Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-২০

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-২০

0
15

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_২০

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

সময় নিজের নিয়মেই বহমান। থেমে থাকার অবকাশ নেই
তার। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে সম্পূর্ণ একটা মাস। ঢাকায় আসার পর থেকে ইনায়ার দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও যেনো খানিকটা সহজ হয়ে এসেছে। চেনা শহর, চেনা পথঘাট, পরিচিত অলিগলি। প্রয়োজনীয় সবকিছুই এখন আর অচেনা কোনো জায়গা থেকে খুঁজে আনতে হয় না। হাত বাড়ালেই যেনো পাওয়া যায় প্রয়োজনের অধিকাংশ জিনিস। প্রতিদিনই আয়শা বেগম, জুয়েল সাহেব সহ পরিবারের সকলের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কথাবার্তা হচ্ছে। সম্পর্কগুলোর মাঝেও ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এক নতুন সেতুবন্ধন। আর ইয়াশ? ছোট্ট মানুষটা তো ততদিনে তার দাদা-দাদি, ফুপু-ফুপা সহ আশেপাশে থাকা সকল মানুষের অঢেল ভালোবাসার অধিকারী হয়ে উঠেছে।

ইনায়া কোনোদিনও চায়নি তার সন্তানের জীবনটা তার নিজের জীবনের মতো নিঃসঙ্গতার আঁধারে আবদ্ধ থাকুক।তার নিজের পরিবার ছিলো না।কিন্তু ইয়াশের আছে। ভরা এক পরিবার। ভালোবাসায় পরিপূর্ণ কতগুলো মানুষ, যারা ক্ষুদ্র এই প্রাণটার একটু হাসির জন্যও নিজেদের সমস্ত ব্যস্ততা ভুলে থাকতে পারে। আর একজন মা হয়ে ইনায়া কখনোই নিজের সন্তানের সেই ভালোবাসার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে না। ইয়াশের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে এখন অনেকগুলো পরিচিত মুখ জমা হয়েছে। দাদা, দাদি, ফুপু, ফুপা সহ একে একে সবাইকে চিনতে শিখেছে সে। কারো কণ্ঠ শুনলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, কাউকে দেখলে আনন্দে হাত-পা ছুঁড়ে দেয়। পৃথিবী সম্পর্কে এখনো তার জানার পরিধি অতি সামান্য, তবুও এই ছোট্ট পৃথিবীর মধ্যেই কতগুলো মানুষ যে তার সমস্ত পৃথিবী হয়ে উঠেছে!

অন্যদিকে নিজের জীবনটাকেও থামিয়ে রাখেনি ইনায়া। অনলাইনে ছোট্ট করে শুরু করেছে মেয়েদের কুর্তির ব্যবসা। মাত্র এক মাসেই বেশ ভালো সাড়া পেয়েছে। এখনো সেভাবে কোনো মালামাল স্টক করে রাখে না। যখন যেমন বিক্রি হয়, ঠিক সেভাবেই প্রয়োজন অনুযায়ী মাল এনে আবার বিক্রি করে। ধীরে ধীরে এই দিকটাতে ভালো কিছু করার ইচ্ছা রয়েছে তার। বড় কোনো স্বপ্ন একদিনে পূরণ হয় না, সে কথা ইনায়া জানে। তাই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপেই এগিয়ে যেতে চায় সে। এখন প্রয়োজনীয় সবকিছু হাতের নাগালেই পাওয়া যায়। একা হাতে সন্তান সামলে কাজ করাটা অবশ্যই মুশকিল। তবে এই সময়টাতে ইয়াশ বেশিরভাগ সময় তার দাদা-দাদির কাছেই থাকে। তাই ইনায়ার কাজটাও অনেকটাই সহজ হয়ে এসেছে। ছেলে খাওয়ার সময়, ঘুমের সময় কিংবা খুব বেশি কান্না করলে মায়ের কাছেই ফিরে আসে। তাছাড়া পরিবারের অন্য সবার কাছেও দিব্যি সময় কাটিয়ে দিতে পারে।ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজটাও ভালোই চলছে ইনায়ার। যা আয় হয়, তা দিয়ে তার দিনগুলো বেশ ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছে। কারো ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যে প্রচেষ্টা, সেই প্রচেষ্টার মাঝেই যেনো এক অদ্ভুত তৃপ্তি খুঁজে পায় মেয়েটা।

