#হৃদমাঝারে_তুমি_ছিলে❤
পর্ব ৩৮+৩৯
#কায়ানাত_আফরিন❤
দরজায় আবারও ঠকঠক শব্দ হতেই আনান দ্রুতপায়ে গিয়ে দরজা খুললো। আয়াত দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো…….হাতে একটি ছাতা, তাড়াহুড়োর চোটে উল্টো টিশার্ট পড়ে এসেছে। আয়াত সেটা খেয়াল করলেও ঠিক করার সময় ছিলোনা মাইশার দুশ্চিন্তার জন্য। মেয়েটা যে এতপরিমাণ পাগলামি করবে তা ধারনা করলে শাওনের সাথে মোটেও যেত না ঢাকায়। আয়াত গম্ভীর স্বরে বললো,
–কোথায় ওই জংলীবিড়ালটা !
কন্ঠটিতে যতটা গম্ভীরতা আছে আয়াত ততটা গম্ভীর না। ওর তীব্র চোখে প্রকাশ পাচ্ছে মাইশার জন্য প্রখর অনুভূতি। সেই কন্ঠটা ঝপাঝপ যেন আনানের কানে প্রতিধ্ধনিত হচ্ছে। নির্লিপ্ত সুরে তাই বললো,
–ভেতরের রুমে আছে ভাই।
আয়াত নির্বিকারে বড় বড় পা ফেলে প্রবেশ করলো ভেতরে। মাথাটা ভনভন করছে আনানের কথা শোনার পর। কি এমন হয়েছে যে মাইশা থম মেরে ঘরে বসে থাকবে?অন্য ৪-৫ টা মেয়ের মতো গভীর আবেগ বিষয়টি মাইশার মধ্যে নেই। দরজার সামনে দাঁড়ালো আয়াত। দরজাটা আটকানো থাকলেও লক করা না। কিন্ত কেউই মাইশার অতিরিক্ত রিয়েক্টের জন্য কাছাকাছি যাওয়ার সাহস পায়নি। চোখজোড়া প্রখর হয়ে এসেছে আয়াতের। কপালে পড়েছে সুক্ষ্ণ এক ভাঁজ। আছড়ে পড়া বৃষ্টির পানিতে চুলগুলো হালকা ভিজে যাওয়াতে ঝেড়ে নিলো তাই। তারপর আনান-সামাদ-পৃথা-আর অর্পির উদ্দেশ্যে বলে ওঠলো.
–আধঘন্টা সময় দাও আমাকে। ব্যাপারটা আমি দেখছি।
বলেই দরজা খুলে রুমে ঢুকলো আয়াত। দরজাটা লাগিয়ে দিলো নিঃশব্দে। আনান-সামাদ-পৃথা-অর্পি প্রত্যেকের মুখশ্রীতেই খানিকটা গ্লানি। মনে মনে তাই বলতে থাকলো….”সব যেন ঠিক হয়ে যায়।”
বর্ষণ বিষয়টাকে বলা হয় প্রেমের এক সুবিশাল ইঙ্গিত। সকল মায়া-অনুভূতি যেন এই বর্ষণের জন্যই জর্জরিত হয়ে থাকে। রাত যতই গহীন হচ্ছে বৃষ্টির প্রকোপ ততটাই বাড়ছে। ঝড়ো হাওয়াও বয়ে চলছে হু হু করে। ঘরের টিমটিমে লাইটের আলোতে মাইশার এই ঘরটিতে আলো আধারীর নিবাস মনে হচ্ছে। আয়াত মৃদু পায়ে এগিয়ে গেলো মাইশার দিকে। মাইশা নির্বিকার। হাটুতে মুখ গুঁজে প্রাণহীন বস্তুর মতো বসে আছে। ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে ফোপানির শব্দ। মেয়েটার এমন দৃশ্য দেখে বুকটা অজান্তেই ধক করে ওঠলো আয়াতের। এমন তো হওয়ার কথা না। যতই হোক নিজেকে সকল পরিস্থিতে শক্তপোক্ত মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে আয়াত। তবে এত বছরের এই দুর্গম ধারনাটিকি ভুল প্রমাণিত হলো?
