#গোধূলি_লগ্নে_তুৃমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_১২
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]
ক্রমশই সময়ের কাঁটা এগিয়ে চলেছে আপন গতিতে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয়াশের শরীরেও জ্বরের তীব্রতা বাড়তে শুরু করেছে। নিস্তব্ধ কক্ষটাতে এই মুহূর্তে সে ব্যতীত আর কেউ নেই। শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে, বুকের ভেতরটা কেমন অদৃশ্য ভারে চেপে আছে। আয়াশ পিটপিট করে চোখ মেলে ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অন্ধকারে ডুবে থাকা ছাদের দিকে। নিজের মধ্যে সে নেই বললেই চলে। জ্বরের ঘোরে চেতনা বহু আগেই তার সীমানা হারিয়েছে। কোনো রকমে চোখের পাতাদুটো খুলে রাখার ব্যর্থ প্রয়াসটুকুই যেন অবশিষ্ট।
তার হাতের মুঠোয় শক্ত করে পেঁচানো একখানা ওড়না। সেই ওড়নাটাকেই আঁকড়ে ধরে বারবার কারো সান্নিধ্যে পৌঁছানোর ব্যর্থ প্রয়াস করছে আয়াশ। অথচ সম্মুখে থাকা অবয়বটা প্রতিবারের মতোই কেমন ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে। আয়াশ দুর্বল হাত বাড়িয়ে সেই ছায়াটাকে থামাতে চায়, অথচ তার আঙুলের নাগাল ছোঁয়ার আগেই অবয়বটা আরও দূরে সরে যায়। জ্বরের ঘোরে সেই আবছা ছায়ার দিকে তাকিয়েই আয়াশ কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে-
“ প..প্লিজ য..যাবেন না ইনায়া। অ..অনেক ক..কষ্টের প..পর আ..আপনাকে পেয়েছি। আর হারানোর মতো ক..ক্ষমতা নেই।”
অথচ সেই ছায়া তার কোনো আকুতিই শুনলো না। ক্রমশ বাতাসের সঙ্গে মিশে যেতে লাগলো। আয়াশ পাগলের মতো হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগলো।
আয়াশ বরাবরই নীরব প্রকৃতির মানুষ। স্বল্পভাষী, অনুভূতিগুলো নিজের অন্তরালেই গোপন রাখতে অভ্যস্ত। ব্যথা পেলেও সহজে অশ্রু ঝরতো না তার চোখে। অথচ প্রিয়ার প্রতি অনুভূতিটা সে নিজের অজান্তেই দিনের পর দিন, তিলে তিলে নিজের ভেতর লালন করেছিল। কোনোদিন মুখ ফুটে বলার সাহস হয়নি। সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মনের কথাগুলো জানানোর সুযোগটুকুও হয়ে ওঠেনি। তার আগেই তাদের ডিপার্টমেন্টের মাহমুদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে প্রিয়া। সেই মুহূর্ত থেকেই আয়াশ নিজের অনুভূতিগুলোকে থামিয়ে দিয়েছিল। তার কাছে ভালোবাসা মানেই প্রিয় মানুষটাকে নিজের করে পাওয়া নয়। প্রিয়ার মুখে হাসি থাকলেই তার ভালো লাগতো। প্রিয়া ভালো থাকলেই সে নিজের ভালো থাকাকে খুঁজে নিতো। কিন্তু মাহমুদের চরিত্র খুব একটা ভালো ছিলো না। একাধিক মেয়ের সঙ্গে তার ঘ’নিষ্ঠতার কথা আয়াশ সহ সবাই জানতো। তবুও প্রিয়া তার জীবনে আসার পর মাহমুদের আচরণে পরিবর্তন দেখে আয়াশ মনে করেছিল, হয়তো সত্যিই মানুষটা বদলে গেছে। হয়তো প্রিয়ার ভালোবাসা তাকে নতুন করে মানুষ করেছে।
অথচ সেই বিশ্বাসই পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিল প্রিয়া এবং আয়াশের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ভুল ধারণা।
