#লাল_শাড়ি
২য় পর্ব
___ডাইনিং টেবিলের ওপরে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির গন্ধ ছড়িয়ে আছে। মুরগির মাংসের ঝোলের উপর পাতলা তেলের স্তর জমেছে।
সত্যিই মাজেদা খালার রান্নার প্রশংসা করতে হয়।নিশা চামচ দিয়ে বাটিতে টুংটাং শব্দ করছে। অথচ পুরো বাড়িটা যেন কবরস্থানের মতো নিস্তব্ধ।
আম্মা মাথা নিচু করে খাচ্ছেন। তার মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। যেন কিছুই হয়নি।
আমি বারবার আড়চোখে আব্বার খালি চেয়ারটার দিকে তাকাচ্ছিলাম।
___ইভা আপু হঠাৎ করে বললেন,,
কিরে ইরা খাবার যে ঠান্ডা হয়ে আসছে।এইদিক ওইদিক করছিস কেনো?
আমি মাথা নিচু করে বললাম কিছু না আপু।এত্ত গরম খাবার খেলে তো মুখ পুড়ে যাবে।
___আমার কথা শুনে আপু আর কিছু বললেন না।
___আম্মা খাবার শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে আমাদের দুই বোনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,
তাড়াতাড়ি করে খেয়ে উঠ।স্কুলে যেতে হবে।
ইভা আপু হাসি দিয়ে বললেন,,
আম্মা আজকে তো শুক্রবার।আজকে স্কুল বন্ধ।
আম্মা আর কিছু বললেন না।
নিশা আমার হাত ধরে বললেন ইরা আপ্পি আজকে আমাকে নিয়া নদীর পালে (পাড়ে) ঘুরতে যাবা।
আমি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সম্মতি দিলাম।
আমার কথা শুনে নিশা বললো কী মজা!
ইভা আপু বললেন নিশা তুমি তাড়াতাড়ি করে খাবার শেষ করো।
_____জোর করে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করছি।ঠিক তখনই দেখলাম আব্বারে একটা কালো প্যাকেট হাতে রুমের দিকে যাচ্ছেন।
আব্বারে দেখে আমার বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।আব্বা আমাদের সাথে একটি কথাও বললো না।আমরা কী খেয়েছি না খেয়েছি একবার জিজ্ঞেসও করলো না।
আব্বা আজ আপনারে খুব অচেনা লাগছে।
____হঠাৎ সজোরে একটা আওয়াজে আমার ঘোর কাটলো।তাকিয়ে দেখি ইভা আপু টেবিলের ওপর চামচ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।
ইভা আপুর এই রকম ব্যবহার দেখে আমার খুব ভয় লাগলো।
ইভা আপু উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে বললো তুই নিশাকে খাইয়ে দে।আমি আম্মার ঘরে চললাম।
কিছুক্ষণ পর
—
আমি আর ইভা আপু আম্মার পাশে খাটে ওপরে বসে আছি।মাজেদা খালা টুলের ওপর বসে আছেন।নিশা নিচে বসে পুতুল বিয়ে খেলছে।
__ইভা আপু আম্মার হাত ধরে বললেন আম্মা এই বাড়ি যে আপনার নামে আপনি তো আমাদের কোনদিন বলেন নাই।
__আম্মা বললেন বলার প্রয়োজন হয়নি তাই বলি নাই।
__মাজেদা খালা বললেন আপা মাইয়াদের সব কথা খুলে বলেন।ওরা ছাড়া এইখানে আপনার আপন আর কে আছে?
___মাজেদা খালার কথা শুনে আম্মা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।আর ধীরে ধীরে আলমারির কাছে গিয়ে আলমারি খুললেন।আলমারিতে হাত দিয়ে একটা লাল শাড়ি বের করে আমাদের সামনে এনে রাখলেন।