ঘরে কারও উপস্থিতি টের পেয়ে মাইশা তাই হালকা মাথা তুললো। মাথাটা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে। এ আর নতুন কিছু নয়……………….দুশ্চিন্তা হলেই মাথার স্নায়ুতে চাপ পড়তে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করলো মাইশা। ঝাপসা চোখে দেখতে পাচ্ছে এক পুরুষালি অবয়বকে। লম্বাটে, চওড়া কাধের এক সুদর্শন ছায়ামূর্তি। মাইশা জানে এ কে। ভাবতেই বুকে যেন চেতনার জোয়ার প্রবলহারে বৃদ্ধি পেতে লাগলো।
আয়াত খাটে বসলো নিষ্পলক ভঙ্গিমায়। চোখের অবিচল দৃষ্টি গেঁথে রেখেছে মাইশার ভেঙে পড়া মুখটির দিকে। মাইশা কিছু না বলে আয়াতের বুকে মুখ ডুবিয়ে নীরবে বসে থাকলো। এখন এই ছেলেটার এক চিলতে মাতাল করা ঘ্রাণ ওর অনুভব করা প্রয়োজন । নাহলে রুদ্ধশ্বাসের শিকার হয়ে হয়তো নিশ্চল হয়ে যাবে। আয়াতের চোখ মুখে অবসাদ। ঠোঁট চেপে মৃদু ভাবে মাইশাকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করছে। সুবিস্তর কেশে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে নিবিড়ভাবে। মাইশা এতে আয়াতের পিঠ আরও জোড়ে আকড়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজলো। অতিরিক্ত ভয়ে দুশ্চিতায় চেতনাহীন হয়ে পড়ছে মেয়েটা।
–কি হয়েছে মাইশু?
আয়াতের শীতল কন্ঠ। এই কন্ঠে কোনো বিচলতা নেই……..আছে শুধু প্রবল আশ্বাস। মাইশা বুকে মুখ গুঁজেই বলে ওঠলো,
–বাবা আজ সকালে বিয়ের কথা বলেছে। ছেলে নাকি আগামীকালই আসবে।
আয়াত নির্বিকারভাবে বসে রইলো তখনও। আপনমনে মাইশার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মাইশা এবার যেন অবাক না হয়ে পারলো না। তাই আবারও বললো,
–শুনেছো কি বলেছি?
–শুনলাম তো।
–তাহলে কিছু বলছো না কেনো?
আয়াতের এই নির্বিঘ্নতা যেন ত্রাসের সঞ্চার করছে মাইশার মনে। এই বর্ষণময় রাতের ন্যায় উথাল-পাতাল করছে ওর মনের ঢেউ। আয়াত নিষ্পলক দৃষ্টিতে অল্পক্ষণ তাকিয়ে রইলো মাইশার দিকে। এ দৃষ্টি কোনো স্বাভাবিক দৃষ্টি নয় , গভীর সম্মোহনী দৃষ্টি। নিজের শুষ্ক ঠোঁটজোড়া হালকা জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিলো আয়াত। তারপর বলে ওঠলো,
–আমি জানি যে তুমি এক্ষেত্রে চুপ থাকার মতো মেয়ে না…………(কিছুক্ষণ নীরব থেকে)…….কি বলেছো খালুকে?
–যা যা বলার কথা।
বলেই আয়াতের বুকে পুনরায় মুখ গুঁজলো মাইশা। জানালাটি কাছাকাছি থাকার কারণে বাতাসের উত্তাল প্রবাহে বৃষ্টির ঝিরঝিরে পানি মৃদুভাবে আছড়ে পড়ছে সর্বাঙ্গে। এই এক একটা অতিক্ষুদ্র পানির কণা হিমশীতল বরফের মতো মনে হলো আয়াতের কাছে। কিছু মাইশার শরীরের উষ্ণতায় তা ধরা দিচ্ছে না। সাংঘাতিক মেয়ে তো ! অতিরিক্ত চিন্তায় জ্বর-টর বাধিয়ে দিলো নাকি?
–বাবা এখনও কিছু বলেনি এ ব্যাপারে। অদ্ভুতভাবে সে সব জেনেও বিন্দুমাত্র আমাদের আন্দাজ করতে দেয়নি।
আয়াত তবুও শান্ত। মাইশার এবার রাগ হচ্ছে ছেলেটার ওপরে। টেনশনে ও মরে যাচ্ছে আর আয়াতের কোনো খেয়াল নেই। তাই সেই প্রশস্তে বুকে সশব্দে একটা কিল মেরে বলে উঠলো,
–এভাবে চুপ হয়ে আছো কেনো? টেনশনে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে যে বাবা না মানলে কি হবে? কেননা আর যাই হোক , বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে আমি একটা স্টেপও নিবো না। আর তুমি? সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই।
–খেয়াল আছে তো?
–কোথায়?