মাহমুদের উদ্দেশ্য ছিল অসৎ। প্রিয়াকে ভো*গ করার জন্যই এতো নাটক, এতো ভালোবাসা ছিলো। প্রিয়ার সরল বিশ্বাসকে সে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছিল। সম্পর্ক যত গভীর হবে, প্রিয়াকে তত সহজে নিজের ইচ্ছার কাছে নত করা যাবে, এমনই ছিল তার কুৎসিত পরিকল্পনা। কিন্তু সত্যিটা জানতে পেরে প্রিয়া সকলের সামনে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেই প্রতিবাদই যেন মাহমুদের নৃশংসতার দ্বার খুলে দেয়। সেই রাতেই প্রিয়ার জীবনে নেমে আসে এক ভয়াবহ অধ্যায়। মাহমুদ এবং তার বন্ধুরা প্রিয়া্ে তুলে নিয়ে যায়, তারপর নির্মম ধ*** শিকার হয় প্রিয়া। পরে তাকে ওমন নির্মম অবস্থায় ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরাও তার জীবন নিয়ে আশাবাদী হতে পারেননি।
আয়াশ যেন সেই সময় নিজের অস্তিত্বটাই হারিয়ে ফেলেছিল। চোখের সামনে প্রিয়ার নিস্তেজ মুখশ্রী কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না সে। যে মেয়েটাকে এতদিন নীরবে ভালোবেসেছে, যার সুখের জন্য নিজের সমস্ত অনুভূতিকে বিসর্জন দিয়েছে, সেই মানুষটাকেই এমন অসহায় অবস্থায় দেখতে হবে, এ বাস্তবতা তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। বাচ্চাদের মতো কেঁদেছিলো সে।
সেই সময়ই আয়াশ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রিয়াকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী করে সারাজীবনের জন্য আগলে রাখবে। সমাজের কটু দৃষ্টি, মানুষের নির্মম বিচার, কোনো কিছুর কাছেই তাকে আর একা হতে দেবে না। অথচ নিয়তি তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। চোখের সামনেই প্রিয়া ধীরে ধীরে জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেল। একসময় পৃথিবীর সমস্ত মায়া ছেড়ে নিঃশব্দে বিদায় নিলো মেয়েটা।
আয়াশ কাউকেই ছাড়েনি। একে একে প্রত্যেক অপরাধীকে আইনের আওতায় এনেছে। তাদের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করেছে। কেউ তার চোখ এড়িয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পরও আয়াশের ভেতরের শূন্যতাটুকু আর পূর্ণ হয়নি। বরং সেদিনের পর থেকেই যেন এই পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্কটা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসতে লাগলো। অন্ধকারের এক অতল গহ্বরে ডুবে গিয়েছিল সে। সেখান থেকে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সহজ ছিল না। নিজের ভেতরের যন্ত্রণা সামলাতে গিয়ে বহুবার সে নিজেকে বিপন্ন করে ফেলেছিল। প্রতিবারই তাকে আপনজনেরা আগলে রেখেছে, ফিরিয়ে এনেছে জীবনের দিকে। অবশেষে আয়াশের বাবা জুয়েল সাহেব ছেলেকে কাজের মধ্যে ব্যস্ত করে দিলেন। ধীরে ধীরে আয়াশ স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরতে শুরু করলো। তবুও অতীতের ছায়া তার পিছু ছাড়লো না। তাকে সম্পূর্ণভাবে নতুন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার আশায় একসময় তার বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
