#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_১০
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার
বেশ অনেকটা সময় ধৈর্য নিয়ে মৃত্তিকার সমস্ত অত্যাচার সহ্য করার পর অবশেষে সমীরণ নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল। ভালোভাবে মুখটা ধুঁয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দেখল ওর ঘরে মৃত্তিকা। মেয়েটা তখনও সমীরণকে খেয়ালই করেনি। ঘুরে ঘুরে সমীরণের পুরো ঘরটা দেখছে, এটাতে ওটাতে হাত লাগাচ্ছে। সমীরণ খেয়াল করল দু একটা জিনিস আবার এদিক থেকে ওদিকে রাখল। সমীরণ জানেনা ওগুলো অগোছালো ছিল কিনা কিংবা দেখতে খারাপ লাগছিল কিনা। মেয়েটা কেন এসব করল সেটাও বুঝল না। ও কি জানে না সমীরণ নিজের জিনিসে কারো হাত লাগানো অপছন্দ করে?
মৃত্তিকা দেখল ঘরের একটা কোনায় খুবই অযত্নে আর অবহেলায় একটা ফুলদানি পড়ে আছে। ছোট্ট একটা মাটির তৈরি ফুলদানি। তাতে আবার কিছু কৃত্রিম ফুলও রাখা, যেগুলোর উপরে ধুলো জমেছে। মৃত্তিকা এগিয়ে গিয়ে ফুলদানিটা হাতে নিল। ফুলের উপর ধুলে ঝাড়ার চেষ্টা করল। সেই সাথে প্রচণ্ড বিরক্ত হলো সমীরণের উপর। মানুষটা কোন কিছুরই যত্ন নিতে জানে না। না ফুলের, না মানুষের। সব সময় সব কিছুতেই অবহেলা। কে জানে এভাবে অবহেলা পেতে পেতে কোন দিন না জানি এই ফুলগুলোর মত মৃত্তিকাও মূর্ছা যায়।
ফুলগুলো থেকে যতটা সম্ভব ধুলো ময়লা ঝেড়ে সে ফুল সমেত ফুলদানিটা সমীরণের পড়ার টেবিলের উপরে রাখল। এখন সুন্দর লাগছে দেখছে।
“আমার জিনিসপত্রে কেউ হাত লাগাক এটা আমি পছন্দ করি না, জানিস না তুই?”
হঠাৎ করে সমীরণের কন্ঠটা কানে আসতেই কেঁপে উঠল মৃত্তিকা। সমীরণের কন্ঠ অনুসরণ করে সেদিকে তাকাল,
“এভাবে ফেলে রেখেছো কেন ফুলদানিটা? ফুলগুলো তো নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।”
“তো? আমার বাপের টাকা দিয়ে কিনেছি, আমি নষ্ট করেছি। তোর কি? নিজের কাজে যা?”
সমীরণের এমন গা ছাড়া ভাব আর ত্যাড়া কথা শুনে রাগ হলো মৃত্তিকার। চোখ মুখে একরাশ বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে তুলল সে।
“এত অবহেলা করতে নেই কোনকিছুর প্রতিই, বুঝতে পেরেছ? তোমার বাপের টাকায় কিনেছো বলে তোমাকে নষ্ট করতে হবে তার কোন মানে নেই। যদি নষ্ট করারই ছিল কিনেছিলে কেন? একটু যত্ন করতে শেখো, ভালোবাসতে শেখো। হোক সেটা ফুলদানির কিংবা মানুষের।”
হাতমুখ মুছে ভেজা গামছাটা বিছানার উপরে ছুঁড়ে মারল সমীরণ। ইচ্ছে ছিল শুয়ে পড়ার। মৃত্তিকার শেষোক্ত বাক্য টা কানে যেতেই ঘুরে তাকাল ওর দিকে। সমীরণের দৃষ্টি সরু আর তীক্ষ্ণ হলো।
মৃত্তিকা শাড়ি পরে এসেছিল যে ব্যাপারটা অনেক আগেই খেয়াল করেছে সমীরণ। তবে পাত্তা দিতে চায়নি। না বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে চেয়েছিল। এই একটা কারণে বেশিক্ষণ মৃত্তিকার কাছাকাছিও থাকতে চায়নি। শাড়ি পরে মেয়েটাকে আজ বড় বড় লাগছে দেখতে। অথচ এতকাল এই মেয়েটাকে সমীরণের কাছে বাচ্চা মনে হতো। যে সব সময় অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে থাকত, ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিত।
