#তোমার_তুমিতেই_আমার_প্রাপ্তি
লেখক-এ রহমান
পর্ব ২৩
খাওয়া শেষ করে আচমা সব কিছু গুছিয়ে রাখল। ইভান আর ইফতি সোফায় বসে টিভি দেখছিল। ঈশা রান্না ঘরে চা বানাচ্ছে। আচমা পিছনে গিয়ে বলল
–মামনি কিছু লাগবে?
ঈশা পিছনে ঘুরে বলল
–না খালা তুমি শুয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়ে গেছে। বাকিটা আমি সামলে নিবো।
আচমা ঈশার কথা শুনে দাড়িয়ে থাকলো। ঈশা অনেক্ষন পর ঘুরে তাকাল। আচমা কে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বলল
–কিছু বলবে খালা?
আচমা হাসল। ঈশার কাছে গিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বলল
–তুমি খুব ভালো মামনি। একদম এই বাড়ির যোগ্য বউ। কি সুন্দর লাগতেছে তোমারে।
ঈশা হেসে বলল
–তুমি শুয়ে পড়ো খালা।
আচমা চলে গেলো। ঈশা রান্না ঘর থেকে চা নিয়ে এলো। ইফতি আর ইভান কে দিয়ে নিজে একটা কাপ নিয়ে সোফায় বসে পড়লো। সবাই টিভি দেখছে। কেউ কোন কথা বলছে না। চা শেষ করে ইফতি বলল
–আমি শুতে যাচ্ছি। গুড নাইট।
বলেই উঠে চলে গেলো। চা শেষ করে ঈশা কাপ নিয়ে রান্না ঘরে গেলো। সেগুলো ধুয়ে ইভানের পাশে দাড়িয়ে বলল
–আমিও ঘুমাবো।
বলে পা বাড়াতেই ইভান হাত ধরে ফেলল। ঈশা ভ্রু কুচকে বলল
–কি হল?
ইভান ঈশাকে এক টানে কোলে বসিয়ে নিয়ে বলল
–তুই কোথায় জাচ্ছিস জান?
–ঘুমাতে যাচ্ছি।
ইভান আরও একটু কাছে টেনে বলল
–সারা রাত তো পড়েই আছে। এখনি ঘুমাবি?
ঈশা নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করলো। ইভান তাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে চলে এলো। ভিতরে ঢুকে কোল থেকে নামিয়ে দিলো। দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঈশার দিকে ধির পায়ে এগুতে লাগলো। ঈশাও পিছাতে লাগলো। আলমারির সাথে আটকে গেলো ঈশা। শক্ত করে ওড়নার মাথা খামচে ধরল। ইভান দুই পাশে হাত রাখল। ঈশা জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করলো। কাপা কাপা গলায় বলল
–কি…কি করছ? আমি ঘুমাবো।
ইভান আরও একটু ঝুকে বলল
–ঘুমাবি তো অবশ্যই। তার আগে আমার পাওনাটা মিটিয়ে নেই।
ঈশা বুঝতে না পেরে ভ্রু কুচকে বলল
–কিসের পাওনা?
–তোর কাছ থেকে কি আমার চাওয়া পাওয়ার শেষ আছে জান।
ইভান বাকা হাসল। তার হাসি দেখে ঈশা শুকনো ঢোক গিলে ফেলল। ভিত চোখে তাকিয়ে থাকলো। ইভান বুঝতে পেরে মাথা নিচু করে নিশব্দে হাসল। সামনে পড়ে থাকা চুল গুলো কানের পিছনে গুঁজে দিলো। কপালে গভির ভাবে একটা চুমু দিয়ে বলল
–এতো ভয় পাস কেন জান? বিশ্বাস নেই আমার উপরে? আমি কোনদিনও তোর বিশ্বাস ভাঙবো না।
ঈশা ইভানের চোখের দিকে তাকাল। অদ্ভুত শান্ত চাহুনি। ঈশা হেসে ফেলল। ইভান তাকে হাত ধরে টেনে এনে বিছানায় বসিয়ে দিলো। পিঠের নিচে বালিশ দিয়ে নিজে হেলানি দিয়ে ঈশাকে বুকে টেনে নিলো। জড়িয়ে ধরে বলল
–ঘুমা।
ঈশা একটু বিরক্ত হল। বলল
–এভাবে ঘুম আসে নাকি?
