#পর্ব_৪৯
#আমার_হয়ে_থেকো
#Tasnim_Riya_khan
_
একটি বিলাসবহুল, বিশাল ডাইনিং হলের চারপাশটা এখন শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ। মেঝে থেকে শুরু করে শ্বেতপাথরের দেয়াল পর্যন্ত সর্বত্র ছিটকে আছে তাজা রক্ত। টেবিলের ওপর এবং ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে কয়েকজনের নিথর, রক্তাক্ত শরীর। ৪-৫ জন মানুষের দেহ এমন নৃশংসভাবে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে যে, তাদের চেনার উপায় নেই। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আছে কাঁচা রক্তের তীব্র, কটু গন্ধে। আরভানের পুরো শরীর জুড়ে তখন রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। তার হাতের ধারালো অস্ত্রটা থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে মেঝেতে পড়ছে।
তার ঠিক সামনেই স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এলিনা চৌধুরী। তার সমস্ত অবয়ব জুড়ে এক জমাটবদ্ধ শীতলতা। এলিনা চৌধুরী একবার নিজের রক্তমাখা কাঁপতে থাকা হাতের দিকে তাকাচ্ছেন, তো পরক্ষণেই আবার সামনে পড়ে থাকা সেই বিশেষ মৃত, নিথর দেহটার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চোখ রাখছেন।তার চোখ ফেটে নোনা অশ্রু নেমে আসলেও, তিনি এক পা এগিয়ে গিয়ে সেই লাশ নামক নিথর শরীরটাকে ছুঁয়েও দেখলেন না। এক অদ্ভুত চাতুর্য আর রহস্যময় নীরবতা গ্রাস করেছে তাকে।কিন্তু এই বীভৎসতা, এই চরম মনস্তাত্ত্বিক ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল ঠিক…
কয়েক ঘণ্টা আগে…
হাসপাতালের ওটি-র বাইরে তখন দীর্ঘ এক সপ্তাহের মতো থমথমে এক নীরবতা বিরাজ করছে। আরভান এখন সম্পূর্ণ নিস্পৃহ, পাথর হয়ে বসে আছে। তার চোখ দিয়ে এখন আর এক ফোঁটা পানিও পড়ছে না, কিংবা সে কোনো প্রকার আহাজারিও করছে না। তার ভেতরের তীব্র উন্মাদনা আর কান্না যেন কোন এক গভীর, অন্ধকার মনস্তাত্ত্বিক স্তরে গিয়ে জমাট বেঁধে গেছে। একদিকে তার স্ত্রী আয়াতে জীবন-মৃত্যুর লড়াই চলছে, আর অন্যদিকে তার এক মাসের কলিজার টুকরো আইরা। আনায়াকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ওটি থেকে বের করার পর থেকেই আরভান মেয়েটাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে আছে।
এরই মাঝে শাহজাদির জ্ঞান ফিরেছে। তার মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ করা। জ্ঞান ফেরার পর শাহজাদির মুখ থেকে সেই বিকেলের প্রতিটি ঘটনার বিবরণ, আরশাদ চৌধুরীর প্রতিটি কুৎসিত আঘাত আর স্বীকারোক্তির কথা শোনার পর থেকেই আরভান এইরকম পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেছে। সে নিজের বুকের সাথে অনায়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অপলক দৃষ্টিতে শূন্যে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটো রক্ত জবার মতো লাল, যেন সেখান থেকে যেকোনো মুহূর্তে তীব্র অগ্নিশিখা বের হয়ে চারপাশ পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।
মাঝেমধ্যে আরভান অবচেতনভাবেই বুকের ভেতরের মেয়েটাকে বড্ড বেশি জোরে চেপে ধরছিল, যার কারণে এক মাসের পুঁচকে মেয়েটা ব্যথায় কেঁদে উঠছিল। শাহজাদি অত্যন্ত ভয় পেয়ে আলতো পায়ে এগিয়ে এসে আনায়াকে নিজের কোলে নিতে চাইল, কিন্তু আরভান পুরোটা সময় কারো কাছে নিজের মেয়েকে দিল না। তার চাউনি তখন এমন হিংস্র ছিল, যেন এই হাসপাতালের প্রত্যেকেই তার মেয়ের ক্ষতি করতে এসেছে, কেউ তাকে স্পর্শ করলেই সে তাকে ছিঁড়ে ফেলবে। অবশেষে ফারহান অনেক খোঁজাখুঁজি করে এক মাসের বাচ্চার জন্য দুধের ব্যবস্থা করে আনলে, এক প্রকার জোর করেই আরভানের বুক থেকে মেয়েকে ছাড়িয়ে নিয়ে খাওয়ানো হলো।
ঠিক তখনই দীর্ঘ সময় পর অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা নিভে গেল। একজন ডাক্তার ক্লান্ত পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, আরভান তার কাছে এগিয়ে গেল না, কিংবা আয়াতের অবস্থা কেমন তা জানতেও চাইল না। সে যেন এক জ্যান্ত লাশ হয়ে ওখানেই বসে রইল। অথচ কিছুক্ষণ আগেও এই আরভানই পাগলের মতো হাসপাতালের করিডোরে ছোটাছুটি করেছে, এক ব্যাগ রক্তের জন্য পুরো মেলবোর্ন শহর ওলটপালট করে ফেলেছে। ফারহান অবাক চোখে আরভানের দিকে তাকিয়ে রইল; সে কোনোভাবেই নিজের চেনা এই আরভানকে মেলাতে পারছে না। এই নীরবতা যেন কোনো এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।
ডাক্তার ফারহান ও শাহজাদির দিকে এগিয়ে এসে তাদের আশ্বস্ত করে মৃদু গলায় বললেন, “ডোন্ট ওয়ারি। বেবি অ্যান্ড মাদার.. বোথ আর আউট অফ ডেঞ্জার নাউ।”
ফারহান ভেবেছিল এই শুভ সংবাদটা শোনামাত্রই আরভান হয়তো আয়াতকে দেখার জন্য পাগলের মতো ডাক্তারের ওপর চড়াও হবে, আইসিইউ-র দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকবে। কিন্তু তার সব ভাবনাকে উল্টে দিয়ে আরভান কিছুই করল না। সে আগের মতোই নিশ্চল, নির্বাক হয়ে বসে রইল।
শাহজাদি অত্যন্ত উদগ্রীব হয়ে ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বলল, “ডক্টর, আমি কি আমার ভাবির সাথে একটু দেখা করতে পারি? দূর থেকে হলেও?”