দুপুরের মৃদু আলোয় ঘরটা এখন বেশ শান্ত।
ইনায়া বসে নিজের কাজে ব্যস্ত। সম্মুখে খোলা ল্যাপটপ, আঙুলগুলো দ্রুততার সঙ্গে কিবোর্ডের ওপর চলমান। আর বিছানার অপরপ্রান্তে আয়াশ শুয়ে আছে ইয়াশকে নিয়ে।
বাবা-ছেলের নিজস্ব এক ছোট্ট জগৎ। ইয়াশ কখনো বাবার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে টানছে, কখনো আনন্দে হাত-পা ছুঁড়ে চলেছে। তার প্রতিটি দুষ্টুমিতেই আয়াশের মুখে হাসির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অল্প কয়েকদিনের মাঝেই বাবা-ছেলের মাঝে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক সখ্যতা। আয়াশকে দেখলেই যেনো ইয়াশের সমস্ত আনন্দ একসঙ্গে উথলে পড়ে।হাত-পা ছোড়ে,অদ্ভুত সব শব্দ করে। মুখভর্তি হাসি নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। খেলতে খেলতে হঠাৎই ইয়াশের মুখটা কুঁচকে গেলো। মুহূর্তের মাঝেই চোখ-মুখ লাল করে কান্নায় ভেঙে পড়লো ক্ষুদ্র প্রাণটা।

আয়াশ তড়িৎগতিতে উঠে বসলো। হঠাৎ করে এমন কান্নার কারণ বুঝতে না পেরে খানিকটা অস্থিরই হয়ে উঠলো সে। শিশুর ক্রন্দনরত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে কখনো মাথায় হাত রাখছে, কখনো গাল স্পর্শ করছে। ইনায়াও কাজ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ছেলের দিকে তাকালো। মুহূর্তের মাঝেই উঠে এলো সে। মায়ের দৃষ্টি যে সন্তানের সামান্য অস্বস্তিও এড়িয়ে যেতে পারে না! ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতেই ইনায়া বুঝতে পারলো কান্নার প্রকৃত কারণ। প্রস্রাব করেছে। ভেজা কাপড়ের অস্বস্তিতেই কাঁদছে ইয়াশ। আয়াশ ছেলের অশ্রুসিক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে-

“ ও কাঁদছে কেনো?”

“ মুতু করে দিয়েছে তাই কাঁদছে।”

বলেই ইনায়া ছেলের ভেজা কাপড়টা পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে হাত বাড়ালো। বাসায় থাকাকালীন ইনায়া ইয়াশকে ডায়াপার কিংবা প্যান্ট পরিয়ে রাখে না। হাতে সেলাই করা নরম কাপড়ের টুকরো পরিয়ে রাখে। এতে করে ইয়াশও আরাম পায়, আর মায়েরও মনে হয় ছেলেটা আরও স্বস্তিতে আছে।আয়াশ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলে-

“ আপনি কাজ করুন, আমি ওকে চেঞ্জ করিয়ে দিচ্ছি।”

ইনায়ার ভ্রু খানিকটা কুঁচকে আসে।

“ পারবেন আপনি?”

আয়াশ বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই জবাব দেয়-

“ ট্রায় করে দেখি।”

ইনায়া আর কিছু বলে না। খানিকটা সরে দাঁড়িয়ে নতুন একটা পরিষ্কার কাপড় এগিয়ে দেয় আয়াশের দিকে। আয়শা বেগম নিজের হাতে নাতির জন্য কত যত্ন করেই না তৈরি করে রেখেছেন কাপড়গুলো! আয়াশ এবার ছেলের দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিলো। ক্ষুদ্র, নরম পা দু’টো একসঙ্গে করে আলতো হাতে উঁচু করে ধরে। তারপর ইয়াশের মুখের দিকে তাকিয়ে অতি আপন ভঙ্গিতে বলে ওঠে-

“ ওরে বাবা! এতোগুলো মুতু করে দিয়েছো দেখি।”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আয়াশ ভেজা কাপড়টা সরিয়ে নেয়। আর ঠিক তখনই ঘটে বিপত্তি। তির্যকভাবে ছুটে আসা গরম, তরল কিছু সরাসরি এসে আছড়ে পড়ে আয়াশের মুখমণ্ডলে। মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় সে। দৃষ্টি স্থির। হাত দুটোও যেখানে ছিলো সেখানেই থমকে গেছে। মস্তিষ্কে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে খানিকটা সময় লাগলো। তারপর ধীরে ধীরে আয়াশের উপলব্ধি হলো। এই গরম, তরল পদার্থটা আসলে কি! অন্যদিকে নিজের সমস্ত কর্ম সম্পাদন করে যেনো ভীষণ প্রশান্তি পেয়েছে ইয়াশ। প্রস্রাব ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দে হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করেছে সে। মনে হচ্ছে শরীরের ভেতরে জমে থাকা অবশিষ্ট অস্বস্তিটুকুও বের করে দিতে পেরে মহা আরাম পেয়েছে। তবে তার থেকেও বেশি আনন্দ পেয়েছে বোধহয় বাবার মুখের ওপর মুতু ছিটিয়ে দিয়ে। ইনায়া পুরো দৃশ্যটার দিকেই তাকিয়ে ছিলো।

