#Out_Of_Bounds
#ishrat_jahan_jarin
#part_27
সাউথ বোস্টনের বাতাসে তখন শেষ শরতের কড়া ঠান্ডা হাওয়ার আমেজ। গাছে গাছে লালচে-হলুদ পাতার ডালপালাগুলো বাতাসের দোলায় কাঁপছে। ডর্ম রুমের ছোট ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল ক্লারা। তার পরনে একটা ধূসর সোয়েটার, গলায় জ্যাকের সেই সোনার লকেটটা উলের জামার ওপর অলসভাবে দুলছে। এক হাতে ইভনিং উইকের ফিনান্সিয়াল ম্যাগাজিন, যেখানে বোস্টন ফার্স্ট সোশ্যাল ব্যাংকের জালিয়াতি উন্মোচনের সাফল্যের খবর ছাপা হয়েছে।
ফোনটা টেবিলে ভাইব্রেট করে উঠতেই ক্লারা দ্রুত ভেতরে এসে রিসিভ করল।
“হ্যালো?”
“খবরটা তো বোস্টনের সব পেপারের ফার্স্ট পেজে,” ওপাশ থেকে ভেসে এলো জ্যাকের সেই গভীর, নিচু গলার স্বর। “মিস ক্যালকুলেটর এখন বোস্টনের সেলিব্রিটি, তাই না?”
ক্লারা হালকা হেসে চশমাটা নাকের ওপর সোজা করল। “সেলিব্রিটি হতে যাব কেন? আমি শুধু আমার কাজটা নিখুঁতভাবে করার চেষ্টা করেছি। ক্যালিফোর্নিয়ার প্র্যাকটিস কেমন চলছে, মিস্টার ক্যাপ্টেন?”
“প্র্যাকটিস ভালোই,” জ্যাক এক মুহূর্ত থামল। তার ফিসফিসানিটা এবার আরও নিবিড় হয়ে উঠল, “তবে তোমার চশমার আড়ালের চোখ দুটো ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার এই ঝলমলে রোদ আমার কাছে কেমন জানি ফ্যাকাশে লাগে, ক্লারা। আর মাত্র কয়েকটা দিন… তারপর এই অলিম্পিক ট্রায়াল শেষ হলেই আমি বোস্টনে উড়াল দেব। তোমাকে নিজের বুকের মধ্যে পিষে না ফেলা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই।”
ক্ল্যারার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত মিষ্টি ঢেউ খেলে গেল। সে জানালার কাঁচের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, “আমিও আপনার অপেক্ষায় আছি, জ্যাক।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই ফোনের ওপাশে একটা কড়া খবরের টিভি অ্যানাউন্সমেন্টের আওয়াজ ভেসে এলো। বোস্টনের লোকাল নিউজের ব্রেকিং অ্যালার্ট,
“বিশেষ খবর! মিলার কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে বিশাল অঙ্কের ট্যাক্স জালিয়াতি ও শেয়ার বাজার ম্যানিপুলেশনের অভিযোগ! আমেরিকান সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (SEC) মিলার ফিনান্সিয়াল হেডকোয়ার্টারে রেড দিতে চলেছে!”
ফোন হাতে স্তব্ধ হয়ে গেল ক্লারা। ওপাশে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা জ্যাকের নিঃশ্বাসের শব্দও এক মুহূর্তে আটকে গেল!
–
বোস্টন ডাউনটাউনের এক অভিজাত ক্লাবের প্রাইভেট লাউঞ্জ। ঘরের মধ্যে হালকা বেহালার সুর বাজছে। একটি দামি কাঁচের গ্লাসে লাল ওয়াইন ঢালছিল ভ্যালেরিয়া। তার পরনে কাস্টম-মেড ব্র্যান্ডেড সিল্কের ড্রেস, ঠোঁটে রক্তবর্ণের লিপস্টিক।
তার উল্টোদিকে বসে আছেন ভ্যালেরিয়ার বাবা বোস্টনের আরেক কুখ্যাত টেক্সটাইল ও রিয়েল এস্টেট মাফিয়া মিস্টার রিচার্ডসন। “কাজটা কতটা নিখুঁত হয়েছে, বাবা?” ভ্যালেরিয়া ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বিষাক্ত হাসি হাসল।
“একেবারে ওয়াটার-টাইট, ভ্যালেরিয়া,” রিচার্ডসন চুরুট টানতে টানতে বললেন। “আর্থার মিলার নিজের অহংকারে অন্ধ হয়ে ছিল। আমাদের তৈরি করা শেল কোম্পানির ব্যাক-ডেটেড এন্ট্রিগুলো সে নিজের কোম্পানির সাবসিডিয়ারি ভেবে সই করে দিয়েছিল। এখন সিকিউরিটিজ কমিশন আর আয়কর বিভাগ যা প্রমাণ পেয়েছে, তাতে মিলার কর্পোরেশন আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে যাবে। আর আর্থার মিলারকে বাকি জীবনটা জেলেই কাটাতে হবে।”
ভ্যালেরিয়ার চোখে ফুটে উঠল চরম হিংসা ও প্রতিশোধের আগুন।
“জ্যাক্সন মিলার ভেবেছিল সে আমাকে রিজেক্ট করে ওই সাউথ বোস্টনের আস্তাকুঁড়ের অনাথ মেয়েটাকে নিয়ে সুখে সংসার করবে?” ভ্যালেরিয়া গ্লাসটা টেবিলে শক্ত করে নামিয়ে রাখল। “এখন আমি দেখব ওদের প্রেম কোথায় যায়! যে রাজপ্রাসাদের অহংকারে জ্যাক উড়ত, সেই রাজপ্রাসাদই আমি গুঁড়িয়ে দিলাম। এবার যখন মিলার পরিবার রাস্তায় নামবে, তখন ওই চশমাওয়ালি অনাথ মেয়েটাই সবার আগে জ্যাককে ছেড়ে পালাবে!”