ইভান কোন কথা বলল না। বন্ধ জানালাটার পর্দা সরানো। সেদিকেই তাকাল সে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার কাঁচ বেয়ে একে বেকে সেই বৃষ্টির ফোটা গড়িয়ে পড়ছে। ফ্যানের হালকা বাতাসে পর্দাটা এলোমেলো ভাবে উড়ছে। ইভান আনমনেই বলল
–বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বারান্দায় যাবি?
ঈশা মাথা তুলল। ইভানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিতেই ইভান তার সম্মতি বুঝে গেলো। বিছানা থেকে নেমে ঈশাকে নিয়ে বারান্দায় গেলো। দুইটা টুল টেনে নিয়ে একদম গ্রিলের ধার ঘেঁষে বসে পড়লো। বাতাসের ধাক্কায় বৃষ্টির ফোটা গ্রিল বেয়ে পড়ছে। বাকা হয়ে কিছু কিছু গ্রিলের এপারেও চলে আসছে। ঈশার চোখে মুখে আছড়ে পড়ছে। সে বেশ খুশি। ঈশার বৃষ্টি কতো পছন্দ সেটা ইভান জানে। তাই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ইভান ঈশার খোঁপার কাঁটাটা খুলে দিলো। সারা গায়ে চুল ছড়িয়ে গেলো। ঈশা ইভানের দিকে তাকিয়ে হাসল। ঈশা চোখ ফিরিয়ে আবার বৃষ্টি দেখতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। ইভান সামনে তাকিয়ে আছে। অনেক্ষন চুপ থাকতে দেখে ঈশা ইভানের কাধে মাথা রাখল। সামনে তাকিয়েই বলল
–মন খারাপ কেন? কি ভাবছ?
ইভান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। গ্রিলে দুই হাত রেখে সামনে তাকিয়ে বলল
–জানিস ঈশা আমি তোকে খুব ভালবাসলেও কখনও এভাবে পাওয়ার কথা ভাবিনি। তোর সাথে বিয়ে হবে সেটাও ধারনাতে ছিল না। তবে আমি তোকে সব সময় আগলে রেখেছি। রাখতে চেয়েছি। আমি তোকে নিজের মতো করে ভালবাসতে চেষ্টা করেছি। বিনিময়ে তোর কাছে কিছুই আশা করিনি। আমি সত্যিই আজ অবাক হয়েছি সবার বিশ্বাস দেখে। সেদিন যখন এঙ্গেজমেন্টের দিনে সবার সামনে তুই বললি আমাকে বিয়ে করতে চাস। সেদিনও আঙ্কেল কোন কথা বলেনি। এক কথায় মেনে নিয়েছে। আমি সেদিনও আঙ্কেলের চোখে আমার জন্য একি রকম বিশ্বাস দেখেছি। আজকেও সেই একি রকম বিশ্বাস। মাঝে মাঝে ভাবি জানিস আমার আসলেই কি এই বিশ্বাসটা পাওয়ার যোগ্যতা আছে? আঙ্কেল আমাকে বিশ্বাস করে তার এক মাত্র মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত। আমি কি পারব তার এই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে? পারব কি তার মেয়েকে ভালো রাখতে?
