Home "ধারাবাহিক গল্প "যেখানে মন ভেজে চুপচাপ যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-০৮

যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-০৮

0
9

#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_৮
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার

বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কিছু ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে সমীরণ। ছেলেগুলো সবাই তার জুনিয়র। সিনিয়র কিংবা সমবয়সীদের সঙ্গে সচরাচর আড্ডা দিতে দেখা যায় না সমীরণ কে। আসলে জুনিয়রদের সাথে আড্ডা দেওয়ার মজাই আলাদা। মুখের উপরে কোন কথা বলে না, তর্ক করে না, বেয়াদবি করার সাহস পায় না। এদের সাথে আড্ডা দিতে গেলে চোখে মুখে অদ্ভুত সম্মান থাকে সিনিয়রের জন্য, ভয় থাকে। সমবয়সী কিংবা সিনিয়রদের সাথে আড্ডা দিতে গেলে তো এই সকল বিষয়গুলো সমীরণকে খেয়াল রাখতে হয়। যদিও খুব একটা বেশি পরোয়া করে না। তবে ঝামেলা হওয়ার জন্য এড়িয়ে যেতে হয় মাঝে মাঝে। সেজন্য জুনিয়রদের সাথে আড্ডা দিতেই বেশি পছন্দ করে।

এমন সময় সেখানে মৃত্তিকা এলো। মেয়েটার পরনে একটা শর্ট কুর্তি আর জিন্স। গলার দুপাশে ঝুলছে একটা স্কার্ফ। চুলগুলো পনিটেল করা। আর কাঁধে ঝুলছে একটা টোট ব্যাগ। বেশ মিষ্টি লাগছে মেয়েটাকে দেখতে। তবে সমীরণের খুব করে ইচ্ছে করল চুলগুলো খুলে দিতে। কেননা সমীরণের মতে খোলা চুলে মৃত্তিকা কে বেশি ভালো লাগে দেখতে। তবে সেসব আপাতত আর করল না। এক নজর মৃত্তিকাকে দেখে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে?”

সমীরণের প্রশ্নের মৃত্তিকা যে জবাবটা দিল সেই জবাবটা ওর প্রশ্নের সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। অন্তত এই কথাটা বলার আগে মৃত্তিকার একটু ভয় পাওয়া উচিত ছিল। কিংবা আশেপাশে যে আরো ছেলেপেলে আছে সেটা মাথায় রেখে হলেও এখন এই কথাটা বলা উচিত ছিল না। কিন্তু ঠিক বেঠিক বুঝল না। সাবলীল গলায় বলল,

“ভালোবাসি তোমায়, সমীরণ।”

বাক্যটা কানে যেতেই সমীরণ বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকাল মৃত্তিকার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে আবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে তাকাল নিজের জুনিয়রদের দিকে। সমীরণের থেকেও বেশি অবাক হয়েছে কয়েকজন। কয়েকজন আবার অনেক কষ্টে নিজের হাসি চেপে রেখেছে। আর যারা কোন মতেই নিজের হাসি চেপে রাখতে পারেনি তারা ঠোঁট টিপে হাসছে। সমীরণ আগে মৃত্তিকাকে ধমক দেবে নাকি এগুলোকে বিদায় করবে এখন সেটাই ভাবছে। ভাবতে ভাবতে ঠিক করল আগে এগুলোকে বিদায় করা দরকার। এদের সামনে ধমকা ধমকি করবে না।

গম্ভীর গলায় সবাইকে চলে যেতে বলল। যাওয়ার আগে অনেক সাহস করে একটা ছেলে আবারো ফিরে এসে ঠোঁট টিপে হেসে বলল,

“ভাই, ভাবি কিন্তু মাশাআল্লাহ। আপনার মতন মানুষকে সবার সামনে এসে প্রপোজ করতেছে। মেলা সাহস কিন্তু ভাবির।”

সমীরণ একটা ধমক দিতেই ছেলেটা ছুটে পালাল সেখান থেকে। মৃত্তিকা অসহায় মুখ করে সমীরণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এভাবে ধমক দিলে কেন? আমি একটা ধন্যবাদ জানাতাম। আমার এত প্রশংসা এর আগে কেউ করেনি। তুমি কেমন যেন হয়ে গেছো সমীরণ। কিচ্ছু বোঝো না।”

