#Out_Of_Bounds ~33
#Ishrat_Jahan_Jarin
বোস্টন শহরের আকাশে আজ যেন ভোর থেকেই এক অনাবিল, স্নিগ্ধ সুপ্রভাত নেমে এসেছে। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া ও বোস্টন হকি মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া শান্ত সকালের রোদে এক অপূর্ব আলোর উৎসব।
আজ সেই বহুল প্রতীক্ষিত দিন বোস্টন শহরের সুপ্রসিদ্ধ এবং তিন শতাব্দী প্রাচীন ‘বোস্টন ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ড ক্যাথেড্রাল’-এ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত বিবাহ উৎসব। সকাল সাতটা থেকেই ক্যাথেড্রালের সুবিশাল গথিক কারুকার্যখচিত চত্বরে উৎসবের সাড়া পড়ে গেছে। ক্যাথেড্রালের মূল ফটক থেকে শুরু করে আলটার পর্যন্ত পুরো পথটি সাজাতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ত্রিশ হাজার তাজা শুভ্র টিউলিপ, গোলাপি কাসাব্লাঙ্কা লিলি এবং প্যারিস থেকে বিশেষ বিমানে উড়িয়ে আনা দুষ্প্রাপ্য অরকিড। লাল মখমলের কার্পেট বিছানো হয়েছে ক্যাথেড্রালের ভেতরের দীর্ঘ আইল জুড়ে।মবোস্টন পুলিশের বিশাল দল সকাল আটটার মধ্যেই গোটা এলাকা কর্ডন করে ফেলেছে। পুরো কমনওয়েলথ এভিনিউতে বিশেষ ট্রাফিক ডায়ভার্সন দেওয়া হয়েছে। সাউথ বোস্টন থেকে শুরু করে ব্যাক বে অঞ্চলের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে শতাব্দীর সেরা এই বিয়ের এক ঝলক দৃশ্য দেখার জন্য। আমেরিকার বিখ্যাত কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তা, বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের বরেন্য ডিন ও অধ্যাপকমণ্ডলী থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত এসে হাজির হয়েছেন। ক্যাথেড্রালের রঙিন কাঁচের জানালা দিয়ে সকালের সোনালী রোদ ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে এক অলৌকিক মায়াবী আবহাওয়া তৈরি করেছে। গীতবিতানের দিক থেকে অর্গ্যানের মৃদু ও গম্ভীর সুর গুঞ্জরিত হচ্ছে।
আলটারের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল আজকের বর জ্যাক্সন মিলার। জ্যাকের পরনে আজ একখানা নিখুঁত, ইতালিয়ান কাস্টম-মেড ব্ল্যাক টাক্সিডো স্যুট। সাদা ধবধবে শার্টের ওপর ধরা আছে মসৃণ রেসমের বো-টাই। তার সুবিন্যস্ত চুলগুলো সুন্দর করে ব্যাক-কম্ব করা। তার ছয় ফুট তিন ইঞ্চির প্রকাণ্ড, অ্যাথলেটিক অবয়বে আজ কোনো তাচ্ছিল্য বা পুরোনো উগ্রতার ছায়া নেই। সেখানে জ্বলজ্বল করছে এক অপূর্ব, রোমান্টিক স্থৈর্য ও ব্যাকুলতা। তার ডান পাশে ‘বেস্ট ম্যান’ হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল মার্ক, টবি আর লিয়ো। বাস্কেটবল টিমের বাকি সদস্যরাও সারিবদ্ধভাবে বসে রয়েছে সামনের ভিআইপি আসনে। মার্ক বারবার টাইয়ের নট সোজা করছিল আর জ্যাকের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল।
“নার্ভাস লাগছে, ক্যাপ্টেন?” মার্ক জ্যাকের কনুইয়ে হালকা গুঁতো দিয়ে নিচু গলায় বলল। “এনসিএএ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে দশ হাজার চিৎকার করা ফ্যানদের সামনে তো তোর চোখের পাতা কাঁপতেও দেখিনি! আজ তোর কপালে এত ঘাম কেন বল তো?”
