Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-০৫

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-০৫

0
1

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_৫

খুলনা শহরের আকাশ আজও অনুজ্জ্বল।

সন্ধ্যার পূর্বমুহূর্তের ধূসর আলো নগরীর বহুতল, বৈদ্যুতিক খুঁটি আর অচেনা অলিগলির শরীরে এক অদ্ভুত নির্জনতার আবরণ মেখে রাখে। শহরটি চলমান রিকশার ঘণ্টাধ্বনি, দূরাগত আজানের সুর, ভাজাভুজির গন্ধ, মানুষের অবিরাম পদচারণা সবই নিজের নিয়মে প্রবাহমান। অথচ এই বিপুল কোলাহলের কেন্দ্রবিন্দুতেই ইনায়া এক পরম নিঃসঙ্গ দ্বীপের ন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। আজ খুলনায় তার তৃতীয় দিন।
মাত্র তিনটি দিন। অথচ এই বাহাত্তর ঘণ্টা যেন ক্যালেন্ডারের তিনটি পৃষ্ঠা নয়, বরং সহস্র বর্ষব্যাপী নির্বাসনের দীর্ঘ উপাখ্যান। মেয়েদের মেসের দ্বিতীয় তলার ক্ষুদ্র কক্ষটি এখন তার অস্থায়ী আশ্রয়। চারটি লোহার খাট, একটি পুরোনো কাঠের আলমারি, জানালার পাশে নীলচে পর্দা, ছাদের ধীরগতির ফ্যান। এই সামান্য উপকরণগুলো দিয়েই নির্মিত হয়েছে তার নতুন ঠিকানা। কিন্তু মানুষের ঠিকানা কি ইট-পাথরের সমষ্টি? নাকি যাদের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জেগে থাকে, তারাই প্রকৃত ঠিকানা? এই প্রশ্নের উত্তর ইনায়া জানে। আর সেই জানাটাই তার সবচেয়ে বড় শাস্তি। জ্বরটা এখন আরও প্রকট হয়েছে আগের থেকে।

শরীরের প্রতিটি অস্থিসন্ধিতে যেন কেউ উত্তপ্ত লোহা গলিয়ে ঢেলে দিচ্ছে। মাথার অভ্যন্তরে ধুকপুক করছে অদৃশ্য এক যন্ত্রণার অগ্নিপিণ্ড। ক্ষুধা বহু আগেই বিদায় নিয়েছে। এক গ্লাস পানি পর্যন্ত পান করতে ইচ্ছা জাগছে না। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা তার প্রধান ব্যাধি নয়। তার প্রকৃত অসুখের নাম স্মৃতি। একটি সংসার, যেটি সে দুই হাতে আগলে রাখতে চেয়েছিল, আজ সেই সংসারই বিষাক্ত লতার মতো তার হৃদয়ের চারপাশে জড়িয়ে প্রতিক্ষণে শ্বাসরোধ করছে। স্মৃতির পাতায় কেমন সব ভেসে বেড়াচ্ছে।
ইনায়া চোখ বন্ধ করে। অমনি ভেসে ওঠে আয়াশের মুখ।
নিরাবেগ,নির্লিপ্ত,অস্পর্শ কত অদ্ভুত! একজন মানুষ ভালোবাসে না এ সত্য মেনে নেওয়া যতটা সহজ, তার চেয়েও কঠিন হলো সেই মানুষটিকে ভালোবেসে ফেলা।আয়াশ কখনো মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেয়নি যে, সে তাকে ভালোবাসবে। তবুও ইনায়া এক টুকরো আয়াশ ছিলো হয়তো ভালোবাসবে। তবুও মানুষের হৃদয় যুক্তির অনুসারী নয়; সে অলীক সম্ভাবনার উপাসক। অসম্ভবের ভস্মস্তূপেও সে সম্ভাবনার ক্ষুদ্রতম বীজ অনুসন্ধান করে। ইনায়াও করেছে। অথচ সেটা হয়নি, সবসময় অসম্ভব জিনিস সম্ভবে পরিণত হয় না। তার প্রতি বাস্তবতা নির্মম,বাস্তবতা নিরাবেগ। বাস্তবতা জানিয়ে দিয়েছে যেখানে ভালোবাসা নেই, সেখানে অপেক্ষারও কোনো গন্তব্য থাকে না।চোখের কোণ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। কান্নারও শব্দ থাকে। কিন্তু এমন কিছু কান্না আছে, যেগুলো কেবল আত্মাই শুনতে পায়।