তারপর বহুদিন পর হঠাৎ করেই শব্দ করে হেসে উঠলো। সেই হাসির শব্দে যেনো এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরটা বদলে গেলো।আয়াশ এখনো হতভম্ব হয়ে আছে। আর ইয়াশ?
মায়ের হাসির শব্দ শুনে যেনো তার আনন্দের সীমা আরও বহুগুণে বেড়ে গেলো। ক্ষুদ্র মুখখানা হাসিতে ভরে তুলে আরও জোরে জোরে শব্দ করতে শুরু করলো সে।

“ অ্যাই! অ্যাইই!! উম্মম! উম্মমমম!”

আয়াশ ধীরে ধীরে ছেলের হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকালো। তারপর কপাল কুঁচকে, ভান করা গাম্ভীর্যে বলে ওঠে-

“ ওরে পাঁজি! বাবার মুখে মুতে দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করা হচ্ছে?”

ইনায়া ততক্ষণে নিজের হাসি থামানোর চেষ্টা করছে।আয়াশ একবার ছেলের দিকে তাকিয়ে আবারও চোখ রাখলো ইনায়ার মুখশ্রীর ওপর।
স্থির হয়ে গেলো দৃষ্টি। এই হাসিটা!গত এক বছরেও কি কখনো এভাবে দেখেছে সে?হাসির রেখায় উজ্জ্বল হয়ে থাকা মেয়েটার মুখটা দেখে আয়াশ যেনো কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গেলো নিজের মুখের ওপর ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ের কথা। এতদিন পর ইনায়ার অধরকোণে এমন স্বতঃস্ফূর্ত হাসি দেখে নিজের অজান্তেই অবাক হলো সে। কিন্তু ইনায়া যেনো নিজের হাসিটুকুর কথাও মনে করে ফেললো। মুহূর্তের মাঝেই মুখশ্রী আবারও নির্লিপ্ত হয়ে এলো।দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো নিজের কাজের দিকে।তাদের মাঝখানের দূরত্বটা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।অভিমানের দেয়ালটাও কোথাও না কোথাও এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

তবুও আজকের এই হাসিটুকু আয়াশের মনে নতুন করে কোনো অজানা অনুভূতির জন্ম দিয়ে গেলো। সে আর কিছু বললো না।ছেলেকে পরিষ্কার করানোর কাজে মন দিলো।প্রথমবার বেশ খানিকটা বেগ পেতে হলেও কয়েকবার চেষ্টা করার পর ঠিকই শিখে গেলো কিভাবে সবকিছু করতে হয়। নতুন, শুকনো কাপড়ে আলতো করে ইয়াশকে মুড়িয়ে দিলো আয়াশ।
তারপর ছেলের গোলগাল মুখখানার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে-

“ এ্যাই পোটকা, মাই ছোট্ট পোটকা এতো হাসি। আমাকে মুতুময় করে দিয়ে খালি হাসা হচ্ছে নাকি।”

বাবার কণ্ঠ শুনে ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গেই হাত-পা নাড়িয়ে উঠলো।মুখে আবারও সেই আনন্দ।

“ অ্যাইই! অ্যাইই!”

আয়াশ সঙ্গে সঙ্গে ছেলের মুখের আরও কাছে গিয়ে বলে-

” আবার বলে হ্যাঁ দেখো কিভাবে।”

কথার অর্থ বোঝার বয়স হয়নি ইয়াশের।তবুও বাবার মুখের এত কাছাকাছি উপস্থিতি বুঝতে পেরে আরও বেশি আনন্দে হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করলো সে।আয়াশ আর অপেক্ষা করলো না।
ছেলেকে নিজের বুকে ঝাপটে ধরে একের পর এক চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলো। ক্ষুদ্র দেহটা বাবার বক্ষের সঙ্গে লেপ্টে আছে, আর সারা কক্ষজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ইয়াশের আনন্দময় শব্দ।

“ অ্যাইই! উম্মম!”

