#তোমার_তুমিতেই_আমার_প্রাপ্তি
লেখক-এ রহমান
পর্ব ২৭
চারিদিকে এতো সোরগোল। অস্থির হয়ে উঠেছে পরিবেশ। নিকটাত্মীয় আসতে শুরু করেছে দুই বাড়িতেই। ৪ দিন পর বিয়ে। সময় হাতে বশি নেই। অনেক আয়োজন এখনো বাকি। তবে অনেকটাই সামলে এসেছে। সবাই খুব ব্যস্ত। নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নিয়েছে। এতো সোরগোল কোন কালেই ঈশার পছন্দ ছিল না। এক প্রকার বিরক্ত হয়েই বারান্দায় বসে কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনছে ঈশা। এর মাঝেই কেউ একজন কান থেকে টান মেরে সেটা খুলে ফেলতেই বিরক্তি নিয়ে সেদিকে তাকায় সে। তার বড় ফুপু দাড়িয়ে আছে রাগি চোখে তাকিয়ে। ঈশা ভালো করে তার দিকে তাকাতেই তিনি বাজখাই কণ্ঠে বললেন
–দেখ মেয়ের কাণ্ড। এখনো এভাবে বসে আছিস কেন? রেডি হবি কখন? হাতে বেশী সময় নেই।
ঈশা ভ্রু কুচকে ফেলল। বিরক্তি মুখে বলল
–রেডি হয়ে আবার কোথায় যাবো ফুপু?
তার ফুপু মাথায় হাত দিয়ে চেচামেচি শুরু করলেন। তার চেচামেচি শুনে ফুপুত বোন নিলা চলে এলো দৌড়ে। তার মাকে থামিয়ে দিয়ে বলল
–কি হয়েছে? এভাবে কেন চেচাচ্ছ?
তার মা বলল
–দেখ এখনো বসে আছে। একটু পরেই ওর শশুর বাড়ি থেকে লোকজন চলে আসবে।
নিলা ঈশাকে দেখে নিয়ে তার মাকে বলল
–তুমি যাও মা। অন্য কাজ করো আমি ওকে রেডি করাচ্ছি।
ঈশার ফুপু আর কথা বাড়াল না। নিজের কাজে চলে গেলো। ঈশা উঠে দাঁড়ালো। নিলাকে জিজ্ঞেস করলো
–ওরা কেন আসবে আপু?
নিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
–বিয়ের আগে মেয়েকে ছেলের বাড়ি থেকে আংটি অথবা চেন কিছু একটা পরিয়ে দেয়। সেটা যদিও বা ইভান ভাইয়া একবার পরিয়ে দিয়েছে। তবুও তোর দাদি শাশুড়ি এটা নিয়ে একটু আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি নিজে তার নাতবউ কে কিছু একটা পরিয়ে দিতে চান আয়োজন করে। তাই তারা একটু পর আসছে। তুই তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।
ঈশা অতি বিস্ময় নিয়ে বলল
–এতো কিছু হচ্ছে অথচ আমাকে কেউ কিছুই বলছে না। কেন? ফুপু না বললে তো আমি জানতামই না।
নিলা হাসল। ঈশাকে হাত ধরে ঘরে এনে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বিছানায় পড়ে থাকা একটা প্যাকেট হাতে দিয়ে বলল
–এই শাড়ীটা পরে নে। খুব দ্রুত। সবার অনেক কাজ বাকি রে।
ঈশা একটা শ্বাস ছেড়ে ওয়াশ রুমে গেলো। কিন্তু একা একা পরতে পারলো না। এর আগেও তো সে নিজে নিজে পরেছে। তাহলে আজ সব কিছু এমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে কেন? মাথাটাও ঠিক মতো কাজ করছে না। কেমন একটা অসস্তি কাজ করছে তার মধ্যে। কোন রকমে শাড়ীটা পেচিয়ে বের হয়ে এলো। সামনে নিলাকে দেখতে পেয়ে অসহায়ের মতো বলল
–পারছি না আপু।
নিলা শব্দ করে হেসে বলল
–জানি তো পারবি না। এই জন্যই বসে আছি।
বলেই ঈশাকে শাড়ি পরিয়ে দিলো। কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই বাইরে থেকে ডাক পড়লো। সবাই এসে গেছে। ডাক কানে আসার সাথে সাথেই ঈশা কেমন লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেলো। ঠিক যেমনটা ইভানের প্রথম স্পর্শে হয়েছিলো। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে সবার সামনে জেতেও তার তেমনি লজ্জা লাগছে। নিলা তাড়াতাড়ি করে শাড়ীটা পরে দিয়ে ঝটপট কিভাবে যেন সাজিয়ে দিলো। আহা মরি তেমন সাজ না। তবে কমও না। আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিলো। কেমন লাগছে সেটা বুঝতে পারছে না। শুধু অসস্তি হচ্ছে বেশ। নিলা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে বলল
–চল।
বলেই টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। ঈশা কয়েক কদম বাড়িয়ে আবার থেমে গেলো। নিলা ভ্রু কুচকে পিছনে তাকাল। বলল
–কি হল? থামলি কেন?