ঠিক তখনই কক্ষের দরজা ধীরে খুলে যায়। হাতে ধোঁয়া ওঠা স্যুপের বাটি নিয়ে প্রবেশ করে রুমাইসা। তার পিছনেই আসে মেহরীন। আর সর্বশেষ দরজাটা পা দিয়ে আলতো ঠেলে বন্ধ করে নাওমি। তিনজনের কারও মুখে অতিরিক্ত সমবেদনা নেই। অতিরঞ্জিত প্রশ্ন নেই। কৌতূহলও নেই। এদের সঙ্গেই ইনায়ার বসবাস শুরু হয়েছে কাল থেকে। নাওমি আর রুমাইসা দু’জনই স্টুডেন্ট, পড়ালেখা করছে। আর মেহরীন জব করছে এখানে। রুমাইসা এগিয়ে এলো বিছানার কাছে,
রুমাইসা বিছানার পাশে বসে কপালে হাত রাখতেই ভ্রু কুঁচকে ওঠে।

“জ্বর এখনো অনেক।”

মেহরীন টেবিলের উপর ওষুধগুলো সাজিয়ে রাখে।

“খালি পেটে ওষুধ খাওয়া যাবে না। আগে অল্প হলেও স্যুপটা শেষ করবেন।”

ইনায়া তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলল। কাল বিছানায় শোয়ার পর আর ওঠার মতো শক্তি ছিলো না ইনায়া, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিলো। থরথর করে কাঁপছিল ঠান্ডায়! তার এমন অবস্থা দেখে এরাই দেখেছিলো কাল রাত। পরিচয়ও হওয়া হয়নি ঠিক মতো। তবুও মেয়ে তিনটা তার এমন বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে, রাতে খাবার খাইয়ে দিয়ে মেডিসিন খাইয়ে দিয়েছিলো। ইনায়ার কাছে কোনো মোটা কাঁথা কিংবা গায়ে জড়ানোর জন্য কিছুই ছিলো না। তখন নাওমি তার কাঁথা তার গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিলো। কখনো কখনো রক্তের সম্পর্কের চেয়েও মানবিকতার বন্ধন অধিক দৃঢ় হয়ে ওঠে। নাহলে কি তার মতো অচেনা কাউকে এইভাবে সাহায্য করে? এর আগে যেসব মেসে ছিলো, সেইগুলোতে কোনোদিন এতো ভালো রুমমের জোটেনি।।সবসময় নিজেদের কাজও ইনায়াকে দিয়ে করিয়ে নিতো।
রুমাইসা হালকা হেসে বলে-

“আপু, আমরা কিন্তু ঠিক করেছি আপনি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত পালা করে আপনার পাশে থাকব।”

মেহরীন মৃদু গলায় যোগ করে-

” সুস্থ হন তারপর আরও ভালো ভাবে পরিচিত হবো।”

ইনায়া কাঁপা কাঁপা চোখে তাকিয়ে থাকলো, চোখ দুটো কেমন ফুলে আছে। তাকাতে পারছে না, কিছু খেতে ভয় লাগছে। যদি উল্টা-পাল্টা মেডিসিন নেয় তাহলে সমস্যা হতে পারে। কারণ সে এখন একা নয়, তার ভিতরে আর একটা প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে। নাওমি ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে বলে-

“মেসে নতুন কেউ এলে তাকে একা থাকতে দেওয়া আমাদের নিয়মের বিরুদ্ধে।”

দীর্ঘ তিন দিন পর ইনায়ার বিবর্ণ অধরে অতি সূক্ষ্ম এক হাসির রেখা জন্ম নেয়। সে হাসি আনন্দের নয়,হাসি কৃতজ্ঞতার।

“ থ্যাঙ্কিউ তোমাদের। আ..আমার এতো খেয়াল রাখার জন্য।”

মেহরীন হেসে বলে-

“ তার দরকার নেই আপু, আমরা আমরই তো।”

