তোমার তুমিতেই আমার প্রাপ্তি পর্ব-১৯ + স্পেশাল পর্ব

0
788

#তোমার_তুমিতেই_আমার_প্রাপ্তি
লেখক-এ রহমান
পর্ব ১৯

হসপিটালের করিডোরে থম থমে মুখে বসে আছেন নিয়াজ সাহেব। পাশেই স্ত্রী মুনিরা মুখে আচল চেপে কাঁদছে। তিনি একবার তার স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেছে। অনেকটা সময় কেঁদেছেন তাই। তিনি পারছেন না তার স্ত্রীকে শান্তনা দিতে। কিই বা বলবে? অসহায়ের মতো শুধু বলল
–পানি খাবে?

মুনিরা তার দিকে অভিমানের দৃষ্টিতে তাকাল। তার কথার উত্তর না দিয়েই কঠিন গলায় বলে উঠলো
–তুমি পাষাণ। তোমার বোন তোমাকে ছেড়ে গিয়ে বেঁচে গেছে। তাই আজ অনেক সুখে আছে। তোমার কাছে থাকলে মরে যেত। তুমি ঠাণ্ডা মাথায় খুন করতে পার। ঠাণ্ডা মাথার খুনি।

বলেই উঠে গেলো। নিয়াজ সাহেব অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকলেন স্ত্রীর যাওয়ার দিকে। মুনিরা যা বলে গেলো আসলেই কি তিনি সেরকম? এর উত্তর তার জানা নেই। কিন্তু এটা বুঝতে পারছেন যে তিনি অন্যায় করেছেন। চোখ ভরে এলো তার। মাথা নামিয়ে নিতেই ইভান সামনে এসে দাঁড়ালো। শান্ত সরে বলল
–মামা?

নিয়াজ সাহেব মাথা তুলে তাকালেন। চোখ দেখে ইভানের বুঝতে বাকি থাকলো না তিনি মেয়ের জন্য কতটা কষ্ট পাচ্ছেন। ইভান পাশে বসে বলল
–তোমার ডায়াবেটিক। কিছু না খেলে অসুস্থ হয়ে যাবে।

ইভানের কথা শুনে তিনি নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ভিতরে তোলপাড় শুরু হলেও নিজেকে যথা সাধ্য শক্ত রেখে কাপা কাপা গলায় বললেন
–মিরা কেমন আছে?

ইভান একটু হেসে বলল
–ঠিক আছে। এখন ঘুমাচ্ছে। প্রেসার ফল করেছিলো। খাওয়া আর ঘুমের অনিয়ম সাথে স্ট্রেচ। উত্তেজিত হয়ে প্রেসার ফল করেছিলো তাই সেন্স লেস হয়ে গেছিলো।

নিয়াজ সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। সামনে দরজায় কাতর স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন। চোখের পানি অনবরত পড়ছেই। করুন ভাবে তাকিয়ে আছে আবদ্ধ ঘরে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। তখন বাবাকে কঠিন কথা বলার পরে বাবা মেয়ের মাঝে অনেক কঠিন বাক্য বিনিময় হয়। এক সময় উত্তেজিত হয়ে মিরা সেন্স হারিয়ে ফেলে। প্রেসার ফল করার কারনে শকড হয়ে যেতে পারে ভেবেই ইভান কোন রিস্ক নেয়নি। সরাসরি হসপিটালে ভর্তি করায়। অবস্থা এখন স্থিতিশীল হলেও প্রচুর রেস্ট দরকার। নাহলে খারাপ কিছু হতে পারে।

ঈশা খাবারের প্যাকেট নিয়ে সামনে দাঁড়ালো। শান্ত সরে বলল
–মামা এগুলা খেয়ে নিন।

নিয়াজ সাহেব চোখ তুলে তার দিকে তাকালেন। কিছুক্ষন ভালো করে দেখে নিয়ে বললেন
–তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না। তুমি ইভানের কি হও?

