#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_১০
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]
সকাল পেরিয়ে গেছে দুপুর। সময়ের স্রোত গড়িয়ে এখন ধরণীর মধ্যগগনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে সূর্য। তপ্ত রৌদ্রের দগদগে আঁচে চারপাশ যেনো পুড়ে খাক হয়ে যাওয়ার উপক্রম। অথচ বিগত দুইটা দিন ইনায়া নিজের মেসের ছোট্ট কক্ষটার গণ্ডি অতিক্রম করেনি। ইচ্ছে করেই করেনি। কারণ জানে, দরজা পেরিয়ে বাইরে পা রাখলেই তাকে আয়াশের মুখোমুখি হতে হবে। আর নিচে সকাল থেকে গভীর রাত অবধি আয়াশ যে অপেক্ষমাণ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে, সেটিও তার অজানা নয়। কিন্তু আজ আর নিজেকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রাখার উপায় নেই। গত দুই দিনে কাজগুলো একটার পর একটা জমে পাহাড়সম হয়ে উঠেছে। তার ওপর আজই ল্যাপটপটা কিনে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইনায়া। নিজের একটা ল্যাপটপ থাকলে অন্তত কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন বাইরে বেরোতে হবে না। সেই একটা মাত্র প্রয়োজনেই আজ নিজের সমস্ত দ্বিধা, অনীহা আর অস্বস্তিকে বুকের গভীরে সমাধিস্থ করে বাইরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলো সে।
মেস থেকে নিচে নামতেই দৃষ্টিপথে এলো পরিচিত সেই অবয়ব। আয়াশ বিল্ডিংয়ের দারোয়ানের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ইনায়াকে দেখতে পাওয়ামাত্রই কথার মাঝখানেই থেমে তার দিকে এগিয়ে এলো সে। ইনায়া একবারও তার দিকে তাকাল না। যেনো মানুষটাকে দেখেইনি এমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। আয়াশও কোনো বাক্যব্যয় করল না। নিঃশব্দ ছায়ার মতো তার পিছু নিলো। কিছুদূর এগিয়ে ইনায়া একটি রিকশা নিয়ে উঠে বসলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আয়াশও আরেকটা রিকশা নিয়ে তার পিছু নিলো। ইনায়া সমস্তটাই নীরবে পর্যবেক্ষণ করছিল। তবুও মুখে কোনো শব্দ ফুটলো না। যেনো দুজনের মাঝখানে জমে থাকা অভিমানই আজ তাদের একমাত্র ভাষা।
অনেকটা পথ পেরিয়ে অবশেষে একটা বড় মার্কেটের সামনে এসে রিকশা থামাল ইনায়া। ভাড়া মিটিয়ে কোনোদিকে না তাকিয়েই সোজা ভেতরে প্রবেশ করল। আয়াশও যথারীতি তার পিছু নিলো। ইনায়ার পরনের জুতা জোড়ার অবস্থা ইতোমধ্যেই শোচনীয়। পা ফেলার প্রতিটা মুহূর্তেই অস্বস্তি হচ্ছে। তবুও সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে সে সোজা একটা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের দোকানে গিয়ে দাঁড়াল। আগেই পছন্দ করে রাখা ল্যাপটপটা আবারও ভালোভাবে দেখে নিলো। শেষ পর্যন্ত ষাট হাজার টাকার ল্যাপটপটিই কিনে ফেলল সে। এর আগে আয়াশ যে ল্যাপটপটা কিনে দিয়েছিল, সেটির মূল্য এর চেয়েও অনেক বেশি ছিল। আয়াশ সব দেখল। শুধু দাঁড়িয়ে রইল। কোনো প্রশ্ন করল না, কোনো মন্তব্যও নয়। কেনাকাটা শেষ হতেই ইনায়া আবার মেসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। আয়াশও নিঃশব্দ পদচারণায় তার পিছু নিলো। দুজনের মাঝখানে বিস্তৃত এক দীর্ঘ নৈঃশব্দ্য।
হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ একসময় ইনায়ার জুতা জোড়ার একটি ছিঁড়ে গেল। মাঝরাস্তায় এমন বিপত্তি ঘটলেও সে দাঁড়াল না। যেনো থেমে যাওয়াই বিপদকে আমন্ত্রণ জানাবে। দাঁড়ালেই কথা বলতে হবে, আর কোনো কথাই সে বলতে চায় না। আয়াশ নীরবে সমস্তটা লক্ষ করল। মেয়েটা অন্তত একজোড়া নতুন জুতা কিনে নিতে পারত। এখন সে নিজের হাতে কিনে দিলেও ইনায়া যে তা গ্রহণ করবে না, সেটাও ভালো করেই জানে। আরও কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর হঠাৎ তীব্র ব্যথায় ইনায়ার মুখমণ্ডল কুঁচকে গেল। পায়ের পাতায় যেনো আচমকা আগুনের শিখা ছড়িয়ে পড়েছে। ছেঁড়া জুতোর ফাঁক গলে ধারালো কোনো কিছুর আঘাত লেগেছে। মুহূর্তের মধ্যেই আয়াশ দ্রুত পায়ে তার কাছে ছুটে এলো।
“ ইসস সাবধানে হাঁটতে পারেন না? দেখি কোথায় ব্যথা পেয়েছেন।”
কথা শেষ করেই আয়াশ নিচে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ইনায়ার পায়ের দিকে হাত বাড়াতেই মেয়েটা দ্রুত সরে দাঁড়াল।আয়াশ একনজরে তাকাল ইনায়ার গম্ভীর মুখশ্রীর দিকে। সেই কঠিন মুখাবয়বের অন্তরালে অসংখ্য দ্বিধা, অভিমান আর অনুচ্চারিত প্রশ্ন যেনো স্তরে স্তরে জমে আছে। সে আর কিছু বলল না। নীরবে উঠে দাঁড়িয়ে ইনায়ার হাত ধরে তাকে সামনের একটা ছোট্ট চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসিয়ে দিল। ইনায়া নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও আয়াশ হাত ছাড়ল না। তাকে বসিয়ে দিয়ে আবারও নিচে হাঁটু গেড়ে বসল সে।
পায়ের জুতাগুলো খুলতেই দৃশ্যটা স্পষ্ট হলো। ভাঙা কাঁচের একটা ক্ষুদ্র টুকরো পায়ের পাতার চামড়া ভেদ করে গভীরে গেঁথে রয়েছে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে র’ক্তের ক্ষীণ ধারা বেরিয়ে আসছে। আয়াশের চোখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল।
একবার ইনায়ার মুখের দিকে তাকাল সে। মেয়েটা মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। যেনো এই মুহূর্তটুকুতেও আয়াশের দৃষ্টি নিজের ওপর পড়তে দিতে নারাজ। আয়াশ জানে, এখান থেকে সে একবার উঠে দাঁড়ালেই ইনায়া আবার চলে যাওয়ার চেষ্টা করবে। তাই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে বিনীত স্বরে জিজ্ঞেস করল-
“ এই যে ভাই, যদি দয়া করে ওই সামনের দোকান থেকে কিছু ব্যান্ডেজ এনে দিতেন খুব উপকার হতো।”
লোকটা পান চিবাতে চিবাতে প্রথমে ইনায়ার দিকে, তারপর আয়াশের দিকে তাকাল। তাদের মধ্যকার নীরবতা আর অদৃশ্য দূরত্ব দেখে হয়তো নিজের মতো করেই কিছু একটা অনুমান করে নিল।
“ বউ রাগ করছেনি ভাই?”