ইনায়া হালকা হাসলো, কষ্ট হচ্ছে তার ভীষণ। বাড়ির জন্য মন কেমন করছে। বাড়িটা তার না হলেও, তিলে তিলে তিনটা বছর ধরে সে সেই বাড়িটাকে নিজ হাতে সাজিয়েছে।
সংসারে মায়া বড় মায়া! সংসার,স্বামী সবকিছুতেই ভীষণ রকমের মায়া। তিনটা বছর তো কম নয়, ইনায়ার কিছুতেই সুখ খুঁজে পাচ্ছেনা। তার অস্থির লাগছে, ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু তার ফেরার বন্ধ বন্ধ সে নিজেই করেছে। আর সেই স্থানে সে দ্বিতীয়বার যেতে চান না, তবুও মায়া জিনিসটা বড্ড বেদনা দিচ্ছে তাকে। ইনায়া চোখ বুজলো, হাতটা পেটের উপর রাখলো। আয়শা বেগমের কথা মনে পরছে৷ মানুষটা তাকে বড্ড আদর করতেন। অসুস্থ হলে কি সুন্দর মাথাটা কোলে নিয়ে বিলি কেটে দিতেন। তেল দিয়ে দিতেন, একপ্রকার মায়ের অভাব অনেকটা কমে গিয়েছিলো আয়শা বেগমের আগমনের পর। বাড়িতে থাকলে, হয়তো আয়শা বেগম তেল গরম করে তার মাথায় দিয়ে দিতেন। ইনায়া চোখ বন্ধ করে শুইয়ে থাকলো, কান্ত লাগছে চোখ খুলে রাখতে। কত পথ চলা বাকি তার।

—–

নবদিবার সূচনা হয়েছে বহুক্ষণ আগেই, তবুও চারিদিকটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে রয়েছে। আয়াশ গত দুই দিন ধরে অফিসে যায়নি, আজকে যেতে হবে। তার জন্য তৈরি ঠিকই হচ্ছে কিন্তু তার মনটা পরে আছে অন্য চিন্তায়। নিজেকে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, এই সময়টাতে ইনায়া রোজ ঘুর ঘুর করতো। মেয়েটা সবসময় সে বাসায় থাকলে তার আশেপাশেই থাকতো; সময় পেলে দুইজন গল্পও করতো। অথচ বাসাটা কেমন ফাঁকা,নিস্তব্ধতা হয়ে পরে রয়েছে। আয়াশ অফিসের উদ্দেশ্যে বের হলো, নিজেকে কেমন অগোছালো লাগছে। হঠাৎ ই তার ফোনটা বেজে উঠলো, আয়াশ ঝরের গতিতে সেদিকে তাকালো, হয়তো আশায় রয়েছে ইনায়ার ফোনের অপেক্ষায়। কিন্তু স্ক্রিনে আইরিন আপু নামটা জ্বল জ্বল করছে। আয়াশ ফোনটা তুললো।

“ ইনায়া কোথায়?”

প্রশ্নটা যেনো আয়াশকে শ্বাসরুদ্ধ করে দিলো। সে কি বলবে? তার গলা কাঁপছে, তবুও নিজেকে সামলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে-

“ আপু ইনায়া নেই।”

“ শেষ পর্যন্ত মেয়েটা চলে গেলো। ঠিকই করেছে, তোর মতো মানুষের সঙ্গে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। তিনটা বছর কি খুব কম আয়াশ মেয়েটাকে ভালোবাসর জন্য?”

আয়াশের যেনো দম আঁটকে এলো! একই প্রশ্ন, ইনায়াও তো লিখেছে তিনটা বছর কি খুব কম?

“ তুমি সব জানো তবুও?”

“ কি জানবো? তুই তোর ভালোবাসাকে বলতে পারিসনি এটা ইনায়ার দোষ? তোর ভালোবাসা হারিয়েছে এটাও কি ইনায়ার দোষ?”

“ আপু!”