আয়াশ কখনোই বিয়েতে জড়াতে চায়নি। কারণ সে জানতো, নিজের ভেতরে যখন ভালোবাসার সমস্ত দরজা বন্ধ, তখন অন্য একজন মানুষকে জীবনে এনে তার প্রতি ন্যায় করা সম্ভব নয়। সে ভালোবাসতে পারবে না, স্বাভাবিক দাম্পত্যের উষ্ণতা দিতে পারবে না। অকারণে আরেকটা জীবন তার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে কষ্ট পাবে, এই আশঙ্কাই তাকে আরও পিছু হটিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তার আপত্তি কেউ শুনলো না। একপ্রকার বাধ্য হয়েই ইনায়ার সঙ্গে তার বিয়ে হলো। বিয়ে হলো। সময়ও গড়াতে লাগলো। ধীরে ধীরে ইনায়ার সঙ্গে আয়াশের বন্ধুত্ব তৈরি হলো। সম্পর্কের পরিধি সেই বন্ধুত্বের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ রইলো। ইনায়া যতবার নিঃশব্দে তার কাছে এগিয়ে এসেছে, আয়াশ ততবার নিজের অজান্তেই দূরে সরে গেছে। ইনায়ার ভালোবাসা সে দেখেছে, অনুভবও করেছে, অথচ প্রতিবারই সেই অনুভূতিকে উপেক্ষা করেছে। কারণ আয়াশ ভালোবাসতে ভয় পেতো। ভয় পেতো, আবার যদি কাউকে নিজের সমস্তটুকু দিয়ে ভালোবাসে, তবে কোনো এক অদৃশ্য নিয়তির নির্মম আঘাতে তাকেও হারাতে হবে।
প্রিয়াকে হারানোর পর তার কাছে ভালোবাসা আর কোনো সুন্দর অনুভূতির নাম ছিল না। ভালোবাসা মানেই হয়ে উঠেছিল হারানোর আতঙ্ক, অপেক্ষার যন্ত্রণা আর বুকের ভেতর অবিরাম রক্তক্ষরণ। তাই দ্বিতীয়বার কাউকে ভালোবাসার সাহস সে আর অর্জন করতে পারেনি।
অথচ তার সেই ভয়, সেই দ্বিধা, সেই ভালোবাসতে না পারার অক্ষমতাই ধীরে ধীরে ইনায়া আর তার মাঝখানে এমন এক দুর্ভেদ্য দূরত্ব তৈরি করে ফেলেছে, যার অস্তিত্ব আয়াশ নিজেও হয়তো এতদিন বুঝতে পারেনি।
আয়াশ বহু কষ্টে মাথাটা সামলে ফোনটা হাতে তুলে নিলো। চোখের পাতা যেনো ভারী পাথরের ন্যায় অবনত, স্ক্রিনের দিকে তাকানোর সামান্য শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। তবুও কোনো রকমে পরিচিত সেই নাম্বারটায় আঙুল রাখলো। ইনায়া। কত রাত পেরিয়ে গিয়েছে, নগরীর ব্যস্ততা কখন নিঃশেষ হয়ে নিস্তব্ধতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র হুঁশ নেই। ফোনের ওপাশে রিংটোন বেজেই চললো। একবার, দু’বার, তারপরও কয়েকবার। প্রতিবারই কোনো উত্তর না পেয়ে কলটা নিঃশব্দে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। কিন্তু আয়াশ থামলো না। জ্বরের উত্তাপে অবশ মস্তিষ্কে একটিমাত্র নাম যেনো বারংবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। ইনায়া!
অপরদিকে, মধ্যরাত্রির নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে ইনায়ার ফোনটা বেজে উঠলো। ঘুম বরাবরই তার হালকা, ফলে আকস্মিক শব্দে নিদ্রার আবেশ ভেঙে গেলো। আধো ঘুমে ভারী হয়ে থাকা আঁখিপল্লব মেলতে মেলতে হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিলো সে। নাম্বারটার দিকে ভালোভাবে খেয়াল করার অবকাশও হলো না। কলটা তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো অস্পষ্ট, কাঁপা কণ্ঠস্বর।
“ য..যাবেন না..যাবেন না। আ..আ..আমি আ আর হারাতে চাই না আপনাকে ইনায়া!”
মুহূর্তের ব্যবধানেই ইনায়ার সমস্ত নিদ্রালুতা উধাও হয়ে গেলো। বিস্ময়ে ভারী হয়ে থাকা আঁখি দুটো কোনো রকমে সম্পূর্ণ মেলে তাকালো অন্ধকারের দিকে। কণ্ঠস্বরটা চিনতে তার এক মুহূর্তও প্রয়োজন হলো না। আয়াশ আবারও অসংলগ্ন স্বরে বলে উঠলো-
“ বার বার চল..চলে যাচ্ছেন কেনো? আ..আমি তো চাই না আ.আপনি যান। প্লিজ যাবেন না!”
