Home "ধারাবাহিক গল্প "Out Of Bounds Out Of Bounds পর্ব-২৫+২৬

Out Of Bounds পর্ব-২৫+২৬

0
12

#Out_Of_Bounds
#Part_25
#Ishrat_Jahan_Jarin

পরদিন সকালে ক্যালিফোর্নিয়াগামী প্রথম ফ্লাইট।
সাউথ বোস্টনের কলোনি রোডের পুরোনো তিনতলা ইটের দালানটায় আজ রাতের হাওয়াটা যেন ভারী হয়ে উঠেছে। বাইরের হিমশীতল বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু আকাশে থমথম করছে কালো মেঘের দল।
ছোট ডর্ম রুমের ভেতরে পাইন কাঠের ফায়ারপ্লেসে আগুনটা দাউদাউ করে জ্বলছে। কাঠের ওপর আলোর নাচানাচি, আর সেই হলুদ আলোয় ঘরের চারদেয়ালে ছড়িয়ে পড়েছে দুটি ছায়ার নিবিড় আলিঙ্গন। জ্যাকের ট্রাভেল ব্যাগটা ঘরের এক কোণে গুছিয়ে রাখা। তার ওপর রাখা ইউএসএ ন্যাশনাল বাস্কেটবল টিমের সেই সোনালী লোগো দেওয়া অফিশিয়াল পাসপোর্ট ফোল্ডার।

জ্যাক খাটে শুয়ে আছে। তার খালি চওড়া বুকের ওপর মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে আছে ক্লারা। তার উলের সোয়েটারের স্লিভটা কনুই পর্যন্ত গোটানো, আর তার ফ্যাকাশে আঙুলগুলো খেলে যাচ্ছিল জ্যাকের বুকের চেনা কাটা দাগটার ওপর।

“চার মাস…” ক্লারা খুব নিচু, কাঁপানো গলায় ফিসফিস করে বলল। “একশ বিশ দিন। আটাশশো আশি ঘণ্টা।”

জ্যাক হাসি হাসল, যদিও তার ধূসর চোখে জমেছে এক গভীর বিষাদ। সে ক্লারার গালের ওপর আলতো করে হাত রেখে বুড়ো আঙুল দিয়ে ক্লারার চিবুকটা ওপরের দিকে তুলে ধরল।

“হিসেবটা তো নিখুঁত হলো না, মিস ক্যালকুলেটর,” জ্যাকের গলার স্বর ভীষণ ভারী আর কড়া শোনাল। “একশ বিশ দিন নয়… আমার কাছে এটা একশ বিশটা বছর। তোমাকে ছাড়া এই চার মাস ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে আমাকে প্রতি মুহূর্তে মরতে হবে।”

ক্লারা কোনো কথা বলতে পারল না। তার নীল চোখের মণি দুটো জলে ভরে উঠল। চশমার কাঁচটা বাষ্পে ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছিল দেখে সে দ্রুত মুখ লুকিয়ে ফেলল জ্যাকের গলার নিচে। জ্যাক এক ঝটকায় ক্লারাকে নিজের সম্পূর্ণ ওপর টেনে নিল। তার দুটি শক্তিশালী হাত ক্লারার নগ্ন কোমর ও পিঠ শক্ত করে বেষ্টন করে নিল।

“শোনো, ক্লারা,” জ্যাকের কড়া ফিসফিসানিটা এবার সরাসরি ক্লারার কানের লতিতে এসে আছড়ে পড়ল। “আমি ক্যালিফোর্নিয়া যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমার আত্মা আর মন এই বোস্টনের ডর্ম রুমেই আটকে থাকবে। ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’-এর প্রতিটি কেস, প্রতিটি ফাইলের দায়িত্ব তোমার। আর সাউথ বোস্টনে যদি কোনো পুরুষ তোমার দিকে ভুল নজরে তাকায়… তবে ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাম্প থেকে প্রথম বিমানে উড়ে এসে তাকে আমি নিজের হাতে শেষ করব। মনে থাকবে?”

ক্লারা চোখ বুজে ফেলে হালকা হেসে উউল।

“আপনি নিশ্চিন্তে যান, মিস্টার মিলার,” ক্লারা জ্যাকের ঠোঁটে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। “আপনার বউকে সামলানোর মতো পুরুষ বোস্টন কেন, পুরো আমেরিকাতেও দ্বিতীয় কেউ জন্মেছ বলে আমার মনে হয় না।”

জ্যাক নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। পরম ভালোবাসায় আর তীব্র বিরহের আশঙ্কায় সে ক্লারার ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের বন্ধনে শক্ত করে পিষে দিল। আগুনের সোনালী আলোয় তাদের বিচ্ছেদের আগের রাতটি এক পরম শারীরিক ও মানসিক একাত্মতায় অমর হয়ে রইল।

সকাল ছ’টা। বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ডিপার্চার টার্মিনাল। সকালের কুয়াশায় চারপাশের রানওয়ে ঢাকা। এয়ারপোর্টের বিশাল কাঁচের দেয়ালে আছড়ে পড়ছে বোস্টনের কড়া হিমেল হাওয়া। টার্মিনালে শত শত মানুেষের ব্যস্ত আনাগোনা, মাইকে একটু পর পর বিভিন্ন ফ্লাইটের অ্যানাউন্সমেন্ট হচ্ছে। জ্যাকের পরনে কালো ট্রাউজার, সাদা সুতির টি-শার্ট আর তার ওপর ইউএসএ বাস্কেটবল টিমের অফিশিয়াল ব্লেজার। কাঁধে ঝুলছে স্পোর্টস কিট ব্যাগ।