ভ্যালেরিয়া আর রিচার্ডসন শয়তানের মতো হেসে উঠল।
–
বিকেল চারটে। মিলার কর্পোরেশনের হেডকোয়ার্টার।
সাধারণত যে ফ্লোরে নীরব অভিজাত পরিবেশ থমথম করত, আজ সেখানে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (SEC) পনেরো-twenty জন অফিসার ফাইলের স্তূপ ঘেঁটছিল। দরজার বাইরে ডজন ডজন সাংবাদিকের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ অনবরত জ্বলছে আর নিভছে। আর্থার মিলার তাঁর বিশাল চামড়ার চেয়ারে বসে আছেন। কিন্তু আজ তাঁর মুখে সেই কড়া ইতালিয়ান চুরুট নেই,, নেই সেই অহংকারী ভঙ্গিমা। তাঁর মুখের রঙ ফ্যাকাশে, মাথার ধবধবে সাদা চুলগুলো অগোছালো। এক রাতের ব্যবধানে বোস্টনের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিলিয়নেয়ারের সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার মুখে।
“মিস্টার মিলার,” প্রধান আইনি তদন্তকারী কর্মকর্তা টেবিলের ওপর এক বিশাল নোটিশ রেখে গম্ভীর গলায় বললেন। “আপনার সাবসিডিয়ারি অ্যাকাউন্ট থেকে সাত কোটিরও বেশি ডলার পাচার করা হয়েছে। আপনার নিজস্ব ডিজিটাল সিগনেচার দিয়ে শেয়ার হোল্ডারদের সাথে জালিয়াতি করা হয়েছে। আগামীকাল সকালের মধ্যে যদি আপনি এই সাত কোটি ডলারের বৈধ হিসাব বা মূল ফান্ড না দেখাতে পারেন… তবে আপনার সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি, পেন্টহাউস, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করা হবে। এবং আপনাকে গ্রেফতার করা হবে।”
আর্থার মিলার কোনো কথা বলতে পারলেন না। তাঁর হাত দুটো কাঁপছে। তিনি এতদিন যাদের নিজের বিশ্বস্ত বন্ধু মনে করেছিলেন সেই সব বড় বড় আইনি ফার্ম আর প্রাইভেট ইনভেস্টররা আজ ফোন ধরা বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি তাঁর নিজস্ব অ্যাটর্নিও হাত তুলে নিয়ে বলেছে, “মিস্টার মিলার, এই আইনি জটলা ছাড়ানোর মতো মেধা বা ক্ষমতা আমেরিকায় কারোর নেই। কেস পুরো সাজানো হলেও প্রমাণ আপনার বিরুদ্ধে।”
আর্থার মিলার কাঁচের জানালার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর কোটি টাকার সাম্রাজ্য আজ নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ। আজ তাঁর পাশে কেউ নেই না তাঁর ক্ষমতা, না তাঁর তথাকথিত অভিজাত সমাজ।
—
রাত নয়টা। সাউথ বোস্টনের ছোট ডর্ম রুম। জ্যাক ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাম্প থেকে প্রথম এমার্জেন্সি ফ্লাইটে বোস্টনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। ক্লারা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।। তার সামনে রাখা খবরের কাগজের বিশাল হেডলাইনগুলো, ‘মিলার কর্পোরেশনের পতন!’, ‘দেউলিয়া হওয়ার পথে আর্থার মিলার!’
ডক্টর অ্যান্ডারসন ফোন করেছেন। তিনি স্পষ্ট সতর্ক করেছেন, “ক্লারা, তুমি এখন বোস্টন ফার্স্ট সোশ্যাল ব্যাংকের অফিসিয়াল কনসালটেন্ট। তোমার কেরিয়ার সবে শুরু হয়েছে। এই ডোবা জাহাজে হাত দিও না। আর্থার মিলারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় জালিয়াতির মামলা। তুমি যদি এর মধ্যে ঢোকো, তবে তোমার নিজের ক্যারিয়ার চিরতরে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।”
ক্লারা ফোন রেখে দিয়ে এক দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। আর্থার মিলার তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন, তাকে ১০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে দেশ ছাড়তে বলেছিলেন, তাকে অপমান করেছিলেন এ কথা সত্যি। কিন্তু আর্থার মিলার হলেন জ্যাকের বাবা! যে মানুষটার রক্তে জ্যাকের সৃষ্টি, যে মানুষটার অহংকার ভাঙলেও সে কিন্তু জ্যাকের বাবা ছাড়া অন্য কেউ নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা ক্লারা একজন অডিটর। সে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল, এটা কোনো সাধারণ ট্যাক্স ফাঁকি নয়। এটা ভ্যালেরিয়া আর রিচার্ডসনের তৈরি করা এক ভয়ংকর আইনি চক্রান্ত!
ক্লারা সোজা হেঁটে নিজের পুরোনো নীল কোটটা গায়ে চাপাল। টেবিল থেকে নিজের ল্যাপটপ, বিশেষ ক্যালকুলেটর আর অডিট টুলসের ব্যাগটা কাঁধে ঝোলাল।
“ওরা ভেবেছে মিলার সাম্রাজ্য ভেঙে দেবে?” ক্লারা আয়নায় নিজের চশমা পরা প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল। “কিন্তু ওরা ভুলে গেছে… এই সাম্রাজ্যের পেছনে এখন শুধু আর্থার মিলারের ক্ষমতা নেই, এই সাম্রাজ্যকে পাহারা দিচ্ছে ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’!”