ইনায়া এবার বুঝতে পারলো, মানুষটা জ্বরের ঘোরে ডুবে আছে। কণ্ঠস্বরের প্রতিটা কম্পনে, প্রতিটা অসংলগ্ন উচ্চারণে জ্বরের তীব্রতা স্পষ্ট। লোকটার কি ভীষণ জ্বর এসেছে? প্রশ্নটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে রইলো। ইনায়া ধীরগতিতে উঠে বসলো। চারপাশে গভীর নিস্তব্ধতা। ঘরের সবাই নিশ্চিন্ত নিদ্রায় নিমগ্ন, আর রাত গড়িয়ে প্রায় তিনটা। এই গভীর রাতে তাকে কী-ই বা বলা যায়? তবুও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করলো-
“মেডিসিন নেননি?”
আয়াশ শিশুর মতো অভিমান মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠলো-
“ আ..আপনি তো দেননি। আ..আপনি নেই কেনো? আম..আমার ভালো লাগছে না।”
ইনায়া দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। এখন তাকে বোঝানোর কোনো অর্থ নেই। জ্বরের ঘোর যে মানুষটার চেতনাকে গ্রাস করে নিয়েছে, তা তার প্রতিটি শব্দেই স্পষ্ট।
“ আমার থাকার কথা নয়। সকালে যে ডাক্তার মেডিসিন দিয়েছে সেগুলো খেয়ে নিন।”
“ না খাবো না, আ..আপনি খাইয়ে দিন।”
“ আয়াশ পাগলামি করবেন না৷ খেয়ে নিন নাহলে আরও সমস্যা হবে পরে।”
ইনায়ার অন্তরে এবার অস্বস্তির সূক্ষ্ম ঢেউ আছড়ে পড়লো। কণ্ঠস্বর শুনেই বোঝা যাচ্ছে, আয়াশের শরীর কতটা উত্তাপে পুড়ছে। অথচ সে এখানে, বহু দূরে। তার কাছে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই, থাকার কোনো কারণও নেই।
আয়াশ আবারও জেদি শিশুর মতো বলে উঠলো-
“ আপনি আসুন না, আপ..আপনাকে ছাড়া থাকি না তো।”
ইনায়া কিছুক্ষণ নীরব রইলো। তারপর শীতল স্বরে বলল-
“ আমাকে ছাড়াই থাকতে হবে।”
“ না..থাকবো না। সবাই চলে যায়, আ..আপনিও যাচ্ছেন ইনায়া!”
বুকের ভেতর কোথাও যেনো অদৃশ্য কোনো ব্যথা ধীরে ধীরে নড়ে উঠলো। তবুও ইনায়া নিজের কণ্ঠে তার সামান্যতম প্রকাশ ঘটতে দিলো না।
“ আমি তো ছিলামই না, তাই যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।”
“ আপনি আসুন, যাবেন না ইনায়া প্লিজ!”
ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নিজের মধ্যে নেই মানুষটা। জ্বরের প্রলাপে হয়তো এমন সব কথা বলে চলেছে, যেগুলো সুস্থ অবস্থায় কোনোদিন উচ্চারণ করার সাহসও তার হতো না।এবার কণ্ঠে সামান্য দৃঢ়তা এনে ইনায়া বললো-
“ কেনো যাবো আপনার কাছে? কিসের জন্য যাবো?”
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর অত্যন্ত সরল এক আকুতি ভেসে এলো-
“ আমার জন্য আসুন।”
ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। তবুও সে অনুভূতিকে প্রশ্রয় দিলো না।
“ মেডিসিন নিয়ে শুয়ে পরুন, আর ঘুমানোর চেষ্টা করুন।”
হঠাৎই আয়াশের কণ্ঠস্বর বদলে গেলো। অসংলগ্নতার মাঝখান থেকে উঠে এলো এমন একটা প্রশ্ন, যার উত্তর থেকে ইনায়া বহুদিন ধরে নিজেকেই আড়াল করে রেখেছে।
“ আমায় ভালোবাসেন ইনায়া?”
