#পর্ব_৫১
#আমার_হয়ে_থেকো
#Tasnim_Riya_khan
গভীর রজনী। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর থমথমে নীরবতা।চৌদ্দ বছর বয়সী এক কিশোর আরভানের শরীর তখন তীব্র জ্বরে পুড়ছিল। মেলবোর্নের নামী ডাক্তার এসে কড়া ডোজের ওষুধ দিয়ে যাওয়ার পরেও সেই কালান্তক জ্বর কিছুতেই কমছিল না। এলিনা চৌধুরী যখন সামান্য ওষুধ খাইয়েই নিজের দায়িত্ব শেষ মনে করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, তখন আরশাদ চৌধুরী কিন্তু ঘুমাননি। তিনি সেই কিশোর আরভানের মাথার শিউরে বসে সারাটা রাত জেগে নিজের হাতে জলপট্টি দিয়েছিলেন। পরম মমতায় ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন।কেন দিয়েছিলেন আরশাদ চৌধুরী সেদিন অত সেবা? কেন করেছিলেন ওই তীব্র ভালোবাসার অভিনয়? ওটা কোনো পিতৃস্নেহ ছিল না, ওটা ছিল স্রেফ এক কুৎসিত প্রদর্শন!
নিজের স্ত্রীকে মিথ্যার আড়ালে রেখে অন্ধ করে রাখার জন্য আর আরভানকে নিজের হাতের পুতুল বানানোর জন্য ওটা ছিল এক নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক চাল। কারণ, সেই জ্বরের ঘোর থেকে সুস্থ হওয়ার সাথে সাথেই তো আরশাদ চৌধুরী তার ছেলেকে দিয়ে করিয়েছিলেন এক চরম, ভয়ঙ্কর পাপ! মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সী একটা নিষ্পাপ বাচ্চার হাতে প্রথমবার তাজা মানুষের রক্ত মাখিয়েছিলেন এই আরশাদ চৌধুরী—শুধু নিজের স্বার্থ আর সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য।
আজ এতগুলো বছর পার হয়ে যাওয়ার পর, মেলবোর্নের সেই সুরম্য ভিলার হলরুমে আজ আবারও বাবা আর ছেলে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আজও আরভান মানুষের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়ে নিজের জন্মদাতার সামনে এক জল্লাদের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তবে সেদিন আরশাদ চৌধুরীর চোখে ছিল এক পৈশাচিক আনন্দ, এক চরম অহংকার; আর আজকে ওনার চোখে খেলা করছে এক আদিম, হিমশীতল ভয়! এটা কি শুধুই মৃত্যুর ভয়? নাকি নিজের তৈরি করা এক ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে দেখে জন্মদাতার নিজের ভেতরের কুঁকড়ে যাওয়া ভয়?
আরশাদ চৌধুরী সময়ের নিয়মে আজ বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। আরভানের সেই আদিম, হিংস্র রূপ দেখে তার মুখের সমস্ত ভাষা যেন হারিয়ে গেল। তিনি এক দৃষ্টিতে নিজের ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আরভানের মুখের অবয়ব চরম হিংস্র আর পাথুরে হলেও, তার চোখের মণির গভীরে আজ জমা হয়ে আছে হাজারো অব্যক্ত প্রশ্ন আর এক অসীম শূন্যতা।
বাবা-মা তো এই পৃথিবীতে সন্তানের জন্য আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় রহমত, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় বাবা-মা ছাড়া আপন আর কে-ই বা হয়? আর সেই কারণেই তো আল্লাহ এই পৃথিবীতে একটা ছোট্ট অবুজ শিশুর অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে, তাকে পরম মায়ায় আগলে রাখতে ‘বাবা’ আর ‘মা’ নামের দুজন নর-নারীকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে সমর্পণ করেছেন। কিন্তু সেই পরম পবিত্র সম্পর্কের আড়ালে থাকা বাবা-মাও কি এতটা চরম ছলনাকারী আর পিশাচ হতে পারে? আরশাদ চৌধুরী আরভানের চোখের সেই সূক্ষ্ম, লুকানো গভীর আবেগ আর দুর্বলতাটুকু তার নিজের পিশাচ মস্তিস্ক দিয়ে ঠিকই খুঁজে নিলেন। তিনি ভাবলেন, এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আরভানকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া যাবে।তার ছেলে কোনোদিনও নিজের বাবার ওপর সরাসরি মরণাঘাত করতে পারবে না।
কিন্তু আরভানের চতুরতা আরশাদ চৌধুরীর চশমখোর ভাবনার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক ছিল।আরভান কোনো সুযোগ না দিয়ে পাশ থেকে সেই ধারালো, চকচকে ছুরিটা তুলে নিয়ে সোজা আরশাদ চৌধুরীর হাতের তালুর মাঝখান দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করে গেঁথে দিল।”আহহহ!”