ডাক্তার মাথা নাড়িয়ে বললেন, “নো,। এখনো ওনার জ্ঞান ফেরেনি। তাই এই মুহূর্তে কাউকেই ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া যাবে না।”
শাহজাদি আর ফারহান অত্যন্ত হতাশ ও চিন্তিত মুখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই হঠাৎ আরভান সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। অত্যন্ত ধীর ও ভারী পায়ে হেঁটে সে আইসিইউ-র বিশাল কাঁচের দেয়ালটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতরের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে দুটো শয্যা—একটিতে আয়াত নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে, তার সমস্ত শরীরে নানাবিধ পাইপ আর ওপাশে তার আদুরে আইরা শুয়ে আছে, যার ছোট্ট হাতে সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো।
আরভান এতক্ষণ নিজের ভেতরের সমস্ত আবেগ পাথর চাপা দিয়ে রাখলেও, এই দৃশ্য দেখে আর পারল না। তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু পরক্ষণেই সে তার শক্ত হাত দিয়ে সেই অশ্রু মুছে ফেলল। তার চোখের মণি তখন এক চরম মনস্তাত্ত্বিক হিংস্রতায় রূপ নিয়েছে। সে ফারহানের দিকে না তাকিয়েই, আইরনের মতো শক্ত ও শীতল গলায় শুধু বলল, “আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার পুরো পরিবারের দায়িত্ব তোর, ফারহান।”
কথাটা বলেই সে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, সোজা করিডোর বেয়ে লিফটের দিকে হাঁটা দিল।
ফারহান প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। তবে আরভানের এই বরফশীতল শান্ত ভাব দেখে সে স্পষ্ট বুঝতে পারল—আরভান আজ বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে যাচ্ছে, মেলবোর্নের বুকে আজ কারো রক্ত গঙ্গা বইবে। সে অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে শাহজাদিকে ওখানেই থাকতে বলে আরভানের পিছু নিল। আরভান যখন পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ফারহানের পায়ের শব্দ পেয়ে সে আচমকা থমকে দাঁড়াল। নিজের গাড়ি ঘোরানোর আগেই আরভান পেছন ফিরে অত্যন্ত ধারালো, গম্ভীর ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল, “আমি আমার পেছনে আসতে বলিনি, ফারহান। যেখানে যাচ্ছি, সেখানে তোর কোনো জায়গা নেই।”
ফারহান আরভানের সেই চাহনি দেখে থমকে ওখানেই দাঁড়িয়ে গেল। তার বুকে আরভানের অবাধ্য হওয়ার মতো সাহস হলো না। কিন্তু আরভান নিজের গাড়িতে উঠে এক প্রচণ্ড গতিতে স্পিড বাড়িয়ে হসপিটালের সীমানা পার হয়ে গেল। তার এই যাত্রার পেছনে যেন কোনো এক আদিম এবং পূর্বপরিকল্পিত আসক্তি কাজ করতে শুরু করেছে, যা আজ কোনো এক চরম রক্তের তৃষ্ণা মিটিয়েই শান্ত হবে।
*******
শহরের একপ্রান্তে অবস্থিত বিশাল, সুরম্য এক বিলাসবহুল ভিলা। চারদিকের নিস্তব্ধতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেই ভিলার ভেতরে তখন চলছে এক পৈশাচিক উৎসবের আমেজ। আরশাদ চৌধুরী যেন খুশিতে একেবারে মঁদ হয়ে আছেন। একের পর এক মদের বোতল খালি হচ্ছে, আর তাকে ঘিরে নাচছে অর্ধনগ্ন পোশাকে থাকা কিছু অস্ট্রেলিয়ান বার-ড্যান্সার নারী। আরশাদ চৌধুরীর ঠোঁটের কোণে এক কুৎসিত, অহংকারী জয়ের হাসি। তিনি ভাবছেন, এতদিনে তার পথের সব কাঁটা উপড়ে গেছে।
তবে এই আমোদ-প্রমোদের আড়ালে ভিলার চারপাশের নিরাপত্তা ছিল চোখে পড়ার মতো। কালো পোশাক পরিহিত, বিশাল দেহী একঝাঁক বাউন্সার আর পেশাদার পাহারাদার পুরো ভিলাটাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে অত্যাধুনিক লোডেড বন্দুক। আরশাদ চৌধুরী নিশ্চিতভাবেই জানেন যে আরভান আসবে। তার পজেসিভ, উন্মাদ ছেলেটা যে নিজের স্ত্রী আর সন্তানের এই অবস্থা দেখে রক্তপিপাসু হয়ে ছুটে আসবে, তা তিনি খুব ভালো করেই জানতেন। আর সেই জানাকে কেন্দ্র করেই তিনি আজ এই ভিলাকে এক দুর্ভেদ্য কসাইখানায় রূপ দিয়ে আরভানের জন্য ফাঁদ পেতে রেখেছেন।
ঠিক তখনই ভিলার সদর দরজার সামনে এসে সশব্দে থামল আরভানের সেই কালো গাড়িটি।
গাড়ির ভেতরে বসে থাকা আরভানের চোখের মণি দুটো তখন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। তার হাতের ফোনে তখনো চলমান রয়েছে আয়াতের ঘরের সেই (Hidden Camera) ক্যামেরার ফুটেজ।
আয়াত আর বাচ্চাদের ওপর হামলার সেই প্রতিটি দৃশ্য সে নিজের চোখে দেখেছে। তার শক্ত চোয়াল রাগে আর যন্ত্রণায় পিষে যাচ্ছিল। আরশাদ চৌধুরী ভেবেছিলেন আরভানের বাড়ির সব মেইন সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট করে দিয়ে তিনি খুব বড় চাতুরির কাজ করেছেন। কিন্তু সেই বোকা লোকটা এটা জানত না যে আরভানের তীক্ষ্ণ নজরদারির বাইরে ওই বাড়ির একটা ধূলিকণাও নড়াচড়া করতে পারে না। নিজের শোবার ঘরের প্রতিটি গোপন কোণ যে তার নখদর্পণে, তা আরশাদ চৌধুরীর চতুর মস্তিস্ক ধরতে পারেনি।
আরভান ধীর পায়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। তার অবয়বে কোনো তাড়া নেই, কিন্তু তার পুরো শরীর থেকে এক আদিম, হিংস্র খুনে হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল। ভিলার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আরশাদ চৌধুরীর পাহারাদারদের প্রায় প্রত্যেকেই আরভান চৌধুরীকে চেনে। মেলবোর্নের আন্ডারগ্রাউন্ডের বেতাজ বাদশাহকে দেখে স্বভাবতই তারা প্রথমে কোনো আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
কিন্তু আরভানের চোখ তখন ভিড়ের মাঝে অন্য কিছু খুঁজছিল। সে নিখুঁত দৃষ্টিতে প্রতিটি গার্ডের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। তার দরকার সেই নরপশুকে, যে আজ দুপুরে তার মায়াবতী আয়াতের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে রাখার দুঃসাহস দেখিয়েছিল।
হঠাৎ করেই আরভানের চোখ গিয়ে পড়ল সেই লোকটার ওপর। ব্যস, পরমুহূর্তেই কোনো সুযোগ না দিয়ে আরভান চিতার গতিতে লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আকস্মিকভাবে লোকটা মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতেই আরভান তার বুট জুতো দিয়ে লোকটার পিঠ চেপে ধরল। কোনো দয়ামায়া বা দ্বিধা ছাড়া, আরভান নিজের দুই হাত দিয়ে টেনে লোকটার দুটি হাত শরীর থেকে টেনে হিঁচড়ে আলাদা করে ফেলল! তীব্র যন্ত্রণায় লোকটা আর্তনাদ করে ওঠার আগেই আরভান নিজের হাতের দুটি আঙুল সজোরে লোকটার চোখের কোটরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে চোখ দুটো উপড়ে নিল!