জ্যাক চোখের পলক না ফেলে সামনের আলটারের দিকে তাকাল। তার ধূসর চোখ দুটো ফায়ার-পিটের চেয়েও বেশি আর্দ্র হয়ে উঠেছিল।
“কোর্ট আর জীবন এক নয়, মার্ক,” জ্যাক গম্ভীর কিন্তু কাঁপানো গলায় উত্তর দিল। “কোর্টে ভুল করলে টাইম-আউট পাওয়া যায়, শর্ট মিস করলে রিবাউন্ড নেওয়া যায়… কিন্তু আজ যে ট্রফিটা আমার হাতে আসতে যাচ্ছে, সেটা যদি আমার হাত থেকে এক সেকেন্ডের জন্য ফসকে যায়, তবে আস্ত জাক্সন মিলারটাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি আজ বিজয়ী হতে আসিনি, আমি স্রেফ নিঃশ্বাসের ঠিকানা পেতে এসেছি।”
লিয়ো হাসল। “আর দু-মিনিট ধৈর্য ধর, ভাই। মিস ক্যালকুলেটর তোর এই অধৈর্য চেহারা দেখলে আবার কোনো কঠিন গাণিতিক সূত্রের পেনাল্টি বসিয়ে দেবে!”
ঠিক তখনই ক্যাথেড্রালের শীর্ষে থাকা প্রাচীন বিশাল পেতলের প্রধান ঘণ্টাটি এক সাথে তিনটি গম্ভীর ধ্বনিতে বেজে উঠল, পুরো ক্যাথেড্রালে উপস্থিত চার শতাধিক সম্মানিত মেহমান এক লহমায় নিজেদের আসন ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। গীতবিতানের গায়ক দল এক যোগে শুরু করল সেই অমর ওয়েডিং মার্চ টিউন, হিয়ার কামস দ্য ব্রাইড…’
–
ক্যাথেড্রালের সুবিশাল প্রবেশদ্বারের জোড়া মেহগনি দরজা ধীরে ধীরে দুটি দিকে উন্মুক্ত হয়ে গেল।
ক্যাথেড্রালের প্রতিটি চোখ, প্রতিটি ক্যামেরা লেন্স এক সাথে স্থির হয়ে গেল সেই প্রবেশদ্বারে। ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করলেন আজকের কনে মিস ক্লারা বেনেট। আর তার ডান হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় পরম শ্রদ্ধায় ও মমতায় ধরে হেঁটে আসছেন স্বয়ং আর্থার মিলার! ক্ল্যারার পরনে সেই গাঢ় রেশমি সাদা রাজকীয় ওয়েডিং গাউন। গাউনের পেছনে বিস্তৃত প্রায় দশ ফুট দীর্ঘ সিল্কের রেসমি ট্রেইল, যা ধরে হেঁটে আসছে সাউথ বোস্টন অনাথ আশ্রমের দুটি ছোট ফুটফুটে এতিম শিশু। ক্লারার মাথায় রাজহাঁসের ডানার মতো সূক্ষ্ম কারুকার্য করা এনটিক ডায়মন্ডের টায়রা, আর মুখের সামনে ঝুলছিল পাতলা রেশমি সাদা ভেইল। আর তার ধবধবে সাদা গলার মাঝে রোদ ঠিকরে পড়ছিল জ্যাকের প্রয়াত মায়ের সেই রাজকীয় এনটিক স্যাফায়ার ও প্ল্যাটিনামের নেকলেস থেকে। ক্লারা যখন ধীর, স্থির ও মার্জিত পদে লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে, তখন উপস্থিত অনেক প্রবীণ অধ্যাপকদের চোখ জলে ভিজে উঠল। যে অনাথ মেয়েটি বোস্টন ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরির ধুলো পড়া টেবিলে বসে স্কলারশিপের খাতা আঁকড়ে ধরে দিন গুজরান করত, যে মেয়েটিকে সমাজের উঁচু তলার মানুষগুলো একদিন ‘অযোগ্য’ বলে দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছিল সে আজ কেবল এক শতকোটিপতি পরিবারের কুলবধূ হিসেবে হাঁটছে না। সে হাঁটছে এক বিজয়ী রাজকন্যক হিসেবে, যে নিজের অদম্য মেধা, চরিত্র ও সততা দিয়ে পুরো বোস্টন শহরকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছে। জ্যাক এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। তার বুকের ভেতরের স্পন্দন যেন কোনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। চশমা আর ভেইলের আড়ালে থাকা ক্লারার সেই সুপরিচিত শান্ত নীল চোখ দুটো তাকে নিঃশব্দে বলছি, ‘আমি এসে গেছি, মিস্টার একরোখা ক্যাপ্টেন। আপনার সমস্ত অংক আজ মিলে গেছে।’
আর্থার মিলার ধীর পায়ে ক্লারাকে নিয়ে আলটারের একদম সামনে এসে থামলেন। তিনি অত্যন্ত মায়ায় ক্লারার হাতটি আলতো করে তুলে এনে সোপর্দ করলেন পুত্র জ্যাক্সন মিলারের সুবিশাল, শক্ত হাতের তালুতে। জ্যাকের হাতটা মৃদু কাঁপছে। ক্লারার ছোট, উলের মতো নরম হাতটা ছোঁবামাত্রই তার শরীরে যেন এক বিদ্যুত তরঙ্গ খেলে গেল। আর্থার মিলার দুই হাত দিয়ে তাদের দুজনের যুক্ত হাত দুটিকে আবৃত করলেন। “আমার অসংযত, উগ্র ছেলেটাকে আজ তোমার হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দিলাম, মা,” আর্থার অত্যন্ত আবেগাপ্লুত ও ভারী গলায় বললেন। “আজ থেকে তোদের এই ভালোবাসাই আমাদের পুরো মিলার বংশের একমাত্র আলো ও অহংকার। ওকে ভালোবাসায় বাঁচিয়ে রেখো।”
জ্যাক তার বাবার চোখের দিকে তাকাল। যে বাবার সাথে তার একসময় দূরত্বের পাহাড় ছিল, আজ সেই বাবার চোখে পরম আস্থা দেখে জ্যাক নিজের মাথাটা আলতো করে ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানাল।
–
প্রবীণ আর্চবিশপ ও পাস্টর তাঁর সামনে থাকা এনটিক সোনায় বাঁধানো পবিত্র বাইবেলটি উন্মুক্ত করলেন। পুরো ক্যাথেড্রাল জুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা। এমনকি কোনো ক্যামেরার ফ্ল্যাশও যেন ঈশ্বরের এই পবিত্র মুহূর্তকে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল না।
“প্রিয় সুধী ও ঈশ্বরের সন্তানেরা,” পাস্টরের গম্ভীর, সুরেল ও আধ্যাত্মিক গলার শব্দ প্রতিধ্বনি তৈরি করল গথিক ছাদের প্রতিটি কোণায়। “আজ আমরা এই পবিত্র আলটারের সামনে মিস্টার জ্যাক্সন মিলার ও মিস ক্লারা বেনেটের দুটি আত্মাকে চিরন্তন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে সমবেত হয়েছি। ঈশ্বরপ্রদেয় প্রেম কোনো পার্থিব সম্পদ, বংশের অহংকার বা ক্ষমতার ওপর গড়ে ওঠে না। তা গড়ে ওঠে দুটি হৃদয়ের পারস্পরিক আত্মত্যাগ, সততা ও অটুট বিশ্বাসের ওপর।”
পাস্টর প্রথমে ঘুরে দাঁড়ালেন বর জ্যাকের দিকে।
“মিস্টার জ্যাক্সন মিলার, আপনি কি পরম ঈশ্বরের উপস্থিতি সাক্ষী রেখে, এই মহীয়সী ও বিশ্বস্ত নারী ক্লারা বেনেটকে আপনার ধর্মীয় ও বৈধ অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত? আপনি কি প্রতিজ্ঞা করছেন সুখে ও দুঃখে, স্বাস্থ্য ও ব্যাধিতে, সম্পদে ও দারিদে, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাঁকে নিজের প্রাণাধিক ভালোবাসবেন, সম্মান করবেন এবং সব বিপদ থেকে আগলে রাখবেন?”
