Home "ধারাবাহিক গল্প লাল শাড়ি লাল শাড়ি পর্ব-১৪

লাল শাড়ি পর্ব-১৪

0
353

#লাল_শাড়ি
#১৪
#ফারহানা_ইসলাম

____ নোভার বিয়ের খবর শুনে হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়েও আমার বুকের ভেতর কেমন যেন আনন্দের ঢেউ উঠল।
কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে কোথাও একটা অদ্ভুত ভয়ও মিশে ছিল।

কারণ বড় চাচী, বড় চাচা, নীল ভাইয়া আর নোভা আপু সবাই একসঙ্গে আবার আমাদের বাড়িতে আসবে।
আর এই বাড়িতে এখন আগের মতো কিছুই নেই।
আগের সেই হাসি নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা আমাদের পরিবারের মাঝখানে হাজেরা এসে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি আম্মার দিকে তাকালাম।

তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।

আব্বা ধীরে ধীরে তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।

___ নাজিয়া।

আম্মা কোনো উত্তর দিলেন না।

___ নোভার বিয়ের জন্য তোমার কোনো সাহায্য লাগলে আমাকে বলো।

আম্মা এবার তাঁর দিকে তাকালেন।

___ ওর বিয়ের দায়িত্ব আপনারও।

আব্বা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

___ জানি।

আম্মার ঠোঁটে তিক্ত একটা হাসি ফুটে উঠল।

___ সব দায়িত্বই তো একদিন আমার ছিল। এখন মনে পড়ছে?

কথাটা শুনে আব্বা মাথা নিচু করে ফেললেন।

আমি আর ইভা আপু একে অপরের দিকে তাকালাম।
এই মানুষ দুজনের মধ্যে ভালোবাসা এখনও আছে।
কিন্তু সেই ভালোবাসার ওপর এত বছরের অভিমান জমে আছে যে, কেউই আর সহজে কাছে যেতে পারছে না।

পরদিন সকালে আমরা সবাই বাড়িতে ফিরে এলাম।
হাজেরাকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হলো।
ডাক্তার বলেছেন, আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আব্বা প্রতিদিন হাসপাতালে যাচ্ছেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বাড়িতে ফিরে তিনি আগের মতো হাজেরার মায়ের সঙ্গে কোনো কথা বলেন না।

তিন দিন পর বড় চাচারা বাড়িতে এসে পৌঁছালেন।

নোভা আপু গাড়ি থেকে নামতেই আমি দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম।

___ নোভা আপু!

নোভা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,,,

___ ইরা! তোরা কেমন আছিস?

আমি হাসার চেষ্টা করলাম।

___ ভালো আছি।

নোভা আপু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে গেল, আমি মিথ্যা বলছি।

সে আস্তে করে বলল,,,,
___ তুই এখনও আগের মতোই মিথ্যা বলতে পারিস না।

আমি আর কিছু বললাম না।
বড় চাচী আম্মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন।
___ নাজিয়া, তোমাকে কতদিন পর দেখলাম!

আম্মাও তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন।
কিন্তু তাঁদের চোখে আনন্দের পাশাপাশি একটা গভীর শূন্যতা ছিল।
বড় চাচা উঠানে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালেন।
হঠাৎ তাঁর চোখ দাদীর খালি ঘরের দিকে চলে গেল।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তারপর আস্তে করে বললেন,,,
___ মা থাকলে আজ কত খুশি হতো!

কথাটা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল।

সন্ধ্যায় নোভা আপুর বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে সবাই বসেছিল।

হঠাৎ নোভা বলল,,,
___ চাচী, আমার একটা ইচ্ছে আছে।
আম্মা বললেন,,,
___ কী ইচ্ছে মা?
নোভা আপু মৃদু হেসে বলল,,,
___ আমার বিয়েতে ইরা আর ইভা আপু দুজনেই আমার পাশে থাকবে।
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
___ আমরা তো থাকবই!
নোভা আপু মাথা নাড়ল।
___ শুধু পাশে থাকবি না। আমার গায়ে হলুদের সবকিছু তোরা করবি।

ইভা আপু হেসে বলল,,,
___ এইটা আবার বলার কী আছে?
নোভা আপু হঠাৎ আম্মার দিকে তাকিয়ে বলল,,,
___ আর একটা কথা।

আম্মা বললেন,,,
___ কী?
___ আমার বিয়ের সব সিদ্ধান্তে আপনি থাকবেন।
আম্মা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।

বড় চাচী হেসে বললেন,,,,
___ আরে নাজিয়াকে বাদ দিয়ে কি কোনো সিদ্ধান্ত হয় নাকি?
কথাটা শুনে আব্বা দূর থেকে সব শুনছিলেন।
আমি লক্ষ্য করলাম, তাঁর চোখে এক ধরনের অদ্ভুত কষ্ট।

হয়তো তিনি বুঝতে পারছেন,,,
যে সংসারটাকে তিনি নিজেই একদিন ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, আজ সেই সংসারের প্রতিটি আনন্দে তাঁর উপস্থিতি থাকলেও তিনি আর আগের মতো সেই পরিবারের অংশ নন।

রাত গভীর হলে আমি পানি খেতে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলাম।
হঠাৎ আব্বার ঘরের ভেতর থেকে হাজেরার মায়ের গলা শুনতে পেলাম।

___ আপনি নাজিয়ারে আবার এত কাছে টানতেছেন ক্যান?

আমি থেমে গেলাম।

আব্বার গলা শুনতে পেলাম,,,,
___ কী বলতে চাইছেন?