নিজের দলের একজনকে চোখের পলকে এভাবে জীবন্ত লাশ হয়ে যেতে দেখে বাকি সমস্ত গার্ডরা মুহূর্তের মধ্যে ভড়কে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই আরশাদ চৌধুরীর কঠোর নির্দেশ মনে পড়তেই তারা একযোগে আরভানের ওপর চড়াও হলো। উপর মহল থেকে তাদের স্পষ্ট আদেশ ছিল—আরভান যদি নিজে থেকে কিছু না করে তবে তাকে যেন ছোঁয়া না হয়, কিন্তু সে যদি কোনো প্রতিরোধ করে, তবে তাকে যেন জ্যান্ত না ছাড়া হয়।
তবে আরভান আজ একা আসেনি। তার ইশারার অপেক্ষায় থাকা আন্ডারগ্রাউন্ডের নিজস্ব লোকগুলো চারপাশ থেকে অতর্কিতে গুলি চালানো শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভিলার সামনে লাশের স্তূপ জমে গেল। সেই গোলাগুলির মাঝে আচমকা একটা তপ্ত বুলেট এসে বিঁধল আরভানের নিজের বাম বাহুতে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে এসে তার গায়ের কালো শার্টটাকে ভিজিয়ে দিল। কিন্তু আরভানের মুখে কোনো যন্ত্রণার রেখা ফুটল না। সে এক হাত দিয়ে নিজের গায়ের শার্টটা খুলে অবলীলায় সেই ক্ষতস্থানে শক্ত করে বেঁধে নিল, যেন ওই বুলেটটা তার চামড়াও স্পর্শ করতে পারেনি।
গুলির লড়াই শেষে চারদিক যখন নিস্তব্ধ, তখন আরভান সেই লাশের স্তূপের মাঝখান থেকে অধমরা হয়ে বেঁচে থাকা সেই দুটো লোককে খুঁজে বের করল—যারা আজ দুপুরে তার আয়াতকে স্পর্শ করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। আরভান তাদের সেই অর্ধমৃত, ক্ষতবিক্ষত শরীর দুটোকে কুকুরের মতো টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে ভিলার দ্বিতীয় তলার সেই বিলাসবহুল হলের দিকে এগোতে লাগল। মেঝেময় রক্তের এক দীর্ঘ দাগ রেখে সে হলের দরজা লাথি মেরে খুলে ভেতরে ঢুকল।
আরভানের এমন আকস্মিক ও ভয়ঙ্কর আগমনে হলের ভেতরের ড্যান্সার নারীদের নাচ থমকে গেল। তারা আতঙ্কে চিৎকার করে পেছনের দেয়ালে গিয়ে সেঁধিয়ে গেল। সবার চোখ গিয়ে আটকাল দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটার দিকে। আরভানের চোখের মণি দুটো তখন টকটকে লাল, রক্তপিপাসু। তার সারা শরীর জুড়ে শত্রুর রক্তের ছড়াছড়ি, আর তার নিজের হাতের ক্ষতস্থান থেকেও তরল রক্ত শার্টের বাঁধন ভেদ করে মেঝেতে চুইয়ে পড়ছে। তাকে দেখতে অবিকল এক নরখাদক জল্লাদের মতো লাগছিল।
আরভান মুখে কোনো কথা বলল না। সে অত্যন্ত শান্ত ও নিস্তব্ধ ভঙ্গিতে সেই আধমরা লোক দুটোকে সোজা আরশাদ চৌধুরীর পায়ের সামনে এনে ছুড়ে ফেলল। তারপর নিজের কোমর থেকে চকচকে, ভারী একটা কুঠার বের করল। আরশাদ চৌধুরীর স্তম্ভিত চোখের সামনেই আরভান সেই ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসল। কোনো রকম বিকার ছাড়া, শীতল মাথায় সে কুঠার দিয়ে সেই জীবন্ত লোক দুটোর হাত-পাগুলোকে শরীর থেকে কুচি কুচি করে কাটতে শুরু করল! তাদের হাতের আঙুলগুলো সহ পুরো হাতটা সে মাংসের টুকরোর মতো কেটে আলাদা করে দিল, এবং এক কোপে তাদের বুঁজে আসা চোখ দুটো উপড়ে নিল।
পুরোটা সময় জুড়ে সেই হলের ভেতর লোক দুটোর বুকফাটা, পৈশাচিক আর্তনাদ বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সেই বীভৎস দৃশ্য দেখে ড্যান্সার নারীরা ভয়ে ও আতঙ্কে চিৎকার করে হলরুম থেকে যে যেদিকে পারল পালাতে শুরু করল। সেই আওয়াজ পেয়ে বাইরে থেকে আরশাদ চৌধুরীর আরও কয়েকজন বিশ্বস্ত বডিগার্ড অস্ত্র উঁচিয়ে হলের ভেতর ঢুকতে চাইল। কিন্তু আরভান তাদের দিকে না তাকিয়েই, নিজের কোমরে গোঁজা পিস্তল বের করে পেছনে অন্ধের মতো গুলি ছুঁড়ল। নিখুঁত লক্ষ্যে সেই বডিগার্ডদের কপাল ফুটো হয়ে গেল। রক্তের স্রোত ধুয়ে দিল হলের দামি কার্পেট।
কিন্তু এই পুরোটা সময় আরশাদ চৌধুরী নিজের সোফায় জমে পাথর হয়ে বসে রইলেন। আরভান শক্ত মুখে, একদৃষ্টিতে তার বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে এই পুরো হত্যাকাণ্ডটি সম্পন্ন করল। তার চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, আছে শুধু এক গভীর, মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা।
হত্যাকাণ্ড শেষ করে আরভান রক্তের অববাহিকা থেকে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। সে আরশাদ চৌধুরীর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে, নিজের শার্টের বাম বাহুর বাঁধনটা এক ঝটকায় খুলে ফেলল। নিজের তাজা রক্তে ভেজা সেই ক্ষতটা আরশাদ চৌধুরীর চোখের সামনে মেলে ধরে, ইশারায় অত্যন্ত শান্ত কিন্তু ধারালো কণ্ঠে বলল, “আপনার রক্ত… মিস্টার চৌধুরী। ভালো করে তাকিয়ে দেখুন, আপনার অহংকারের রক্ত আজ কতটা অবহেলিত, কতটা জঘন্য ও নোংরা নর্দমার সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে!”
আরভান তার পাথুরে মুখাবয়ব নিয়ে আরও একধাপ এগিয়ে এল।
“আমার সন্তানকে কেন মারলেন মিস্টার চৌধুরী? সে আপনার ঠিক কোন সাম্রাজ্যটা ভাগ করে নিয়েছিল, বলবেন কি?”
আরশাদ চৌধুরী মনে মনে নিজের ছেলের এই আদিম, সাইকোপ্যাথিক রূপ দেখে ভেতরে ভেতরে চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তার মেরুদণ্ড বেয়ে ভয়ের এক শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু নিজের দীর্ঘদিনের অহংকার আর গাম্ভীর্য ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে তিনি কঠিন গলায় বললেন— “ওরা আমাদের অনেক বড় ক্ষতি করেছিল আরভান! ওই মেয়ের মা-ও অতীতে আমার অনেক বড় ক্ষতি করেছিল, আর এই মেয়েও তোর মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছিল। এরা সবাই মিলে আমার নিজের তৈরি সাম্রাজ্য থেকে, আমার নিজের ছেলের থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছিল। তুমি আমার কথা শোনা বন্ধ করে দিয়েছিলে, আমার অন্ধ অনুগত থাকা বন্ধ করে দিয়েছিলে! নিজের বাবাকে অমান্য করার জন্য আর কী কারণ লাগবে আরভান, বলো?”আরভান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। সে এক দৃষ্টিতে তার জন্মদাতার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করেই সে এক উন্মাদের মতো শব্দ করে হাসতে লাগল। তার সেই অট্টহাসিতে হলের ঝাড়বাতিগুলো যেন কেঁপে উঠল। আরভানের এই অপ্রকৃতিস্থ হাসি দেখে আরশাদ চৌধুরী এবার সত্যি সত্যিই ভড়কে গেলেন, তার চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আরভান নিজের দুই হাত আরশাদ চৌধুরীর চোখের সামনে মেলে ধরে গভীর আবেগে ও শান্ত স্বরে বলতে লাগল, “জানেন মিস্টার চৌধুরী? ছোটবেলায় আমার একজন বাবা ছিল। আমার পুরো দুনিয়াটা ছিল ওই একটা মানুষকে কেন্দ্র করে। এই হাত দুটো ধরে তিনি আমাকে প্রথম হাঁটতে শিখিয়েছিলেন… শিখিয়েছিলেন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে কীভাবে টিকিয়ে রাখতে হয়। নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করতাম আমি তাকে। তিনি উঠতে বললে উঠতাম, বসতে বললে বসতাম। তিনি নিজের হাতের পুতুলের মতো আমাকে নাচাতেন, আর আমিও এক পরম ভক্তের মতো নাচতাম। একদিন তিনি আমাকে একটা ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গেলেন। আমাকে বললেন— আমি তার রক্তের মর্যাদা রাখতে পারি কি না, আজ তার পরীক্ষা হবে।আদো আমি তার সন্তান নাকি অন্য কারো? আমি তো তখন এক অবুঝ বোকা বালক! আমি বুঝিনি যে তিনি আমার মায়ের চরিত্রের দিকে আঙুল তুলছিলেন। আমি তখন নিজেকে আমার বাবার যোগ্য সন্তান প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে বুক ফুলিয়ে সেই বিষাক্ত ড্রাগের ইনজেকশন নিজের শরীরে নিয়ে নিলাম!”