বিশেষ করে যখন প্রথম রান্নাঘরে গিয়ে দেখেছিল মৃত্তিকা রান্না করছে এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করেছিল সমীরণের মাঝে। পাক্কা গৃহিণী লাগছিল দেখতে। মনে হচ্ছিল এই বাড়ির সম্পূর্ণ দায়িত্ব মৃত্তিকার, সমীরণের মতন একটা উশৃংখল ছেলেকে সামলানোর দায়িত্ব, সমীরণের সংসার সামলানোর সব দায়িত্ব মৃত্তিকার। তবে নিজের সেই ভালোলাগা, খারাপ লাগা কোন কিছুকেই প্রশ্রয় দেয়নি। অন্তত মৃত্তিকার সামনে তো মোটেই না।
সমীরণ এখনো জানেনা যে মৃত্তিকা কে সুন্দর লাগছে নাকি দেখতে। সমীরণ মুগ্ধ হয়েছে কিনা তাও জানে না। শুধু এতোটুকু জানে আজেবাজে কিছু খেয়াল আসছে মনে। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। এই অনুভূতির নাম যদি মুগ্ধতা হয় তবে সমীরণ মুগ্ধ হয়েছে মৃত্তিকাকে দেখে। আর যদি ভালোবাসা হয় তবে হয়ত ভালোবেসে ফেলেছে।
অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও সমীরণের থেকে কোন ঝারি না খাওয়া ব্যাপারটা যেন ঠিক হজম হতে চাইল না মৃত্তিকার। অধৈর্য হয়ে বলল,
“আজকাল এমন হুটহাট চুপ করে যাও কেন বলতো? কথা বল।”
সমীরণ কিছু না বলে এক পা দু পা করে এগিয়ে আসতে থাকল মৃত্তিকার দিকে। ভরকাল মৃত্তিকা। এই ছেলে আবার এগিয়ে আসছে কেন ওর দিকে? চ ড় মা র বে নাকি? মা র খাওয়ার মতন তো কিছু বলেনি মৃত্তিকা। চোখ মুখ দেখে তো মনেও হচ্ছে না রেগে গেছে। শান্তই লাগছে দেখতে। আচ্ছা একি ঝড় আসার আগের পূর্বাভাস!
মৃদু তুতলে বলল,
“দেখো চড় মা রা র মতন কিন্তু আমি কিছু বলিনি তোমায়। এখন যদি সত্যি চড় মা রা র হয় তাহলে আগে আমাকে ইচ্ছেমত কথা শোনাতে দাও।”
হেসে ফেলল সমীরণ। ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“তোর কথায় তো সব হবে না। তোর কথায় কিছুই হবে না। আমি যা বলব, আমি যা ভাবব তাই হবে।”
মৃত্তিকা আবারো তুতলে বলল,
“কাছে আসছো কেন? আমি কিন্তু তোমায় দেখে ভয় করিনা।”
মৃত্তিকা পেছাতে পেছাতে এক সময় বুঝতে পারল ওর কাছে আর পেছানোর মতন জায়গা নেই। ওর ঠিক পিছনে সমীরণের পড়ার টেবিল। মোট কথা ওকে লুকোনোর মতন আর জায়গা দেবে না কেউ। সমীরণ ততক্ষণে ওর অনেকটাই কাছে চলে এসেছে। মৃত্তিকা ডান দিক দিয়ে পালাতে চাইলে সমীরণ বাধা দিল। মৃত্তিকা বাম দিক দিয়ে পালাতে চাইলে সমীরণ সেদিকেও বাধা দিল ওকে। মোটকথা নিজের দুই হাতের মাঝে ফাঁকা জায়গাটায় বন্দি করল মৃত্তিকাকে।
“তোর দুঃসাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, মৃত্তিকা। একেই তো শাড়ি পরেছিস। এতক্ষণ দুরে দুরে থেকেছিস কিছু বলিনি। কিন্তু সোজা আমার ঘরে চলে এসে আবার আমাকে দেখে ভয় করিসনা এটা বলে ভুল করলি। এবারে এমন কিছুই করব যেন তুই ভয় পাস আমায় দেখে।”
চোখ বড় বড় করে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে মৃত্তিকা সমীরণের দিকে তাকাল। আতঙ্কিত গলায় বলল,
“কি করবে?”
