#তু্ই_আমার
#Samia_Jarin
পর্ব _৬
[কপি করা নিষিদ্ধ ]
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মির্জা ভিলার পরিবেশটা অন্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি ভারী হয়ে উঠেছিল। নুহা বাড়িতে ফিরে আসার পর থেকেই পরিবারের সবাই ওকে ঘিরে রেখেছে। মনা মির্জা বারবার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, যেন এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে চান না। ড্রয়িংরুমে বসে আছেন আরমান মির্জা, তাঁর ছোট ভাই আরিফ মির্জা, একমাত্র বোন মেহজাবিন, বড় দুই ছেলে আয়াস ও ইয়াস, তাঁদের স্ত্রী, নূর এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা। সবাই নুহার কাছ থেকে গত এক সপ্তাহে কী ঘটেছে, সেটাই জানার চেষ্টা করছিল।
ঠিক তখনই কলিংবেলের শব্দে সবার কথোপকথন থেমে গেল। গৃহকর্মী গিয়ে দরজা খুলতেই অবাক হয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে এল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঊষান, মুখে অদ্ভুত স্থিরতা, আর চোখে এমন এক শীতল দৃষ্টি যেটা দেখলে যে কারও বুক কেঁপে উঠবে। কোনো অনুমতির অপেক্ষা না করেই সে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল, যেন এই বাড়ির প্রতিটি ইট-পাথরের সঙ্গে তার বহুদিনের পরিচয়।
ঊষানকে দেখেই নুহার মুখ থেকে রক্ত সরে গেল। সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল,,,,,,,
“আপনি! আপনি এখানে কেন এসেছেন? আমার জীবনটাকে কি এখনও শেষ করা বাকি আছে? আমাকে তো আমার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাহলে আবার কেন এসেছেন? আপনার কি এখনও আমাকে নিয়ে কোনো খেলা বাকি আছে? দয়া করে আর আমার পরিবারকে কোনো কষ্ট দেবেন না। আমি যত কষ্ট পেয়েছি, সেটা শুধু আমার মাঝেই থাকুক।”
নুহার কথা শেষ হওয়ার আগেই নূর বোনের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট রাগ,,,,,,
“আমি জানি না তুমি কে, কোথা থেকে এসেছ বা কতটা ক্ষমতাবান। কিন্তু একটা কথা খুব ভালো করে শুনে রাখো। আমার বোনের জীবনে তুমি যা করার করেছ। এখন যদি আবার ওর দিকে এক পা বাড়াও, তাহলে তোমাকে আইনের হাতেই তুলে দেব। এই বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমার পরিবারের কাউকে ভয় দেখানোর সাহস আর কখনো করবে না।”
নূরের কথা শেষ হতেই ঊষান ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে ধীরে ধীরে হাততালি দিল। তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল,,,,,,
“বাহ সত্যিই প্রশংসা করতে হয়। নিজের বোনকে রক্ষা করার জন্য তোমার সাহসটা আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু একটা বিষয় তুমি এখনও জানো না। আমি আজ এখানে নুহার জন্য আসিনি। আমি এসেছি এমন একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করতে, যার সঙ্গে আমার বহু বছরের একটা অসমাপ্ত হিসাব বাকি আছে।”
ঘরে উপস্থিত সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। কারও কিছুই বুঝতে বাকি নেই যে এই ঊষান শুধু কথা বলতে আসেনি।
আরমান মির্জা এতক্ষণ চুপচাপ বসে সব দেখছিলেন। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,,,,,,