ইভান হেসে ফেলল। কারন সে জানে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ঈশা অপ্রস্তুত। ঈশা ইভানের হাসি দেখে কঠিন চোখে তাকাল। দাড়িয়েই থাকলো। ইভান এবার বলল
–আশরাফ আঙ্কেল কে চিন?

–কোন আশরাফ? ইমতিয়াজের বন্ধু?

ইভান মাথা নাড়ল। নিয়াজ সাহেব আবারো জিজ্ঞেস করলেন
–আশরাফের কে হয়?

–মেয়ে।

নিয়াজ সাহেব এবার ঈশার হাত ধরে সামনের চেয়ারে বসালেন। ঈশা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। মাথা নিচু করে থাকলো। নিয়াজ সাহেব বেশ উতফুল্যতার সাথে বলল
–তুমি আশারফের মেয়ে? বাহ! কতো বছর আগে দেখেছি আশরাফ কে। আর আজ তার মেয়ে কতো বড়। জানো ইমতিয়াজ আশরাফ আর আমি এক সাথে আড্ডা দিতাম। খুব ভালো সম্পর্ক ছিল আমাদের।

শেষ করেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন
–কতো বছর দেখা হয়না। আশারাফ কেমন আছে?

–আব্বু ভালো আছে।

–তুমি কি এখানেই পড়ো?

ঈশা মাথা নাড়ল। ঈশার এমন অবস্থা দেখে ইভান মজা পাচ্ছে। ঈশাকে আরেক্টু অপ্রস্তুত করে দিতেই ইভান দুষ্টুমির সুরে বলল
–জানো মামা ও ভবিষ্যতে বোনের বড় ছেলের বউ হবে।

নিয়াজ সাহেব ইভানের কথাটা বুঝতে না পেরে ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকালেন। ঈশা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেলো। মনে মনে ইভান কে গালি দিতে শুরু করেছে। কোন জায়গাতেই তাকে এরকম পর্যায়ে ফেলতে পিছপা হয়না। নিয়াজ সাহেব এবার হেসে উঠলেন। ঈশার মাথায় হাত দিলেন। তার দিকে তাকিয়ে বললেন
–বাহ! খুব মানাবে তোমাদের। খুব ভালো।

ইভান হেসে ঈশার দিকে তাকাল। এমন সময় ইভানের মা আফসানা আর তার বাবা ইমতিয়াজ রহমান চলে এসেছেন। তাদেরকে দেখে ইভান আর ঈশা উঠে দাঁড়ালো। নিয়াজ সাহেব মাথা নিচু করে বসে আছে। মাথা তুলে একবার বোনের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু মনের কোথাও একটা বাধা কাজ করছে। নিজের আত্মসম্মান টা বেশ করেই বাধা দিচ্ছে তাকে। কিন্তু তার পরেও ভালবাসার কাছে তো আর কিছুই বড় হয়ে দাড়ায় না। আফসানা ভাইয়ের সাথে কথা না বলেই ভাবির কাছে চলে গেলেন। দরজায় দাড়িয়ে দেখলেন একবার মিরাকে। তারপর ভাবির ঘাড়ে হাত দিতেই তিনি চমকে ফিরে তাকালেন। আফসানা কে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। এতদিন পর ভাবিকে এভাবে দেখে সেও নিজেকে সামলাতে পারলো না। দুজন দুজন কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন। ঈশা এসে দুজন কেই থামিয়ে দিয়ে বললেন
–তোমরা আর কেদনা। প্লিজ! মিরা ঠিক আছে। রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।

মুনিরা ঈশার দিকে তাকাল। ভালো করে দেখে নিয়ে বলল
–তোমাকে কাল থেকেই দেখছি। কিন্তু ঠিক চিনতে পারলাম না।