ঈশা ভিত কণ্ঠে বলল
–কে কে এসেছে আপু?
নিলা বিরক্ত হল। হাত ছেড়ে দিয়ে ভালো করে দাঁড়ালো। একটু ঝাঝাল কণ্ঠে বলল
–আমি কি দেখেছি? তোর সাথেই তো ছিলাম। আর এমন ভাবে ভয় পাচ্ছিস যেন অপরিচিত কেউ। যেই আসুক না সবাই তো তোর পরিচিত। তাড়াতাড়ি আয়।
বলেই সে পা বাড়াল। কিন্তু ঈশার পা যেন আটকে গেলো। ভারি হয়ে উঠছে। বুকের ঢিপঢিপ শব্দটা বেড়ে গেলো। শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেলো। ঘামতে লাগলো। এমন কেন লাগছে তার? ইভান কি এসেছে? ভাবতেই গলা শুকিয়ে এলো। নিলা ঈশাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে কঠিন গলায় বলল
–বিয়েটা কি আদৌ করার ইচ্ছা আছে?
ঈশা চোখ বন্ধ করে ফেলল। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়েও কিছুদুর পরে আবার থেমে গেলো। ইভান কে সোফায় বসে থাকতে দেখেই তার সমস্ত শরীর যেন শক্তি হারিয়ে ফেলল। হালকা গোলাপি রঙের একটা পাঞ্জাবী পরেছে। হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। চুলগুলো এখনো ভেজা। মনে হয় কিছুক্ষন আগেই গোসল করেছে। ইফতির সাথে বসে কথা বলছে। কি নিয়ে যেন হাসাহাসি করছে। ইভান তার দিকে তাকাতেই চোখে চোখ পড়লো। ঈশা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো। ইভান ক্ষীণ হাসল। এমন তো আগে হয়নি? তাহলে আজ কেন? এতো লজ্জা কেন পাচ্ছে সে ইভানের সামনে যেতে? নিলা এবার বিরক্ত হয়ে এক প্রকার টেনেই নিয়ে গেলো ঈশাকে। নিয়ে গিয়ে ইভানের পাশে বসিয়ে দিলো। ইভানের শরীর তার সাথে ছুঁইছুঁই হতেই হালকা কেঁপে উঠলো সে। ইভান বুঝতে পেরে ভ্রু কুচকে তাকাল। ঈশার রক্তিম চেহারা লালাভ নাকের ডগা তার লজ্জার মাত্রাটা ঠিক ঠাক বুঝিয়ে দিচ্ছে। ইভান মুচকি হাসল। তার দাদি ঈশাকে দেখে নিয়ে বলল
–খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে।
ঈশা চোখ নামিয়েই ক্ষীণ হাসল। তিনি একটা চেন বের করে ইভানের উদ্দেশ্যে বললেন
–দাদু ভাই এটা পরিয়ে দাও।
ইভান চেনটা হাতে নিলো। ঈশার মাথায় শাড়ির আচল টেনে দেয়ায় সেটা পরাতে অনেকটা কাছে যেতে হবে। ইভান ভালো করে দেখে নিলো ঈশাকে। গালের পাশ দিয়ে হাত বাড়িয়ে শাড়ির আচলটা সরিয়ে দিলো। ঈশা হালকা ভাবে নিচের ঠোট কামড়ে ধরল। ইভান মুখটা একদম কানের কাছাকাছি আনতেই ঈশা চোখ বন্ধ করে ফেলল। অতিরিক্ত লজ্জা আর ভয়ের কারনে গা ঘেমে গেছে। গলা বেয়ে ঘাম ঝরছে। ইভান চেনের হুকটা লাগিয়ে দিয়েও সরল না। ঈশা চোখ বন্ধ করে ঠোট কামড়ে ধরেই বসে আছে। গলায় জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম এক আঙ্গুলে মুছে দিয়ে কানে ফিসফিস করে দুষ্টুমির সুরে বলল
