Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৩

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৩

0
1

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_১৩

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

দেখতে দেখতে অতিবাহিত হয়েছে দুটি মাস। সময়গুলো যেনো চোখের পলকেই একে একে পেরিয়ে যাচ্ছে, থামবার কোনো পিছুটান নেই তার। সময়ের পরিক্রমায় ঋতু বদলায়, দিন বদলায়, মানুষের জীবনও কখনো কখনো তার পুরোনো গতিপথ পাল্টে নতুন কোনো বাঁকে গিয়ে দাঁড়ায়। আবার কারো কারো জীবন আটকে থাকে সেই একই গোলকধাঁধায়, যেখানে পথের পরিবর্তন ঘটে না, কেবল মানুষটিই প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলে নিতে বাধ্য হয়।

নয় মাসের স্ফীত উদর নিয়ে ইনায়া আর আগের মতো স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারে না। সামান্য পথ পেরোতেই হাঁপিয়ে ওঠে, শরীরের কোথাও যেনো আর কোনো স্বস্তি নেই। অকারণেই ক্লান্তি এসে সমস্ত অবয়বটাকে গ্রাস করে। এই সময়টাতে প্রতিটা নারীই একটু যত্ন চায়, ভালোবাসার সামান্য আশ্রয় চায়, আর চায় এমন একটা ভরসার হাত, যার স্পর্শে সমস্ত ভয় কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্তব্ধ হয়ে যায়। অথচ ইনায়ার জীবনে সেই তিনটার কোনোটাই নেই।
তাই বাস্তবতাকে মেনে নিতে শিখে গেছে সে। সবার ভাগ্যে তো আর সমস্ত সুখ একসঙ্গে লেখা থাকে না। কারো জীবনের প্রাপ্তির ঝুলিটা পরিপূর্ণ হয়, আবার কারো ভাগ্যে কিছু অপূর্ণতা আজীবনের জন্যই থেকে যায়। ইনায়ার ভাগ্যেও হয়তো সুখের সেই পূর্ণ অধ্যায়টা লেখা ছিলো না। তাই অভিযোগের সমস্ত দরজা নিজের অন্তঃকরণেই বন্ধ করে দিয়েছে সে। নীরবে মেনে নিয়েছে নিজের প্রাপ্তি, নিজের অপ্রাপ্তি, এমনকি নিজের নিঃসঙ্গতাটুকুও।

মানবজীবন বোধহয় এমনই। মানুষ নিজের ভাগ্যের সীমারেখার চেয়ে প্রত্যাশার পরিধিটাকেই বড় করে তোলে। অন্তঃকরণে একের পর এক আশার প্রদীপ জ্বালায়, অথচ শেষপর্যন্ত জীবনের প্রাপ্তি এসে থামে ঠিক ততটুকুতেই, যতটুকু বিধাতার অদৃশ্য খাতায় পূর্বনির্ধারিত থাকে।
ডাক্তার জানিয়েছেন, ডেলিভারির সময় আসতে এখনো আরও দশ দিন কিংবা তারও কিছু বেশি সময় লাগতে পারে। তাই ইনায়া আগেভাগেই প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে রাখছে। ছোট্ট প্রাণটার পৃথিবীতে আগমনের জন্য যা যা দরকার, একে একে সবকিছু যত্ন করে প্রস্তুত করছে সে।
তবুও চিন্তার কালো মেঘটা কিছুতেই সরে না। যদি গভীর রাতে হঠাৎ ডেলিভারির পেইন ওঠে, তখন কী করবে সে? কার কাছে ছুটবে? কার সাহায্যের হাতটুকু চাইবে?