ক্লারা পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার গাঢ় নীল কোটের পকেটে দুটি হাত পুরে রাখা। তার চোখ দুটো সারা রাতের কান্নায় কিছুটা লাল হয়ে আছে, কিন্তু সে কঠোর চেষ্টা করছে নিজের দুর্বলতা চেপে রাখার জন্য। জ্যাক বোর্ডিং পাসের কাউন্টারের দিকে দু-পা এগিয়ে গিয়ে আবার থমকে দাঁড়াল। সে ঘুরে এসে ক্লারার একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। সে নিজের কোটের ভেতরের পকেট থেকে দুটি জিনিস বের করল।

প্রথমটি হলো তার বাস্কেটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে প্রিয় স্মারক, সোনার চেইনে বাঁধানো সেই লকেট, যাতে তার প্রথম ন্যাশনাল জুনিয়র ট্রফির খোদাই করা তারিখ রয়েছে। আর দ্বিতীয়টি হলো সাউথ বোস্টনের তাদের সেই তিনতলার ডর্ম রুমের অতিরিক্ত স্পেয়ার চাবি। জ্যাক সোনার চেইনটা নিজ হাতে ক্লারার গলায় পরিয়ে দিল। লকেটটা ঝুলতে লাগল ক্লারার বুকের ঠিক মাঝখানে।

“লকেটটা তোমার কাছে রইল, ক্লারা,” জ্যাক খুব নিচু, গভীর গলায় বলল। “যেদিন আমি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের মেডেল নিয়ে ফিরব, সেদিন তুমি নিজ হাতে এটা আমার গলায় আবার পরিয়ে দেবে। আর এই চাবিটা…”

জ্যাক ক্লারার হাতের তালুতে চাবিটা চেপে ধরল। “এই ঘরটা আমাদের। আমার ফেরার ঠিকানা। এটাকে আগলে রেখো।”

ক্লারা চোখ বুজে ফেলল। তার গাল বেয়ে এক ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়ল। জ্যাক হঠাৎ কোনো তোয়াক্কা না করে, হাজারো মানুষের ভিড়ের মাঝেই ক্লারাকে নিজের দু-হাতে তুলে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরল। তার ঠোঁট নেমে এলো ক্লারার কপালে আর ঠোঁটে, এক দীর্ঘ, অশ্রুসিক্ত, উন্মাদ চুম্বন। চারপাশের বেশ কয়েকজন যাত্রী থমকে তাকিয়ে এই দৃশ্য দেখছিল, কিন্তু জ্যাকের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।

“আই লাভ ইউ, চশমাওয়ালি,” সে ফিসফিস করে বলল।

“আই লাভ ইউ টু, জ্যাক,” ক্লারা জ্যাকের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে বলল। “নিজের খেয়াল রাখবেন। আর বাস্কেটবল কোর্টে সবাইকে বুঝিয়ে দেবেন আপনি কার স্বামী।”

জ্যাক একটু বাঁকা হেসে ব্যাগটা কাঁধে চেপে ধরল। সে আর পেছনে ফিরে তাকাল না। সোজা হেঁটে চলে গেল সিকিউরিটি চেকিংয়ের গেটের ওপারে। ক্লারা এয়ারপোর্টের সুবিশাল কাঁচের দেয়ালের সামনে একা দাঁড়িয়ে রইল। একটু পরেই কুয়াশা চিরে ইউএসএ টিমের চার্টার্ড প্লেনটি ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্দেশ্যে ডানা মেলল।

জ্যাক বোস্টন ছাড়ার ঠিক চৌত্রিশ ঘণ্টা পর। মিলার কর্পোরেশনের হেডকোয়ার্টার। শহরের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত আর্থার মিলারের বিশাল কাঁচের অফিস ঘরটি থেকে পুরো বোস্টন শহরকে পায়ের নিচে মনে হয়। বিকেল চারটে। ডেস্কে বসে ছিলেন বোস্টনের সবচেয়ে প্রভাবশালী কোটিপতি বিলিয়নেয়ার আর্থার মিলার। তাঁর মুখে কড়া ইতালিয়ান চুরুট, পরনে হাজার ডলারের কাস্টম-মেড থ্রি-পিস স্যুট। তাঁর সামনে খবরের কাগজের কাটিং ছড়ানো। ‘বোস্টন ফিনান্সিয়াল ইভনিং স্টার’-এর সেই হেডলাইন, “তরুণী অডিট জিনিয়াস ক্লারা বেনেটের অসামান্য ফাইন্ডিং!”

পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর পার্সোনাল অ্যাটর্নি ও ড্রাইভার। “তার মানে,” আর্থার মিলার চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে বরফের মতো ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “আমার ছেলে এখন ক্যালিফোর্নিয়ায় জাতীয় দলের সাথে প্র্যাকটিস করছে। আর সাউথ বোস্টনের সেই অনাথ মেয়েটা বোস্টনে নিজের নামে ফার্ম খুলে রাজত্ব করার স্বপ্ন দেখছে?”

