#লাল_শাড়ি
#সূচনা_পর্ব
#ফারহানা_ইসলাম
আব্বার পাশে একটা অচেনা মহিলা দেখে আমার চোখ কপালে উঠে গেল।লাল শাড়ি, হাতে কাঁচের চুড়ি, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। মহিলাটা নতুন বউয়ের ভঙ্গিতে লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
আব্বার পাশে একটা অচেনা মহিলা দেখে আমার চোখ কপালে উঠে গেল।লাল শাড়ি, হাতে কাঁচের চুড়ি, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। মহিলাটা নতুন বউয়ের ভঙ্গিতে লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে আছে।আমার কিছু বুঝতে বাকি ছিল না, কিন্তু পুরোটা বোঝার মতো বয়সও তখন আমার হয়নি।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আম্মা প্রথমে কিছুই বলেনি।যেন হঠাৎ করেই পাথর হয়ে গেছে।
ইভা আপু তখন ভেতর ঘর থেকে বের হয়ে এসে থমকে দাঁড়াল। তার হাতে তখনো ভেজা কাপড়। কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো বাড়িটা নিশ্চুপ হয়ে গেল।
তারপর আব্বা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
হাজেরা আজ থেকে এই বাড়িতেই থাবো।
কথাটা বলার সময় আব্বার চোখে কোনো অপরাধবোধ ছিল না। যেন খুব সাধারণ একটা কথা বলছে।
আম্মার ঠোঁট কাঁপল।
তিনি চিৎকার করে বলেন এটা তুমি কীভাবে করতে পারলে?এই কাজ করার আগে আমার আর আমার তিনটে মেয়ের মুখ কী তোমার চোখে ভেসে উঠেনি?
কেমন বাপ তুমি?
আব্বা তখন অগ্নি দৃষ্টিতে আম্মার দিকে তাকিয়ে বললো শুনো নাজিয়া এই বংশে আমার একটা বংশধর দরকার ছিল।তাই আমি দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।আর এই মেয়েরা তো কয়দিন পর শশুর বাড়িতে চলে যাবে।তখন আমার ব্যবসা, জায়গা-জমির দেখভাল কে করবো?
মোট কথা আমি একটা ছেলের জন্যেই হাজেরাকে বিয়ে করেছি।
ভেবেছিলাম আব্বার কথা শুনে আম্মা প্রতিবাদ করবে।কিন্তু না আম্মা টু শব্দটি ও করলো না।
চার বছরের নিশা তখনো কিছু বুঝতে না পেরে মহিলাটার শাড়ি ধরে বলল,
তুমি কে?
মহিলাটা একটু অপ্রস্তুত হয়ে নিশার মাথায় হাত রাখল।
আমি,,, আমি তোমাদের নতুন মা।
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে আম্মার দিকে তাকালাম।
মা তখন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
নিশা খুশিতে হাত তালি দিয়ে বললো,,
ওমা!কী মজা!! আজ থেকে আমাল দুটো মা!! অনেক মজা হবে।একটা আব্বা দুটো আম্মা।
নিশার এই অস্পষ্ট কথা শুনে যেন আমার পায়ের নিচের মাটি সরে গেলো।
ইভা আপু দৌড়ে এসে নিশার দুই গালে দুটো চড় মেরে বললেন,,
চুপ কর বাচাল মেয়ে।
আব্বা ইভা আপুকে ধমক দিয়ে বললেন তুই ওরে মারলি কেনো?
এরই মধ্যে আম্মা আমাকে বললেন ইরা তুই ইভা আর নিশাকে নিয়ে ঘরে আয়।
এই কথা বলে আম্মা চলে গেলেন।
আমি নিশার হাত ধরে ওরে নিয়ে ঘরে চলে এলাম।ইভা আপু ও আমাদের পেছন পেছন আসলো।ইভা আপু ঘরে ঢুকে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিলো।
নিশা শুধু ইভা আপুকে বলছে আপু তুমি আমায় মারলা কেনো?