–এতটুকুতেই ঘেমে আইস্ক্রিমের মতো গলে যাচ্ছিস। বিয়ের পর তোর কি হবে সেটা ভেবেই আমার খুব টেনশন হচ্ছে। ভয়েই আবার দম আটকে মরেই না যাস। তখন আমার কি হবে বল।
ঈশা শুকনো ঢোক গিলে ফেলল। ইভান সরে গেলো। সবাই নিজেদের মতো গল্পে ব্যস্ত হয়ে গেলো। এতক্ষন সবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গুলো ঈশার উপরে থাকলেও এখন নেই। একটু হলেও অস্বস্তিটা কমেছে তার। ইভান পাশ থেকে টিস্যু নিয়ে ঈশার দিকে এগিয়ে দিলো। ঈশা সেদিকে তাকিয়ে প্রথমে একটু বিরক্ত হলেও কি মনে করে সেটা নিয়ে নিলো। মুখের ঘামটা মুছে আচলটা টেনে দিলো। ইভানের মা নিজদের কথা শেষ করে সবার উদ্দেশ্যে বললেন
–আমরা চাইছি দুই বাড়ির অনুষ্ঠান সব একসাথেই হোক। আর বাকি অনুষ্ঠান গুলো সব কমিউনিটি সেন্টারে হবে। আপনাদের কোন আপত্তি নেই তো?
ঈশার মা হেসে বললেন
–আপত্তি থাকার কি আছে? এটা তো ভালো কথা। সবাই তাহলে সবার অনুষ্ঠানেই মজা করতে পারবে। কারও আফসোস থাকবে না যে ইভানের আর ঈশার বিয়েতে আলাদা করে মজা করতে পারেনি।
ঈশার মায়ের কথা শুনে সবাই বেশ মজা পেলেন। পুরো ঘরে হাসির রোল পড়ে গেলো। কিন্তু ঈশার অসস্তি বেড়েই যাচ্ছে। সে অনেক জোরে একটা শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো। কিছুক্ষন পরেই নিলা এসে ঈশার হাত ধরে তাকে উঠালো। ঈশা উঠে দাড়াতেই ইভান নিলার দিকে তাকাল। নিলা দাত কেলিয়ে বলল
–বিয়ের আগে বউকে এতো দেখতে হয় না। বিয়ের পরেই দেখ মন ভরে।
ইভান খুব শান্ত ভাবে বলল
–ছোট বেলা থেকেই আমার বউকে আমি মন ভরে দেখে এসেছি। ভবিষ্যতেও তাই দেখবো। তোকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না।
ঈশা তাদের এমন লাগাম ছাড়া কথা শুনে চারিদিকে তাকাল। সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত। কেউ তাদের কথা শুনতে পায়নি। নিলা ঈশাকে ঘরে এনে তাড়াতাড়ি শাড়ি চেঞ্জ করতে বলল। ঈশার আসলেই শাড়ীটা পরে বিরক্ত লাগছিল। সেও সুযোগ পেয়ে তাড়াতাড়ি শাড়ি ছেড়ে নিজের মতো জামা পরে নিলো। ইভানরা আচার অনুষ্ঠান নিয়ে আরও কিছুক্ষন কথা বলে চলে গেলো। এর মাঝে ঈশা একবারও ঘর থেকে বের হল না। ইভান যতক্ষণ বাড়িতে ছিল ততক্ষন তার মধ্যে এক রকম অসস্তি কাজ করছিলো। কোন কিছু করেই শান্তি পাচ্ছিল না। এরকম হওয়ার কারণটা ঈশার কাছে কোন ভাবেই স্পষ্ট না।