“জি, মিস্টার মিলার,” অ্যাটর্নি মাথা নিচু করে বললেন। “রেডক্লিফ শিপিংয়ের কেসটার পর থেকে বড় বড় কোম্পানিগুলো ক্লারা বেনেটকে অডিট ফাইল পাঠাচ্ছে। মেয়েটির গাণিতিক ব্রেন অবিশ্বাস্য রকম ক্ষুরধার।”

আর্থার মিলার ডেস্কের ওপর চুরুটটা চেপে ধরলেন। তাঁর চোখ দুটো ক্ষোভে ও অহংকারে ছোট হয়ে এলো।

“জ্যাক্সন ভেবেছিল সে দূরে চলে গিয়ে আমাকে এড়িয়ে যাবে,” আর্থার বিদ্রূপের হাসি হাসলেন। “আর ওই অনাথ মেয়েটা ভাবছে সামান্য কিছু অংক মিলিয়ে সে মিলার বংশের ওয়ারিশকে নিজের ঘরে বন্দি করে রাখবে! গাড়ি পাঠাও। তাকে আমার অফিসে নিয়ে এসো।”

বিকেল সাউথ বোস্টনের ডর্ম রুমের নিচে একটা সুবিশাল কালো লিমোজিন এসে দাঁড়াল। ক্লারা তখন কিছু আইনি বই আর এক্সেল শিট গুছিয়ে ক্লায়েন্টের মিটিংয়ের জন্য বের হচ্ছিল। গাড়ি থেকে নেমে এলো আর্থার মিলারের বডিগার্ড।

“মিস বেনেট,” লোকটা কড়া গলায় বলল। “মিস্টার আর্থার মিলার আপনাকে পেন্টহাউসে ডেকেছেন। এখনই।”

ক্লারা চশমাটা সোজা করে নিল। তার গলার লকেটটা জামার আড়ালে জ্বলজ্বল করছে। সে জানতো, এই দিনটা একদিন না একদিন আসবেই। এতদিন সে জ্যাকের আড়ালে ছিল, কিন্তু আজ তাকে একা এই শকুনের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। ক্লারা কোনো ভয় বা দ্বিধা না দেখিয়ে খুব শান্ত, শক্ত পায়ে লিমোজিনের ভেতরে গিয়ে বসল।

পেন্টহাউসের দোতলার গেট খুলে দেওয়া হলো। ইতালিয়ান মার্বেলের চকচকে মেঝে পার হয়ে ক্লারা এসে দাঁড়াল আর্থার মিলারের বিশাল ইবোনি কাঠের ডেস্কে সামনে। ঘরের আবহাওয়াটা ছিল ভীষণ ভারী আর থমথমে। আর্থার মিলার তাঁর ঘূর্ণায়মান চামড়ার চেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন। তিনি ক্লারাকে ওপর থেকে নিচে একবার ধিক্কারের চোখে দেখলেন ছেঁড়া জুতো না থাকলেও ক্লারার পরনে সেই গাঢ় নীল সাধারণ কোট, চোখের মোটা চশমা আর এক জোড়া জেদী নীল চোখ। আর্থার মিলার ড্রয়ার খুলে একটা চেক বই বের করলেন। সে খসখস করে গোল্ডেন পেন দিয়ে একটা চেকে সই করে ক্লারার দিকে ছুঁড়ে মারলেন। চেকটি টেবিল গড়িয়ে ক্লারার একদম সামনে এসে থামল।

“দশ মিলিয়ন ডলার।” আর্থার মিলার বিষাক্ত গলায় বললেন। “অন-দ্য-স্পট ক্যাশ। সাথে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ আর লন্ডনে একটা থ্রি-বেডরুম ফ্ল্যাট। আজ রাতের মধ্যেই বোস্টন ছেড়ে লন্ডন চলে যাও। জ্যাকের জীবন থেকে চিরতরে সরে দাঁড়াও।”

ক্লারা চেকটার দিকে এক নজরও তাকাল না। সে অত্যন্ত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“আর যদি না যাই, মিস্টার মিলার?” ক্লারার গলার স্বর ছিল স্ফটিকের মতো পরিষ্কার আর ঠাণ্ডা।

আর্থার মিলার বিদ্রূপের হাসি হাসলেন। “না গেলে? খুকি, তুমি মনে হয় জানো না আমি কে! তোমার এই ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’ নাম দিয়ে যে খেলাটা খেলছ এক কলমের খোঁচায় আমি ওটার লাইসেন্স বাতিল করে দেব। বোস্টনের কোনো কোম্পানি তোমাকে একটা দশ ডলারের অডিটের কাজও দেবে না। তোমায় রাস্তায় বসিয়ে দেব আমি।”

ক্লারা এক পা এগিয়ে এলো। সে টেবিলের ওপর রাখা সেই ১০ মিলিয়ন ডলারের চেকের কাগজটা নিজের আঙুলে তুলল। আর্থার মিলারের চোখের সামনেই ক্লারা দশ মিলিয়ন ডলারের চেকটিকে চার টুকরো করে ছিঁড়ে টেবিলের ওপর ছড়িয়ে দিল! আর্থার মিলার থমকে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। “হাউ ড্যার ইউ!”