নাওমি, মেহরিন আর রুমাইসাকে আগেই বলে রাখা হয়েছে। মেয়েগুলো কোনো কারণ ছাড়াই সবসময় তার পাশে দাঁড়িয়েছে। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তাদের আন্তরিকতায় কখনো কোনো কমতি নেই। ইনায়া জানে, জীবনের এই ঋণ সে হয়তো কোনোদিনও পরিশোধ করতে পারবে না। তাই অন্তরের গভীর থেকে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাটুকু আজীবন বয়ে বেড়াবে। ডাক্তারও আগেই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকতে বলেছেন। ইনায়ার শারীরিক অবস্থা ভালো থাকায় স্বাভাবিক প্রসবে তেমন কোনো জটিলতার আশঙ্কা নেই। তবুও ভয় হয় তার। এর আগে কখনো শিশুকে সামলানোর অভিজ্ঞতা নেই। মাতৃত্বের এই সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে অচেনা এক শঙ্কা বারবার বুকের ভেতর মাথা তুলে দাঁড়ায়। আর ঠিক তখনই বড্ড বেশি মনে পড়ে আয়শা বেগমকে।

মানুষটা পাশে থাকলে হয়তো প্রতিটা মুহূর্তে মাথার ওপর ভরসার একটা হাত বুলিয়ে দিতেন। ভয়ের সময় সাহস দিতেন, অস্থিরতার সময় বুকে টেনে নিতেন। ইনায়া মানুষটাকে নিজের মায়ের স্থানেই বসিয়েছিল। কোনোদিন অনাথ বলে তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেননি তিনি। বরং আইরিনের মতোই নিজের মেয়ের মর্যাদায় আগলে রেখেছিলেন। ওই বাড়ির কারো প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই ইনায়ার। নেই কোনো অভিমানও। সেই বাড়িটায় সে সত্যিই বড্ড ভালো ছিলো। এতগুলো মানুষকে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল তার, এতগুলো সম্পর্ক তাকে আপন করে নিয়েছিল। অথচ যে মানুষটাকে কেন্দ্র করে সেই সমস্ত সম্পর্কের জন্ম, সেই মানুষটাই তো কখনো তার ছিলো না।
তাহলে সেই জায়গায় সে থাকে কী করে?

তিনটা বছর কম তো চেষ্টা করেনি ইনায়া। নিজের সমস্তটুকু দিয়ে সেই সম্পর্কটাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিল। ভেবেছিলো, হয়তো কোনো একদিন তার প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে। হয়তো কোনো একদিন আয়াশের হৃদয়ের দরজাটুকু তার জন্যও খুলে যাবে। কিন্তু শেষবারের মতো আয়াশের অধরকোণে ফুটে ওঠা সেই অমায়িক হাসিটুকু দেখার পরই তার সমস্ত ভ্রমের অবসান ঘটেছিল। বহুদিনের লালিত মায়া, প্রত্যাশা আর আত্মপ্রবঞ্চনার আবরণ এক নিমেষে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বেরিয়ে এসেছে সে সেই সংসার নামক মায়ার জাল থেকে। ওই সংসার তার ছিলো না। কোনোদিন তার হওয়ারও ছিলো না। আয়াশ তাকে কোনোদিন আশা দেয়নি। কোনো প্রতিশ্রুতিও দেয়নি। তবুও মানুষ তো আশারই দাস। কাউকে কিছু না বলেও, কারো কাছ থেকে কিছু না চেয়েও অন্তঃকরণের গহিনে শত শত আশার জন্ম দিয়ে ফেলে। নিজের অজান্তেই সেই আশাগুলোকে লালন করে, আগলে রাখে, বাঁচিয়ে রাখে।

অতঃপর কোনো একদিন যখন বাস্তবতার নির্মম স্পর্শে সেই আশাগুলো একে একে নিভে যায়, তখন মানুষ বুঝতে পারে, সে আসলে যার জন্য এতদিন অপেক্ষা করছিল, সেটা কখনো তার ভাগ্যেই লেখা ছিলো না। ইনায়াও বুঝেছে।
তাই এবার আর কোনো প্রত্যাশা নেই। শুধু অনাগত ছোট্ট প্রাণটাকে ঘিরেই তার সমস্ত পৃথিবী। জীবনের যতটুকু ভালোবাসা সে পায়নি, হয়তো সেই ভালোবাসার সমস্তটুকুই এবার নিজের সন্তানকে দিয়ে পূর্ণ করে দেবে।