আয়াশ এবার ইনায়ার পানে তাকাল। মেয়েটার মুখ তখনও বিপরীত দিকে ফেরানো।
“ হুম, খুব রাগ করেছে। একটু এনে দিন না ভাই।”
লোকটা মৃদু হেসে আয়াশের দেওয়া টাকা নিয়ে সামনের দোকানের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যান্ডেজ, তুলা আর স্যাভলন এনে তার হাতে তুলে দিল। এই সামান্য সময়ের মধ্যেই ইনায়া বহুবার উঠে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই আয়াশ তার পায়ের কাছে হাত রেখে তাকে থামিয়েছে। যেনো আজ অন্তত এই ক্ষতটুকুর দায়িত্ব সে কোনোভাবেই অন্য কারও হাতে তুলে দেবে না।
“ পা ছাড়ুন, আমারটা আমি দেখে নিবো।”
অতি গম্ভীর স্বরে কথাটি বলল ইনায়া। দৃষ্টি তখনও অন্যদিকে নিবদ্ধ। আয়াশ শুনেও না শোনার ভান করল। যেনো কথাটা তার কর্ণকুহর অবধি পৌঁছায়নি। অত্যন্ত যত্নে তুলার ওপর সামান্য স্যাভলন নিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানটি পরিষ্কার করতে লাগল। প্রতিটা স্পর্শে ছিল অসীম সতর্কতা। মাঝে মাঝে ক্ষতস্থানের দিকে আলতো করে ফুঁ দিয়ে ব্যথার তীব্রতা কিছুটা প্রশমিত করার চেষ্টা করছিল। ইনায়া নিঃশব্দে বসে রইল। আর আয়াশ, সমস্ত অভিমান ও দূরত্বের ঊর্ধ্বে উঠে, তার ক্ষতটুকু সারিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় মগ্ন হয়ে ধীর স্বরে বলে উঠল-
“ যা পরলে নিজেই কষ্ট পান, সেটা পরার দরকার কি?”
বাক্যটুকু শেষ করতে করতেই অতি যত্নে ইনায়ার পায়ের ক্ষতস্থানটিতে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিতে থাকলো আয়াশ। তার আঙুলের প্রতিটি স্পর্শে ছিলো অদ্ভুত এক সাবধানতা, যেন সামান্য অসতর্কতাতেও মেয়েটার কষ্ট আরেকটু বেড়ে যেতে পারে। অথচ যার পায়ে ব্যান্ডেজ লাগছে, সেই ইনায়ার মুখশ্রীতে কোনো প্রতিক্রিয়ার লেশমাত্র নেই। নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিজের পায়ের দিকেই। অন্তরালে ঠিক কীসের তোলপাড় চলছে, তা অনুমান করাও যেন দুঃসাধ্য।
আয়াশ ক্ষতস্থানটুকু সুন্দরভাবে ঢেকে দিলো। ইনায়া কয়েকবার নিজের পা সরিয়ে নিতে চাইলেও আয়াশ ছাড়লো না। চারপাশের মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি তখন তাদের দুজনকে ঘিরে রেখেছে। জনসমুদ্রের মাঝখানে এমন দৃশ্য সত্যিই বিরল। কোনো পুরুষ মানুষের ভরা রাস্তায় এভাবে কারও পা নিজের হাতের ওপর রেখে এতটা যত্নে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে, সেই দৃশ্য সহজে চোখ এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়।
শেষমেশ ইনায়া নিজেই পা সরিয়ে নিলো। দাঁড়াতেই ব্যথার তীব্রতা যেন নতুন করে জানান দিলো নিজের অস্তিত্ব। এমনিতেই পায়ের পাতায় পানি জমে আছে, তার ওপর আকস্মিক আঘাত। প্রতিটা পদক্ষেপ যেন তাকে নিজের দুর্বলতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। তবুও থামলো না সে।
উঠে দাঁড়িয়ে আয়াশের দিকে একবারও না তাকিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে শুরু করলো। এর আগেও বহুবার আয়াশ তার পায়ে এভাবেই ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। অথচ আজকের দৃশ্যটির সঙ্গে অতীতের কোনো মিল নেই। আগে ইনায়া এই যত্নকে ভালোবাসা বলে ভুল করেছিল। ভেবেছিল, এই মানুষটার নির্লিপ্ততার আড়ালেও হয়তো তার জন্য কোনো কোমল অনুভূতি লুকিয়ে আছে। পরবর্তীতে বুঝেছে, কিছু কিছু যত্ন ভালোবাসার নাম বহন করে না, তবুও তার উষ্ণতা সত্যি হয়।