__আমি জিজ্ঞেস করলাম আম্মা আপনি এই লাল শাড়ি কেনো বের করছেন।আপনি কী কোথাও বের হবেন নাকি?
__ইভা আপু বললেন আম্মা কিছু বলেন না।আপনি কোথায় চলে যাবেন আমাদেরকে ছেড়ে।
__আম্মা ইভা আপুর পাশে বসে বললেন তোরা যা শুনতে চাইতেছিস সেই ইতিহাসের শুরু এই লাল শাড়ি থেকেই।
__মাজেদা খালা বললেন আপা কী ইতিহাস আমরা শুনতে চাই।
__আম্মা তখন ইতিহাস বলা শুরু করলেন,,
আমি আমার বাবা-মায়ের আদরের ছোট মেয়ে।তিন ভাইয়ের পর আমার জন্ম হয়।আমার দাদী আমার নাম রাখলেন নাজিয়া আক্তার শিরিন।
কিন্তু সবাই নাজিয়া বলেই ডাকত।
পরিবারের সকলের আদরের মেয়ে ছিলাম আমি।তিন ভাইয়ের চোখের মণি। আর আব্বা আম্মার কথা কী বলবো এক কথায় আমি উনাদের প্রাণ ছিলাম।
আমার একজন ফুফুও ছিলেন।তিনি আমাকে অনেক ভালোবাসতেন।ফুফুর কোনো মেয়ে ছিলো না।দুইজন ছেলে ছিল।
আমার বয়স তখন মাত্র ষোলো বছর।আমি সবেমাত্র ক্লাস নাইনে পড়ি।স্বপ্ন ছিল শহরের কলেজে গিয়ে পড়াশুনা করবো।
কিন্তু বিপত্তি বাধে বড় ভাইয়ের পর।আশেপাশের লোকজন বলত ও নিজামের মা (বড় ভাইয়ের নাম) তোমার পোলা তো বিয়ে করে ঘরে বউ তুলছে।এখন তোমার নাজিয়াকে একটা কিনারা করে দাও।না হয় পরে বিপদে পড়তে হবে।তোমার মাইয়ার যা রূপ।গ্রামের পোলারা এমনিতেই দেওয়ানা হয়ে যাইবো।
কিন্তু আমার আব্বা আম্মা এসব কথা কানেও নিতেন না।
___হঠাৎ করে একদিন আমার ফুফু আর ফুফা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে গেলেন। ফুফু-ফুফাকে দেখে আমরা চার ভাই বোন অনেক খুশি হলাম। ছোট ভাইয়া আর আমি তো খুশি তো নেচে উঠলাম।একমাত্র ফুফু এসেছেন তাও অনেকদিন পর।
___ফুফা ফুফু ভাইয়ার বউকে দেখে অনেক খুশি হলেন। ভাবী ফুফা ফুফুকে যথেষ্ট আপ্যায়ন করলেন। বাড়িটা সেদিন হাসি আনন্দে ভরে উঠেছিল।বাড়িতে যেন উৎসব উৎসব আমেজ ছিল।
কেউ তখন বুঝতে পারেনি, সেই হাসির আড়ালে কী লুকিয়ে আছে?
___বিকেলের দিকে ফুফু আমাকে পাশে ডেকে বললেন,,
–নাজিয়া, তুই দিন দিন এত সুন্দর হইতেছিস কেনো রে? নজর লাগবো কিন্তু।
আমি লজ্জা পেয়ে দৌড়ে রান্নাঘরে চলে গিয়েছিলাম।
তখনও বুঝিনি, ফুফুর ওই কথার ভেতরে অন্য মানে ছিল।
___রাতে সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে মাটিতে পাটি বিছিয়ে বসেছেন।গরম চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। আমি আর ছোট ভাইয়া একপাশে বসে ছিলাম। হঠাৎ শুনলাম ফুফা আব্বাকে বলছেন,,
হাশেম, একটা কথা ছিল।
আব্বা হেসে বললেন,,
বলেন দুলাভাই।
ফুফা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,,
নাজিয়ারে আমরা আমাদের বাড়ির বউ করতে চাই।
কথাটা শুনে আমার বুক ধক করে উঠলো।
আমি যেন মুহূর্তেই পাথর হয়ে গেলাম।
___আম্মা অবাক হয়ে বললেন,,
___ দুলাভাই কী বলেন এসব?মেয়েটা তো এখনও ছোট।
ফুফু তখন মুচকি হেসে বললেন,,
___ছোট কই?গ্রামের কত মাইয়া এই বয়সে দুই বাচ্চার মা।
আমার বড় ভাইয়া সাথে সাথে বলে উঠলেন,,
___না ফুফু। নাজিয়ার পড়াশোনা আগে।
___আমি চুপচাপ বসে ছিলাম। মাথা নিচু।কেমন জানি অস্বস্তি হচ্ছে।
___ফুফা আবার বললেন,,
___আমরা তো দূরে কোথাও দিতেছি না। নিজের বাড়িতেই থাকবো। আমার ছোট ছেলে সোহেল শহরে চাকরি করে। শিক্ষিত ছেলে। নাজিয়ারে অনেক সুখে রাখবো।
“সোহেল” নামটা শুনে আমার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো।
সোহেল ভাইয়াকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনতাম। উনি আমাদের বাড়িতে এলে খুব কম কথা বলতেন। সবসময় শান্ত, গম্ভীর।
কিন্তু কেন জানি তাকে দেখলে আমার খুব ভয় লাগত।
___আম্মা বললেন শুনেন আপা আমি আমার মেয়েকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিবো না।আমার একটা মাত্র মাইয়া।আমি ওরে আরও পড়াবো।
আম্মার কথা শুনে ফুফু হাতে থাকা কাপটা মাটিতে সজোরে রেখে আব্বারে উদ্দেশ্য করে বললেন,,