—-

“ আপা আপনের মালাডা।”

বলেই মুখভরা হাসিতে উদ্ভাসিত হলো শীর্ণ, কদাকার চেহারার ছেলেটা। চেহারায় কদর্যতার ছাপ থাকলেও কোথাও যেন অদ্ভুত এক সরল মায়া লেপ্টে আছে। ইনায়া বেশ বিরক্ত হলো, তবুও ছেলেটাকে কিছু বললো না। ছেলেটার নাম কালাম। প্রতিদিন তার একটাই কাজ, কোনো না কোনো অজুহাতে ইনায়ার হাতে বেলিফুলের মালা তুলে দেওয়া। কখনো তার সঙ্গে থাকে নানা রকম মুখরোচক খাবার, কখনোবা ছোট্ট শিশুদের ব্যবহার্য নানান জিনিসপত্র। যেন প্রতিদিনের এই ছোটখাটো উপহারগুলোর মাঝেই কেউ একজন নিজের অনুচ্চারিত অনুভূতিগুলো পৌঁছে দিতে চায়। কালাম পুনরায় ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললো-

“ নিয়া নেন আপা, ভাইয়ে আপনেরে অন্নেক ভালাপায়। হেয় প্রতিদিন কত অপেক্ষা করে আপনের লেইগা।”

ইনায়ার বিরক্তির রেখাটা কপালে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো। ঠোঁটের কোণে জমে থাকা অসন্তোষ নিয়ে বললো-

“ তোকে বলেছিনা এইসব আমাকে এনে না দিতে। তারপরও আনিস কেনো?”

বিরক্তির তীক্ষ্ণতা কণ্ঠে স্পষ্ট। অথচ কালাম সেসব গায়ে মাখলো না। বরং আগের মতোই গালভরা হাসি ফুটিয়ে তুললো মুখে।

“ কি কন আপা, ভাইয়ে আমারে এই একটা কাজের বদলে প্রতিদিন পাঁচশ কইরা টেহা দেয়। এইডা তো আমার কাম। আপনে খালি খালি ভাইয়ের লগে রাগ কইরা আছেন।”

ইনায়া আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলো না। কণ্ঠে এবার কঠোরতার আবরণ স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

“ হয়েছে তোর? এবার যা, যার জিনিস তাকে দিয়ে আয়। তোকে আমি ধরে মা’রবো কালাম আমার কাছে এইসব আনলে কিন্তু।”

কালাম কথাগুলোকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিলো না। সে খুব ভালো করেই জানে, ইনায়ার এই শাসনের অন্তরালে প্রকৃত রাগের চেয়ে বিরক্তিই বেশি। তবুও আজ তার মুখের হাসিটা হঠাৎ খানিকটা ম্লান হয়ে এলো।

“ আইচ্ছা আপা আমারে মাইরেন তাও এইটা নেন। ভাইয়ে নিচে বইয়া রইছে, হাত থেইকা হের সেই র’ক্ত পরতাছে। কত কইলাম ডাক্তারের কাছে যাইতে,কিন্তু হুনতাছে না ভাইয়ে।”

কালামের শেষ কথাটুকু ইনায়ার কানে পৌঁছাতেই বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠলো। মুহূর্তেই বিরক্তির জায়গা দখল করে নিলো বিস্ময় আর অজানা উৎকণ্ঠা।

“ মানে? কি হয়েছে তোর ভাইয়ের? হাত কে’টেছে কিভাবে?”

