#লাল_শাড়ি
#৬
#ফারহানা_ইসলাম
___স্কুল ছুটি হওয়ার পর আমি ইভা আপুর জন্যে গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।ইভা আপু আসার পর দুই বোন একসাথে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিছি।
___হঠাৎ করে আপু বললেন ইরা তাড়াতাড়ি পা চালা।
…আমি বললাম,,
কেনো আপু?
ইভা আপু আমাকে আকাশের দিকে ইশারা করে বললেন দেখ আকাশ কেমন কালো মেঘে ঢেকে আছে।
আমি তাকিয়ে দেখলাম সত্যিই তো আকাশে ঘন কালো মেঘ।মেঘ দেখে মনে হচ্ছে যেকোনো সময়ে কালবৈশাখী ঝড় নামবে।
আমরা দুই বোন দ্রুত হাঁটছিলাম। রাস্তার পাশে ধানের ক্ষেত, দূরে নদীর জল কালচে হয়ে উঠেছে।
হঠাৎ পেছন থেকে সাইকেলের বেল শোনা গেল।
আমি ফিরে তাকিয়ে দেখি—
অনিম ভাইয়া।
অনিম ভাইয়া আমাদের পাশের গ্রামের। বয়সে ইভা আপুর চেয়ে তিন-চার বছরের বড় হবে। কলেজে পড়ে। মাঝেমধ্যে স্কুলের সামনে তাকে দেখা যায়।
আমি আগে খেয়াল করিনি, কিন্তু আজ দেখলাম উনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ইভা আপুর দিকে তাকিয়ে আছে।
___অনিম ভাইয়া সাইকেল থামিয়ে বললেন,,,
___ইভা! তোমরা বাড়ি যাইতেছো?
ইভা আপু বিরক্ত গলায় বলল,
___দেখে কি মনে হইতেছে আমরা সিনেমা দেখতে যাইতেছি?
অনিম ভাইয়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল।হয়তো ইভা আপুর থেকে তিনি এমন জবাব আশা করেন নাই।
___না, মানে!! আকাশের অবস্থা খারাপ। যদি বৃষ্টি বা তুফান শুরু হয়। তোমরা চাইলে আমি পৌঁছে দিতে পারি।
___দরকার নাই। আমরা বাড়ির রাস্তা চিনি।আমরা যেতে পারবো।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখছিলাম।
অনিম ভাইয়ার চোখে কেমন যেন অদ্ভুত এক শীতলতা।
তিনি একটু থেমে আবার বললেন,
___শোনো, গ্রামের মানুষ অনেক কথা বলবো। ওসব কানে নিও না।
ইভা আপুর চোখ-মুখ সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে গেল।
___গ্রামের মানুষের কথা বাদ দিয়ে আগে নিজের মুখটা বন্ধ করেন।আপনাকে আমাদের জন্য মায়া দেখাতে হবে না। নিজের রাস্তা দেখেন।
কথাটা বলে আপু আমার হাত টেনে হাঁটা দিল।
আমি পেছন ফিরে দেখলাম, অনিম ভাইয়া এখনও সাইকেল হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
তার মুখ লাল হয়ে আছে।
___আমি আস্তে করে বললাম,
___আপু, তুমি এভাবে বললা কেন? উনি তো ভালোই কথা কইলো।
ইভা আপু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
___আজকাল মানুষের ভালোবাসার কথার চেয়ে করুণার কথা বেশি ভয় লাগে।
___সবাই কি খারাপ?
___না। কিন্তু কে ভালো আর কে খারাপ তা এই মুহূর্তে বোঝা সবচেয়ে কঠিন।
—
______ বাড়ির গেইটের ভেতর ঢুকতেই শুনলাম কোনো এক মহিলার কর্কশ গলা। তাকিয়ে দেখলাম উঠানে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়স্ক মহিলার গলার আওয়াজ।বুঝতে আর বাকি রইলো না উনি হাজেরার মা। হাজেরার মায়ের কর্কশ গলা ভেসে আসছে,,,,