আয়াশ কোনোদিন তার সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলেনি। এমন কোনো আচরণও করেনি, যা ইনায়ার হৃদয়ে সরাসরি আঘাত হানতে পারে। তবুও মানুষের শরীরের ক্ষত যতটা না যন্ত্রণা দেয়, তার চেয়ে বহুগুণ গভীর হয় মনের ক্ষত।
শরীরের ক্ষত একদিন শুকিয়ে যায়। চামড়ার ওপরের দাগও একসময় ম্লান হয়ে আসে। কিন্তু মনের ভেতরে জন্ম নেওয়া কিছু ক্ষত কোনো ঋতুর পরিবর্তনেই শুকোয় না। তারা নীরব থাকে, অথচ প্রতিনিয়ত অন্তঃস্থলে অদৃশ্য রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে যায়। ইনায়াকে একা যেতে দেখে আয়াশও ধীর পায়ে তার পিছু নিলো। কিছুদূর যাওয়ার পর শান্ত অথচ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠলো-
“ এইভাবে হাঁটা ঠিক না ইনায়া, আপনার আরও কষ্ট বাড়বে।”
ইনায়ার পদক্ষেপ থামলো না। কেবল ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠলো।
“ এতোদিন যেহেতু নীরবে সব কষ্ট সহ্য করে নিতে পেরেছি, এতোটুকু কোনো ব্যাপার না। এই কষ্ট তো ওই কষ্টের এক চিমটিও না।”
কথাটুকু বাতাসে মিলিয়ে যেতেই আয়াশের পদক্ষেপ থমকে গেলো। আয়াশ কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থেকে বললো-
“ দরকার কি কষ্ট সহ্য করার? সহ্য করতে হবে না।”
ইনায়া এবার থামলো। মুখ তুলে তাকালো না, শুধু মৃদু স্বরে বললো-
“ আমাদের মত অনাথদের সব সহ্য করেই বাঁচতে হয়। সবার ভাগ্য এক নয়, যে চাইলেই সবকিছু পাওয়া যায়।”
আয়াশের বুকের কোথাও যেন কথাগুলো এসে থেমে গেলো। এই মেয়েটা এখনো নিজেকে অনাথ ভাবে এতগুলো মানুষ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও?কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বললো-
“ এখন তো অনাথ নন আপনি, বাবা-মা, আপু সবাই আছি। আমিও আছি।”
ইনায়া থেমে গেলো। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে আয়াশের পানে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে ছিলো এমন এক তাচ্ছিল্য, যার আড়ালে লুকিয়ে ছিলো বহুদিনের জমাট অভিমান। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো ক্ষীণ অথচ বিষণ্ণ এক হাসি।তারপর আয়াশের চোখের দিকে তাকিয়েই বলে উঠলো-
“ সত্যি আপনি ছিলেন? কই,আমি তো দায়িত্বশীল স্বামী ছাড়া, আমার নামক মানুষকে দেখতে পেলাম না?”
কথাটা শুনে আয়াশ নির্লিপ্ত রইলো। কিন্তু তার চোখের গভীরতা বদলে গেলো। ইনায়া জানে না, তার এই একটা বাক্য কতটা নিঃশব্দে আঘাত করলো মানুষটাকে। আয়াশ তাকে ভালোবাসতে পারেনি, হয়তো আজও সেই অনুভূতির নাম তার কাছে অচেনা। কিন্তু ইনায়াকে সে কখনো কেবল দায়িত্ব বলে ভাবেনি। তার যত্নের প্রতিটি মুহূর্তে ছিলো এক অদৃশ্য টান, যার নাম সে নিজেও কোনোদিন খুঁজে দেখেনি।
হয়তো শুরুতে সত্যিই দায়িত্ব ছিলো। কিন্তু সময় কি কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে? দিনের পর দিন পাশে থাকতে থাকতে, অজান্তেই কিছু সম্পর্ক দায়িত্বের সীমানা পেরিয়ে যায়। কোনো ঘোষণা ছাড়াই, কোনো স্বীকারোক্তি ছাড়াই তারা মনের এমন এক কোণে গিয়ে বসে, যেখান থেকে তাদের সরিয়ে ফেলা আর সহজ থাকে না। আয়াশ ধীরে ধীরে ইনায়ার দিকে এগিয়ে এলো।
“ আপনি একটা কথা ভুল বুঝেছেন, ইনায়া।”
ইনায়ার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেলো।
“ কোন কথা?”