—
রাত এগারোটা। মিলার কর্পোরেশনের অন্ধকার হয়ে আসা হেডকোয়ার্টার। অফিসের বেশির ভাগ কর্মচারী অলরেডি কাজ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। ফ্লোরের আলোগুলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে, স্রেফ আর্থার মিলারের প্রাইভেট কেবিনের একটুকরো আলো জ্বলছে। আর্থার মিলার ডেস্কে মাথা রেখে বসে আছেন। ঘরের দরজা খোলার শব্দে তিনি ভাবলেন হয়তো সিকিউরিটি গার্ড এসেছে।
“আমি বলেছি আমাকে একা থাকতে দাও…” আর্থার ভাঙা গলায় বললেন।
“আপনার একা থাকার সময় এখনো আসেনি, মিস্টার মিলার,” একটি শান্ত, পরিষ্কার আর কড়া গলার আওয়াজ ভেসে এলো।
আর্থার মিলার চমকে উঠে মুখ তুললেন। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সেই সাউথ বোস্টনের চশমা পরা অনাথ মেয়েটি ক্লারা বেনেট! তার কাঁধে ঝুলছে ভারি ফাইলের ব্যাগ, হাতে একটা মস্ত বড় কপি ব্যাকআপ ড্রাইভ। আর্থার মিলার বিশ্বাসই করতে পারলেন না নিজের চোখকে। “তুমি…? এখানে কেন এসেছো? আমাকে নিয়ে বিদ্রূপ করতে? আমার পতন দেখতে?”
ক্লারা কোনো জবাব দিল না। সে শান্ত পায়ে হেঁটে এসে আর্থার মিলারের ঠিক উল্টোদিকের চেয়ারে নিজের ব্যাগটা সজোরে রাখল।
“আমি আপনার পতন দেখতে আসিনি, মিস্টার মিলার,” ক্লারা অত্যন্ত কড়া আর প্রফেশনাল গলায় বলল। “আমি এসেছি শত্রু যাদের ফ্রন্ট বানিয়ে আপনার বুকে ছুরি মেরেছে, সেই ক্ষতটা কেটে হিসাব মেলাতে।”
ক্লারা টেবিলের ওপর সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পাঠানো কেস ফাইলটা নিজের দিকে টেনে নিল। “আপনাকে দেওয়া চব্বিশ ঘণ্টার ডেডলাইনের অলরেডি পাঁচ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। হাতে আর উনিশ ঘণ্টা সময় আছে,” ক্লারা ফাইলটি উল্টাতে উল্টাতে বলল। “আর এই উনিশ ঘণ্টার মধ্যে আমাকে রিচার্ডসন গ্রুপের গত তিন বছরের সমস্ত ভুয়া ট্রানজ্যাকশন উল্টে দিয়ে আপনাকে আর মিলার কর্পোরেশনকে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে।”
আর্থার মিলার হা করে দাঁড়িয়ে রইলেন। “তুমি… তুমি আমার জন্য লড়াই করবে? যে মানুষটা তোমাকে লন্ডনে পাঠাতে চেয়েছিল, তোমাকে অপমান করেছিল?”
ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর সামান্য সোজা করে সরাসরি আর্থার মিলারের চোখে চোখ রাখল।
“আমি আপনার জন্য লড়াই করছি না, মিস্টার আর্থার মিলার,” ক্লারা বরফের মতো শক্ত অথচ গভীর ভালোবাসায় ভরা গলায় বলল। “আমি লড়াই করছি আমার স্বামীর সম্মানের জন্য। যে মানুষটা নিজের বাবার রাজপ্রাসাদ ছেড়ে সাউথ বোস্টনের ছোট ঘরে এসে আমার হাত ধরেছিল… তার বাবার নাম কাদা ছিটিয়ে কেউ নষ্ট করবে, তা ক্লারা বেনেট বেঁচে থাকতে হতে দেবে না।”
আর্থার মিলার স্তব্ধ হয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন। তাঁর চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল অলক্ষ্যে গড়িয়ে পড়ল। যে চশমা পরা অনাথ মেয়েটিকে তিনি সারা জীবন তুচ্ছ ভেবেছেন, আজ শত কোটি টাকার সাম্রাজ্য যখন ধ্বংসের মুখে, তখন একমাত্র সে-ই এসে দাঁড়িয়েছে এই ভাঙা রাজপ্রাসাদের ঢাল হয়ে!
চলবে?