আরশাদ চৌধুরী তীব্র যন্ত্রণায় এক গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠলেন।
তিনি ভাবতেও পারেননি আরভান এতটা অতর্কিতে এই কাণ্ড ঘটাবে। আরশাদ চৌধুরী যখন নিজের অন্য হাত দিয়ে আরভানকে প্রতিহত করতে গেলেন, ঠিক তখনই আরভান এক অদ্ভুত, অপ্রকৃতিস্থ মস্তিস্কের পরিচয় দিল। সে হুট করেই আরশাদ চৌধুরীকে আঘাত করা থামিয়ে দিল। নিজের হাতের সেই রক্তমাখা ছুরিটা সে এবার নিজের শরীরের দিকে তাক করল! কোনো দ্বিধা ছাড়া, এক চরম উন্মাদের মতো সে নিজের বলিষ্ঠ বাহুতে আর পেটের ডান পাশে চড়চড় করে কয়েকটা গভীর পোঁচ দিয়ে দিল! নিজের চামড়া কেটে তাজা রক্ত ফিনকি দিয়ে ছুটে এল।
নিজের ছেলের এমন বীভৎস, পাগলামো কাণ্ড দেখে আরশাদ চৌধুরী পুরোপুরি ভড়কে গেলেন, তার বুকের ভেতরটা আতঙ্কে কেঁপে উঠল। আরভান এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে নিজের সেই রক্তমাখা হাতটা নিয়ে আরশাদ চৌধুরীর একটা হাত জোর করে নিজের গলার ওপর চেপে ধরল। যেন আরশাদ চৌধুরী তাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলছেন! আর ঠিক তখনই আরভান হলের দরজার দিকে তাকিয়ে এক চরম উচ্চকিত, আর্তনাদ ভরা নাটুকে সুরে চিৎকার করে বলতে শুরু করল, “ছাড়ুন! মেরে ফেলবেন না আমাকে! প্লিজ হাতটা সরান মিস্টার চৌধুরী! ছেড়ে দিন আমাকে… আহ!”
আরশাদ চৌধুরী নিজের ওই রক্তাক্ত, অবশ হাত নিয়ে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।তার সেই চোখের মণি দুটো অবাক হতে হতে যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। নিজের জন্ম দেওয়া ছেলের এমন ভয়ঙ্কর চাতুরি আর নিখুঁত অভিনয় সে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না।
ঠিক তখনই হলের প্রবেশদ্বারে এক নারীমূর্তির অবয়ব ফুটে উঠল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নারী দেহটি দেখে আরশাদ চৌধুরীর বুঝতে আর এক বিন্দুও বাকি রইল না যে আরভানের এই পুরো পাগলামি আর আর্তনাদ আসলে কার জন্য সাজানো এক নিখুঁত নাটক ছিল! কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আরশাদ চৌধুরী চাইলেও আরভানের গলা থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে আনতে পারছিলেন না, কারণ আরভান নিজের অলৌকিক ও আসুরিক শক্তি দিয়ে ওনার হাতটা নিজের গলার ওপর লোহার খাঁচার মতো শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছিল। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল আরশাদ চৌধুরীই আরভানকে শ্বাসরোধ করে খুন করছেন।
দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এলিনা চৌধুরী নিজের ছেলের এই রক্তাক্ত, আর্তনাদমাখা দশা দেখে এক নিমেষে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। কাঁপাকাঁপা হাতে নিজের হ্যান্ডব্যাগ থেকে পিস্তলটা বের করে আরশাদ চৌধুরীর দিকে তাক করে এক তীক্ষ্ণ, ও ক্ষিপ্ত স্বরে চিৎকার করে বললেন,
“আরশাদ!!! তুমি যদি এই মুহূর্তে আরভানকে না ছাড়ো, তবে আমি নিজ হাতে তোমার এই পাপিষ্ঠ বুকটা গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেব! তোমাকে আমি এত সহজে মরতে দিতে চাইনি আরশাদ, কারণ তোমার মতো পিশাচের মৃত্যু অত্যন্ত জঘন্য আর যন্ত্রণাদায়ক হওয়া উচিত!”
