটা আলতো করে ছাড়িয়ে দিয়ে সামনে হাঁটা শুরু করল। “ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে, ফারহান এসে গেছে হয়তো।”
”আরভান!”
আরভান পেছন ফিরে তাকালো।বিরক্তি আর ক্লান্তির সংমিশ্রণে বলল,
“আজ তোমার হয়েছেটা কী আয়াত? কেন বারবার এত প্রশ্ন…?”
কথাটা পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই এক নরম কোমল শরীর ঝড়ের গতিতে আরভানের প্রশস্ত বাহুডোরে আছড়ে পড়ল। ছোট দুটো হাত দিয়ে সে আরভানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আরভান পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল। ওর হাত দুটো কয়েক সেকেন্ড শূন্যে ঝুলে রইল। আয়াতের উষ্ণ নিঃশ্বাস ওর বুকের ওপর আছড়ে পড়ছে।
”আয়াত… এসব কী হচ্ছে?”
আয়াতের কণ্ঠস্বর আবেগে বুজে এল। “আমি আপনাকে আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্করতম ভুল হিসেবে কবুল করে নিলাম মিস্টার আরভান চৌধুরী। এখন আপনি চাইলে অভিনয় করতে পারেন, কিন্তু সরাতে পারবেন না।”
”আয়াত! উল্টোপাল্টা কী খেয়ে এসেছো ওই বুড়ির কাছ থেকে? মাথা ঠিক আছে তোমার?” আরভান ওকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও আয়াত আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
আয়াত ওর মুখটা আরভানের বুকের মাঝে আরও গভীর করে গুঁজে দিয়ে বলল,
“আপনিই তো বলেছিলেন অধিকার ছিনিয়ে নিতে! আজ আমি আপনাকে আমার অধিকার করে নিলাম। আজ থেকে আপনি আমার। আমি আপনার জীবনটাকে নরক করে দেব, আবার সেই নরক জীবনে ছায়ার মতো আপনার পাশে আমিই থাকব। আপনি চাইলেও আর পালাতে পারবেন না।”
আয়াতের এমন নিঃশর্ত সমর্পণে আরভানের সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। সে ধীরলয়ে আয়াতকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“কী খাইয়েছে তোমাকে ওই মহিলা? এত সাহস কোথায় পেলে?”
”মহিলা কিছু খাওয়ায়নি। আপনি নিজেই তো আস্ত একটা নেশা, মস্ত বড় এক নষ্ট পুরুষ! আপনি যা খাইয়েছেন…” আয়াত থেমে গেল।
”হুম, বলুন মিসেস… আমি আপনাকে কী খাইয়েছি? এখন পর্যন্ত তো ভালো করে একটা চুমুও খাওয়াতে পারলাম না!” আরভানের কণ্ঠে এবার সেই পরিচিত দুষ্টুমি ফিরে এল।
”ধুর! সরুন তো!” আয়াত লজ্জা পেয়ে সরে যেতে চাইলেও আরভান এবার ওকে ছাড়ল না। কোমরের বাঁধন আরও শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল।
”এত কিছুর পরেও আমায় কেন ভালোবাসো আয়াত? আমি তো তোমার চোখের জল ছাড়া আর কিছুই দিতে পারিনি। ।”
”চেয়ে তো আর ভালোবাসিনি আরভান, হয়ে গেছে। লোকে বলে না— ভালোবাসা যায় না, বরং নিজের অজান্তেই তা অস্তিত্বে মিশে যায়।”আয়াত ওর বুকের ধুকপুকুনি অনুভব করতে করতে বলল।
আরভান আয়াতের চোখের গভীরে এক টুকরো মাদকতা নিয়ে ওর মুখটা নিজের হাতের আজলায় আগলে নিল।
আরভান ফিসফিস করে বলল, “আয়াত, যদি কোনোদিন আমি হারিয়ে যাই, তবুও কি এই অধিকার দাবি করবে?”