#Out_Of_Bounds
#ishrat_jahan_jarin
#part_28
বোস্টন শহরের ওপর রাত যত গভীর হচ্ছে, পেন্টহাউসের আবহাওয়া ততটাই জমে বরফ হয়ে উঠছে। বাইরে ঝোড়ো হাওয়ায় কাঁচের সুবিশাল দেয়ালগুলো থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। মিলার কর্পোরেশনের মূল কনফারেন্স রুমের সেই বিশাল ওক কাঠের টেবিলজুড়ে তখন ছড়ানো আছে তিন হাজারেরও বেশি আইনি ও ফিনান্সিয়াল নথি। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (SEC) হাজারো পাতার চার্জশিট, ট্যাক্স ফাইল, শেয়ার বাজার হস্তান্তরের খাতা আর ডিজিটাল লেজার।
ক্লারা তার কোটটা খুলে চেয়ারের পেছনে ঝুলিয়ে রাখল। সে তার উলের হালকা লাল সোয়েটারের হাতা দুটি কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়েছে। চশমার কাঁচটা দীর্ঘ ক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে ঘোলাটে হয়ে আসছে, সে প্রতি আধঘণ্টা পর পর সুতির রুমাল দিয়ে সাবধানে তা পরিষ্কার করে নেয়। তার ঠিক উল্টোদিকে বসে আছেন বোস্টনের একসময়ের একচ্ছত্র অধিপতি আর্থার মিলার।
ক্লারা কোনো ধরনের ভূমিকা না করে, বিরতি না নিয়ে টানা চার ঘণ্টা ধরে আড়াই হাজার পাতার ডাটাপ্রসেসিং শেষ করে এনেছে।
“মিস্টার মিলার,” ক্লারা এক মুহূর্তে খাতা থেকে মুখ তুলে তাকাল। তার নীল চোখ দুটোতে ক্লান্তির লেশমাত্র নেই, “আপনার সাবসিডিয়ারি কোম্পানি ‘মিলার লজিস্টিকস’-এর সাথে রিচার্ডসন গ্রুপের টেক্সটাইল ফান্ডের যে জয়েন্ট ভেঞ্চার সাইন হয়েছে, তার থার্ড পেজের সাব- ক্লজটা কি আপনি নিজে পড়েছিলেন?”
আর্থার মিলার একটু অপ্রস্তুত হয়ে চশমাটা হাতে নিলেন। “আমি… আমি ওটা পড়েছিলাম, ক্লারা,” আর্থার ভাঙা গলায় বললেন। “রিচার্ডসন আমার প্রায় পনেরো বছরের ব্যবসায়িক পার্টনার। আমাদের চুক্তি অনুযায়ী রিচার্ডসন গ্রুপ চার কোটি ডলারের ইক্যুইটি দেওয়ার কথা ছিল। আমার অ্যাটর্নি আমাকে বলেছিল ডকুমেন্টেশন একদম ওকে আছে।”
“আপনার অ্যাটর্নি আপনাকে ভুল বলেননি, উনি রিচার্ডসনের কাছ থেকে টাকা খেয়ে চুপ ছিলেন,” ক্লারা ঠাণ্ডা গলায় বলল। সে পেন্সিল দিয়ে ফাইলের একটি নির্দিষ্ট প্যারাগ্রাফে গোল দাগ দিল। “এখানে একটা ‘প্রক্সি-অন-ডিফল্ট’ ক্লজ গোপনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, যদি রিচার্ডসন গ্রুপের শেল কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হয়, তবে তাদের সমপরিমাণ চার কোটি ডলারের সমস্ত ঋণ আর ট্যাক্স ফ্রডের দায়ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলার কর্পোরেশনের মেইন ভল্টে গিয়ে জমা হবে!”
আর্থার মিলার থমকে গেলেন! তিনি চেয়ার ছেড়ে এক নিমেষে দাঁড়িয়ে উঠলেন। “কী বললে?! ইমপসিবল! রিচার্ডসন এটা করতে পারে না!”
“ওরা এটা এক দিনে করেনি, স্যার,” ক্লারা শান্ত অথচ বরফের মতো শক্ত গলায় বলল। “গত তিন বছর ধরে রিচার্ডসন আর ভ্যালেরিয়া মিলে একটু একটু করে মিলার কর্পোরেশনের ভেতরের সার্ভার থেকে আপনার ডিজিটাল আইডেন্টিটি আর ব্যাংক ট্রানজ্যাকশন কোড চুরি করেছে। ওরা সিকিউরিটিজ কমিশনকে যে সাত কোটি ডলারের ট্যাক্স ফাঁকির হিসাব দেখিয়েছে, তার আশি ভাগ টাকাই গেছে রিচার্ডসনের সুইজারল্যান্ডের অ্যাকাউন্টে! অথচ খাতায়-কলমে সই রয়েছে আপনার!”
আর্থার মিলার দুলতে দুলতে আবার চেয়ারে বসে পড়লেন। তাঁর কপাল বেয়ে ঠাণ্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।
তিনি এতদিন ধরে ভেবেছিলেন তিনি বোস্টন শহরের সবচেয়ে চতুর, সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষ। অথচ আজ এই মেয়েটির সামনে বসে তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন তিনি কত বড় এক চক্রান্তের শিকার হয়েছেন! ক্লারা ফায়ারপ্লেসের পাশে রাখা ছোট কফি মেকার থেকে এক কাপ ব্ল্যাক কফি এনে আর্থার মিলারের সামনে রাখল। “হাল ছাড়বেন না, মিস্টার মিলার,” ক্লারা নরম কিন্তু অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল। “অংক যেমন জটিল হতে পারে, তেমনই প্রতিটি জটিল অংকের একটা নির্দিষ্ট সমাধানও থাকে। ওরা ফাঁদ পেতেছে ডিজিটাল সই আর ব্যাংকিং ব্যাচ-প্রসেসিংয়ের ওপর। আর আমি ঠিক সেখানেই ওদের ঘাড় মটকাব।”
আর্থার মিলার কফির কাপটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। যে মেয়েটিকে তিনি একদিন ১০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে দেশ থেকে বের করে দিতে চেয়েছিলেন, সেই মেয়েটি আজ তাঁর পতনের রাতে পরম মমতায় তাঁর জন্য কফির কাপ এগিয়ে দিচ্ছে!