“আপনার এই কাগজ দিয়ে আপনি বোস্টনের বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি বা ভুয়া সম্মান কিনতে পারেন, মিস্টার মিলার,” ক্লারা চোখের চশমাটা সোজা করে খুব ধীর, কিন্তু বিধ্বংসী গলায় বলল। “কিন্তু আপনার ছেলের আত্মসম্মান আর আমার ভালোবাসাকে কেনার ক্ষমতা আপনার কোটি কোটি ডলারের ব্যাংক ব্যালেন্সের নেই।”

ক্লারা সরাসরি আর্থার মিলারের চোখের দিকে তাকাল। “জ্যাক্সন আপনার পেন্টহাউসের রাজপ্রাসাদ ছেড়ে সাউথ বোস্টনের ডর্ম রুমে এসেছে, কারণ সেখানে সত্য আছে, সম্মান আছে,” ক্লারা কড়া গলায় বলল। “আপনি যদি মনে করেন আপনার পাওয়ার দিয়ে আমাদের থামিয়ে দেবেন তবে মনে রাখবেন, ক্লারা বেনেট অংক মেলাতে ভালোবাসে। আর আপনার মিলার কর্পোরেশনের তিন বছরের ট্যাক্স ফাইলের প্রতিটি লুকানো হিসাব আমার নখদর্পণে। আমাকে রাস্তায় নামানোর আগে ভেবে নেবেন আপনার পেন্টহাউসের ভিত্তি ঠিক আছে তো?”

আর্থার মিলার স্তব্ধ হয়ে গেলেন! তাঁর অভিজ্ঞ, শক্ত চেহারাটা প্রথমবারের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল!

তিনি কোনোদিন কল্পনাও করেননি এক সাধারণ অনাথ স্কলারশিপের মেয়ে তাঁর সাম্রাজ্যে দাঁড়িয়ে তাঁর মুখের ওপর এভাবে সিংহীর মতো হুঙ্কার দিয়ে কথা বলতে পারে! ক্লারা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। সে নিজের কোটের হাতা গুটিয়ে, শক্ত পদে হেঁটে পেন্টহাউসের দরজার দিকে চলে গেল।


ক্যালিফোর্নিয়া অলিম্পিক ট্রেনিং সেন্টারের বাস্কেটবল জিম। দুপুরের প্র্যাকটিস ম্যাচ চলছে। চারপাশের বিশাল স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের কোচ, সিলেক্টর আর জার্নালিস্টরা বসে আছেন। কোর্টে জ্যাক আছে রুদ্ররূপী এক দৈত্যের মতো! তার গায়ে সবুজ ইউএসএ স্পোর্টস কাস্টম জার্সি, কপাল থেকে ঝরঝর করে ঘাম ঝরছে। সে অপোনেন্ট টিমের চারজন প্লেয়ারকে ড্রিবলিংয়ে কুপোকাত করে রিংয়ের ওপর এক প্রকাণ্ড টু-হ্যান্ডেড রিভার্স ড্যাঙ্ক মারল। রিংয়ের স্টিলের কাঠামোটা বিকট শব্দে কেঁপে উঠল। কোচ মার্কাস গ্যালারি থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে উঠলেন। “অসাধারণ! জ্যাক্সন মিলার ইজ অন ফায়ার টুডে!”

কিন্তু প্র্যাকটিসের মাঝেই ড্রেসিংরুমে রাখা জ্যাকের পার্সোনাল ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠল। ম্যাচ বিরতির সময় জ্যাক ক্যান গিলে জল খেতে খেতে ফোনে নজর দিল। সাউথ বোস্টনের প্রাইভেট ডিটেক্টিভ ও তার বন্ধু লিয়োর মেসেজ,

“জ্যাক, আজ বিকেলে আর্থার মিলার ক্লারাকে পেন্টহাউসে ডেকে পাঠিয়েছিল। ১০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে লন্ডন পাঠানোর চক্রান্ত করেছিল। কিন্তু তোর বউ তোর বাবার মুখের ওপর চেক ছিঁড়ে পেন্টহাউস কাঁপিয়ে বের হয়ে এসেছে।”

মেসেজটা পড়তেই জ্যাকের ধূসর চোখ দুটোয় যেন এক নিমিষে লাল নক্ষত্র জ্বলে উঠল! তার হাতের ক্যানটা দুমড়ে-মুচড়ে জলের মতো চ্যাপ্টা হয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, গলার রগগুলো কড়া হয়ে ফুলে উঠল। জ্যাক সোজাসুজি ড্রেসিংরুমে গিয়ে নিজের ফোনটা তুলে নিয়ে স্যাটেলাইট ডিরেক্ট কল লাগাল আর্থার মিলারের প্রাইভেট নম্বরে। পেন্টহাউসে বসে থাকা আর্থার মিলারের ফোনটা বেজে উঠল। আর্থার মিলার কাঁপানো হাতে ফোন কানে তুললেন।

“বাবা,” ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো জ্যাকের হিমশীতল গলা।

“জ্যাক্সন…?” আর্থার নিজের গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেন।

“আমি তোমাকে শেষবারের মতো সতর্ক করছি, মিস্টার আর্থার মিলার,” জ্যাক ক্যালিফোর্নিয়ার ড্রেসিংরুমের দেয়ালে এক সজোরে ঘুসি মেরে বলল, “ক্লারা বেনেট শুধু আমার ভালোবাসা নয়, সে এই জ্যাক্সন মিলারের সম্মান। ক্যালিফোর্নিয়ায় বসে যদি আমি শুনি যে তুমি তার দিকে আর একটা কড়া নজরও দিয়েছো… তবে বোস্টনে ফিরে এসে বাস্কেটবল পরে খেলব, আগে তোমার এই পেন্টহাউস আর মিলার কর্পোরেশনকে আমি নিজের হাতে ছাই করে দেব।”