কালাম এবার একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মাথা চুলকালো।

“ রাস্তায় আসার সময়, কিছু পোলা একজনের থেইকা টেহা নিতাছিলো। তখন হেরে বাঁচাইতে গিয়া হাত চিঁইড়া গেছে।”

ইনায়ার চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠলো। আহত অবস্থায় মানুষটা নিচে বসে আছে, অথচ ডাক্তার দেখানোর পরিবর্তে তার জন্য মালা নিয়ে অপেক্ষা করছে। ব্যাপারটা ভাবতেই ইনায়ার ভেতরের বিরক্তি যেন আরও তীব্র হয়ে উঠলো।

“ তো তুই তোর ভাইকে ডাক্তারের কাছে না নিয়ে গিয়ে এখানে এসেছিস কেনো মক্কেল?”

কালাম সঙ্গে সঙ্গেই নিজের পক্ষ সমর্থনের ভঙ্গিতে বলে উঠলো-

“ আরে আপা হেয় যাইতে চায় না। কত কইরা কইলাম যাইতে। হে আগে আপনাকে এইডা দিয়া আইতে কইছে।”

ইনায়া এবার সত্যিই বিরক্তির শেষ সীমানায় এসে দাঁড়ালো। প্রতিদিন কালাম কোনো না কোনো কিছু নিয়ে হাজির হয়। কখনো ফুল, কখনো খাবার, কখনো শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। যেন আয়াশ তার জীবনের প্রতিটা অনুচ্চারিত অনুভূতিকে এভাবেই ইনায়ার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এখন আর কারও অজানা নেই, আয়াশ নামের সেই পুরুষটা ইনায়ার স্বামী। এখানে থাকা মেয়েরাও বিষয়টা জেনে গেছে। কেউ মুখের ওপর কিছু না বললেও আড়ালে আবডালে নানান কথার ফুলঝুরি ছুটে বেড়ায়। কেউ আয়াশের এমন নিরবচ্ছিন্ন যত্নে মুগ্ধ হয়ে ইনায়াকেই নিন্দা করে, কেউবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, মানুষটাকে অন্তত আরেকবার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু ইনায়া কারও কথাই কর্ণপাত করে না। তার জীবন, তার ক্ষত, তার সিদ্ধান্ত। কোনটা তার জন্য প্রয়োজন, সেটা নির্ধারণ করার অধিকারও কেবল তার নিজের। বহুদিন পর আজ নিচে নামলো ইনায়া।

দৃষ্টিসীমার খানিকটা দূরেই বসে আছে আয়াশ। র’ক্তাক্ত হাতটি অসাবধানতায় নিচে ঝুলে রয়েছে। ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে পড়া র’ক্তের ফোঁটাগুলো একে একে মাটির বুকে ছড়িয়ে পড়েছে। দৃশ্যটা দেখেই ইনায়ার মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠলো। ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেলো সে।
আর আয়াশ? বহুদিন পর প্রিয় মানুষটাকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে যেন মুহূর্তের জন্য সমস্ত অস্তিত্বের গতি থমকে গেলো তার। স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ইনায়ার মুখপানে। পরক্ষণেই নিজের কাটা হাতটা দ্রুত শরীরের আড়ালে লুকিয়ে ফেললো। ইনায়ার চোখে এই দৃশ্য পড়ে যদি কোনো প্রকার আতঙ্কের জন্ম নেয়, সে তা কিছুতেই চায় না।
ইনায়া তার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। মুখে কোনো কোমলতা নেই, চোখে নেই কোনো অনুরাগের চিহ্ন। কেবল দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান আর ক্লান্তির কঠিন আবরণ।

“ আপনি এইসব কবে বন্ধ করবেন?”

কাঠের মতো শুষ্ক কণ্ঠে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলো ইনায়া।
আয়াশের চেহারার দিকে তাকানোই যেন কঠিন। অগোছালো অবস্থা, ক্লান্ত চোখ, বিবর্ণ মুখশ্রী। কতদিনের নির্ঘুম প্রতীক্ষা আর অনুতাপ যেন মানুষটার অবয়বটাকেই ক্ষয়ে দিয়েছে। তবুও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি ফুটিয়ে সে বললো-

“ যেদিন আপনি আমায় মাফ করবেন।”