প্রশ্নটি শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলো ইনায়া।
ভালোবাসা? এই অনুভূতির অর্থ তো সে আয়াশের মাধ্যমেই জেনেছিল। অচেনা এক অনুভূতিকে তার হাত ধরেই চিনেছিল। তাহলে ভালো না বেসে থাকা সম্ভব ছিল কি? কিন্তু এখনকার বাস্তবতা তো সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা আলাদা। তাদের মাঝখানে জমে আছে অতিক্রম করা যায় না এমন দূরত্ব। তাই এই অনুভূতির কোনো মূল্য নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই।ইনায়া চোখ বন্ধ করলো। বুকের গভীরে জমে থাকা অগণিত কথাকে পাথরের নিচে চাপা দিয়ে কাঠ কাঠ গলায় বললো-
“শেষবার যখন বলেছিলাম, ‘আমাকে একটু ভালোবাসেন’ তখনও আপনি বুঝেননি। অথচ সেটাই ছিল আমার শেষ চাওয়া। এরপর থেকে আমি আর ভালোবাসা চাইনি। আর না ভালোবেসেছি।”
ইনায়ার কথাগুলো যেনো ওপাশের মানুষটাকে মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দিলো। জ্বরগ্রস্ত, অবশ মস্তিষ্কটুকুও যেনো সেই নির্মম সত্যটাকে ধারণ করতে পারলো না। কিছুক্ষণ পর ভাঙা কণ্ঠে আয়াশ বলে উঠলো-
“ প্লি..প্লিজ ইনায়া! আমায় ছেড়ে যাবেন না। আ..আমি ভালো নেই, একটু ভালো নেই। ভালোবাসতে হবে না, তবুও যাবেন না।”
ইনায়ার আঁখিপল্লব ভারী হয়ে এলো। তবুও কণ্ঠে কোনো কোমলতা আনলো না।
“ মেডিসিন নিন, সকালে ডাক্তারের কাছে আগে যাবেন। রাখছি।”
কোনো প্রকার উত্তরের অপেক্ষা না করেই ফট করে ফোনটা কেটে দিলো সে। নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে আবারও ঘরটি নিঃশব্দ হয়ে গেলো। ইনায়া বড় বড় করে নিশ্বাস নিলো। অদৃশ্য কোনো ভার যেনো বুকের ওপর চেপে বসেছে। আঁখিপল্লবের কার্নিশে অশ্রুরা এসে নিঃশব্দে জমাট বাঁধলো। সে ফিরবে না। ফেরার পথ যদি এখনো কোথাও অবশিষ্ট থেকেও থাকে, তবুও ফিরবে না। কারণ কিছু ভালোবাসা কাছে থেকে নয়, দূরত্বের অন্তরালেই সবচেয়ে সুন্দর থাকে। কিছু মানুষকে নিজের করে পাওয়ার চেয়ে দূর থেকেই ভালো থাকতে দেখাটাই হয়তো শেষ ভালোবাসা।
আয়াশও দূর থেকেই সুন্দর থাকুক।
—-
সাড়ে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ইনায়ার দিনগুলো এখন আর আগের মতো স্বাভাবিক নেই। সময়ের প্রতিটা প্রহর যেনো তাকে নিজের ভেতরে বেড়ে ওঠা ছোট্ট প্রাণটার অস্তিত্ব নতুন করে অনুভব করিয়ে দেয়। শরীরটা ভারী হয়ে এসেছে, হাঁটতে গেলেই পায়ের পাতায় ক্লান্তি জমে, অল্প কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও কোমরজুড়ে অস্বস্তির মৃদু ঢেউ খেলে যায়। তবুও এই সমস্ত ক্লান্তির আড়ালেও তার মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। কারণ তার ভেতরে বেড়ে উঠছে তার পৃথিবী।