একটা শিশুর হাসি কতখানি শান্তি বয়ে আনতে পারে, তা হয়তো কেবল সেই মানুষগুলোই জানে, যাদের পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান অংশটুকু এমন করে তাদের সম্মুখে হাসে।
ইয়াশ হাসছে।আর সেই হাসির শব্দে ধীরে ধীরে ভরে উঠছে পুরো ঘরটা। ইনায়া নিজের কাজে মনোনিবেশ করে থাকলেও তার কান ঠিকই শুনছে ছেলের প্রতিটি আনন্দময় শব্দ। অন্যদিকে আয়াশের সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ তার ক্ষুদ্র ছেলের ওপর। তাদের মাঝে মান আছে,অভিমান আছে,বিগত সময়ের অমীমাংসিত ক্ষতও আছে। তবুও তাদের মাঝখানে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণটা যেনো প্রতিনিয়ত সেই সমস্ত দূরত্বের মাঝখানে এক অদৃশ্য সেতু নির্মাণ করে চলেছে।ইয়াশ আবারও হেসে ওঠে।আর অদ্ভুতভাবে সেই হাসির সঙ্গে ইনায়া আর আয়াশ, দুজনের হৃদয় বেয়ে নেমে আসে প্রশান্তির এক মৃদু ঢেউ।কেউ কাউকে কিছু বললো না।কিন্তু ছোট্ট মানুষটার হাসির মাঝেই যেনো তারা দুজনেই এক মুহূর্তের জন্য খুঁজে পায় নিজেদের হারিয়ে যাওয়া শান্তিটুকু।

—-

পরন্ত বিকেল। বেলা ততক্ষণে আপন গতিতে ঢলে পড়েছে পশ্চিমের দোরগোড়ায়। জানালার কাঁচ ভেদ করে আসা ম্লান সূর্যালোকটুকু ঘরের মেঝেতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। চারিদিকজুড়ে কেমন এক অলস, নিস্তব্ধ আবেশ। সেই আবেশ ছিন্ন করেই ধীরে ধীরে তন্দ্রাঘোর থেকে বেরিয়ে এলো আয়াশ।বক্ষের উপর ক্ষুদ্র এক দেহের উষ্ণ উপস্থিতি। ছোট্ট ছোট্ট নিশ্বাসের ওঠানামায় আয়াশের বুকের আবরণটাও মৃদু কেঁপে উঠছে। কখন যে খেলতে খেলতে ইয়াশকে বুকের উপর নিয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছে, তার কোনো খেয়াল নেই মানুষটার। পিতৃত্বের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলো বোধহয় এমনই! কখন ক্লান্তি এসে চোখের পাতা ভারী করে দেয়, কখন সন্তানের উষ্ণতায় নিজের অজান্তেই নিদ্রার অতলে তলিয়ে যেতে হয়, তার হিসাব রাখার অবকাশ কোথায়?

আয়াশ ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো।প্রথমেই দৃষ্টি ঘুরলো আশেপাশে। অভ্যাসবশতই হয়তো চোখ খুঁজে নিলো অন্য একজনকে। কিন্তু ঘরের চারিদিকটা ফাঁকা। কেবল মাথার উপর ঘুরতে থাকা ফ্যানের একঘেয়ে শব্দ আর বুকের উপর ঘুমন্ত ক্ষুদ্র প্রাণটার মৃদু নিশ্বাস।
ইয়াশ ঘুমের ঘোরেই দুধপান করার মতো করে ‘চো চো’ শব্দ করছে। ক্ষুদ্র ওষ্ঠদ্বয় নড়ছে আপন খেয়ালে, যেনো স্বপ্নের মাঝেও সে খাবারের সন্ধান পেয়েছে। দৃশ্যটা দেখে আয়াশের মুখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠলো।কি অদ্ভুত এই ক্ষুদ্র মানবগুলো!ঘুমের মাঝেও তাদের চাহিদা, তাদের অভিমান, তাদের ছোট্ট ছোট্ট অনুভূতিগুলো কতটা সত্যি হয়ে ওঠে!

কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে আয়াশ অত্যন্ত সাবধানে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। ক্ষুদ্র দেহটাকে চাদরের মাঝে আরাম করে রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। ঘর থেকে বের হতেই দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো সামনের সোফার দিকে।ইনায়া,মেয়েটা সোফায় বসে কাজ করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কোলের উপর ল্যাপটপটা এখনো খোলা। মাথাটা এলিয়ে আছে সোফার পেছনে। মুখজুড়ে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। মাতৃত্বের পর থেকে মেয়েটার জীবনটা যেনো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নিয়মে আবদ্ধ হয়ে গেছে। রাতের ঘুম আর দিনের বিশ্রাম, সবকিছুর হিসাব এখন নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষুদ্র এক মানব।আয়াশ ধীর পায়ে এগিয়ে এলো।কোলের উপর থাকা ল্যাপটপটা অত্যন্ত সাবধানে তুলে নিলো। যেনো সামান্য শব্দেও ঘুমন্ত মানুষটার বিশ্রামটুকু বিঘ্নিত হতে পারে। সামনের টেবিলের উপর ল্যাপটপটা রেখে আবার ফিরে তাকাতেই দেখলো ইনায়ার চোখের পাতা কেঁপে উঠেছে।পরমুহূর্তেই ঘুম ভেঙে গেলো মেয়েটার।ইয়াশ হওয়ার পর থেকে ইনায়ার ঘুম কেমন অস্বাভাবিক রকমের হালকা হয়ে এসেছে। সামান্য নড়াচড়া, ক্ষুদ্র কোনো শব্দ, এমনকি পাশের পরিবেশে অতি মৃদু পরিবর্তনেও তার ঘুম ভেঙে যায়। রাতের অধিকাংশ সময় জেগে কাটাতে হয়। মাঝেমধ্যে ইয়াশ কান্না করে ওঠে। কখনো খিদের জন্য, কখনো ঘুম ভেঙে কাউকে কাছে না পেয়ে। সবকিছুই একা হাতেই সামলাতে হয় ইনায়াকে।ঘুমজড়ানো চোখে কিছুক্ষণ আয়াশের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। তারপর কণ্ঠে অস্থিরতা মিশিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“ ইয়াশ কোথায়?”

“ ঘুমাচ্ছে।”

“ওহহ্!”

তবে স্বস্তির সেই নিঃশ্বাসটুকু বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।হঠাৎ করেই ভেতরের ঘর থেকে ক্ষুদ্র এক কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। প্রথমে মৃদু, অস্পষ্ট। তারপর ধীরে ধীরে কান্নার তীব্রতা বাড়তে লাগলো। ইনায়ার সমস্ত তন্দ্রা যেনো মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেলো। কোনো কথা না বলেই দ্রুত উঠে ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো সে। তার পেছন পেছন ধীর পায়ে চললো আয়াশও। ইয়াশ একা থাকতে পারে না। কিছুক্ষণের জন্য একা রাখলেও ঘুম ভেঙে কাউকে চোখের সামনে না পেলে কান্না শুরু করে দেয়। যেনো পৃথিবীর সমস্ত নিরাপত্তা তার কাছে এই পরিচিত দুটি মানুষের উপস্থিতির মাঝেই সীমাবদ্ধ। দ্রুত ছেলের কাছে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো ইনায়া। ক্ষুদ্র দেহটাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। মায়ের বক্ষের উষ্ণতা পেতেই ছোট্ট ইয়াশের ছটফটানি সামান্য থামলেও কান্না থামলো না।ইনায়া মমতায় ভেজা কণ্ঠে বললো-

“ কি হয়েছে আব্বু? এই তো মা আছি। খুদু পেয়েছে বুঝি?”

ছোট্ট ইয়াশ তবুও কেঁদেই চললো।আয়াশ পরিস্থিতিটা বুঝতে খুব বেশি সময় নিলো না। নিঃশব্দে একবার ছেলে আর মায়ের দিকে তাকালো সে। তারপর কোনো অপ্রয়োজনীয় উপস্থিতি না রেখে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।ইনায়া ততক্ষণে নিজের ছেলেকে সামলাতে ব্যস্ত।মায়ের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণটার চাহিদা মেটাতেই সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ তার। মাতৃত্বের এই ব্যস্ততা, এই ক্লান্তি, এই রাতজাগা, এই ক্ষুদ্র প্রাণটাকে ঘিরে প্রতিনিয়ত নিজের সমস্ত অস্তিত্ব বিলিয়ে দেওয়া, সবকিছুই যেনো এখন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আয়াশ যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে, সেটাও অজানা নয় ইনায়ার। তবুও সে তাকালো না পেছনে।কিছু অভিমান মানুষের হৃদয়ে এমনভাবেই জমে থাকে, যেখানে যত্নের উপস্থিতি অনুভব করা যায়, অথচ সেই যত্নের দিকে ফিরে তাকানোর সাহস হয় না। ঘরের একপাশে এখনও ক্ষীণ কান্নার রেশ।
আর অন্যপাশে নিজের মায়ের উষ্ণতায় ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকা ক্ষুদ্র এক পৃথিবী।