চলবে………
#তোমার_তুমিতেই_আমার_প্রাপ্তি
লেখক-এ রহমান
পর্ব ২৮
‘আইবুড়ো ভাত’ শব্দটা ঈশা আজ সকালেই প্রথম শুনল। ইভানের দাদি নাকি বলেছে তাদের দুজনকে আইবুড়ো ভাত খাওয়াতে হবে। তিনি সেকালের মানুষ। আর থাকেনও গ্রামে। সেখানে বিভিন্ন রকমের আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয় বিয়েকে ঘিরে। এগুলো আদৌ পালন করা জরুরি কিনা সেটা মুখ্য বিষয় নয়। তিনি চান তার বিয়েতে যেসব নিয়ম পালন করা হয়েছে সেসব যেন ইভানের বিয়েতেও পালন করা হয়। ইভানের দাদি নিয়ম পালনে খুব স্ট্রিক্ট। তাকে এসব নিয়ে কেউ বাধা দিতে পারবে না। খুব রেগে যাবেন। তাই কেউ কিছুই বলছে না। নিজেদের মতো তার এসব হুকুম পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। ঈশার ফুপু এসে একটা মেরুন সূতি শাড়ি হাতে দিয়ে তাড়াতাড়ি গোসল সেরে সেটা পরতে বললেন। ঈশা গোসলে যাবে ঠিকই কিন্তু তার মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সমস্ত এই নতুন শব্দটাকে ঘিরে। সে ভ্রু কুচকে তার ফুপুকে বলল
–আচ্ছা ফুপু? এই আইবুড়ো কি জিনিস?
ঈশার ফুপুর কথায় কথায় রেগে গিয়ে চেচামেচি করার বাতিক আছে। সেটার প্রস্তুতি নিলেও মুহূর্তেই দমে গেলেন তিনি। একটু ভাবলেন। এইসব আচার অনুষ্ঠান এখন তেমন চোখে পড়েনা। নেই বললেই চলে। আর শহরে বড় হওয়ায় এসব সম্পর্কে না জানাটাই স্বাভাবিক। তাই তিনি টেনে ঈশাকে বসালেন। তারপর খুব শান্ত ভাবে বললেন
–প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পরেও যখন মেয়েদের বিয়ে হয়না তখন তাকে আইবুড়ো বলে। আর বিয়ের আগে অনেক আয়োজন করে তাদের পছন্দের খাবার খাওয়ানো হয়। সেটা ছেলে মেয়ে দুজনের জন্যই আয়োজন করা হয়। তাদের সমস্ত পছন্দের খাবার সামনে দেয়া হয়। সব কিছুই একটু একটু করে মুখে দিতেই হয়। সেটাকে আইবুড়ো ভাত বলে। এটা খাওয়ানোর একটাই কারন হল বিয়ের পর এই আইবুড়ো নামটা ঘুচে যাবে। তাই শেষ বারের মতো বিয়ের আগের এমন আয়োজন করে খাওয়ানো।
ঈশা কি বুঝল কে জানে। আবারো প্রশ্ন করে বসলো
–কেন? আর কখনও এমন করে খাওয়াবে না?
ঈশার ফুপু মুচকি হেসে বলল
–খাওয়াবে কিন্তু সেটা বিয়ের পর। আইবুড়ো অবস্থায় এটাই শেষ খাওয়া।
ঈশা গভির চিন্তায় ডুবে গেলো। তার ফুপু এভাবে চিন্তিত হয়ে বসে থাকতে দেখে বলল
–আর দেরি করিস না। সবাই তোর জন্য বসে থাকবে।
ঈশা উঠে দাড়িয়ে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো
–সবাই মানে? কে বসে থাকবে?
