হৃদমাঝারে তুমি ছিলে পর্ব-৩৩+৩৪

0
797

#হৃদমাঝারে_তুমি_ছিলে❤
পর্ব ৩৩+৩৪
#কায়ানাত_আফরিন❤

অর্পি নড়াচড়া করতেই শক্ত করে ওর বাহু চেপে ধরলো নুহাশ। ছেলেটার উষ্ণ নিঃশ্বাস অবাধ্যে ওর মুখশ্রীতে লেপ্টে যাচ্ছে। অর্পির শরীরে অদ্ভুদভাবে কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গিয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে ভূমিকম্পের ন্যায় হয়তো ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে। কেমন যেন ঝিমানো অনুভূতি চারা দিয়ে উঠেছে ওর হৃদয়ে। জড়ানো সুরে তাই বলে ওঠলো,

–আপনার কাছে আসার ভয়েই এড়িয়ে চলছি…………এবার ছেড়ে দিন না?

–ছাড়বো না। কি করবে তুমি?

–আমি তবে সত্যিই অজ্ঞান হয়ে যাবো।

নুহাশ কিছু বলতে যাবে বাইরে কেউ নক করতেই তাই থেমে গেলো। মাইশা বলে ওঠলো,

–এই নে………তোর ব্লাউস এনেছি।

বেচারা অর্পি তো এবার পড়লো মহাফ্যাসাদে। এদিকে ভাই জ্বালাচ্ছে ওদিকে বোন প্যানপ্যান করছে। উত্তেজনা আর অস্থিরতা ওকে যেন ক্রমশ গ্রাস করে ফেলছে। এদিকে নুহাশেরও ছাড়ার কোনো নামগন্ধ নেই। বাইরে মাইশা আছে বিধায় কিছু বলতেও পারছে না । ভারক্রান্ত হয়ে কেঁদে দিতে ইচ্ছে করছে ওর। তপ্তশ্বাস নিয়ে তাই মিনমিনয়ে বললো,

–আল্লাহ আমায় উঠাইয়া নিয়া যাও !
.
.
.
এদিকে বিরক্তির শেষ সীমা অতিক্রম করে চলছে মাইশা। কখন থেকে চেন্জিং রুমের দরজা ধাক্কাচ্ছে কিন্ত মেয়েটার কোনো সাড়াশব্দ নেই। হাতে শুধু একটা ব্লাউজ নিয়ে এভাবে দরজা ধাক্কাতে দেখে কিছু মানুষ আড়চোখে দেখতে থাকলো ওকে। মাইশার এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাতে নিজেকে মনে হচ্ছে এক ভিন্নগ্রহের প্রাণী। তাই দাঁতে দাঁত চেপে আবার বলে ওঠলো,

–কি রে? ভেতরে মরে টরে গেলি নাকি?

নুহাশ ইশারায় অর্পিকে বলল প্রতিউত্তর দিতে। অর্পি তাই আমতা আমতা করে বললো,

–নননা রে। এমনিই তোর ডাক খেয়াল করিনি।

–এই নে ব্লাউজ নিয়ে আমারে উদ্ধার কর।

অর্পি দরজাটা এমনভাবে খুললো যাতে মাইশা কিছুতেই ভেতরে নুহাশকে না দেখতে পারে। উত্তেজনায় মেয়েটার বুক ক্রমশ ধুকধুক করে চলছে। মাইশার হাত থেকে দু সেকেন্ডের ব্যবধানে ফট করে ব্লাউজটা তাই হাতিয়ে নিলো। নুহাশ অপরপাশে হাত ভাঁজ করে দেখে চলছে অর্পির উদ্ভট কার্যকলাপ। নুহাশকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অর্পি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। নুহাশ হয়ত মাইশার সরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে যাতে এই চেন্জিং রুম থেকে বের হতে পারে কিন্ত সেটা সে প্রকাশ করলো না। বেচারি অর্পি শূণ্যমস্তিষ্কে এক হাতে ব্লাউজ আর শাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া আর করবেটাই বা কি…………নুহাশের সামনে তো আর মেয়েটা শাড়ি পড়ে দেখতে পারবে না।

–উফফফ ! আপনি কেন যে এখানে আসতে গেলেন।

অর্পির নিম্নমাত্রার ফিসফিসানো কন্ঠ। যাতে মাইশা কিছুতেই বাইরে থেকে কোনো ধারনা করতে না পারে। অর্পির কথার ধরন দেখে ঠোঁটে বিস্তৃত হাসি ফুটে উঠলো নুহাশের। এমন হাসি দেখে অর্পির গলা যেন তটস্থে আরও মরুভূমির রূপ ধারন করেছে। অর্পির থেকে দ্বিগুন মাত্রায় ফিসফিসিয়ে নুহাশ বলে ওঠলো,