জ্যাক এক সেকেন্ডের একশত ভাগের এক ভাগ সময়ও অপচয় করল না। সে সামান্য ঘুরে সোজা ক্লারার চোখের দিকে তাকাল। তার কড়া, স্পষ্ট ও পরম গভীর কন্ঠস্বর ক্যাথেড্রালের প্রতিটা কোণায় গমগম করে উঠল, “আই ডু।”
পাস্টর এবার মিষ্টতার সাথে ঘুরে দাঁড়ালেন কনে ক্লারার দিকে। “মিস ক্লারা বেনেট, আপনি কি পরম ঈশ্বরের উপস্থিতি সাক্ষী রেখে, এই পুরুষ জ্যাক্সন মিলারকে আপনার ধর্মীয় ও বৈধ স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত? আপনি কি প্রতিজ্ঞা করছেন জীবনের প্রতিটি সত্য ও সংকটে, আঁধার ও আলোতে, স্বাস্থ্যে ও ব্যাধিতে, চিরদিন তাঁর পাশে থাকবেন, তাঁকে পথ দেখাবেন এবং পরম ভালোবাসায় আগলে রাখবেন?”
ক্লারা চশমার আড়াল থেকে জ্যাকের ধূসর চোখের দিকে তাকাল। সে হাতের অনামিকায় থাকা মিলার বংশের সুপ্রাচীন ডায়মন্ড রিংটি স্পর্শ করল, যা জ্যাক তাকে বোস্টন লেকের পাড়ে দিয়েছিল। ক্লারা কোনো দ্বিধা ছাড়া খুব শান্ত, রেশমি কিন্তু পর্বতসম শক্ত গলায় উত্তর দিল ” ইয়েস আই ডু।”
“তবে আপনাদের বিবাহের পবিত্র আংটি বিনিময় করুন,” পাস্টর নির্দেশ দিলেন।
লিয়ো অতি সাবধানে ভেলভেটের লাল ট্রের ওপর রাখা দুটি রাজকীয় হীরার আংটি এগিয়ে দিল।
জ্যাক অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ক্লারার বাঁ হাতের অনামিকাটি ধরল। ক্লারার নরম আঙুলে সেই ডায়মন্ডের ওয়েডিং ব্যান্ডটি পরিয়ে দেওয়ার সময় জ্যাকের মনে হলো, আজ সে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মালিক হয়ে গেছে। এরপর ক্লারাও নিজের ছোট, মসৃণ হাত দিয়ে জ্যাকের প্রকাণ্ড আঙুলে বিয়ের সোনার আংটিটি শক্ত করে গলিয়ে দিল। পাস্টর তাঁর দুই হাত নবদম্পতির মাথার ওপর প্রসারিত করে পরম করুণাময়ের পবিত্র আশীর্বাদ পাঠ করলেন,
“ঈশ্বর যে দুটি আত্মাকে আজ এক পরম পবিত্র সুতোয় বেঁধে দিয়েছেন, কোনো নশ্বর মানুষ যেন কখনো তাদের বিচ্ছিন্ন করতে না পারে! পরম পিতার অসীম কৃপায়, বাই দ্য পাওয়ার ভেস্টেড ইন মি, আই নাউ প্রনাউন্স ইউ অফিশিয়ালি হাসব্যান্ড অ্যান্ড ওয়াইফ! ইউ মে নাউ কিস ইউর বিউটিফুল ব্রাইড, মিস্টার মিলার!”