ঈশার ফুপু উঠে ঘর থেকে যেতে যেতে বলল
–ইভান আর তোর আইবুড়ো ভাত একসাথেই খাওয়ানো হবে। ছাদে আয়োজন করা হয়েছে। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।
ঈশা থেমে গেলো। আবার ইভান আসবে? কথাটা শুনেই তার অসস্তি হচ্ছে। কেমন এক অনুভুতি। ভয় লজ্জা সব মিলেমিশে একাকার। আচ্ছা বিয়ের সময় কি সব মেয়েদেরই এমন হয়? ঈশা আর ভাবতে পারলো না। ওয়াশ রুমে চলে গেলো। গোসল শেষ করে অনেকটা সময় নিয়ে শাড়ীটা পড়লো। আজ নিজে নিজেই পরেছে। আয়নার সামনে দাড়িয়ে গেলো। কি করবে বুঝতে পারলো না। রুমাকে সেদিক দিয়ে যেতে দেখেই ডাকল। রুমা এগিয়ে এসে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল
–কি হল? কিছু বলবে? শাড়ি তো পরে ফেলেছ ঠিকঠাক।
ঈশা অসহায় হয়ে বলল
–আর কি করব বুঝতে পারছি না।
রুমা একটু হাসল। পুরোটাই ভিতরে ঢুকে ঘাড়ে হাত রেখে বলল
–মেয়েদের বিয়ের সময় এমন অদ্ভুত রকমের অনুভুতি হয় ঈশা। চেনা পরিবেশ অচেনা হয়ে উঠে। গোছানো অনুভুতি এলোমেলো হয়ে যায়। লজ্জা আড়ষ্টতা সব সময় ঘিরে থাকে। এটা স্বাভাবিক। তোমার যা যা করতে ইচ্ছা করে করো।
বলেই চলে গেলো। ঈশা অনেকটা সময় দাড়িয়ে থাকলো। তারপর একটু ভেবে হালকা করে চোখে কাজল দিলো। শাড়ির পাড়ের সাথে মিলিয়ে ছোট্ট করে কালো রঙের একটা টিপ পরল। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক ছুয়ে দিলো। আয়নায় নিজেকে ভালো করে দেখে নিলো। বাইরের সোরগোল কানে আসছে। বিছানায় বসে মাথাটা হেলে দিলো। চোখ বন্ধ করে ফেলল। তখনই রুমা তাড়াতাড়ি করে এসে বলল
–তাড়াতাড়ি চল। সবাই এসে গেছে।
ঈশা আয়নার সামনে দাড়িয়ে লম্বা করে ঘোমটাটা টেনে দিলো। রুমার সামনে দাড়িয়ে বলল
–সব ঠিক আছে?