তুমি খুব পচা।আমি আল তোমার সাথে কথা বলব না।
নিশার কথা শুনে ইভা আপু মুখে ওড়না গুঁজে কান্না করে দিল।
ইভা আপু আমার দিকে তাকিয়ে বললো,,
ইরা আব্বা এই কাজ কীভাবে করতে পারলো?এখন আমরা মানুষের কাছে মুখ দেখাবো কীভাবে?
আমি কী বলবো কিছুই বুঝতে পারছি না।
আব্বা!আব্বা আপনি কী আমাদের আর ভালোবাসবেন না। সাইকেলে চেপে আর স্কুলে নিয়ে যাবেন না।হাতে টাকা দিয়ে বলবেন না এই নে মা তুই কিছু খেয়ে নিস।
–কিরে কী ভাবছিস?
ইভা আপুর ডাকে আমার ভাবনার ঘোর কাটলো।
আমি বললাম না কিছু না।
আপু বললো মিথ্যে বলিস না।তুই আব্বার কথা ভাবছিস।
আমি নিশ্চুপ হয়ে রইলাম।
সেদিন বিকেলটা আমাদের জন্যে যেন একটা অশুভ সূচনা ছিল।বাতাস যেন ফিসফিস করে বলছে আজ থেকে তোদের অশুভ দিনের সূচনা হলো।
রাতের বেলা
সেইদিন রাতের বেলা আমি আর ইভা আপু বসে স্কুলের পড়া পড়ছি।আম্মা নিশাকে নিয়ে খাটের উপর বসে আছে।
ইভা আপু হঠাৎ করে পড়া বন্ধ করে আম্মাকে বললেন ,,
আম্মা আপনি কি মামাদের জানিয়েছেন?
আম্মা ইভা আপুর দিকে তাকিয়ে বললেন না।
ইভা আপু বলেন কেনো জানালেন না?
আম্মা তখন একটা হাসি দিয়ে বললেন,,
খবর বাতাসের আগে চলে যায়।
আসলে আমার নানার বাড়ি পাশের গ্রামে।আমার নানা গ্রামের মেম্বার।আমার নানার তিন ছেলে এক মেয়ে।আমার মা সবার ছোটো।আমার নানি বলেন আমার মাকে নাকি তিনি অনেক মানত করে পেয়েছেন।
আম্মার কথা শুনে আপু আর কিছু বললেন না।
ঘড়িতে রাত দশটা বেজেছে। নিশা তখন ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেছে।
আম্মা বললেন ইভা আর ইরা খাবার খেতে আয়।আমরা দুই বোন আম্মার পেছন পেছন খাবার ঘরে গেলাম।সেইখানে গিয়ে দেখি আব্বা আর তার নতুন বউ আগে থেকে বসে আছেন।
আব্বাকে দেখে আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।যেই আব্বা আমাদের তিন বইনেরে রেখে এক দানা খাবার ও খেত না সেই আব্বা নিজের নতুন বউরে নিয়া আগে আগে খেতে বসে গেছে।
আব্বা আম্মার দিকে তাকিয়ে বললেন নাজিয়া তুমি বসো।আজকে হাজেরা আমাদের সবাইকে খাবার বেড়ে দিবে।
আব্বার কথা শুনে আম্মা অগ্নি দৃষ্টিতে আব্বার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,
আমার আর আমার মেয়েদের কোনো ব্যাপারে তুমি আর তোমার নতুন বউ খবরদারি করবে না।এই বলে দিলাম।
আমরা দুই বোন আম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।আম্মার চোখ রক্তের মত লাল হয়ে গেছে।এই আম্মা যেন বিকেলের সেই আম্মা নন।এখন আম্মার চোখে দেখছি এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের এক নারী।যেই নারীর চোখে ভয় বা অভিমান নেই।আছে শুধু প্রতিবাদ।