“আপনাকে কোন দিন হারাতে দিবো না আরভান।”
আরভান খুব নিচু স্বরে বলল, “তুমি কি জানো আয়াত? এই মুহূর্তে তোমাকে না ছুঁলে আমি হয়তো মরেই যাব। তুমি আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে যাচ্ছো।”
আয়াত নিমেষে চোখ বুজে নিল। দুজনের উষ্ণ নিঃশ্বাস যখন একে অপরের ঠোঁট স্পর্শ করতে উদ্যত, ঠিক তখনই,
”আস্তাগফিরুল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ! তোরা রাস্তাঘাটে এসব কী শুরু করেছিস? ছি ছি ছি! আমার মতো সিঙ্গেল মানুষের সামনে লজ্জা করে না তোদের? আমার বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে! একটা বউ পাগল, আরেকটা স্বামী পাগল—মাঝখানে আমি কি নিরামিষাশী?”
আয়াত লজ্জায় আরভানের বুকের আড়ালে মুখ লুকালো। আরভান বিরক্তি নিয়ে চোখ বন্ধ করল। ফারহান কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে চোখে হাত দিয়ে আঙুলের ফাঁক দিয়ে সব দেখছে।
আরভান বিড়বিড় করে বলল, “হারামজাদা ! আসার আর সময় পেল না! জীবনের প্রথম রোমান্টিক মোমেন্টটাও জাহান্নামে দিল!”
ফারহান এবার জোর গলায় বলল, “এভি! এভাবে গালি দিবি না। আয়াতকে আমি বোন ডেকেছি। বড় ভাই এখনো সিঙ্গেল, সেখানে ছোট বোনকে আমি এই লম্পট স্বামীর সাথে একা নির্জনে ছাড়ব না। আয়াত, ওকে ছেড়ে চলে আসো। আগে তোমার স্বামী আমার জন্য একটা সুন্দর বউ খুঁজে আনবে, তারপর সে আমার বোনকে পাবে। তার আগে নো রোমান্স অনলি ডিসট্যান্স!”
আরভান আয়াতকে আগলে রেখেই ফারহানের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “ফারহান, তুই যদি আর এক সেকেন্ডের মধ্যে এখান থেকে না যাস, তবে আমি তোকে এই নদীতে চুবিয়ে মারব। আর তোকে এখান থেকে হেঁটে মেলবোর্ন পাঠাবো, মনে রাখিস!গাড়ি কোথায়?”
ফারহান হাসতে হাসতে বলল, “গাড়ি রেডি স্যার! কিন্তু আগে ডিস্ট্যান্স মেইনটেইন করুন।
আরভান মুচকি হেসে আয়াতের কপালে একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝামেলা এটা, সবকিছুতে শুধু ব্যাঘাত ঘটায়।বাকিটা বাড়িতে গিয়ে সুদে-আসলে উসুল করব মিসেস। তৈরি থেকো।
চলবে….
#পর্ব_২৪
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
ফারহান হাসতে হাসতে বলল,
“গাড়ি রেডি স্যার! কিন্তু আগে ডিস্ট্যান্স মেইনটেইন করুন। জনসমক্ষে রোমান্স করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, বিশেষ করে আমার মতো সিঙ্গেলদের সামনে।”
আরভান মুচকি হেসে আয়াতের কপালে একটা গভীর ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝামেলা এটা, সবকিছুতে শুধু ব্যাঘাত ঘটায়।বাকিটা বাড়িতে গিয়ে সুদে-আসলে উসুল করব মিসেস। তৈরি থেকো।
আরভানের তপ্ত নিঃশ্বাসের ছোঁয়ায় আয়াত শিউরে উঠল। লজ্জায় রাঙা হয়ে সে আরভানের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল। ফারহান আয়াতের দিকে হাত বাড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, “চলে আসো আয়াত! এই খাড়ুস লোকটার সাথে থাকলে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করবে। বড় ভাইয়ের সেফ প্রোটেকশনে চলে আসো।”
আরভান ফারহানের দিকে কটমট করে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “খবরদার! আমার বউকে টাচ করার সাহস করবি না। বউয়ের আশেপাশে যদি তোকে ঘুরঘুর করতে দেখি, তবে তোকে গুলি করে উড়িয়ে দিতে আমার এক সেকেন্ড সময় লাগবে না।”
ফারহান দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে পকেটে হাত দিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “মুখে বড় কথা বললেই হয় না এভি! আমিও দেখব তুই কী করিস। আজ এই মুহূর্তে যদি তুই আমাকে একটা সুন্দরী বউ এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি না দিস, তবে আয়াতকে আমি কিডন্যাপ করব। আগে আমার জন্য বউ নিয়ে আসবি, তারপর নিজের বউ ফেরত পাবি। ডিল?”