পাস্টরের কথা শেষ হওয়ার সাথেই পুরো ক্যাথেড্রালে উপস্থিত চার শতাধিক অতিথি এক সাথে এমন প্রচণ্ড হাততালিতে ফেটে পড়লেন যে মনে হলো যেন আকাশে কোনো জয়ধ্বনি হচ্ছে, করতালি! করতালি! করতালি! জ্যাক অতি সাবধানে, কাঁপা হাতে ক্লারার মাথার সুক্ষ্ম রেশমি ভেইলটি পেছনে সরিয়ে দিল। ক্ল্যারার চশমা পরা নীল চোখ দুটোতে তখন আনন্দের জলের ফোঁটা চিকচিক করছে। তার ধবধবে গাল দুটো গোলাপি হয়ে উঠেছে লজ্জায় আর আবেগে।
জ্যাক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে দুই হাত দিয়ে ক্লারার মুখটা আলতো করে নিজের দিকে তুলে ধরল। পুরো পৃথিবীর সমস্ত ক্যামেরার সামনে, স্বজন ও বন্ধুদের সামনে সে ঝুঁকে পড়ে ক্লারার কপালে, চোখের পাতায় এবং শেষে তার নরম ঠোঁটে দীর্ঘ, গভীর ও ব্যাকুল এক চুম্বন এঁকে দিল। ক্লারা নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল জ্যাকের চওড়া পিঠ। আজ তাদের সমস্ত অপমান, অশ্রু, সাউথ বোস্টনের সেই পুরোনো লাইব্রেরির কোণায় সয়ে যাওয়া কষ্ট আর কোর্টের রক্তক্ষরণ শেষ হয়ে জন্ম নিল এক অমর প্রেমের উপাখ্যান!
–
দুপুর আড়াইটা। বোস্টন ডাউনটাউনের অতি-অভিজাত ৫০ তলার ‘মিলিনিয়াম পেন্টহাউস’-এর সুবিশাল বলরুম আজ এক রূপকথার প্রাসাদে পরিণত হয়েছে। ঝাড়বাতির আলোয় হলের কাঁচের জানালার বাইরে থেকে পুরো বোস্টন শহর ও বোস্টন হারবারের সমুদ্রের নীল জলরাশি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বলরুমের মাঝখানে সাজানো হয়েছিল আট স্তরের একখানা বিশালাকার ওয়েডিং কেক, যা প্যারিসের সেরা শেফরা বিশেষ ডিজাইনে তৈরি করেছেন। দেশ-বিদেশের প্রায় পাঁচ শতাধিক আমন্ত্রিত ভিআইপি মেহমান ক্রিস্টালের গ্লাসে দামী শ্যাম্পেন নিয়ে একে অপরের সাথে কিয়ার্স করছিলেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে ইতালিয়ান ওভেশনের রাজকীয় সিমফনি বাজছিল। বলরুমের মূল গোল্ডেন থ্রোন পাশাপাশি বসেছিল রাজজোড় মিস্টার জাক্সন মিলার ও মিসেস ক্লারা বেনেট মিলার। আর্থার মিলার হাতে মাইক নিয়ে প্রধান ডায়াসে এসে দাঁড়ালেন। হলের সমস্ত আলো মৃদু হয়ে স্রেফ আর্থার মিলারের ওপর এসে পড়ল। পুরো বলরুম এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“আমার প্রিয় সুধী, সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা,” আর্থার মিলার মাইকে বলা শুরু করলেন। তাঁর কন্ঠে আজ ব্যবসায়িক অহংকার ছিল না, ছিল এক পরম পিতার অনাবিল গর্ব। “আজ আপনারা অনেকেই এই প্রাসাদে এসেছেন বোস্টনের সবচেয়ে ধনকুবের পরিবারের উত্তরাধিকারীর বিবাহ উৎসবে যোগ দিতে। আপনারা হয়তো ভাবছেন মিলার পরিবার তার বিশাল সাম্রাজ্যে আরও কোনো বড় নাম যুক্ত করেছে। কিন্তু আজ পরম ঈশ্বরের সামনে আমি একটা চরম সত্য স্বীকার করতে চাই…”
আর্থার মিলার থামলেন। তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে নববধূর আসনে বসে থাকা ক্লারার দিকে পরম মমতায় তাকালেন। “আমার হাজার কোটি ডলারের ব্যাংক ব্যালেন্স, আমার পেন্টহাউস বা এই কোম্পানির চেয়েও অনেক বড় সম্পদ হলো আমার এই বড় বউ ক্লারা!”