“তুমি যেই হও না কেন, আমার বাড়িতে ঢুকে এভাবে কথা বলার কোনো অধিকার তোমার নেই। যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে স্পষ্ট করে বলো। আর যদি উদ্দেশ্য আমাদের পরিবারকে ভয় দেখানো হয়, তাহলে ভুল জায়গায় এসেছ। কারণ মির্জা পরিবার কাউকে ভয় পেতে শেখেনি।”
ঊষান এবার সরাসরি আরমান মির্জার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দুজনের মাঝখানে মাত্র কয়েক হাত দূরত্ব। কয়েক সেকেন্ড শুধু একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কোটের ভেতর থেকে খুব যত্ন করে একটি পুরোনো খাম বের করল। খাম থেকে একটি বিবর্ণ ছবি বের করে টেবিলের ওপর রেখে বলল,,,,
“এই ছবিটার দিকে ভালো করে তাকান, মিস্টার আরমান মির্জা। আমি জানি আপনার বয়স হয়েছে, স্মৃতিশক্তিও আগের মতো নেই। তাই হয়তো মানুষকেও ভুলে গেছেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, জীবনের কিছু মুখ কখনো পুরোপুরি ভুলে যাওয়া যায় না। বিশেষ করে সেই মুখ, যার জীবনটা আপনি নিজের হাতে ভেঙে দিয়েছিলেন।”
ছবিটা হাতে নিয়েই আরমান মির্জার চোখ বড় হয়ে গেল। তাঁর মুখের রঙ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। ঠোঁট কাঁপছে, হাত কাঁপছে, কিন্তু কোনো কথা বের হচ্ছে না।
ঊষান ঠান্ডা গলায় আবার বলল,,,,,,,
“চিনতে পেরেছেন? নাকি এখনও মনে করতে পারছেন না? তাহলে আমি মনে করিয়ে দিই। এই ছবিতে যে মেয়েটা আপনার পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে, সে কোনো অপরিচিত মানুষ নয়। সে এমন একজন নারী, যাকে আপনি সারাজীবন ভালোবাসার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তারপর সমাজ, সম্মান আর নিজের স্বার্থের কাছে তাকে একা ফেলে চলে গিয়েছিলেন। আপনি নতুন জীবন শুরু করেছিলেন, আর তার জীবনে শুরু হয়েছিল এক অন্তহীন অন্ধকার।”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কেউ নড়ছে না, কেউ কথা বলছে না।
ঊষান গভীর শ্বাস নিয়ে একেকটা শব্দ স্পষ্ট করে উচ্চারণ করল,,,,,,,,
“আজ এত বছর পর আমি নিজের পরিচয় দিতে এসেছি। আমার নাম ঊষান। আর আমি শুধু ঊষান নই… আমি ঊষান আবিদ মির্জা এটা আমার পরিচয় হওয়ার কথা থাকলেও শুধু মাত্র ওনার জন্য সম্ভব হয় নি । হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন আমি সেই সন্তানের পরিচয় নিয়ে আজ আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যাকে পৃথিবীতে আনার পর আপনি কোনোদিন নিজের সন্তান বলে স্বীকার করেননি। আমি সেই অতীত, যাকে আপনি টাকা, ক্ষমতা আর সম্মানের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।”
কথাটা শেষ হতেই পুরো ড্রয়িংরুমে যেন বজ্রপাত হলো। নুহা হতবাক হয়ে ঊষানের দিকে তাকিয়ে রইল। নূরের মুখে অবিশ্বাস। আয়াস ও ইয়াস একসঙ্গে বাবার দিকে তাকাল। মনা মির্জা বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেলেন।
আরমান মির্জা কাঁপা গলায় শুধু একটি কথাই বলতে পারলেন,,,,,,,,
“না এটা এটা হতে পারে না”
আরমান মির্জার স্ত্রী সাবিহা মির্জা স্বামীর সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওনাকে দেখেই মনে হচ্ছে উনি খুব ভেঙে পড়েছেন।
“ওই ছেলেটা যা বলছে তা কি সত্যি??”
