Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-০৯

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-০৯

0
1

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_৯

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

স্তব্ধ দিগন্তের বুকে ক্ষণে ক্ষণে মেঘের গর্জন ধ্বনিত হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টির তীব্রতাও ক্রমশ বেড়েই চলেছে। দুপুরের আকাশজুড়ে যে সূর্যটি এতক্ষণ আপন দীপ্তিতে জ্বলজ্বল করছিল, ঘন মেঘের অন্তরালে সেও যেনো নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। চারিপাশে এখন কেবল ধূসরতার রাজত্ব, আর অবিরাম বর্ষণের একটানা সুর।ইনায়া অপেক্ষমাণ। বৃষ্টি একটু কমলেই ছাতা ছাড়াই বেরিয়ে পড়বে। যদিও বাইরে গিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। এমন প্রবল বর্ষণে রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য, যানবাহনেরও কোনো চিহ্ন নেই। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।

ইদানীং এভাবে বাইরে বেরোতে গেলেই কেমন যেনো অস্বস্তি অনুভব করে ইনায়া। একেই সে অন্তঃসত্ত্বা, তার ওপর ক্যাফেতে এসে কাজ করাটা অনেকেরই বাঁকা দৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য সেসব কথাকে ইনায়া কখনো গুরুত্ব দেয় না। তবুও আজকাল মানুষের দৃষ্টি যখন অনিচ্ছাকৃতভাবে তার স্ফীত উদরের দিকে স্থির হয়ে থাকে, তখন বুকের ভেতরটা কেমন অস্বস্তিতে সংকুচিত হয়ে আসে। ল্যাপটপটাও এখনো কেনা হয়ে ওঠেনি। নিজের বাজেটের মধ্যে উপযুক্ত কিছু পায়নি বলে আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।

হঠাৎ করেই কেউ এসে তার পাশে দাঁড়াল। পাশে দাঁড়ানো মানুষটির মুখশ্রী না দেখেও ইনায়ার অন্তঃস্থল কেমন সিরসির করে উঠল। খুব পরিচিত, খুব আপন এক সুগন্ধ ভেসে এলো তার নাসারন্ধ্রে। মুহূর্তেই চারপাশের সমস্ত শব্দকে ছাপিয়ে সেই পরিচিত অনুভূতিটুকু ইনায়ার ভেতর তোলপাড় সৃষ্টি করল। বুকের বাঁ পাশে চিনচিন করে ব্যথা উঠল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাতটা সেখানে চলে গেল। চোখ তুলে তাকাল না সে। তবুও বুঝে গেছে, তার পাশে কে দাঁড়িয়ে আছে। শ্বাস যেনো ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া দু ফোঁটা অশ্রু নীরবে গাল স্পর্শ করল। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটি কেবল একজন মানুষ নয়, একসময় যার ছায়াতলেই ইনায়া নিজের সমস্ত আশ্রয় নির্মাণ করেছিল।

ইনায়া সামান্য সরে দাঁড়াল। পাশের অবয়বটিও যেনো তার সেই দূরত্ব মেনে নিতে পারল না। আরও কিছুটা নিকটে এসে দাঁড়াল। ইনায়া এবার আরও দূরে সরে গেল। এই সামান্য দূরত্বটুকুও যেনো তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

“ ইনায়া!”

দীর্ঘ তিন মাস পর আয়াশের কণ্ঠে নিজের নামটা শুনে ইনায়া কয়েক মুহূর্তের জন্য শ্বাস নিতেই ভুলে গেল। কম সময় তো নয়, তিনটি বছর। দীর্ঘ তিনটা বছর ধরে প্রতিটি দিন, প্রতিটি প্রহর এই মানুষটিকে ভালোবেসেছে সে। এখনো ভালোবাসে। হয়তো সবকিছু আগের মতো নেই, হয়তো সময় তাদের মধ্যবর্তী অসংখ্য সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে। কিন্তু ভালোবাসা কি এত সহজে বদলায়?

