#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক
৪১
আদ্রিশ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে আরো প্রায় চার ঘণ্টা আগে। উনি বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই আমি উনার রুমে বসে আছি। অবশ্য এখানে থাকার জন্য আম্মু আর বড় মামির কাছ থেকে পারমিশন নিতে হয়েছে। বড় মামি সহজে রাজি হয়ে গেলেও আম্মু রাজি হতে চাইলো না। কেনো, তা জানি না।
আদ্রিশ যখন পরিবারের সবাইকে এ সমস্যার কথা জানায়, তখন উনার ঢাকায় যাওয়ার বিষয়টাতে কেউই রাজি হয়েছিলো না। পরে আদ্রিশ উনাদের এই বলে বুঝিয়েছিলেন যে, এ সমস্যা ঢাকায় গিয়ে নিজ হাতে সমাধান করে আসবেন। তাহলে ভবিষ্যতে এ নিয়ে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হবে না। আদ্রিশের এ মতের সাথে সাথে আমিও একমত। কারন মাহা নামক সমস্যার সমাধান ফোন ফোনে করা সম্ভব নয়। সরাসরি সেখানে উপস্থিত থেকে এ সমস্যার সমাধান করলে ভবিষ্যতে এ নিয়ে কোনো ঘটনা হবে না। অন্তত আমার আর আদ্রিশের এটা মনে হয়।
আদ্রিশ এক পোশাকেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। কারন আজ গিয়ে সোজা হসপিটালে উঠবেন এবং সেখানকার কাজ সেরে রাত অথবা কাল সকালের মধ্যেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিবেন।
উনি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরপরই এক অজানা আতঙ্ক এবং ভয় আমাকে গ্রাস করতে শুরু করে। উনাকে হারানোর বাজে এক চিন্তা আমার পুরো মনমস্তিষ্ক জুড়ে বসে। বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক শূন্যতা অনুভব হতে থাকে। এজন্যই আমি উনার রুমে এসে উনার উপস্থিতি কল্পনা করে সে শূন্যতা দূর করতে চাইছিলাম।
কিছুক্ষণ সময় কেটে যাওয়ার পর আমি আদ্রিশকে ফোন করলাম। প্রথমবার কল রিসিভ করলেন না উনি। এজন্য দ্বিতীয়বার কল দিলাম। সাথে সাথে উনি কল রিসিভ করলেন। ওপাশে শুনতে পেলাম উনার ঘুম জড়ানো কণ্ঠ,
“হ্যা বলো, মিশমিশ।”
আমি ছোট্ট এক নিঃশ্বাস ফেলে বললাম,
” কোথায় আপনি?”
উনি কয়েক সেকেন্ড পর জবাব দিলেন,
” গাজীপুরে।”
” ওহ ভালো। আচ্ছা আপনার কি টেনশন হচ্ছে না?”
আদ্রিশের ঘুম হয়তো এবার কেটে গেলো। উনি স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,
” টেনশন হওয়ার কি আছে?”
আমার প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে এমন প্রশ্ন করায় আমার একটু রাগ হলে বটে। আমি অভিমানী কণ্ঠে বললাম,
” এতো চিল মুডে আছেন কি করে আপনি? ঐ মাহা যদি কিছু করে বসে? আপনাকে যদি আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়?”
আমার কথা শেষ হতে ফোনের ওপাশে আদ্রিশের হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। কয়েক সেকেন্ড হাসবার পর উনি বললেন,
” কার এমন সাধ্য আছে যে আমার মিশমিশকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিবে? ঐ মাহা কখনও এমন করতে পারবে না। এতো টেনশন করে লাভ নেই।”
আদ্রিশের সোজা স্বাভাবিক কথাও আমি মানতে পারলাম না। বললাম,
” আপনি বললেই হলো? আমার টেনশন হচ্ছে, এটা আপনি বুঝতে পারবেন না। ”
” ওহ তাই নাকি! আমি বুঝতে না পারলে কে বুঝবে শুনি?”