–তো তুমি কি এখন চাচ্ছো যে আমি এখান থেকে বের হয়ে যাই।

আখিজোড়ায় যেন তুমুল ঝঙ্কার ওঠলো অর্পির। এই মেয়ের এমনিতেও শূণ্যবুদ্ধি নিয়ে চলাফেলা করে তার ওপর এমন অস্বস্তিকর পরিবেশে মাথার স্নায়ুতে রীতিমতো উত্তেজনাগুলো যেন লুঙ্গি ডান্স করছে। একটা উচ্চস্বর বের হয়ে এলো ওর মুখ দিয়ে…..

–না।

ওপাশে চমকে ওঠলো মাইশা। এই মেয়েরে ভেতরে কি কোনো দেওভূত ধরলো? দরজায় টোকা মেরে আবার বললো,

–এই অর্পি ! এমন ভেড়ার মতো চিল্লান দিলি কেন? কারে না বললি?

এমন বিদঘুটে পরিবেশে অর্পির মরে যেতে ইচ্ছে করছে। নুহাশকে এভাবে ঠোঁট কামড়ে হাসতে দেখে একমুহূর্ত মনে করলো, গলা টিপে মেরে ফেললে কেমন হয়? কিন্ত এই সাহস অর্পি সাত জন্মেও কুড়োতে পারবে না।ইনিয়ে বিনিয়ে তাই প্রতিউত্তরে বললো,

–শাড়ির কুচি পড়ে যাচ্ছিলো তো তাই। আচ্ছা শোন তো?

–বল্।

–আমার একটু সময় লাগবে। তুই আর এখানে দাঁড়াইস না । আমি শাড়ি পড়ে বেরিয়ে আসবো নে।

অর্পির এই কথাটা ভালো লাগলো মাইশার। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ওর পা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে। তবুও মেয়েটা তো একেবারে ভীতুর ডিম। এভাবে রেখে গেলে কি ঠিক হবে?তবুও শরীরকে সায় দিলো মাইশা। শীতল কন্ঠে বললো.

–আমি গেলাম। তুই তাড়াতাড়ি শাড়ি পড়ে আয়। সবাই ওয়েট করছে।

বেশ কিছুক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অর্পি তপ্তনিঃশ্বাস ছাড়লো। অর্পির চক্ষুগোচরে নুহাশও। নাহলে কোন ভাইয়ই বা নিজের বোনের সামনে এমন বিভ্রান্তিকর পরিবেশে ধরা পড়তে চাইবে?কিন্ত কিছু করার ছিলো না। এই পাগল মেয়েটা নুহাশকে যেভাবে এড়িয়ে চলছে সেটা মোটেও সে সহ্য করতে পারেনি। জিভ দিয়ে হালকা ঠোঁট ভিজিয়ে অর্পি বলে উঠলো,

–আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি এখন এখান থেকে যান।

–ফাইন। আজকে তোমার কথা শুনলাম। কিন্ত নেক্সট টাইম যদি আমায় এড়িয়ে চলো তাহলে হয়তো এর থেকেও অকওয়ার্ড সিচুয়েশন তোমার সামনে আসবে। আর হ্যাঁ , ভুলেও এই শাড়িটা বাসররাতের সময় পড়বা না। নাহলে যে আমি কি করে বসবো সেটা তোমার কি…….আমার নিজেরও ধারনা নেই।

বলেই নিমিষেই চেন্জিং রুম থেকে চলে গেলো নুহাশ। তবে অর্পির স্নায়ু এখনও নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। কানের কাছে নুহাশের বলা কথাগুলো হরর মুভির শব্দের ন্যায় বারি খাচ্ছে। ক্রমশ অদ্ভুদ সব অনুভূতি জর্জরিত হচ্ছে ওর ভয়ার্ত হৃদয়ে। বিয়ের আগেই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে বিয়ের পর কি হবে?
.
.
.
________________________________________