“ ইনায়া প্লিজ,আমার কথা শুনুন।”

ইনায়া আর দাঁড়াল না। এখানে দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি তার অবশিষ্ট নেই। প্রবল বর্ষণকে উপেক্ষা করেই ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল সে। ইনায়াকে এমন তীব্র বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে যেতে দেখে আয়াশ আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। দ্রুত পায়ে তার পিছু নিল। সঙ্গে মাথার ওপর ছাতাটিও মেলে ধরল। এমন অবস্থায় বৃষ্টিতে ভেজা একেবারেই উচিত নয়। মেয়েটার যদি জ্বর আসে, অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন তো দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া তার আর কিছুই করার থাকবে না। তার ওপর ইনায়ার বর্তমান অবস্থাটা এমনিতেই তাকে চিন্তিত করে তুলছে। ইনায়া মাথার ওপর থাকা আশ্রয়টুকু এক ঝটকায় সরিয়ে দিল।

আয়াশ আবারও ছাতাটা তার মাথার ওপর তুলে ধরল।
ইনায়া আরও দ্রুত পা চালাতে লাগল। কীভাবে আয়াশ তার ঠিকানা খুঁজে পেল? সে তো কোনোভাবেই চায়নি এই মানুষটি তার খোঁজ পাক। তাহলে কেন এসেছে? কীসের জন্য এসেছে? চোখের অশ্রু অনবরত ঝরে পড়ছে ইনায়ার। তবে প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে মিশে যাওয়ায় সেই কান্নার কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই। বোঝার উপায় নেই, আকাশ কাঁদছে নাকি মেয়েটি।রাস্তাজুড়ে জমে আছে বৃষ্টির পানি। সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই ইনায়ার। তার সমস্ত অস্তিত্ব যেনো কেবল একটাই উদ্দেশ্য জানে, সামনে এগিয়ে যেতে হবে। পিছনে তাকানো যাবে না। হঠাৎ আয়াশ তার হাতট ধরে ফেলল।ইনায়া তবুও পিছন ফিরে তাকাল না।আয়াশ অনুনয়ের সুরে বলে উঠল-

“ ইনায়া প্লিজ আমার রাগ নিজের ওপর ঝাড়বেন না। আপনি ভিজে গেছেন, এইভাবে থাকলো অসুস্থ হয়ে পরবেন।”

ইনায়া কোনো উত্তর দিল না। নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল। আয়াশও হাত ছাড়ল না। মাথার ওপর ছাতা ধরে রাখার চেষ্টা করেও কোনো লাভ হলো না। দুজনের শরীরই ততক্ষণে বৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিজে একাকার।ইনায়ার নীরবতা আয়াশের বুকের ভেতরটাকে আরও ভারী করে তুলল। সে আবারও কাতর কণ্ঠে বলে উঠল-

“ ইনায়া প্লিজ! আমার দিকে তাকান। আ’ম সরি আমি সত্যি আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি,তবুও আমার নীরবতা আপনাকে একটু একটু করে শেষ করে দিয়েছে। আ’ম রিয়ালি সরি!”

ইনায়ার চোখ থেকে অশ্রুধারা থামল না। বৃষ্টির আড়ালে কান্না লুকিয়ে গেলেও তার শুভ্র মুখশ্রী ততক্ষণে গভীর আবেগে রক্তিম হয়ে উঠেছে। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল সে। শেষ পর্যন্ত আয়াশ হাতটা ছেড়ে দিল। এইভাবে টানাহেঁচড়া করলে ইনায়ার হাতেই ব্যথা লেগে যেতে পারে। হাত মুক্ত হতেই ইনায়া ঝড়ের বেগে সামনে এগিয়ে গেল। পিছনে ফেরার কোনো অবকাশ নেই।
কারণ পিছনে ফিরলেই অতীতের দরজা খুলে যাবে। আর সে আর সেই অতীতের পাতায় ডুব দিতে চায় না। যতই বুকের ভেতরটা ক্ষতবিক্ষত হোক, যতই পুরোনো স্মৃতিগুলো তাকে ভেতর থেকে টেনে ধরুক, তবুও তাকে এগিয়ে যেতেই হবে। আয়াশ ইনায়ার পিছু পিছু হাঁটতে লাগল।