****

ব্যস্ত নগরী ছুটে চলেছে নিজস্ব ব্যস্ততার ধারাবাহিকতায়। যান্ত্রিক জীবনের কোলাহলে কোথাও থেমে থাকার অবকাশ নেই। আইরিন আর আয়শা বেগম এসেছেন বেশ অনেক সময় হলো। ইয়াশ আরাম করে বসে আছে তার আন্টির কোলে। ছোট্ট মানুষটার মধ্যে কোনো অস্থিরতা নেই। আপন মানুষদের সান্নিধ্যে শিশুরা যেমন নির্বিঘ্নে নিজেদের পৃথিবী খুঁজে পায়, ইয়াশও তেমনভাবেই আইরিনের বুকে গা এলিয়ে বসে আছে। আর কিছুক্ষণ পরই আইরিনকে ফিরতে হবে নিজের বাসায়। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার একমাস পার হয়েছে তার। এই সময়টাতে বাইরে বেরোনো নিয়ে ফেরদৌসের কড়াকড়ি যেনো একটু বেশিই। প্রয়োজন ছাড়া আইরিনকে খুব একটা বাইরে আসতে দেয় না মানুষটা। কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে নিজেই নিয়ে আসে, আবার সময় হলে সযত্নে ফিরিয়েও নিয়ে যায়। আইরিনের প্রতি মানুষটার এই অতিরিক্ত সতর্কতা কিংবা যত্নে বিরক্ত হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পায় না কেউ।ফেরদৌস বড্ড ভালোবাসে আইরিনকে।

কিছু ভালোবাসা থাকে, যেগুলো প্রকাশ করার জন্য খুব বেশি শব্দের প্রয়োজন হয় না। সামান্য যত্ন, অকারণ দুশ্চিন্তা কিংবা প্রিয় মানুষটাকে চোখের আড়াল না করার প্রবণতাই বুঝিয়ে দেয় সেই মানুষটা কারো কাছে ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ।আইরিনের দৃষ্টি হঠাৎ করেই স্থির হলো ইনায়ার মুখপানে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে যেনো কোনো কথা নিজের ভেতর গুছিয়ে নিচ্ছিল সে। তারপর আর কোনো ভূমিকা না করেই বলে উঠলো-

“ ইনায়া সবকিছু ঠিক করে নেওয়া যায় না? এখন তো তুমি একা নও, ইয়াশ আছে। আয়াশকে কম তো শাস্তি দিলে না, এবার ওকে মাফ করো।”

কথাগুলো শুনে ইনায়া কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলো।একটা বছর। পুরো একটা বছর হয়ে গেছে সে আর আয়াশ আলাদা আছে। সময়ের হিসেবে একটা বছর হয়তো খুব বেশি দীর্ঘ নয়। অথচ এই একটা বছরের মাঝেই কতকিছু পাল্টে গেছে! মানুষের অভ্যাস পাল্টেছে, জীবনের গতিপথ পাল্টেছে, দায়িত্বের ধরন পাল্টেছে। ইনায়ার জীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন এক পৃথিবী, যার নাম ইয়াশ। কেবল পাল্টায়নি তাদের সম্পর্কটা। আজও সেই জায়গাতেই যেনো স্থির হয়ে আছে সবকিছু। না এগিয়েছে, না সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়েছে। ইনায়া হালকা করে ঢোক গিললো। তারপর নিজের ভেতরে জমে থাকা অস্বস্তিটুকু গোপন করার চেষ্টা করে বললো-

“ আপু এই ব্যাপারে কথা না বলি।”

আইরিনের মুখের অভিব্যক্তি বদলালো না। বরং আরও গম্ভীর হয়ে উঠলো তার দৃষ্টি। ইনায়ার কথার পেছনে লুকিয়ে থাকা ব্যথাটা তার অজানা নয়। তবুও কিছু কথা আছে, যেগুলো প্রিয় মানুষকে বলতে হয়। উত্তরটা যতই অস্বস্তিকর হোক, কখনো কখনো সেই অস্বস্তির মুখোমুখি দাঁড়ানোও প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

“ কেনো বলবে না ইনায়া? আমি আয়াশ যা করেছে সেটাকে সঠিক বলে গন্য করছি না। তোমার জায়গায় আমি থাকলেও হয়তো এমনটা করতাম। আমার ভাই কি তোমায় কখনো মা’রধোর করেছে? তোমাকে কষ্টে রেখেছে? যদি এমন কিছু করে থাকে তাহলে জোর করবো না তোমাকে। এখন তুমি বা আয়াশ একা নও, ইয়াশ রয়েছে৷ ও বড় হচ্ছে, তোমরা যদি এইভাবেই থাকো সেটার প্রভাব ইয়াশের উপরেই পরবে। নানা প্রশ্ন জাগবে, আশা করি তুমি এইসব চাও না।”

ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো। কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ভীষণ কঠিন। কারণ উত্তরগুলো বলতে গেলেই পুরোনো ক্ষতগুলো আবার নতুন করে র’ক্তাক্ত হয়ে ওঠে। মানুষ ভুলে থাকার চেষ্টা করলেও, কিছু অনুভূতি কখনো সত্যিকার অর্থে বিস্মৃত হয় না। তারা কেবল বুকের গভীরে স্থান বদলায়।ইনায়া খানিকটা সময় নিশ্চুপ থেকে বললো-