___হাশেম আমি তোর বড় বইন।আমি কী তোর আর তোর মেয়ের খারাপ চাইতে পারি?
আব্বা বললেন আপা রুবিনা (মায়ের নাম) কিন্তু আপনারে সেই কথা বলে নাই।
ফুফা কইলেন থাক হাশেম।তোমাকে আর কিছু বলতে হবে না।আমরা কাল সকালেই চলে যাব।আর কোনোদিন আসবো না।
___
হাশেম আলী ভীষণ চিন্তায় পড়ে যান।একদিকে নিজের একমাত্র বোন আর অন্যদিকে একমাত্র কন্যা।বোন কিন্তু খারাপ কিছুই বলে নাই।
সত্যিই তো সোহেল আর মাসুদ দুই ভাই অনেক ভালো।বড় ছেলে মাসুদ বিয়ে করে পরিবার নিয়ে সংসার করছে।বাবার ব্যবসা সামলাচ্ছে।অন্যদিকে সোহেল পড়াশুনা শেষ করে একটি কোম্পানির ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করে।দেখতে শুনতে কিন্তু মাশাআল্লাহ।
___
হাশেম আলী বিছানায় শুয়ে এই পাশ ওই পাশ করছেন।পাশে শুয়ে আছে স্ত্রী রুবিনা।রুবিনা বানুর কপালেও চিন্তার ভাঁজ।এই বর্ষার মৌসুমেও তিনি বিন্দু বিন্দু ঘামছেন।
হাশেম আলী বিছানা থেকে উঠে হ্যারিকেনটা হাতে নিলেন। হ্যারিকেনের আগুন নিভু নিভু করছে।তিনি হ্যারিকেনের আলো বাড়িয়ে দিয়ে রুবিনা বলে স্ত্রীকে ডাক দিলেন।
স্ত্রী রুবিনা বানু বিছানা থেকে উঠে বললেন কী হয়েছে?এইভাবে ডাকছেন কেনো?
হাশেম আলী স্ত্রীর মুখে দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন রুবিনার চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ।হ্যারিকেনের মৃদ আলোতেও কিছু আড়াল হলো না।
হাশেম আলী রুবিনা বানুকে জিজ্ঞেস করলেন,,
— আমি যা ভাবছি তুমি ও কী তাই ভাবছো রুবি?
রুবিনা বানু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন হ্যাঁ।কিন্তু বুঝতে পারছি না কীভাবে কী করবো?
হাশেম আলী স্ত্রীকে বললেন,,
রুবি একবার ভেবে দেখ আমাদের সোহেল কিন্তু মন্দ নয়।ভালো চাকরি, উচ্চ শিক্ষা সব আছে।সব থেকে বড় কথা ও আমার ভাগ্নে।
রুবিনা বানু বললেন আমি সব বুঝতে পারছি।কিন্তু নাজিয়াও যে আমাগো একটা মাইয়া।ওরে কী এত্ত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ন ঠিক হইব?
___রুবিনা বানুর কথা শুনে হাশেম আলী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। বাইরে তখন টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দে পুরো রাতটা আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
হ্যারিকেনের হলুদ আলোয় দুইজনের মুখ কেমন যেন ফ্যাকাসে লাগছিল।
হাশেম আলী ধীরে ধীরে বললেন,,
__রুবি, মাইয়ারে তো একদিন বিয়া দিতেই হইবো। নিজের মানুষ অন্তত মেয়েরে আড়চোখে দেখবে না।
রুবিনা বানু কাঁপা গলায় বললেন,,
___নিজের মানুষ হইলেই কী সুখে থাকবো? আমার মনের মধ্যে কেমন জানি অশান্তি লাগতেছে।তাছাড়া সোহেল শহরে থাকে।তারও তো একটা মতামত আছে।
হাশেম আলী বলেন রুবি তুমি চিন্তা করিও না।আমি আপা আর দুলাভাইয়ের সাথে কথা বলব তারে যেন সোহেলের সাথে কথা বলে নেয়।
—
___এইদিকে নাজিয়া পাশের ঘর থেকে সব শুনছে।
চোখ বন্ধ করে করেছে ঠিকই, কিন্তু ঘুম তো অনেক আগেই পালিয়ে গেছে।
সোহেল নামটা বারবার মাথার ভেতর ঘুরছিল।
কেন জানি নাজিয়া সোহেলকে সহজভাবে নিতে পারে না। সোহেল যখনই বাড়িতে আসেন তার দিকে কেমন গভীর চোখে তাকিয়ে থাকেন। সেই দৃষ্টিতে মায়া নয়, রয়েছে অদ্ভুত একটা শীতলতা।
নাজিয়া চাদর মুড়ি দিয়ে চোখ বন্ধ করলো।
কিন্তু সেদিন রাতে, টিনের চালের বৃষ্টির শব্দের মাঝেও, তার বুকের ভেতরের অজানা ভয়টা থামলো না…
চলবে