আফসানা হেসে বলল
–ইভানের আব্বুর বন্ধুর মেয়ে। আমার বড় ছেলের হবু বউ।

মুনিরা ঈশার মাথায় হাত দিয়ে বললেন
–বেশ ভালো মেয়ে। দেখতেও বেশ মিষ্টি।

ঈশা কোন কথা বলল না। নিয়াজ সাহেব বেশ অপ্রস্তুত অবস্থায় বসে আছে। মাথা তুলেও দেখছেন না। ঈশা ভিতরে একবার তাকিয়ে দেখল ইফতি নিস্পলক বসে আছে মিরার পাশে। সেদিকে তাকিয়েই বলল
–মামনি ইফতি কিছুই খায়নি। ওকে কিছু খাওয়াতে চেষ্টা করি।

বলেই খাবার নিয়ে ভিতরে গেলো। ইফতির ঘাড়ে হাত রাখতেই সে চমকে ঈশার দিকে তাকাল। ঈশা বুঝতে পারছে ইফতির অসহায়ত্ব। কিন্তু সেদিকে পাত্তা না দিয়েই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই বলল
–এরকম দেবদাসের মতো বসে আছিস কেন? তুই না ডক্টর? তুই তো জানিস কোন প্রবলেম নেই।

ইফতি বিরক্ত নিয়ে তাকাল। কঠিন মুখে বলল
–ডক্টর বলে কি আমার মন নেই? আমি কি মানুষ না? আমার ভালবাসার মানুষটা কতো অসুস্থ আর আমার গলা দিয়ে খাবার নামবে?

ঈশা হেসে ফেলল। ইফতি ভ্রু কুচকে তাকাল। একটু জোরেই বলল
–তোর কি বাংলা ছবির ডায়ালগ মনে হল আমার মনের কথা গুলো? তুই এতো নিষ্ঠুর কেন রে?

ঈশা ভ্রু কুচকে খাবার তুলে ইফতির মুখে চেপে ধরে বলল
–এখন আজে বাজে কথা না বলে খেয়ে নে। তুই না খেয়ে থাকলে মিরা ঠিক হয়ে যাবে না।

ইফতি খাবার মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে বলল
–আচ্ছা ঈশা তোর কি মনে হয় মিরা ঠিক হলে মামা আমাদের বিয়ে দেবে?

–অবশ্যই দিবে। কেন দিবে না?

দুজনি পিছনে ঘুরে তাকাল। ইভান পাশে এসে বসলো। ঈশা একটু সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
–তুমি কিভাবে এতো সিওর হচ্ছ?

ইভান হেসে বলল
–আব্বু আম্মু মামা মামি কথা বলছে। সব কিছু ঠিক থাকলে মিরা সুস্থ হলেই তাদের আংটি পরিয়ে রাখবে। আর বিয়ে পরে হবে।

কথাটা শুনেই ঈশা চিৎকার করে উঠতে জেয়েও মিরাকে দেখে থেমে গেলো। সে ঘুমাচ্ছে। ইভান ঈশা আর ইফতি কে বলল
–তোরা এখন এখান থেকে বের হয়ে যা। ওকে ঘুমাতে দে।

ইভানের কথা শুনে সবাই রুম থেকে বের হয়ে গেলো।

————–
মিরাকে একবার চেকাপ করার জন্য ইভান তার রুমের দিকে পা বাড়াতেই মেঘলার ডাকে থেমে গেলো। মেঘলা এগিয়ে এসে বলল
–ইভান তুমি কি মিরাকে চেকাপ করতে যাচ্ছ?

–হ্যা।

মেঘলা একটু হেসে বলল
–আমি মাত্রই চেক করে এসেছি। সব একদম ঠিক আছে। ঘুমের ইঞ্জেকশন আবার দেয়া হয়েছে। ফুল রেস্ট দরকার। এবার ঘুম ভাংলেই আশা করা যায় ঠিক হয়ে যাবে।

ইভান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল
–থ্যাঙ্ক ইউ মেঘলা।

মেঘলা ইভানের দিকে তাকিয়ে বলল
–তোমাকে খুব টায়ার্ড লাগছে ইভান। মনে হয়না কিছু খেয়েছ? কামান ইভান! এভাবে তুমিও অসুস্থ হয়ে পড়বে। এতো উত্তেজিত হলে কিভাবে হবে বল? নিজের খেয়াল রাখতে হবে তো। নিজে না পারলে আমি তো আছি।

–তুমি একটু বেশিই কেয়ার করছ না মেঘলা আপু?