আর্থারের বুকের ভেতরে এক অব্যাখ্যমান অপরাধবোধ আর শ্রদ্ধার মেলবন্ধন ঘটে গেল।
–
রাত দুটো দশ। বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের প্রাইভেট টার্মিনাল। ঝড়-বৃষ্টির কারণে সাধারণ সমস্ত প্যাসেঞ্জার ফ্লাইট বাতিল হলেও, ইউএসএ বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিশেষ পারমিশনে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে উড়ে আসা চ্যাটার্ড বিমানটি রানওয়েতে আছড়ে পড়ল। বিমানের সিড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে এলো এক সুবিশাল প্রকাণ্ড অবয়ব। জ্যাক্সন মিলার। তার পরনে ইউএসএ টিমের সেই গাঢ় নীল স্পোর্টস ট্রাউজার, কালো চামড়ার জ্যাকেট আর মাথায় অলিম্পিক ক্যাপ। তার কাঁধে ব্যাগ ঝুলছে। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রওনা দেওয়ার পর সে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বোজেনি। এয়ারপোর্টের ভিআইপি এক্সিট গেটে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার পুরোনো বন্ধু ও প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর লিয়ো। জ্যাক এক ঝটকায় লিমোজিনের প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
“গাড়ি পেন্টহাউসে নে, লিয়ো।”
লিয়ো দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিয়ে এক্সিলারেটরে চাপ দিল। গাড়ি বোস্টনের ভেজা রাজপথ চিরে ১০০ মাইল গতিতে ছুটতে শুরু করল।
“জ্যাক, শান্ত হ,” লিয়ো আয়নায় জ্যাকের ক্ষুব্ধ চেহারার দিকে তাকিয়ে বলল। “ক্লারা কিন্তু একা নেই। সে গতকাল রাত থেকে পেন্টহাউসে তোর বাবার সাথেই আছে। সিকিউরিটিজ কমিশনের টিম আজ সকালে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।”
“আমি শান্ত আছি, লিয়ো,” জ্যাকের ডান হাতের শক্ত মুঠি গাড়ির চামড়ার সিটটাকে চেপে ধরে মোচড় দিচ্ছে। “কিন্তু আমার বাবাকে আর রিচার্ডসনকে আজ বুঝতে হবে আমার লাইফ, আমার ওয়াইফ আর আমার ফ্যামিলিকে নিয়ে খেলার পরিণতি কী হতে পারে।”
“ক্লারা যা করছে, জ্যাক… তা অবিশ্বাস্য,” লিয়ো লল। “বোস্টনের তাবড় তাবড় আইনি ফার্মগুলো যেখানে হাত গুটিয়ে নিয়েছে, সেখানে ক্লারা এক রাতের মধ্যে রিচার্ডসন গ্রুপের আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কোড ক্র্যাক করে ফেলেছে। মেয়েটা মানুষ নয়, আস্ত এক গাণিতিক দানব!”
জ্যাক কোনো কথা বলল না। সে গাড়ির জানালায় মাথা হেলান দিয়ে বাইরের স্ট্রিট লাইটগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। ক্লারা…! জ্যাক যখন তার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছে, তখন পরিস্থিতি এমন এক মোড় নিয়েছে যেখানে ক্লারা নিজে পুরো মিলার বংশের সম্মান বাঁচানোর জন্য একা এক মহাযুদ্ধে নেমে পড়েছে। জ্যাকের বুকের ভেতরের সোনার লকেটটা পকেটের আড়ালে গরম হয়ে উঠছিল। তার চোখ বন্ধ করলেই মনে পড়ছিল ক্যালিফোর্নিয়া যাওয়ার আগে ক্লারার সেই শেষ কথা, “আপনার বউকে সামলানোর মতো পুরুষ পুরো আমেরিকাতেও জন্মায়নি।”
জ্যাকের ঠোঁটের কোণে এক হালকা বুনো হাসি ফুটে উঠল। “সত্যিই জন্মায়নি, মিস ক্যালকুলেটর। তবে আজ আমি তোমার এই সাম্রাজ্যের রক্ষক হয়ে দাঁড়াব।”
–
সকাল নয়টা। বোস্টন ফেডারেল কোর্ট হাউসের বিশাল মেম্বার্স অডিটোরিয়াম। আমেরিকান সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (SEC), স্টেট ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট আর বোস্টন মিডিয়ার ডজন ডজন সাংবাদিকে পুরো হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ। মাইকের অনবরত পরীক্ষার আওয়াজ আর ক্যামেরার লাল লাইটের ঝিলিক চারপাশের পরিবেশকে এক অভূতপূর্ব উত্তেজনায় ভরিয়ে তুলেছে। কনফারেন্স টেবিলের বাঁ পাশে বসে আছেন মিস্টার রিচার্ডসন এবং তাঁর মেয়ে ভ্যালেরিয়া।
ভ্যালেরিয়ার পরনে ধবধবে সাদা ব্র্যান্ডেড সুট, মুখে বিজয়ের উদ্ধত হাসি। তার বাবা রিচার্ডসন অত্যন্ত রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে বোস্টনের প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার থম্পসনের সাথে নিচু গলায় কথা বলছিলেন। “বাবা,” ভ্যালেরিয়া ফিসফিস করে বলল। “আজকের পর থেকে মিলার পেন্টহাউস আর মিলার কর্পোরেশনের সমস্ত শেয়ার আমাদের হাতে চলে আসবে। জ্যাক্সন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ফিরে দেখবে তার রাজপ্রাসাদ বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।”
“আর ওই অনাথ মেয়েটি?” রিচার্ডসন চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে হাসলেন। “সে এখন সাউথ বোস্টনের বস্তিতে বসে কেঁদে ভাসাবে।”
ঠিক তখনই হলরুমের ভারী মেহগনি কাঠের দরজা দুটি সজোরে খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করলেন প্রধান তদন্তকারী জজ মিস্টার ডেভিডসন এবং তাঁর টিম। আর তাঁদের ঠিক পেছনে হেঁটে এলো ক্লারা বেনেট এবং আর্থার মিলার!