সমীরণ উত্তর না দিয়ে ঝুঁকে গেল মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকার পক্ষে যতটা সম্ভব পিছিয়ে গেল। সমীরণ ঠিক ততটাই ওরদিকে ঝুঁকে গেল। একবার শ্বাস টানল। যেন কোন ঘ্রাণ অনুভব করার চেষ্টা করল। অতঃপর ঘাড় ঘুরিয়ে মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুই কোন শ্যাম্পু ইউজ করিস?”
মৃত্তিকা এতটাই বেশি ভয় পেয়েছে আর ঘাবড়ে গেছে যে ভুলেই গেল কোন শ্যাম্পু ইউজ করে। প্রথম দফায় শ্যাম্পু জিনিসটা কি, এটা খায় না পরে সেটাও ভুলে গিয়েছিল।
“ভুলে গেছি।”
“কোন পারফিউম ইউজ করিস?”
মৃত্তিকা একটু মনে করার চেষ্টা করল তবে মনে পড়লো না। কাতর দৃষ্টিতে সমীরণের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এটাও ভুলে গেছি।”
সমীরণ আবারও হেসে ফেলল মেয়েটার অবস্থা দেখে। মৃত্তিকার চুলগুলো একটা হেয়ারব্যান্ড দিয়ে পেছনে আটকানো। চুল ছেড়ে দিয়েই এসেছিল। তবে রান্না করার সময় চুলগুলো বেঁধেছিল। নয়ত গরমে অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। সমীরণ আগে পিছে কোন কিছু না ভেবে মৃত্তিকাট মাথা থেকে হেয়ারব্যান্ডটা খুলে দিল। মুহূর্তের মাঝে মৃত্তিকার পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ওর লম্বা চুলগুলো। সমীরণ আরেকবার ওর দিকে ঝুঁকে গিয়ে চুলের ঘ্রাণ টুকু টেনে নিয়ে বলল,
“সবই ভুলে যাস। শুধু আমায় সমীরণ বলে ডাকার কথা মনে থাকে। আর আমাকে ভালোবাসিস সেটুকু মনে থাকে, তাই না?”
“তুমি যে আমার আত্মার সঙ্গে মিশে আছো। তোমায় যেদিন ভুলে যাব সেদিন তো নিজেকেও ভুলে যাব। নিজেকে কি কেউ ভুলতে পারে?”
মৃত্তিকা নিজেও জানে না ঠিক সময় ওর মুখ থেকে এই ঠিক কথাটা কি করে বেরিয়ে গেল। একেবারে মনের কথাটা বেরিয়ে গেছে। আচ্ছা এই কথাটা কি সমীরণের ওপর প্রভাব ফেলল? ব্যাপারটা দেখার জন্য মৃত্তিকা তাকিয়ে রইল সমীরণের দিকে। খেয়াল করল সমীরণও নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। নিজের দু চোখের সাহায্যে মৃত্তিকার পক্ষে নিজের কাতরতা যতটা প্রকাশ করা সম্ভব ততটাই প্রকাশ করল। সমীরণের জন্য হৃদয়টা ঠিক কতটা তৃষ্ণার্ত, নিজের সেই তৃষ্ণা প্রকাশ করার চেষ্টা করল। তবে সে সবকিছু এই কঠিন মানবের হৃদয় গলাতে পারল কিনা মৃত্তিকা জানে না।
কিছুক্ষণ এভাবে নিষ্পনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর সমীরণ নিজের বাঁধন থেকে মুক্ত করে দিল মৃত্তিকাকে। ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“আত্মার সাথে মানুষ মিশে থাকে কিভাবে রে? আজকালকার ছেলেমেয়েদের এতই সব ঢঙের কথাবার্তা। আত্মার সাথে মিশে আছি আমি! দুদিন পর বিয়ে হলে সমীরণের চেহারাটাও ভুলে যাবি আবার সেই নাকি আত্মার সাথে মিশে আছে। “
“বিয়ে করলে তোমাকেই করব বুঝতে পেরেছো? নয়ত কাউকে করব না।”
“যদি ভাগ্যে না থাকি? ভাগ্য টাগ্য মানিস তো?”