আরভানের গলার স্বর এবার কিছুটা ভারী হয়ে এল, চোখের কোণে এক ফোঁটা অশ্রু টলমল করে উঠল। “ড্রাগটা শরীরে ঢুকতেই আমি যন্ত্রণায় চিৎকার করেছিলাম, ফ্লোরে শুয়ে ছটফট করেছিলাম। অথচ আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার ‘বাবা’ নামক সেই লোকটা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিল, আমাকে একটু ছুঁয়ে সান্ত্বনা দিতেও এগিয়ে আসেনি। আমি জ্ঞান হারালাম। এরপর থেকে আমার ওপর সেই ড্রাগের ডোজ দিন দিন বাড়তে লাগল। কারণ আমাকে শক্তিশালী হতে হবে, বাবার যোগ্য হতে হবে! আমি সেই তীব্র যন্ত্রণা, সেই নারকীয় ব্যথা—সবকিছুকে বাবার ভালোবাসা ভেবে নীরবে সহ্য করে গেলাম।”
“তারপর বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন বাংলাদেশে। বাবার একটা মাত্র কথায়, সতেরো বছর বয়সী আমি কোনো কিছু না ভেবে বিয়ে করে নিলাম একটা অবুঝ বাচ্চা মেয়েকে। অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসার পর মায়ের সাথে আমার দূরত্ব তৈরি করা হলো। আমার শরীরে যখন সেই মরণব্যাধি হৃদরোগ ধরা পড়ল, তখনও আমি মাকে কিছু বলিনি। কারণ? কারণ আমি আমার সেই বাবার ওপর অন্ধের মতো বিশ্বাস রাখতাম, তিনি যে আমার পুরো পৃথিবী ছিলেন! এরপর ধীরে ধীরে মায়ের সাথে আমার সম্পর্কের তিল তিল করে অবনতি ঘটানো হলো। আর বাবা? আপনি আমার হৃদরোগের কথা জানার পরেও নিজের স্বার্থে আমার শরীরে বিভিন্ন ক্ষতিকারক ড্রাগের ডোজ পুশ করিয়ে গেলেন! ফলাফল? আমি এতটাই ড্রাগ অ্যাডিক্টেড হয়ে গেলাম যে আমাকে নিজের ঘর ছেড়ে রিহ্যাব সেন্টারে গিয়ে বছরের পর বছর কাটাতে হলো! ছাড়তে হলো আমার নিজের চেনা বাড়ি।”
আরভানের শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হতে লাগল, তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গাল বেয়ে রক্তের সাথে মিশে গেল। “এরপর আমার পুরো পৃথিবীটা হয়ে গিয়েছিল এক অন্ধকার কুঠুরি। না ছিল বাঁচার আশা, না ছিল জীবনের প্রতি কোনো মায়া। কিন্তু সেই ঘন অন্ধকারে আমার জীবনে আলো হয়ে এল… একটা মেয়ে। আয়াত! সে হয়ে উঠল আমার এই মৃত শরীরে প্রাণ ফেরাানোর একমাত্র কারণ, আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। বাবার ওপর তখনো আমার এক অবাধ্য মায়ার জাল বোনা ছিল। অথচ আমার সেই বাবা? তিনি শুধু নিজের সন্তানকে নিজের যোগ্য বানাতে চাননি, তিনি তাকে কোনোদিন সন্তান হিসেবেই গণ্য করেননি! শুধু নিজের স্বার্থে, নিজের ক্ষমতার লোভে একটা দাবার ঘুঁটির মতো ব্যবহার করেছেন। এমনকি আমার মাকেও তিনি ভালোবেসে নয়, নিজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করেছিলেন। কী অদ্ভুত এই সংসার! কী অদ্ভুত এই পরিবার, তাই না মিস্টার চৌধুরী? যেখানে একজন লোক নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দিতে পারল না, পারল না নিজের সন্তানের বাবা হতে—সে শুধু হয়ে রইল একজন সাইকো প্রেমিক, একজন ক্ষমতা লোভী অবৈধ ব্যবসায়ী!”
আরভান তার ভেতরের সমস্ত জমে থাকা শৈশবের স্মৃতি উগরে দিয়ে বলতে লাগল, “ছোটবেলায় আপনি আমার সবকিছু ছিলেন। মনে আছে? আপনার হাত ধরে আমি মাইল কে মাইল পথ হেঁটেছিলাম। আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন— ‘পা ব্যথা করছে আরভান?’ আমি তখন পায়ে প্রচণ্ড তীব্র ব্যথা নিয়েও মিথ্যে বলেছিলাম— ‘না বাবা, ব্যথা করছে না।’ কারণ আমি শুধু আপনার পাশে পাশে হাঁটতে চেয়েছিলাম, আপনার একটুখানি মনোযোগ পেতে চেয়েছিলাম। আপনি যখন আমাকে প্রথমবার সেই ল্যাবে নিয়ে গিয়েছিলেন, আমাকে বলেছিলেন— এই একটা সাধারণ ইনজেকশন আপনার জীবন বদলে দেবে, আপনার জীবনে সুখ এনে দেবে। আমি আপনার সেই মুখের কথাকে সত্যি মেনে, আপনাকে সুখী করতে নিজের জীবন বাজি রেখেছিলাম!”
আরভানের কণ্ঠস্বর এবার এক অদ্ভুত শান্ত অথচ ভয়ঙ্কর রূপ নিল। “যখন ওই ইনজেকশন আমার শরীরে প্রবেশ করত, আমার শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকা যখন ফুটন্ত তেলের মতো টগবগ করে ফুটত, আমি যন্ত্রণায় ছটফট করতাম, কাঁদতাম, আর পরিশেষে জ্ঞান হারাতাম। আমি যখন বলতাম— ‘বাবা, আমি আর এসব নিতে পারছি না,’ আপনি তখন আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে বলতেন— ‘তাহলে আমি এই দুনিয়ায় বেশিদিন টিকবো না আরভান।’
আপনার মৃত্যুর ভয়, আপনার হারিয়ে যাওয়ার ভয় বুকে নিয়ে আমি সেই নারকীয় যন্ত্রণা দিনের পর দিন সহ্য করেছি, এমনকি মম-কেও কিচ্ছুটি জানতে দিইনি। অথচ আপনি খুব ভালো করেই জানতে মিস্টার চৌধুরী— যে ড্রাগ আপনি আমার শরীরে পুশ করাচ্ছেন, তা আমার হৃদপিণ্ডের প্রাচীরকে তিলে তিলে পাতলা করে দিচ্ছে! ওটা যেকোনো দিন ফেটে আমি মারা যেতে পারতাম। শুধু মাত্র ক্ষমতা আর টাকার লোভে আপনি নিজের সন্তানকে তিলে তিলে খুন করছিলেন!”
আরশাদ চৌধুরী এতক্ষণ পর এক অদ্ভুত, নিষ্ঠুর হাসি হাসলেন। সোফায় হেলান দিয়ে বললেন, “এই দুনিয়ায় সম্পর্ক বলতে আদতে কিছু হয় না আরভান। সবটাই স্বার্থের খেলা।”
”হ্যাঁ, তা তো ঠিকই!” আরভানের ঠোঁটের কোণে এক মারাত্মক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। “তা না হলে যে পুরুষ একটা সময় এক নারীকে ভালোবেসেছিল, তাকে নিজের করে না পেয়ে—নিজে এবং নিজের ভাই মিলে সেই নারীর হাসব্যান্ড সহ তাকে নৃশংসভাবে খুন করে দিল কীভাবে? আর সেটাকে একটা সাধারণ রোড অ্যাক্সিডেন্ট বলে পুরো দুনিয়ার সামনে চালিয়ে দিল!”