ঈশা কথাটা বলতে বলতে ইভানের পাশে এসে দাঁড়ালো। মেঘলা সরু চোখে তাকাল। মুচকি হেসে বলল
–বন্ধু বন্ধুর জন্য কেয়ার করবে সেটাই কি ঠিক না ঈশা? আর আমি এমন কোন বাড়াবাড়ি কিছুই করিনি যেটা দেখতে দৃষ্টি কটু দেখায়।

–বন্ধু শব্দটার একটা লিমিট থাকে। তুমি সেটা ক্রস করে যাচ্ছ। তুমি ইভান কে নিয়ে যতটা সচেতন সেটা কিন্তু আমার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার দায়িত্বটা তুমি নিতে চাইছ মেঘলা আপু।

ঈশার কথা শুনে মেঘলা এবার একটু ঝাঝাল গলায় বলল
–তুমি ঠিক কি বলতে চাইছ? আমার সাথে ইভানের একটা সম্পর্ক আছে। তোমার দায়িত্ব তুমি ঠিক মতো পালন করতে পারছ না বলেই আমি সেটার দায়িত্ব নিতে চাইছি।

বলেই একটা তাছিল্যের হাসি দিয়ে বলল
–দায়িত্ব নিতে গেলে একটা সম্পর্ক থাকতে হয়। সেটা তোমার নেই। তাই তোমার মধ্যে একটু হলেও সংকোচ কাজ করে। সেই জন্যই হয়তো ইভানের খেয়াল রাখতে পারনা। তোমার মনের মাঝে কোথাও বাধা কাজ করে।

ঈশা এবার রেগে গেলো। ইভানের দিকে একবার তাকাল। ইভান খুব শান্ত ভাবে ঈশার দিকে তাকিয়ে আছে। ঈশা ঠিক কি উত্তর দিবে সেটাই বুঝতে চেষ্টা করছে। মেঘলা আবারো ঈশার হাত ধরে সামনে ধরে বলল
–তোমার আংটিটাও তো নেই ঈশা। তাহলে কিসের সম্পর্কের ভিত্তিতে তুমি এতো জোর দেখাও।

ইভান কথাটা শুনে চুপ করে থাকতে পারলো না। কিছু একটা বলতে যেতেই ঈশা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল
–তুমি এতো ছোট বিষয় নিয়ে ভাবো মেঘলা আপু? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।

মেঘলা ইভান দুজনি ঈশার দিকে ভ্রু কুচকে তাকাল। ঈশার কথার মাঝে এমন কিছু তো একটা আছে যেটা এই মুহূর্তে শুধু ঈশাই বুঝতে পারছে। কিন্তু কি? ঈশা নিজের ব্যাগ হাতড়িয়ে একটা কাগজ বের করলো। সেটা মেঘলার হাতে দিয়ে বলল
–আমার মনে হয়না এর পরে আংটি নিয়ে আর কোন মাথা ব্যাথা থাকবে তোমার।

ইভান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কাগজটার দিকে তাকিয়ে আছে। সেটা কি বুঝতে চেষ্টা করছে। মেঘলা হাজার বিস্ময় নিয়ে কাগজটার দিকে তাকিয়ে আছে। অস্পষ্ট সরে বলল
–এটা কিভাবে সম্ভব?

চলবে………

#তোমার_তুমিতেই_আমার_প্রাপ্তি
লেখক-এ রহমান
স্পেশাল পর্ব

–ইভান তুমি ঈশাকে বিয়ে করেছ?

–হোয়াট?