“একটা চ ড় মে রে তোর বত্রিশটা দাঁত ফেলে দেবো আমি বে য়া দ ব মেয়ে। আর একবার সমীরণ বলে ডাকলে এমন অবস্থা করব যে জীবনে আর কোন কিছু বলে ডাকতেই পারবি না। ফোকলা বানিয়ে দেব।”

আজ সমীরণ শুধু চ ড় মা রা র জন্য হাত তুলল। তবে
চ ড় মা র ল না। এর আগে এমনটা কখনো হয়েছে বলে মৃত্তিকার আপাতত মনে পড়ছে না যে সমীরণ মা রা র জন্য উদ্যত হয়েছে অথচ মা রে নি। তার মানে নিশ্চয়ই মা র বে ও না। মৃত্তিকা আরেকটু সাহস পেয়ে গেল। একটু এগিয়ে গিয়ে সমীরণের পাশাপাশি বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

“সমীরণ কে সমীরণ বলে ডাকব না তো কি বলে ডাকব, সমীরণ? অবশ্য তুমি চাইলে ওগো, কিগো, শুনছো এসব বলেও ডাকতে পারি।”

“বাড়াবাড়ি করছিস কিন্তু, মৃত্তিকা। আমি নিজের রাগের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি এর আগে চলে যা এখান থেকে।”

মৃত্তিকা মাথাটা একটু কাত করে হাসি হাসি মুখে সমীরণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তাহলে একবার বলো আমায় ভালোবাসো। এটা বললেই চলে যাব। সমীরণ, বলো না একবার ভালোবাসো তুমি আমায়। শুধু একবার বলো তাহলেই আমি চলে যাব কথা দিচ্ছি।”

সমীরণ হাঁসফাস করছে। খেয়াল করল ওর হৃদযন্ত্রটা দাপাদাপি করছে। বুকে হাত রেখে সেটাকে শান্ত হতে বলল। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। তবে কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছে না

এই মেয়ে যে আজ এমন করছে কেন বুঝতে পারছে না। হঠাৎ করে ভয় ডর উবে গেল কেন? সমীরণ বোধহয় অধিক মাত্রায় প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছে। সমীরণের এসব ভাবনার মাঝেই খেয়াল করল কেউ যেন ওর বাহু জড়িয়ে ধরেছে। তাকাতেই আরেক দফা চমকাল। মৃত্তিকা ওর বাহু জড়িয়ে ধরেছে। বিস্ময়ে সমীরণের মুখ হা হয়ে গেল। কথা স্পষ্ট হলো না। হালকা তুতলে বলল,

“এই এই ততুই আমাকে এভাবে ধরেছিস কেন? ছাড়। আমার গায়ের কাছে একদম ঘেষবি না। আমার ভালো লাগে না কিন্তু।”

মৃত্তিকার সাহস আজ সত্যি বেড়েছে। সাবধান করল তবুও সে ছাড়ল না। বরং নিজের মাথাটা আলতো করে সমীরণের বাহুতে এলিয়ে দিয়ে বলল,

“নিজেকে আমি সময় দিয়েছি কিছুদিন। আমি আমার ভালোবাসাকে সময় দিয়েছি কিছুদিন। যদি এই কয়েক দিনের মাঝে তোমার মন গলাতে না পারি তবে বুঝব আমার ভালোবাসা মিথ্যে ছিল। আর যদি এমনটা হয় চিরতরে তোমার থেকে দূরে চলে যাব কথা দিলাম। আর কখনো তোমাকে বিরক্ত করব না। আর যদি এমনটা না হয়…….।”

মৃত্তিকাকে নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে সমীরণ তুমুল আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

“আর কিছু ভাবার প্রয়োজন নেই। এমনটাই যে হবে সেটাই স্বাভাবিক। তার কারণ কোন ভালোবাসাই নেই এখানে। আমি তো তোকে ভালো বাসিই না। তুই আমাকে ভালোবাসিস এই বিষয়েও সন্দেহ আছে। ছোট মানুষ মাথা কাজ করে না। অ্যাট্রাকশন কে ভালোবাসে ভেবে নিয়েছিস।”