মৃত্তিকা আলতো হেসে বলল,
“মানি। ভাগ্যের কিছু লিখন পরিবর্তনও করা যায়। আমি তোমায় আমার জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত চাইব। খোদার দরবারে নিষ্ঠার সাথে কিছু চাইলে তিনি ফেরত দেন না, সমীরণ। তার বান্দারা নিষ্ঠুর হতে পারে, তার বান্দাদের হৃদয় কঠিন হতে পারে তবে তার হৃদয় কঠিন না। আমার খোদা ভীষণ দয়ালু। তার আমার প্রতি নিশ্চয় দয়া হবে।”
সমীরণ ফের ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“এমন ভাব করছিস খোদা যেন তোর একার? আমার কথাও নিশ্চয়ই শুনবে। দুজনের মোনাজাত তো মিলবে না রে।”
“যদি আমার ইচ্ছে পূরণ না হওয়াতে তুমি বেশি খুশি হও তবে দোয়া রইল যেন তোমার ইচ্ছে পূরণ হয়। খোদা তোমার সেই ইচ্ছে পূরণ করুক। তবে তিনি তো সবার। তিনি নিশ্চয়ই আমারও একটা ইচ্ছা পূরণ করবেন।”
সমীরণ খুব কৌতুহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কি ইচ্ছে?”
“তোমার ভালোর জন্য, তোমার খুশির জন্য তোমাকে ছেড়ে দেবো। তবে তিনি যেন তুমি ব্যতীত আর কক্ষনো কাউকে আমার জীবনে না পাঠান। আর কোন পুরুষের দিকে যেন ভুলক্রমেও আমার চোখ না ওঠে। কখনো যেন তুমি ব্যতীত আর কোন পুরুষের প্রতি আমার হৃদয়কে নরম না করেন। একজনকে ভালোবেসেছি। সেই একজনকেই ভালোবেসে আমি আমার জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। সে আমার হোক কিংবা না হোক আমি তার হয়ে রয়ে যাব।”
সমীরণ এবারে বিরক্ত হল। এই মেয়ের মান সম্মান নেই নাকি? এত অপমান করে, ভালোবাসা নিয়ে এত মজা করে তারপরেও কি করে এত বড় বড় কথা বের হয়।
“হয়েছে হয়েছে। আর ডায়লগ ঝাড়তে হবে না। নিজের কাজে যা। কি সব যেন কুত্তার গু না বিলাইয়ের গু রেধেছিস সেসব খেয়ে দেয়ে বাড়ি যা।”
মৃত্তিকা গায়ে মাখল না এসব কথা। এখানে আসার যেটা আসল উদ্দেশ্য ছিল সেটা এখনও পূরণ হয়নি। সমীরণের জন্য একটা উপহার এনেছিল। সেটাই দিতে এসেছিল। ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে রঙিন কাগজে মোড়ানো উপহারের বাক্স এনে সমীরণের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“এটা তোমার জন্য।”
সমীরণ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“এটা আবার কি?”
“তোমার জন্মদিন তো, তাই উপহার দিচ্ছি।”
“লাগবে না। নিয়ে যা।”
“লাগবে না বললেই হলো নাকি? তোমার জন্য এনেছি যখন তোমাকে দেবোই। “
“বললাম তো আমি নেব না। তুই জানিস না আমি এসব উপহার নিতে পছন্দ করি না?”