আরভান বাঁকা হাসল। পেছনে তাকিয়ে সেই কাঠের বাড়িটার দিকে ইশারা করে বলল, “ওই বাড়িতে একজন বৃদ্ধা আছেন, তুই চাইলে এখনই ওনার সাথে তোর বিয়েটা দিয়ে দিতে পারি। সারাজীবন ওনার সাথে রোমান্টিক ডিনারে পাখিদের কিচিরমিচির শুনে দিন কেটে যাবে তোর। যাবি নাকি? চল, কথা বলে আসি।”
ফারহান গালি দিয়ে উঠল, “শালা! তুই আস্ত একটা হারামি। দেখিস, তোর কপালে কোনোদিন প্রপার বাসর রাত জুটবে না! জুটবে না মানে জুটবেই না! আমার অভিশাপ রইল!”
আরভান এবার তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “বেগার্স ক্যান নট বি চুজারস, মাই ফ্রেন্ড! বাসর অলরেডি হয়ে গেছে আমার, তোর এই অভিশাপ নিজের পকেটে ভরে রাখ!”
“কীহ!”
আয়াত আর ফারহান দুজনেই একসাথে চিৎকার করে উঠল। আয়াত বড় বড় চোখে আরভানের দিকে তাকিয়ে যেন আকাশ থেকে পড়ল। আরভান বুঝতে পারল মুখ ফসকে সে কী একটা বোমা ফাটিয়ে দিয়েছে! নিজের অপ্রস্তুত ভাবটা কাটাতে সে ফারহানের হাত থেকে গাড়ির চাবিটা এক ঝটকায় কেড়ে নিল। তারপর ফারহানের কোনো উত্তরের তোয়াক্কা না করে আয়াতকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে সোজা গাড়ির দিকে হাঁটা দিল।
ফারহান পেছনে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার নারী-বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত বন্ধুটি যে এতটা ঠোঁটকাটা আর বেসামাল হয়ে উঠবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। সে চিৎকার করে বলল, “এভি! আমাকে নিবি না? আমি কি হেঁটে যাবো?”
আরভান পেছনে না ফিরেই চেঁচিয়ে জবাব দিল, “তুই আসলে আমার ফেলে আসা নষ্ট গাড়িটা কে আনবে? ওটা ঠিক করে চালিয়ে নিয়ে আসিস। গুড লাক মাই ব্রাদার!”
ফারহান বিড়বিড় করে একগাদা অশ্রাব্য গালি দিয়ে পকেটে হাত ঢোকালো। তার কপালটাই এমন! বন্ধু রোমান্স করে আর তাকে মেকানিকের কাজ করতে হয়!
আয়াত কাঁপা গলায় আরভানের দিকে তাকিয়ে বলল, ” আপনি কি সত্যিই কাল রাতে… মানে…”
আরভান আয়াতের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। “জাস্ট এ জোক মিসেস! ফারহানকে জ্বালানোর জন্য এর চেয়ে বড় অস্ত্র আর কী হতে পারে? বেচারা এখন সারা পথ এটা নিয়েই পাজলড হয়ে থাকবে।”
আয়াত আরভানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হেসে ফেলল। আরভানের গলার কাছে মুখ গুঁজে সে ফিসফিস করে বলল, “আপনি এতটা খারপ আগে জানা ছিলো না। একটা কথা বলি আরভান?”