ইভানের কথাটা শেষ না হতেই ঈশা তার হাতের নিচে দিয়ে ঢুকে পড়লো। দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখল। ইভান ঈশাকে জড়িয়ে ধরে বিচলিত কণ্ঠে বলল
–ভিজে জাচ্ছিস তো।
ঈশাকে উঠাতে চেষ্টা করলেও সে শক্ত করে ধরে ওভাবেই দাড়িয়ে থাকলো। ইভান বুঝতে পারলো ঈশা এখন কোন কথাই শুনবে না। তাই নিজেও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল
–ভিজলে জ্বর হবে তো।
–হোক।
ঈশার কথা শুনে ইভান একটু হাসল। তারপর ওভাবেই তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুরে গেলো। নিজের পিঠটা গ্রিলে ঠেকিয়ে দাড়িয়ে গেলো। ঈশা এবার মাথা তুলে বলল
–এখন তোমার জ্বর হবে না?
ইভান হাসল। বলল
–হলেই ভালো। তুই সেবা করবি।
ঈশা কিছু বলল না। বাইরে তাকাল। কি ভেবে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল
–বৃষ্টি কমে গেছে। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতে ভিজলেও কি জ্বর হয়?
ইভান ভ্রু কুচকে তাকাল। একটু ভেবে বলল
–আমার মনে হয় তোর বাপ তোর পড়ালেখার পিছনে অযথায় টাকা নষ্ট করছে। সামনে তোর ফাইনাল পরিক্ষা। তারপর ডাক্তার হয়ে বের হবি। এখানে যদি কোন পেশেন্ট থাকতো তাহলে আমি সিওর তোর এরকম প্রশ্ন শুনে নিজের রোগের কথা শোনার আগেই স্বেচ্ছায় জীবন ত্যাগ করতো।
ইভানের কথাটা যে তাকে অপমান করার জন্য সেটা ঈশা বুঝতে পেরে একটু সরে দাঁড়ালো। তারপর অভিমানের সুরে বলল
–এসবের বাইরে তুমি আর ভাবতেই পারনা। কি বুঝে ডক্টর কে বিয়ে করতে গেলাম। আনরোম্যান্টিক একটা!
ইভান ঈশাকে টেনে নিজের কাছে আনল। দুই গালে হাত দিয়ে ঠোট দুটো নিজের দখলে নিয়ে নিলো। কিছুক্ষন পরে ছেড়ে দিয়ে বলল
–আমি কতো রোম্যান্টিক সেটা জানার জন্য যে তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে ঈশা পাখি। শুধু তোমার না। আমি সবার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে চাই। আরও কাছে আসা যে আমার পক্ষে অসম্ভব।
ঈশাকে ছেড়ে দিয়ে ঘরে চলে গেলো। ঈশা বারান্দায় দাড়িয়ে ভাবতে লাগলো। কি অদ্ভুত মানুষটা সবার কথা ভাবে। সবার ইচ্ছার খেয়াল রাখে। ঈশা দাড়িয়েই থাকলো। বেশ কিছুক্ষন পর ইভান আসলো। হাত ধরে টেনে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বলল
–চেঞ্জ কর। ঠাণ্ডা লাগবে।
ঈশা ইভানের দিকে তাকাল। ভেজা কাপড় চেঞ্জ করে এসেছে। ঈশাকে চুপ করে দাড়িয়ে থাকতে দেখে চোখ দিয়ে ইশারা করে ওয়াশ রুমে যেতে বলল। ঈশা কোন কথা না বলেই ওয়াশ রুমে চলে গেলো। কাপড় চেঞ্জ করে ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে দেখল ইভান জানালার সামনে দাড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ঈশা তার পিছনে গিয়ে দাড়াতেই তার দিকে ঘুরে একটা কাপ এগিয়ে দিলো। ঈশা ভ্রু কুচকে সেদিকে তাকাতেই বলল
–কফি। খেলে ঠাণ্ডা লাগবে না।
ঈশা কাপটা হাতে নিয়ে বলল
–কে বানাল?
ইভান ভ্রু কুচকে বলল
–কেন তোর বর কি অকর্মা? কিছুই পারেনা?
ঈশা কিছু বলল না। কফির কাপে চুমুক দিয়েই থেমে গেলো। একটু হেসে বলল
–মোটেই না। আমার বর অনেক ভালো কফি বানাতে পারে।
ইভান দেয়ালের সাথে হেলানি দিলো। ঈশা তার বুকে মাথা রাখল। ইভান এক হাতে তাকে জড়িয়ে নিলো। কিছু একটা ভেবে বলল
–আচ্ছা যদি কোনভাবে সবাই বিয়ের কথা জেনে যায় তাহলে খুব রাগ করবে তাই না?