___আমার মাইয়ার পেটে সোহেলের বাচ্চা। এই বাড়িতে তার অধিকার আছে।
___অধিকার? সেটা আবার কী?
আম্মার কণ্ঠে কোনো ভয় ছিল না। বরং ছিল এক অদ্ভুত শীতলতা।
___অধিকার কাগজে-কলমে দেখাইয়েন, তারপর কথা কইয়েন।
আমি আর ইভা আপু দৌড়ে উঠানে গেলাম।
দেখি আম্মা মাঝউঠানে দাঁড়িয়ে। মুখে কোনো ভয় নেই।
নানা ভাইয়ের দেওয়া পুরনো কাঠের চেয়ারে বসে আছে হাজেরার মা। পাশে সেই কিশোরী মেয়েটা, যে সকালে আব্বাকে বাবা বলে ডাকছিল।
হাজেরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে কাঁদো কাঁদো মুখে সব দেখছে।
আর আব্বা,,,
আব্বা চুপ।
এই চুপ করাটাই এখন আমার সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে।
যে মানুষটা আগে অন্যায় দেখলে গর্জে উঠত, আজ সে অন্যায়ের পাশেই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে।
___ইভা আপু এগিয়ে গিয়ে আম্মার পাশে দাঁড়ালো।
আমি নিশাকে খুঁজতে খুঁজতে চারপাশে তাকালাম।
দেখি সে বারান্দার খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় চোখে সবাইকে দেখছে।
আমি দ্রুত গিয়ে ওকে কোলে তুলে নিলাম।
___হাজেরার মা এবার গলা উঁচু করে বললেন,
___দেখ নাজিয়া, মাইয়া মানুষের কপাল খারাপ হইলে এমন হয়। তুইও আমার মাইয়ার মত।কিন্তু তাই বলে তুই আরেকটা মাইয়ারে এভাবে অপমান করতে পারস না।
আম্মা শান্ত গলায় বললেন,,,
___ দেখেন আপনি আপনার মাইয়ারে নিয়ে অন্য কোথাও যান। আমার সংসারের নিয়ম আমি নিজেই ঠিক করে নেব।
আপনার সংসার? এই বাড়িতে এখন আমার মাইয়ার স্বামী থাকে!
___থাকে। ভাড়া দিয়ে থাকে।
কথাটা এমন ঠান্ডা স্বরে বলা হলো যে, চারপাশ মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আমি দেখলাম, আব্বার মুখটা শক্ত হয়ে গেছে।
হাজেরার মা যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না, কেউ তাকে এভাবে জবাব দিতে পারে।তিনি অবিশ্বাসের চোখে আম্মার দিকে তাকিয়ে আছেন।
—
প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে।সাথে প্রচন্ড বাতাস আর বজ্রপাত। বজ্রপাতের আওয়াজে চারদিক একবার আলোকিত হয়, আবার অন্ধকার।বজ্রপাতের শব্দে যেন কানের পর্দা ফেটে যাবে।নিশা আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে।
বৃষ্টির শব্দে বাইরের অনেক কথা শোনা যাচ্ছিল না। কিন্তু হঠাৎ একটি চিৎকার পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে দিল।
আহ্!!!
আমি আর ইভা আপু একে অপরের দিকে তাকালাম।
নিশা ভয়ে আমার আঙ্গুল শক্ত করে ধরে বলল,
__ইরা আপু, বাইরে কে কাঁদতেছে?
আমরা দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দেখলাম মাজেদা খালা আর উনার মেয়ে মুন্নী বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন।মাজেদা খালাকে দেখে আম্মা বললেন,,,