ইনায়ার বুকের ভেতর কোথাও যেন পুরোনো কোনো ক্ষত নড়েচড়ে উঠলো। কিন্তু মুখে তার কোনো বহিঃপ্রকাশ ঘটলো না।

” যদি বলি মাফ করে দিয়েছি। আর আপনি কোনো পাপ করেননি যে, আমি আপনাকে মাফ করবো।”

আয়াশের ভীষণ ইচ্ছে করলো ইনায়াকে ছুঁয়ে দেখতে। কেবল একবার। তার স্ফীত উদরটাতে হাত রেখে অনুভব করতে ইচ্ছে করলো সেই অনাগত প্রাণের অস্তিত্ব, যে তার নিজের রক্তের অংশ। অথচ এতদিনেও সেই অধিকারটুকু সে অর্জন করতে পারেনি। ইচ্ছে হয়েছিল অসংখ্যবার। প্রতিবারই নিজের বুকের ভেতর জন্ম নেওয়া সেই আকাঙ্ক্ষাকে নির্মমভাবে পিষে দিয়েছে সে। কারণ ইনায়ার অস্বস্তির বিনিময়ে কোনো অনুভূতিই তার কাছে মূল্যবান নয়। অসহায় দৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আয়াশ কাঁপা কণ্ঠে বললো-

“আর একটা বার কি সুযোগ দেওয়া যায় না? নতুন করে সব শুরু করা যায় না?”

ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বুকের ভেতর জমে থাকা ভার যেন নিঃশ্বাসের সঙ্গে খানিকটা বাইরে বেরিয়ে এলো। তারপর ধীর কণ্ঠে বলে উঠলো-

“সব নতুন করে শুরু করা গেলেও, সেটা আমি চাই না। নতুন করে সেই আগুনে আবার ঝাপ দিতে চাই না। ফিরে যান। আপনার আর আমার পথ আলাদা হয়ে গিয়েছে।”

আয়াশের চোখের দৃষ্টি আরও নিস্তেজ হয়ে এলো। তবুও শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে বললো-

“ একটা বার আমায় সুযোগ দিন, আমি এই ভুল আর কখনো করবো না।”

ইনায়ার ঠোঁটের কোণে অতি ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু সেই হাসির অন্তরালে লুকিয়ে রইলো শত শত না বলা যন্ত্রণা। এমন এক যন্ত্রণা, যার গভীরতা কোনো শব্দে মাপা সম্ভব নয়।

“ আপনি তো কোনো ভুল করেনি। আপনি যা করেছে সেটা আসলেই করেছেন, সেটাকে ভুল বলে না আয়াশ। আপনি আমায় ভালোবাসতে পারেনি, এরজন্য আপনাকে দোষারোপ করবো না। আপনি না কথা দিয়েছেন, আর না আশাও। তবুও আমি পাগলের মতো আশা রেখেছি। তাই হয়তো আমার এতোটা কষ্ট হয়েছে। আপনি মুক্ত, আমি এমনিও ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিতাম। আপনি আর প্রিয়া আবারও একসঙ্গে থাকতে পারবেন। তাহলে এতোকিছু করার কোনো মানে হয় না।”

কথাগুলো শেষ হওয়ার পরও চারপাশের বাতাসে যেন ইনায়ার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি থেকে গেলো। কত সহজভাবে সে বললো, সে মুক্ত। অথচ সেই মুক্তির প্রতিটা অক্ষরের আড়ালে যে কত বছরের অপেক্ষা, কত রাতের নিঃসঙ্গতা, কত অপূর্ণ প্রত্যাশা আর কতখানি ভেঙে পড়া ভালোবাসা চাপা পড়ে আছে, তা কেবল ইনায়াই জানে। আয়াশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটা হয়তো সত্যিই মুক্ত। কিন্তু তার হৃদয়ের কোনো এক গোপন প্রকোষ্ঠে যে মানুষটাার জন্য একদিন নিঃশর্ত ভালোবাসা জন্মেছিল, তাকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে দেওয়ার ক্ষমতা কি আদৌ তার হয়েছে? হয়তো হয়নি।
হয়তো কোনো কোনো ভালোবাসা শেষ হয়ে গেলেও তার রেশ থেকে যায়। মানুষের জীবন থেকে মানুষটা চলে যায়, অথচ তার রেখে যাওয়া অনুভূতিগুলো থেকে যায় বুকের গভীরে, নিঃশব্দে, অনন্তকাল।

“ প্রিয়া বেঁচে নেই ইনায়া। ও মা’রা গেছে ছয় বছর আগেই!”