আয়াশ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে খুব ধীর কণ্ঠে বললো-
“ আপনাকে আগলে রাখাটা আমার দায়িত্ব ছিলো না। দায়িত্ব হলে মানুষ হিসাব করে যত্ন নেয়। আপনার ক্ষেত্রে আমি কখনো হিসাব করিনি।”
ইনায়ার চোখের পাতা কেঁপে উঠলো। আয়াশ আবার বললো-
“ আপনি হয়তো আমার ভালোবাসা পাননি, কিন্তু আমার অবহেলাও পাননি। আর এই দুটো জিনিস এক নয়।”
ইনায়া নির্বাক হয়ে রইলো। মনের গহিনে কোথাও যেন বহুদিনের জমে থাকা কোনো প্রশ্ন নিঃশব্দে নড়ে উঠলো।
আয়াশ তার দিকে তাকিয়েই বললো-
“ সব অনুভূতির নাম ভালোবাসা হয় না, ইনায়া। কিছু অনুভূতি মানুষ বুঝতে বুঝতেই হারিয়ে ফেলে। আর কিছু অনুভূতি বুঝতে অনেক দেরি হয়।”
ইনায়ার চোখের কোণে চিকচিক করে উঠলো জল।সে মুখ ফিরিয়ে নিলো। কারণ কিছু কথা চোখে জল এনে দেয়, আবার কিছু কথা সেই জল লুকিয়ে রাখতেও শেখায়।
আয়াশ আর কিছু বললো না। শুধু ধীর পায়ে তার পাশে এসে হাঁটতে লাগলো। ইনায়া খুঁড়িয়ে হাঁটছে, আর আয়াশ তার গতির সঙ্গে নিজের পদক্ষেপ মিলিয়ে নিয়েছে।
কেউ কাউকে ছুঁয়ে নেই। কেউ কোনো প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে না।
তবুও সেই মুহূর্তে পাশাপাশি হাঁটা দুটো মানুষের মাঝখানে যে নীরবতা জন্ম নিলো, তার ভেতরেই হয়তো কোনো এক অনুচ্চারিত সম্পর্ক ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে শুরু করেছে।
—-
“ পরশু থেকে একটা ছেলে মেসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওইটা কে? না মানে সকালে যেতেও দেখি, দুপুরেও দেখি আবার রাতেও দেখি।”
নাওমি কথাটুকু বলে উঠতেই রাতের খাবারের মুহূর্তের জন্য যেন কৌতূহলের আবহ নেমে এলো। সবাই তখন নিজ নিজ খাবারে ব্যস্ত। আচমকা উত্থাপিত এই প্রসঙ্গে ইনায়া নিশ্চুপই রইল। মুখের সামনে থাকা খাবারের প্রতিই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখল সে, যেন কথাটুকু তার কর্ণকুহর পর্যন্ত পৌঁছায়নি। মেহরিন গ্লাসে পানি তুলে এক ঢোক পান করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“ জানি না তো, আমিও তিনদিন ধরে দেখছি। হয়তো কারো প্রেমিক হতে পারে।”
“ যারই প্রেমিক হোক, বোধহয় গার্লফ্রেন্ড রাগ করেছে৷ তাই রাগ ভাঙানোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকে৷ হাউ কিউট ভাই।ছেলেটাও দেখতে দারুন।”
নাওমির কথাগুলো যেন আচমকাই ইনায়ার গলার কাছে এসে আটকে গেল। খাওয়ার মাঝখানেই কেশে উঠল সে। চোখেমুখে অস্বস্তির ক্ষীণ ছাপ ফুটে উঠলেও দ্রুতই তা আড়াল করে ফেলল। এইখানের কেউ জানে না সেই মানুষটার পরিচয়। জানে না তার স্বামী কে, কী তার নাম। ইনায়া নিজেও কখনো সে প্রসঙ্গ উত্থাপন করেনি। অবশ্য কেউ তাকে সেভাবে প্রশ্নও করেনি। হয়তো তার নীরবতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনুচ্চারিত কষ্টটুকু আঁচ করতে পেরে সবাই সচেতনভাবেই বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।কিন্তু আজকের এই কথোপকথন যেন তার দীর্ঘদিনের নিস্তব্ধতার ওপর হঠাৎ করেই একটি পাথর নিক্ষেপ করল।ইনায়া আর কোনো কথা বাড়াল না। দ্রুত খাবার শেষ করে উঠে পড়ল। বিল্ডিংয়ের বাইরে এভাবে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার কোনো অর্থ সে বুঝতে চায় না। বুঝতে চাইলেও হয়তো পারবে না। নিজের মনটাকেই যেখানে সে এতদিন ধরে বুঝে উঠতে পারেনি, সেখানে অন্য কারও অপেক্ষার অর্থ খুঁজে বের করার অবকাশ কোথায়?