”বলুন মিসেস।”
”আপনাকে মাঝে মাঝে আমার পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত আর রহস্যময় মানুষ মনে হয়। আবার কখনো মনে হয় আপনি একটা জেদি বাচ্চা, যে নিজের প্রিয় খেলনা কাউকে ছুঁতে দিতে চায় না।”
আরভান আয়াতকে গাড়িতে বসিয়ে তার চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরাল। ওর চোখে তখন এক গভীর প্রশান্তি আর অধিকারবোধের নেশা। আরভান ধীরলয়ে বলল, “তুমি আমার খেলনা নও আয়াত। তুমি আমার সেই অস্তিত্ব, যা হারিয়ে গেলে আরভান চৌধুরীর নামটা কেবল একটা অর্থহীন শব্দে পরিণত হবে। আমি জানি আমি বড্ড রুক্ষ, হয়তো বড্ড নিষ্ঠুর; কিন্তু এই নিষ্ঠুরতার আড়ালেও যে একটা মানুষ তোমাকে পাগলের মতো আগলে রাখতে চায়, তাকে কি চিনতে পেরেছ?”
আয়াতের চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। সে আরভানের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “চিনতে পেরেছি আরভান। সেই মানুষটাকেই তো আমি নিজের ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর ভুল’ হিসেবে মেনে নিয়েছি।”
আরভান আয়াতের রক্তিম গালে নিজের অধরের উষ্ণ ছোঁয়া দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য সময়টাকে থামিয়ে দিল। ওর স্পর্শে আয়াতের সারা শরীরে যেন এক পশলা বিদ্যুৎ বয়ে গেল। তারপর ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে আয়াতের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
”বাসর নিয়ে ফারহানকে যা বলেছি, সেটা কিন্তু পুরোপুরি মিথ্যা নয় আয়াত। কাল রাতে তুমি আমার ওপর ঠিক যে পজিশনে ছিলে আর যেভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে, ওটা কোনো রোমান্টিক বাসর রাতের চেয়ে কম ছিল না! সো, টেকনিক্যালি আই অ্যাম রাইট!”
আয়াতের মুখ লজ্জায় আরও লাল হয়ে উঠল। সে কোনো উত্তর দিল না, আরভানের দিকে ফিরেও তাকালো না। লোকটা যে এত সুন্দর করে নির্লজ্জের মতো কথা বলতে পারে, তা ওর জানা ছিল না। আয়াত শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে মুচকি হাসল আর মনে মনে ভাবল—এই অদ্ভুত মানুষটাকে কোনোদিন বুঝে ওঠা বোধহয় তার সাধ্যে নেই।
****
থানার ভেতরে এসি চললেও উত্তেজনার পারদ যেন টগবগ করে ফুটছে। চেয়ারে বসে রাগে ফেটে পড়ছেন মিস্টার স্মিথ। তার সামনে ফোনের লাউডস্পিকারে আরশাদ চৌধুরীর শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, যা স্মিথকে আরও বেশি উত্তেজিত করে তুলছে।
স্মিথ চিৎকার করে বললেন, “আরশাদ! পুলিশ তোমার ছেলের নামে কেস নিচ্ছে না। তারা বলছে তোমার ছেলে নাকি অতি ভদ্র, সে এসব করতেই পারে না! তুমি কি তাদের বলবে যে তোমার ওই ‘ভদ্র’ ছেলেটা আসলে কী জিনিস? জেসিকাকে কাল রাত থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার মেয়েটা কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে—কেউ জানে না!”
আরশাদ চৌধুরী ওপাশ থেকে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বললেন, “স্মিথ, শান্ত হও। পুলিশ তো আর আবেগে চলে না, তারা তথ্য-প্রমাণে চলে। জেসিকা প্রাপ্তবয়স্ক, সে হয়তো আরভানের সাথেই আছে; তবে সেটা অপহরণ হিসেবে না হয়ে গোপন অভিসারও তো হতে পারে। আমার ছেলে যদি তাকে কোথাও রেখেও থাকে, তবে সেটা নিশ্চয়ই জেসিকার সম্মতিতে অথবা তার নিজের কোনো বোকামির ফল।”
তার কথার এই দ্ব্যর্থবোধক মানে পুলিশ বা স্মিথ কেউই পরিষ্কার বুঝতে পারল না। সামনের চেয়ারে বসা পুলিশ কর্মকর্তা হাই তুলে বিরক্তি নিয়ে স্মিথকে বলল,
” দেখুন মিস্টার স্মিথ, আপনার মেয়ের রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। সে হয়তো কোথাও ওভারডোজ ড্রিঙ্ক করে পড়ে আছে। তার জ্ঞান ফিরলে সে নিজেই ফিরবে। আপনি বরং বাড়ি গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমান। শুধু শুধু আরভান চৌধুরীর মতো একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে বিরক্ত করবেন না।”
স্মিথ রাগে টেবিলের ওপর সজোরে থাপ্পড় মেরে উঠে দাঁড়াল। “মজা করছেন আমার সাথে? এর আগের বার বিজনেস পার্টিতে ওই ছেলে সবার সামনে আমার মেয়েকে থাপ্পড় মেরেছিল! আর কালকের সিসিটিভি ফুটেজেও পরিষ্কার দেখা গেছে আরভান জেসিকার গাল কতটা নৃশংসভাবে চেপে ধরে তাকে করিডোরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল! এত কিছুর পরও আপনারা বলছেন ও নির্দোষ।আপনার জেনেবুঝে হাত গুটিয়ে বসে আছেন? আমার মেয়ে নিশ্চিত ওই আরভানের কাছেই আছে। ওর বাড়ি তল্লাশি করবেন কি না বলুন, না হলে আমি ওপর মহলে কথা বলে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো!”