কথাটুকু নিঃশব্দে আঁচড়ে পরলো ইনায়ার কর্ণকুহরে। বিস্মিত নয়নে সে চেয়ে থাকলো। আয়াশ ধীর কণ্ঠে আবারও বলে-

“ আপনাকে সবটা বলা হয়নি। আপনাকে দিগুণ কষ্ট দিতে চাইনি,তাই কোনোদিন পুরোপুরি আপনাকে কিছুই জানায়নি।”

“ তাহলে আপনি রেস্টুরেন্টে কার সঙ্গে ছিলেন?”

আয়াশ খানিকটা অবাক হয়েই প্রশ্ন করে।

“ কোন সময়ের কথা বলছেন?”

“আমাদের বিবাহবার্ষিকীর আগের দিন।”

কথাটা উচ্চারিত হতেই ইনায়ার বুকের ভেতর কোথাও যেনো নিঃশব্দে জমে থাকা এক দীর্ঘশ্বাসের অনুরণন হলো। চোখের সম্মুখে ভেসে উঠলো সেই দিনটার অসংখ্য স্মৃতি, অথচ স্মৃতির প্রতিটা অলিন্দে আয়াশের উপস্থিতি থেকেও যেনো তার অনুপস্থিতিই ছিলো অধিক স্পষ্ট।

“ওহ্ আচ্ছা! ও প্রিয়া জমজ বোন শ্রেয়া। ও আমার ছোট বোনের মতো। আপনি কি এই কারণে চলে এসেছেন?”

ইনায়ার স্থির দৃষ্টির সম্মুখে আয়াশের অবয়বটা নির্বাক হয়ে রইলো। ঠোঁটের কোণে একটুখানি বিষণ্ণ হাসির রেখা ফুটে উঠতেই সে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

“আপনার কি মনে হয় এতো সামান্য বিষয়ে চলে আসবো আমি?”

তিনটা বছর। সময়ের হিসেবে হয়তো খুব দীর্ঘ কোনো কাল নয়, অথচ একটা মানুষের জীবনে ভালোবাসাহীন তিনটা বছর কখনো কখনো অনন্তকালের সমান দীর্ঘ হয়ে ওঠে। ইনায়া সেই দীর্ঘ সময়টুকু বয়ে বেড়িয়েছে একাকিত্বের ভার কাঁধে নিয়ে। পাশে থেকেও যাকে পাওয়া যায়নি, তার সঙ্গে সংসার করার চেয়ে নিঃসঙ্গতাই যেনো অধিক আপন হয়ে উঠেছিলো তার কাছে। আয়াশের নীরবতা ক্রমশই ইনায়ার অন্তর্গত অভিমানগুলোকে উন্মুক্ত করে দিতে লাগলো। বহুদিন ধরে বুকের গভীরে সযত্নে পুঁতে রাখা কথাগুলো আজ আর কোনো বাঁধ মানতে চাইলো না।

“আপনার সঙ্গে তিনটা বছর কাটিয়েছি, শেষ কবে আপনাকে আমি প্রাণ খুলে হাসতে দেখেছি বলতে পারেন? কতবার আপনার কাছে গিয়েছি ভালোবাসা চেয়ে আপনি দিয়েছেন? সংসারটা আমাদের হলেও আপনাকে সেখানে কখনোই পাইনি। কারণ আপনি কখনোই আমায় চাননি। আমি সেখানে থেকে কি করবো বলুন? ওই সংসার কি আদৌও আমার ছিলো কোনোদিন?”