পুরো হলরুমে এক মুহূর্তে তীব্র শোরগোল উঠে গেল। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরাগুলো উন্মাদের মতো ক্লারা আর আর্থারের ওপর আছড়ে পড়তে লাগল। আর্থার মিলার আজ হেরে যাওয়া কোনো আসামীর মতো মাথা নিচু করে আসেননি। তাঁর পরনে কাস্টম-মেড নেভি ব্লু থ্রি-পিস স্যুট, মুখমণ্ডল শান্ত আর গম্ভীর। আর তাঁর ঠিক পাশে, গাঢ় নীল কোট আর চশমা চোখে ক্লারা হাঁটছিল এক চূড়ান্ত সেনাপতির মর্যাদায়। তার হাতে একখানা মেটালিক কেস। ভ্যালেরিয়া চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। তার চোখের হাসি মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। “এ কী করে সম্ভব?! আর্থার মিলার এখনো পুলিশ কাস্টডিতে নেই কেন?!”
জজ মিস্টার ডেভিডসন হাত তুলে সবাইকে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। “আজকের এই স্পেশাল হিয়ারিং মিলার কর্পোরেশনের সাত কোটি ডলারের জাতীয় ট্যাক্স ফাঁকি এবং সিকিউরিটিজ ফ্রডের কেসে আয়োজিত হয়েছে,” জজ সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন। “সিকিউরিটিজ কমিশনের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মিলার কর্পোরেশনের অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়ার কথা। মিস্টার আর্থার মিলার, আপনার কি নতুন কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য বা প্রমাণ আছে?”
আর্থার মিলার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি মাইক্রোফোনের সামনে এসে এক সেকেন্ড থামলেন।
তারপর তিনি পুরো হলরুমকে স্তব্ধ করে দিয়ে স্পষ্ট, দৃঢ় গলায় বললেন, “আমার নিজস্ব কোনো বক্তব্য নেই, ইউর অনার। তবে মিলার কর্পোরেশনের অফিশিয়াল অডিট চিফ এবং লিগাল কনসালটেন্ট মিস ক্লারা বেনেট আজ পুরো আদালতের সামনে সত্য প্রকাশ করবেন।”
পুরো কোর্টরুমে এক মুহূর্তে বিস্ময়ের ঝড় বয়ে গেল!
মিলার কর্পোরেশনের অফিশিয়াল অডিট চিফ?! এক চশমা পরা স্কলারশিপের ছাত্রীকে মিলার বংশের সর্বেসর্বা বানিয়ে প্রধান আসনে বসিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং আর্থার মিলার?!
ক্লারা শান্ত পায়ে ডায়াসের দিকে এগিয়ে গেল। সে তার চশমাটা নাকের ওপর সোজা করল, তারপর মেটালিক কেস থেকে নিজের ল্যাপটপ আর ড্রাইভটি কানেক্ট করল ডায়াসের প্রজেক্টর স্ক্রিনের সাথে। ভ্যালেরিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার থম্পসন তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে আপত্তি জানালেন। “ইউর অনার! অবজেকশন!” থম্পসন গর্জে উঠলেন। “মিস বেনেট একজন স্টুডেন্ট! বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সে এখনো ডিগ্রি কমপ্লিট করেনি! এই জাতীয় আইনি ফিনান্সিয়াল অডিটে একজন আন-লাইসেন্সড বা জুনিয়র স্টুডেন্টের প্রেজেন্টেশন গ্রহণ করা নিয়মবহির্ভূত!”
“আমার আপত্তি আছে, ইউর অনার,” অডিটোরিয়ামের একদম পেছনের সারি থেকে এক প্রবীণ, ভারী গলার স্বর ভেসে এলো।
সবাই ঘুরে তাকাল। হেঁটে আসছেন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিনান্সিয়াল ল ডিপার্টমেন্টের প্রধান এবং ইউএসএ অডিট বোর্ডের প্রবীণ চেয়ারম্যান প্রফেসর উইলিয়াম অ্যান্ডারসন! অ্যান্ডারসন সাহেব জজের সামনে এসে নিজের অফিসিয়াল ব্যাজ ও সিল করা পারমিট লেটার রাখলেন।
“মিস ক্লারা বেনেট শুধু একজন স্টুডেন্ট নন, সে বোস্টন ফার্স্ট সোশ্যাল ব্যাংকের অনুমোদিত স্পেশাল অডিট হেড,” অ্যান্ডারসন প্রখর গলায় বললেন। “আর তাঁর এই প্রেজেন্টেশনের প্রতিটি ফাইন্ডিংয়ের পেছনে উইলিয়াম অ্যান্ডারসনের নিজস্ব অফিশিয়াল সই রয়েছে। সো, অবজেকশন ইজ ওভাররুলড!”