মেঘলার এমন আজব কথা শুনে ইভান চিৎকার করলো। মেঘলা বিস্ময় নিয়ে বলল
–এই পেপার তো সেটাই বলে। তুমি আর ঈশা লিগালি ম্যারিড কপোল। এটা তোমাদের ম্যারেজ রেজিস্ট্রি পেপার।

মেঘলার কথা সব ইভানের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। মেঘলার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে সেটাতে চোখ বুলাতেই বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে গেলো ইভানের। বড় বড় চোখে সেটার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে ঈশার দিকে তাকাল। ঈশা স্বাভাবিক ভাবেই তার দিকে তাকিয়ে আছে। ইভান এক হাতে কাগজটা নিয়ে আরেক হাতে ঈশাকে টেনে নিয়ে গেলো তার কেবিনে। ভিতরে ঢুকেই দরজা লক করে দিলো। ঈশা ইভানের আচরন বুঝতে চেষ্টা করলো। ইভান কাগজটা ঈশার সামনে ধরে দাতে দাত চেপে বলল
–এসব কি?

–যা লেখা আছে সেটাই।

ঈশার এমন কথায় ইভানের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। চোখ বন্ধ করে নিজের রাগ দমন করে বলল
–আমিও দেখতে পাচ্ছি কি লেখা আছে। কিন্তু এটা কিভাবে আসলো? তুই কোথায় পেলি? সবটা ক্লিয়ার কর। নাহলে আজ তোর কপালে দুঃখ আছে ঈশা।

ঈশা অবাক চোখে ইভানের দিকে তাকিয়ে আছে। এই বিষয়ে ইভান এমনভাবে রিয়াক্ট করবে সেটা বুঝতে পারেনি সে। ঈশাকে এভাবে চুপ করে থাকতে দেখে ইভান ঈশার হাত শক্ত করে ধরে দাতে দাত চেপে বলল
–চুপ করে থাকতে এখানে আনিনি তোকে। আমি কিছু জানতে চাই। আর সেটা তুই জানাবি।

ঈশার হাতে প্রচণ্ড ব্যাথা লাগছিল। সে চোখ মুখ কুচকে বলল
–আমার লাগছে। ছাড়ো।

ঈশার কথায় ইভানের কোন হেলদোল প্রকাশ পেলো না। সে ওই অবস্থাতেই ঈশার দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে আছে। ঈশা ইভানের এমন আচরনের কারন বুঝতে পারলো না। অবাক চোখে ইভানের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ইভান আবার বলল
–স্পিক আউট ঈশা।

ঈশা আঁতকে উঠলো ইভানের চোখ দেখে। সে ইভানের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। ইভান এতো জোরে তার হাত ধরেছে যে ভেঙ্গে যাওয়ার মতো অবস্থা। কিন্তু এই মুহূর্তে ঈশার কোন অনুভুতিই হচ্ছে না। সে ইভানের চোখের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল
–এটা আমাদের ম্যরেজ রেজিস্ট্রি পেপার। আমরা এখন বিবাহিত।

–আমি এটা জানতে চাইনি। যা জানতে চেয়েছি সেটা বল।

ইভান দাতে দাত চেপে বলল। ঈশা তার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত সরে বলল
–তোমাকে না জানিয়েই এটাতে সাইন করিয়ে নিয়েছি। তোমাকে এসবের কিছু জানাতেও চাইনি। আজ বাধ্য হয়ে জানাতে হল।

ইভান নিজের রাগটাকে সামলাতে না পেরে ঈশাকে সজরে একটা থাপ্পড় মারে। ঈশা গালে হাত দিয়ে ইভানের দিকে তাকিয়ে আছে। থাপ্পড়ের আঘাত টা হয়তো ততটাও তীব্র না। কিন্তু মনের কষ্টটা তার থেকেও ভয়ানক। বুকটা ফেটে যাচ্ছে ঈশার। ইভানের এমন আচরন সহ্য করার মতো না। তার পরেও সহ্য করে নিয়েছে। কারন সে জানে ইভানের রাগ হলে সে কোনভাবেই নিজেকে আটকাতে পারেনা। কি করছে সেটা তার মাথায় থাকে না। ঈশা নিজেকে স্বাভাবিক করে খুব শান্ত ভাবে বলল
–তুমি এখন অনেক রেগে আছো। আমরা এটা নিয়ে পরে কথা বলবো। ঠাণ্ডা মাথায় তোমাকে সব বলবো।

ইভান ঈশাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। রাগে ইভানের চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে সে। দাতে দাত চেপে বলল
–পরে কথা বলার মতো কিছুই বাকি রাখিস নি তুই। কি করেছিস সেটা যদি বুঝতে পারতিস তাহলে এতটা স্বাভাবিক থাকতে পারতিস না। তুই বুঝতে পারছিস কি করেছিস?