“জ্যাক্সন! আমি তোমার বাবা!” আর্থার চেঁচিয়ে উঠতে চাইলেন।

“তাহলে বাবার মতো থাকো, শাসকের মতো নয়!” জ্যাক কড়া গলায় বলল। “কারণ ক্লারা যদি আর এক ফোটা চোখের জল ফেলে… তবে পৃথিবীর কোনো আইনজীবী তোমাকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না।” ফোনটা কেটে গেল।

পেন্টহাউসের এসি রুমে বসেও আর্থার মিলারের কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঠাণ্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ল।
তিনি দরজার দিকে তাকালেন, যেখানে কিছু আগে সেই চশমা পরা মেয়েটি দাঁড়ানো ছিল।

আর্থার মিলার বুঝতে পারলেন তাঁর কোটি টাকার সাম্রাজ্যের অহংকারে আজ প্রথম গভীর ফাটল ধরেছে। তাঁর একরোখা ছেলে আর এই অনাথ মেয়েটি মিলে বোস্টনে এমন এক সত্যের দেয়াল তৈরি করেছে, যা ভাঙার ক্ষমতা মিলার কর্পোরেশনের আর নেই!

চলবে?

#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_26

বোস্টন থেকে লস এঞ্জেলেসের দূরত্ব প্রায় তিন হাজার মাইল। কিন্তু জ্যাক আর ক্লারার কাছে এই তিন হাজার মাইল দূরত্ব যেন দুটো ভিন্ন গ্রহের মতো শোনাত। লস এঞ্জেলেসের অলিম্পিক ট্রেনিং সেন্টারের কাঁচের জানালা দিয়ে দুপুরের প্রখর ক্যালিফোর্নিয়ান রোদ এসে পড়ছিল কাঠের চকচকে বাস্কেটবল কোর্টের ওপর। বাতাসে সি-সল্ট আর কড়া সানস্ক্রিনের গন্ধ। জ্যাক ভিজে ল্যাকল্যাকে জার্সির হাতা গুটিয়ে বেঞ্চে বসে আছে। চারপাশে ইউএসএ ন্যাশনাল দলের বাকি প্লেয়াররা হাসিঠাট্টা করছে, ট্রেনাররা বরফের প্যাক দিয়ে কারো হাঁটু মাসাজ করছে। কিন্তু জ্যাকের মন সেখানে নেই। সে একমনে নিজের হাতের তালুতে রাখা ডর্ম রুমের সেই স্পেয়ার চাবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। পকেটে রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠতেই জ্যাক এক নিমেষে তুলে নিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে সাউথ বোস্টনের ল্যান্ডলাইনের নম্বর। “মিস ক্যালকুলেটর?” জ্যাকের গলার স্বর ঘুমভাঙা আবেশ আর চরম ব্যাকুলতায় ভীষণ নিচু শোনাল। ওপাশ থেকে হালকা এক দীর্ঘশ্বাসের শব্দ এলো। তারপর ভেসে এলো সেই মিষ্টি, শান্ত গলা, “আমি। ক্যালিফোর্নিয়ায় পৌঁছেও কি আপনি ঘড়ি ধরে কফি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন, মিস্টার মিলার?”

জ্যাক চোখের মণি দুটো বুজে ফেলল। ক্লারার গলার শব্দটা শোনার সাথে সাথে ক্যালিফোর্নিয়ার এই উত্তপ্ত দুপুরের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তেই উবে গেল।

“আমি ঘড়ি দেখা বন্ধ করে দিয়েছি, ক্লারা,” জ্যাক ফিসফিস করে বলল। তার হাতের শক্ত মুঠি চাবিটাকে চেপে ধরল। “কারণ সময় এখানে থমকে আছে। তুমি ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার এই রোদের কোনো উত্তাপ নেই। তুমি ঠিকমতো খাচ্ছ তো? নাকি সারারাত স্রেফ এক্সেল শিটের ডেবিট-ক্রেডিট গিলে দিন পার করছ?”

সাউথ বোস্টনের ছোট রুমটায় বসে ক্লারা ফোন কানে ধরে মুচকি হাসল। তার পরনে একটা সাধারণ সুতির কুর্তি, চুলগুলো ঢিলেঢালা করে খোঁপা করা। টেবিলে কফির কাপ থেকে তখনও ধোঁয়া উঠছে।

“আমি একদম ঠিক আছি, জ্যাক,” ক্লারা নরম গলায় বলল। সে নিজের বুকের ওপর হাত রাখল, যেখানে জামার আড়ালে ঝুলছিল জ্যাকের দেওয়া সেই সোনার লকেটটা। “আর আপনার বাবা… সেই ঘটনার পর থেকে আর কোনো লোক পাঠাননি। হয়তো উনি একটু ধাক্কা খেয়েছেন।”

“ধাক্কা উনি এখনো পাননি, ক্লারা,” জ্যাকের গলার স্বর এক মুহূর্তে কড়া আর পুরুষালী হয়ে উঠল। “আমি বোস্টনে ফিরে আসার পর উনি বুঝবেন মিলার বংশের সত্যিকারের তেজ কোনটা। তুমি স্রেফ নিজের কাজ চালিয়ে যাও। কোনো সমস্যা হলে লিয়োকে ফোন দেবে। আর রাতে শোয়ার আগে বাথরুমের লক আর পেছনের জানালার হুক দুটো ভালো করে চেক করবে। মনে থাকবে?”