ইভান কফিতে চুমুক দিয়ে ঈশাকে শক্ত করে ধরে বলল
–জানবে না। তুই এসব নিয়ে ভাবিস না। আমি আছি তো।
‘আমি আছি তো’ এই একটা কথাই ঈশার সমস্ত চিন্তা দূর করে দিতে সক্ষম। এই মানুষটার এই একটা কথা ঈশার পুরো দুনিয়া বদলে দিতে সক্ষম। নিশ্চিন্তে ভরসা করা যায় এই মানুষটাকে। কফি শেষ করে ইভান বলল
–চল ঘুমাব। অনেক রাত হয়েছে।
ঈশা কাপ দুইটা টেবিলে রেখে বিছানায় বসে পড়লো। ইভান সব বন্ধ করে এসিটা অন করে পাতলা কম্বল টেনে শুয়ে পড়লো। ঈশা কম্বলের নিচে ঢুকে বিছানায় হেলানি দিয়ে বসে আছে। ইভান চোখ বন্ধ করেই বলল
–ঘুমানোর ইচ্ছা কি নেই?
ঈশা কিছুই বলল না। ইভান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে বসলো। একটু রাগি সরে বলল
–কি সমস্যা? কেন এরকম করছিস?
ঈশা ইভানের দিকে তাকিয়ে বলল
–ঘুম আসছে না।
ইভান কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলো। ঈশার গালে আলতো করে স্পর্শ করে শান্ত কণ্ঠে বলল
–কি হয়েছে? কি নিয়ে এতো ভাবছিস? আমাকে বল। না বললে আমি কিভাবে বুঝবো?
ঈশা মন খারাপ করে বলল
–সবাই তোমাকে কতো বিশ্বাস করে। আর আমি সব সময় বোকার মতো কাজ করি। বিয়ের কথাটা সবাই জানতে পারলে তোমাকেও ভুল বুঝবে। আমার জন্য শুধু শুধু তোমাকে সবার কাছে খারাপ হতে হবে। আমি এতো বড় বোকামি না করলেও পারতাম।
ঈশার কথা শুনে ইভান হাসল। বলল
–এটা নিয়ে এতো ভাবছিস? বলেছি না এসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই জতদুর পর্যন্ত ভেবেছিস আমি বিষয়টা এতো দূর পর্যন্ত যেতেই দিবো না। বিশ্বাস নাই আমার উপরে?
ঈশা মাথা নাড়াল। ইভান ঈশার গালে হালকা স্পর্শ করে বলল
–তুই যখন বোকামি করেছিস তখনই আমি সব ভেবে নিয়েছি। কি হতে পারে আর কিভাবে এসব সামলানো যায়। আমি জতদিন বেঁচে আছি ততদিন তোকে কোন কিছু নিয়েই ভাবতে হবে না। তুই আমার জীবন। আমি বেঁচে থাকতে আমার জীবন কে কিভাবে কষ্ট দেই বল।
ঈশা ইভানের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ইভান তাকে বুকে টেনে নিয়ে শুয়ে পড়লো।
চলবে………
#তোমার_তুমিতেই_আমার_প্রাপ্তি
লেখক-এ রহমান
পর্ব ২৪
অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। প্রকৃতির নিয়মে ধিরে ধিরে সব কিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। কিছু সময় আগেই সন্ধ্যা পেরিয়ে অতি সজ্জিত পসরা নিয়ে রাত নেমেছে। রাস্তায় রাস্তায় নিয়ন বাতির ঝলক। আবদ্ধ ঘরের এক কোনায় খাটের সাথে মাথা লাগিয়ে মেঝেতে বসে আছে ঈশা। হাঁটু মুড়ে দুই হাতে সেটা চেপে ধরে আছে। চোখটা বন্ধ। মাথাটা এলিয়ে দেয়ায় এলোমেলো চুলগুলো বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘরটা অন্ধকার। দরজাটা কিঞ্চিত ফাকা থাকায় বাইরের হালকা একটা আলো এসে গুমোট অন্ধকারে বাধা সৃষ্টি করেছে। তার মনের মাঝে এলোমেলো ঝড় বয়ে যাচ্ছে। রুমা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। ঈশাকে এভাবে অন্ধকারে বসে থাকতে দেখে লাইট জ্বালাতে জ্বালাতে বলল
–ঈশা তুমি রেডি?