আরশাদ চৌধুরী এবার তীব্রভাবে চমকে উঠলেন। তার মুখের সমস্ত রক্তের আভাস এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। তিনি চট করে মুখ তুলে নিজের ছেলের চোখের দিকে তাকালেন। আরভানের ঠোঁটের সেই বাঁকা রহস্যময় হাসি যেন এই মুহূর্তে আরশাদ চৌধুরীর এতকাল লুকিয়ে রাখা সমস্ত অন্ধকার অতীতকে এক লহমায় টেনে বের করে এনেছে।
ভয়ে আরশাদ চৌধুরীর গলার স্বর কিছুটা কেঁপে উঠল। তিনি তোতলামো করে জিজ্ঞেস করলেন, “তু… তুমি এসব জানলে কী করে?”
”হুম, জেনে গেছি!” আরভান বরফশীতল কণ্ঠে জবাব দিল। “সব জেনে গেছি। শুধু ওটুকুই নয়, আমি ইহাও জেনে গেছি যে আপনি আপনার নিজের শ্বশুরকেও ঠান্ডা মাথায় খুন করিয়েছিলেন, আমার শ্রদ্ধেয় আব্বুজান!”
আরভানের মুখ থেকে এমন শান্ত ভঙ্গিতে প্রথমবার ‘আব্বুজান’ ডাকটা শুনে আরশাদ চৌধুরীর মনে এক চরম অশনি সংকেত দানা বাঁধল। তিনি বুঝতে পারলেন, এই শান্ত রূপটাই আরভানের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ।
আরভান কুঠারটা মাটিতে ফেলে দিয়ে আরশাদ চৌধুরীর একদম মুখোমুখি বসে বলল, “এখন আপনার সাথে আমার কী করা উচিত বলুন তো? আপনারই তো রক্ত আমার শরীরে বইছে, তাই না? তাহলে বলুন, একজন চৌধুরীর তার শত্রুর সাথে কী করা উচিত?”
আরশাদ চৌধুরী বেগতিক দেখে এবার সুর নরম করার চেষ্টা করলেন। কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, “দেখো আরভান… এটা সত্যি যে অতীতে আমি অনেক ভুল করেছি। কিন্তু আমি তোমার সন্তানদের মারতে চাইনি! ওটুকু হাত কাটায় কোনো বাচ্চার মৃত্যু হয় না আরভান, বিশ্বাস করো!”
আরভান এবার হা হা করে এক বিকট অট্টহাসি হেসে উঠল। এতক্ষণ যে ছেলেটা নিজের শৈশবের যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে চোখের জল ফেলছিল, তার এই হঠাৎ পৈশাচিক হাসি দেখে আরশাদ চৌধুরী আতঙ্কে সোফার সাথে সেঁধিয়ে গেলেন।
আরভান তার হাসি থামিয়ে এক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের চোখ দুটোকে পশুর মতো হিংস্র করে আরশাদ চৌধুরীর কলারটা চেপে ধরে বলল, “আমি কখন বললাম যে আপনি আমার সন্তানকে মেরে ফেলেছেন? ওদের শরীরে যে আঘাত লেগেছে, ওদের কচি শরীর থেকে যে এক এক ফোঁটা তাজা রক্ত ঝরেছে—তার হিসাব কে দেবে? আপনি যদি একটা পরনারীর জিদ আর আকর্ষণের জন্য এতগুলো মানুষকে খুন করতে পারেন, তবে আমি আমার নিজের হালালকৃত স্ত্রী আর সন্তানদের গায়ে হাত তোলার জন্য আপনার সাথে কী কী করতে পারি—তা আপনার এই নোংরা কল্পনারও বাইরে মিস্টার চৌধুরী!”
”মা… মানে?” আরশাদ চৌধুরীর ঠোঁট দুটো ভয়ে কাঁপতে লাগল।
আরভান আরশাদ চৌধুরীর মুখটা নিজের দিকে টেনে এনে হিসহিসিয়ে বলল, “মানে খুব সহজ। শুধু আমার বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে, ও যেন আমাকে ভুল বুঝে দূরে সরে না যায়—সেই ভয়ে আমি এতদিন আপনার সব পাপ জেনেও না জানার ভান করে চুপচাপ বসেছিলাম। কিন্তু আজ আপনি আমার জানের ওপর হাত দিয়েছেন। তাই কাল সকালের খবরের কাগজের হেডলাইনটা আমি নিজেই সাজিয়ে এসেছি— ‘নিজের পুত্রবধূ এবং নাতনিদের হত্যার চেষ্টার দায়ে, ক্ষিপ্ত ছেলের হাতে নৃশংসভাবে পিতা খুন!’ কেমন হবে বলুন তো হেডলাইনটা, মিস্টার আরশাদ চৌধুরী
নোট: ব্যস্ততার কারণে ইদানীং গল্প লিখতে পারছি না, তবুও আজ একটু চেষ্টা করলাম—জানি না কেমন হয়েছে, কোনো ভুলত্রুটি হলে দয়া করে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আজ রাতে ‘হৃদয়ের গহীনে ছিলি তুই’ গল্পটার পর্ব দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তবে ইনশাআল্লাহ্ আজ পুরো রাত জেগে দুটো পর্ব লেখার চেষ্টা করব এবং আগামীকাল রাতে একসাথেই তা পোস্ট করে দেব।
চলবে..
#পর্ব_৫০
#আমার_হয়ে_থেকো
#Tasnim_Riya_khan
_
.
হাসপাতালের সেই ভিআইপি কেবিনটিতে তখন এক গা ছমছমে নীরবতা। চারদিকের ধবধবে সাদা দেয়াল, স্যালাইনের স্ট্যান্ড আর মনিটরের নিয়মিত ‘বিপ বিপ’ শব্দ কেবিনের ভেতরের শূন্যতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। মাঝরাতে যখন আয়াতের চোখ ফুটল, তখন তার পুরো শরীরে এক তীব্র, অবর্ণনীয় ব্যথার ঢেউ খেলে যাচ্ছে। পিঠের ডানপাশটা যেন কেউ তপ্ত কয়লা দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। অবশ মস্তিস্কটা প্রথমে চারপাশের কোনো কিছুই গ্রহণ করতে পারছিল না; চোখের পাতা দুটো ছিল সীসার মতো ভারী। ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফোটার পর যখন মস্তিস্ক কিছুটা সচল হলো, তখন তার মনে পড়ল সেই নারকীয় বিকেলের কথা। বুকটা এক অজানা আতঙ্কে ধক করে উঠল।
সকাল হতেই শাহজাদি আর ফারহান কেবিনে এসে তার সাথে দেখা করে গেছে। শাহজাদির কপালে সাদা ব্যান্ডেজ, চোখ দুটো ফোলা। ফারহানের চোখে-মুখেও ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। তারা আয়াতকে সান্ত্বনা দিয়েছে, কপালে হাত বুলিয়ে দিয়েছে, কিন্তু যার জন্য আয়াতের চাতক পাখির মতো প্রতীক্ষা—সেই আরভান চৌধুরী একবারের জন্যও এই কেভিনে পা রাখেনি। নার্সরা এসে বাচ্চাদের ফিডিং র ব্যাপারে সাহায্য করছিল। মনিটরের ওপাশে অন্য একটা বিশেষ কেবিনে তার দুটো সন্তানকে রাখা হয়েছে। তারা দুজন যে বেঁচে আছে, সুস্থ আছে—এটার জন্য আল্লাহর দরবারে হাজারো শুকরিয়া আদায় করল আয়াত। আইরার ছোট্ট বাহুতে ব্যান্ডেজ করা, তবে ডাক্তাররা জানিয়েছেন ভয়ের কিছু নেই।
কিন্তু আরভান কোথায়? এই একটা প্রশ্ন আয়াতের বুকের ভেতর অনবরত হাতুড়ি পেটার মতো বাজতে লাগল। শুধু আরভানই নয়, আজ সারাটা দিনে এলিনা চৌধুরীও একটিবারের জন্যও তাকে দেখতে আসেননি। যে নারী এতদিন তাকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রেখেছিলেন, পরম মায়ায় বুকে টেনে নিয়েছিলেন, আজ তার এই চরম পরিস্থিতিতে তিনি পাশে নেই! আসবেনই বা কীভাবে? তার নিজের স্বামীই তো এই পুরো ধ্বংসযজ্ঞের মূল হোতা! আরশাদ চৌধুরীর সেই পৈশাচিক মুখটা মনে পড়তেই আয়াতের পুরো শরীর কাঁপতে লাগল। চোখ ফেটে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। জানালার ওপাশে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের সামনে ভেসে উঠল তার নিজের বাবা-মায়ের হাসিমুখের সেই ফ্রেমবন্দি ছবিটা। ওই নোংরা, পিশাচ লোকটার জন্য সে নিজের শৈশব হারিয়েছিল, আর আজ আবারও সেই একই মানুষের জন্য সে তার নিজের সাজানো পরিবারকে চিরতরে হারাতে বসেছে! আয়াতের মনের কোণে এক গভীর, সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল—তবে কি এলিনা চৌধুরীও এই সবকিছুর সাথে জড়িত ছিলেন? এতদিন যে ভালোবাসার নাটকটা তিনি করে গেছেন, তা কি শুধুই আরভানের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য?আয়াতের মনের মধ্যে একটু সংশয় দানা বাধলো আরভান কি আদো তার বাবারে কুৎসিত রূপ সম্পর্কে জানা আছে?