আরশাদ চৌধুরী ওপাশ থেকে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। “অফিসার, এত রক্তচাপ বাড়িয়ে কী লাভ? উনি একজন উদ্বিগ্ন বাবা। আপনি বরং ওনার সন্তুষ্টির জন্য একবার আরভানের বাড়ি গিয়ে দেখে আসুন। আমার ছেলে যদি অপরাধ করে থাকে, তবে তাকে পুলিশি জেরা ফেস করতে হবে—এটাই স্বাভাবিক। আইনের উর্ধ্বে তো কেউ নয়, তাই না?”
আরশাদ চৌধুরীর নিজের ছেলের প্রতি এই ‘নিরপেক্ষতা’ স্মিথকে একটুও অবাক করল না। তিনি জানেন, এই লোক যেকোনো রূপ ধরতে পারে। আরশাদ চৌধুরীর কাছে সম্পর্ক কেবল একটা দাবার গুটি; প্রয়োজন হলে সে নিজের ছেলেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেও পিছপা হবে না। তবে তার এই সম্মতির পেছনে যে বড় কোনো রহস্য আছে, তা স্মিথের মস্তিস্কে তখন কাজ করছিল না।
পুলিশ অফিসার একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। “ঠিক আছে মিস্টার স্মিথ। আপনি যখন পিছু ছাড়ছেনই না, তখন চলুন। তবে আমার বিশ্বাস, এভি’র মতো একজন বিজনেস টাইকুনের হাতে একটা মেয়েকে কিডন্যাপ করার মতো সস্তা সময় নেই। তবু নিয়ম রক্ষার খাতিরেই আমরা যাবো। কিন্তু যদি সেখানে কিছু না পাওয়া যায়, তবে এই হ্যারাসমেন্টের দায়ভার কিন্তু আপনাকেই নিতে হবে।”
স্মিথ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,” আমি সব দেখে নেব। চলুন!”
****
গাড়ির মাঝে পিনপতন নীরবতা। আয়াত পাশে বসে ঘাড় কাত করে আরভানের তীক্ষ্ণ মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে আছে। আরভান ড্রাইভ করতে করতে স্টিয়ারিংয়ে আঙুল ড্রাম করে আলতো স্বরে বলল,
”মিসেস, আপনার দৃষ্টি সংযত করুন। আপনার চোখের এই তীব্র নেশায় আমি ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিতে পারছি না। এক্সিডেন্ট হলে কিন্তু আমাদের এই অসমাপ্ত রোমান্সটা হাসপাতালেই শেষ করতে হবে!”
আয়াত দৃষ্টি সরালো না। বরং আরও গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আরভান, আপনার বুকের ওই গভীর ক্ষতটা কিসের? ওটা কীভাবে হয়েছিল?”
আরভান এক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর বাঁকা হেসে বলল, “এত কিছু কীভাবে দেখেন বলুন তো? কাল রাতে কি তবে আমার অজান্তেই আমার ইজ্জত লুটে নিয়েছেন?”
আয়াত ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। “ছি! আমি কি আপনার মতো চরিত্রহীন নাকি যে ওসব করব?”