“ রাগ করেছেন? আমায় মা’রুন, অভিমান করুন, যা ইচ্ছে করুন তবুও এইভাবে মুখ ফিরিয়ে থাকবেন না। প্লিজ ইনায়া নিজেকে কেনো কষ্টের দিকে ঠেলছেন? আমার শাস্তি আমায় দিন।”

ইনায়া যেনো কিছুই শুনছে না। বৃষ্টি যেনো তার অশ্রুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে, আকাশও বুঝি ইনায়ার সমস্ত কান্না নিজের বুকের ভেতর ধারণ করে নিতে চাইছে। তার প্রতিটি অশ্রুবিন্দুকে নিজের অসংখ্য বৃষ্টিকণার সঙ্গে মিশিয়ে সমস্ত কষ্ট ধুয়ে মুছে দিতে চাইছে।
কিন্তু ইনায়া থামল না। এতদিনে নিজেকে যে একটু একটু করে শক্ত ধাতব আবরণে আবদ্ধ করেছিল, আয়াশের একটিমাত্র উপস্থিতিতেই সেই আবরণ যেনো নিমিষেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তার আর আয়াশের মুখোমুখি হওয়ার কোনো কারণ নেই। সব পিছুটান পেছনে ফেলে সে এসেছে। এত কষ্টের পর নিজেকে যখন অতীত থেকে মুক্ত করেছে, তখন আবার সেই পিছুটানের দিকে ফিরে তাকাবে না সে।
যতই কষ্ট হোক। যতবারই আয়াশ ডাকুক। ইনায়ার কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। যেনো আয়াশ তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষ। আর ইনায়া ইচ্ছাকৃতভাবেই সেই অপরিচিত মানুষটিকে উপেক্ষা করে নিজের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে।

“এইভাবে আপনি আমাকে এড়াতে পারেন না ইনায়া অনেক কথা জমে আছে। আপনি এসেছেন সঙ্গে আমার শান্তিও নিয়ে এসেছেন। এইভাবে অপরিচিত হবেন না।”

ইনায়া ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্নাকে সংবরণ করার চেষ্টা করল। রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই, কোনো যানবাহন নেই, যার সাহায্যে সে এই মানুষটির কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারে। এমন সময় দূরে একটি অটোরিকশা চোখে পড়ল। ইনায়া ব্যাকুল পায়ে সেদিকেই এগিয়ে গেল। নিজের কান্নাকে কোনোভাবে সামলে নিয়ে চালকের দিকে তাকিয়ে কাতর কণ্ঠে বলে উঠল-

“ কাকা প্লিজ আমাকে শাপলা বিল্ডিং এ নিয়ে চলুন। যত টাকা লাগে নিয়েন, তাও নিয়ে চলুন।”

লোকটি ইনায়ার বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। তাকে নিয়ে যেতে রাজি হলেন। ইনায়া অটোরিকশায় উঠতেই সেটি ধীরে ধীরে ছুটে চলল।
আয়াশ চেয়েও তাকে আটকাতে পারল না। পেছন থেকে শতবার ডাকলেও সেই ডাক ইনায়ার কাছে পৌঁছেও যেনো পৌঁছাল না। বৃষ্টির অবিরাম শব্দের ভেতর আয়াশের কণ্ঠস্বর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে গেল। আয়াশ অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল ইনায়ার চলে যাওয়ার পথের দিকে। পুরো একটি দিন সময় নিয়ে সে ইনায়ার ঠিকানা বের করেছে। কত অনুসন্ধান, কত অপেক্ষা, কতটা পথ পেরিয়ে অবশেষে এই শহরে এসে পৌঁছেছে। কত কষ্টের পর পেয়েছে সেই ঠিকানা।অথচ এতটা পথ পেরিয়ে আসার পরও ইনায়া তাকে একটা বাক্য বলার সুযোগ পর্যন্ত দিল না।
আয়াশ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বৃষ্টির অসংখ্য ধারার আড়ালে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল অটোরিকশাটি। আর তার সঙ্গে যেনো আরও একবার দূরে সরে গেল আয়াশের সমস্ত আশ্রয়।