চিন্তা করতে করতে সকাল পেরিয়ে বিকেল হলো, বিকেল গড়িয়ে রাত নেমে এল মেলবোর্নের বুকে। কিন্তু আরভানের কোনো দেখা নেই। শাহজাদি আর ফারহানকে যতবারই সে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করেছে, “আরভান কোথায়?” ততবারই তারা চোখে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ নিয়ে মুখ লুকিয়ে নানাভাবে কথা এড়িয়ে গেছে। আয়াত চাইলেও জোরে কথা বলতে পারছিল না, শরীরটা সামান্য নাড়ানোর ক্ষমতাও তার ছিল না। পিঠের ক্ষতটা এমনভাবে অবশ হয়ে আছে যে আদো তার শরীরের নিচের অংশ অক্ষত আছে নাকি নেই, সে তা-ই বুঝতে পারছিল না। তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও সে দায়িত্বরত নার্সদের আরভানের কথা জিজ্ঞেস করলে তারা অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে এড়িয়ে গিয়ে বলল, “মিস্টার চৌধুরী আমাদের ওনার ব্যাপারে কিছু বলতে বারণ করেছেন। আপনি এত মানুষের চিন্তা না করে নিজের শরীরটাকে আগে সুস্থ করুন। সন্তানদের জন্য হলেও আপনাকে এখন শক্ত থাকতে হবে, মিসেস চৌধুরী।”
নার্সদের এই একটা কথাই আয়াতের সন্দেহের আগুনকে আরও উস্কে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। যে মানুষটা তার সামান্য একটু চোখের জল দেখলে পুরো দুনিয়া ওলটপালট করে দেয়, যে লোকটা তার ভালোবাসায় এক আস্ত উন্মাদ পাগল—সে আজ পুরো একটা দিন ধরে নিজের রক্তাক্ত স্ত্রী আর এক মাসের কলিজার টুকরো সন্তানদের ফেলে দূরে আছে? এমনটা তো কোনোদিন হতেই পারে না! আয়াতের মনের ভেতর এক চরম ভয়াবহ ভয় দানা বাঁধতে শুরু করল। তবে কি আরশাদ চৌধুরী আরভানেরও কোনো বড় ক্ষতি করে দিল? ওই লোক তো কোনোভাবেই পিতা নামের যোগ্য নয়, সে একটা হিংস্র জানোয়ার! নিজের সন্তানকে বিষাক্ত ড্রাগস দিতে যার হাত কাঁপেনি, সে আরভানের প্রাণ কেড়ে নিতেও দ্বিধা করবে না!
আয়াত আর নিজের ভেতরের এই মানসিক যন্ত্রণা আর ভয়কে ধরে রাখতে পারল না। সে পুরোপুরি অস্থির হয়ে উঠল। তার ভেতরের মাতৃত্ব আর স্ত্রীর অবাধ্য প্রেম এক হয়ে তাকে পাগল বানিয়ে দিল। সে নিজের শরীরের তীব্র যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে, স্যালাইনের পাইপ টান মেরে ছিঁড়ে ফেলে বিছানা থেকে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করল। পিঠের সেলাইগুলো যেন ছিঁড়ে রক্ত বের হতে চাইল।
”নার্স! জলদি আসুন! ম্যাম পাগলামি করছেন!”
একজন নার্সের চিৎকারে ফারহান করিডোর থেকে এক ছুটে কেবিনের ভেতর ঢুকে পড়ল। আয়াতের এই অবস্থা দেখে সে স্তম্ভিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “আয়াত! কী করছ এসব? পাগল হয়েছ তুমি? শুয়ে পড়ো প্লিজ!”
আয়াত ফারহানকে দেখে আরও ক্ষিপ্ত, আরও উগ্র হয়ে উঠল। তার চোখের চাহনিতে তখন এক আদিম হিংস্রতা। সে বিছানার চাদরটা খামচে ধরে ভাঙা, রুদ্ধকণ্ঠে চিৎকার করে বলল, “আপনার ফ্রেন্ড কোথায় ফারহান ভাইয়া? কোথায় আরভান? এখনই, এই মুহূর্তে তাকে আমার সামনে নিয়ে আসুন! আমার আর কিচ্ছু শোনার ধৈর্য নেই, আমার আরভানকে লাগবে!”
“আয়াত, প্লিজ শান্ত হও। তুমি নড়াচড়া করলে পিঠের সেলাই ছিঁড়ে যাবে…” ফারহান তাকে আটকানোর চেষ্টা করল।
“আমি শান্ত হবো না! আমার আরভান কোথায়? ও কেমন আছে? ও কেন একটা বারও এখানে আসলো না? ও কি বেঁচে আছে ফারহান ভাইয়া? নাকি ওই জানোয়ারটা…”
আয়াত আর কথা শেষ করতে পারল না, তার গলা বুঁজে এল।ফারহান হুট করেই চুপ করে গেল। তার মুখের সমস্ত অভিব্যক্তি এক নিমেষে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, চোখের দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ হলো। ফারহানের এই রহস্যময় নীরবতা যেন আয়াতের বুকের ভেতর একটা তপ্ত তীরের মতো বিঁধল। সে নিশ্চিত হয়ে গেল যে আরভানের বড় কোনো বিপদ হয়েছে। সে এক উন্মাদের মতো বিছানায় ছটফট করতে লাগল। নার্সরা তাকে চেপে ধরার চেষ্টা করতেই আয়াতের পিঠের সাদা ব্যান্ডেজটা তাজা রক্তে ভিজে লাল হয়ে উঠল। আয়াত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আরভানের নাম ধরে চিৎকার করতে লাগল, “আমাকে ছেড়ে দাও! আমি ওনার কাছে যাব! আমার আরভানকে ছাড়া আমি মরে যাব! ছেড়ে দাও আমাকে!”