লালচে রঙের মেঘের আড়ালে দীপ্তমান গোধূলীবেলা। হয়তো যে কোনো সময়ই সূর্য সেই গোধূলীর অন্তরালে টুপ করে লুকিয়ে যাবে। অবর্ণণীয় এক সুন্দর দৃশ্য। মাত্রই শপিং সেন্টার থেকে বের হয়ে গাড়ি পান্থপথের পশ্চিম দিকের পথ ধরে এগিয়ে চলছে। তাই পশ্চিমের নীলাভ দৃশ্যটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে গাড়ি থেকে। কাচ ভেদ করে যেই আলোরশ্মিগুলো আসছে সেগুলো ঘোর লাগানোর মতো।এসির হাওয়ায় আবিষ্ট হয়ে পড়েছে গাড়ির পরিবেশটি। শারমিন আর রাহেলা বেগম গাড়ির সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে গভীর নিদ্রায় মগ্ন।ড্রাইভিং সিটে নীরবে ড্রাইভ করছে নুহাশ আর পাশে বসা রয়েছে আনান। ছেলেটা না আসতে চাইলেও নুহাশ ওকে জোর করে নিয়ে এসেছে। আর গাড়ির সর্বশেষ সিটগুলোতে শপিং ব্যাগগুলোর সাথে বসে আছে মাইশা আর আয়াত। আয়াত আজ অনেক ক্লান্ত।সেই সকালে মিটিং সম্পন্ন করে দীর্ঘক্ষণ শপিং ব্যাগ নিয়ে এভাবে হাঁটাচলা করাতে চোখে ভর করেছে পাহাড়সমান ঘুম। এতটাই ঘুম যে বাইক চালাতে গিয়ে হয়তো দুর্ঘটনা বাধিয়ে ফেলবে।
তাছাড়া গতরাত দেরি করে ঘুমিয়ে আবার আজ তাড়াতাড়ি ওঠার কারনে কপালের বামপাশে আয়াতের চিনচিন ব্যাথা করছিলো। তাই কেউই চায়নি যে আয়াত এই অবস্থায় বাইক চালাক। পরে শাওনকে বলে দেওয়া হয় বাইকটা বাসার গ্যারেজে রেখে আসার জন্য। চাবিটা রেখে আসবে গেটের দারোয়ানের কাছে।
.
হঠাৎ কাধের কাছে ভারি কিছু অনুভব করতেই তৎক্ষণাৎ মাথা বাকিয়ে সেখানে তাকালো মাইশা। নজর পড়লো সোনালী রঙের আলোর মিশ্রনে আয়াতের উজ্জল ফর্সা মুখটার ওপর। ছেলেটা ঘুমের ঘোরে মাথাটি গাড়ির সিটে থেকে মাইশার কাধে নামিয়ে দিয়েছে।

এয়ারকন্ডিশনের হিমশীতল বাতাস ছড়িয়ে পড়েছে গাড়ির সর্বত্র। গাড়ির কাচ লাগানো বিধায় সামনে নুহাশের স্টেয়ারিং আর এসির শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না এই নিস্তব্ধ পরিবেশে।সন্ধে নেমে পড়ছে বিধায় গাড়িটাও এখন খানিকটা ম্লান হয়ে গিয়েছে। মাইশার নাকের ডগায় একটু রক্তিম আভা জমে পড়লো । কিছুটা লজ্জায়, কিছুটা অস্বস্তিতে।মাইশা আড়চোখে পুনরায় তাকালো আয়াতের দিকে ।
ছেলেটার গোলাপী ঠোঁটজোড়া এখন মরুভূমির মতো রুক্ষ।দু ঠোঁট অদ্ভুতভাবে চেপে রেখেছে নিদ্রার আড়ষ্টে।মাথাটা সযত্নে পড়ে রয়েছে মাইশার কাধের ওপর। মাইশা তাকিয়ে আছে সেদিকে। কেমন যেন সম্মোহনী দৃষ্টি। আয়াতের বড় ঘন পাপড়িগুলো ওর মুখমন্ডলে অন্যরকম লাগছে মুখশ্রীতে। কি সুন্দর সেই দৃশ্য ! এ যেন এক ঘুমন্ত রাজকুমার। যার মোহনীয় সৌন্দর্য পানির ফোয়ারার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে।

মাইশা অজান্তেই বোধহয় দুইবার হার্টফেল করলো। ক্রমশ ঘোর লেগে যাচ্ছে উত্তেজনায়। কোনো ছেলের নিদ্রাবিশিষ্ট মুখ যে এতটাই মনোহর হতে পারে মাইশার তা জানা ছিলো না। নাকি আয়াত নিতান্তই ওর বলে এরকম মনে হচ্ছে?