একাধারে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে ইনায়া। সারা শরীর বেয়ে টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির জল, অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই তার। এতগুলো দিন পর আয়াশকে চোখের সামনে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই অন্তঃকরণের গভীরতম প্রকোষ্ঠে যত্ন করে চাপা দিয়ে রাখা ব্যথাগুলো যেনো পুনরায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নিঃশব্দে জমে থাকা অভিমানগুলো একে একে বুকের দেয়ালে এসে আছড়ে পড়ছে। পুরোনো ক্ষতগুলো যেনো নতুন করে রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে।

“ কেনো এসেছেন আবার? কেনো? সব তো ছেড়ে এসেছি। আপনি এই সংসারে খুশি নন, তাই তো সংসারটা ছেড়েছি৷ সঙ্গে আপনার মায়াও তবুও কেন আবাডও এসেছেন?”

কথাগুলো উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই কান্নার বেগ যেনো আরও বেড়ে গেলো। আজ বুঝি অশ্রু থামার কোনো নামই নেই। নিঃসঙ্গ ঘরটায় তাকে সামলানোর মতো কেউ নেই। শীতলতায় শরীর বারংবার কেঁপে উঠছে, তবুও নিজের প্রতি কোনো খেয়াল নেই তার। হঠাৎ করেই সমস্ত অভিমান, সমস্ত কষ্টকে একপাশে সরিয়ে মাতৃসত্তা জেগে উঠলো ইনায়ার অন্তরে। তার অসতর্কতার মাশুল তো আর একা তাকে দিতে হবে না। তার গাফিলতির ভারে আরেকটি নিষ্পাপ প্রাণ কেনো কষ্ট পাবে?

ইনায়া আর বিলম্ব করল না। দ্রুত ভেজা পোশাক পরিবর্তন করে নিলো। শরীরের প্রতিটি অঙ্গে ক্লান্তির ভার, সামান্য শক্তিটুকুও যেনো অবশিষ্ট নেই। গা ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছে। তবুও নিজের ইচ্ছেমতো কোনো ওষুধ খাওয়ার সাহস করল না সে। চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোনোটিই গ্রহণ করা সমীচীন নয়। কখন কোন ওষুধের কী প্রতিক্রিয়া ঘটে যায়, সেই আশঙ্কায় নিজেকে কম্বলের উষ্ণতায় আচ্ছাদিত করে নীরবে শুয়ে রইল। চোখ দুটো বন্ধ করে রাখলেও অশ্রুধারা থামলো না। চোখের কার্নিশ বেয়ে অবিরাম গড়িয়ে পড়তে লাগলো নোনাজলের ধারা। এতটা যন্ত্রণা হচ্ছে কেনো তার?আয়াশ কেনো এসেছে? তার প্রতি দয়া দেখাতে? না। সে কারও দয়ায় বাঁচতে চায় না। প্রয়োজন নেই তার কোনো করুণার। নিজের ভাঙাচোরা অস্তিত্বটুকু নিয়েই বাঁচতে শিখে গেছে ইনায়া।

—–

অন্যদিকে প্রায় একঘণ্টা ধরে ইনায়ার মেসের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে আয়াশ। জানে, ইনায়া হয়তো আর নিচে আসবে না। তবুও পা সরাতে পারছে না। যদি কোনোভাবে একবার দেখা হয়ে যায়! যদি একবার সেই মুখটির দিকে তাকানোর সুযোগ পায়! দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টিতে ভেজা পোশাকেই দাঁড়িয়ে থাকায় ক্ষণে ক্ষণে হাঁচি এসে উঠছে তার। শরীর শীতলতায় কাঁপছে, অথচ সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। দৃষ্টি কেবল নিবদ্ধ সেই ভবনের প্রবেশপথে। হঠাৎ পকেটের ভেতর থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। আয়াশ ফোনটি বের করে পর্দায় ভেসে থাকা নামটির দিকে তাকাল। আয়শা বেগম।ফোনটি কানে তুলতেই ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এলো।

“ ইনায়াকে পেয়েছো?”