আজকাল প্রায়ই হাতটা নিজের উদরের উপর রেখে বসে থাকে ইনায়া। কখনো নীরবে, কখনো অন্যমনস্ক হয়ে। যেনো হাতের তালুর উষ্ণতা ভেদ করে পেটের ভেতর থাকা ছোট্ট মানুষটার কাছে নিজের সমস্ত মায়া পৌঁছে দিতে চায়। সেই ছোট্ট প্রাণটা যে এখন তার প্রতিটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। জানালার পাশে রাখা চেয়ারটাতে ধীরে ধীরে বসে পড়লো ইনায়া। বাইরে বিকেলের আলো ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে। আকাশের একপ্রান্তে মেঘ জমেছে, বাতাসে ভেসে আসছে আসন্ন বৃষ্টির গন্ধ। অথচ তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে নিজের উদরের দিকে। হঠাৎই ভেতর থেকে ক্ষীণ এক নড়াচড়া অনুভব করলো সে।
ইনায়ার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠলো। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো মায়ামাখা হাসি। হাতটা আরেকটু যত্নে পেটের উপর রেখে ফিসফিসিয়ে বললো-
“এই যে, আবার নড়ছো? খুব দুষ্টু হয়ে গেছো তুমি।”
নিজের কথার কোনো উত্তর নেই। তবুও ইনায়ার মনে হলো, তার ছোট্ট মানুষটা বুঝি সত্যিই তার কথা শুনছে। এই কয়েক মাসে কত কিছু বদলে গিয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে আগের সেই ইনায়াকে আর খুঁজে পায় না সে। শরীরের পরিবর্তন, চলাফেরার ধীরতা, নিঃশ্বাসে ক্লান্তি, রাতের অস্বস্তি, সবকিছুর মাঝেও একটা বিষয়ই তাকে প্রতিনিয়ত পূর্ণ করে রাখে। সে মা হতে চলেছে। কখনো কখনো গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে ইনায়া অন্ধকার ঘরে নিঃশব্দে শুয়ে থাকে। এক হাত নিজের উদরের উপর, অন্য হাত বালিশের নিচে। তখন তার মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত একাকিত্ব যেনো তার চারপাশে এসে জমা হলেও তার ভেতরে থাকা ছোট্ট প্রাণটা তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা হতে দেয় না। আজও তেমনই হলো। বসে থাকা অবস্থায় আবারও ভেতরে হালকা নড়াচড়া অনুভূত হতেই ইনায়া বিস্ময়ে তাকালো। আঁখিপল্লবের নিচে জমে থাকা ক্লান্তির পরত পেরিয়ে অদ্ভুত কোমলতা ফুটে উঠলো তার দৃষ্টিতে।
“তুমি জানো, তোমার জন্য আমি কত অপেক্ষা করছি?”
কণ্ঠস্বরটা নিজের কাছেই যেনো অপরিচিত লাগলো তার।
“তুমি আসার পর আমার নতুন একটা বাসা নিবো। তখন হয়তো আমার সেই ঘরটা আর এতটা নিঃশব্দ থাকবে না। তোমার কান্নায় ঘুম ভাঙবে, তোমার ছোট্ট হাত ধরে বসে থাকবো, তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাবে।”
কথাগুলো বলতে বলতে ইনায়ার চোখের কোণে অশ্রু জমলো। তবে সেই অশ্রু দুঃখের নয়। বরং এমন এক অনুভূতির, যার নাম হয়তো মাতৃত্ব। সে ধীরে ধীরে নিজের উদরটাকে দুই হাতের মুঠোয় আগলে নিলো।
“তুমি শুধু ভালো থেকো। তোমার জন্য আমার আর কিছুই চাই না।”
বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টি টুপটাপ শব্দে ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। সেই শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ইনায়ার ধীর নিঃশ্বাস। সাড়ে সাত মাসের অপেক্ষা পেরিয়ে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়ের আর মাত্র কিছুটা পথ বাকি। আর সেই পথ যতই ক্লান্তিকর হোক, যতই দীর্ঘ হোক, ইনায়া জানে, শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে তার ছোট্ট পৃথিবী। তার সন্তান।
#চলবে