” কেউই বুঝতে পারবে না। ”
” মিস মিশমিশ, ভুল বললেন আপনি। আমি শুধরে দিচ্ছি। কথাটা হবে, আমি বাদে তোমাকে কেউ বুঝতে পারবে না।”
” হুহ, ঢং করবেন না। আপনি আমাকে বুঝতে পারলে আমাকে টেনশন ছাড়া থাকতে বলতেন না।”
ওপাশে আবারো হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। আদ্রিশ এবার হাসতে হাসতে বললেন,
” তো আমি কি তোমাকে টেনশন করতে বলবো? বলবো, টেনশন থেকে দূরে থাকতে।”
“আচ্ছা, হয়েছে হয়েছে। ”
” ঠিক আছে। তুমি কি করছো এখন?”
” আপনার রুমে বসে আছি।”
ওপাশে আদ্রিশের বিস্ময়াভূত কণ্ঠ শুনতে পেলাম। উনি বললেন,
” ও আল্লাহ! আমার রুমে মিস মিশমিশ এসে উপস্থিত হয়েছে! আই কান্ট বিলিভ দিস।
উনার এমন বিস্মিত কণ্ঠস্বর শুনে আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
” হ্যা, তো? এতো অবাক হওয়ার কি আছে?”
” তো অবাক হবো না? আমার মিশমিশ বাসর রাতের আগেই আমার রুমে এসে উপস্থিত! ”
আদ্রিশের কথায় আমি লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম। এ কথাকে পাশ কাটাতে বললাম,
” আচ্ছা, পরে কথা বলবো। এখন রাখছি।” এই বলেই আমি ফোন রাখতে গেলাম। তবে আদ্রিশ আমাকে ফোন রাখতে দিলেন না। উনি বললেন,
” আমার রুমে কি করছো তুমি?”
” তা জেনে আপনার কাজ কি?”
” বাহ রে। আমার রুমে গিয়েছো তুমি। কি কারনে গিয়েছো, সেটা তো আর জানি না। জানতে তো হবে।”
” পরে জানবেন, এখন না। আর ঢাকায় পৌঁছে আমাকে জানাবেন। বাই।”
এই বলে সাথে সাথে ফোন রেখে দিলাম আমি। এখন আপাতত কথা অন্যদিকে নেওয়ার কোনো মুড নেই। এ মূহুর্তে তো শুধু দুশ্চিন্তা আর আদ্রিশের শূন্যতা অনুভব করছি আমি।
হঠাৎ দরজার দিকে চোখ যেেতই উনার টেবিলে রাখা ডায়েরিটার কথা মনে পরলো। আজ আদ্রিশ নেই, কেননা এই সুযোগে উনার ডায়েরিটা পড়ে ফেলা যাক! যেই ভাবা সেই কাজ।
আমি দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে দরজাটা ভিজিয়ে দিলাম। টেবিলের উপর থেকে আদ্রিশের পার্সোনাল ডায়েরিটা নিয়ে সোজা বিছানায় এসে বসে পরলাম। আজকে সম্পূর্ণ ডায়েরি পড়বো আমি। একদম শুরু থেকে শেষ। আমার প্রতি উনার সব অনুভূতির কথা জানতে এ ডায়েরি পড়া ছাড়া আর উপায় নেই।
আমি আস্তেধীরে ডায়েরির প্রথম পাতা খুললাম। শুরুতেই আদ্রিশের ফ্যামিলি ফটো লাগানো। নিচে ক্যাপশন দেওয়া,’হ্যাপি ফ্যামিলি।’
ডায়েরির প্রথম কয়েক পাতা উনার ইন্টার্নি লাইফ নিয়ে লেখা। মেডিকেল লাইফ নিয়ে কিছুই লেখা নেই। অর্থাৎ এ ডায়েরিটা নতুন ডায়েরি। খুব বেশিদিন আগের না। অথচ অর্ধেকের বেশি ডায়েরির পাতা লেখায় ভরপুর।