মৃত্তিকা ছেড়ে দিল সমীরণের বাহু। এতক্ষণে সমীরণ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। এই মেয়েটার এত কাছাকাছি থাকতে সমীরণের বেশ কষ্ট হয়। তবে খুব বেশিক্ষণ এই শান্তি অনুভব করতে পারল না। মৃত্তিকা দুই হাতে সমীরণের কলার চেপে ধরে ওকে টেনে নিজের দিকের ঘোরালো। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সমীরণ। আশেপাশে একবার তাকিয়ে তাড়াহুড়ো গলায় বলল,

“আরে কি করছিস? ছাড়। দেখছে তো মানুষজন।”

মৃত্তিকা দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,

“দেখুক। সবাই জানুক যে তুমি আমার। কেউ যেন চোখ তুলে তাকানোর সাহস না পায় তোমার দিকে, বুঝতে পেরেছো? আর আমার ভালোবাসা, ভালোবাসা। কোনো অ্যাট্রাকশন না। ভালোবাসা শব্দের মানে যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছি তারও বহু আগে থেকে তোমায় ভালোবেসেছি। তুমি ব্যতীত কখনো কোন পুরুষের দিকে চোখ তুলেও তাকাইনি। তোমার সাথে প্রেম করার স্বপ্ন দেখি না আমি। আমি সংসারের স্বপ্ন দেখি, বুঝেছো? খবরদার আমার ভালোবাসাকে ছোট করার চেষ্টাও করবে না, সমীরণ। মে রে ফেলব কিন্তু।”

“বেঁচে আছি নাকি আমি! বাঁচিয়ে রেখেছিস তুই? নতুন করে আর কি মা র বি?”

“সে যখন মা র ব তখনই দেখাব। বললাম তো এই কয়েকদিনে যদি তোমার মন গলাতে না পারি তবে চলে যাব তোমার জীবন থেকে। আর যদি মন গলাতে পারি তাহলে সোজা বিয়ে করব। তোমার আর একটা কথাও চলবে না এখানে। কথাটা মাথায় রেখো।”

____________

অন্যান্য দিনের তুলনায় ছেলে আজ বেশ চুপচাপ। এই ব্যাপারটা একদম শুরু থেকেই লক্ষ্য করছেন সাদ্দাম হোসেন। কিন্তু ছেলের নিশ্চুপতার মানে ঠিক বুঝতে পারছেন না। দেখে মনে হচ্ছে কোন দুশ্চিন্তার মাঝে ডুবে আছে। অথচ খেতে বসলে তাদের দুই বাপ ছেলের কথা ফুরোয় না। এদিক ওদিকের গল্প করতে করতে কখন যে খাওয়া শেষ হয়ে যায় টেরই পায় না। আর সেই ছেলের এমন নীরবতা ঠিক ভালো লাগছে না সাদ্দাম হোসেনের। তার গল্প করার তো এই একটাই মানুষ।

“সমীরণ!”

সাদ্দাম হোসেনের ডাকে ধ্যান ভাঙল সমীরণের। চটজলদি নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,

“হ্যাঁ আব্বু বল।”

“কি হয়েছে? দেখে মনে হচ্ছে কোন দুশ্চিন্তায় আছিস। কোন সমস্যা হয়েছে কি?”

আব্বুর থেকে সচরাচর সমীরণ কোন কথা লুকোয় না। বলা যায় লুকোতে পারে না। নিজের জীবনের যেকোনো কথা নির্দ্বিধায়, নিঃসংকোচে বলে দিতে পারে। মাঝে মাঝে দুই একটা কথা ইচ্ছাকৃতভাবে খুব কষ্টে লুকিয়ে রাখে। নয়ত উনি আবার চিন্তা করবেন। চিন্তা করতে করতে প্রেশার বেড়ে যাবে। এই যেমন যদি কোথাও কখনো কারো সাথে ঝামেলা হয়, দু একটা কথা কাটাকাটি হয় সেই কথাগুলো সাদ্দাম হোসেনকে জানানো হয় না। তবে এখন যে বিষয়টা নিয়ে সমীরণ চিন্তায় আছে সেই বিষয়টি নিয়ে সাদ্দাম হোসেনের সাথে আলোচনা করতেই হবে।