এলিনা চৌধুরীর চোখ দিয়ে তখন ক্রোধ আর ঘৃণার আগুন ঝরছিল। তিনি দাঁত কিড়মিড় করে বলতে লাগলেন, “তুমি আমার নিরপরাধ, সরল আব্বাজানের খুনি! তুমি আমার এই নিষ্পাপ ছেলেটাকে দিনের পর দিন ড্রাগের ইনজেকশন দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছ, তাকে জীবন্ত লাশ বানিয়েছ! আর আজ… আজ তোমার ক্ষুধা এত বেড়েছে যে তুমি আমার এক মাসের ছোট্ট, অবুজ নাতিদেরও হত্যা করতে চেয়েছ? তুমি একটা নরপিশাচ আরশাদ চৌধুরী! কোনোদিনও তুমি একজন স্বামী হওয়ার যোগ্যতা রাখোনি, পারোনি একজন আদর্শ সন্তান হতে, পারোনি একজন স্নেহময় পিতা কিংবা একজন দাদা হতে! তুমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু, সবচেয়ে নিকৃষ্ট এক জঘন্য কীট!”
এলিনা চৌধুরীর এই তীব্র ঘৃণাময় বাক্যটি হলের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে না হতেই আরশাদ চৌধুরী আতঙ্কে কুঁকড়ে গেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের ওপর থেকে আরভানের লোহার খাঁচার মতো চেপে বসা হাতটার দিকে তাকিয়ে তিনি আসল চালটা ধরে ফেললেন। তিনি চিৎকার করে এলিনাকে বলতে চাইলেন, “এলিনা! তোমার ছেলে নাটক করছে! আমি তোমার নাতনিদের মারিনি! মারতে চেয়েছিলাম ঠিকই, তবে…”
আরশাদ চৌধুরীকে নিজের সাফাই গাওয়ার আর কোনো সুযোগই দিল না আরভান। তার মুখ থেকে বাক্যটি পুরোপুরি বের হওয়ার আগেই আরভান নিজের পাশ ফিরে অত্যন্ত হিংস্র ও শক্ত হাতে আরশাদ চৌধুরীর অবশ হাতটা টেনে এনে সোজা নিজের পেটের ক্ষতস্থানে ঢুকিয়ে দিল!”উহহহ!”
গলগল করে তাজা গরম রক্ত আরভানের পেট থেকে গড়িয়ে পড়তে লাগল মেঝেতে। আরশাদ চৌধুরী এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার পুরো শরীর হিম হয়ে গেল। তিনি তো হাত চালাননি! তিনি তো আরভানকে এই মুহূর্তে আঘাতই করেননি! আরশাদ চৌধুরীর মস্তিস্ক কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো আসল তাণ্ডব।
’ঢিসুম! ঢিসুম! ঢিসুম!’