পুরো হলরুম জুড়ে এক অভূতপূর্ব করতালি ছড়িয়ে পড়ল। “যেদিন ক্লারা আমাদের পরিবারে পা রেখেছে,” আর্থার চোখে জল নিয়ে বলতে থাকলেন, “সেদিন সে স্রেফ আমার অসংযত ছেলেটার জীবন গুছিয়ে দেয়নি, সে আমার মৃতপ্রায় সংসারটাকে ভালোবাসার আলো দিয়ে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলেছে। সে আমাকে শিখিয়েছে যে টাকা দিয়ে ক্ষমতা কেনা যায়, কিন্তু মানুষের সত্যিকারের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা অর্জন করতে সততা আর যোগ্যতার প্রয়োজন হয়।”
আর্থার মিলার তাঁর পকেট থেকে একখানা আইনি দলিল বের করলেন। “তাই আজকের এই পরম শুভ দিনে,” আর্থার গম্ভীর ও দৃঢ় কন্ঠে ঘোষণা করলেন, “আমি ‘মিলার গ্লোবাল ফাউন্ডেশন’-এর তরফ থেকে বোস্টন শহরের সমস্ত অনাথ, দরিদ্র ও স্কলারশিপের ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার জন্য ১৫০ মিলিয়ন ডলারের এক বিশেষ ট্রাস্ট ফান্ডের ঘোষণা করছি যার নাম চিরকালের জন্য রাখা হলো, ক্লারা বেনেট এডুকেশনাল স্কলারশিপ ফান্ড’! এবং এই ফান্ডের সার্বিক পরিচালন ও ট্রাস্টি বোর্ডের একমাত্র প্রধান চেয়ারপার্সন থাকবেন স্বয়ং ক্লারা বেনেট মিলার!”
ক্লারা চমকে উঠে তার আসন থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল পরম কৃতজ্ঞতার জল। আর্থার মিলারের এই উপহার কোটি টাকার হীরার নেকলেস বা বড় গাড়ির চেয়েও তার হৃদয়ের অনেক বেশি কাছে পৌঁছে গেল। সাউথ বোস্টনের যে অনাথ মেয়েটি একদিন বই কেনার টাকার জন্য সংগ্রাম করেছিল, সে আজ বোস্টনের হাজার হাজার অনাথ শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার কাণ্ডারী হয়ে গেল! পুরো হলরুমে উপস্থিত প্রতিটা রাজকীয় মেহমান নিজেদের আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বিশ্বখ্যাত সিইও থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটির ডিন সবাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নববধূ ক্লারাকে এক ঐতিহাসিক স্ট্যান্ডিং ওভেশন প্রদান করলেন। প্রোফেসর অ্যান্ডারসন কফির কাপ উঁচিয়ে প্রবীণ পাস্টরকে বললেন, “দিস ইজ নট জাস্ট আ ওয়েডিং, দিস ইজ দ্য ভিক্টরি অফ ট্রু এডুকেশন অ্যান্ড লাভ!”