বেশ অনেকটা সময় ভাবনা চিন্তার পর সমীরণ সামনে থেকে খাবার থালাটা ঠেলে সরিয়ে রেখে গুরুতর ভঙ্গিতে বলল,

“একটা মেয়ে আমায় ভীষণ বিরক্ত করছে আব্বু।”

কথাটা যেন ঠিক হজম হলো না সাদ্দাম হোসেনের। মেয়েরা আবার কবে থেকে ছেলেদের বিরক্ত করতে লাগল? যুগ কি তবে বদলে গেল! তাও আবার তার ছেলের মতন ছেলেকে বিরক্ত করা তো যে সে মেয়ের ব্যাপার না। যে সে মেয়ের সাধ্য হবে না সমীরণকে বিরক্ত করার। সেই অসম্ভব সাহসী মেয়েটা কে তার পরিচয় জানতে ইচ্ছে করল সাদ্দাম হোসেনের।

“একটা মেয়ে তোকে বিরক্ত করছে? কে সে?”

“মৃত্তিকা।”

এবার ব্যাপারটা আরো হজম হলো না সাদ্দাম হোসেনের। যে মেয়েটা সমীরণকে দেখে ভয়ে থর থরিয়ে কাঁপে সে কিনা সমীরণকে বিরক্ত করবে! না নির্ঘাত তার ছেলের শরীর খারাপ করেছে। ভুলভাল বকছে।

“কি যা তা বলছিস। মৃত্তিকা তোকে বিরক্ত করে? মেয়েটা তোর সামনে অসহায়। তুই তো বরং ওকে বিরক্ত করিস।”

“না আব্বু। বলছি তো ও আমাকে বিরক্ত করছে।”

“আচ্ছা কিভাবে বিরক্ত করছে শুনি?”

সমীরণ কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বলল,

“ও বিয়ে করতে চায় আমাকে। পছন্দ করে আমায়। যার তার সামনে ভালোবাসে বলে ফেলে। পিছু ছাড়ছে না। আমি এত করে ওকে বোঝাচ্ছি যে আমি সংসার করার মতন ছেলে না, আমি ওর যোগ্য না। কিন্তু ওর মাথার তার কেটে গেছে বোধহয়। কথা শুনছেই না। আসলে আমার চ ড়ে র জোর কমে গেছে বুঝেছো আব্বু। কয়েকদিন জিমে গিয়ে শরীরে শক্তি বাড়াতে হবে। তারপর ঠাটিয়ে একটা চ ড় লাগালেই মাথা থেকে এসব আজেবাজে ভূত নেমে যাবে ওর।”

হাতে তোলা লোকমাটা সাদ্দাম হোসেন আর মুখে পুড়তে পারলেন না। আটকে গেলেন তিনি। খাবারগুলো থালায় রেখে এবার তিনিও সামনে থালাটা ঠেলে সরিয়ে রাখলেন। একটু ভাবনা-চিন্তা করে জিজ্ঞেস করলেন তিনি,

“তোর আপত্তির কারণ কি? পছন্দ নয় মৃত্তিকাকে? পছন্দ না হলে কি পছন্দ না ওর বিষয়ে?”

“ওর অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া আমার পছন্দ না। ওর অতিরিক্ত ভালোবাসা আমার পছন্দ না। আমার জন্য করা ওর অতিরিক্ত পাগলামি আমার পছন্দ না। তবে ওকে পছন্দ।”

“আর কেন এসব পছন্দ না?”