___ আমি সব বুঝি। হাজেরা অসুস্থ হইছে বইলা আপনি এখন আবার আগের সংসারে ফিরতে চাইতেছেন?

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর আব্বা কঠিন গলায় বললেন,,,,
___ আমি কারও কাছে ফিরতে চাইছি না।

হাজেরার মায়ের গলা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
___ তাহলে নাজিয়ার প্রতি এত খেয়াল ক্যান?

___ কারণ সে আমার সন্তানদের মা।
___ আর হাজেরা?

আব্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
___ হাজেরা অসুস্থ। তার চিকিৎসার দায়িত্ব আমার।

হাজেরার মা তীব্র গলায় বললেন,,,,
___ আপনি যদি নাজিয়ার জন্য এত কাঁদেন, তাহলে আমার মাইয়ার জীবনটা নষ্ট করলেন ক্যান?

কথাটা শুনে আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কিছুক্ষণ পর আব্বা খুব ধীরে বললেন,,,

___ এই প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেকেও প্রতিদিন দিই।
তারপর দীর্ঘ নীরবতা।

আমি নিঃশব্দে সেখান থেকে সরে এলাম।
কিন্তু আব্বার শেষ কথাটা আমার মাথায় ঘুরতে লাগল।
___ এই প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেকেও প্রতিদিন দিই।
সত্যিই কি আব্বা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন?
নাকি হাজেরার অসুস্থতা তাঁকে সাময়িকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে?

আর ঠিক তখনই আমার মনে হলো,,
নোভার বিয়ের আনন্দের আড়ালে এই বাড়িতে আরও বড় কোনো ঝড় অপেক্ষা করছে।

কারণ পরদিন সকালে হাসপাতাল থেকে এমন একটি ফোন আসতে চলেছে, যে ফোনটা শুধু হাজেরার জীবন নয়
আমাদের পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেবে।

পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই দেখি বাড়িতে সাজসাজ রব।

নোভা আপুর গায়ে হলুদের আর মাত্র দুই দিন বাকি।

বড় চাচী আর আম্মা মিলে বিয়ের তালিকা করছেন।
ইভা আপু আর নোভা আপু কাপড়চোপড় নিয়ে ব্যস্ত।
মুন্নী আর নিশা তো সারাদিন এ ঘর থেকে ও ঘর দৌড়াদৌড়ি করছে।

শুধু আমার মনটাই কেমন অস্থির হয়ে আছে।

গতরাতে আব্বার কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে।

___ এই প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেকেও প্রতিদিন দিই।

কী প্রশ্নের উত্তর?

কেন তিনি আম্মাকে ছেড়ে গিয়েছিলেন?

কেন আমাদের ছেড়ে অন্য একজনকে বিয়ে করেছিলেন?

কেন এখন তাঁর চোখে আবার অনুতাপ?

আমি কোনো উত্তরই খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

ঠিক তখনই উঠানে একটা গাড়ির শব্দ হলো।

সবাই চমকে উঠল।

আব্বা তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে গেলেন।

আমি বারান্দা থেকে দেখলাম, হাসপাতালের একজন লোক গাড়ি থেকে নামছেন।

আব্বার মুখটা মুহূর্তেই বদলে গেল।

তিনি দ্রুত লোকটার কাছে এগিয়ে গেলেন।

___ আপনি?

লোকটা মাথা নেড়ে বললেন,

___ আমি ডাক্তার নই। হাসপাতাল থেকে এসেছি। রোগীর রিপোর্ট নিয়ে।

আব্বার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

___ হাজেরার রিপোর্ট?

___ জি।

কথাটা শুনে আম্মাও বারান্দা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

আব্বা কাগজগুলো হাতে নিলেন।

কিন্তু খাম খুলতে পারছিলেন না।

কিছুক্ষণ পর তিনি কাঁপা হাতে খামটা খুললেন।

আমি দূর থেকে দেখলাম, তাঁর চোখ দ্রুত কাগজের ওপর ঘুরছে।

হঠাৎ তাঁর হাত কেঁপে উঠল।

কাগজটা প্রায় হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল।

___ কী হয়েছে?

বড় চাচা আর নীল ভাইয়া এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন।

আব্বা কোনো উত্তর দিলেন না।

তিনি শুধু চেয়ারে বসে পড়লেন।

আমি আর ইভা আপু দৌড়ে তাঁর কাছে গেলাম।

___ আব্বা?

তিনি ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।

তাঁর চোখে এমন এক ভয় দেখলাম, যা আগে কখনও দেখিনি।

___ ডাক্তার বলছে!!! ক্যান্সারটা ছড়িয়ে গেছে।

আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

___ কোথায়?

আব্বা ঠোঁট নাড়লেন।

কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।

হাসপাতাল থেকে আসা লোকটি ধীরে বললেন,

___ জরায়ু থেকে আশেপাশের কিছু অংশে ছড়ানোর আশঙ্কা আছে। ডাক্তার বলেছেন দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

চলবে