পায়ের ব্যথাটাও আজ যেন আগের তুলনায় খানিকটা বেড়েছে। ঘরে ফিরে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিতেই সমস্ত অবসন্নতা একসঙ্গে এসে তাকে গ্রাস করল। ক্লান্ত দেহটুকু শয্যার ওপর স্থির হয়ে রইল। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। ঠিক তখনই নিস্তব্ধ ঘরের বুক চিরে ফোনের নোটিফিকেশনের ক্ষীণ শব্দ ভেসে এলো। ইনায়া অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনটা হাতে তুলে নিল। পর্দায় ভেসে থাকা পরিচিত নম্বরটি দেখেই বুকের গভীরে অদৃশ্য কোনো অনুভূতি যেন নিঃশব্দে নড়ে উঠল। বার্তাটি খুলতেই চোখে পড়ল,
“ বেশি ব্যথা করে আমাকে জানাবেন, শুধু শুধু আমার আর আপনার মধ্যকার বিষয়ের জন্য নিজেকে কষ্ট দিবেন না।”
ইনায়া কোনো উত্তর দিল না। কেবল স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। কত অদ্ভুত এই মানুষটা! দূরে থেকেও তার প্রতিটা কষ্টের হিসাব রাখে। অথচ যে মানুষটার উপস্থিতিই একসময় তার সমস্ত পৃথিবী ছিল, আজ সেই মানুষটার একটি বার্তার উত্তর দেওয়ার মতো সামান্য ইচ্ছেটুকুও তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই।কিছুক্ষণ পর আবারও ফোনের পর্দায় নতুন একটি বার্তা জ্বলে উঠল।
“ আমরা কি কথা বলতে পারি? একটু সময় কি দেওয়া যায় না?”
ইনায়ার দৃষ্টি এবারও স্থির রইল। ঠোঁট দুটি সামান্য কেঁপে উঠলেও কোনো শব্দ বের হলো না। উত্তর দেওয়ার মতো অসংখ্য কথা তার মনের গভীরে জমে আছে, অথচ সেই কথাগুলোই যেন আজ তার কণ্ঠনালীর কাছে এসে পাথর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত ফোনটি পাশে রেখে দিল সে। আর দেখতে ইচ্ছে হলো না।
এদিকে কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে আয়াশও আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার অর্থ খুঁজে পেল না। ধীরে ধীরে হোটেলের উদ্দেশ্যে ফিরে গেল সে। রাত অনেকটাই গভীর হয়ে এসেছে। অফিস থেকে সাময়িক সময়ের জন্য ছুটি নিয়েছে সে। তবুও ছুটির এই দিনগুলো যেন বিশ্রামের পরিবর্তে তার কাছে অনন্ত প্রতীক্ষার প্রহর হয়ে উঠেছে। বাড়িতে ফোন করতেই ওপাশ থেকে আয়াশা বেগমের কণ্ঠ ভেসে এলো-
“ খাবার খেয়েছো?”
“ না, হোটেলে গিয়ে খাবো। তোমরা?”