–এইযে আমার ”মাইশুপাখির” দিকে।
আয়াতের প্রখর কন্ঠ। মাইশা ঝট করে সরে এলো আয়াতের কাছ থেকে। টিমটিমে আলোতে ছেলেটার গভীর সম্মোহী কথাগুলো মাদকময় লাগছে মাইশার কাছে। আয়াতের মুখশ্রী দুর্বল। কেমন যেন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। উল্টো টিশার্টটির বোতাম ভেতরের দিকে বিধায় উজ্জল বুকের অনেকাংশই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ছোটবেলায় একবার আম গাছ থেকে পড়ে যে ক্ষতটি হয়েছিলো বুকের এক প্রান্তে তার আংশিক দাগটি এখনও যায়নি। আয়াত চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে অপার্থিব নয়নে বললো,
–কে কি বললো সেদিকে খেয়াল রাখতে চাই না আমি। আমার সামনে যেই উদ্ভট পাগল মেয়েটা বসে আছে না , আমি শুধু ওর খেয়াল রাখতে চাই। যতই ওকে ”জংলীবিড়াল” বলি না কেন………দিনশেষে এই মানুষটিকে আমার হৃদমাঝারে রাখতে চাই। অকপটে একটি কথা বলতে চাই যে ,#হৃদমাঝারে_তুমি_ছিলে……….আছো এবং থাকবে।
কি পরিশ্রান্ত এই কথাগুলো। আয়াত যতবারই কথাগুলো বলার জন্য অদ্ভুতভাবে ঠোঁট নাড়িয়ে চলছিলো ততবারই বুকে তোলপাড় শুরু হয়েছে মাইশার। আচ্ছা এই ঠোঁটজোড়ার মায়াবী স্পর্শ তো আজও অনুভব করতে পারেনি মাইশা তবে এখন এই ঠোঁটজোড়া ছুঁইয়ে দিলে কি বড়সড় কোনো ভুল হয়ে যাবে?
আয়াত আবারও বললো,
–এ ব্যাপারে আর কোনো কথা হবেনা মাইশুপাখি !আগে দেখো খালুজান কি বলে। শুরুতেই ভয় পেলে চলবে নাকি !
চোখে ঘুম ভর করেছে মাইশার। মাথার ভোঁতা যন্ত্রণাটিও যেন কয়েকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। আয়াত ধীরস্থিতিতে শুয়িয়ে দিলো মাইশাকে বিছানায়। মাথার নিচে কোমল বালিশের স্পর্শে এখন অনেকটা আরাম লাগছে ওর। আয়াত খাটের পাশে দাঁড়িয়ে সামান্য ঝুঁকে এলো মাইশার দিকে। ওর উষ্ণ নিঃশ্বাস এলোপাথাড়িভাবে গ্রাস করে নিচ্ছে মাইশার মিহিয়ে পড়া মুখশ্রীতে।
–ঘুমিয়ে পড়ো এখন ”মাইশুপাখি!”
আয়াতের সম্বোধনে মনে মাইশার প্রশান্তি কাজ করছে। চোখ দুটো নিভে আসছে ম্লানভাবে। আরও কিছুক্ষণ জেগে থাকতে চায় মাইশা। চায় আয়াতের ঘোর লাগানো কথাগুলো উপভোগ করতে, আরও কিছুক্ষণ ছেলেটার সঙ্গ পেতে। মাইশা জানে , এখন ঘুমিয়ে পড়লেই আয়াত পৃথা-অর্পিকে ডেকে চলে যাবে। যাওয়ার আগে সবাইকে বলে দিবে,
–ওর যেন বিন্দুপরিমাণ ঘুমোতে কষ্ট না হয়। খেয়াল রেখো পাজিটার !
এটাই তো প্রেমিকের সংজ্ঞা। সর্বদা নির্বিকার, প্রখর থাকলেও প্রেয়সীর জন্য উজার করে দেবে সর্বস্ব ভালোবাসা। ইসসসস! ঘুমানোর আগে একবার শুধু আয়াতের যত্নে গড়া এই কথাগুলো শুনতে পারতো!