সমীরণ নীরবে কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে সবগুলো প্রশ্নের উত্তর খুঁজল। আগে নিজের মস্তিষ্কে সবগুলো প্রশ্নের উত্তর সাজালো। অতপর সাদ্দাম হোসেনকে বলল,

“এত যত্নে আমি অভ্যস্ত নই আব্বু সেটা তুমিও জানো। এত যত্ন আমার সহ্য হয় না। হঠাৎ করে সেই মানুষটা না থাকলে তখন কি হবে? আমি অযত্ন আর অবহেলা কে ভয় পাই। এর থেকে ভালো শুরু থেকেই কেউ আমাকে অবহেলা করুক। তাই ঠিক আছে। ভালোবাসায় বিশ্বাস নেই আমার। সেখানে ওর অতিরিক্ত ভালোবাসা প্রতি মুহূর্তে আমার মনে প্রশ্ন জাগায়। আমার সন্দেহ তৈরি হয়। ওর পাগলামি গুলো দেখলে সেই সন্দেহ আরো বেড়ে যায়। এভাবে ভালোবাসা যায় নাকি! এত ভালো কে বাসে? হয়ত ওর পাগলামি গুলো কয়েক দিন, কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছরের জন্য। কিন্তু আমি যদি একবার ওকে ভালোবাসি আমি তো সারা জীবনের জন্য বাসবো। আমি তো ওকে ছাড়বো না কখনো। কিন্তু পরে গিয়ে যদি আমার পাগলামো গুলো ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে ওর পাগলামো কমে যায় তখন কি করবো বলো?”

“সবাই তোর মায়ের মতন হয় না।”

সমীরণ তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই আমার মায়ের মতনই হয়। মৃত্তিকার পরিবার সম্বন্ধে তুমি জানো না? ওরা অনেক বড়লোক আব্বু। আমাদের দুজনের সংসারে তোমার উপার্জন দিয়ে আমাদের স্বচ্ছল ভাবে চলে যায়। কিন্তু আমরা ওদের মতন না। ওই বাড়িতে মৃত্তিকার আদরের কোন অভাব হয় না। রানীর মতন থাকে। সব সময় ওর সুবিধা অসুবিধা দেখার জন্য একজন লোক ওর পিছনে লেগেই রয়েছে। ওখানে সবকিছু যতটা স্বাচ্ছন্দ্যে পায় আমাদের এখানে এসে ততটা স্বাচ্ছন্দে সবকিছু পাবে না। তখন যদি ওর মনে স্বচ্ছলতার লোভ জাগে? লোভ জাগা আমি অন্যায় বলব না। ও যে পরিবেশের মাঝে বড় হয়েছে তাতে সারা জীবন হয়ত স্বচ্ছলতাই ও আশা করবে। কিন্তু আমি হয়ত দিতে পারলাম না। তখন যদি দারিদ্রতার অজুহাত দেখিয়ে চলে যায়! যেমনটা তোমার সাবেক স্ত্রী করেছিল।”

সাদ্দাম হোসেন একটা লম্বা শ্বাস টেনে সমীরণ কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন,

“সবাই এমন হয় না, বাবা। আমার সাবেক স্ত্রী কিংবা তোর মা বড্ড চালাক ছিলেন। বলতে পারিস খানিকটা স্বার্থপর।”

“খানিকটা না, উনি মানুষটা পুরোটাই স্বার্থপর ছিলেন।”

সাদ্দাম হোসেন ছেলের কথা মেনে নিয়ে বললেন,

“হ্যাঁ ঠিক। উনি স্বার্থপর ছিলেন। জীবনে সাফল্য অর্জনের জন্য যে কোন পন্থা বেছে নিতে পারত ও সেসব আমি জানতাম। কিন্তু মৃত্তিকা মেয়েটা বড্ড বোকা, বাবা। স্বার্থপর তো মোটেই নয়। ও জীবনে এগিয়ে যেতে চায় তোকে নিয়ে। এই বোকা মেয়ে গুলো নিজেকে নিয়ে শুধু একবারই ভাবে। কখন জানিস?”

“কখন?”