ঈশা চোখ খুলে তার দিকে তাকাল। ক্লান্ত সরে বলল
–কেন ভাবি?
রুমা ভ্রু কুচকে ফেলল। চারিদিকে ভালো করে দেখে নিয়ে বলল
–কি হয়েছে? এই অবস্থা কেন?
ঈশা নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে বলল
–কিছু হয়নি ভাবি। একটু টায়ার্ড ছিলাম। আর রেডি হওয়ার কথা বললে যে? কোথাও যাচ্ছি আমরা?
–কেন তুমি কিছু জাননা? আজ ইফতির মামা মামি আসছে মিরার সাথে ওর এঙ্গেজমেন্টের তারিখ নিয়ে কথা বলতে। ওখানেই যাচ্ছি সবাই। বাবা আর তোমার ভাইয়া চলে গেছে। তুমি রেডি হলেই আমরা চলে যাবো।
ঈশা মনে মনে একটু খুশি হল। ইভান দের বাড়িতে যাবে। উঠে দাঁড়ালো। আলমারির সামনে গিয়ে এলোমেলো ভাবে সব কিছু খুজতে খুজতে বলল
–জানতাম ভাবি। ভুলে গিয়েছিলাম।
রুমা ঘর থেকে বের হতে যাবে তখনই ঈশা ডাকল
–ভাবি?
রুমা ঘুরে তাকাল। এগিয়ে এসে বলল
–কিছু বলবে?
ঈশা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালো। অসহায়ের মতো বলল
–ভাইয়া যখন তোমার উপরে কোন কারনে রাগ করে তখন তুমি কিভাবে মানাও?
রুমা ভ্রু কুচকে তাকাল। অনেকটা সময় নিয়ে ভাবল। চিন্তিত ভঙ্গিতেই বলল
–অভিমান আর রাগ দুইটা আলাদা জিনিস। আগে তোমাকে বুঝতে হবে সেটা কোনটা। তারপর মানানোর ব্যবস্থা করতে হবে। রাগ যে কেউ করতে পারে। অভিমান করতে অধিকার লাগে। রাগ সহজেই ভেঙ্গে যায়। কিন্তু অভিমান ভাংতে লাগে তীব্র ভালবাসা। নাহলে সেই অভিমান ক্রমশ দূরত্ব তৈরি করে।
ঈশা অসহায়ের মতো মুখ করে ফেলল। গভির চিন্তায় ডুবে গেলো। তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে অভিমান আর রাগের পার্থক্যটা বুঝে উঠতে পারেনি। রুমা একটু হেসে বলল
–আগে পার্থক্যটা বুঝতে শেখ তারপর বাকি সব কিছু ভাববে। এখন রেডি হও। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
ঈশা নিজের মতো একটা কাপড় বের করে রেডি হয়ে নিলো। হালকা করে একটু সাজল। বাইরে বের হয়ে রুমা আর তার মার সাথে ইভান দের বাড়ির দিকে বেরিয়ে গেলো। দরজায় কলিং বেল বাজাতেই ইভানের মা দরজা খুলে দিলেন। সবার সাথে কথা বলে ঈশার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন
–এটা আসার সময়? বাড়ির বড় বউ হিসেবে তোর কোন দায়িত্ব আছে কিনা বল? তোর আরও আগে আসার কথা ছিল।
ঈশা ঠোট কামড়ে কান ধরে বলল
–সরি মামনি। ভুল হয়ে গেছে।
ইভানের মা হেসে ফেলল। বাড়ির ভিতরে ঢুকেই ঈশা চারিদিকে চোখ ফিরিয়ে দেখল ইভান সোফায় বসে আছে সবার সাথে। ফোনে কি যেন করছে। কাজ শেষ করে উঠে এসে ঈশার মা আর রুমার সাথে কথা বলল। কিন্তু ঈশার দিকে একবারও ফিরে তাকাল না। ঈশার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ইভান কথা শেষ করে ইফতির কাছে গেলো। তার সাথে কথা বলছে। ঈশা সেখানে গিয়ে দাড়াতেই ইভান চলে গেলো। ঈশা অসহায়ের মতো ইভানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলো। ইফতি ঈশার ঘাড়ে হাত রেখে বলল
–তোর জল্লাদের কি হয়েছে রে? মুড অফ মনে হচ্ছে। আবার তোর সাথেও কথা বলছে না। কি ব্যাপার?