পরপর কয়েকটি গুলির শব্দে পুরো হলরুম কেঁপে উঠল। আরভান ভেবেছিল তার মা হয়তো ভয়ে ঠিকভাবে লক্ষ্যভেদ করতে পারবেন না, বন্দুকের ঘোড়া টানতে গিয়ে তার হাত কাঁপবে। কিন্তু আরভান এবার সত্যি সত্যিই কিছুটা চমকে গেল। এলিনা চৌধুরী শুধু একজন সাধারণ নারী।নিজের জীবনের প্রথম ও একমাত্র ভালোবাসার মানুষটার ভেতরের এই পৈশাচিক রূপ, নিজের বাবার খুন আর নিজের সন্তানের এই রক্তাক্ত দশা দেখে তার ভেতরের মাতৃত্ব আজ এক ভয়ঙ্কর রণচণ্ডী রূপ ধারণ করেছিল।
এলিনার ছোঁড়া পরপর কয়েকটি বুলেট আরশাদ চৌধুরীর হাত আর পায়ে এসে সজোরে বিঁধল। একটি বুলেট তার পেটের একপাশ দিয়ে তীব্র গতিতে ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। তবে আরভান খুব ভালো করেই জানত—এই গুলিতে আরশাদ চৌধুরী সহজে মরবেন না। ঠিক সেই মুহূর্তে, এলিনার শেষ বুলেটটি আরশাদ চৌধুরীর পেটের ঠিক মাঝ বরাবর এসে বিঁধল এবং সেখানে এসে থমকে গেল।
আরশাদ চৌধুরী যন্ত্রণায় মেঝেতে হাঁটু গেড়ে ধপাস করে পড়ে গেলেন। তার মুখ দিয়ে শেষ আর্তনাদ বের হওয়ার আগেই আরভান ওনার কানের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেল। তার রক্তাভ চোখের মণি দুটো এক আদিম, উল্লাসে চকচক করে উঠল। সে অত্যন্ত নিচু ও হিমশীতল কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল, “আমার সাজানো সংসারে কুৎসিত নজর দিয়েছিলেন মিস্টার চৌধুরী… বলেছিলাম না, আপনার এই জঘন্য পাপের অবসান আমি নিজ হাতে করব? গুড বাই, মিস্টার চৌধুরী।”
কথাটি শেষ হতেই আরশাদ চৌধুরী তড়পাতে তড়পাতে ফ্লোরের ওপর উপুড় হয়ে ধপ করে পড়ে গেলেন। তার ঠোঁট দুটো শেষবারের মতো নড়ে উঠলেও, আর কোনো কথা বলার বা গোঙানোর সুযোগ তিনি পেলেন না। আরভানের গলা থেকে তার হাতটা আলগা হয়ে ফসকে নিচে পড়ে গেল। চিরতরে নিথর হয়ে গেল আরশাদ চৌধুরীর সেই পাপিষ্ঠ দেহখানা।
এলিনা চৌধুরী নিজের হাতের ধোঁয়া ওঠা পিস্তলটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে ধীর পায়ে নিচে বসে পড়লেন। নিজের স্বামীর সেই রক্তাক্ত, মৃত শরীরের দিকে তাকিয়ে তিনি একদম নিঃসাড়, নিস্পন্দ হয়ে রইলেন। তার চোখ ফেটে কোনো নোনা জল গড়িয়ে পড়ল না, বরং এক দীর্ঘশ্বাসের সাথে তার মনে হলো—আজ তিনি এক আজন্ম অভিশাপ থেকে নিজেকে এবং নিজের সন্তানকে মুক্তি দিতে পেরেছেন।
ঠিক তখনই ভিলার বাইরে দূর থেকে পুলিশের গাড়ির তীব্র সাইরেনের আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। পুলিশ হয়তো আরশাদ চৌধুরীকে গ্রেফতার করতেই আসছিল। কারণ এত বড় আন্ডারগ্রাউন্ডের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম সাম্রাজ্যের প্রধানকে ধরতে পুলিশ অনেকদিন ধরেই জাল পাতছিল। কিন্তু তারা এসে দেখবে, এ তো এক পারিবারিক রক্তগঙ্গা!
এলিনা চৌধুরী সাইরেনের শব্দ শুনেই এক লহমায় সম্বিৎ ফিরে পেলেন। তিনি অত্যন্ত উদগ্র ও ব্যাকুল হয়ে আরভানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আরভান! তুই এখান থেকে এখনই পালিয়ে যা! পুলিশ চলে এসেছে… ওরা তোকে এই অবস্থায় দেখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে!”