”আমি চরিত্রহীন? অসভ্য? তাহলে আপনি কী মিসেস? আপনার যা ভাবসাব দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে আপনি আমার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে যাবেন। কাল রাতে তো নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এখন আবার সাধু সাজছেন?”
আয়াত রাগ সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “কথা ঘুরাচ্ছেন কেন?”
আরভানের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। সে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে শীতল স্বরে বলল, “নিজেই পুড়িয়েছিলাম।”
আয়াত থমকে গেল। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে। শ্বাসরোধ করা গলায় বলল, “মানে? কোনো সুস্থ মানুষ কীভাবে নিজের বুক এভাবে গভীর ক্ষত করে পুড়িয়ে ফেলে?”
”যাদের বুকের ভেতরের যন্ত্রণা প্রচণ্ড বেশি থাকে আয়াত, তারা বাইরের চামড়া পুড়িয়ে সেই ব্যথাটা আড়াল করার চেষ্টা করে। ওটা আমার এক চরম ভুলের মাশুল।”
আরভানের স্বরে আজ কোনো নাটকীয়তা নেই, আছে কেবল এক বিষণ্ণ সত্য।আয়াত কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে গাড়িটা বাড়ির সদর দরজায় আসতেই আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। দেখা গেল কয়েকজন পুলিশ সিকিউরিটি হ্যাক করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে।
আরভান গাড়ি থামিয়ে দ্রুত নেমে এগিয়ে গেল। আরভান শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “এনিথিং রং অফিসার? আমার বাড়ির সদর দরজায় আপনাদের এই অযাচিত উপস্থিতি ঠিক কী কারণে?”
পুলিশ অফিসার সামনে এগিয়ে এসে বললেন, “হ্যালো মিস্টার আরভান, সরি ফর দ্যাট বাট আই হ্যাড টু ডু ইট। জেসিকা নামে এক তরুণীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার বাবার দাবি, আপনি তাকে অপহরণ করেছেন। কাল রাত থেকে সে মিসিং। মিস্টার আরভান, আপনি কি কিছু জানেন?”
আরভান পকেটে এক হাত ঢুকিয়ে অবজ্ঞাভরে হাসল। অন্য হাত বাড়িয়ে বাড়ির লক কোড দিয়ে দরজা খুলে দিতে দিতে বলল, “আপনাদের ইনফরমেশন ভুল অফিসার। কারণ আমার এত ফালতু সময় নেই যে একটা সস্তা মেয়েকে অপহরণ করে পাহারা দিয়ে বসে থাকব।”
আয়াত সন্দিহান দৃষ্টিতে আরভানের দিকে তাকালো। আরভান ওর দৃষ্টি দেখে ভ্রু নাচাল। “তুমি ওভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেন?”
আয়াত ফিসফিস করে বলল, “জেসিকা কোথায় আরভান? সত্যি করে বলুন।”
”আশ্চর্য! আমি কীভাবে জানব? কাল সারাটা সময় আমি তো তোমার সাথেই ছিলাম। তুমি কি আমার সাক্ষী নও?”
আয়াত আরভানের শার্টের হাতা খামচে ধরে বলল, “প্রথমবার জেসিকার সাথে রোমান্স করার জন্য আমাকে ফিঁয়াসে বলে হাতে হাত বেঁধে ঘুরিয়েছিলেন। এবার যদি সত্যিই আপনি জেসিকাকে স্পর্শ করে থাকেন, তবে আগে আপনার হাত ভেঙে ফেলব তারপর আঙুলগুলো কুচিকুচি করে কাটব। মনে রাখবেন কথাগুলো!”
আরভান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। “আয়াত! এটা তোমার কোন রূপ? আমাকে হুমকি দিচ্ছো?”