ঈশা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ইফতির দিকে তাকিয়ে বলল
–কাজটাই এমন করেছি। তাই তো এসব মেনে নিতে হচ্ছে।
ইফতি এবার নড়েচড়ে ঠিক হয়ে দাঁড়ালো। মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করলো। বলল
–কি করেছিস? খুলে বল।
ঈশা অসহায়ের মতো মুখ করে বলল
–ওই যে সেদিন সন্ধ্যায় ক্লাস শেষে তুই থেকে গেলি আর আমি সারাদের সাথে বাসায় এসেছিলাম।
ইফতি একটু মনে করার চেষ্টা করলো। মনে পড়তেই বলল
–হ্যা। তুই সারা আর মনি একসাথে বাসায় আসার জন্য বের হয়েছিলি। তো কি হয়েছে?
–আমরা বের হয়ে অর্ধেক রাস্তায় চলে এসেছিলাম। কিন্ত তখনি সারার বয় ফ্রেন্ড নিরাদ ফোন দেয়। দেখা করতে বলে পাশেই একটা রেস্টুরেন্টে। সারা একা যেতে চায়না। তাই আমাদের দুজনকেই জোর করে যেতে। আমরা প্রথমে যেতে না চাইলেও সারার অনুরধের কাছে হার মেনে যাই। বাধ্য হয়ে চলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি নিরাদ একা না তার একজন বন্ধুও আসে। আমি আগেও কয়েকবার ওই ছেলেটাকে দেখেছি। কিন্তু কথা হয়নি। আমরা সবাই বসে গল্প করছিলাম। তখন তোর ভাই আমাকে ফোন দেয় জিজ্ঞেস করার জন্য আমি বাড়ি পৌঁছে গেছি কিনা। ওই মুহূর্তে কিছু মাথায় ঢুকছিলো না। আর জানলে খুব রাগ করবে। তাছাড়া কিছুক্ষনের মধ্যেই বাসায় চলে আসার কথা ছিল। তাই ফটাফট একটা মিথ্যে বলে দেই যে আমি বাড়িতে চলে এসেছি। কিন্তু সব দুরভাগ্য তো আমি সাথে নিয়েই ঘুরি। তাই সেটা বেশিক্ষন কাজে দিলো না। মুহূর্তেই মুষল ধারে বৃষ্টি শুরু হল। সেই বৃষ্টিতে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠে। তাই আমরা সেখানেই বসে থাকি।
ঈশা থেমে গেলো। ইফতি জিজ্ঞেস করলো
–ভাইয়া মিথ্যাটা জানতে পেরেই রাগ করেছে তাই তো?