আরভান নিজের পেটের ক্ষতস্থান চেপে ধরে শক্ত মুখে বলল, “আপনাকে এই লাশের সামনে একা রেখে আমি কোথাও যাব না, মম।”
”আরভান! এখন আমাকে নিয়ে ভাবার বা জেদ করার সময় এটা নয়!” এলিনা চৌধুরী পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলেন। “আয়াত আর আমার নিষ্পাপ নাতনিরা হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছে আরভান! তুই ওদের কাছে যা! তুই নিজের সন্তানদের একজন আদর্শ বাবা হবি, এই আরশাদ চৌধুরীর মতো কোনো নরপিশাচ বা জল্লাদ হবি না! নিজেকে বাঁচা আরভান! আমি যদি এখন এখান থেকে পালাতে যাই, তবে আমাদের দুজনকেই পুলিশ ধরে ফেলবে। তোকে এই রক্তাক্ত শরীর নিয়ে আমি কোনো হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারব না। তোকে নিজেকে সামলে নিয়ে হসপিটালে পৌঁছাতে হবে। নিজের জানকে বাঁচাতে হবে! তুই অলরেডি অনেক কিছু হারিয়েছিস, এবার বাকি যে দুজন বেঁচে আছে—ওদের শক্ত করে আঁকড়ে ধর আরভান! আর… আর তোর এই অভাগী মাকে পারলে ক্ষমা করে দিস। তোর মা খারাপ ছিল না রে… শুধু এই মিস্টার চৌধুরীর অন্ধ মায়ায় পড়ে আমি কোনোদিন কিছু বুঝতে পারিনি…”
এলিনা চৌধুরী আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে রইলেন না। তিনি হন্তদন্ত হয়ে হলের ভেতরের ড্রেসিং টেবিলের টিস্যু আর কাপড় দিয়ে আরভানের হাতের স্পর্শ, তার পায়ের জুতোমোর দাগসহ আরভানের উপস্থিতির প্রতিটা সূক্ষ্ম প্রমাণ মেঝে থেকে মুছে ফেলতে শুরু করলেন। একজন উন্মাদের মতো তিনি শুধু নিজের সন্তানকে একটা সুন্দর, দাগহীন জীবন দেওয়ার জন্য সমস্ত খুনের দায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। শৈশবে তার কিছু ভুলের জন্য, তার ছেলেটার পুরো জীবনটা যে নরক যন্ত্রণায় কেটেছে—তার হিসাব যদি আরভান আজ হাশরের ময়দানে খোদার কাছে চায়, তবে এলিনা চৌধুরী কী জবাব দেবেন? তিনি তো মুখ দেখানোর যোগ্যও নন!
আরভান কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। সে এক অদ্ভুত, মনস্তাত্ত্বিক ও গম্ভীর দৃষ্টিতে তার মায়ের এই মরিয়া রূপের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব স্বরে বলল, “সরি মম। অন্য অপরাধের জন্য আজকে আপনাকে এই শাস্তিটা পেতে হচ্ছে। অন্যায় আমিও করেছি, অন্যায় আপনিও করেছেন।”
এলিনা চৌধুরী চোখের জল মুছে শক্ত গলায় বললেন, “নিজের ছেলের চেয়ে বড় এই দুনিয়ায় আমার আর কেউ নেই আরভান। আমি যে অন্যায় করেছি, তার শাস্তি আমি মাথা পেতে নিলাম। আর তোর ওপর যে অন্যায় হয়েছিল, তার জন্য দায়ীও তো আমিই ছিলাম। আমি তোকে একটা ভালো, সুস্থ পরিবার দিতে পারিনি আরভান—এটা আমার ব্যর্থতা, তোর না। এখন আর দাঁড়িয়ে থাকিস না! হাসপাতালে যা দ্রুত চিকিৎসা করা, ওদের তোকে ছাড়া আর কেউ নেই আরভান, ওদের তোকে বড্ড প্রয়োজন! নিজের জেদ ধরে সবার ক্ষতি করিস না, চলে যা!”