আরমান মির্জা কে চুপ থাকতে দেখে উনি আবার প্রশ্ন করলেন,,,,,, এটা কি সত্যি?দেখুন চুপ করে থাকবেন না।
এদিকে ঊষান চুপ করে দাঁড়িয়ে সবার অবস্থা দেখতে ব্যাস্ত, মুখ জুড়ে আছে একটা শয়তানি হাসি। ওকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুব আরাম করে বসে কোনো বিনোদন দেখছে।
আরমান মির্জা কোনো রকম উত্তর করলো,,,, হ্যা সত্যি ঊষান আমার সন্তান।
ওনার মুখ থেকে কথাটা বের হতেই যেন পুরো ড্রয়ইং রুম জুড়ে বিস্ফোরণ ঘটলো। সাবিহা মির্জা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
ঊষান সামনে এগিয়ে এসে নুহার পাশে দাড়িয়ে বললো,,,,, আপনারা আপনাদের নাটক চালিয়ে যান আমি আমার বউ নিয়ে বাসর করতে যাচ্ছি আর হ্যা তাড়াতাড়ি আমার রুমের ব্যবস্থা করেন সবাই।
ঊষান আর দেড়ি না করে নুহা কে কোলে তুলে নিয়ে উপরের দিকে হাটা শুরু করলো।নুহা জানে ঊষান ওকে এখন আস্ত রাখবে না আর, ঊষান কে দেখেই বোজা যাচ্ছে ও খুব রেগে আছে।
ঊষান আর কারো সাথে কোনো কথা না বলে নুহাকে নিয়ে সোজা ওর রুমে চলে গেলো। ওখানে নিয়ে গিয়ে সোজা দরজা বন্ধ করে সোজা নুহার ঠোঁটে হামলা শুরু করলো মনে হয় যেন ঊষান তার সব রাগ ওর ঠোঁটে কিসের মাধ্যমে উগড়ে দিচ্ছে।
♡ ♡ ♡ ♡ ♡
**মির্জা পরিবার** শহরের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত ব্যবসায়ী পরিবার। বহু বছর ধরে পারিবারিক ব্যবসা, সামাজিক মর্যাদা এবং পারস্পরিক বন্ধনের জন্য এই পরিবার পরিচিত। পরিবারের কর্তা দুই ভাই, যাঁরা একসঙ্গে ব্যবসা সামলান। তাঁদের একমাত্র বোনও ভাইদের কাছে অত্যন্ত আদরের। পরিবারের প্রতিটি সদস্য একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীল, আর নুহা এই পরিবারের সবচেয়ে আদরের মেয়ে।
পরিবারের বড় কর্তা **আরমান মির্জা**। তিনি শান্ত, বিচক্ষণ এবং পরিবারের অভিভাবকসুলভ মানুষ। তাঁর স্ত্রী **সাবিহা মির্জা** একজন স্নেহশীলা ও গৃহপরিচালনায় দক্ষ নারী। তাঁদের দুই ছেলে আয়াস মির্জা ও **ইয়াস মির্জা**। দুজনেই বিবাহিত এবং পারিবারিক ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছে। আয়াসের স্ত্রী **আফিফা মির্জা**, আর ইয়াসের স্ত্রী **মেহরীন মির্জা**। বড় দুই ছেলের সংসারে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে থাকে বাড়ির পরিবেশ।
ছোট ভাই **আরিফ মির্জা** (নুহার বাবা) পরিবারের ব্যবসার পাশাপাশি সন্তানদের নিয়েও ভীষণ সচেতন। তাঁর স্ত্রী **মনা মির্জা** একজন স্নেহময়ী মা, যিনি পরিবারের সবাইকে একসূত্রে বেঁধে রাখেন। তাঁদের তিন সন্তান। বড় ছেলে **নূর মির্জা**, দেশের অন্যতম সেরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় **বুয়েটের** মেধাবী শিক্ষার্থী। মেধাবী, দায়িত্বশীল এবং ছোট বোনের প্রতি অসম্ভব স্নেহশীল। দ্বিতীয় সন্তান **নুহা মির্জা**, যে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। প্রাণবন্ত, জেদি, আবেগপ্রবণ এবং পুরো পরিবারের চোখের মণি। সবার ছোট **রিদওয়ান মির্জা**, যার এখনো স্কুলজীবন শুরু হয়নি। সে সারা বাড়ির আনন্দের উৎস, আর বড় ভাই-বোনদের আদরের ছোট্ট সদস্য।