___ কিরে মাজেদা তুই এই সময় এইখানে?
___মাজেদা খালা কান্নাজড়িত কন্ঠে বললেন,,
….আপা আমার সব শেষ হয়ে গেছে।আমি নিঃস্ব হইয়া গেলাম আপা।আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে।
____ মাজেদা তুই আগে মুন্নীকে নিয়ে ভেতরে আয়।তারপর শুনবো তোর কথা।
আম্মার কথা শুনে মাজেদা খালা মুন্নীকে নিয়ে ভেতরে এলো।ভেতরে আসার পর আম্মা জিজ্ঞেস করলেন
____ কী হয়েছে মাজেদা?
____ আপা ঝড়ে আমার ছোট ঘরটা উড়ে গেছে।সব লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। আমি এখন কি করমু আপা। কোথায় যামু এই ছোট্ট মাইয়াটারে নিয়া।আমার যে কোনো দিকে যাওয়ার জায়গা নাই।
____ মাজেদা তুই শান্ত হও। আমি একটা কথা বলি শোন তুই আপাতত আমাদের ঘরে থাকবি। তোর ঘর ঠিক হলে তুই তবে যাবি।
____ আম্মার কথা শুনে মাজেদা খালা দুই হাত তুলে বললেন, ” হে খোদা তোমার অশেষ রহমতে আমার একটা আশ্রয় মিলল। তোমার দরবারে শুকরিয়া।”
___
সন্ধ্যার পর আমি ইভা আপু আর মুন্নী খাটের ওপর বসে আছি। টেবিলের ওপর মোমবাতিটা আলতো আলতো করে জ্বলছে।আমরা তিনজন বসে বসে গল্প করছি।মুন্নী আমার থেকে এক বছরের ছোট সে ক্লাস ফোরে পড়ে।আমরা তিনজনে গল্প করছি আর হাসাহাসি করছি।
হঠাৎ দেখি মাজেদা খালার সাথে আম্মা আর নিশাও এসে যোগ দিয়েছেন।
আম্মা আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন,,,
___ তোদের কী পড়ালেখা নাই?
____ইভা আপু বললেন আম্মা আগে বিদ্যুৎ আসুক তারপর পড়তে বসব।
____ ইভা আজকে মনে হয় না বিদ্যুৎ আসবে।যেই পরিমাণ তুফান হইছে।
_____ আম্মা তাহলে আমরা কাল ভোরে উঠে পড়া শেষ করে ফেলব।এখন একটু গল্প করি।
আমাদের কথা শুনে আম্মা আর কিছু বললেন না।কিন্তু হঠাৎ মাজেদা খালা বললেন,,,,
____ আপা সোহেল ভাইজানের সাথে বিয়ের পর আপনার সাথে কী হইছে সেটা কিন্তু বললেন না।
আম্মা এইবার একটি নড়েচড়ে বসলেন।তিনি বলেন মাজেদা তোর দেখি এই ব্যাপারে জানার খুব আগ্রহ।
মাজেদা খালা বললেন, কী যে বলেন আপা?আগ্রহ থাকবো না ক্যান? কী এমন ব্যাপার হইলো যে আপনি সতীন কাটা সহ্য করতেছেন!! তাও আবার নিজের বাড়িতে!!