আম্মার ধমক শুনে আব্বা চুপসে গেছে।আব্বা হয়তো আম্মার কাছ থেকে এইটা আশা করে নাই।
এর মধ্যে হাজেরা নামক মহিলাটা আম্মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,
আপা আপনি একটু বেশিই রাগ করছেন।উনি কিন্তু আপনাকে খারাপ কিছু বলে নাই।
এইবার আম্মা সজোরে চিৎকার করে বললেন,,
চুপ করো অপায়া মেয়ে।আমার ব্যাপারে ওকালতি করতে একদম আসবে না।এর ফল ভালো হবে না এই বলে দিলাম।
আমার এগারো বছর বয়সে এই প্রথমবার আম্মাকে এত জোরে কথা বলতে শুনলাম।আম্মার মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে দেখলাম এই কী আমাদের সেই আম্মা যাকে গ্রামের মানুষ মাটি বলে ডাকত।গ্রামের মুরুব্বিরা বলে আমার মা নাকি মাটির মানুষ।তিনি কোনোদিন কারো সাথে টু শব্দটি ও করেন নি।
আর আজ সেই আম্মার চোখে শুধু আগুন দেখতে পাচ্ছি।
খেয়াল করে দেখলাম ইভা আপু মিটিমিটি হাসছে।মনে হচ্ছে আপু আম্মার মুখ থেকে এই কথা গুলো শুনার অপেক্ষা করছে।
আম্মা ইভা আপুর দিকে তাকিয়ে বললেন ইরা ভাত তরকারির পাতিল নিয়া আমার ঘরে আয়।
ইভা আপু আমাকে বললেন ইরা তুই প্লেট আর গ্লাস নিয়ে আয়।আমি পাতিল নিয়া আসতেছি।
আব্বা কিছু বলার আগেই আম্মা নিজের ঘরে চলে গেলেন।
রাতের খাবার তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারলাম না।আব্বার জন্যে সত্যিই অনেক কষ্ট হচ্ছে। আব্বারে ভীষণ ভালোবাসি আমি।আব্বা আপনি কী আমাদের ভালোবাসেন না।
আম্মা আমার দিকে চেয়ে হাসি মুখে বললেন বাপের কথা চিন্তা করিস না ইরা।তিনি আর তোদের বাপ নাই।তিনি এখন কারো নতুন জামাই।
আম্মার কথাটা আমার কলিজায় তীরের মতো বিধল।
তিনি আবার বললেন কষ্ট পাস নারে মা।আমি তো আছি।তোদের তিন জনের জন্যে আমি আমৃত্য লড়াই করে যাব।
আম্মার কথা শুনে ইভা আপু আম্মার হাত ধরে বলল আম্মা আমরাও আপনার পাশে আছি।
______
সকাল বেলা
সকাল বেলা আমাদের বাড়ির বুয়া মাজেদা খালা এসে আম্মারে বললেন,,
আপা ভাইজানের নামে কী শুনতেছি এইসব।এলাকার লোকজন কী বলতেছে এইসব।
আম্মা একটা হাসি দিয়ে বললেন যা রটে তার কিছুটা হলেও ঘটে।
আর তুই যা শুনছিস সব সত্যি।
মাজেদা খালা কিছু বলতে যাবে।তখনই আম্মা বললেন শুন আজকে খিচুড়ি রান্না করবি আর মুরগির মাংস রান্না করবি।নিশার জন্যে স্যুপ বানাবি।
মনে রাখিস আজকের নাস্তা শুধু পাঁচ জনের জন্যে।আমাদের চার জন আর তোর জন্যে বানাবি।
মাজেদা খালা বললেন আপা ভাইজান আর নতুন ভাবির জন্যে কী বানাবো?