মির্জা পরিবারের প্রতিটি সদস্য একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে থাকে। পরিবারের বড়রা সিদ্ধান্ত নেন একসঙ্গে, ছোটরা বড়দের সম্মান করে, আর সবাই মিলে এই বিশাল বাড়িটাকে শুধু একটি পরিবার নয়, ভালোবাসা আর ঐক্যের এক সুন্দর আশ্রয়ে পরিণত করেছে।
♡ ♡ ♡ ♡ ♡
ঘটনাটা বহু পুরোনো,,,,,তখন আরমান মির্জা ব্যবসার কাজে প্রায়ই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাতায়াত করতেন। নতুন নতুন ব্যবসায়িক চুক্তি, জমি কেনাবেচা আর আমদানি রপ্তানির কাজে সপ্তাহের বেশিরভাগ সময়ই তাঁকে চট্টগ্রামে থাকতে হতো। সেই ব্যস্ত সময়েই তাঁর পরিচয় হয় এক তরুণীর সঙ্গে। মেয়েটির নাম ছিল **আবিদা**। খুব সাধারণ, দরিদ্র একটি পরিবারের মেয়ে। তাঁদের ছোট্ট টিনের ঘর, সীমিত আয় আর অভাবের সংসার সব মিলিয়ে জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা। কিন্তু দারিদ্র্য তার ব্যক্তিত্ব বা সৌন্দর্যকে ম্লান করতে পারেনি। আবিদার বড় বড় শান্ত চোখ, স্নিগ্ধ হাসি আর ভদ্র ব্যবহার প্রথম দেখাতেই মানুষের মনে ছাপ ফেলে দিত। আশপাশের সবাই বলত, এমন রূপ যেন প্রকৃতি নিজ হাতে সময় নিয়ে এঁকেছে।
ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকেই আরমানের সঙ্গে আবিদার দেখা হতে থাকল। প্রথমে পরিচয়, তারপর কথাবার্তা, ধীরে ধীরে একে অপরের প্রতি টান। আরমান নিজের পরিচয় সম্পর্কে সব সত্য বলেননি। তিনি নিজেকে অবিবাহিত বলেই পরিচয় দিয়েছিলেন। আবিদা বিশ্বাস করেছিল তাঁর প্রতিটি কথা। পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও একসময় তারা বিয়ে করে। আবিদা ভেবেছিল, অবশেষে তার জীবনে সুখের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। স্বামীর প্রতি অগাধ বিশ্বাস নিয়ে সে নতুন সংসারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল।
কিন্তু সেই স্বপ্ন খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবিদা এমন কিছু সত্য জানতে শুরু করল, যা তার পৃথিবীটাই বদলে দিল। যে মানুষটিকে সে নিজের জীবনের ভরসা ভেবেছিল, তাঁর অতীত এবং বর্তমান সম্পর্কে বহু বিষয় তার অজানা ছিল। সেই সত্য সামনে আসার পর তাদের সম্পর্কের ভেতরে গভীর সংকট তৈরি হয়। সেই ভাঙনের মধ্যেই জন্ম হয় একটি ছেলের,,,,**ঊষান**।
শৈশব থেকেই ঊষান বড় হয়েছে মায়ের কষ্ট, নীরব কান্না আর অপূর্ণ জীবনের গল্প শুনে। আবিদা কখনো ছেলের মনে অকারণে ঘৃণা ঢেলে দিতে চাননি, কিন্তু জীবনের বাস্তবতা লুকিয়েও রাখতে পারেননি। নিজের বাবার পরিচয়, মায়ের ভাঙা স্বপ্ন আর অতীতের অসমাপ্ত ইতিহাস এসবই ধীরে ধীরে ঊষানের ব্যক্তিত্বকে কঠিন করে তোলে। আর সেই অতীতই একদিন তাকে নিয়ে যায় মির্জা পরিবারের দরজায়, যেখানে বহু বছরের চাপা পড়ে থাকা সত্য আবার সামনে এসে দাঁড়ায়।
♡ ♡ ♡ ♡ ♡
#চলবে