ঠিক তখনই কেবিনের ভারী দরজাটা এক মৃদু শব্দে খুলে গেল। আয়াতের অশ্রুসিক্ত, ঝাপসা চোখ দুটো দরজার দিকে তাকাতেই এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই দীর্ঘকায়, সুপরিচিত পুরুষটা! আরভানের পরনে একটা সাধারণ এ্যাস রঙের শার্ট আর কালো প্যান্ট। শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। তার সেই চেনা সিল্কি চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো হয়ে কপালে লেপ্টে আছে। চোখ দুটো অতিরিক্ত ক্লান্তিতে লালচে হয়ে আছে, কিন্তু তার চর্তুদিকে এখনো সেই চিরচেনা রাজকীয় আভিজাত্য। আরভান অত্যন্ত ধীর পায়ে, কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কেবিনের ভেতরের দিকে এগিয়ে এল।
আরভানকে জীবিত, অক্ষত অবস্থায় নিজের চোখের সামনে দেখে আয়াতের বুকের ভেতরের সমস্ত মেঘ এক নিমেষে কেটে গেল। তার চোখের পানির বেগ আরও দ্বিগুণ বেড়ে গেল, ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দটা কেবিনের নীরবতা ভেঙে দিল। আরভান ফারহান আর নার্সদের দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় সবাইকে বাইরে চলে যেতে বলল। ফারহান কিছু সময় আরভানের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে এক বুক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নার্সদের নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা টেনে দিল।
কেবিনে এখন শুধু তারা দুজন। আরভান আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে ধীর পায়ে বিছানার পাশে এসে বসল। সে কোনো কথা না বলে, নিজের সমস্ত আবেগ আর ব্যাকুলতা উজাড় করে দিয়ে এক ঝটকায় আয়াতকে নিজের শক্ত দুই বাহুর মাঝে জড়িয়ে ধরল। আয়াতের গাল দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় পুরে তার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সে এক গভীর, তীব্র এবং প্রগাঢ় চুম্বনে আয়াতকে আচ্ছন্ন করে দিল। এই চুম্বনে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল পুরো একটা দিন ধরে প্রিয়তমাকে হারানোর সেই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তির এক চরম প্রগাঢ় আর্তি।
আয়াত প্রথমে তীব্র অভিমানে আরভানের বুক ঠেলে তার থেকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করল। সে কাঁদতে কাঁদতে আরভানের বুকে দুর্বল হাতে কিল মেরে বলল, “ছাড়ুন আমাকে! আপনি একটা আস্ত নিষ্ঠুর, পাষাণ আরভান চৌধুরী! কাল মাঝরাত থেকে আমি একটা চাতক পাখির মতো আপনার জন্য ছটফট করেছি, যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছিলাম, অথচ আপনি পুরো একটা দিন পার করে এই মাঝরাতে আমার সামনে মুখ দেখাতে আসলেন? একটা বারও কি আপনার এই অভাগী বউটার কথা মনে পড়েনি? একটা বারও কি জানতে ইচ্ছে করেনি আমি বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি?”
আরভান চুম্বনের পরশ ঠোঁট থেকে সরিয়ে আয়াতের কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। তার চোখ দিয়েও তখন এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল আয়াতের গালে। সে এক গভীর, নিচু স্বরে বলল, “শান্ত হও মিসেস চৌধুরী। তোমার এই জানটা যদি একটু শান্ত না হয়, তবে এই আরভান চৌধুরী বাঁচবে কীভাবে, বলো? তোমার থেকে দূরে থাকা আমার প্রতিটা সেকেন্ড যে এক একটা যুগের মতো কেটেছে, তা শুধু আমার এই ভাঙা মনটাই জানে।”
আয়াত আরভানের এই গভীর চোখের চাহনি আর আকুলতায় নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার সমস্ত অভিমান এক লহমায় গলে জল হয়ে গেল। সে আরভানের গাল, কপাল, চোখ আর সারা মুখে নিজের ঠোঁটের ছোঁয়া দিয়ে পাগলের মতো চুমুর বন্যা বইয়ে দিল। যেন সে নিশ্চিত হতে চাচ্ছে যে তার আরভান সত্যিই তার সামনে অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে। সে নিজের দুই হাত আরভানের ঘাড়ের পেছনে জড়িয়ে ধরে তাকে পরম মায়ায়, শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।
”আহ…!”
আয়াত শক্ত করে জড়িয়ে ধরতেই আরভানের মুখ থেকে এক চাপা, তীব্র যন্ত্রণার গোঙানি বের হয়ে এল। তার পুরো শরীরটা মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল।
আরভানের এই মৃদু ‘আহ’ শব্দটা শুনে আয়াত মুহূর্তের মধ্যে অস্থির হয়ে উঠল। সে আরভানের চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, সেখানে এক তীব্র যন্ত্রণার রেখা ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে গেল। আয়াতের ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে জানান দিল কিছু একটা মারাত্মক ভুল হয়েছে। সে জোর করে আরভানের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করল। আরভানের কোনো বাধা, কোনো অজুহাত আজ খাটবে না। আয়াত তার গায়ের শার্টটা এক ঝটকায় টেনে খুলতে গেল।আরভান আয়াতের এই মারকুটে আর মরিয়া রূপ দেখে নিজের ভেতরের তীব্র যন্ত্রণাটা চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। সে আয়াতের দুটি হাত আলতো করে চেপে ধরে ঠোঁটের কোণে তার সেই চেনা, আদিম ও বাঁকা চিলতে দুষ্টুমি মেশানো হাসি ফুটিয়ে তুলল। নিজের ভাঙা, খসখসে কণ্ঠে বলল, “কী করছেন মিসেস? হসপিটালের কেবিনে মাঝরাতে নিজের স্বামীর শার্ট এভাবে জোর করে খুলে ফেলছেন যে। আপনি যদি এই অবস্থাতেই আমার শরীরের সমস্ত এনার্জি পরীক্ষা করতে চান… আমার কিন্তু বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। আই অ্যাম ফুল রেডি উইথ ফুল এনার্জি!”
আরভানের মুখে এই চরম সংকটের মাঝেও এমন কথা শুনে আয়াত নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে রাগে চোখ গরম হয়ে তাকাল। তার চোখ ফেটে নতুন করে পানি চলে এল। সে আরভানের কোনো কথাই কানে তুলল না, বরং আরভানের হাত দুটো ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে কাঁপাকাঁপা আঙুলে শার্টের বোতামগুলো একটা একটা করে জোরপূর্বক খুলে ফেলল।শার্টটা শরীর থেকে পুরোপুরি আলগা হয়ে নিচে পড়ে যেতেই আয়াতের চোখের মণি দুটো আতঙ্কে, ক্ষোভে আর এক অসীম বেদনায় একদম স্থির হয়ে গেল। তার মুখের সমস্ত কথা গলার ভেতর দলা পাকিয়ে আটকে গেল।আরভানের পেটের ডান পাশে একটা বিশাল, চওড়া সাদা ব্যান্ডেজ করা। ভেতরের তাজা রক্ত সেই ব্যান্ডেজের সুতো ভেদ করে এখনো হালকা কালচে-লাল হয়ে চুইয়ে চুইয়ে বের হচ্ছে। শুধু তাই নয়, তার বাম হাতের সুগঠিত বাহুটাতেও একটা নিখুঁত, গভীর ক্ষতের ওপর শক্ত করে ব্যান্ডেজ জড়ানো! সাদা কাপড়ের ওপর সেই রক্তের দাগগুলো যেন আয়াতকে এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল।
আয়াত এক লহমায় পুরোপুরি ক্ষিপ্ত, দিশেহারা আর উন্মাদ হয়ে উঠল। সে আরভানের সেই রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ করা পেটের দিকে নিজের কাঁপাকাঁপা আঙুল বাড়িয়ে রুদ্ধস্বরে চিৎকার করে বলল, ”এসব কী আরভান? আপনার পেটে এই আঘাত আর হাতে এই গুলির ক্ষত কোত্থেকে এলো? কে করেছে এসব?”