–
রাত আটটা। গ্র্যান্ড রিশেপশন উদযাপনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। নবদম্পতির ‘ফার্স্ট ড্যান্স’ বলরুমের প্রকাণ্ড ঝাড়বাতির আলো একদম মৃদু, নীলচে ও গোলাপি রঙের নরম আলোয় রূপান্তরিত হলো। সেন্ট্রাল ড্যান্স ফ্লোরের ওপর কৃত্রিম ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে তৈরি করল এক মেঘের রাজ্য। ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে উঠল প্রখ্যাত রোমান্টিক ক্লাসিক্যাল ট্র্যাক, “আই ক্যানট হেল্প ফলিং ইন লাভ উইথ ইউ…’*
জ্যাক তার স্যুটের ওপরের বোতামটা খুলে ফেলল। সে এক হাত নিজের ব্যাক-পকেটে রেখে, অন্য হাতটি অত্যন্ত সুপুরুষ ভঙ্গিতে প্রসারিত করে দিল ক্লারার সামনে। “আমাকে কি একটা নাচের সুযোগ দেবেন, মিসেস মিলার?” জ্যাক তার নিচু, নেশাক্ত ও পরম ব্যাকুল গলায় ফিসফিস করে বলল।
ক্লারা হালকা মিষ্টি হেসে নিজের ছোট, নরম হাতটি জ্যাকের প্রকাণ্ড, গরম তালুর ওপর স্থাপন করল।
“আমি কিন্তু বাস্কেটবল কোর্টের মতো খুব ভালো নাচতে পারি না, মিস্টার ক্যাপ্টেন,” ক্লারা চশমাটা একটু সোজা করে বলল। “আমি তো স্রেফ অংক মেলাতে পারি আর বইয়ের পাতায় মনোযোগ দিতে পারি।”
“অংক আমি সারাজীবন মিলিয়ে দেব, ক্লারা,” জ্যাক পরম আবেগে বলল। “তুমি স্রেফ আমাকে শক্ত করে ধরে রাখো, যাতে আমি আবার হারিয়ে না যাই।”
জ্যাক এক হাত দিয়ে ক্লারার নমনীয় কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের একদম কাছাকাছি টেনে আনল। এত কাছাকাছি যেখানে ক্লারা জ্যাকের শার্টের ভেতরে তার উন্মাদের মতো স্পন্দিত হওয়া হৃদপিণ্ডের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। ক্লারা তার ডান হাতটি আলতো করে রাখল জ্যাকের শক্ত, চওড়া কাঁধের ওপর। মিউজিকের তালে তালে দুজনের শরীর ধীরগতিতে ঘুরতে লাগল ড্যান্স ফ্লোরের ওপর। জ্যাক ক্লারাকে শূন্যে আলতো করে ঘুরিয়ে এনে আবার নিজের বুকের সাথে গভীরভাবে পিষে ফেলল। ক্লারার মাথার সিল্কের ট্রেইলটা ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করছিল।
“তুমি আজ এত বেশি সুন্দর লাগছো, ক্লারা,” জ্যাকের ঠোঁট ক্লারার কানের লতি স্পর্শ করল, তার গরম নিঃশ্বাস ক্লারার গালে আছড়ে পড়ছিল। “আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে সাউথ বোস্টনের সেই জেদী, একরোখা লাইব্রেরিয়ান মেয়েটা আজ সত্যিই আমার অর্ধাঙ্গিনী।”
“বিশ্বাস করতেই হবে, মিস্টার মিলার,” ক্লারা জ্যাকের ধূসর চোখে চোখ রেখে মিষ্টি করে হাসল। “এখন আর কোনো কাল্পনিক সূত্র নেই, কোনো ফাউল শট নেই। এখন সবটাই পরম সত্য।”
জ্যাক ক্লারাকে আরও শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরে, নিজের এক হাত দিয়ে ক্লারার নাকের ওপর থাকা চশমাটা হালকা করে ঠিক করে দিল।
“আমি বাস্কেটবল কোর্টে কখনো কোনো প্রতিপক্ষের কাছে হারিনি, ক্লারা,” জ্যাক পরম আত্মোৎসর্গে ফিসফিস করে বলল। “কিন্তু তোমার ভালোবাসার কাছে এই হেরে যাওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্রফি, আমার জীবনের সেরা জয়।”
ক্লারা নিজের মাথাটি আলতো করে এনে রেখে দিল জ্যাকের চওড়া ছাতির ওপর।
বলরুমের চারপাশে থাকা শত শত অভিজাত মেহমান, তাদের পুরোনো বন্ধুরা, প্রবীণ প্রফেসররা মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলেন মেঘের রাজ্যে নাচতে থাকা ভালোবাসার দুটি পবিত্র আলোর বিন্দু। বাইরে বোস্টন শহরের রাতের আকাশে তখন আতশবাজির হাজারো রঙের আলো ফুটছিল। কালকের নতুন ভোর তাদের জন্য নিয়ে আসবে এক অনাবিল, শান্ত ও অমর এক সুসংগঠিত জীবনের পরম বার্তা!
চলবে?