রুমা হেসে মাথা নাড়াল। ঈশাকে নিয়ে সবাই ছাদে গেলো। ঈশা ছাদে উঠেই চোখ উঠিয়ে একবার চারিদিকে দেখে নিলো। ইভান্ দের বাড়ির সবাই প্রায় এসেছে কিন্তু ইভান কে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ঈশাকে টেবিলে নিয়ে গিয়ে বসাল। ঈশার সাথে তার আর ইভানের কাজিনরা টেবিলে বসে পড়েছে। পুরো টেবিল জুড়ে খাবারের মেলা। একটা বড় প্লেটে অল্প করে সব ধরনের খাবার সাজিয়ে দিয়েছে ঈশার জন্য। ঈশা খাবারের থালাটা সামনে নিয়ে বসে ভাবছে কোথা থেকে শুরু করবে আর কিভাবে শুরু করবে। তার ভাবনা দেখে ইভানের দাদি বলল
–শুভ কাজে মিষ্টি মুখ করতে হয়। মিষ্টি দিয়েই শুরু করো।
তার কথা শুনে ঈশা কোন কিছু না ভেবেই সামনে থেকে একটা বরফি তুলে মুখে দিতে যাবে তখনই কেউ একজন তার হাত ধরে ফেলে। ঈশা পাশ ফিরে দেখে ইভান তার হাত ধরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ঈশা বুঝতে পারল না ঠিকই কিন্তু কোন কথা বলল না। চোখ নামিয়ে নিলো। ইভান তার হাত থেকে বরফিটা নিয়ে ইফতির হাতে দিয়ে বলল
–সবাই নাহয় ভুলে গেছে কিন্তু তুই? বাদামে এলারজি সেটা মনে রাখা উচিৎ ছিল। না দেখে খেয়ে ফেললে বাকি খাবার আর খেতে হতোনা।
ঈশা ইফতির হাতে থাকা বরফিটার দিকে তাকাল। সত্যিই ওটার উপরে বাদাম কুচি দেয়া। আর ঈশার সাংঘাতিক রকমের এলারজি আছে বাদামে। একটু বেশী পরিমানে খেয়ে ফেললে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় তার। এখনি না দেখে খেয়ে ফেললে অসুস্থ হয়ে যেত। ইভান পাশের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে পড়ল। ঈশা চুপচাপ বসে আছে। ভালো করেই বুঝতে পারছে এখানে সবাই না থাকলে ইভান আজ তাকে ইচ্ছা মতো বকত। ঈশার মা এবার ভালো ভাবে খেয়াল করলো সব মিষ্টি জাতীয় খাবারের উপরেই বাদাম কুচি দেয়া। তিনি মা হয়ে মেয়ের এতো বড় বিষয়টা কিভাবে ভুলে গেলেন। কিছুটা অপরাধ বোধ কাজ করলো তার মধ্যে। কিন্তু পরক্ষনেই আবার ইভানের এমন খেয়াল রাখা দেখে চোখ ছলছল করে উঠলো। তার মেয়ে ইভানের কাছে কতটা সুখী হবে সেটা নিয়ে তাকে আর ভাবতে হবে না। ইভানের দাদি ইভান কে দেখে বলল
–এতক্ষন কোথায় ছিলে তুমি? আর একটু দেরি করলেই তো বিপদ হয়ে যেত।
ইভান খাবারের দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলল
–আমার আগে বিপদ আসবে এটা তো মোটামুটি অসম্ভব দাদু। কখনও এরকম হয়নি আর আমি বেঁচে থাকতে হবেও না।
ইভানের কথা শুনে ঈশা নত দৃষ্টিতেই মুচকি হাসল। ঈশার মা সময় নষ্ট না করে ঈশার প্লেট থেকে সমস্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার গুলা সরে ফেলল। খুব স্বাভাবিক ভাবেই অনুষ্ঠানটা শেষ হল। অনুষ্ঠান শেষ করে সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো।
——————
হাত ভর্তি করে মেহেদি পরে দুই হাত উঁচু করে ধরে অসহায়ের মতো সেদিকেই তাকিয়ে আছে ঈশা। চোখে ঘুম তার। সারাদিনে অনেক ক্লান্ত হয়ে গেছে সে। ঘুমানোর কোন উপায় নেই। কাজিনরা সবাই মেহেদি পরছে। সবার মেহেদি পরা শেষ হবে তারপর তারা দেখবে কতোটুকু রঙ ধরেছে। সে অনুযায়ী তুলতে পারবে। আরও কতো রাত হবে কে জানে। ঈশা বারবার করে বলেছিল তার খুব ঘুম পাচ্ছে। কাল সকালে মেহেদি পরবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। কাল হলুদের আয়োজন নিয়ে সকাল থেকেই সবাই ব্যস্ত থাকবে। সন্ধ্যা বেলা হলুদ। তাই আলাদা কোন প্রেসার নিবে না। বাকি যা কিছু আছে সব আজ রাতেই শেষ করে ফেলবে। ঈশা আর নিজের চোখ খুলে রাখতে পারছে না। এক পাশে দেয়ালে হেলানি দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু এভাবে কি আর ঘুমানো সম্ভব। বিরক্ত হয়ে উঠে বারান্দায় গেলো। চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে দাড়িয়ে রাস্তায় তাকিয়ে আছে। ইভান ছাদে তার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। পিছনে ঘুরতেই ক্লান্ত ঈশার চেহারা চোখে পড়তেই ভ্রু কুচকে নিলো সে। এতো রাত পর্যন্ত জেগে আছে। একটু ভেবে ফোন বের করে ফোন দিলো ঈশার নাম্বারে। কিন্তু ঈশা তো বারান্দায়। কিছুক্ষন বাজার পরে ফোন রিসিভ হল। ইভান ঈশাকেই দেখছিল। ফোন তো ঈশার হাতে নেই তাহলে রিসিভ করলো কে? ইভান চুপ করে আছে বিষয়টা বোঝার জন্য। নিলা ফোনটা রিসিভ করে একটু থেমে বলল
–ইভান ভাইয়া তুমি এতো ডেস্পারেট কেন বলতো? দুপুরেই তো বউকে নিজে হাতে খাইয়ে দিয়ে গেলে। আবার কাল বাদে পরশু তো বউকে নিয়েই যাবে। তাহলে এতো রাতে আবার ফোন দিয়েছ কেন?