ঈশা অসহায়ের মতো বলল
–সেটা হলেও তো একটা কথা ছিল। আগে যা হয়েছে এটা তো তার কাছে কিছুই না।
ইফতি কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলো
–তার মানে আসল ক্লাইমেক্স এখনো বাকি। কি করেছিস তুই খুলে বল তো।
ঈশা ভ্রু কুচকে বলল
–আমি কিছুই করিনি। আমার কোন দোষ ছিল না। আমরা ওখানে বসেই ভাবছিলাম কিভাবে বাসায় যাবো। কোন উপায় খুজে পাচ্ছিলাম না। বৃষ্টির বেগ বেড়েই চলেছে আর এদিকে সময়। অনেক রাত হয়ে গেছে। আর সেখানে থাকা সম্ভব হল না। বাধ্য হয়ে বৃষ্টিতে ভিজেই রওনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আশে পাশে কোথাও কোন রিকশা বা সি এন জি কিছুই ছিলোনা। হেটে হেটে আসতে হল। একটু সামনে মোড়ে এসে সারা আর মনি তাদের বাড়ির দিকে চলে গেলো। আমি বললাম একাই যেতে পারব। কিন্তু তারা কেউ মানল না। ফাকা রাস্তা তার উপর অনেক রাত। তাই নিরাদ ওদের সাথে গেলো আর নিরাদের বন্ধু শোভন আমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে আসলো আমার সাথে। বিষয়টা আমি তখন বুঝতে পারিনি। তখনও বৃষ্টি ছিল। বাসার কাছাকাছি এসে শোভন আমাকে দাড়াতে বলল। আমি কিছু না ভেবেই দাড়িয়ে যাই। আর সে ফাকা রাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসে আমাকে প্রপোজ করে। সে নাকি অনেকদিন থেকে আমাকে পছন্দ করে। কিন্তু বলার সাহস হয়ে উঠেনি। হয়তো আমার এঙ্গেজমেন্টের কথা জানে না। আমি কিছুই বুঝতে পারিনা কি হচ্ছে। বুঝতে চেষ্টা করি সব কিছু। কিন্তু জতক্ষনে আমি বুঝে উঠি তার মাঝেই একজন এসে পড়ে।
বলেই ঈশা চোখ বন্ধ করে ফেলে। ইফতি বিস্ময় নিয়ে বলে
–মাই গড! কেস তো বেশ জটিল। এটা তো কয়েকদিন আগের কথা। তুই আমাকে এসব কিছু বলিস নি কেন? এই জন্য বেশ কয়েকদিন থেকে দেখছি ভাইয়ার মুড অফ।
ঈশা চোখ খুলে বলল
–সেদিন থেকেই মানানোর চেষ্টা করছি। কোন লাভ হচ্ছে না। না কথা শুনছে না কথা বলছে। ফোন দিলেও রিসিভ করে না। এস এম এস দিলেও সিন করেনা। এসব নিয়ে আমারও মুড অফ ছিল। তাই তোকেও জানাতে পারিনি।
ইফতি হতাশ হয়ে বলল
–তুই তো জানিস তোর জল্লাদ কেমন। এতো সহজে কি মানবে?
ঈশা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল
–কিভাবে মানাবো বুদ্ধি দে না।
ইফতি একটু ভেবে বলল
–ঘরে নিয়ে যা। গলায় চাকু ধরে বল ‘তুমি যদি আমার সাথে কথা না বল তাহলে আমি নিজেকে শেষ করে দিবো।’
ইফতির কথা শুনে ঈশার মাথা ঘুরে গেলো। কোন মতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
–তোর জত্তসব বুদ্ধি নিজের কাছেই জমা রাখ। সেদিন তো একটা থাপ্পড় মেরেছিল শুধু। এরকম কিছু করলে ওই চাকু দিয়েই আমার গলা কেটে দিবে। আমি এতো তাড়াতাড়ি মরতে চাই না।
ইফতি অসহায়ের মতো বলল
–এখানে এখন কিছুই করা সম্ভব না রে। ভাইয়া নিজে থেকে যতক্ষণ চায়নি ততক্ষন কেউ কিছুই করতে পারবে না। তুই তো জানিস। তাই এখন রিলাক্স থাক। এমনিতেই রাগ কমে যাবে। তখন সব ঠিক হয়ে যাবে।