ব্যারিস্টার থম্পসন মুখ ফ্যাকাশে করে বসে পড়লেন। ভ্যালেরিয়া নিজের নখ কামড়াতে শুরু করল। ক্লারা প্রজেক্টরের রিমোটটা হাতে নিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল শত শত ক্রিপ্টোগ্রাফিক ডেটা, রিয়েল-টাইম সুইফট ট্রানজ্যাকশন কোড আর ব্যাংক গ্যারান্টির চেইন।
“ইউর অনার,” ক্লারা স্ফটিকের মতো পরিষ্কার, তীক্ষ্ণ আর বরফের মতো ঠাণ্ডা গলায় বলা শুরু করল। “মিলার কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে সাত কোটি ডলারের যে ট্যাক্স জালিয়াতির অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার মূল সূত্রপাত দেখানো হয়েছে `ML-902` সাবসিডিয়ারি ড্রাইভ থেকে। দাবি করা হয়েছে, মিস্টার আর্থার মিলার সুইজারল্যান্ডের ‘আলফা লজিস্টিকস’ নামে এক ভুয়া ব্যাংকে এই টাকা পাচার করেছেন।”
ক্লারা রিমোটে একটি লাল বাটন টিপল। স্ক্রিনে এক মুহূর্তে দুটো পাশাপাশি উইন্ডো খুলে গেল। “কিন্তু আমার ডিজিটাল ফরেনসিক অডিট দেখাচ্ছে যে দিনগুলোতে এই টাকা ট্রান্সফার হয়েছে, সে দিনগুলোতে মিলার কর্পোরেশনের মূল সার্ভার ডাউন ছিল! টাকাটা সুইজারল্যান্ডে গেছে ঠিকই, কিন্তু ট্রান্সফারের মূল প্রাইমারি আইপি অ্যাড্রেস বাস্টন সেন্ট্রাল ব্যাংকের থেকে জেনারেট হয়নি। ওটা জেনারেট হয়েছিল রিচার্ডসন টেক্সটাইলসের প্রাইভেট সার্ভার রুম থেকে!”
পুরো অডিটোরিয়ামে এক বিকট চিৎকারের সুর ছড়িয়ে পড়ল, “হোয়াট?!”
রিচার্ডসন চেয়ার থেকে চমকে উঠে দাঁড়ালেন। “এসব মিথ্যা! ভিত্তিহীন গল্প!”
“মিথ্যা, মিস্টার রিচার্ডসন?” ক্লারা চশমার আড়াল থেকে এক ক্ষুরধার হাসি হাসল। সে স্লাইড চেঞ্জ করল।
স্ক্রিনে এবার ভেসে উঠল একটি ক্লিয়ার এনক্রিপ্টেড ভয়েস রেকর্ড এবং সাইন করা অফশোর ব্যাংকিং ডকুমেন্টস!
“আপনার মেয়ে মিস ভ্যালেরিয়া রিচার্ডসন গত ছয় মাস ধরে মিলার কর্পোরেশনের সিস্টেম হ্যাক করার জন্য একজন প্রাইভেট আইটি স্পেশালিস্টকে দুই মিলিয়ন ডলার ঘুষ দিয়েছিলেন,” ক্লারা এক একটি নথি পিনপয়েন্ট করে বলতে লাগল। “এবং আপনারা ভেবেছিলেন সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং গোপনীয়তার আইনের কারণে এই টাকা কার একাউন্টে গেছে তা কেউ দেখতে পাবে না? কিন্তু আপনারা ভুলে গেছেন, সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মাসে ইউরোপীয় ইউজারদের জন্য আন্তর্জাতিক ফ্রড ট্র্যাকিং ওপেন করে দিয়েছে। আর সেই আন্তর্জাতিক অডিট ডাটাবেসের অফিশিয়াল এক্সেস এই ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’-এর কাছে রয়েছে!”
স্ক্রিনে ফুটে উঠল সুইজারল্যান্ডের অফিশিয়াল ব্যাংক স্টেটমেন্ট যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, পাচার হওয়া সাত কোটি ডলারের মধ্যে সাড়ে ছয় কোটি ডলার সরাসরি রিচার্ডসন অ্যান্ড ডটার্স ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে!
ক্লারা ফাইনাল ফাইলটা জজের ডেস্কে সজোরে রাখল। “মিলার কর্পোরেশন এখানে কোনো অপরাধী নয়, ইউর অনার,” ক্লারা গর্জে উঠল। “মিলার কর্পোরেশন হলো রিচার্ডসন গ্রুপের পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক ফিনান্সিয়াল ষড়যন্ত্রের শিকার! আমি আদালতের কাছে অনুরোধ করছি মিলার কর্পোরেশনের সমস্ত আইনি দায়ভার অবিলম্বে খারিজ করা হোক এবং রাষ্ট্রদ্রোহী জালিয়াতির অপরাধে মিস্টার রিচার্ডসন ও ভ্যালেরিয়াকে তৎক্ষণাৎ গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হোক!”
ক্ল্যারার শেষ বাক্যটি শোনামাত্রই পুরো অডিটোরিয়াম এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। প্রফেসর অ্যান্ডারসন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে শুরু করলেন, তাঁর সাথে যোগ দিলেন সিকিউরিটিজ কমিশনের প্রধান কর্মকর্তারা। জজ মিস্টার ডেভিডসন তাঁর হাতুড়ি দিয়ে ডেস্কে আঘাত করলেন,
“অর্ডার! অর্ডার!” জজ সাহেব চশমা খুলে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে ক্লারার দিকে তাকালেন। “কোর্ট মিস ক্লারা বেনেটের জমা দেওয়া গাণিতিক ও ডিজিটাল প্রমাণকে শতভাগ সত্য হিসেবে গ্রহণ করছে। মিলার কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ পূর্ণাঙ্গভাবে খারিজ করা হলো! এবং বোস্টন পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে রিচার্ডসন গ্রুপ ও তাদের সহযোগীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে!”
পুলিশের চারজন কড়া অফিসার তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এসে রিচার্ডসন আর ভ্যালেরিয়ার হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিল। ভ্যালেরিয়া উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল, “না! এটা হতে পারে না! এই চশমাওয়ালি অনাথ মেয়ে আমার সব শেষ করে দিল! আই উইল কিল ইউ, ক্লারা বেনেট!”