“যখন সে কাউকে ভালোবাসে তখন শুধুমাত্র সেই মানুষটার সাথেই জীবনটা কাটাতে চায়। এই একটা সময় তারা নিজেদের কথা ভাবে। তাদের বোকামি, পাগলামি গুলোকে সবসময় সন্দেহের চোখে দেখিস না। যে যত্ন নিতে জানে সে খুব সুন্দর ভাবে আগলেও রাখতে জানে। তেমনি ভাবে সে ভালোবাসতেও জানে। কোন একজন মানুষের দ্বারা সবাইকে বিচার করতে নেই। যে সিদ্ধান্ত নিবি ভেবে চিন্তে নিবি। এখন তোর অতিরিক্ত যত্ন, ভালোবাসা এসব সহ্য হচ্ছে না। দেখিস জীবনে যেন এমন কোন দিন না আসে যখন এক চিমটি ভালোবাসা কিংবা যত্ন পাওয়ার জন্য তুই ছটফট করিস। কিন্তু সেটুকুও দেওয়ার মতন কেউ না থাকে তোর জীবনে।”

___________

সমীরণের একটা বদ অভ্যাস আছে রাতে জেগে পড়ার। আবার রাত জেগে পড়লে যে সারাদিন ঘুমোয় তেমনটাও না। আসলে ছেলেটার চোখে ঘুমই কম। রাত দুটো তিনটে পর্যন্ত অনায়াসে পড়ে ঘুমিয়ে আবার ভোর পাঁচটা ছয়টার দিকে খুব সহজে উঠে যেতে পারে। মাসখানেক পর পরীক্ষা। তাই আজ বই নিয়ে বসেছে।

সমীরণের ইচ্ছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পড়াশোনাটা শেষ করে একটা চাকরি করবে। তারপরে আব্বুকে বলবে অবসর নিতে। মানুষটা সারা জীবন প্রচন্ড ছোটাছুটি করে গেছে। অনেক খাটাখাটনি করেছেন। সমীরণ এবার একটু ওনাকে বিশ্রাম দিতে চায়। আব্বুর হাতে অনেকগুলো টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলতে চায়,

তুমি অনেক কষ্ট করেছো এতকাল। এবার আমি কষ্ট করব। তোমার টাকায় এতবছর আমি ঘুরেছি। এবারে আমার টাকায় তোমার যেখানে যেতে ইচ্ছে করে যাও, যা করতে ইচ্ছে করে করো, যা খেতে ইচ্ছে করে খাও। তোমার ছেলে বড় হয়েছে। এবার সে তোমার দায়িত্ব নেবে। ঠিক যেভাবে তুমি একা হাতে একটা শিশুকে এত বড় করে তুলেছো। সেই ছেলে এখন থেকে একটা ছোট্ট শিশুর মতন তোমার যত্ন নেবে।

খুব মনোযোগ দিয়েই পড়ছিল সমীরণ। এর মাঝে হঠাৎ করে ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকাতেই দেখল মৃত্তিকা কল করেছে। ফোনটা উল্টিয়ে রাখল সমীরণ। কথা বলবে না।

রিং হতে হতে কলটা কেটে গেল। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে মেসেজের একটা টুং শব্দ হলো। সমীরণ মেসেজটা দেখবে না দেখবে না করেও দেখল। এবং দেখার সাথে সাথে আঁৎকে উঠল। মৃত্তিকাই মেসেজ দিয়েছে। লিখেছে,

“প্লিজ কলটা রিসিভ করো। সমস্যায় পড়েছি।”

আগে পিছে আর কোন কিছু না ভেবে সমীরণ তড়িঘড়ি করে মৃত্তিকার নাম্বারে কল করল। একবার রিং হতে না হতেই মৃত্তিকা ফোনটা রিসিভ করল। ফোনটা রিসিভ হওয়া মাত্রই উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল সমীরণ,

“কি হয়েছে? কি সমস্যা? কোথায় আছিস তুই?”

“আরে কিছু হয়নি। ঠিক আছি আমি। তুমি ফোন রিসিভ করছিলে না বলে মেসেজটা দিতে হলো। আমি তো জানতাম তুমি ইচ্ছে করেই ফোনটা রিসিভ করছো না।”

মুহূর্তের মাঝে চোয়াল শক্ত হয়ে এল সমীরণের। ভয়ে এখনো হাত কাঁপছে। আর এই মেয়ে মশকরা করছে ওর সাথে। দাঁত পিষে বলল,

“এখন যদি তুই সামনে থাকতি আজ আমি নিশ্চিত একটা চ ড় মে রে তোর মুখের আকৃতি বদলে দিতাম বেয়াদবির জন্য। মজা করার জায়গা পাস না? এটা কোন মজা করার সময়? তোর সাথে আমার মজা করার সম্পর্ক?”