আদ্রিশের ইন্টার্নি লাইফ নিয়ে, উনার ঢাকায় থাকা বন্ধুদের নিয়ে বেশ কয়েকটা ঘটনা লেখা ডায়েরিতে। সেসব পড়তে প্রায় পয়তাল্লিশ মিনিট চলে গেলো আমার। এরপর এলাম কাঙ্ক্ষিত সেই ডায়েরির পাতায় যেটা পড়ার জন্যই প্রধানত ডায়েরিটা হাতে নিয়েছি আমি।
যে কেউ ডক্টর আরসালান আহমেদ আদ্রিশের হাতের গোটাগোটা অক্ষরে লেখা ডায়েরির একটা পাতা পড়লে, উনার হাতের লেখার উপর ফিদা হবে এটা আমি নিশ্চিত। উনার এত সুন্দর হাতের লেখা শুধু দেখতেই মন চাইছে আমার। সাধারণত ডক্টরদের হাতের লেখা ধরন হয় ‘কাকের ঠ্যাং,বকের ঠ্যাং’ টাইপ। অথচ আদ্রিশের হাতের লেখা অদ্ভুত রকমের সুন্দর এবং আকর্ষণীয়।
ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে আসার আগের রাতের লেখা থেকে পড়তে শুরু করলাম আমি।
“আজকে সব ফ্রেন্ডসরা মিলে খুব মজা করলাম। অনেকদিন পর এমন পার্টি করলাম। করবোই না বা কেনো। এরপর তো সবাই আলাদা হয়ে যাবো। কে কোথায় চলে যাবে তার থাকবে না কোনো খোঁজ। আবার কবে গেট টুগেদার পার্টি হবে সেটাও আন্দাজ করা যায় যাচ্ছে না। এজন্যই এতো প্ল্যানিং করে বড়সড় পার্টি করলাম আজকে।
আগামীকাল সকালে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হবো। কাউকে ফোন করে আমার যাওয়ার কথা বলেনি। কারন সারপ্রাইজ দিতে চাচ্ছি সবাইকে। ভাবতেই মজা লাগছে যে, আমাকে হুট করে দেখে দাদি,আম্মু আর চাচির চেহারার অঙ্গভঙ্গির কি পরিবর্তন হবে! অবশ্য সবচেয়ে বেশি সারপ্রাইজড হবে নদী। মেয়েটা আমাকে দেখলে প্রতিবার সারপ্রাইজড হয়। বলে কয়ে যাওয়ার পরও। আর এবার তো বলে যাচ্ছি না। সো নদীর চেহারার অবস্থা দেখার মত হয়ে যাবে নিশ্চয়ই।”
“বাড়িতে এসে সবাইকে সারপ্রাইজ দেওয়ার পর দিনশেষে আমিও এসে সারপ্রাইজড হয়ে গিয়েছি। আজ বাড়িতে অনাকাঙ্ক্ষিত এক অতিথির সাথে দেখা হলো আমার। বাকি সবার জন্য সে কাঙ্ক্ষিত হলেও আমার জন্য সে অনাকাঙ্ক্ষিত।
মেয়েটার সাথে এর আগে কখনও দেখা হয়নি আমার। রাতের বেলা ওর পরিচয় জানতে পারলাম। অনেকটা দূর সম্পর্কের এক ফুফাতো বোন সে। যদিও আমি ওকে ফুফাতো বোনের মত মানতে পারিনি। মোটকথা, ওকে ফুফাতো বোন মানতে মোটেও মন চাইছিলো না।
আচ্ছা, মেয়েটার সাথে প্রথম দেখা কিভাবে হলো তা লিখি।
আমি সবার সাথে দেখা করার পর দাদু রুমে গেলাম। কারন দাদু বেশিরভাগ সময় নিজের রুমেই থাকে। দাদুর রুমে যাওয়ার পর দাদুকে তো পেলাম না। বরং অপরিচিত একটা মেয়েকে দেখতে পেলাম। চশমা পরে গভীর মনযোগ দিয়ে সে বই পড়ছিলো। এট এ গ্ল্যান্স, মেয়েটার সেই মনযোগী রূপটা মনে ধরে যায় আমার। কাউকে এভাবে চোখে চশমা দিয়ে গভীর মনযোগে বই পড়তে দেখলে অবশ্যই ভালো লাগার কথা। অন্তত আমার এটা মনে হয়।