পাশ থেকে ইফতির ডাক পড়তেই সে চলে গেলো। ঈশা সামনে দাড়িয়ে থাকা ইভান কে দেখছে। টেবিলে হেলানি দিয়ে হাত গুঁজে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে স্থির দৃষ্টিতে। এই পর্যন্ত একবারও ঈশার দিকে তাকায় নি। ঈশার খুব কষ্ট হচ্ছে ইভানের এমন আচরন মেনে নিতে। যদিও বা তার দোষ আছে চাইলেই অন্য ভাবে শাস্তি দিতে পারে কিন্তু এরকম অবহেলা ঈশা মেনে নিতে পারছে না। ইভানের অভিমানটা যে তার ভালবাসার মতই তীব্র। ঈশাকে প্রতি মুহূর্তে জালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে।
——————
ইফতি আর মিরার এঙ্গেজমেন্টের ডেট ঠিক করা নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। ইভানের দাদিও এসেছে। সবাই সোফায় বসে আলোচনা করছে। ঈশা চা নিয়ে আসলো। সবাইকে দিয়ে চলে যাবে তখনি ইভানের দাদি তাকে ডাকল। সেখানে গিয়ে দাড়াতেই পাশে বসতে ইশারা করলো। ঈশা একটু হেসে পাশে বসলো। সামনের সোফায় বসে ছিল ইভান। তার দাদি ইভান কে ইশারা করে ডাকল। ইভান উঠে দাড়াতেই তাকে ঈশার পাশে বসতে বলল। ইভান তার পাশে বসলো ঠিকই কিন্তু দূরত্ব রেখে। সবাই সেখানে থাকায় ঈশা বেশ লজ্জা পেলো। মাথা নিচু করে বসে থাকলো। ইমতিয়াজ রহমান তাদের দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে বললেন
–আমি একটা বিষয় ভেবেছি। যদি কারও কোন আপত্তি না থাকে।
সবাই তার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকাল। তিনি একটু সময় নিয়ে বললেন
–আমি ভাবছিলাম ইফতি আর মিরার সাথে আমরা ইভান আর ঈশার এঙ্গেজমেন্ট টাও সেরে ফেলি। এক সাথেই হয়ে যাবে। আর যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভালো।
সবাই কিছুক্ষন চুপচাপ বসে থাকলো। ঈশার বাবা বললেন
–আমি আর কি বলবো এখন তুমি যেটা ভালো মনে করো। সেটাই করো।
সবাই সম্মতি দিতেই ইমতিয়াজ রহমান বললেন
–তাহলে আগামি শুক্রবার একসাথে অনুষ্ঠানটা হচ্ছে। এতে তো কারও কোন আপত্তি নাই। আমরা সেভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। হাতে ৬ টা দিন আছে। এর মাঝেই সব রকম প্রস্তুতি শেষ করতে হবে। সময়টা একটু কম হয়ে গেছে কিন্তু সবাই মিলে কাজ করলে খুব একটা অসুবিধা হবে না।
ইমতিয়াজ রহমান কথা শেষ করলেন। ঈশার দিকে তাকিয়ে বললেন
–মামনি? তোমার কিছু বলার থাকলে বলতে পার। মানে তোমারও তো অনেক ধরনের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে। কোন সমস্যা নেই। তুমি যেভাবে চাও সব সেভাবেই হবে।
ঈশা একটু ইতস্তত বোধ করলো। কিন্তু মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল
–আমার কিছু বলার নাই আঙ্কেল।
ঈশার কথা শেষ করতেই ইভান গম্ভীর গলায় বলল
–কিন্তু আমার কিছু বলার আছে আব্বু। এই সিদ্ধান্তে আমার আপত্তি আছে।
‘আপত্তি’ কথাটা ঈশার কষ্টের মাত্রা দিগুন বাড়িয়ে দিলো। ছলছল চোখে ইভানের দিকে তাকাল। ইভান ভাব্লেশ হীন ভাবে নিচের দিকে আছে। ইভানের তো কোন আপত্তি থাকার কথা না।
চলবে…………