মায়ের সেই তীব্র অনুনয় শুনে আরভান কোনোমতে পেছনের গোপন দরজা দিয়ে ভিলা থেকে বের হয়ে এল। কিন্তু বাইরের পিচঢালা রাস্তায় এসে কয়েক পা হাঁটার পরেই তার শরীর আর সায় দিল না। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার চারপাশের সমস্ত পরিবেশ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল, চোখ দুটো যেন সীসার মতো বুজে আসছিল। রাস্তার নিস্তব্ধতার মাঝে নিজের অবশ শরীরটা যখন লুটিয়ে পড়তে যাবে, ঠিক তখনই দূর থেকে একটা গাড়ি তীব্র স্পিডে এগিয়ে এলো তা দেখে আরভানের ঠোঁটে হাসি ফুটলো। গাড়িটা এসে তার ঠিক সামনে ব্রেক কষে থামল।
গাড়ির দরজা খুলে একজোড়া অস্থির পা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে আরভানের দিকে ছুটে এল। ফারহান আরভানের এই রক্তাক্ত, আধমরা দশা দেখে আঁতকে উঠে বলল, “এভি! কী হয়েছে এসব?”
আরভান ফারহানকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। সে নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে ফারহানের কাঁধে ভর রেখে ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল, “সব ঠিক হয়ে গেছে, ফারহান…”
ফারহান আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে আরভানকে ধরাধরি করে গাড়ির পেছনের সিটে তুলে নিল। গাড়ির স্টার্ট দিয়ে ফুল স্পিডে হাসপাতালের দিকে ছুটে যেতে যেতে ফারহান বলল, “আয়াতের জ্ঞান ফিরে এসেছে আরভান! ও চোখ মেলেছে!”
আরভান ফারহানের এই কথাটা শুনে মুখে আর কিছু বলল না। সে শুধু এক পরম তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার পরমুহূর্তেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে সে পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে ফারহানের গাড়ির সিটে ঢলে পড়ল।
হাসপাতালে নিয়ে আসার পর আইসিইউ-তে নিয়ে রাতে আরভানের জরুরি চিকিৎসা করা হয়।তার পেটের গভীর ক্ষত আর হাতের বুলেটের ইনজুরি ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ করা হয়। পুরো একটা দিন তাকে কড়া অবজারবেশনে রাখা হয়েছিল। কিন্তু রাতের বেলা শরীরে কিছুটা শক্তি আসতেই, আরভানের সেই অবাধ্য মন আর এক সেকেন্ডও আইসিইউ-এর বেডে টিকতে পারল না। সে ডাক্তার আর নার্সদের সমস্ত নিষেধাজ্ঞা, সমস্ত কড়া প্রটোকলকে বুড়ো আঙুল দিয়ে সোজা নিজের স্ত্রী আর সন্তানদের কেবিনের দিকে ছুটে এসেছিল। ফারহান অদ্ভুত ও বিস্ময় ভরা চোখে আরভানের এই ভালোবাসার পাগলামি দেখছিল।যে ছেলেটা কয়েক ঘণ্টা আগেও শয্যাশায়ী, মরণাপন্ন অবস্থায় ছটফট করছিল, সে কিনা স্রেফ নিজের ভালোবাসার টানে, নিজের স্ত্রীর একটা ডাকে সব কষ্ট ভুলে এক ছুটে চলে এসেছে! এটাকে কি শুধুই এক অন্ধ ভালোবাসা বলে? নাকি এক ভয়ঙ্কর, অপ্রকৃতিস্থ ও প্রগাঢ় মায়ার টান বলে?