“মনে থাকবে, আমার একরোখা ক্যাপ্টেন,” ক্লারা হেসে ফেলল। দূরত্ব তাদের শরীরকে আলাদা রেখেছিল সত্যি, কিন্তু দূরভাষের ওপারে দুজন মানুষের প্রতিটা নিঃশ্বাসের শব্দ যেন তাদের আত্মা দুটোকে আরও বেশি শক্ত বন্ধনে বেঁধে ফেলছে।

পরদিন সকাল নয়টা। বোস্টন ডাউনটাউনের ‘বোস্টন ফার্স্ট সোশ্যাল ব্যাংক’-এর প্রাচীন ইটের ইম্পোজিং হেডকোয়ার্টার। শতাব্দীর পুরোনো এই ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটি বোস্টনের বড় বড় ব্যবসায়ী ও অভিজাত পরিবারের ট্রাস্ট ফান্ড হ্যান্ডেল করে। মেইন কনফারেন্স রুমে গোল হয়ে বসে আছেন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সাতজন প্রবীণ ডিরেক্টর। সবার সামনে চা-কফির কাপ ঠান্ডা হয়ে জমে গেছে, মুখের ভঙ্গি থমথমে। টেবিলের মাথায় বসে আছেন প্রফেসর উইলিয়াম অ্যান্ডারসন। আর তাঁর ঠিক পাশের চেয়ারে শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে গাঢ় ধূসর স্যুটে সাজা ক্লারা বেনেট। ব্যাংকের চেয়ারম্যান মিস্টার ফার্গুসন একখানা বেশ মোটা লাল রঙের চামড়ায় বাঁধানো স্টেটমেন্ট ফাইল ক্লারার সামনে ঠেলে দিলেন।

“মিস বেনেট,” ফার্গুসন সাহেব বেশ উদ্বেগভরা গলায় বললেন। “প্রফেসর অ্যান্ডারসন আপনার কাজের প্রশংসা করেছেন বলেই আমরা ব্যাংকের এই অতি-গোপনীয় ফাইলটা আপনাকে দেখাচ্ছি। গত দুই কোয়ার্টারে আমাদের চারটে বড় ট্রাস্ট ফান্ডের ট্রান্সফারে আড়াই কোটি ডলারের হিসাব মিলছে না। অথচ বাইরের কোনো হ্যাকিং বা জালিয়াতির প্রমাণ মেলেনি। প্রতিটা এন্ট্রি নাকি ইন্টারনাল অথরাইজেশন দিয়ে হয়েছে!”

ক্লারা ফাইলের পাতা উল্টাতে শুরু করল। তার আঙুলগুলো দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছে, এক পৃষ্ঠা থেকে অন্য পৃষ্ঠায়। প্রতিটি ট্রানজ্যাকশন আইডি, ব্যাংকিং কোড আর সিস্টেম জেনারেটেড লগের পঠন সে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের ব্রেনে প্রসেস করে নিচ্ছে।

“আপনারা কি কোনো বাইরের অডিট ফার্মকে এই ফাইল দেখিয়েছেন?” ক্লারা চোখ তুলে জিজ্ঞেস করল।

“দেখিয়েছিলাম,” এক ডিরেক্টর বিরক্তির সাথে বললেন। “আমেরিকার প্রখ্যাত ‘এমবি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ তিন সপ্তাহ ধরে ঘেঁটে বলেছে সব ওকে আছে। কিন্তু আমাদের মূল ভল্টের ক্যাশ ব্যালেন্সের সাথে ডিজিটাল লেজার মেলেনি! এটা জানাজানি হলে বোস্টন ব্যাংকিং সার্কেলে ধস নামবে।”

ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর সামান্য ঠেলে সোজা হয়ে বসল। সে প্রফেসর অ্যান্ডারসনের দিকে এক নজর তাকাল। অ্যান্ডারসন সাহেব মুচকি হেসে ঘাড় নাড়লেন যেন বলছেন, ‘এবার তোমার চাল, ক্লারা।’

“মিস্টার ফার্গুসন,” ক্লারা শান্ত অথচ বরফের মতো শক্ত গলায় বলল। “বাইরের লোক কখনো ইন্টারনাল অথরাইজেশন বাইপাস করতে পারে না, যতক্ষণ না সিস্টেমের ভেতরের কেউ তাকে ‘ডিজিটাল মাস্টার কি’ বানিয়ে দিচ্ছে। আপনারা ভুল জায়গায় খুঁজছেন। আপনারা খুঁজছেন বাইরের হ্যাকার, কিন্তু ফাঁকটা তৈরি করা হয়েছে আপনার ব্যাংকের নিজস্ব সার্ভার রুমে।” কনফারেন্স রুমে উপস্থিত সাতজন ডিরেক্টর একযোগে সোজা হয়ে বসলেন!