“কিসের আপু আয়াশ! কার জন্য অপেক্ষা করছিস তুই? ওকে ভুলতে পারছিস না কেনো? কম তো হলো না, দীর্ঘ ছয়টা বছর হলো। তবুও একই মানুষের পিছনে নিজের অনুভূতি গুলোকে নষ্ট করছিস তুই। বদলে ওই মেয়েটাকে তিলে তিলে শেষ করেছিস।”

আয়াশ কোনো কথা বললো না, নীরবে সবটা শুনলো। আইরিন আবারও বলে ওঠে-

“ আয়াশ মানুষ নতুন করে আবারও কাউকে আঁকড়ে ধরে। নতুন করে বাঁচার জন্য একজন মানুষ আপন করে, ইনায়া কি তোর আপন হতে পারেনি? নাকি মেয়েটার কমতি ছিলো যে তুই ওকে মানতে পারিস নি?”

“ তোমার কি মনে হয় আমার দশ বছরের অনুভূতি এইভাবে শেষ হয়ে, নতুন করে বাঁচতে শিখবে?”

“ ও আচ্ছা! তা কিসের জন্য পারবি না? তুই সময় মতো বলেছিস তোর অনুভূতি? বাঁচাতে পেরেছিস ওই অনুভূতিকে? তাহলে এতো বছরেও কেনো সেটা উবড়ে ফেলছিস না?”

আয়াশ চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টেনে নিলো। সবকিছু তার কাছে যদি সহজ হতো, সত্যি সে মুক্তি দিতো নিজেকে এই সকল শিকলবন্দী কারাগার থেকে।

“ তুমি জানো আমার জন্য এতোটাও সহজ নয়। নিজের মধ্যে লালন করা ওর প্রতিটা অনুভূতি, আমি কতটা আগলে রেখেছি।”

“ তুই আসলেই স্বার্থপর আয়াশ। এমন কারো জন্য নিজেকে শেষ করছিস, যা তোর হওয়ার নয়।”

আয়াশ ফোনটা কেটে দিলো, চোখ বন্ধ করতেই একটা হাসিমাখা মুখশ্রী চোখের পাতায় ভেসে উঠলো। কি স্নিগ্ধ হাসি, চেয়ে আছে সে সেই হাসির দিকে। আয়াশ চোখটা খুলে ফেললো।

“ আমার না হওয়ারই ছিলো, তাহলে আমার হৃদয়ে কেন দখলদারি করলে?”

——-

“ আমায় একটা কাজ খুঁজে দিতে পারবে?”

প্রশ্নটা বাকিদের উদ্দেশ্যে করলো ইনায়া। জ্বরটা খানিকটা নেমে এসেছে, দুর্বল শরীরটা বালিশে হেলান দিয়ে রেখেছে।

“ মাসের মাঝঝানে এখন কোনো কাজ পাওয়াটা মুসকিল। তোমার বাড়ির কোথায়?”

নাওমির প্রশ্নের ইনায়া ক্ষুন্ন হাসলো। বাড়ি? সেটা কি তার আদৌও কোনোদিন ছিলো? কই তার মনে পরছে না তো।

“ আমার বাড়ি নেই, আমি অনাথ।”

“ সো সরি আপু, আমি আসলে বুঝতে পারিনি। তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি।”

“ আরে সরি বলতে হবে না। কষ্ট পাওয়ার কি আছে বল, যা সত্য সেটা মানতে কষ্ট পেতে হয় না।”

“ তুমি এখানে কেনো এসেছো তাহলে? আগে কোথায় থাকতে?”

“ ঢাকায়, এমনি নতুন শহরে,নতুন ভাবে বাঁচার জন্য আসা।”

টুকটাক তিন জনের সঙ্গেই ইনায়া পরিচিত হলো। বেশ অনেকটা ভালো লাগছে এখন, সময়টা পার হচ্ছে। নতুন কাজ খুঁজতে হবে। মাসের মাঝঝানে কাজ পাওয়া যাবে না। তাই এই মাসটা শেষ হওয়া অব্দি অপেক্ষা করতে হবে। হাতে আর পঁচিশ হাজার টাকা রয়েছে, সেটা দিয়ে চলতে হবে। কি ভাবে, কি হবে ইনায়ার জানা নেই। খেটে খাওয়ার তার অভ্যাস আছে। তাই তার এতোটাও কষ্ট হবে না।

#চলবে