হালকাভাবে ঠোঁট কামড়ে ধরলো মাইশা। নিজের বৃদ্ধাআঙ্গুল হালকা করে আয়াতের ঠোঁটে ছুইয়ে দিলো তাই। ঠোঁটযুগল যেন চৌচির হয়ে গিয়েছে পানির স্পর্শ না পেয়ে।তাই সামনের দিকে তাকালো মাইশা। ব্যাগ থেকে পানির বোতলটি বের করলো সন্তর্পণে।হালকা করে আয়াতকে সম্বোধন করে বললো,

–আয়াত?

নড়ে ওঠলো আয়াত। আঙুল নড়ছে পুনঃপুন ভাবে। চোখজোড়া খোলার জন্য এখনও আয়াতের স্নায়ু যেন কাজ করছে না। তাই আড়ষ্ট হয়ে বললো,

–হুম…….

–পানি খেয়ে নেও।

আয়াত এই কথাটিতে কোনো কর্ণপাত করলো না। যদিও প্রচন্ড তেষ্টা পেয়েছে আয়াতের। তাই হাতটা বাড়িয়ে দিতেই মাইশা বোতল এগিয়ে দিলো আয়াতের দিকে। ধীরে ধীরে চোখ খুললো আয়াত। সেই ঘন নিভু নিভু পাপড়ি। ঘুমের ঘোরে বারবার বুঁজে আসছে।আয়াতের কালচে বাদামী মণি নড়ে উঠছে ক্রমশ। মাইশা চোখ সরিয়ে নিলো তাই। জেগে থাকা আয়াতের দিকে তাকানোর ক্ষমতা এখন নেই তাই হয়ত।

আয়াত দুর্বল ভঙ্গিতে শেষ করে নিলো পানির নিম্ন অংশ। এতক্ষণে শুকনো জর্জরিত ঠোঁটজোড়া পানির স্পর্শে হয়ে ওঠেছে প্রানবন্ত। গোলাপী রংটা বিনাবাক্যে এবার রক্তিম রং ধারন করেছে। কি মোহনীয় লাগছে তা দেখতে ! মাইশা কিছুক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে থাকলো আয়াতের ঠোঁটজোড়ার দিকে।পানি খাওয়ার সময় আয়াতের থুতনিতে যেই পানি গড়িয়ে পড়েছিলো তা নিজের ওড়না দিয়ে মুছে নিলো সযত্নে , একেবারেই মৌনতার সঙ্গে।

নিজের কাজকর্ম দেখে মাইশা যেন অবাক না হয়ে পারেনা। সামনেই খালামণি আর ওর আম্মু ঘুমিয়ে আছে। তবে এত সাহস মনে জোগালো কি করে? আয়াতও অবাক হচ্ছে প্রবল। রাস্তার টিমটিমে আলোর সংমিশ্রনে মাইশার কাজকর্ম উদ্ভট লাগছে ওর। তাই একেবারেই জড়ানো গলায় বললো,

–এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো?

–তোমার ওই ঠোঁটজোড়া আমায় টানছে।

দ্বিগুন ফিসফিসিয়ে বললো মাইশা। আয়াতের ঠোঁটে ফুটে ওঠলো বিস্তৃত হাসি। এতক্ষণ নিদ্রায় যেই আরামটি না পাচ্ছিলো তা আরও প্রগাঢ়ভাবে অনুভূত হচ্ছে মাইশার জড়ানো কন্ঠে।মাইশার কাধে পুনরায় মাথা রাখলো আয়াত। চোখ দুটো বন্ধ করে রেখেছে মুচকি হাসির সঙ্গে।মাইশার হাতটি নিজের ঠোঁটের কাছে টেনে হাতের উল্টোপাশে নিবিঢ় একটি চুমু খেলো।কেঁপে উঠলো মাইশা।আয়াতের স্পর্শ এই শীতল পরিবেশটা যেন উষ্ণ করে তুলেছে।আয়াতের ভারি ভারি নিঃশ্বাসের শব্দগুলো নৈশ শব্দের মতো ওর কানে খেলা করছে। আয়াত আরেকটু ঘেষেঁ বসলো মাইশার সাথে। কাধের থেকে এখনও মাথাটা সরিয়ে নেয়নি। কানের কাছে আড়ষ্ট কন্ঠে বলে ওঠলো,

–কোনো কথা বলোনাতো এবার জান। তোমার এই কাধে ঘুমিয়ে একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখতে চাই আমি। অনুভব করতে চাই আমাদের আগামী পূর্ণতার!!❤
.
.
.
.
#চলবে………..ইনশাআল্লাহ