“আপনি এত নিশ্চিত হচ্ছেন কীভাবে, মিস বেনেট?” ফার্গুসন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

“কারণ ইন্টারনাল কোডিংয়ের এই ব্যাচ-প্রসেসিং প্যাটার্ন কোনো সিস্টেম বাগ নয়,” ক্লারা ফাইলটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর টোকা মারল। “এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা এক ব্যাক-ডেটেড এন্ট্রি জালিয়াতি। আমাকে তিন দিন সময় দিন। আমি ব্যাংকের পেছনের মূল অপরাধীর নাম আর টাকা কোথায় গেছে দুটোই আপনাদের ডেস্কে এনে দেব।”

সাউথ বোস্টনের রাত তখন বারোটা। ডর্ম রুমের কোণের কাঠের টেবিলজুড়ে ছড়ানো ছিল ব্যাংকের হাজারো ডিজিটাল ট্রানজ্যাকশন শিটের প্রিন্টআউট। টেবিল ল্যাম্পের কড়া আলো এসে পড়েছে ক্লারার মুখের ওপর। তার চোখের নিচে হালকা কালচে ছায়া, কিন্তু কাজের জায়গায় তার মনোযোগ ছিল লেজারের মতো তীক্ষ্ণ। পাসেই একটা কাঁচের গ্লাসে অর্ধেক হয়ে যাওয়া ঠান্ডা পানি আর কিছু শুকনো বিস্কুট। জ্যাক ক্যালিফোর্নিয়ায় প্র্যাকটিস সেশনে ব্যস্ত, তাই ক্লারা তাকে এই কাজের চাপের কথা বলে বিরক্ত করতে চায়নি। এটা তার নিজের লড়াই, ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’-এর নিজস্ব ভিত্তি শক্ত করার লড়াই।

ক্লারা তার গাণিতিক মগজকে চরম সীমায় নিয়ে গিয়ে প্রতিটা ব্যাংকিং ইন্টারভাল ট্র্যাকিং করছে। হঠাৎ করেই তার চোখ আটকে গেল একটা ছোট কোডের ওপর—`TRST-8092-B`।

“পাওয়া গেছে!” ক্লারা সজোরে নিঃশ্বাস ফেলল। হিসেবটা অবিশ্বাস্য রকমের ধূর্ত! টাকাটা সোজা কোনো প্রাইভেট অ্যাকাউন্টে যায়নি। প্রতি মাসের নির্দিষ্ট একটা দিনে, রাত তিনটে চার মিনিটে ব্যাংকের মূল ফান্ড থেকে আধা পার্সেন্ট করে ক্যাশ ট্রান্সফার করা হতো একটা ভুয়া অফশোর রিয়েল এস্টেট টিমের ফান্ডে। আর সেই ফান্ডের ডিজিটাল সই ছিল ব্যাংকেরই চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার (CFO) মিস্টার ব্রাউনের! আরও ভয়ংকর বিষয় হলো সেই ভুয়া রিয়েল এস্টেট ফান্ডের মূল শেয়ারহোল্ডারদের নামের তালিকায় আবছাভাবে জড়িয়ে আছে ‘মিলার ফ্রন্ট’-এর একটা সাবসিডিয়ারি কোম্পানির নাম!
ক্লারা চেয়ারে পেছনে হেলান দিয়ে থমকে গেল। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। তার মানে মিস্টার ব্রাউন একা এই জালিয়াতি করেননি! এর পেছনে কি আর্থার মিলারের হাত আছে? নাকি আর্থার মিলারকে বিপদে ফেলার জন্য অন্য কোনো তৃতীয় শক্তি গোপনে এই নোংরা খেলা খেলছে? ক্লারা দ্রুত নিজের ডায়েরি বের করে নোট নিতে শুরু করল। তার চোখের সামনে পুরো জালিয়াতির মাকড়সার জালটা স্পষ্ট ফুটে উঠতে লাগল।

পরদিন বিকেল তিনটা। বোস্টন ফার্স্ট সোশ্যাল ব্যাংকের মেইন অডিটোরিয়াম। আজ শুধু ব্যাংকের ডিরেক্টররা নন, উপস্থিত আছেন বোস্টন ব্যাংকিং অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকজন হেভিওয়েট প্রতিনিধি এবং ব্যাংকের সিএফও মিস্টার ব্রাউন নিজে। মিস্টার ব্রাউন দামি সুট পরে বেশ অহংকারী ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে চুরুটের ধোঁয়া ছাড়ছে। তিনি ক্লারাকে দেখে বিদ্রূপ করে বললেন, “ফার্গুসন সাহেব, আপনি কি শেষ পর্যন্ত এই ইউনিভার্সিটির কচি স্কলারশিপের মেয়েটার কথায় বিশ্বাস করে ব্যাংকের কোটি টাকার অডিট রিপোর্ট এর হাতে তুলে দিলেন? এ মেয়ে ব্যাংক স্ট্রাকচারের ‘বি’ বর্ণও বোঝে?”

ক্লারা কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে উঠে প্রজেক্টর স্ক্রিনের সামনে এসে দাঁড়াল। তার হাতে ছিল কেবল একখানা কালো পেনড্রাইভ। সে পেনড্রাইভটা ল্যাপটপে কানেক্ট করে প্রজেক্টর চালু করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল হাজারো জটিল গ্রাফ, সার্ভার আর আইপি ট্র্যাকিং স্টেটমেন্ট। “মিস্টার ব্রাউন,” ক্লারা স্ফটিকের মতো পরিষ্কার আর ঠাণ্ডা গলায় বলা শুরু করল। “আমি ‘বি’ বর্ণ বুঝি কি না জানি না, তবে আমি বুঝি যে গত ১৪ মাসে আপনি `TRST-8092-B` আইডির মাধ্যমে সুইজারল্যান্ডের একটা ভুয়া শেল অ্যাকাউন্টে মোট দুই কোটি ত্রিশ লাখ ডলার ট্রান্সফার করেছেন।”

কনফারেন্স রুমে এক মুহূর্তে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো! মিস্টার ব্রাউনের হাতের চুরুটটা মেঝের ওপর খসে পড়ল! তার মুখের রঙ মুহূর্তের মধ্যে ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল।

“এ… এসব বোগাস কথা!” ব্রাউন চিৎকার করে উঠলেন। “ইউ হ্যাভ নো প্রুফ!”