–আমি কোন অন্যায় করিনি। হ্যা! তোমাকে না জানিয়ে এরকম কিছু করা ঠিক হয়নি। কিন্তু এটা কোন ভুলও না। আমি মনে করি যা করেছি ঠিক করেছি।

ঈশা কথাটা বলতেই ইভান আরও জোরে চপে ধরল তাকে। ঈশা ব্যাথায় আহ শব্দ উচ্চারণ করলেও ইভানের সেদিকে কোন খেয়াল নেই। সে রাগ করে বলল
–এটাকে ধোঁকা বলে ঈশা। আমি জানিনা তুই কেন করেছিস। কিন্তু এটা যদি বাড়িতে কেউ জানতে পারে তাহলে কি হবে ভেবেছিস?

ঈশার হাতটা সামনে উঁচু করে ধরে বলল
–সামান্য আংটি খোলা নিয়ে কতো কিছু হয়ে গেছে। এখন এটা জানতে পারলে কি হবে সেটা কি ধারনা আছে তোর? অনেক কিছু করে আমি তোকে পেয়েছি। এতটা সহজ ছিলোনা। তুই অন্য কারও হয়ে যাচ্ছিলি। সেটা তোর জন্য খারাপ ছিল তাই আমি সেখান থেকে তোকে বাচাতেই সেদিন জোর করে আংটি পরিয়েছিলাম। চাইলে সেদিন তোকে বিয়েও করতে পারতাম। কিন্তু করিনি কেন জানিস? কারন তোর এই সম্পর্কে কোন বিশ্বাস ছিল না। মতামত ছিল না। আমি তোর উপরে জোর করতে চাইনি। সাথে সবার কথা ভেবেছিলাম। সবার মতামত নিয়ে তোর ভালবাসা আদায় করে তবেই বিয়ে করবো। আমি সেটা করেছি। সবটা নিজের মনের মতো করেই করেছি। অনেক ঝামেলার পর আমরা এক হতে যাচ্ছিলাম। সবাই রাজি ছিল আমাদের বিয়ে নিয়ে। তোর ফাইনাল এক্সাম শেষ হলেই আমাদের বিয়ে দিত। কিন্তু মাঝ পথেই তুই বিষয়টাকে এলোমেলো করে দিলি। এই বিষয়টা সবাই যদি জানতে পারে তাহলে কতটা কষ্ট পাবে সেটা ভেবেছিস? আর তোর আব্বু কিভাবে রিয়াক্ট করবে? সব কিছু তোর কাছে ছেলে মানুষী মনে হয়? তুই এই বিষয়টাকে সহজ ভাবে নিচ্ছিস কিভাবে আমি সেটাই বুঝতে পারছি না।

ঈশাকে ছেড়ে দিলো। ইভানের এমন আচরন ঈশাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। চোখ বেয়ে অঝরে পানি পড়ছে। ঈশা ইভানের ঘাড়ে হাত রেখে বলল
–আমার কথাটা শোন প্লিজ। আমার এটা ছাড়া কোন উপায় ছিল না।

ইভান ঈশাকে এক ঝটকায় দূরে ঠেলে দিলো। উলটা দিকে ঘুরেই খুব শান্ত ভাবে বলল
–যেই কারনি থাক এখন আমি আর জানতে চাইনা। এরকম কিছু করার আগে তোর আমাকে জানানো উচিৎ ছিল। যখন জানানোর প্রয়োজন মনে করিস নি তখন এসব বলা অর্থহীন।