“ আপু ব্যাপারটা মা’রা কিংবা অবহেলার নয়। ব্যাপারটা হলো ভালোবাসার, উনি আমায় ভালোবাসেন না। ভালোবাসবেন না, আমি জানি মেয়েদের বেলাই এইসব মেনে নিতে হয়। কারণ একটাই আমরা মেয়ে, আমি তো অপেক্ষা করেছি। একটা দিন নয়, একটা বছর নয় তিনটা বছর! অথচ উনি তাকে ভুলতে পারেনি। আমি ওনার গলায় কাঁটার মতো আটকে ছিলাম। না উনি সেই কাঁটা গিলতে পারছেন আর না ফেলতে পারছেন। তাই ওনাকে আর নিজেকে মুক্তি দিয়েছি। আমি আর থাকতে পারছিলাম না, আমার একটা ভরসা চাই, ভালোবাসা চাই, আমার সংসারের কর্তাকে চাই। কিন্তু উনি আমার কিছুই হতে পারেনি, হ্যাঁ সে আমার বন্ধু হয়েছে, স্বামী হয়েছে কিন্তু আমি তার ভালোবাসা হতে পারিনি। হ্যাঁ আমার মতো শত শত মেয়েরা ভালোবাসাবিহীন সংসার করছে। কিন্তু আমি পারছি না, সবার মতো হয়ে থাকতে পারছি না। ওনার চোখে যখন অন্যকারো জন্য হাহাকার দেখতাম, আমার আত্মা অব্দি কাঁদত। ওনার সবকিছু জুড়ে অন্য কারো অস্তিত্ব! আমার অস্তিত্ব আমি তৈরি করতে পারিনি। এটা আমার ব্যর্থতা, তাই চেষ্টা করে ছেড়ে দিয়েছি।”

কথাগুলো শেষ হতেই চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো। ইনায়ার কণ্ঠে কোনো অভিযোগের তীব্রতা নেই। নেই আয়াশকে ছোট করার কোনো চেষ্টা। বরং দীর্ঘদিন ধরে নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখা এক ক্লান্ত মানুষের স্বীকারোক্তি। ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্ট হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব কষ্টগুলোর মধ্যে একটি। সেখানে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না, কাউকে বাধ্য করা যায় না, কাউকে শাস্তিও দেওয়া যায় না।শুধু প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের ভেতরটা শূন্য হয়ে যেতে থাকে। ইনায়া সেই শূন্যতা নিয়েই তিনটা বছর কাটিয়েছে। ভালোবাসা পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করেছে। মানুষটার চোখে নিজের জন্য একটুখানি আকুলতা খুঁজেছে। নিজের অস্তিত্বটুকুকে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী করে রাখার কত চেষ্টা করেছে। অথচ প্রতিবারই যেনো তাকে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে।আয়শা বেগম আর আইরিন দুজনই নীরবে শুনলেন সবটা।

ইনায়ার জীবনের এই অধ্যায় তাদের কারোর কাছেই অদেখা নয়। তারা দূর থেকে শোনা কোনো গল্পের বিচার করছে না। নিজেদের চোখের সামনে দেখেছে মেয়েটার চেষ্টা। দেখেছে কিভাবে একটা সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জন্য ইনায়া নিজের অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া, অভিমান সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিল। দেখেছে তার ভালোবাসাও।তাই আজ ইনায়াকে সম্পূর্ণরূপে দোষ দেওয়ার মতো কোনো যুক্তি তাদের কাছে নেই।আবার আয়াশকেও পুরোপুরি ফেলে দেওয়ার মতো শক্তি নেই। একদিকে রক্তের সম্পর্ক, অন্যদিকে একটি মেয়ের দীর্ঘদিনের নীরব যন্ত্রণা। মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়ে। আইরিন তবুও বলল-

“ তবুও আর একটা চেষ্টা করো, ইয়াশের জন্য হলেও করো।”

ইনায়ার দৃষ্টি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে এলো। ইয়াশ। ছোট্ট মানুষটার নাম এলেই বুকের ভেতরটা কেমন বদলে যায় তার। মা হওয়ার পর পৃথিবীটাকে আর আগের মতো করে দেখা যায় না। নিজের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সন্তানের ভবিষ্যৎ। তার হাসি, তার কান্না, তার আগামী, সবকিছুই তখন একজন মায়ের সমস্ত চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। তবুও কি কেবল সন্তানের জন্য একটা ভালোবাসাহীন সম্পর্কে ফিরে যাওয়া যায়? যে সম্পর্কে শরীরের উপস্থিতি থাকে, অথচ হৃদয়টা অন্য কোথাও বন্দী হয়ে থাকে। যেখানে একজন মানুষ ফিরে আসে ঠিকই, অথচ তার ফিরে আসার মাঝেও অন্য কারো স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকে।ইনায়া ক্ষীণ কণ্ঠে বললো-