———————————————
হরেক রকম মেঘের সমাহারে এ যেন এক রক্তিম গোধূলী বেলা। পশ্চিমা আকাশটি অপার্থিব সুন্দর মনে হচ্ছে। ডুবন্ত সূর্যের দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে দু’কয়েক ডানা ঝাপটানো পাখি। যে দেখবে সে একটা কথাই বলবে ,”মাশাল্লাহ!”। সৃষ্টিকর্তা কত যত্নের সাথেই যেন এই পৃথিবী বানিয়েছে। সন্ধ্যে পড়বে পড়বে ইতিমধ্যেই হলুদের আমেজ শুরু হয়েছে চারিপাশে। স্বভাবত হলুদের অনুষ্ঠান হয় অনেক রাতে। কিন্ত এই রিসোর্টের অথোরিটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে ১২ টার পর কোনো হৈ হুল্লোড় করলে এই এলাকার উপরস্থ কর্মকর্তার কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে।রহমান সাহেব এসব ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট মোটেও পছন্দ করেননা। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে অনুষ্ঠান সন্ধ্যার পর শুরু করে ১২ টার পূর্বেই শেষ করবেন।
গত দুইদিনের তুলনায় আজ সকাল থেকেই মেহমান আসা শুধু করেছে পুরোদমে। অর্পি চাচা-মামারা থেকে শুধু করে নুহাশের চাচা-ফুপি সবাই। আনান-সামাদের পরিবারও এসেছে……..এমনি পৃথারও। যদিও পৃথার বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে আসার জন্য ওর ওপর সবার ক্ষোভ জমলেও কলেজের অধ্যাপক আনানের বাবা তা সামলে নেন সুণিপুনভাবে।তাই পরবর্তীতে এ নিয়ে আর ঝামেলা হয়নি।
তবে এত মানুষের ভীড়েও মুখে ম্লান হাসি নিয়ে ঘোরাঘুরি করেছে মাইশা। কেননা আজ সকাল থেকে আয়াত ওর সাথে কোনো কথা বলেনি। এড়িয়ে গিয়েছে তা ব্যস্ততার খাতিরে। আর মাইশাও কথা বলার জন্য তেমন একটা চেষ্টা করেনি। হলুদের অনুষ্ঠান চলছে পুরোদমে। একপাশে অর্পি আর একপাশে নুহাশকে বসানো হয়ছে। একে এক করে সবাই ছুঁইয়ে দিয়ে আসছে হলুদ। মাইশা-সামাদ-পৃথা ক্লান্ত ভঙ্গিতে প্রাঙ্গনের এককোণে বসলো। ওদিকে আনান মেকি হাসি দিয়ে নুহাশ ভাইয়ের সাথে বসে আছে অনিচ্ছায় । অন্যসময় মাইশা এ নিয়ে বিদ্রুপ করলেও আজ মাইশার মন মেজাজ ভালো নেই । আড়চোখে বারবার পরখ করে নিচ্ছে ছুটাছুটি করা আয়াতকে। কাচা হলুদ পান্জাবি , হাতে খয়েরী বেল্টের ওয়াচ , মসৃন চুলগুলো সমান্তরালে কপালের কাছে রেখে দিয়েছে। হাতা গুটানোর কারনে নীল রগগুলো দেখা যাচ্ছে স্পষ্টভাবে। কি মোহনীয় ছেলেটার কাজকর্ম !
চোখ সরিয়ে নিলো মাইশা। ভয় আর ত্রাস দুটোই মনে বাসা বাধছে পুনরায়। আয়াতের কি ভয় করছেনা যে কেউ না মানলে কি হবে? আর বাবার বেশ স্বাভাবিক আচরণে মনে আরও সন্দেহ বাধছে মাইশার। হঠাৎ আমেনা বিবির ডাকে ধ্যান ভাঙলো। ওকে ডাকছে নুহাশকে হলুদ দিয়ে দেয়ার জন্য।
.
.
.
ঘড়ির কাটা পৌনে বারোটা ছুঁই ছুই। হলুদের কার্য শেষ করে খাওয়া-দাওয়ার সমাপ্তি ঘটলো সবেমাত্র। সবাই এবার ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। কেউ কেউ তাই ডেকোরেটরের চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছে তো কেউ আনানের মতো নরম ঘাসে বসে পড়েছে। রহমান সাহেব এগুলো দেখে বিগলিত হাসলেন। অদ্ভুত স্বরে বললেন,
–অনুষ্ঠান তো এখনও শেষ হয়নি। সবাই এভাবে ঝিমুচ্ছো কেনো?