শোন তাহলে,,
সাল ১৯৯৩
…. নাজিয়া ১৯৯৩ সালে মেট্রিক পরীক্ষা দিবে। সোহেল বলেছে নাজিয়া মেট্রিক পাস করলে নাজিয়াকে ঢাকায় নিয়ে যাবে।
সোহেল নাজিয়ার অনেক খেয়াল রাখত। ভীষণ ভালোবাসত। প্রতি সপ্তাহে একবার শশুর বাড়ি আসত নাজিয়ার সাথে দেখা করতে।
এর মধ্যে এলো এক খুশির সংবাদ, নাজিয়া সন্তানসম্ভবা। এই সংবাদ সোহেল ও তার বাবা মা জানার পর খুব খুশি হলো। তারা সবাই না দেখতে গ্রামে চলে আসলো। সাথে আসলো বড় জা মানে মাসুদের স্ত্রী। তাদের ছেলে নীল আর মেয়ে নোভা। শশুর শাশুড়ি নাজিয়াকে অনেক দোয়া করলো। কিন্তু নাজিয়ার বড় জা কেমন জানি এই বাড়িতে এসে খুশি হতে পারল না।
এইদিকে নাজিয়ার মেট্রিক পরীক্ষার দিন নিকটে চলে আসলো। কিন্তু সোহেল কোনোমতে নাজিয়াকে এই অবস্থায় বের হইতে দিবে না। সোহেলের একটাই কথা তার সন্তান আর স্ত্রী আগে। কিন্তু নাজিয়া এই শর্ত মানতে নারাজ। নাজিয়া চায় সে পরীক্ষায় পাশ করে কলেজে ভর্তি হবে।
সোহেল এটা কিছুতেই মানে না। শেষ পর্যন্ত নাজিয়ার বাবা-মা, ভাই-ভাবী নাজিয়াকে অনেক বুঝাল যেন পরীক্ষা না দেয়। নিজের সংসার আর সন্তান আগে।নাজিয়ার আর পরীক্ষা দেওয়া হলো না।
…. দিনের পর দিন কেটে যায়। সোহেল আর নাজিয়ার ভালোবাসা যেন দিন দিন বেড়েই চলছে। সোহেল নাজিয়ার অনেক খেয়াল রাখে। এক কথায় নাজিয়া যেন সোহেলের প্রাণ।
গ্রামের মহিলারা প্রায়শই সমালোচনা করত,, নাজিয়ার রাজ কপাল, না হয় সোহেলের মত এত্ত সুন্দর, যত্নশীল আর দায়িত্ববান স্বামী কী পায়।
____ অবশেষে সোহেল আর নাজিয়ার অপেক্ষার প্রহর শেষ হইলো। নাজিয়ার কোল আলো করে এসেছে এক কন্যা সন্তান। সেই মেয়ের নাম রাখা হল ইবনাত সুলতানা ইভা। কন্যা সন্তান হওয়ার পর নাজিয়ার প্রতি সোহেলের ভালোবাসা যেন আরও বেড়ে গেল।
সোহেল ঠিক করে এইবার নাজিয়াকে এইবার শহরে নিয়ে যাবে।
শহরে যাওয়ার পর
____ শহরে যাওয়ার পর দিন ভালোই কেটে যাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো বড় জা নিঝুম। সে সবসময় নাজিয়ার ভুল ধরবে। নাজিয়া রান্না করলে বলবে রান্না ভালো হয় নাই। কোনোদিন বলবে তেল, নুন, মশলা বেশি হয়েছে, আবার কোনদিন বলবে কম হয়েছে।
নিঝুমের এই রকম ব্যবহার নাজিয়া মুখ বুজে সহ্য করে নিত। কিন্তু সকলের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না করত। তবে যা-ই হোক না কেনো সোহেল সবসময় নাজিয়ার পাশে থাকত।
দিন দিন নিঝুমের অত্যাচার বেড়েই চলছে। কিন্তু নাজিয়া কিছু বলতেও পারে না। শুধু কান্না করে। এইদিকে শশুর শাশুড়ি যদি নাজিয়ার পক্ষে কথা কোনো কথা বলে তাহলে বলে নিজের ভাইয়ের মেয়ের দোষ দেখতে পান না। শুধু আমার দোষ ই দেখেন।
…. একদিন অসময়ে সোহেল বাসায় আসলো। নাজিয়া তাড়াতাড়ি করে আসার কারণ জিজ্ঞেস করতেই সোহেল উত্তর দেয়, তার চাকরিটা আর নয়।কোম্পানিতে কিছু সমস্যা হয়েছে… যার কারণে কোম্পানি অর্ধেকের বেশি লোককে ছাঁটাই করে দিয়েছেন। কথায় আছে না বিপদ যখন আসে সব দিক থেকেই আসে।
চলবে