” চেষ্টা তখনই করা মানায়,যখন চেষ্টা করার মানুষটা সেই চেষ্টার মূল্য দিয়ে থাকে।”

কথাটুকু উচ্চারণ করেই নীরব হয়ে গেলো ইনায়া। তার কণ্ঠে অভিযোগের কোনো উচ্চস্বরে প্রকাশ নেই, নেই কোনো উত্তেজনা। আছে কেবল দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা একরাশ অবসাদ। আইরিন কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে ইনায়ার ম্লান মুখশ্রী পানে তাকিয়ে থেকে ধীর স্বরে প্রশ্ন করে ওঠে-

“ আয়াশ তোমার সঙ্গে কোনোদিন প্রতারণা করেছে?”

“ না!”

“ তোমার অযত্ন করেছে?”

“ না!”

“ তবুও বিচ্ছেদ চাইছো?”

“ জানো আপু, উনি রোজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে৷ ঘুমানোর আগে, ঘুম থেকে উঠে সবসময় ওনার নিঃশ্বাস জুড়ে একটা আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকে। ওনার অনুভূতি, ওনার ভালোবাসা, আক্ষে, দীর্ঘশ্বাস সবকিছু জুড়ে একটাই নাম ‘প্রিয়া’ যে গ্লানিকে তার মস্তিষ্ক, মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি আজও। সে এখনো সেই ভ্রমেই আটকে আছে। উনি দিন শেষে আমার কাছে ফেরে ঠিকই যেটা উনি মেনে নিয়েছে। আমি তার সেই জীবন নই, যে জীবন সে চেয়েছে। আমি তার মেনে নেওয়া জীবন, যা সে চায়নি কখনো।”

শেষের শব্দগুলো যেনো ইনায়ার কণ্ঠনালি পেরিয়ে বেরিয়ে আসার আগেই কোথাও আটকে যাচ্ছিল। কতদিনের জমে থাকা অনুভূতি আজ অতি সামান্য কয়েকটা বাক্যে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করে দিলো। অথচ এই কথাগুলো বলার জন্য কোনোদিনই প্রস্তুত ছিল না সে। কথাটুকু বলেই ইনায়া সেখানে আর বসে রইলো না। বসে থাকার মতো শক্তিও যেনো অবশিষ্ট নেই তার। দুর্বল পায়ে ধীরে ধীরে সরে গেলো সেখান থেকে। প্রতিটা পদক্ষেপে যেনো নিজের বুকের ওপর চেপে বসা অদৃশ্য কোনো ভার বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু ইনায়া জানে না। এতক্ষণ ধরে তার প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা নীরবতার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাস দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আয়াশের কর্ণকুহরে গিয়ে পৌঁছেছে।মানুষটা নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ইনায়ার বলা একট কথাও ভুল নয়। বরং তার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস, প্রতিটি অদৃশ্য আক্ষেপ পর্যন্ত উপলব্ধি করেছে মেয়েটা। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত একই ছাদের নিচে থেকে ইনায়া এমন সব অনুভূতি বুঝে নিয়েছে, যা আয়াশ কখনো মুখ ফুটে বলেনি।অথচ বিনিময়ে আয়াশ কী করেছে?সে কি কখনো উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছে ইনায়ার নীরবতাকে?মেয়েটা যখন একা একা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে, তখন কি সে কোনোদিন ফিরে তাকিয়েছে?করেনি। হয়তো পারেনি। তবে আজও কি সে সেই অতীতের ধ্বংসাবশেষ আঁকড়ে ধরে আছে? না।
আজ আর সে অতীত নামক স্মৃতির গোলকধাঁধায় বন্দী নেই। ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসেছে সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন ভ্রম থেকে। একসময় যে স্মৃতিগুলো তার বর্তমানকে গ্রাস করে রেখেছিল, আজ সেগুলোকে হৃদয়ের কোনো এক নির্জন কোণে তালাবদ্ধ করে রেখেছে সে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস বোধহয় এখানেই।যেদিন সে অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে এসেছে, সেদিনই তার বর্তমান তাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে এমন এক সত্যের, যা সে কোনোদিন উপলব্ধি করেনি। ইনায়ার দীর্ঘশ্বাসগুলোও যে একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গভীর আক্ষেপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

#চলবে