“ হু।”

“ ঠান্ডা লেগেছে কিভাবে? আর ইনায়া কি অবস্থা? ও ভালো আছে?”

সেদিনের পর থেকেই আয়শা বেগম তাকে ‘তুমি’ সম্বোধন করেন। সম্পর্কের এই সামান্য পরিবর্তনটুকুও আয়াশের কাছে মেনে নেওয়া সহজ ছিল না। তবুও মেনে নিয়েছে। অভিমান তো চিরস্থায়ী নয়, সময়ের প্রবাহে একদিন নিশ্চয়ই আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে।আয়াশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীর কণ্ঠে বলল-

“ মা জানো ও অনেক পাল্টে গেছে। কেমন শুকিয়ে গেছে, তবুও পেটটা বড়ো হওয়ার কারণে খুব আদুরে লাগছে।”

ওপাশে আয়শা বেগম কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। ছেলের কণ্ঠের প্রতিটি ভাঙন, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস যেনো তার অদৃশ্য শ্রবণে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

“ এতোদিনে খেয়াল করেছো?”

আয়াশা বেগম শুকনো একটি হাসি দিলেন।

“ ওই যে ব্যর্থ স্বামী দেখে, স্ত্রীর সৌন্দর্য দেখেও অদেখা করেছি।”

দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আয়শা বেগমের বুক চিরে। ছেলের অবস্থাটা তিনি বুঝতে পারছেন। কিন্তু এই অনুশোচনার ভার তো আয়াশকেই বহন করতে হবে। এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী যে মানুষটি, সে আর কেউ নয়, আয়াশ নিজেই।

“ ওর সঙ্গে কথা হয়েছে?”

“ জানো মা,ও একবারের জন্যও আমার দিকে তাকায়নি। কত বার ডাকলাম তবুও উত্তর দিলো না। খুব অভিমান করেছে তাই না? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা, ইনায়া কোনোদিন আমার ডাকে উপেক্ষা করে না।অথচ কতবার ডাকলাম, একবারের জন্যও আমার দিকে তাকালো না।”

কথাগুলো বলতে বলতে আয়াশের কণ্ঠে জমে থাকা অনুতাপ যেনো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। এতদিন যে মানুষটি তার একটিমাত্র ডাকে সাড়া দিত, আজ সেই মানুষটিই তার অস্তিত্বকে উপেক্ষা করেছে। এই সামান্য ঘটনাটুকুই যেনো আয়াশের কাছে তার সমস্ত অপরাধের সবচেয়ে কঠিন শাস্তি।

“ এখন তুমি কোথায়?”

“ মেসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি?”

“ বৃষ্টি হয়েছে ওখানে?”

“ হু।”

“ দু’জনেই ভিজেছো?”

” হু।”

ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো। তারপর আয়শা বেগম দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

“ হোটেলে যাও, নিজেকে ঠিক রাখো। নাহলে যা করতে গিয়েছো সেটা আর করতে হবে না।”

আয়াশ আর কোনো উত্তর দিলো না। ফোনটি ধীরে ধীরে নামিয়ে আবারও চোখ তুললো মেসের উঁচু ভবনটির দিকে।
একইভাবে অপরিচিত মানুষজন আসছে, যাচ্ছে। কারও পদধ্বনি থেমে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের ব্যস্ততায়। অথচ আয়াশের অপেক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটির আসার কোনো নামগন্ধ নেই।তবুও আয়াশ দাঁড়িয়ে রইলো। হয়তো অপেক্ষারও কোনো কোনো প্রান্ত থাকে না। কিছু অপেক্ষা কেবল মানুষকে দাঁড় করিয়ে রাখে, যতক্ষণ না প্রিয় মানুষটির অভিমান একটু হলেও গলে আসে।

#চলবে