আয়াতের কণ্ঠে তীব্র আতঙ্ক, ক্ষোভ আর বুকফাটা কান্নার আর্তি। আরভান কোনো জবাব দিল না। সে একদম নিস্তব্ধ হয়ে গভীর এক দৃষ্টিতে আয়াতের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার রক্তাভ চোখ দুটো একবার ওপাশে ঘুমিয়ে থাকা নিষ্পাপ দুই কন্যাসন্তানের ওপর বুলিয়ে নিল। বাচ্চাদের অক্ষত মুখের দিকে তাকাতেই আরভানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান, পরিশ্রান্ত মুচকি হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু আয়াতের ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দে সে আবারও তার মায়াবী চোখের দিকে তাকাল।
আয়াত আরভানের কোনো নীরবতাই মানতে রাজি নয়। সে আরভানের হাত দুটো খামচে ধরে আকুল হয়ে বলল, “আপনার বাবা করেছে, তাই না আরভান? আপনার কোনো ধারণাই নেই আপনার বাবা ঠিক কতটা খারাপ, কতটা জঘন্য একটা মানুষ! উনি আমাদের এক মাসের নিষ্পাপ সন্তানদের মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন! এমনকি… এমনকি উনিই আমার বাবা-মাকেও নির্মমভাবে হত্যা করেছেন! আপনি বিশ্বাস করুন আর না করুন আরভান, এটাই সত্যি! আমি… আমি ওনাকে বেঁচে থাকতে দেব না, আমি নিজে ওনাকে মেরে ফেলব! উনি আমার পুরো জীবনটা তছনছ করে দিয়েছেন। আমি ওনাকে শেষ করে দেব! না হলে উনি আবারও আপনাকে, আমার সন্তানদের কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন…”
আয়াতের তীব্র উত্তেজনা আর কান্নার মাঝে আরভান তার মুখের ওপর নিজের তর্জনী রাখল। তারপর অত্যন্ত শান্ত, মার্জিত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “শান্ত হও আয়াত। ওনি আর কখনো আমাদের কোনো ক্ষতি করতে আসবেন না। কোনোদিনও না।”
আয়াত আরভানের কথার ধরনে চমকে উঠে এক জোড়া অবিশ্বাসী চোখে তাকাল। তার কণ্ঠে এবার তীব্র অভিমান আর ক্ষোভের ছটা, “আপনি এখনো আপনার বাবার হয়ে সাফাই গাইছেন আরভান? ওই লোকটা কতটা কুৎসিত, কতটা পিশাচ! ওনি আপনার স্ত্রী আর সন্তানদের হত্যার চেষ্টা করেছেন—এই নির্মম সত্যটা জানার পরেও আপনি ওনাকে বাঁচানোর কথা ভাবছেন?”
আরভান এবার আর কোনো তর্ক করল না। সে আলতো করে আয়াতকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর নিজে আড়াআড়িভাবে তার পাশে শুয়ে, এক হাত আয়াতের কোমরের ওপর রেখে, নিজের মুখটা আয়াতের গলার ভাঁজে ও চুলের সুবাসের মাঝে ডুবিয়ে দিল। গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল, “আই জাস্ট ওয়ান্ট টু ডাই ইন ইউর নেক, আয়াত… পুরো দুনিয়া শেষ হয়ে যাক, আমি শুধু তোমাতেই বুঁদ হয়ে থাকতে চাই।”
আরভানের উষ্ণ নিঃশ্বাস গলার চামড়ায় লাগতেই আয়াত এক তীব্র ভালো লাগা আর আবেশে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। তার অবশ, কাঁপাকাঁপা হাত দুটো আলতো করে আরভানের এলোমেলো রেশমি চুলের মাঝে ডুবিয়ে দিল। কিন্তু ঠিক পরমুহূর্তেই আয়াতের গলার ওপর আরভানের চোখ থেকে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু এসে আছড়ে পড়ল। সেই অশ্রুর ছোঁয়া যেন এক বজ্রপাতের মতো আয়াতের পুরো শরীরকে কাঁপিয়ে দিল! আরভান কাঁদছে? তার সেই লৌহমানব আরভান চৌধুরী আজ চোখের জল ফেলছে?
আয়াত চট করে চোখ মেলে আরভানকে নিজের দু-বাহু দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের পিঠের তীব্র যন্ত্রণাকে ভুলে সে আরভানের মুখটা বুকের মাঝে চেপে ধরে ব্যাকুল হয়ে বলল, “কী হয়েছে আপনার আরভান? আমাকে বলুন প্লিজ, আপনাকে এমন লাগছে কেন?”
আরভান আয়াতের গলার ভাঁজে মুখ রেখেই এক রুদ্ধ ও ভাঙা কণ্ঠে বলতে লাগল, “ওনি আর কখনো আমাদের ছোঁয়া তো দূর, আমাদের জীবনে কোনোদিনও ফিরে আসতে পারবেন না আয়াত। ওনি যে আর এই পৃথিবীতেই নেই! আমার বাবা… যে একটা সময় আমার পুরো পৃথিবী ছিল, আমার সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল—সে আজ আর বেঁচে নেই আয়াত! কেন… কেন সে তার সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে একটা সুখের সংসার করতে পারল না? কেন একটুখানি আমাদের ভালোবাসতে পারল না আয়াত? কেন এমনটা হলো?”
আরভানের মুখে এই চরম সত্যটা শুনে আয়াত মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল। তার সারা শরীর এক অজানা আশঙ্কায় স্থবির হয়ে গেল। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “ওনি নেই মানে? কী হয়েছে ওনার?”
আরভান আয়াতের বুক থেকে মুখ তুলল। কেবিনের টিমটিমে আলোয় তার পাথুরে মুখাবয়বটা দেখতে এক চেনা অথচ ডার্ক এক রাজপুত্রের মতো লাগছিল। সে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল, “মরে গেছেন।”
“কীভাবে?” আয়াতের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ।
আরভানের মুখাবয়বটা কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠল। সে নিজের মুখটা আয়াতের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে জানালার ওপাশে অন্ধকার মেলবোর্ন শহরের দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল, “মম-এর হাতেই ওনার মৃত্যু হয়েছে। নিজের স্বামীর বুকে মম নিজেই গুলি চালিয়েছেন।”
আয়াত যেন এক গোলকধাঁধায় পড়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে বলল, “তার মানে? মা… মা এখন কোথায়?”
আরভানের ঠোঁটের কোণে এবার এক অতি সূক্ষ্ম, পৈশাচিক ও বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। চোখের এক পলকেই সে সেই অন্ধকার হাসির আড়াল করে অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, “জেলে।”
”আপনি ওনাকে ছাড়িয়ে আনেননি?” আয়াত অস্থির হয়ে উঠল।
”খুনি সে, আয়াত। সে মিস্টার আরশাদ চৌধুরীকে নিজের হাতে গুলি করে মেরেছে। আইন আর আদালতের হাত থেকে এত সহজে তো তার মুক্তি হবে না। খুব শীঘ্রই ওনাকে আদালতের কাঠগড়ায় ওঠানো হবে, তারপর তার জেল হবে। তবে হ্যাঁ, আরশাদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে আরও অনেক অবৈধ এবং জঘন্য অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই এক চরম সন্ত্রাসী ও অপরাধীকে হত্যার অপরাধে মমর শাস্তি হয়তো কিছুটা কম হতে পারে…”
আয়াতের চোখে তখন আরশাদ চৌধুরীর প্রতি চরম ঘৃণা। সে শক্ত গলায় বলল, “তাহলে মা কেন একজন পিশাচকে হত্যা করে জেলে পচে মরবেন? ওই নরক তো মরে গিয়ে একদম ঠিক হয়েছে! মা যা করেছেন, একদম ঠিক কাজ করেছেন। আমি নিজে মাকে ওখান থেকে ছাড়িয়ে আনব!”
আরভান আয়াতের এই ব্যাকুলতা দেখে তার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। এক গভীর চুমু এঁকে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “ওকে উকিল ম্যাম, আগে নিজের পড়াশোনাটা শেষ করুন। তারপর না হয় শাশুড়ি মায়ের কেস লড়বেন…”
আরভানের এই নিবিড় স্পর্শ আর ভালোবাসার পরশে আয়াত লজ্জায় চোখ জোড়া বুজে নিজের বাচ্চাদের দিকে তাকাল। আরভান তার দু-হাত দিয়ে আয়াত আর সন্তানদের একসাথে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। তার নিজের বাম হাতের বুলেটের ক্ষত আর পেটের ছুরির আঘাত তখনো তীব্র ব্যথায় টনটন করছে, কিন্তু আরভানের পুরো মনোযোগ তখন নিজের অবশ মস্তিস্কের নেপথ্যে থাকা সেই রাতের আসল, অন্ধকার সত্যটার দিকে।
ফ্ল্যাশব্যাক…
সেই সুরম্য ভিলার অন্ধকার হলরুমে যেখানে আরশাদ চৌধুরী আর আরভান মুখোমুখী দাঁড়িয়ে।
চলবে….