মৃত্তিকা বিরক্তিতে চ বর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করে বলল,
“আচ্ছা জ্বালায় পড়লাম। কেন পছন্দ করো না?”
“এসব উপহার নেওয়া মানে ঋণী হয়ে যাওয়া কারো কাছে। তুই আমাকে আজ উপহার দিলি তার মানে আমাকেও তোকে কোনো না কোনোদিন উপহার দিতেই হবে। ধর সেই সুযোগ আমার হলো না। তাহলে যে তোর কাছে আমি ঋণী থেকে গেলাম। তোর ঋণ শোধ করার সুযোগ পেলাম না। আমি রিস্ক নিতে পারব না। আমি কারো কাছে ঋণী হয়ে থাকতে চাই না।”
মৃত্তিকা কটমটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শুধু শুনে গেল সমীরণের কথাগুলো। নিজেই কাগজ ছিঁড়ল। বাক্সের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একটা সিলভার ডায়ালের ঘড়ি। মৃত্তিকা খুব শখ করে নিজে পছন্দ করে কিনেছে। ঘড়িটা বের করার পর নিজেই সেটা সমীরণ কে পরিয়ে দিতে চাইল। সমীরণ এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঝাড়ি মেরে বলল,
“বললাম তো নেব না আমি।”
মৃত্তিকা পাত্তা দিল না। আবারো সমীরণের হাতটা ধরল। সমীরণ এবারে নিজের হাতটা ছাড়াতে পারল না। মৃত্তিকা জোর করে ধরে থাকল। কিংবা বলা যায় হয়ত সমীরণ ছাড়াতে চাইলোই না নয়ত সমীরণের শক্তির সাথে তো মৃত্তিকা পেরে উঠত না।
“এটার নাম ঋণ না। এটা আমার ভালোবাসা। ধরো যদি কখনো আমি না থাকি কিংবা আমাদের মাঝে অপ্রত্যাশিতভাবে কখনো দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল। হয়ত বছরেও একবার দুজন দুজনের মুখটা দেখতে পেলাম না। সেই সময়ের জন্য আমার একটা স্মৃতি রেখে দিলাম তোমার কাছে। তোমার দেওয়া অজস্র স্মৃতি রয়েছে আমার কাছে। এটা আমার স্মৃতি হয়ে তোমার কাছে থেকে গেল বুঝলে?”
কথাগুলো বলতে বলতে ঘড়ি পরানো শেষ। সমীরণ আড়চোখে একবার ঘড়িটার দিকে তাকাল। পছন্দ হলো। পছন্দ না হয়ে উপায় নেই। যেহেতু মৃত্তিক দিয়েছে পছন্দ তো হওয়ারই ছিল।
_________
রাতে যাওয়ার আগে সবাই মিলে খেতে বসল। সাদ্দাম হোসেন অনেকক্ষণ আগেই খাওয়া দাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়েছেন। তিনি এখন বেশি রাত জাগতে পারেন না। সকালে আবার স্কুলে যেতে হয়। ঘড়িতে সময় তখন রাত এগারোটা। এই সময়ে মৃত্তিকার মেসের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। আজ যে আর ফিরতে পারবে না সেটা ভালো করেই জানে। তাই ঠিক করেছে শশীর বাড়ি যাবে। সেই জন্য কোন তাড়াহুড়ো না করে এই সময় খেতে বসেছে।
মৃত্তিকা নিজে বিরিয়ানি রান্না করেছে। যে মেয়েটা জীবনে কখনো ডিম সেদ্ধ করেনি সে আজ সরাসরি হাত বাড়িয়েছে বিরিয়ানির দিকে। প্রত্যেকটা মানুষ খুবই চিন্তিত। তবে মৃত্তিকা চিন্তিত নয়। মৃত্তিকার নিজের উপরে বিশ্বাস ছিল। তবে মৃত্তিকার সেই বিশ্বাসটা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙ্গে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল যখন দেখল সমীরণ বাইরে থেকে খাবার আনিয়েছে। রাগে দুঃখে কান্না পেয়ে গেল মৃত্তিকার। অভিমানী গলায় বলল,
“তোমার আমার রান্নার প্রতি ভরসা নেই? আমি কখনো রান্না করিনি তো কি হয়েছে? আজ ভালো রান্না করেছি। একবার খেয়ে তো দেখো। তা না করে আগেই বাইরে থেকে খাবার এনে আমায় অপমান করলে কেন?”