আয়াত স্থির দৃষ্টিতে আরভানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার মতো গিরগিটির সাথে থাকতে থাকতে আমিও এখন রূপ বদলাতে শিখেছি। এখন থেকে আমি ঠিক আপনার মতোই হব, আর আপনাকে সেটা সহ্য করতে হবে ঠিক যেমনটা আমি এ পর্যন্ত সহ্য করেছি।”
আরভান এবার একটু দমে গেল। সে নিচু স্বরে বলল, “আমার ভুল হয়ে গেছে আয়াত। অধিকার নিতে বলেছিলাম, এখন দেখছি তুমি একবারে আমায় গিলে ফেলতে চাইছো! প্লিজ, এই রূপ বাদ দিয়ে আগের সেই শান্ত আয়াত হয়ে যাও।”
আয়াত তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “আপনার জন্য এই আয়াতই ঠিক আছে। আগের আয়াত আপনাকে সামলাতে পারবে না। আর অধিকার যখন নিতেই বলেছিলে, তখন আমি তা নিয়ে নিয়েছি। এখন আর ফেরানোর পথ নেই।”
আরভান নেশালু চোখে আয়াতের কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। “বুঝে নিন কিন্তু ম্যাডাম! আমিও যদি আবার নিজের অধিকার ফলাতে শুরু করি, তবে আপনার কী হাল হবে ভেবেছেন?”
আয়াত কম্পিত স্বরে আরভানের ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নিয়ে বলল, “আপনাকে বারণ করেছে কে মিস্টার?”
আরভান এক মুহূর্তের জন্য যেন সব ভুলে আয়াতের ঠোঁটের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে এক ঝটকায় স্মিথ এসে আরভানের শার্টের কলার ধরলেন। “আমার মেয়ে কোথায় এভি? কাল থেকে ওর কোনো খবর নেই!”
আরভান বিরক্তি নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। স্মিথের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে তপ্ত স্বরে বলল, “আপনারা সবসময় আমার রোমান্টিক সিনের মাঝে কেন আসেন বলুন তো? আপনার মেয়ে কোথায় আমি কীভাবে জানব? আমি কাল পুরোটা সময় আমার স্ত্রীর সাথে কাটিয়েছি। বিশ্বাস না হলে দেখুন, আমার স্ত্রীর পায়ের এই ক্ষতটা কালকের বুনো জঙ্গলে দৌড়ানোর চিহ্ন!”
স্মিথের দৃষ্টি এবার আয়াতের দিকে পড়ল। মেয়ের মুখে এই আয়াতের কথা সে বারবার শুনেছে। আয়াত কিছুটা কুঁকড়ে গিয়ে আরভানের পেছনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “উনি এভাবে কেন তাকাচ্ছেন আমার দিকে? আমি তো কিছু করিনি! আপনার বাবাও আমার দিকে এক অদ্ভুত চোখে তাকান—কেমন যেন লাগে আমার।”
আরভানের চোখ দুটো মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। সে গম্ভীর গলায় বলল, “কেন? আমার বাবা তোমার দিকে কীভাবে তাকায়?”
”জানি না… ঠিক বোঝাতে পারব না। বড্ড অস্বস্তিকর দৃষ্টি।”
আরভান কিছু একটা ভাবল। পুলিশ অফিসার বাড়ি তল্লাশি করে ফিরে এসে বললেন, “সরি মিস্টার স্মিথ, আমরা পুরো বাড়িতে এমন কাউকে পাইনি। মিস্টার আরভান, আপনাকে হ্যারাস করার জন্য আমরা দুঃখিত।”
আরভান আয়াতের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বাঁকা হেসে পুলিশকে বলল, “ইটস ওকে অফিসার। চাইলে আরও খুঁজুন। এমনকি আজকের রাতটা এখানে থেকেও যেতে পারেন। আমাদের একটা এক্সট্রা রুম আছে। আমি আর আমার স্ত্রী তো একটাই রুমে ঘুমাই, সারারাত জড়িয়ে ধরে কাটাই, বাকিটা যদি একা কাটাতে আপনাদের কষ্ট হয়—আহ্!”
আয়াত আর সহ্য করতে পারল না। সে আরভানের পায়ের ওপর সজোরে একটা লাথি বসিয়ে দিয়ে গটগট করে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। যাওয়ার সময় বিড়বিড় করে বলল, “আস্ত অসভ্য একটা!!”
আরভান ব্যথায় পা চেপে ধরে একগাল হাসল। পুলিশ আর স্মিথ থমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল, আর আরভান নিজের বিজয়ের তৃপ্তি নিয়ে আয়াতের পিছু পিছু ভেতরে ঢুকে গেল।
চলবে..