আনানের মুখে বিরক্তির ভাজ ফুটে ওঠলো। তাই নির্বিঘ্ন বলে,
–কি বলেন খালুসাব!মাত্রই তো শেষ হইলো। আমার মনে হয় বয়সের ভারে আপনার স্মৃতি লোপ………
নুহাশ চোখ গরম করে তাকাতেই মুখে ক্লুপ লাগিয়ে দিলো আনান। এখন একটা কথা বলেই ব্যাটাস ঠাস ঠাস ধরে থাপড়াবে। আর বিয়েমহলের এত সুন্দরী মেয়েদের সমাগমে এ কাজ ভুলেও করবেনা ও। রহমান সাহেব সোফায় বসে আছেন আয়েশ ভঙ্গিতে। চোখে-মুখে কঠোরতা। উনার ঠিক মুখোমুখি সোফায় বসে আছে মাইশা। মুখে চিন্তার ছাপ। বাবাকে এত কঠোর দেখাচ্ছে কেনো?
রহমান প্রখর কন্ঠে বললো,
–আয়াত !
বুকটা ধক্ করে ওঠলো মাইশার। বাবা এভাবে আয়াতকে ডাকছে কেন? তবে কি সবার সামনে ওদের সম্পর্কের কথা বলবে। চিন্তিত ভঙ্গিতে এদিক ওদিক তাকালো মাইশা। সবাই নির্বিকারভাবে যে যার মতো আছে। এটাই যেন স্বাভাবিক। এগিয়ে আসলো আয়াত। আগের তুলনায় স্নিগ্ধ লাগছে এখন। হয়তো অল্প কিছুসময় আগে মুখটা ধুয়ে এসেছে। রহমান সাহেব গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
–বসে পড়ো ওখানে।
কথাটি শোনামাত্র হুড়মুড়িয়ে মাইশার পাশ ঘেষেঁ বসলো আয়াত। উত্তেজনায় মাইশার ঠোঁটজোড়া শুকিয়ে গিয়েছে। ছেলেটা পাগল হয়ে গেলো নাকি ! গতকালই বললো বাবা ব্যাপারটা জানে তো সবার সামনে এভাবে লেপ্টে বসার কারনটা কি?পূর্বের ন্যায় আবার বিড়বিড়য়ে আয়াতকে ”লুচুবাঘ” সম্বোধন করলো তাই। আড়চোখে আয়াতের দিকে তাকালো মাইশা। ছেলেটার চোখেমুখে একটা চাপা হাসি।
আয়াতের মা হিসহিস করে বলে ওঠলেন,
–এভাবে চাপা হাসি হাসছিস কেন ব্যাটা? প্রেম করার সময় কিছু বলিস নাই এখন আংটি না পড়িয়ে হাসা হচ্ছে? এক কিলে হবু বউয়ের সামনে তোর হাসি উড়িয়ে দেবো। আংটি কি পকেটে রেখে ঘুরঘুর করার জন্য দিয়েছি? জলদি আংটিটা ওকে পরিয়ে দে !
হতভম্ব হয়ে পড়লো মাইশা। উত্তেজনায় জর্জরিত থাকা এই মস্তিষ্কটির স্নায়ু এবার যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এখন সে যেন এক অনুভূতিশূণ্য মানবী।আয়াত মাথা নত করে নিজেই ধরে কাছে নিয়ে আসলো মাইশার হাত। অনামিকা আঙুলে সাদা পাথরে কারুকার্জিত এই আংটি টা পরিয়ে দিলো সন্তর্পণে। মাইশার কাছে এ যেন এক নতুন অনুভূতি। শারমিন বেগমের কাছ থেকে আংটি নিয়ে সে নিজেও আংটি পরিয়ে দিলো সেই কাঙ্খিত হাতে। সবার চোখে-মুখে এবার খুশির আমেজ। এমনকি আনান-সামাদ-পৃথা-অর্পির মুখেও। এর মানে এর কথা এরা সবগুলোই জানতো। মাইশা মৃদু কন্ঠে বললো,
–আমাকে আগে বলা হয়নি কেনো?
–আগে বললে কি তোমার ফ্যাকাশে মুখের স্নিগ্ধতা দেখতে পারতাম মাইশুপাখি !
আয়াতের ফিসফিসানো কন্ঠ। কথার আমেজে কেউই এই দুজনের কথোপকথন শুনতে পারেনি।
মিহি হাসে মাইশা। আজ এই সময়টা স্বপ্নের মতো লাাগছে। কথা হলো আরও কয়েকমাস পর আয়াত কাজটা সামলে ওঠতে পারলেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু হবে।মাইশার হাত আরও গভীরভাবে আকড়ে ধরলো আয়াত। গহীন কন্ঠে বললো,
~এই হাতজোড়ার মানুষটি এখন নিতান্তই আমার ”প্রাণপ্রেয়সী!”
.
.
.
#চলবে……….ইনশাআল্লাহ