“তো কেমন সম্পর্ক আমাদের? তুমি বলো আমাদের সম্পর্কের নাম কি? আচ্ছা চলো আজ আমাদের সম্পর্কের একটা নাম দেই।”

“কোন প্রয়োজন নেই। সব সম্পর্কের নাম থাকা জরুরী নয়।”

“তবে আমাদের সম্পর্কের নাম থাকাটা জরুরী। আমি নাম দেবো এই সম্পর্কের। হয় এই সম্পর্কটা দুই তরফা ভালোবাসার গল্প হবে, নয়ত এক তরফা।”

সমীরণ বিরক্তিকর গলায় বলল,

“রাত বিরেতে মাথা খেতে ফোন করেছিস? ফোন রাখ তো।”

কথাটা বলে সমীরণ ফোনটা রাখতে ধরলে অপর পাশ থেকে মৃত্তিকা অনুরোধের স্বরে বলল,

“এই প্লিজ প্লিজ ফোনটা কেটে দিও না। একটা জরুরী কথা বলতে কল করেছিলাম। আর মজা করব না। সরি। প্লিজ কথাটা শোনো।”

হাজার চেষ্টা করেও সমীরণ কলটা কাটতে পারল না। এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সজোরে টেবিলের উপরে আঘাত করল। ব্যথা পেল সমীরণ। তবে গায়ে মাখল না। ফোনটা কানে ধরে গম্ভীর গলায় বলল,

“কি?”

“শোনো না, একটু আগে আমার রুমমেট মেয়েটা আইসক্রিম খেল। একা একাই খেল। আমাকে একবার একটু খেতেও বলল না। আমার তখন থেকেই খুব আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে। একটু আইসক্রিম কিনে দিয়ে যাও তো আমায়।”

সমীরণ তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“তোর সত্যি মনে হয় আমি এত রাতে তোকে আইসক্রিম কিনে দেওয়ার জন্য এতদূর ছুটে যাব?”

“না মনে হওয়ার কি আছে? এমনটা কি আগে কখনো হয়নি? আমার প্রয়োজন কিংবা আমি কোন কিছু আবদার করলে কি মাঝ রাতে তুমি আমার সেই আবদার পূরণ করার জন্য ছুটে আসোনি কখনো?”

থতমত খেল সমীরণ। বুঝল এই নিয়ে এখন কথা তুললে ওরই বিপদ। মেয়েটা আজকাল চালাক হয়ে গেছে। আর ওর আব্বু কিনা বলে এই মেয়ে বোকা!

কন্ঠ পূর্বের মতন গম্ভীর করে ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল,

“পারবো না আমি। তোর এসব ন্যাকামি মার্কা ইচ্ছে পূরণ করার ঠ্যাকা নিয়ে বসে নেই সমীরণ। তোর ভাই তো এখনো ম রে নি। ওকে কল করতে পারিস না?”

“তাহলে আসবে না তুমি?”

সমীরণ অনেক কষ্টে নিজেকে কঠোর রেখে বলল,

“না। পড়ছি আমি। বিরক্ত করিস না। রাখছি।”

সমীরণ কলটা কেটে দিতে ধরলে মৃত্তিকা একবার ডেকে উঠল ওর নাম ধরে।

“সমীরণ!”

এবারে সমীরণ অসহায় গলায় বলল,

“কি সমস্যা তোর? বারবার এভাবে ডাকিস কেন আমায়?”

“ভালোবাসি তোমায়। তুমি আমার সাথে যতই কঠোরতা দেখানোর নাটক করো না কেন আমি জানি আমার জন্য তোমার হৃদয়টা বড্ড কোমল। যার ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য নেই তোমার তার ভালোবাসা উপেক্ষা করে কতদিনই বা চলবে! ধরা তোমায় দিতেই হবে, সমীরণ। আমি হারিয়ে যাওয়ার আগেই ধরা দিও। নয়ত পড়ে কিন্তু আফসোস করবে।”

চলমান।