“প্রমাণ?” ক্লারা একটা স্লাইড চেঞ্জ করল। “প্রতিটি ট্রানজ্যাকশনের সময় আপনার পার্সোনাল ল্যাপটপের ডিজিটাল সিগনেচার আর আপনার ক্লাউড আইপি ম্যাচ করেছে। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো আপনি টাকাটা সরানোর জন্য যে রিয়েল এস্টেট ফ্রন্টের নাম ব্যবহার করেছেন, তার ভুয়া আইনি ডকুমেন্টে আপনি আমার সই জাল করার চেষ্টা করেছিলেন!”

ক্লারা টেবিলে ফাইলটা সজোরে মারল। “ব্যাংকের ভল্ট খালি করার অপরাধে এবং আইনি তথ্য জালিয়াতির দায়ে আপনার বিরুদ্ধে বোস্টন পুলিশ ডিপার্টমেন্ট অলরেডি ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছে, মিস্টার ব্রাউন। দরজাটা দেখুন।”

কনফারেন্স রুমের ভারী দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো বোস্টন মেট্রোপলিটন পুলিশের চারজন সশস্ত্র অফিসার! মিস্টার ব্রাউন আর কোনো কথা বলতে পারলেন না। কাঁপতে কাঁপতে তিনি পুলিশের হাতে হাতকড়া পরে রুম ছেড়ে বের হয়ে গেলেন। ক্ল্যারার এই ক্ষুরধার মেধা, উপস্থিত বুদ্ধি আর অকাট্য প্রমাণের সামনে পুরো ব্যাংকিং বোর্ডের অভিজ্ঞ প্রবীণেরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ব্যাংকের চেয়ারম্যান মিস্টার ফার্গুসন নিজে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে ক্লারার সামনে দাঁড়ালেন। তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে ক্লারার দিকে হাত বাড়ালেন। “মিস বেনেট… ইউ আর নট জাস্ট অ্যান অডিটর। ইউ আর দ্য কুইন অফ ফিনান্সিয়াল অডিট!” ফার্গুসন সাহেব স্বহস্তে পঁচিশ হাজার ডলারের স্পেশাল লিগাল অডিট ফি-এর চেক এবং ব্যাংকের স্থায়ী কনসালটেন্সি চুক্তিপত্র ক্লারার হাতে তুলে দিলেন।

সন্ধ্যা সাতটা। লস এঞ্জেলেসের ন্যাশনাল অলিম্পিক ট্রেনিং সেন্টারের কাঁচের দেওয়ালে সানসেটের রক্তিম আলো। জ্যাক ড্রেসিংরুমে বসে আইপ্যাডে ‘বোস্টন ইভনিং লাইভ’-এর নিউজ চ্যানেলটা দেখছে। টিভি স্ক্রিনে ব্রেকিং নিউজ ভেসে উঠছে,

“বোস্টন ফার্স্ট সোশ্যাল ব্যাংকের আড়াই কোটি ডলারের ইন্টারনাল ফ্রড কভার-আপ উন্মোচন করলেন তরুণী অডিটর ক্লারা বেনেট! সিএফও গ্রেফতার!”

স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে প্রেসের শয়ে শয়ে ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের সামনে গাঢ় নীল কোট পরা সেই চশমাওয়ালি মেয়েটি শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার গলায় ঝুলছে জ্যাকের দেওয়া সেই সোনার লকেটটা। জ্যাকের মুখের কোণে ফুটে উঠল হাসি। তার দলের বাকি প্লেয়াররা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নিউজটা দেখছিল। টিমের মেইন সেন্টার ‘মারকাস’ জ্যাকের পিঠে এক সজোরে থাপ্পড় মেরে বলল, “ম্যান! তোর বউ তো আস্ত এক বোস্টন কাঁপানো সিংহী! এই মেয়েকে তুই সামলাস কীভাবে, জ্যাক?”

জ্যাক উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন ভালোবাসার এক অনাবিল শিখা। “আমি ওকে সামলাই না, মারকাস,” জ্যাক পকেটে হাত পুরে গর্বিত গলায় বলল। “আমি স্রেফ ওর সাম্রাজ্যের প্রটেক্টর হয়ে পাশে থাকি।”

জ্যাক সোজা নিজের ফোন বের করে ক্লারাকে মেসেজ পাঠাল, “অভিনন্দন, মাই কুইন। বোস্টন জয় হয়ে গেছে। এবার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ট্রফি নিয়ে আমি ফিরছি। প্রস্তুত থেকো, কারণ এবার ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’-এর আসল রাজ্য শুরু হবে।”

বোস্টনের সেই ছোট ডর্ম রুমে বসে ক্লারা মেসেজটা পড়ল। বাইরে হিমেল হাওয়া বইছে, কিন্তু তার বুকের ভেতরটা এক পরম আত্মবিশ্বাস আর ভালোবাসার উষ্ণতায় ভরে গেল। দূরত্বের এই কঠিন পরীক্ষা তাদের দুর্বল করেনি, বরং ক্লারাকে বানিয়ে দিয়েছে বোস্টনের নতুন ফিনান্সিয়াল রানী, আর ক্যালিফোর্নিয়ায় জ্যাককে বানিয়ে দিয়েছে এক অপরাজেয় বাস্কেটবল বীর!

চলবে?