(বর্তমান সময় )
আরভান আয়াতকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে মিশিয়ে রেখে, পরম মায়ায় নিজের দুই সন্তানের কচি গায়ে হাত বোলাতে লাগল। আয়াত তখন আরভানের বুকের উষ্ণতায় শান্ত হয়ে ঘুমে কাদা হয়ে গেছে। তার চোখের কোণে এখনো কান্নার শুকিয়ে যাওয়া দাগ স্পষ্ট।
আরভান কেবিনের ছাদের দিকে তাকিয়ে নিজের চোখ দুটো ধীরে বন্ধ করে নিল। এই পুরো ঘটনাটা, এই পুরো রক্তক্ষয়ী অধ্যায়টা ছিল আসলে আরভানের মস্তিস্কের এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম, নিখুঁত ও চতুর গেম প্ল্যান।
তবে হ্যাঁ, এই খেলায় একটা জায়গায় তার হিসাবের বড় ভুল হয়ে গিয়েছিল—সে কোনোদিনও ভাবেনি যে তার মায়াবতী আয়াতকে নিজের পিঠে এভাবে বুলেটের আঘাত সইতে হবে! তার এক মাসের কচি বাচ্চাদের এইটুকু বয়সে রক্তের এই বীভৎস বন্যা দেখতে হবে—তাও আরভানের কল্পনার বাইরে ছিল।
সে খুব ভালো করেই জানত, তার বাবা আরশাদ চৌধুরী অতীত থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সমস্ত ক্ষোভ এই আয়াতের ওপরই মেটাবেন, আয়াতকে শেষ করেই সে আরভানের ওপর প্রতিশোধ নেবেন।
যদি আরশাদ চৌধুরী সেদিন সফল হতেন, তবে আয়াতকে নিজের সন্তানদের মৃত্যুর খবর শুনতে হতো। তখন আয়াত নিজেকে দোষী ভাবত, নিজের মা-বাবার মতো সন্তানদেরও বাঁচাতে না পারার গ্লানিতে তিলে তিলে মরে যেত।
কিন্তু আরভান চৌধুরী নিজের চালটা এমনভাবে খেলেছে, যাতে সমস্ত দোষ গিয়ে পড়ে আরশাদ চৌধুরীর ওপর। আর সেই কারণেই সে নিজের বাবাকে দিয়ে নিজের সন্তানদের ওপর এই মরণঘাতী হামলাটা করিয়েছে, যাতে আয়াত বুঝতে পারে আসল খুনি কে।
শুধু তাই নয়, আরভান মনে মনে চেয়েছিল আরশাদ চৌধুরীর মৃত্যুটা যেন এলিনা চৌধুরীর হাতেই হয়। কিন্তু আরভান তার বাবার আসুরিক শক্তি আর মায়ের দুর্বল মানসিকতা খুব ভালো করেই জানত। সে জানত এলিনার গুলিতে আরশাদ চৌধুরী সহজে মরবেন না। আর ঠিক সেই কারণেই, ধোঁয়া আর অন্ধকারের আড়ালে সে নিজে পেছন থেকে আরশাদ চৌধুরীর গলার রগে ছুরিটা ঢুকিয়ে ওনার নিশ্চিত মৃত্যু ডিক্লেয়ার করেছিল! এলিনা চৌধুরী সারাজীবন ভাববেন যে তিনিই নিজের স্বামীকে খুন করেছেন এবং এই খুনের অপরাধবোধ নিজের মাথায় নিয়ে তিনি স্বেচ্ছায় জেলের অন্ধকারে চলে গেলেন।
মায়ের ওপর আরভানের কোনো রাগ বা ক্ষোভ ছিল না। কিন্তু মায়ের এই শাস্তি পাওয়াটা অত্যন্ত জরুরি ছিল। কারণ আরশাদ চৌধুরির পরম আরাধ্য, তার জীবনের একমাত্র আলোর উৎস—আয়াতের বাবা-মায়ের আসল খুনির এক মাত্র সাক্ষী কে এলিনা চৌধুরীই হত্যা করেছিলো অথচ সেই তার মা তাকে মিথ্যা বলে অন্যের মাথায় চাপিয়ে নিজের পিট বাছিয়েছে।
নিজের আয়াতের চোখের প্রতি ফোঁটা জলের বদলা, তার মা-বাবার খুনের প্রতিশোধ আর নিজের সন্তানদের গায়ে লাগা রক্তের এক একটি কণার হিসাব আরভান চৌধুরী আজ এক রাতেই চুকিয়ে দিয়েছে। এটাই ছিল আরভানের সেই অন্ধকার, সাইকোলজিক্যাল মাস্টারপ্ল্যান—যা এই পৃথিবীর বুকে আরভানের বুকের গভীরেই চিরতরে আড়াল হয়ে রইল।
চলবে…