প্রশ্নগুলোর পর প্রশ্ন ছুড়ে দিলেও ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না। আয়াশের নিশ্চুপ অবয়বটুকু যেনো ইনায়ার প্রতিটা কথার সামনে অপরাধীর মতো নত হয়ে রইলো।
উত্তর না পেয়ে ইনায়া পুনরায় বললো-

“এরচেয়ে ভালো আমাদের বিচ্ছেদ হওয়া। আপনাকে আর জোর করে কোনো দায়িত্ব পালন করতে হবে না। দায়বদ্ধ নিয়ে ঘুরতে হবে না। আপনি ফিরে যান, আর সময় মতো ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিয়েন। নাহয় আমি দিয়ে দিবো।”

শেষ কথাটুকু উচ্চারণ করতে গিয়ে কণ্ঠের দৃঢ়তা অটুট থাকলেও চোখের গভীরে জমে থাকা অভিমানটুকু আর গোপন রইলো না। মানুষটা তাকে ভালোবাসেনি, এই সত্য মেনে নেওয়া যতটা কঠিন ছিলো, তার থেকেও কঠিন ছিলো নিজের অপ্রাপ্ত ভালোবাসার কাছে বারবার পরাজিত হওয়া। দীর্ঘ নীরবতার পর আয়াশের কণ্ঠ ভেসে এলো। কণ্ঠস্বরটা ভাঙাচোরা, যেনো প্রতিটা শব্দ উচ্চারণের পূর্বে তাকে নিজের ভেতরকার কোনো এক কঠিন দেয়াল অতিক্রম করতে হচ্ছে।

“আর এক সুযোগ কি দেওয়া যায় না ইনায়া? আমি জানি আমার দ্বারা যে অপরাধ হয়েছে সেটার ক্ষমার অযোগ্য তবুও, দ্বিতীয় একটা সুযোগ তো সবাই পায়। আমার বেলায় এতোটা নিষ্টুর হচ্ছেন কেনো?”

ইনায়ার চোখের পাতা কেঁপে উঠলো। অথচ দৃষ্টি নামলো না। ঠোঁটের কোণে জমে থাকা তিক্ত হাসিটুকু যেনো তার সমস্ত ক্লান্তির ভাষান্তর হয়ে উঠলো।

“সুযোগ দিলেই কি আমায় ভালোবাসতে পারবেন? সুযোগ দিলেই কি সব আগের মতো হয়ে যাবে?”

প্রশ্নটা শুনে আয়াশের বুকের ভেতরটা যেনো হঠাৎ শূন্য হয়ে গেলো। কত সহজেই মানুষ ভালোবাসার কথা বলে ফেলে, অথচ ভালোবাসাহীনতার দীর্ঘ ক্ষত বহন করা মানুষটার কাছে সেই একটা শব্দই কখনো কখনো সবচেয়ে নির্মম প্রতারণা হয়ে ওঠে। আয়াশ ধীর কণ্ঠে বললো-

“আমি আপনায় ভালোবাসি ইনায়া। হয়তো দেরিতে বুঝতে পেরেছি, কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনি ছাড়া আমি অসহায়।”

ইনায়া খানিকটা হাসলো। সে হাসিতে আনন্দের কোনো রেশ নেই। ছিলো দীর্ঘদিনের অবহেলা, না পাওয়া ভালোবাসা আর তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক নারীর অসহায় উপলব্ধি। মানুষটা আজ তাকে ভালোবাসে বলছে, অথচ এই কথাটুকু যদি কয়েক বছর পূর্বে শুনতে পেতো, তবে হয়তো তার সমগ্র পৃথিবীটুকুই বদলে যেতো। কিন্তু এখন?
এখন তার হৃদয় আর আগের মতো সরল নেই।

“এটাকে ভালোবাসা বলে না আয়াশ। এটা আবার অপরাধ বোধ থেকে আসা অনুভূতি। এতোটাও নির্বোধ হবেন না।”

#চলবে