মাজেদা খালার কথা শুনে ইভা আপু তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল।সে মাজেদা খালাকে উদ্দেশ্য করে বললো আম্মা কী বলল শুনতে পাও নাই।নাকি আজকাল তুমি কানেও কম শুনতে পাও।
আম্মা আমাদের দুই বোনের দিকে তাকিয়ে বললেন ইভা তুই নিশাকে ঘুম থেকে তুলে ফ্রেশ করে টেবিলে নিয়ে আয়।
আর ইরা তুই ছাদে উঠে গাছে পানি দে।
আম্মার কথা শুনে আমরা দুই বোন কাজে লেগে পড়লাম।
—
ছাদে উঠে গাছে পানি দিতে দিতে আমার বুকের ভেতরটা কেমন জানি ছ্যাৎ করে উঠল।
এই ছাদ আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। আব্বা নিজ হাতে টবে টবে ফুলের গাছ লাগিয়েছিল। গোলাপ, জবা, বেলি সব গাছের নামও আমাকে শিখিয়েছিল।
আজ সেই গাছগুলোতেও যেন বিষণ্নতা নেমে এসেছে।
আমি পানি দিতে দিতে নিচের উঠানের দিকে তাকালাম। দেখি হাজেরা নামক মহিলাটি উঠানে দাঁড়িয়ে কাপড় শুকাচ্ছে। আজ তার পরনে হালকা নীল শাড়ি। মুখে কোনো সাজ নেই। তবুও তাকে দেখেই আমার ভেতরটা জ্বলে উঠছে।
—
হঠাৎ আম্মার চিৎকার শুনতে পেয়ে নিচে গেলাম।নিচে গিয়ে দেখলাম আম্মা হাজেরা নামক মহিলাটির দিকে আগুন চোখে তাকিয়ে আছেন।
আমি যাওয়ার পর ইভা আপু নিশাকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
ইভা আপু আম্মাকে জিজ্ঞেস করল,,
আম্মা কী হয়েছে?আপনি এতো জোরে চিৎকার করলেন কেনো?
আম্মা ইভা আপুকে কিছু না বলে ওই মহিলাকে বললেন,,
আমার সংসারের গিন্নি হওয়ার চেষ্টা করবে না।এই বাড়িতে থাকতে হলে আলাদা রান্না করে তোমরা বর বউ খাবে।
খবরদার আমার কোনো কিছুতে খবরদারি করতে আসলে এর পরিণাম ভালো হবে না।
___নাজিয়া তুমি কিন্তু একটু বেশিই করছো।
আব্বা দূর থেকে দাঁড়িয়ে কথাটা বললেন।
আম্মা আব্বার কথার কোনো উত্তর দিলেন না।
তিনি বললেন মাজেদা খাবার রান্না হলে টেবিলে রেখে আমাদের ডাক দিবি।
এই কথা বলে আম্মা চলে গেলেন।
___এইদিকে আব্বার নতুন বউ আব্বার সামনে গিয়ে বললো নাজিয়া আপা আমাকে অনেক অপমান করেছেন।আমি শুধু বলেছিলাম আপা আজকে আমি নাস্তা বানাবো।
হাজেরা বেগম খুব কান্না শুরু করে দিলেন।
আব্বা হাজেরা বেগমকে বললেন,,
___হাজেরা তুমি একদম কান্না করবে না।আমি এখনি হোটেল থেকে তোমার জন্যে নাস্তা নিয়ে আসছি।
আব্বার কথা শুনে আমার কেমন জানি লজ্জা লাগলো।আমি আর সেইখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না।আমিও আম্মার কাছে চলে গেলাম।
—
আমি আর আম্মা খাটে বসে আছি।ইভা আপু নিশার চুল বেঁধে দিচ্ছে।
এর মধ্যে মাজেদা খালা এসে বললেন,,
আপা খাবার বানানো হইয়া গেছে।আপনারা আসেন।
আম্মা বললেন তুই যা আমরা আসছি।
মাজেদা খালা দরজা অবধি গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন।আবার আম্মার কাছে এসে আম্মাকে বললেন,,
___আপা এই বাড়ি তো আপনার নিজের নামে তাহলে আপনি কেনো সতীন মাইনা নিয়েছেন।
মাজেদা খালার কথা শুনে ইভা আপু আর আমি দুইজন ই আম্মার দিকে বড় বড় চোখে তাকালাম।
আম্মা আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন চল তোরা নাস্তা করবি চল।
চলবে।