ক্লারা কোনো জবাব দিল না। সে স্রেফ শান্ত ভঙ্গিতে নিজের ল্যাপটপ আর ফাইলগুলো গুছিয়ে মেটালিক কেসে পুরে ফেলল।
হিয়ারিং শেষ হওয়ার পর অডিটোরিয়ামের বাইরের বিশাল মার্বেলের করিডোর। সাংবাদিকদের ভিড় ঠেলে আর্থার মিলার ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন ক্লারার সামনে। বোস্টনের সেই দাপুটে, অহংকারী বিলিয়নেয়ার আজ এক সাধারণ মানুষের মতো ক্লারার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে কোনো অভিজাতের অহংকার ছিল না, সেখানে ছিল এক বাবার অপরিসীম শ্রদ্ধা। আর্থার মিলার নিজের পকেট থেকে সেই ১০ মিলিয়ন ডলারের ছেঁড়া চেকের অবশিষ্টাংশ এবং মিলার বংশের পারিবারিক সোনার মেডেলটি বের করলেন। তিনি হাত বাড়িয়ে ক্লারার ডান হাতটা নিজের দুটি কাঁপানো হাতের মুঠোয় তুলে নিলেন।
“আমাকে ক্ষমা করে দাও, মা…” আর্থার মিলারের গলা রুদ্ধ হয়ে এলো, চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল পরম অনুশোচনার জল। “আমি অন্ধ ছিলাম। আমি ভেবেছিলাম টাকা দিয়ে পুরো পৃথিবী কেনা যায়, ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে নিজের গোলাম বানানো যায়। কিন্তু আজ তুমি আমাকে আর আমার বংশকে রক্ষা করে দেখিয়ে দিলে সত্য, মেধা আর সৎ আত্মসম্মানের মূল্য কোটি টাকার রাজপ্রাসাদের চেয়েও অনেক উঁচুতে।”
আর্থার মিলার সবার সামনে নত মস্তকে ক্লারার হাতে মিলার বংশের মূল উত্তরাধিকারী সিলিং রিংটি পরিয়ে দিলেন। “আজ থেকে তুমি শুধু ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’-এর মালিক নও,” আর্থার গর্বিত অথচ কাঁপানো গলায় বললেন। “আজ থেকে তুমি এই মিলার পরিবারের একমাত্র সম্মান, আমাদের বড় বউ।”
ক্লারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল। তার চোখের চশমাটা বাষ্পে ঘোলা হয়ে গেল। সে আলতো করে আর্থার মিলারের হাত চেপে ধরল। “আপনার ভুল ভেঙেছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় জয়, স্যার… আই মিন, বাবা।”
ঠিক তখনই করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে ভেসে এলো কড়া বুটের ভারী শব্দ। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন ইউএসএ বাস্কেটবল দলের সেই ছয় ফুট তিন ইঞ্চির প্রকাণ্ড ক্যাপ্টেন। জ্যাক্সন মিলার। তার পরনে সেই কালো চামড়ার জ্যাকেট, চুলগুলো কিছুটা অগোছালো, কিন্তু চোখে ফুটে বেরোচ্ছে এক অদ্ভুত, ব্যাকুল রোমান্টিক আলো। জ্যাক এক মুহূর্ত দাঁড়াল। সে দেখল তার বাবা আর ক্লারা একসাথে দাঁড়িয়ে আছে, আর ক্লারার হাতে মিলার বংশের সেই রিং।
জ্যাক কোনো কথা না বলে সোজা হেঁটে এলো। সে কারোর তোয়াক্কা করল না, না সাংবাদিকদের, না ক্যামেরার, না তার বাবার! জ্যাক দুই বাড়িয়ে এক ঝটকায় ক্লারাকে মেঝের ওপর থেকে শূন্যে তুলে নিল! সে ক্লারাকে নিজের বুকের সাথে এমনভাবে পিষে ফেলল, যেন পৃথিবীর সমস্ত ঝড় পার করে সে তার মূল আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। “জ্যাক…!” ক্লারা হালকা হাঁপিয়ে উঠে জ্যাকের জ্যাকেটের কলার শক্ত করে চেপে ধরল। “সবাই দেখছে!”
“দেখুক!” জ্যাকের কড়া, ভারী ফিসফিসানিটা ক্লারার ঘাড়ের কাছে এসে লাগলো। তার ভেজা চুলের গন্ধ আর সুবাস ক্লারার স্নায়ুকে অচল করে দিল। “পুরো বোস্টন দেখুক যে আমার বউ আজ একা পুরো বিশ্বকে জয় করে নিয়েছে।”
জ্যাক ক্লারাকে নিচে নামিয়ে, তার থুতনিটা নিজের বুড়ো আঙুলের ডগায় তুলে ধরল। চশমা ছাড়া ক্লারার নীল চোখের মনি দুটো জলে ভাসছে। জ্যাক অত্যন্ত পরম মায়ায়, সবার সামনে ক্লারার কপালে আর ঠোঁটে দীর্ঘ এক গভীর চুম্বন ছুঁইয়ে দিল। আর্থার মিলার পাশে দাঁড়িয়ে এক তৃপ্তির হাসি হাসলেন।
বাইরে বোস্টনের আকাশে মেঘ কেটে গিয়ে এক অনাবিল সোনালী রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। আজ আর কোনো সামাজিক মর্যাদা বা অর্থের দেয়াল নেই। আজ জয় হয়েছে এক অনাথ মেয়ের অসামান্য মেধার, এক প্রেমিকের অটুট বিশ্বাসের এবং সত্যের চিরন্তন আলোর!
চলবে?