ঈশা ফিকরে ফিকরে বলল
–আমি তোমাকে সবটা বলবো। আমাকে ভুল বুঝিওনা প্লিজ। একটু ঠাণ্ডা মাথায় আমার কথা শোন। একটু সময় দাও আমাকে।

ইভান ঈশার দিকে ঘুরে তাকাল। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল
–যে কোন সম্পর্কে বিশ্বাস টা সব থেকে বড়। তুই যদি আমাকে বিশ্বাস করতিস তাহলে আগেই কারণটা বলে দিতিস। আর কি বললি? এরকম পরিস্থিতি না আসলে আমাকে জানানোর প্রয়োজন হতো না। খুব সাহস তোর ঈশা। নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবিস তুই। সব কিছু তোর কাছে ছেলে খেলা মনে হয়। খুব সহজ কিছু। তুই তো আমাকে বিশ্বাস করিস না আবার তোর উপরে যে বিশ্বাস টা ছিল সেটাও ভেঙ্গে দিয়েছিস। আমাকে না জেনে রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করে নিয়েছিস। আবার দেখা যাবে কবে ডিভোর্স পেপারেও সাইন করে নিবি। কখন বিয়ে হল আর কখন ডিভোর্স হল কিছুই জানতে পারলাম না।

ঈশা কাঁদতে লাগলো। কাঁদতে কাঁদতে বলল
–এরকম করনা প্লিজ। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। অনেক বিশ্বাস করি।

–দেখতেই পাচ্ছি তোর বিশ্বাসের নমুনা। এসব কথা বলে আমার কাঁটা ঘায়ে আর নুনের ছিটা দিস না। আমাকে মাফ করে দে। আমি আর নিতে পারছি না।

ইভানের কথ গুলো ঈশাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিলো। ইভান কি বুঝতে পারছে না ঈশা বাধ্য হয়ে এরকম কিছু করেছে। কি কারন সেটাও তো জানতে চাইছে না সে। এতো নিষ্ঠুর কেন ইভান? ঈশা বুঝতে পারছে সে ইভান কে আগে থেকে সব কিছু না বলে অন্যায় করেছে। কিন্তু যা হওয়ার হয়েই তো গেছে এখন এমন করে তো কোন লাভ নেই। ঈশা অসহায়ের মতো বলল
–আমাকে কি কিছুই বলার সুযোগ দিবে না?

–তুই হারিয়ে ফেলেছিস। যখন সুযোগ ছিল তখন বলিস নি। এখন আমি আর শুনতে চাই না।

ঈশা ইভানের কাছে এসে তার কলার চেপে ধরে বলল
–কি পেয়েছ আমাকে? তোমার ইচ্ছা হবে নিজের সাথে জড়াতে জোর করবে আবার ইচ্ছা হবে এভাবে কষ্ট দিবে। কেন? আমি কি অপরাধ করেছি?

ইভান ঈশার হাত দুটো ধরে নিজের কলার ছাড়িয়ে নিয়ে কঠিন গলায় বলল
–আমি যা করেছি তুইও তাই করেছিস। কিন্তু আমি তোকে আগে সবটা বলেছি। তুই তখনও আমাকে বিশ্বাস করিস নি। আর আজ তুই আমাকে না জানিয়েই এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছিস। এখনো আমাকে বিশ্বাস করিস নি। আমার আফসোস থেকে যাবে ঈশা। এতো ভালবেসেও তোর বিশ্বাস অর্জন করতে পারিনি। আমি ব্যর্থ। সত্যিই ব্যর্থ। তুই আমার সামনে থেকে চলে যা। আমি তোর চেহারা দেখতে চাইনা। তুই আমার ইমোশন কে হার্ট করেছিস। আমি খারাপ কিছু করার আগেই এখান থেকে চলে যা। নাহলে যা কিছু হবে তার জন্য তুই দায়ি থাকবি।

ঈশা নিস্পলক ইভানের দিকে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি অনুভুতি শুন্য। ইভান তার দিকে ঘুরেও তাকাল না। ঈশা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বুক ভরা আহাজারি নিয়ে বের হয়ে গেলো।

চলবে………