ইভান বিরক্ত হয়ে বলল
–অকারনে তো ফোন দেইনি। যথেষ্ট কারন আছে। এই যে তোরা আমার এতো গুলো শালা শালি আছিস কিন্তু কেউ কোন কাজের না। এতো রাত পর্যন্ত আমার বউটাকে জাগিয়ে রেখেছিস। সারাদিনে কতো ক্লান্ত হয়ে গেছে। এই রাতের বেলাতেও তোদের অত্যাচার সহ্য করবে?
নিলা বিস্ময় নিয়ে বলল
–সারাদিন এই গরমে আমরা খেটে মরছি। আর তোমার বউ বসে থেকেই ক্লান্ত হয়ে গেলো? আমরা কেউ না তাই না? বউই সব হয়ে গেলো এখন? খুব ভালো।
ইভান নিলার কথা শুনে হেসে ফেলল। তারপর খুব শান্ত ভাবে বলল
–আমি খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছি। এখন আপাতত আমার বউটাকে একটু ঘুমানোর ব্যাবস্থা করে দে। আর দুইটা দিন ওর খেয়াল রাখ। তোদের জন্য স্পেশাল ট্রিটের ব্যবস্থা থাকবে।
নিলা হাসল। তারপর বলল
–দাড়াও ঈশাকে দিচ্ছি।
বলেই ফোনটা নিয়ে বারান্দায় গেলো। ঈশা গ্রিলের সাথে মাথা ঠেকিয়ে দাড়িয়ে আছে। নিলা ফোনটা ঈশার কানে ধরেই বলল
–তোর জামাই। কথা বল।
ঈশা ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে ইভান বলল
–কেন এভাবে বারান্দায় দাড়িয়ে আছিস? শুয়ে পড়। কাল সারাদিনে অনেক কাজ আছে। ঠিক মতো রেস্ট না নিলে নিতে পারবি এতো প্রেসার?
ঈশা অবাক হল। ইভান তাকে দেখছে। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে ছাদের দিকে তাকাতেই দেখল ইভান এক কোনায় দাড়িয়ে আছে কানে ফোন ধরে। ঈশাকে সেদিকে দেখতে দেখে হাসল। ঈশাও হেসে চোখ নামিয়ে নামানো কণ্ঠে বলল
–এখনি শুয়ে পড়ব।
ইভান একটা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল
–ভালবাসি জান।
ঈশা কোন কথা বলল না। চুপ করে থাকলো। ইভান একটু হেসে আবার বলল
–ভালবাসি বলতে হবে না। তোর এই অনুভুতি গুলোই আমার কাছে সব। তোর এই নিরব অনুভুতির সাক্ষী হয়ে থাকুক ভালবাসাময় প্রতিটা মুহূর্ত। এই মুহূর্ত গুলো এভাবেই থাক সারাজীবন ভালবাসাময় হয়ে।
চলবে………