আমি মেয়েটাকে কয়েক সেকেন্ড দেখালাম। মনযোগ সহকারেই দেখলাম। হঠাৎ আমার নজর পরলো ওর হাতে থাকা বইটার উপর। ‘ত্রাতিনা’ বইটা পড়ছে সে। ঐ বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় যে আমার আনাড়ি হাতের কবিতা আছে সেটা খেয়ালই ছিলো না। কবিতার কথা মনে পরতেই আমি দ্রুত গিয়ে ওর হাত থেকে বইটা নিয়ে নিলাম। ওর কোনো প্রশ্ন করার আগেই বইটা তার নিজের জায়গায় রেখে ওর সামনে এসে দাঁড়ালাম। বই নেওয়ার পর ওর চেহারা দেখার মত ছিলো। চশমার আড়ালে বড় বড় চোখের সে চাহনি বেশ মনে ধরেছিলো আমার।
খানিকটা রাগী আর বিরক্তির একটা ভান ধরে আমি ওর তাকিয়ে রইলাম। এমনটা না করলে ও অনেক কিছুই ভাবতে পারে। আমার রাগী দৃষ্টির পরিবর্তে সেও বেশ রাগী একটা ভাব নিয়ে উঠে পরলো। এরপর তার প্রথম করা প্রশ্ন ছিলো,’ এটা কোন ধরনের ভদ্রতা!’ ওর কণ্ঠস্বরে একটা প্রতিবাদী ভাব ছিলো। সাথে ঝগড়ার এক ঝাঁঝ! আমিও ওর কথার প্রত্যুত্তর দিলাম। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ আমাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি চললো। পরে দাদু রুমে চলে আসায় আমাদের কথা সেখানেই শেষ হলো।
সন্ধ্যার দিকে আমি নিজের রুমে বসে ছিলাম। হয়তো আম্মুর কথায় মেয়েটা আমার জন্য শরবত নিয়ে আসলো। রুমে ঢুকেই ও আমাকে ভাইয়া সম্বোধন করে শরবতের কথা বললো। ওর মুখে ভাইয়া সম্বোধনটা শুনে একটু রাগ হয়েছিলো আমার। এজন্য ওর সাথে একটু মজা করতে চাইলাম। হুট করে বলে বসলাম, ও কাজের মেয়ে কি না। ব্যস,ওর চোখেমুখের অবস্থা দেখার মত ছিলো। রেগে একদম ফুলে ফেঁপে উঠেছিলো। ফলস্বরূপ শরবতের গ্লাসটা ঠাস করে টেবিলে রেখে চলে গেলো। ওর এ কাণ্ডে আমি তখন এতো হেসেছিলাম, তা বলার বাইরে। খুব মজা লেগেছিলো ওকে রাগিয়ে।
মেয়েটার পরিচয় তখনও জানতাম না। পরে খাওয়ার টেবিলে জানতে পেলাম ওর পরিচয়। ওর নাম। কমন একটা নাম ওর, ‘মিম’। নামটা কমন হলেও ওর চেহারাটা কমন ছিলো না। মানে, কারোর চেহারাই কমন না। ওর ও না আরকি।
যাই হোক, ওর সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে আমি শুধু ওর রাগী চেহারা দেখেছি। মানে চেহারায় সবসময় খিটখিটে, রাগী একটা ভাব ওর। মেয়েটা কি হাসতে জানে নাকি কে জানে। এ রাগী মেয়েটার হাসিখুশি চেহারাটা দেখতে কেমন হবে কে জানে। হয়তো সুন্দর, হয়তো সাধারণ বা হয়তো অসাধারণ!”
®সারা মেহেক
#চলবে