সমীরণ তখন নিজেই সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। মৃত্তিকাকে আর কিছু করতে দেয়নি।
সমীরণ বাইরে থেকে কাচ্চি বিরিয়ানি আনিয়েছে। তারই একটা প্যাকেট খুলে সেটা মৃত্তিকার প্লেটে ঢেলে দিয়ে প্লেটটা মৃত্তিকার সামনে রেখে বলল,
“দুই লাইন বেশি বুঝিস কেন? আমার বাড়িতে এসে আমি তোদেরকে খাওয়াবো না এটা হতে পারে না। সেই জন্য এনেছি। আর বিরিয়ানি তো রান্না করেছিস আমার জন্য। তোদেরকে কেন খাওয়াবো?”
এতক্ষণে সন্তুষ্ট হলো মৃত্তিকা। সমীরণ তাহলে ওর রান্না করা খাবারই খাবে। সমীরণ বাইরে থেকে আনা খাবারটাই মৃদুল আর শশীর প্লেটে তুলে দিল। তবে ওরা দুজনে মৃত্তিকার রান্না করা খাবারটা একটু করে চেখে দেখতে চাইল। সমীরণ যদিও আপত্তি জানাল কিন্তু পরে ওদের জোরাজুরিতে রাজি হলো।
খাবারটা মুখে দিতেই শশী আর মৃদুলের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। না গিলতে পারছে না ফেলতে পারছে। দুজনে একযোগে সম্মুখ চেয়ারে বসা সমীরণের দিকে তাকাতেই দেখলে ছেলেটা গপগপ করে খেয়ে যাচ্ছে। মৃদুল অনেক কষ্টে পানি দিয়ে মুখের মাঝে থাকা খাবারটুকু গিলে মৃত্তিকা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মৃত্তিকা, বোন আমার সত্যি করে বলতো কয় কেজি মসলা মেরেছিস? মসলা ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না?”
“বেশি মসলা তো দেইনি। ভিডিওতে যতটুকু বলেছিল ততটুকুই দিয়েছি।”
মৃদুল আরেক গ্লাস পানি ঢক ঢক করে পান করে নিয়ে বলল,
“তাহলে এক লোকমা খেয়েই আমার অবস্থা এমন হয়ে গেল কেন বোন?”
এবারে মৃত্তিকা কিছু বলে ওঠার আগে সমীরণ গম্ভীর গলায় মৃদুল কে বলল,
“তোর না পোষালে খাবি না। অন্য খাবারের ব্যবস্থা আছে তো। কষ্ট করে রান্না করেছে অযথা দুর্নাম করছিস কেন? না খেলে না খাবি। আজেবাজে কথা বলে ওর মন ভাঙার কি আছে। আর রান্না তো যথেষ্ট ভালো হয়েছে।”
মৃদুল আর বলার মতন কিছু খুঁজেই পেল না। আর শশীর কোন কিছু বলার সাহসই হলো না। মৃত্তিকা শুধু দেখে গেল সমীরণ কে। মৃত্তিকা নিজেও এখন বুঝতে পারছে রান্না খুব একটা ভালো হয়নি। অতিরিক্ত তেল মশলা ব্যবহার করে ফেলেছে। অথচ সমীরণ কি সুন্দর তৃপ্তি সহকারে খেয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কতই না স্বাদ।
মানুষটা আবার মৃত্তিকার মন ভাঙা নিয়ে চিন্তিত। অথচ এই মানুষটা রোজ কতবার নিষ্ঠুর ভাবে মৃত্তিকার মন ভাঙে সে কি জানে! সমীরণ কি বোঝে সে যখন মৃত্তিকার মন ভাঙে তখন মৃত্তিকার ঠিক কতটা কষ্ট হয়!
চলমান।