“ খেলাম, ইনায়ার সঙ্গে কথা হয়েছে।”
আয়াশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটাকে আর কতক্ষণ আটকে রাখা যায়? শেষ পর্যন্ত ভারী কণ্ঠে বলে উঠল-
“ না, আমার দিকে তাকায় না অব্দি।”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে রইল। তারপর আয়াশা বেগম ধীর, অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন-
“ না বলতে চাইলে ওকে জোর করবে না।তোমার নীরব আঘাত গুলো ওকে একটু একটু করে শেষ করেছে। তাই এই ঘা শুঁকানোর নয়।”
আয়াশ কোনো উত্তর দিল না। তার কাছে সত্যিই কি কোনো উত্তর আছে? সে কী করবে? কোন ভাষায় নিজের অপরাধের ব্যাখ্যা দেবে? কীভাবে সেই মানুষটিকে বোঝাবে, যার হৃদয়ের ভেতর নিজের হাতেই এতগুলো ক্ষত তৈরি করেছে, যে সে এখন অনুতপ্ত? আয়াশের মতো দুর্ভাগা বোধহয় সত্যিই কেউ নেই। এই সময়টাতে তার ইনায়ার পাশে থাকার কথা ছিল। প্রতিটি মুহূর্তে তার যত্ন নেওয়ার কথা ছিল। অথচ বাস্তবতার নির্মম পরিহাসে আজ সে বহুদূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার ইচ্ছে করে, একবার শুধু ইনায়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে। একবার তার অনাগত সন্তানের অস্তিত্ব অনুভব করতে। সেই ছোট্ট প্রাণটার স্পন্দনের সঙ্গে নিজের সমস্ত অপরাধবোধকে মিলিয়ে দিতে। কিন্তু ইনায়া তো তাকে সেই অধিকারটুকুও দেয়নি। হয়তো দেওয়ার মতো অবস্থায়ও নেই। আয়াশের বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে এলো।
“ মা, আমি কি ওদের আর ছুঁতে পারবো না?”
আয়াশা বেগমের কণ্ঠে এবার কোনো কোমলতা নেই, আছে বাস্তবতার কঠিন স্বর।
“ ইনায়া চাইলে পারবে, এই জটিলতা তুমি সৃষ্টি করেছো। তাই এর ভোগান্তি তোমাকেই ভুগতে হবে।”
আয়াশ এবারও নীরব রইল। আয়াশা বেগম নিজেও কখনো কল্পনা করেননি, নিজের ছেলে আর পুত্রবধূর মধ্যে এমন এক দুর্ভেদ্য দূরত্ব তৈরি হবে। এই সময়টাতে তো তাদের সবাইকে মিলে ইনায়াকে নিজেদের স্নেহ, যত্ন আর ভালোবাসায় আগলে রাখার কথা ছিল। অনাগত শিশুটাকে ঘিরে পুরো পরিবারে আনন্দের আবহ থাকার কথা ছিল।
অথচ ভাগ্যের নির্মমতায় সেই আনন্দের মাঝেই জমে উঠেছে এক দীর্ঘ অভিমান।আর সেই অভিমানের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে তারই ছেলে।আয়াশা বেগম কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বললেন-
“ যা করবে ভেবে করবে, আশা করি প্রতিবারের মতো ওর আর হৃদয় ভাঙনের কারণ হবে না নতুন করে। হোটেলে যাও, আর খাবার খাও।”
আয়াশ এবার ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলল। মায়ের সঙ্গে কথোপকথনের ইতি টেনে ফোনটা নামিয়ে রাখল সে। তারপর ক্লান্ত পদক্ষেপে হোটেলের দিকে ফিরে গেল।
কতদিনে এই মান অভিমানের পর্বত গলবে, কতদিনে ইনায়ার জমে থাকা অভিমান তার হৃদয়ের দরজা থেকে সরে দাঁড়াবে, কিংবা আদৌ কখনো সেই বন্ধ দরজাটা তার জন্য খুলবে কি না, তার উত্তর আয়াশের নিজের কাছেও অজানা। শুধু এটুকুই জানে, অপেক্ষা এখন তার নিয়তি।
আর সেই অপেক্ষার প্রতিটা প্রহরে নিজের করা ভুলগুলোর ভার তাকে একাই বহন করতে হবে।
#চলবে

